হারুকি মুরাকামির গল্প – উবে গেল হাতি। ভাষান্তর : হোসেন মোতাহার

0
1231

হারুকি মুরাকামির গল্প

উবে গেল হাতি

ভাষান্তর : হোসেন মোতাহার

হাতির খেদা থেকে হাতিটা উধাও হয়ে গেল। খবরটা আমি প্রথম নিউজপেপার পড়েই জানতে পারি।
আমার এলামর্ দেয়া ঘড়িটা রোজকার মত সেদিনও যথারীতি সকাল ৬:১৩তে জাগিয়ে দেয়। রান্নাঘরে ঢুকে আমি কফি আর টোস্ট বানাই। রেডিওটা ছেড়ে দিই। আর পেপারটা রান্নাঘরের টেবিলেই ছড়িয়ে দিই। তারপর পড়ায় মনোনিবেশ করি। আমি বস্তুতপক্ষে সেরকমই একজন যে পেপারের আদি থেকে অন্ত পড়ি। ফলে হাতির উবে যাওয়ার খবরটা পুরোপুরি পেতে কিছু দেরী হয়ে যায়। প্রথমপাতা ভরে আছে এসডিআই, আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য বচসার খবর দিয়ে। তারপরের পাতাগুলোয় দেশের খবর, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি, সম্পাদকের কাছে চিঠি, বুক রিভিউ, রিয়েল-এস্টেট বিজ্ঞাপন, খেলাধুলোর জগৎ। আর সবশেষে থাকে আঞ্চলিক খবর।
হাতির উবে যাওয়ার খবরটা আঞ্চলিকপাতায় লিড করে ছাপানো। অস্বাভাবিক বড়বড় অক্ষরে ছাপানো
‘টোকিওর শহরতলী থেকে হাতি উধাও’ তার চেয়ে একসাইজছোট অক্ষরে লেখা ‘নগরবাসীর উদ্বেগ চূড়াস্পর্শী। কেউ কেউ এর জন্য তদন্ত দাবী করছে।’ বিরাণ খেদায় পুলিশের ছবি ছাপানো। হাতিশূন্যতায় জায়গাটা কীরকম যেন অচেনা লাগে। জায়গাটাকে অনেক বড়, শূন্য আর ফাঁকা লাগে। হাতি থাকতে অবশ্য এরকম বড় মনে হয়নি। এখন মনে হতে থাকে, বিশাল কোন প্রাণির ডিহাইড্রেশনের জন্য পাকস্থলীটাই খুবলে নেয়া হয়েছে।
টোস্টে কামড় দিতে দিতে আমি আর্টিকেলটার প্রত্যেকটা লাইন পড়ি। ১৮ই মে’র আগের দিন বেলা দু’টোর দিকে হাতির অনুপস্থিতি প্রথম নজরে পড়ে, স্কুললাঞ্চ কোম্পানির ট্রাকটা খেদায় এসে স্কুলের বাচ্চাদের ফেলে দেয়া খাবারগুলো যখন দেয় খেদায় তখন কেবল তালাবদ্ধ লোহার বিশাল শেকলটা পড়ে আছে, যেটা হাতির পেছনের পায়ে বাঁধা থাকে সবসময়। আরো আশ্চর্যের, হাতির সাথে সাথে হাতির মাহুত মহোদয়ও হাওয়া। উনিই প্রথম থেকে সর্বদা হাতির খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে স্নানের বিষয়গুলো দেখভাল করতেন।
আর্টিকেলঅনুযায়ী, হাতি শুদ্দ মাহুত মহোদয়কে সর্বশেষ ১৭ই মে’র বিকেল ৫টার দিকে দেখা গিয়েছিল। এটা জানা যায়, এলিমেন্টারী স্কুলের কতিপয় ছাত্রের কাছ থেকে। কারণ ওরা সেদিন রঙপেনসিল দিয়ে হাতির ছবি আঁকতে এসেছিল। পেপার নিশ্চিত করেই জানায়, অই বাচ্চারাই সর্বশেষ হাতিটাকে দেখে থাকবে। ৬টার সাইরেন বাজলে মাহুত মহোদয় খেদার বিশাল দরজা টেনে তালা লাগান।
প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যমতে সেদিন কী হাতি কী মাহুত – কোনকিছুতেই কোনরকম অস্বাভাবিকতা চোখে পড়েনি। হাতিটা ওখানটাতেই দাঁড়িয়ে ছিল, রোজ যেমনটা থাকে, একদম খেদার বৃত্তের ঠিক মাঝখানটায়। মাঝেমধ্যে শুঁড় তোলে অথবা ছোট ছোট কোঁচকানো চোখে পিটপিট করে এদিক ওদিক তাকায়। হাতিটা এমনই বুড়োটে যে, নাগরিক মনে করছেন যেকোন সময় ও অক্কা পেয়ে লুটিয়ে পড়তে পারে।
আমাদের শহর কর্তৃপক্ষ হাতিটার বার্ধ্যক্যজনিত সমস্যা নিয়ে গতবছরে আলাপ করেছিল। তখন অই ছোট চিড়িয়াখানাটা চরম আর্থিকসঙ্কটে এটার দরজা চিরতরে বন্ধ করে দিল। একজন বন্যপ্রাণি ডিলারের সারা দেশব্যাপী চিড়িয়খানা ছিল। তবে ওর প্রতেকটাতেই অজস্র হাতি থাকায়, এই বুড়ো হাতিটাকে না নেয়ার ব্যাপারে ছিল অনড়। কারণ হিসেবে বলছিল হাতিটা এতই বুড়ো যে যেকোন সময় এটা অক্কা পেতে পারে। ফলে বুড়ো হাতিটা রয়েই গেল পুরাতন চিড়িয়াখানায়। হাতির সকল সঙ্গীসাথী চলে গেল। বুড়ো হাতি একাকী রয়ে গেল ক্ষয়িষ্ণু চিড়িয়াখানায় ৪ মাসের মত, অসহায় হয়ে। অবশ্য ব্যাপারটা এমনও নয় যে হাতিটা এর আগে কাজে দিত। এর ফলে চিড়িয়াখানা এবং শহর যুগপতভাবেই বেশ সঙ্কটে পড়ল। চিড়িয়খানা কর্তৃপক্ষ জমি বেচে দিল এক ডেভলপারের কাছে। ও ব্যাটা আবার হাইরাইজ কন্ডো বিল্ডিং তৈরি করতে চায়। শহরকর্তৃপক্ষ ওকে আগে থেকেই এর অনুমোদন দিয়ে রেখেছিল। যতই হাতি সমস্যার সমাধান হচ্ছিল না, ততই ডেভলপারের গাঁটের থেকে অনর্থক পয়সা বেরিয়ে যাচ্ছিল। তারপরও, হাতিটাকে মেরে ফেলবার ব্যাপারটা ছিল আউট অব কোয়েশ্চেন। তবে এটা বাঁদর বা বাদুড় হলে ওরা হয়তো আর কোন দ্বিধা করত না মেরে ফেলতে। কিন্তু হাতিটাকে মেরে ফেলা ছিল প্রায় দু:সাধ্য একটা কাজ। কাজটা যদিও করেও ফেলা যায়, এর পূর্বাপর ভেবে। কিন্তু শহরময় এর প্রতিক্রিয়া হতে পারে ভয়াবহ। ফলে অনেক দল বেশ কয়েকবার বসে বুড়ো হাতিটার বিষয়ে এরকম একটা মতৈক্যে পৌঁছুতে পারল :
১। নগর কর্তৃপক্ষ বিনাপয়সায় হাতির মালিকানা পাবে।
২। ডেভলপার, কোন ক্ষতিপূরণ দাবী ছাড়াই, হাতির জন্য অন্যকোথাও খেদা নির্মাণ করে দেবে।
৩। চিড়িয়াখানার প্রাক্তন মালিক মাহুতের মাসিক ব্যয় নির্বাহ করবে।
প্রথম থেকেই হাতিসঙ্কট আমার কৌতুহলের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আর আমি একটা খেরোখাতায় যেখান থেকেই পাই, হাতিসম্পর্কিত সবক্লিপিং জমাতে থাকি। এমনকি আমি পৌরসভাতেযাই হাতি বিতর্ক শুনতে। এর ফলে অই হাতির ব্যাপারে সকল তথ্য পূর্ণাঙ্গভাবে দিতে পারব এমনটি আপনি ধরে নিতে পারেন। আর যখন হাতিউপখ্যানের তথ্যাদি জমে আমার খাতা বড় হতে থাকে, তখন আমার যে কী হলো এটাকে কাটছাঁট করে ছোট করে ফেলি। মনে হতে থাকে হাতি উধাও বা কিছু একটা হলে আমার সঙ্গে এর একটা প্রত্যক্ষ যোগসূত্র খুঁজে নিতে পারেন যে কেউ। বহুবাকবিতন্ডার পর মেয়র মহোদয় এরকম সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে পৌরসভা নিয়মঅনুযায়ী হাতির দায়িত্ব নেবে। এক গোপন আন্দোলন যে বিরোধীদলের ভেতরে তলে তলে দানা বাঁধতে পারে এটা আমার কল্পনার বাইরে ছিল। ‘হাতির দায়িত্ব কেন পৌরসভা নেবে?’ ওরা মেয়রের কাছে দাবী জানায়। এরপর ওরা নিচের পয়েন্টগুলো তুলে ধরে। তালিকাটা দিতেই হচ্ছে, যাতে সবাই বুঝতে পারেন। আমি এর জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
১। হাতিসঙ্কট বস্তুত ছিল চিড়িয়াখানার মালিক আর ডেভলপারের সমস্যা। এখানে পৌরসভার কোন দায়দায়িত্ব নেই।
২। এর যত্ন আর খাবারদাবার সরবরাহে অনেক খরচ জড়িত হয়ে পড়বে।
৩। এর নিরাপত্তা সমস্যার কী সমাধান করেছে , ইতোমধ্যে পৌরসভা?
