চাকমা লোকসংস্কৃতি গেঙহুলি – বিনয় জ্যোতি চাকমা

0
591
চা। ক। মা। লো। ক। স। ং। স্কৃ। তি
গেঙহুলি
বিনয় জ্যোতি চাকমা
ঐতিহ্যবাহী আধ্যাত্মিক ধরনের পালা গানের শিল্পীদের গেঙহুলি বলে। গেঙহুলি চাকমাদের এক ভিন্ন ধরনের গান। গেঙহুলিরা মূলত: বেহালা, ঢোল, শিঙা, হেংগরঙ (শিঙা আর হেংগরঙ এক ধরনের চাকমাদের বাদ্যযন্ত্র) বাজিয়ে পালা গান গেয়ে থাকে। বর্তমানে কমই দেখা যায় এ ধরনের শিল্পীদের। গেঙহুলিদের আনাগোনা দেখা না গেলেও ইদানিং ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য কিছু সচেতন লোক তাদেরকে বিভিন্ন প্রোগ্রামে আমন্ত্রণ করে থাকেন এবং গেঙহুলির আসর বসান। গেঙহুলিরা পূজা মণ্ডপের মত করে বৈঠক সাজায় এবং পদ্মাসন এর মত করে বসে বৈঠকখানায়। সেই মণ্ডপে থাকে দা, ফুল, সুতা, মাটির পটে পানি, তুলা, চাউল ইত্যাদি আর সাথে কুপি এবং মোমবাতি জ্বালিয়ে সরস্বতী হাজির করানো হয়। সে সময় গানের সুরে তারা বলেন  –
টাগোল দাড়েই হর শিলোত
শ্বরস্বত্তি আজিল অ মর জিলত।
বাংলা হলো  –
দা সান দেয় টাক টাক শব্দ করা পাথরে
সরস্বতী হাজির হোক আমার জিহ্বায়।
তার মানে তারা আত্মাতিক শক্তি হাজির করে জিহ্বায় এবং তখন সেই আত্মাতিক আত্মা এসে সেই সময় রচিত পালাগুলো গানের সুরে গাইতে শুরু করে। রাধামন- ধনপুদির পালাতে যতগুলো চরিত্র আছে ঠিক ততোধিক শব্দ করতে থাকে তবে একসাথে দুজন প্রয়োজন হয়। মেয়েদের কণ্ঠস্বর একজনের জিহ্বায় ভর করে আর পুরুষের কণ্ঠস্বর আরেক জনের জিহ্বায়। তবে গেঙহুলিতে মেয়েরা বা মহিলারা দলের মধ্যে থাকে না। শুধু ছেলে/ পুরুষরাই এই পালা গানের দলে থাকে।
তাদের গানগুলো মূলত ভিন্ন ধরনের এবং তারা শত শত বছর পুরনো চাকমাদের যে ইতিহাস এবং তখনকার ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার চিত্র তুলে ধরেন গানের মধ্যে দিয়ে। গেঙহুলি চাকমাদের খুব জনপ্রিয় একটা পালা গানের আসর। গেঙহুলি পালা গানের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হল – রাধামন-ধনপুদি পালা। রাধামন-ধনপুদি পালাতে মূলত রাধামন আর ধনপুদি নামের দুজনের জীবন কাহিনী। তাদের দুজনের শৈশব, যৌবন, বিবাহ নিয়ে এই পালা। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের পালা তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো –
১. চাদিগাঙ চাড়া পালা (চিটাগং ছাড়ার  সময়কাল)
২.চাঙমা ইদিহাস পালা (চাকমাদের ইতিহাস নিয়ে) ইত্যাদি।
এখানে রাধামন-ধনপুদি পালার সংক্ষিপ্ত উপস্থাপন করা হলো  –
১.
জন্মানের পর পরই যেভাবে দোলনায় বড় হয়েছে।
নাদিন দ্বিবে এধঝেবর
দাঙর দাদা এগবজর।
গলা, মরিজে বান্যেগোই
পারবো দগা আন্যেগোই।
নাক্স গাজর রিবেঙ জু
বুন্নে দুলোন হেরেঙ জু।
হেরেঙ জু দুলোন হেরেদ চাদ
এবেত বুনিলু চলাবাপ।
দুলোন বুনোনা থুম অল
নাদিন দুওবো তুলিলো।
বত্যে দরি ঘনপাগ
অলি দাগিদের চলাবাপ।
সোনার দুলোনর রুবোর দরি
দাদালোই বেবে ঘুমযাদন সমারে দুলোনত পরি।
অলিরে অলি অলি অলি।
আদত লোইয়্যা গুলিগুন
আমা দাদা মারি আনিব ঝার পেইক।
অুল্ল্য বয়ারে দুলোনান
আজি উদিল জনমান।
মেইয়্যা দিদিল মেইয়্যা জালে
মাত্তল অল মহাহাল।
দিনর গাঙে দিন উজাদন
গুরো দুওবো বারদন।
এ্যাহেধ ফুরেল হাদাবন
চিগোন ছড়া পাদাবন
মেনকা পুও রাধামন।
রঙবুদি বিদ্যা দোল গমপুদি
হপুদি ঝিবও ধনপুদি।।
চগদায় হামাল্যে থুরগুন
মেনকা বোন পুগবেল পজিমে গেল
ফুদেলুঙ হনাদ ঝেদেনা হৈ।
গাবুর সুন্দর অলাককোই
গুলসদরত পল্লাককোই।
সাগর দিন গেলোগোই
বেবে ধনপুদি বার বজরত পল্লগোই।
বাংলা অনুবাদ
নাতী দুইটার বয়সের হেরপের
বড় নাতী বড় একবছর।
পাহাড়ি বেত, দেশী বেত বাঁধছে
বাঁশ নিয়ে এসেছে।
নাগেশ্বর গাছের ছার কাঠ
বুনে দোলনা কেড়েঙ জো।
(এখানে কেড়েঙ জু মানে বুননের একটা ধরন বুঝানো হয়েছে। উপরে উল্লেখ ছিল কেরেদ, মরিজ্যে, গোলা সবই বেত জাতীয় তবে চাকমা ভাষায় সবই আলাদা আলাদা নামে পরিচিত।)
কেড়েঙ জু দোলনা বেত চালা
এই  বেত বুনছে চলার বাপ।
দোলনা তেরি  শেষ হলো
নাতী দুটোকে তুললো।
বস্তা দড়ি ঘন পাক
অলি ডেকে দিচ্ছে চলার বাপ।
সোনার দোলনাতে রূপার দড়ি
নাতি নাতনী একসাথে ঘুমায় দোলনাতে চড়ি।
অলিরে অলি অলি অলি।
হাতে নিয়েছে গুলিগুলো
নাতি মেরে আনবে জঙ্গলের পাখি।
বাতাসে দোলে দোলনা
উঠল হাসি জনম ভর।
মায়া জালে মায়া দিল
মাতাল হলো মহাকাল।
দিনের নিয়মে দিন বাড়ে
দুই নাতীন যায় বেড়ে।
হেঁটে হেঁটে ফুরালো কাঁটাবন
ছোট নদীর পাতাবন
মেনকার ছেলে রাধামন।
শিক্ষায় সুন্দর রঙ ফুটে
হপুদির মেয়ে ধনপুদি।
কাঠবিড়ালী কামড়েছে মোচা
মেনকা বোন, পূর্বের সূর্য পশ্চিমে গেল
খৈ ফোটাবো কোণায় বসে।
সুন্দর যৌবনে পা দিয়েছে
সুন্দর গ্রামে এসে পড়েছে।
অনেকদিন চলে গেছে
ধনপুদি বার বছরে পা দিয়েছে।
২.
কৈশোরের সময় –
ঘিলে হারাত তাক চেলাক
সয় সমাজ্যা লাক পেলাক।
ফুলে ল্যাম্যা ফুল বিঝু
তা পরনদি মুর বিঝু।
সমারে বেরাদন গুরো জাক
ঘিলে ভাগগল্যো চলাবাপ।
ধল্য ঘিলে এগ থাগত
মিলে মদ্দে এগ ফাগত।
             লামি এলাগ ঘরত্তুন
                     অলাগ এগফাগত মরত্তুন।
             পেঙগুল রাঙা ঘিলেগুন
                      হমর দর মিলেগুন।
             লামি ঘোস্যে ফুরেলাক
                       আদাম্যা পাড়াল্যে থুবেলা।
             বত্যে দরি ঘনপাগ
                       হবর দিলু চলাবাপ।
বাঙ্গানুবাদ –
ঘিলে খেলায় তাক করল (ঘিলে এক ধরনের খেলা। যা গোল চ্যাপটা এক ধরনের ফলের বিচি দিয়ে খেলতে হয়)
বন্ধু- বান্ধবের সাথে দেখা হইল।
ফুল নিয়ে এসেছে ফুলবিঝু
(বিঝু চাকমাদের সামাজিক উৎসব যা চৈত্র সংক্রান্তির দিন করা হয়। ঠিক তার আগের দিন ফুল বাসিয়ে প্রার্থনা করা হয় তাকে ফুল বিঝু বলে)
                  তারপর দিন মুল বিঝু।
           একসাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে ছেলেমেয়ের ঝাঁক
                  ঘিলা ভাগ করছে চলার বাপ।
           ধরছে সব ঘিলা এক জায়গায়
                   ছেলে মেয়ে একসাথে।
            নেমে আসলো ঘর থেকে
                   ছেলেরা সব হলো একসাথে।
            লাল চ্যাপ্টা গোল ঘিলাগুলো
                    কোমরে শক্ত মেয়েদের।
            তিল তোলা শেষ হলো
                     গ্রামের মানুষ জড়ো হলো।
            বস্তা দড়ি ঘন পাক
                     খবর দিলো চলার বাব।
৩.