৪। শহরের একটা নিজস্ব হাতি রাখার কী গুরুত্ব ?
‘শহরের হাতিপালার চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে পয়:নিষ্কাশন, নতুন অগ্নিনির্বাপক গাড়ি কেনা ইত্যাদি ইত্যাদি’
বিরোধীপক্ষ ঘোষণা দেয়। যদিও ওরা এটা নিয়ে বেশি কূটকচাল করে না, তবে ওরা পৌরসভা আর ডেভলপারের মধ্যকার গোপন আঁতাতের সম্ভাবনা নিয়ে ইঙ্গিত কিন্তু ঠিকই দেয়।
মেয়র মহোদয়কে ওদের কথার প্রতিক্রিয়ায় নিচের কথাগুলো বলতে হয় :
১। যদি হাইরাইজ কন্ডোস বিল্ডিং নির্মাণের অনুমোদন দেয়া যায়, তবে পৌরসভার রাজস্ব আদায় নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাবে। সেক্ষেত্রে, অই তুলনায় হাতির খরচটা এতই নগণ্য যে সে হিসাব না করলেও চলে।
২। আর হাতিটা যেহেতু খুবই বুড়ো। ফলে ও খুব বেশি খাবার খরচে ফেলবে না। আর নাগরিকের জন্য হুমকীর বিষয় হয়ে দাঁড়ানোর কোন সুযোগও নেই।
৩। হাতিটা মারা গেলে, পৌরসভা ডেভলপের দান করা নতুন খেদার জায়গাটার পুরো দখল পেয়ে যাবে।
৪। হাতিটা শহরের প্রতীকও হতে পারে।
দীর্ঘ বিতর্কের পর সিদ্ধান্তে উপনীত হয় সবাই। পৌরকর্র্তৃপক্ষ হাতিটার দায়িত্ব নেবে। পুরাতন আর সমৃদ্ধ শহরতলীটিতে, ধীরে ধীরে নাগরিকগণের অর্থকড়ির সূচকের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত এবং তা মজবুত এক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে। গৃহহীন ছন্নছাড়া হাতিটার দায়িত্ব পৌরকর্তৃপক্ষ নেয়ায় আমজনতা স্বাগত জানায়। জনগণ পয়:নিষ্কাশন বা অগ্নিনির্বাপক ইঞ্জিনের চেয়ে হাতিটাকেই প্রাধান্য দেয়।
আমার কথা বলতে হলে বলি আমি প্রথম থেকেই এটাই চাইছিলাম। এটা সত্যি, একদম সত্যি যে আমি হাইরাইজ কন্ডোর ব্যাপারে খুবই বীতশ্রদ্ধ তবে হাতিটার মালিকানা পৌরসভা পাক এটাই চাই।
একটা জঙ্গল কেটে সাফসুতরো করা হয়। এলিমেন্টারী স্কুলের বয়সের ভারে ন্যুব্জ জিমখানাটা ওখানে একটা খেদায় রূপ নেয়। আগের মাহুতকেই নতুন খেদায় হাতির দেখভালের দায়িত্ব দেয়া হয়। বাচ্চাদের ফেলে দেয়া খাবার জমিয়ে হাতির খাদ্যের ব্যবস্থা করা হয়। সবশেষে, হাতিটাকে অই নতুন ধেদায় জুড়িগাড়িতে চড়িয়ে নেয়া হয়।
হ্যাঁ। আমি হাতির নতুন জায়গায় নেয়ার উৎসবে যোগ দিই। হাতির সামনে দাঁড়িয়ে, মেয়র মহোদয় শহরের উন্নয়ন আর গৌরবের বিষয় নিয়ে বক্তৃতা করেন। এলিমেন্টারীস্কুলের এক ছোট্ট বাচ্চা যে ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব করছিল, স্বরচিত কবিতা পড়ার জন্য উঠে দাঁড়ায়। (দয়া করে প্রিয় গজ/ বেঁচে থাকুন দীর্ঘদিন যেমন অগ্রজ, /বেঁচে আছে।) এরপর হাতির ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা শুরু হয়, যা তখন থেকে বাচ্চাদের পাঠক্রমে একটা রেওয়াজে পরিণত হয়।
তারপর শহরের দুই তরুণী সেলাইকরা কাপড় পরে হাতিটাকে এককাঁদি কলা খেতে দেয়। হাতিটা বিলক্ষণ এইসব লোকদেখানো অর্থহীন ফর্মালিটিজে যারপরনাই বিরক্ত। হাতিটার জন্য সত্যি গোটা ব্যাপারটাই অর্থহীন আসলে।
এটা বোঝা যায় হাতিটা হঠাৎই যতদূর পারে একটা ঝাঁপ মেরে কলার কাঁদি তছনছ করে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। তবে হ্যা এটাতেও সবাই দারুন মজা পায়।
হাতিটার পেছনের ডানপায়ে একটা মোটা লোহার বালা পরানো। ওটার সাথে দেখতে জমকালো একটা শেকল সংযুক্ত। আর শেকলটা বাঁধা কংক্রিটের একটা মোটা স্লাবের সাথে। যে কেউ বুঝতে পারে কত শক্তভাবেই না হাতিটাকে বেঁধে রাখা হয়েছে। হাতিটা ১০০ বছর চেষ্টা করলেও ওটা ছিঁড়তে বা ভাঙতে পারবে না।
হাতিটাকে ওর বন্দীত্ব কেমন লাগছে আমি বলতে পারব না। তবে বাইরে থেকে, কমপক্ষে হাজারখানেক ধাতব বালা হাতিটার পায়ে জড়িয়ে আছে এটা স্পষ্ট। হাতিটা একঠাঁয় ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। থেকে থেকে ওর কান দুটো, শরীরের কিছু পাকা চুল বাতাসে দোলে।
মাহুত মহোদয় খুবই পুঁচকে আর হাড্ডিসার। ওর বয়স কত আন্দাজ করা কঠিন। এরকম মনে হতে পারে ওর বয়স ৬০-এর গোড়ায় অথবা ৭০-এর শেষে। ওর বয়সটা আসলে এমন জীবনের এমন একটা জায়গায় গিয়ে পড়েছে যে ওর উপস্থিতি আর কারুর উপর কোন প্রভাবই ফেলে না। ওর গায়ের চামড়া তামাটে। শীত কী বা গ্রীষ্ম দুইঋতুচক্র এতদিনে ত্বকের এই হাল করে থাকবে। চুল ছোট আর খাড়া। চোখজোড়াও ছোট। ওর মুখম-লে এমন কোন বিশেষ ব্যক্তিত্বের ছাপ নেই। কিন্তু ওর দু’পাশ থেকে গজিয়ে ওঠা প্রায় বর্তুলাকৃতির কান দু’টো কেমন যেন অস্বস্তিকর।
বন্ধুবিহীন প্রকৃতির মানুষ ও নয়। হ্যাঁ, কেউ যদি ওর সঙ্গে কথা বলে, তবে ও উত্তর দেয়। সাথে সাথে নিজেকেও প্রকাশ করে সঠিকভাবে। যদি ও চাইতো যে ও সর্বদা প্রাণোচ্ছল থাকবে – আপনারা সবাই জানেন, এটি হবার নয়। ও ছিল বরং সঙ্কোচময়। মিশুক প্রকৃতির নয়। বরাবরই ও থাকতো জড়সড় হয়ে, কথা বলতে অনভ্যস্ত এমন। নি:সক্সগ আর বুড়ো মানুষ। হযতো বা ও বাচ্চাদের উপস্থিতিতে খুশী হত। বাচ্চারা বেড়াতে এলে ও ওদের সাথে চমৎকার ব্যবহার করত। তবে বাচ্চাদের কাছ থেকে ও কখনই সেরকম উষ্ণ সাড়া পায়নি।
ওর একমাত্র ব্যাপার ছিল কেবল হাতিটাই। খেদা লাগোয়া একটা ছোট্ট ঘরে ও থাকত। সারাদিন ও হাতির সঙ্গেই থাকত। হাতির কখন কী লাগে এই কাজে সব সময় ব্যস্ত। হাতি আর মাহুত তা বছর দশেক তো হবেই একসাথে আছে। আপনি খুব খেয়াল করলে সহজেই বুঝতে পারবেন যে ওদের দু’জনের অসাধারণ নৈকট্য আছে। এটা আরো বোঝা যায় ওদের প্রত্যেকটা নড়নচড়ন আর তাকানো দেখে। হাতি নট নড়নচড়নটি থাকলে মাহুত মহোদয় ইচ্ছে হলে হাতির খুব কাছে গিয়ে সামনের পায়ে আলতো করে গুঁতো দেয় আর কানে কানে কিছু একটা বলে। তখন হাতিটা তার বিশাল দেহটা হেলেদুলে উঠিয়ে মাহুত যেদিক যেতে বলে সেদিকেই যায়। তারপর আবার মহাশূন্যে দৃষ্টিহীন তাকিয়ে থাকে।
ছুটির দিনগুলোতে আমি খেদায় যাই। অই দুই প্রাণি যারা দু’জন দু’জগতের – ওদের জীবন নিয়ে স্টাডি করতে লেগে পড়ি। কিন্তু আমি কোনদিনই ওদের দু’জনের মানে হাতি আর মাহুতের বোঝাপড়াটা কেমনকরে, কোন প্রক্রিয়ায় ঘটে তা উদ্ধার করতে পারি না। হয়তো এবং যেহেতু ওরা দু’জনে দিনরাত একসঙ্গেই থাকে ফলে হাতিটা দুয়েকটা শব্দ বুঝতে পারে। অথবা এমনও হতে পারে হাতিটা মাহুতের আলতো গুঁতো থেকেই সিগন্যাল পায়, যে কখন কী করতে হবে। অথবা এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দিতে পারা যায় না যে হাতিটার কোন বিশেষ ক্ষমতা আছে যেটা দিয়ে ও মাহুতের মন পড়তে পারে, টেলিপ্যাথির মত। একবার আমি মাহুতমহোদয়কে জিজ্ঞেস করে থাকব নিশ্চয়ই যে হাতি ওর কথা কী করে বুঝতে পারে। এইকথায় বুড়ো শুধু হাসে আর বলে, ‘আমরা দু’জনে আসলে একসঙ্গে অনেকদিন ধরেইতো আছি।’
এইভাবে একটা বছর কেটে যায়। তারপর, কাউকে কিছু না বলে, হাতি উবে গেল। যেন একদিন ওখানটাতে ছিল আর এখন তার আর থাকার কথা নয়।
দ্বিতীয়বার কফির কাপ ভর্তি করি। পুনরায়, একদম শুরু থেকে শেষতক আর্টিকেলটা পড়ি। সত্যিকার অর্থে, এটা নি:সন্দেহে এক অদ্ভুত রহস্যময় আর্টিকেল। শার্লক হোমস হলে উত্তেজিত হয়ে বলতেন, ‘এটা দেখ, ওয়াটসন,’ তাঁর ঠোঁটে ঝোলানো পাইপে মৃদু টোকা দিয়ে, ‘খুবই ইন্টারেস্টিং। আসলেই এটা মারাত্মক ইন্টারেস্টিং।’
আর্টিকেলটা এইরকম ভূতুড়ে হওয়ার সুযোগ পেয়েছে চূড়ান্ত কনফিউশান থেকে। আর রিপোর্টার ও ভয়ঙ্কর কনফিউজডও বটে। আর এই কনফিউশন আর কনফিউজড ব্যাপারটা কিন্ত অবাস্তব আর প্রায় অযৌক্তিক প্রেক্ষিত থেকে। আপনি খেয়াল করলেই টের পাবেন, রিপোর্টার আর্টিকেলটাকে ‘নরমাল’ ভাবে উপস্থাপন করার জন্য এই ভূতুড়ে কা-কে খুবই হাস্যকর চাতুরীর আশ্রয় নিয়েছে। আর দু:খজনক এই যে রিপোর্টারের এই প্রাণান্ত গোপন প্রচেষ্টাই আর্টিকেলটাকে করে তুলেছে কনফিউশন এবং কনফিউজড এর এক দ্বিধান্বিত প্রকাশ। হ্যাঁ চূড়াস্পর্শী অর্থহীন এই রিপোটিং।
উদাহরণ দেই, আর্টিকেলে এরকম প্রকাশ পেয়েছে, ‘হাতি পলাতক।’ কিন্তু আপনি যদি গভীরভাবে চিন্তা করে দেখেন দেখবেন হাতির পলায়নের কোন সুযোগই নেই। হাতিটা জাস্ট হাওয়ায় উবে গেছে। রিপোর্টার নিজেই তার মানসিক দ্বিধার বহির্প্রকাশ ঘটিয়েছে এই সব কথা বলে যে কিছু কিছু ‘ডিটেনলস’ ‘আনক্লিয়ার’। কিন্তু এই রহস্যভেদের খেলায় এইরকম অর্ডিনারি শব্দবন্ধের ব্যবহার রিপোর্টিংয়ের রীতিবহির্ভূত।
প্রথম সমস্যা হচ্ছে গিয়ে হাতির পায়ের মোটা লোহার বালা। ওটা তখন পর্যন্ত তালাবদ্ধ পাওয়া গেছে। সবচেয়ে যৌক্তিক ব্যাখ্যা হতে পারে এটা যে মাহুত হয়তো তালা খুলে হাতিকে মুক্ত করে আবার তালা মেরে দিয়েছে। তারপর হাতিটাকে নিয়ে সটকে পড়েছে। এটা একটা হাইপোথিসিস হিসেবে নেয়া যেতে পারে। কিন্তু সত্য এই যে মাহুতের কাছে লোহার বালা খোলার কোন চাবিই নেই। অই তালার দু’টো চাবি আছে, নিরাপত্তার খাতিরে একটা চাবি আছে পুলিশহেডকোয়ার্টারে, আরেকটা ফায়ার সার্ভিসে। দু’টোর যে কোন একটা যোগাড় করা মাহুতের পক্ষে কোনদিনই সম্ভব নয়। যদি কেউ চুরিও করে মানে চুরি করতে সমর্থ হয় তাহলে চাবিটা আবার যথাস্থানে রেখে আসার কোন দরকার নেই। ঘটনার দিন থেকে পরের মাসেও চাবি দু’টো যেখানে রাখা হয়েছিল সেখানেই পাওয়া গেছে। এর ফলে এরকম সিদ্ধান্তে আসা যায় যে হাতি নিজেই কসরত করে লোহারবালা থেকে নিজের পা কে ছাড়িয়ে নিয়েছে। এটাও অসম্ভব। কারণ হাতির পা কেটে ফেলা ছাড়া আর কোন উপায়ই নেই।
দ্বিতীয় সমস্যা হলো হাতির পালিয়ে যাওয়ার রুট। হাতির খেদা এবং মাঠের চারদিকেই ১০ফুট উঁচু নির্মিত কংক্রিটের দেয়াল রয়েছে। হাতির নিরাপত্তা ইস্যুটা পৌরসভায় আলোচিত হয়েছিল। অনেক উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছিল। কারণ কেউ কেউ বিবেচনা করেছিল সামান্য একটা বুড়োহাতির জন্য এত বিশাল খরচ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। মোটা লোহার পাতের সঙ্গে পুরু কংক্রিট ফাউন্ডেশন। এর সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করতে হয়েছিল রিয়েলএস্টেট কোম্পানিকেই। আর ওখানে রাখা হয়েছিল কেবল একটাই দরজা, যেটা ভেতর থেকে তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। ফলে নিশ্চিত করেই বলা যায় এরকম অভূতপূর্ব কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেদ করে হাতিটার পালিয়ে যাবার কোন পথ খোলা ছিল না।
তিন নম্বর সমস্যা – রাস্তা। হাতিরখেদার পেছনে আছে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ভীষণ খাড়া ঢালের পাহাড়। হাতি কেন কোন প্রাণির পক্ষেই অই পাহাড় ডিঙানো চাট্টিখানি কথা নয়। হাতির পক্ষে তো একেবারেই অসম্ভব। তর্কের খাতিরে ধরে নিন, হাতিটা কোনভাবে লোহারবেড়ি থেকে নিজের পা ছাড়িয়ে নিয়ে ১০ফুট উঁচু দেয়াল টপকে চম্পট দিল। কোন রাস্তায় তো হাতির কোন পদচিহ্নই নেই। মারাত্মক ধাঁধার বিষয় এই যে, এইরকম কুহকী আর ক্লেশকর অর্থহীন বাক্যব্যবহার আর্টিকেল থেকে একটাই সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারা যায়। হাতি ভেগে যায় নি। হাতি মহোদয় বাতাসে মিলিয়ে গেছে কর্পুরের মত।
মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন, তবুও এই ব্যাপার না পেপার না পুলিশ এমনকি মেয়র মহোদয়ও খোলাশা করে ঝেড়েকেশে কিছু বলতে পারছে না। পুলিশের তদন্ত জারি। তারা কেবল বলছে – ‘নিয়ে পালিয়েছে অথবা খুবই কৌশলে মারাত্মক ছক কষে হাতিটাকে সরানো হয়েছে। কারণ এমন বিশাল হাতির কোথাও চট করে লুকিয়ে থাকায় এটা বের করতে আমাদের আরো সময়ের প্রয়োজন। এইরকম আশাবাদ ব্যক্ত করে তারা আরও বলে যে স্থানীয় শিকারী আর জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর নিখুঁত বন্দুকবাজের সহায়তা নিয়ে ওরা জঙ্গলময় অনুসন্ধান করবে।’