যৌবনের গানের অংশটুকু সংগ্রহে না থাকায় এখানে দেয়া গেল না।  তবে এর সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা আমি উত্থাপন করছি। এখানে রাধামন আর ধনপুদি তাদের প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তারা দুজন দুজনকে অনেক ভালোবাসে এবং রাধামন ধনপুদিকে ছাড়া থাকতে পারে না এক মুহূর্ত। তারা একসাথে ঘুরতো ফিরতো। যৌবনের প্রেমের বন্ধন তাদেরকে নিয়ে যেত এক স্বর্গীয় আবাসে। সে সময় রাধামন ধনপুদির জন্য ফুল আনতে যায় এবং ফুল আনতে গিয়ে রাধামনের সামনে পড়ে এক বড় কোবরা সাপ এবং এক সময় সেই সাপ রাধামনকে দংশন করে। গাছের ঢালের উপর বসে সেই ডাল ভেঙ্গে পড়ে যায় এবং রাধামন সাগরে ভেসে যায়। ধনপুদি রাধামনকে সাগরে এক তান্ত্রিক দ্বারা সাগরের নীচ থেকে ভাসিয়ে তোলে। রাধামনকে বাঁচানোর জন্য ধনপুদি মরিয়া হয়ে উঠে। এবং বিভিন্ন ওঝা আর তান্ত্রিক নিয়ে আসে রাধামনকে বাঁচানোর জন্য। ধনপুদির চোখে মুখে বিষাদের ছাপ। তান্ত্রিক আর ওঝা দিয়ে বিষ উঠানোর ব্যবস্থা করায় ধনপুদি। শেষ পর্যন্ত বাঁচাতে সক্ষম হয় রাধামনকে।
এসব কাহিনী নিয়ে রচিত হয় রাধামন ধনপুদির পালা।  ফুল নিয়ে আসার অংশটুকু বলে “ফুল পারা” অর্থাৎ ফুল পেরে নিয়ে আসা।
প্রেমের সেই শুভ ক্ষণগুলো রাধামন আর ধনপুদির ছিল এক একটা মধুময় সময়। তারা একসময় একে অপরকে কথা দেয় কোনদিন তারা কেউ কাউকে ছেড়ে যাবে না। তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়, মরতে হয় এক সাথে, বাঁচলেও এক সাথে। রাধামন একদিন ধনপুদির জন্য ঘিলা বীজ পেরে নিয়ে আসতে যায়। প্রতিনিয়ত রাধামনকে তার প্রেমের পরীক্ষা দিতে হয়েছে। সেই ঘিলা পেরে নিয়ে আসা বিষয়ক যে পালাটি রচিত হয় তার নাম হলো “ঘিলে পারা”। ঘিলা হলো  এক ধরনের ফলের বীজ। ঘিলা দিয়ে যে খেলাটি করা হয় তার নাম ঘিলা খেলা।  এই খেলা চাকমাদের মধ্যে একটা ঐতিহ্যবাহী খেলা। সেইসব ঘিলা দিয়ে ছেলেমেয়ে সবাই একসাথে খেলে। তার পরের যৌবনের আর একটা বড় অংশ হলো “রান্যে বেরা”। মানে পুরানো জুম ক্ষেতে গিয়ে বেড়ানো। তারা দুজনে মিলে সেসব জায়গায় ঘুরে ঘুরে প্রেমালাপ আর হাতে হাত ধরে ঘুরাঘুরি।  এবং সেখানে কী ঘটনা বা কী সব কথা হতো সেগুলো নিয়ে শুরু হয় রান্যে বেরা অধ্যায়টি। তারা দুজনে প্রেমে মত্ত হয়ে সারাদিন ঘুরে বেড়াতো পুরানো জুমে জুমে। এক বাড়িতে জানাজানি হয়ে যায় তাদের প্রেমের কথা। ফলে ধনপুদির বাবা মা ধনপুদিকে বকাবকি করে। তাদের বাবা মা কিছুতেই তাদের প্রেমকে মেনে নেয়নি। যার দরুন ধনপুদির বাবা মা ঠিক করে ধনপুদিকে বিয়ে দিয়ে দিবে। এই কতা শুনে রাধামন আর ধনপুদির দুজনের মন ভেঙ্গে গেল। কিন্তু তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বাঁচলে একসাথে, মরলে একসাথে। এক সময় ধনপুদির বিয়ের সম্বন্ধ আসে আদিচরন নামে গ্রামেরই এক ধনী লোকের ছেলের সাথে।
৪.