মেয়র মহোদয় একটা নিউজ কনফারেন্সের আয়োজন করেন। শহরে প্রয়োজনের তুলনায় পুলিশস্বল্পতার জন্য শহরবাসীর কাছে ক্ষমা চান। পাশাপাশি তিনি ঘোষণা দেন, ‘দেশের যেকোন চিড়িয়াখানার চেয়ে হাতির নিরাপত্তা কোন অংশে বস্তুতপক্ষে কম রাখা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে, এই নিরাপত্তাব্যূহ এমনই মজবুত আর সুরক্ষিত যে এখান থেকে কোন কিছু গায়েব হয়ে যাওয়া একেবারেই অসম্ভব।’ তাঁর মতে, ‘এটা একটা ভয়াবহ আর কা-জ্ঞানহীন সমাজবিরোধী জঘন্য অপকর্ম। আমরা কোনমতেই এর শাস্তির ব্যবস্থা না করে ছাড়ছি না, অপরাধী সে যেই হোক।’
বছরখানেক আগেই বিরোধীদল অভিযোগ তুলেছিল। ‘আমরা মেয়রমহোদয়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছার দিকে তাকিয়ে আছি; তিনি হাতির সমস্যার দোহাই দিয়ে বেনিয়া ডেভলপারের কুমতলব চরিতার্থ করতেই সহায়তা করছেন। যাতে সে নিরাপদে নির্বিঘ্নে আমজনতার গাঁট কেটে তার ব্যবসার প্রসার ঘটাতে পারে। একজন, দেখে মনে হয় ভীষণ উদ্বিগ্ন, বয়স সাইঁত্রিশ, মায়ের ইন্টারভ্যু নিয়েছিল নিউজপেপারের রিপোর্টার। ‘এখন আমি মারাত্মকভাবে ভয় পাচ্ছি আমার বাচ্চাদের মাঠে খেলতে পাঠাতে’ তিনি বলেন।
পৌরসভা কর্তৃক হাতিটার দেখভালের সকল পদক্ষেপের একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণী পেপারে দিয়েছে। হাতি, মাহুত আর খেদার একটা অপার্থিব স্কেচও সেইসাথে যুক্ত করেছে। আর এরসঙ্গে ছেপেছে হাতি আর মাহুতের সংক্ষিপ্ত জীবনী।
চিবা প্রদেশের তাতেয়ামা শহরের নবোরু ওয়াতানাবে, বয়স ৬৩, চিড়িয়াখানার স্তন্যপায়ী প্রাণির জীবনযাপন নিয়ে বহু বছরের হাতেকলমে কাজ করবার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন ব্যক্তিত্ব। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের সহমর্মী অতলস্পর্শী দায়িত্বজ্ঞানসম্পণ্ন এই বিশাল ব্যক্তিত্বের প্রতি অগাধ আস্থা আছে। আর তাঁর এই বিষয়ে অসাধারণ জ্ঞান নিয়েই তারা গর্বিত। হাতিটা পূর্ব আফ্রিকা থেকে ২২ বছর আগে পাঠানো হয়। কিন্ত খুব কম লোকই হাতিটার প্রকৃত বয়স সম্পর্কে জানেন। রিপোর্টার পুলিশের হয়ে কারো কাছে যদি হাতিটার বিষয়ে কোন খবর বা তথ্য থাকে তাদের এগিয়ে আসার উদাত্ত আহবান জানায়।
দ্বিতীয়বারের মত কফিরকাপে চুমুক দিতে দিতে আমি এই আহবানের বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করি। কিন্তু আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি পুলিশকে কিছু জানানো যাবে না। কারণ – আমি চাইছিলাম না যে পুলিশের সঙ্গে ওদেরকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার ব্যাপারে আমার যোগাযোগ হোক, আমার হঠাৎ করেই বোধ হলো পুলিশ আমার কথা বিশ্বাস করবে না যদি আমি কী ঘটেছে তা ওদের বলি। আর জনসাধারণকে জানিয়ে কী ভাল কাজটাই বা হবে! তাদের কেউই এমনটি ভাবতে পারেনা যে হাতি প্রকৃতপক্ষে মিলিয়ে গেছে হাওয়ায়। আমি আমার খেরোখাতা শেলভ থেকে নামাই। তারপর হাতির আর্টিকেলটা কেটে নিয়ে খাতায় পেস্ট করি। থালাবাসন মাজাঘষা করে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি।
সন্ধ্যা ৭.০০টার টিভি নিউজে হাতির অনুসন্ধান পর্ব দেখি। বড়বড় রাইফেল নিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনী, পুলিশ আর ফায়ারসার্ভিসের লোকজন ভীতসন্ত্রস্তভাব দূর করার গুড়োর প্যাকেট নিয়ে জঙ্গলময় তন্নতন্ন করে সাড়াশি অভিযান চালাচ্ছে। পাশের পাহাড় থেকে জঙ্গলের উপর সারাক্ষণ হেলিকপ্টার উড়ছে। অবশ্যই, ওরা টোকিওর বাইরে শহরতলীর জঙ্গল আর পাহাড়ীঅঞ্চলের কথাই বলেছিল। ফলে অনুসন্ধানকারীদের খুব একটা বিশাল অঞ্চল হাঁতড়ে বেড়াতে হবে না। দেখা যাচ্ছে অনেকলোকই এর সাথে যুক্ত হয়েছে ফলে তাদের জন্য হাতিকে বের করা একদিনের বেশি লাগার কথা নয়, যেভাবে কার্যক্রম চলছে। আর ওরা তো কোন ছোট্ট ইঁদুর খুঁজে বেড়াচ্ছে না। খুঁজে মরছে এক বিশাল আফ্রিকান বুড়ো হাতি। হাতির লুকিয়ে থাকার জায়গাও এখানে খুব বেশি হওয়ার কথা নয়। হায়! ওরা এখনও হাতির নাগাল পায়নি। পুলিশপ্রধান স্ক্রীনে হাজির হলেন, বললেন, ‘আমরা অনুসন্ধান কাজ চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর।’
উপস্থাপক এর সাথে জুড়ে দিয়ে বলল ‘কে বা কারা হাতিটাকে মুক্ত করল? আর কীভাবে? কোথায় ওরা হাতিটাকে লুকিয়ে রেখেছে? হাতি সরানোর মতলবটাই বা কী? সবকিছুতেই আঠার মত যুক্ত হয়ে আছে রহস্য।’
সপ্তাহখানেক অনুসন্ধান চলল। কিন্তু হাতির টিকির নাগাল কেউ পেল না। এমন কী হাতিটা কোথায় লুকিয়ে আছে, বা লুকানো হয়েছে সে সর্ম্পকেও কিসসু বলতে পারল না। আমি নিউজপেপার পড়ি আর পেপারকাটিং দিয়ে খেরোখাতা ভরি। এমনকী হাতি নিয়ে সম্পাদকীয়কার্টুনও বাদ যায় না। দ্রুত খেরোখাতা ভরে গেল। আমাকে তখন আরেকটা খাতা কিনতে হল। পরের রিপোর্টগুলো দেখা যাচ্ছে বেহুদা অথবা মানসম্মত নয়: ‘হাতির এখনও কোন খোঁজ নেই। হেডকোয়ার্টারে অনুসন্ধানকারীদের ভেতরে চূড়ান্ত হতাশা, বৃহত্তর বিচ্ছিন্ন কোন জনগোষ্ঠীর হাত রয়েছে হাতির ব্যাপারে।’ সপ্তাহ যেতে না যেতে এইধরনের আর্টিকেল চোখেপড়ার মত ভীতিকর হয়ে ওঠে। এসব থেকে সহজেও অনুমেয় কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। গুটিকয়েক সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনের ভেতর একটা আবার মাহাত ভাড়া করেছে। তবে ওদের কেউই বুনো হেডলাইনের সাপোর্টে উল্লেখযোগ্য কোন প্রমাণ দিতে পারেনি। ভাব দেখে অনুমান করি জনসাধারণ সবকিছুতেই আস্থা হারিয়ে এটাকে ‘আনসলভড মিস্ট্রি’ হিসাবে নিতে শুরু করেছে। একটা বুড়ো হাতি আর তার বুড়ো মাহুতের একসঙ্গে উধাও হয়ে যাওয়াটা সমাজে আর কোন প্রভাবই রাখতে পারল না।
পৃথিবী আবার আগের মতই তার নিজ অক্ষে ঘুরতে থাকবে ক্লান্তিকরভাবে। রাজনীতিবিদেরা নতুন কোন ইস্যু নিয়ে মাঠ গরম করবেন। সাধারণ মানুষ হাঁই তুলতে তুলতে যে যার কাজে যাবে। ছেলেমেয়েরা কলেজে ভর্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য পাঠে ব্যাপক মনোনিবেশ করবে। অশেষ উম্মাদনা নিয়ে প্রাত্যহিক জীবন চলবে চড়াই উৎরাইয়ের ভেতর দিয়ে। হাতির হারিয়ে যাওয়া নিয়ে আর কোন কৌতুহল থাকবে না একসময়। আর এভাবে ঋতুচক্রে পরিবর্তন আসবে। যেন জানালার পাশ দিয়ে চলে যাওয়া ক্লান্ত আর অবসন্ন সৈনিকদের মার্চপাস্ট।
যখনই আমি সময় পাই, আমি হাতির খেদায় বেড়াতে যাই। যদিও ওখানে হাতি নেই। লোহার একটা মোটা শেকল গুটিয়ে লোহার পাতের সঙ্গে, লোহার দরজার পাশে রেখে দেওয়া আছে। ভেতরে উঁকি দিলে, চোখে পড়ে খেদার দরজা শেকলসহ তালাবদ্ধ। পুলিশের নিরন্তর প্রয়াস কয়েকস্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা ভেদ করে হাতির পালিয়ে যাওয়ার সুরাহাকে বস্তুত ব্যর্থ করে দিয়েছে। এখন জায়গাটা যেন জনশূন্য এক বিরাণপ্রান্তর। লোকজনের বদলে ওখানে কবুতরের দল বেঁধে ছাদে হাজিরা দেওয়াটাই নিয়মিত হয়ে উঠল। খেদার মাঠের আর কেউ যতœ নেবার নেই। আর এই অবসরে মোটাঘাসেরগুচ্ছে ভরে যায় জায়গাটা। কয়েকমাসের ব্যবধানে হাতিহীনতায় ওখানে যেন গম্ভীর এক মেঘরাশি ছায়া ফেলে।
সেপ্টেম্বর শেষনাগাদ মেয়েটার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একঘেয়ে বৃষ্টি। এমন ঘ্যানঘেনে বৃষ্টি বছরে একবার নয় হয় বরাবর। আস্তে আস্তে ধুয়েমুছে সাফ করে দিয়ে যায় গ্রীষ্মের গণগণে স্মৃতি। কার্নিশ বেয়ে স্মৃতির টুকরোটাকরা বৃষ্টির জলে নর্দমা দিয়ে নদীতে গড়ায়। যা অবশেষে মহাসাগরকে করে তোলে অতল আর ঘন কালো। আমার কোম্পানি সে সময় বিজ্ঞাপন ক্যাম্পেইনের আয়োজন করে। অই অনুষ্ঠানে আমি টের পাই একসময় আমরা দু’জন দু’জনকে চোখে চোখে রাখছি। একটা বড় কোম্পানি, ইলেক্ট্রিকাল দ্রব্যাদি তৈরি করে এমন যেখানে আমি জনসংযোগবিভাগে কাজ করি। অইসময়ে আমি রান্নাঘরের যাবতীয় ইলেক্টিকাল দ্রব্যাদি তৈরি করে এমন বিভাগের দায়িত্বে নিয়োজিত। প্রডাক্টগুলো হেমন্তের বিয়েশাদি আর শীতের বাড়তি সময়কে টার্গেট করে শিগগীরই বাজারে যাবে। আমার কাজ হচেছ বাজারে চালু মহিলাদের ম্যাগাজিনগুলোর সঙ্গে লিয়াজোঁ করা, যাতে ওরা আমাদের প্রডাক্ট নিয়ে লিখে। একাজের জন্য অবশ্য খুব বেশী বুদ্ধি খাটানোর দরকার পড়ে না। কিন্তু অইসব আর্টিকেলে যাতে আমাদের প্রডাক্ট নিয়ে কোন নেতিবাচক প্রভাব না থাকে সেটা আমাকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে লক্ষ্য করতে হয়। যখন ম্যাগাজিনগুলো আমাদের পণ্যের পক্ষে লিখালিখি করে তখন আমরা তাদের ম্যাগাজিনে আমাদের পণ্যের বিজ্ঞাপন ছেপে পুরস্কৃত করি। ওরা আমাদের পিঠ চুলকায় আমরা ওদেরটা চুলকে দিই – এই আর কী।
একটা ম্যাগাজিনের সম্পাদক, নব্য বিবাহিতা, আর্টিকেল ছাপার সুবাদে অই যজ্ঞে হাজির হয়। ঘটনাচক্রে আমি ওকে চারদিক ঘুরিয়েফিরিয়ে রেফ্রিজারেটর, কফিমেকার, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, জুসমেকার এইসব দেখাই। ওকে অবহিত করি যে এগুলো জগদ্বিখ্যাত ইতালীর ডিজাইনারের তৈরি ।
‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটা – ঐক্য,’ আমি এবার ব্যাখ্যায় চলে যাই। ‘বস্তুতপক্ষে খুবই সুন্দর ডিজাইনে দারুণ মালমশলা দিয়ে তৈরি প্রডাক্টও মার খেয়ে যায় যদি এটা রান্নাঘরের ঐকতানে সুর মেলাতে না পারে। ডিজাইনে ঐক্য, কার্যকারিতায় ঐক্য : এটাই চায় এখনকার কিট-চিন। (আমি কিন্তু অত্যন্ত কৌশলে কিচেন বলাটা এড়িয়ে যাই।)
গবেষকরা বলছেন গৃহিনীরা দিনের বেশিরভাগ সময়টা রান্নাঘরে থাকেন। ফলে বলা যায় কিট-চিন তাঁদের কাজেরক্ষেত্র, পড়াশোনার জায়গা মায় লিভিংরুম হয়ে ওঠে একসময়। সে কারণে প্রত্যেক গৃহিনী চাইবেন তাঁর এইরকম অবকাশের জায়গাটা একটা তালমিলের সঙ্গে যেন থাকে সবসময়। সে জায়গা ছোট কিংবা বড় তাতে কিছু এসে যায় না, প্রকৃত নীতি হচ্ছে যেন প্রত্যেক গৃহিনী তাঁর নিজের একান্ত আপন জায়গা মানে কিট-চিনটাকে একটা অনন্য ঐকতানে ভরিয়ে রাখবেন। আর সেটাই খুব সঙ্গত। আর এটাই হচ্ছে আমাদের প্রতিটি প্রডাক্ট ডিজাইনের গূঢ় রহস্য। এটা দেখুন এই যে কুকার তার চূড়াটি, উদাহরণ হিসেবে বলি …’
মেয়েটা কেবল মাথা নাড়ে আর ছোট্ট নোটবুকটা টুকটুক করে লিখে ভরতে থাকে। তবে এটা নিশ্চিত ওর এইসব প্রডাক্টের প্রতি কৌতুহল সামান্যই। আমার কথা বলতে হলে বলি আমারও তেমন আগ্রহ নেই এসবে। আসলে আমরা দু’জনেই কেবলমাত্র আমাদের দায়িত্ব পালন করছি। ‘আপনি দেখছি রান্নাঘর নিয়ে অন্নেক জানেন।’ আমি থামলে ও বলে। ও জাপানী শব্দটাই ব্যবহার করে। কিট-চিনের বদলে।
‘বেঁচে থাকার জন্যই আমাকে এসব করতে হয়, জানতে হয়,’ একটা প্রফেশনাল হাসি দিয়ে বলি, তবে হ্যাঁ রান্নাবান্নার কথা যদি বলতে হয় তবে বলি আমি কিন্তু রাঁধতে পছন্দ করি। শখ করে নয়, আমাকে আসলে নিজের জন্যই রান্না করতে হয়।’
‘আমি এখনও অবাক! অই রান্নাঘরের ঐকতান নিয়ে।’
‘আমরা কিট-চিন বলি ম্যাম,’ যেন ওকে আমি পরামর্শ দিচ্ছি। ‘এটা কোন ব্যাপার নয়, তবে কোম্পানি চায় আমরা এই শব্দটাই যেন ব্যবহার করি।’
‘ওহো, দু:খিত। তবুও এখনও আমি ভেবে অবাক! কিট-চিনে তাহলে ঐকতানটা ভীষণ দরকার? আপনি কী বলেন?’