যখন ধনপুদির অন্য জায়গা থেকে বিয়ের সম্বন্ধ আসলো
            হোল্ল্যি মেলি পান হাদন
                  ধনপুদিরে বো চাদন।
            বোগোরা মুঝি হপুদি
                 কয়দ্যে ঝিবরে বো দি।
            বিদুর শুনি রাগ গরে
                 উরুদ আহ্রাদ হাম গরে।
            তাগল লাগেই সামেইবো
                  দেগা আনিলাগ জামেইবো।
             আদাম্যে গুরো হাপ্পেই চান
                    আদিচরনরে রেনি চান।
              সাঝিত তলে ঝাম্পাদি
                   নোনেয়্যা বোন্ন্যু ধনপুদি।
              পিজুম বাজচ্যে ধোচ্চেগোই
                     সাঙু পাগেই পোয্যেগোই।
              সিত্তুন ঘরত উত্তেগি
                     সাঝিত তলে বোচ্চেগি।
               মরিজ বাদে ধনপুদি
                      হামদ বায্যে হপুদি।
              পানে হেইয়্যা সিবুদি
                    গত্তন আদিচরনরে বিগিদি।
              মেলাঘর জামেইব্যে
                    বেবে ধনপুদিলোই বারি মানেবো।
             আধহ্ ভরেইনে দোই হেইয়্যা
                   নিজদি আদিচরনরে চেই যেইয়্যা।
             ফুলর হাবর বিঝেইদি
                    বোজ্যা ধনপুদিমা পিজেন্দি।
              পিজে গেল আজুরে দেগেই দিলু
              আদিচরনে এ্যাইয়োত বৌব।
              মুজুঙে হপুদি মুজিরে–
              গানে দোলে নাঝদন
                   জাগায় জাগায় আজদন।
               মুঝি হপুদি আজিলো
                     দাদা আদিচরনে লাজেল
               সালাংগোরি পোয্যেগোই পান
                   লগে সিবুদি উল্লেই পল্ল পিজেদি
                     ফেল্যা আত্তান বিজেইদি।
             দোয়ে মাদাত ঘি অব
                 হল হপুদি হি অব।
             বুগত পুদিল শক্ডি শেল
                  ঘরত্তুন চিত্তি লামি গেল।
             আজু ঘরত বোচ্ছ্যেগোই
                  গুজুরি গুজুরি হানেল্লোই।
             বোত্যে দরি ঘন পাক
                   হল আজু চলাবাপ।
              ভাদে হাবরে হেই পেবে
                    দিলে মা বাবে যেই পেবে।
বঙ্গানুবাদ –
            পলিথিন খুলে পান খাচ্ছে
                         ধনপুদিকে বৌ দেখতে এসেছে।
             বগরা মাসি হপুদি
                         বলে মেয়েটাকে বিয়ে দিই।
             বিদুর শুনে রাগ বাড়ে
                        রাগে তাড়াতাড়ি কাজ করে।
             হামি লাগায় দা তে
                        জামাই নিয়ে আসলো দেখতে।
             গ্রামের ছেলেরা লুকিয়ে দেখে
                        আদিচরণ চেহারার দিকে।
            পানির পাত্র সনচার উপর
                        ধনপুদি বোনটি আদরের
            বেয়ে উঠার বাঁশটি ধরেছে
                         মইটি ঘুরে পড়েছে।
            সেখান থেকে ঘরে উঠেছে
                          সনচার উপর বসেছে।
            মরিচ বাছে ধনপুদি
                         কাজে ব্যস্ত হপুদি।
            পানের সাথে চুন খায়তে
                         আদিচরণকে নিয়ে ঠাট্টা করতে।
            বিয়ের বাড়ির বর
                         সাথে মানাবে দিদি ধনপুদির।
            হাতে দিয়ে দই খেয়েছে
                         নিচে আদিচরণকে দেখে গেছে।
            নকশা তুলা কাপড় বিছিয়েছে