‘আমার ব্যক্তিগত মতামত? ওটাতো আমার নেকটাইটা – যতক্ষণ – থাকবে – ততক্ষণ বলা যাবে না ভদ্রে।’ একটা অট্টহাসি দিয়ে বলি। ‘তবে আপনার খাতিরে আজ তার ব্যতয় ঘটাব। রান্নাঘরে, সামান্য কয়টা জিনিস জরুরি ওসব ‘ঐকতান’ এর চেয়ে। হ্যাঁ কিছুকিছু জিনিস আছে যা আপনি বেচতে পারবেন না। তত্তকথার কচলানির চেয়ে ধর-তক্তা-মার-পেরেক মার্কা আমাদের পৃথিবীতে আপনি ওসব বেচতেই পারবেন না, যা গণনায় ধর্তব্য।’
‘আমাদের পৃথিবীটা কী সত্যিই ধর-তক্তা-মার-পেরেক এর মত একটা জায়গা।’
আমি একটা সিগার বের করে লাইটার দিয়ে ধরাই।
‘আরে ধ্যুত। আমি অতশত জানি না, মুখে চলে এল আর বলে ফেললাম আর কী’, আমি বলি। ‘তবে এর বহুবিধ ব্যাখ্যা হতে পারে। আর কী জানেন, এতে করে সবকিছু বোঝা সহজতর হয়ে ওঠে। আপনি কোন গেম খেলতে অথবা ধরুন গিয়ে আপনার নিজেকে প্রকাশ করতে এমত ব্যবহার সবকিছুকেই সহজ করে তুলবে: ‘দরকারী এই নীতি’, অথবা ‘আপনার মাঝে এর উপস্থিতি’। এবার বলতে পারি আপনি এভাবে করে দেখুন। দেখবেন অনেক জটিলতা যা নিয়ত আমাদের গ্রাস করে রাখে, কেটে যাচেছ, সহজেই।
‘কী চমৎকার ভিউ আপনার!’
‘আসলে তা নয়। এভাবেই সবাই চিন্তা করে। ও হ্যাঁ, আরেকটা কথা, আমাদের এই আয়োজনে কিন্তু বেশ ভাল শ্যাম্পেইন রাখা হয়েছে। আপনি কী নেবেন কয়েক চুমুক?’
‘ধন্যবাদ! তাহলে তো খুব ভাল হয়।’
শ্যাম্পেইন নিয়ে কথা বলতে বলতে, বোধ করি আমরা দু’জনেই, খানিকটা অন্তরঙ্গ হয়ে পড়ি। অবশ্যই মানি আমাদের যাপিতজীবনের এই পুকুরটা খুব বড় নয়। কয়েকটা নুড়ি বা পাথরের ঢিল ছুঁড়েন এদিকে। একটা না একটা ঠিকই লেগে যাবে টুক করে। আরেকটা ব্যাপার, মেয়েটা আমার একদম ছোট্ট বোনটির সঙ্গে একই ইউনিভার্সিটি থেকে গ্রাজুয়েশন করেছে। এই সুবাদে আমাদের এই অন্তরঙ্গ কথোপকথন মসৃণভাবে অনেকক্ষণ চলতে থাকে। লাউন্জ এর জানালার বাইরে শব্দহীন কিন্তু মুখর বৃষ্টি অঝোরে ঝরতে থাকে। বৃষ্টির এই নিখুঁত বেষ্টনী ভেদ করে শহরের আলোর চ্ছটার দু’য়েক ঝলক ঝাপসা বার্তা পাঠাচ্ছে। প্রায় বিরাণ হয়ে যাওয়া এই ককটেলপার্টির এই জায়গাটার উপর, ধীরে, খুব ধীরে, নিরবতার চাদর ঝুলে পড়ে। মেয়েটা একটা জমেথাকা দাইকুইরির অর্ডার দেয়। আর আমি বসে থাকি স্কচ নিয়ে।
তরলে চুমুক দিতে দিতে, কোন বারে যেমনটি ছেলে আর মেয়েরা করে, আমরা নিচু আর মগ্নস্বরে কথোপকথন চালাতে থাকি। যখন কেউ প্রথম কারো দেখা পায়, প্রথমে দু’জন দু’জনকে ভাল লাগতে শুরু করে। আমরা আমাদের কলেজজীবন, আমাদের গানের টেস্ট, খেলাধুলা এমনকী আমাদের যাপিত জীবনের প্রাত্যহিকে ঘটে যাওয়া তুচছ বিষয় নিয়ে কথা বলতে থাকি।
তারপর আমি হাতির প্রসঙ্গ তুলি। আমি, বিশ্বাস করুন, কোনমতেই ঠিক করে বলতে পারব না কীভাবে এটা হল। হতে পারে আমরা প্রাণিকূল নিয়ে কথা বলছিলাম। আর এভাবেই হাতি প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। অথবা, হয়তো, অবচেতনভাবে, আমি একজন ভাল নির্ভর করা যায় এমন শ্রোতা খুঁজছিলাম এদ্দিন যাকে আমি আমার ভেতরের খুব ভেতরের না বলা কথাগুলো বলতে পারি। একেবারে অন্যরকম দৃষ্টিভঙ্গি, হাতির উধাও হয়ে যাওয়া নিয়ে। অথবা, আবার বলি, তরল আমাকে ভালমতই পাকড়াও করেছে। ফলে আমাকে বকবকানি পেয়ে বসেছে।
যেভাবে হউক। দ্বিতীয় শব্দটা আমরা ঠোঁট গলে বেরিয়ে পড়ে। আমি বেশ বুঝতে পারি, কোনভাবেই স্বস্তিকর নয় এমন এক বিষয়ের অবতারণা করে ফেলেছি। ন্নাহ। হাতির প্রসঙ্গটা টানা একদম বেহুদা হয়ে পড়ল। টপিক ছিল – কী যেন? -খুব সম্পণ্ন আর ভীষণ অন্তরঙ্গ।
খুবই দ্রুতই এমন বিটকেলে প্রসঙ্গ পাল্টাতে তৎপর হয়ে উঠি। আরও ইন্টারেস্টিং হবে এমন কিছু। কিন্ত কপালে থাকলে ঠেকায় কে মহোদয়া হাতির উবে যাওয়া নিয়েই কথা বলতে চান। আর হ্যাঁ আমি একবার বলেছিলাম, যতবার আমি হাতি দেখার কথা বলি ততই ও আমাকে প্রশ্নের পর প্রশ্নের জলে চুবিয়ে ছাড়ে। কেমন ধরনের হাতি, হাতি কী করে পালাল বলে আপনি মনে করেন, হাতি কী খায়, সমাজের জন্য এটা কি বিপজ্জনক, ইত্যোকার নানান প্রশ্ন।
নিউজপেপারের কল্যাণে লোকজন যা জানতে পেরেছে আমি তার বেশী একটা বর্ণও বলি না। তবে আমার ধারণা মেয়েটা আমার কথায় আস্থা রাখতে পারছে না একরত্তি। কারণ ও মনে করতেই পারে, অন্তত আমার কণ্ঠস্বর শুনে, আমি বোধ হয় জোর করে কিছু একটা আড়াল করছি। আর কী জানেন জ্বলজ্যান্ত মিথ্যা বলতে পারাটাও আসলে আমার কম্ম নয়। তবে হ্যাঁ ও এমন করে দারকুইরিতে চুমুক দেয় যে আমার ভেতরে ও কোন অস্বাভাবিকতা লক্ষ্যই করে না।
‘হাতি উধাও হয়ে যাওয়ায় আপনি কষ্ট পান নি? এটা এমন যে লোকজন আগেথেকে টের পেয়েছিল, তাই।’
‘ন্নাহ। সম্ভবত না।’
স্তুপ করে জমিয়ে গ্লাশের পাহাড় থেকে একটা নোনা মুচমুচে বিস্কুট নেই। দু’টুকরো করি। একটুকরো খেতে থাকি। ওয়েটার পুরাতন এ্যাশট্রে সরিয়ে নতুন খালি একটা টেবিলে দেয়।
‘না। আমি অবশ্য আগে থাকতেই অনুমান করতে পারিনি।’ একটা ম্লান হাসি দেই। ‘মানে একটা হাতি হুট করে একদিন কেউ কিসসুটি জানে না, এরকম কোন ঘটনাও নেই, জানার প্রয়োজনও নেই, হাওয়া হয়ে গেল। এইটার কোন যুক্তি খুঁজে আপনি পাবেন না।’
‘তবে হ্যাঁ, আপনার জবাব ছিল খুব অদ্ভূত।’ আমি যখন বলি, ‘এটা এমন কিছুই নয় যে কাউকে না কাউকে টের পেতেই হবে।’ আপনি বললেন, ‘না। সম্ভবত না।’ বেশীরভাগ লোকই হয়তো বলবে ‘আপনি ঠিক কথাই বলেছেন,’ অথবা, ‘হুম, এটা অস্বাভাবিক।’ বা, অন্যকিছু। বুঝতে পারছেন আমি কী বোঝাতে চাইছি?’