                        ধনপুদির মা বেসেছে পিছনে।
            পিছনে গেলো
                        দাদুকে দেখিয়ে দিলো।
            আদিচরণ বসবে এখানে
                        হপুদি মানিকে সামনে।
            গানের তালে নাচতেছে
                         জায়গায় জায়গায় হাসতেছে।
            মাসি হপুদি হাসল
                         আদিচরণ লজ্জা পেল।
            সালাম করতে পড়েছে
                          পানের সাথে চুন
                               উল্টিয়ে পড়লো পিছনে
                                   হাতটা দিলো বিছিয়ে।
           ধোয়া মাথায় ঘি হবে
                          বললো হপুদি আর কী হবে।
           ধনুকের তীর বুকে বিঁধল
                          বাড়ি থেকে ধনপুদি নেমে গেল।
            দাদুর ঘরে বসেছে
                          জোরে জোরে কাঁদতেছে।
            বস্তা দড়ি ঘন পাক
                           বললো দাদু চলার বাপ।
           অভাব হবে না কাপড় ভাতে
                            মা বাবায় বিয়ে দিলে হবে যেতে।
ধনপুদি কিছুতেই তার বাবা মায়ের মতের সাথে রাজি হতে চাইলো না। কিন্তু ধনপুদির বাবা মা ও ধনপুদিকে তার অমতে তারা আদিচরণের সাথেই বিয়ে দিবে এবং শেষ পর্যন্ত আদিচরণের সাথে ধনপুদির বিয়ে ঠিক হলো। এবং বিয়ের দিনও ধার্য করা হলো।
৫.
বিয়ের দিন –
            চেরোহিত্যে বাদ্য বাজাদন
                      দুলে দগরে নাজদন।
             হামদ বায্যে যেদে হপুদি
                       চুমুলঙ পানি হুম্মো গাঙত ভরা গেল
                          নোনেয়্যে বন্ন্যে ধনপুদি।
             গাঙত সালাঙ দি বোচ্চ্যগোই
                        গুজুরি গুজুরি নোনেয়্যি বন্ন্যে হানেল্ল্যোই।
              পানি হুম্মো ভোজ্যেগোই
                        চালাগি বুদ্ধি তুল্ল্যেগোই।
               চুমুলঙ পানি হুম্মোলোই
                         রাধামন দাগি ঘরত উথ্যেগোই।
বাঙ্গানুবাদ –
              বাদ্যযন্ত্র বাজায় চারদিকে
                  ঢোলের তালে তালে নাচতেছে।
              কাজে ব্যাস্ত জেঠি হপুদি
                   নদীতে চুমুলঙ পানির কলসটা ভরতে গেছে
(চাকমাদের বিয়ে করতে পানির কলস আর পানি লাগে, বিয়ে পড়ানোর সময়টা ব্যবহার হয়,  সেই পানির কলস নদী থেকে ভরে নিয়ে আসতে হবে বউকে এবং বউকে অবশ্যই সেই কলস সহ পানি নিয়ে বরের ঘরে আসতে হবে। অন্য ঘরে উঠলে সেই ঘরের উপযুক্ত বা কোন পুরুষ থাকলে তাকেই বিয়ে করতে হয়, সেই পানিটাকে চুমুলঙ পানি বলে)
                        আদরের বোনটি ধনপুদি।
              নদীকে সালাম দিয়ে বসেছে
                     জোড়ে জোড়ে আদরের বোনটি কাঁদছে।
               চুমুলঙ পানি ভরলো
                       চালাকি বুদ্ধি করলো।
               চুমুলঙ এর কলসটা নিয়ে
                       উঠল রাধামনের বাড়িতে।
শেষ পর্যন্ত ধনপুদি চুমুলঙ-এর পানির কলস নিয়ে রাধামনের বাসায় উঠে পড়ল এবং তারা দুজনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হল।
=============
তথ্য সংগ্রহ সহযোগিতায়:  বাবু বিমল চন্দ্র চাকমা, বয়সঃ ৭৬, শশী দেওয়ান পাড়া, বনরূপা, রাঙামাটি।  লেখাটি ‘চালচিত্র’ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here