একটা ঝাপসা নড দেই আর হাত তুলে ওয়েটেরকে ডাকি। আরেকটা স্কচ দিতে বলি। স্কচ টেবিলে পৌঁছুনোর সময় সাময়িক মৌনতা আমাদের গ্রাস করে।
‘আমি বিষয়টা হজম করতে পারছি না।’ খুব মোলায়েম ওর কণ্ঠস্বর। ‘আপনি এইতো কিছুক্ষণ আগেও খুব স্বাভাবিকভাবে কথা বলছিলেন, অন্তত হাতি প্রসঙ্গে যাওয়ার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত। তারপর থেকেই হাস্যকর ঘটনা ঘটিয়ে চলেছেন। বিশ্বাস করুন, আমি আর আপনার কথার খেই ধরতে পারছি না, উল্টাপাল্টা। কিছু একটাতো হয়েছে। এটা কী হাতির জন্য? নাকি আমার কান আমার সঙ্গে চালাকী করছে।’
‘আপনার কানের কোন দোষ নেই।’ আমি বলি।
‘তাহলে, আপনার কিছু? মানে আপনারই সমস্যা?’
গ্লাশে আঙুল চুবিয়ে আমি বরফ গুলতে থাকি। হুইস্কির গ্লাশের এই শব্দটা আমাকে দারুণ টানে।
‘আমি অবশ্য এটাকে সমস্যা বলতে চাইনা। আর এটা তেমন বিশাল কিছুও নয়। আমি কিছু লুকোচ্ছিও না। আমি আসলে নিশ্চিত নই। আমি কী হাতি উপাখ্যানটা ঠিকঠিক গুছিয়ে বলতে পারি? এটাই। আর একারণেই হয়তো বা আমি অর্থহীন বকবক করে যাচ্ছি। তবে আপনি অই কথাটা ঠিকই বলেছেন। এটা খুবই অস্বাভাবিক, অদ্ভূত!’
‘মানে কী এসবের?’
কোন কাজেই আসবে না, জানি। আমি ওকে গল্পটা বলতে পারতাম। একঢোক হুইস্কি গিলে আমি শুরু করি।
‘বিষয়টা হলো, হাতি উধাও হবার আগে সম্ভবত আমিই হচ্ছি গিয়ে শেষব্যক্তি যে হাতিটাকে দেখে। ১৭ই মে সন্ধ্যা ৭.০০টার পরে আমি হাতিটাকে খেদাতেই দেখতে পাই। আর ওরা লক্ষ্য করে ১৮ই মে’র বিকেলবেলা। সন্ধ্যা ৬টার পর লোহার দরজার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আর কারুরই হাতিটাকে দেখা সম্ভব ছিল না।’
‘সন্ধ্যা ৬টায় দরজা বন্ধ হলে, আমি মোটেই বুঝতে পারছিনা, আপনি কী করে ৭টায় হাতির দেখা পেলেন!’
‘খেদার পেছনদিকটায় একধরণের দীর্ঘ পাথুরে ঢাল ছিল। খাড়া ঢালের পাহাড়। বস্তুত ওখানে কোন রাস্তা ছিল না।
পাহাড়ের পেছন দিকটায়, একটা জায়গায় থেকে আপনি হাতিটাকে সহজেই দেখতে পাবেন। বোধ হয় অই বিশেষ জায়গাটার খোঁজ আমি ছাড়া আর কেউ জানত না।
একদম ঠেলায় পড়েই আমি অই জায়গাটার সন্ধান পাই বলতে পারেন। রোববার বিকেলের দিকে অই এলাকা দিয়ে খুব সন্তর্পনে বেড়ানোর সময় আমি পথ হারিয়ে ফেলি। আমি খুব কষ্ট করে পাথুরে পাহাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে উপরে উঠতে বাধ্য হই। তখন আমি খুব পুচকে একটা দাঁড়ানোর জায়গা পাই। একজনের দাঁড়ানোর সমান একটা জায়গা। ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে আমি নিচের দিকে তাকালে খেদার ছাদটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ছাদের নিচদিকটা অনেকটাই খোলা। এর ভেতর দিয়েই চোখ চালালে খেদায় থাকা হাতিটার স্পষ্ট অবস্থানটা বোঝা যায়।
ফলে হাতিটা ভেতরে থাকা কালে ওখান থেকে হাতিটাকে দেখা আমার অভ্যাসে পরিণত হল। কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, আমি কেন কষ্ট করে অমন পথ বেছে নিই। আমার কাছে এর কোন সদুত্তর নেই। বলতে পারেন এমন অসময়ে হাতির দর্শন আমাকে একধরণের আনন্দ দিত। এরচেয়ে বেশী কিছু নেই। অন্ধকার নেমে এলে আর হাতি দর্শন সম্ভব হয় না। তবে অবশ্য গোধূলী বেলায় বা প্রথম সন্ধ্যায় হাতিটার যত্নআত্তি করার জন্য লাইট জ্বালিয়ে দেয়। ফলে হাতিটার প্রত্যেকটা মুভমেন্ট আমি খুব সহজেই দেখতে পাই।
অল্পকয়েকদিনের মাথায় আমি বেশ ভাল করে বুঝতে পারি হাতি আর মাহুতের মধ্যে একটা চমৎকার, ব্যাখ্যাবিহীন বোঝাপড়া আছে। যেটা দিনের বেলায় কারুর পক্ষে বোঝা সম্ভব না। মানে লোকজনের সামনে মাহুত এসব করা থেকে একরকম বিরত থাকে। ওদের দু’জনের অপত্যভালবাসার সম্পর্কটা প্রত্যেকটা নড়াচড়ায় কেবল অনুভূতি দিয়ে হৃদয়াঙ্গম করা যেতে পারে। এরকম মনে হতে পারে ওরা দু’জনেই সারাদিন এই মজাটা জমিয়ে রাখে শেষবিকেলের জন্য। হাতির যত্নআত্তি বা ওদের গোপন কথোপকথন যেন কেউ টের না পায় সে ব্যাপারে বোধ করি দু’জনেই বেশ সতর্ক থাকত। আর গোপন ভালবাসার থলেটা ওরা রাতের বেলা বের করে আনত। এর মানে আমি এমনও বলতে চাইনা যে ওরা এমন ভিন্নতর কিছু একটা করত যা সচারচর দিনের দিকটায় করত না। হাতিটা কেবল একঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে, ফ্যালফ্যল করে শূন্যদৃষ্টিতে, সবদিনের মত। মাহুত সেইকাজই করত যা সচারচর একজন মানুষ ওর কাছে আশা করে। লম্বা হাতাঅলা ব্রাশ দিয়ে সাবানপানি নিয়ে হাতির শরীরটা বেশ করে রগড়ে দিত। ঝরে পড়া পানিতে থ্যাকথ্যাকে হয়ে নষ্ট হওয়া জায়গাটা নিকিয়ে তকতকে করে দিত। আর হাতির খাবারের উচ্ছিষ্ট সব ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিত। কিন্তু ওদের পরস্পরের বন্ধুত্বপূর্ণ উষ্ণতা, বিশ্বস্ততা এসব আপনার এড়িয়ে যাবার কোন উপায়ই থাকে না। মাহুত ঝাড়– দিতে শুরু করলে হাতিটা বেশ মোলায়েম করে শুঁড় দিয়ে ওর পেছনদিকটায় আদর বুলিয়ে চলে। আর আমি এটা ভীষণরকম উপভোগ করতাম।’
‘হাতিপ্রীতি কী আপনার আগে থেকেই সবসময় ছিল?’ মেয়েটা এবার জানতে চায়। ‘মানে বলছিলাম কোন বিশেষ হাতি নয় এমনটি আর কী।’
‘হুমম…. ভেবে দেখতে হয় তাহলে। আমি আসলে হাতি পছন্দ করি।’ অস্ফুটে বলি, ‘ওদের মধ্যে কিছু একটা আছে। আর তাতেই আমি মোহিত হয়ে যাই। মনে হয় আমি সবসময়ই হাতি পছন্দ করে এসেছি। আমি নিজেই অবাক, কেন।’
‘আর অইদিন, আরসবদিনের মত, বেলা পড়ে এলে, ধরে নিই আপনি চড়াইউৎরাই পেরিয়ে পাহাড়ে উঠে হাতিদর্শন করছিলেন। মে মাসের কত তারিখ যেন ?’
‘সতের তারিখ। মে’র সতের তারিখ সন্ধ্যা সাতটা। দিনগুলো তখন বড় হয়ে গেছে আগের চেয়ে। আকাশটা প্রায় গাজরের রঙ ধারণ করেছে। আলোটা মরে বিবর্ণ। তবে খেদার বাতিগুলো জ্বলছিল।’
‘আর তখন কী আপনার চোখে অস্বাভাবিক কিছু পড়েছিল? মানে হাতি কিংবা মাহুতের সরানড়ায়।’
‘কী করে বলি। ছিল আবার ছিল না অস্বাভাবিক কোনকিছু। আমি সঠিক বলতে পারব না। এটা এইরকম না যে ওরা দু’জনেই আমারই সামনে দাঁড়িয়েছিল। সম্ভবত, মানে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে এ ব্যাপারে, আমিই সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য একজন সাক্ষী হতে পারি।’
‘আসলে সত্যিকার অর্থে কী ঘটেছিল ?’
এতক্ষণে জলবৎ হয়ে যাওয়া স্কচের একটা ঢোক গিলি। জানালার বাইরে আগের মতই বৃষ্টি অঝোরে ঝরছে। একটু বেশীও নয়, আবার কম নয়। মনে হয় সবকিছু থিতু হয়ে গেছে। আর এ অবস্থার পরিবর্তন হবে না।
‘আসলে কিছুই ঘটেনি। হাতি আর মাহুত রোজকার মত যা করে – করছিল। পরিষ্কার করা, খাওয়ানো, বন্ধুরা যেমন খেলে তেমন খেলাধুলা করা সবকিছুই চলছিল। এটা এমন নয় যে ওরা ভিন্নতর কিছু একটা করছিল সেদিন। ওদের দর্শন করার এটাই কার্যকর ব্যবস্থা। কিছু একটা আছে ওদের দু’জনের ভারসাম্যতায়।’
‘ভারসাম্য?’
‘আকারে। ওদের শরীরে। হাতি আর মাহুতের। ভারসাম্য মনে হচ্ছে বদলে যাচ্ছে। আমার কাছে কিছুটা এমন মনে হতে পারে, ওদের দু’জনের আকৃতি ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে।’
মেয়েটা এবার কিছুসময়ের জন্য ওর দারকুইরির গ্লাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। বরফ গলে যাচ্ছে, পুচকে মহাসাগরের মত পানি ওর কাজ শুরু করে দিয়েছে ককটেলে।
‘তার মানে আপনি বলতে চাইছেন হাতি ক্রমশ ছোট হয়ে যাচ্ছে?’
‘কিংবা ধরুন মাহুত ক্রমে বড় হয়ে উঠছে। অথবা দু’জনেই একইসঙ্গে।’
‘আর আপনি পুলিশকে কিছুই জানালেন না?’
‘না না। জানাইনি।’ চট করে বলে উঠি। ‘আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত। পুলিশ আমার কথা কখনই বিশ্বাস করবে না। আর যদি আমি বলি যে অনেক চড়াইউৎরাই পেরিয়ে খটখটে পাথুরে পাহাড়ে চড়ে আমি হাতি দর্শন করি নিয়মিতভাবে। তবে ও ব্যাটারা আমাকেই প্রথম সন্দেহভাজন ব্যক্তি মনে করবে।’
‘আপনি এখনও মনে করেন ওদের দু’জনের শরীরের আকারে পরিবর্তন ঘটে চলেছিল?’
‘সম্ভবত। আমি কেবল ‘সম্ভবত’ই বলতে পারি। আমি যে এমন করে বলছি, এসবের তো কোন প্রমাণ নেই আমার কাছে। আমি দূর থেকে খোলা বাতাসের বেষ্টনী ভেদ করে দেখতাম। আমি জানি না। আমি কতবার ওদের দু’জনকে এইভাবে দেখেছি। ফলে আমার পক্ষে বিশ্বাস করা কঠিন, মানে খুবই কঠিন, আমার দেখায় কোন ভুল আছে – বিশেষকরে ওদের দু’জনের আকারের সম্পর্কতে।’
‘সত্যিকার অর্থে আমিও প্রথম চমকে যাই। আমার চোখজোড়া কোন খেলা খেলছে না তো? চোখ বুজে আবার খুলে দেখে, আমি নিজেই মাথা নাড়ায়। হ্যাঁ, আমি ঠিকই দেখছি। হাতির আকার কমে যাচ্ছে। এটা এমন, শহরে যদি নতুন ছোট একটা হাতি আসে ওর শুঁড় থেকে শুরু করে সবকিছুই ছোট থাকবে। তো খেদার হাতিটাকে এমন দেখাচ্ছে যেন ওটা আগেই থেকেই খর্বাকৃতির। এতই ছোট যে আমি ভাবলাম শহরটা বোধ হয় একটা নতুন, ছোটআকৃতির হাতি পেয়েছে। আমি নিউজপেপারে নিয়মিত হাতিউপাখ্যানে চোখ রেখে চলেছি। একটা ছোট্ট নিউজও আমার চোখ এড়িয়ে যাবার কথা নয়। কিন্তু হাতিটার খর্বাকৃতি ধারণ সংক্্রান্ত কোন ইঙ্গিত কোন পেপারে দেখলাম না।
যদি এটা একটা একেবারে নতুন হাতি না হয়ে থাকে, তবে সম্ভাব্য উপসংহার এভাবে টানা যেতে পারে – হাতিটা যেকোন অদৃশ্য মন্ত্রবলে পুচকে হয়ে গেছে। আমার পর্যবেক্ষণে এটাই ধরা পড়েছে। বদলে যাওয়া হাতিটার আচরণ কিন্তু আগের পুরোনোটার মতই আছে। হাতিটার স্নানের সময় আগের মতই আনন্দচিত্তে ডান পা তুলে মাটিতে লাথি মারে। আর ছোট হয়ে আসা শুঁড় তুলে মাহুতের পেছনে মোলায়েম আদর বুলোতে থাকে।
এটা রহস্যজনক দৃশ্য। বাতাসের বেষ্টনী ভেদ করে দেখতে দেখতে আমার মনে এক অন্যরকম অনুভূতির সৃষ্টি হলো। হাতির খেদায় যেন এক শিহরণজাগানো সময় বয়ে চলেছে। আর কোত্থাও নয়। আর হাতি এবং মাহুত দু’জনেই সানন্দে এই নব পরিবর্তনকে যেন বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে। অথবা আগেই এই পরিবর্তন ওদের দু’জনকে আবৃত করেছে।
যাই হোক, আমি আধাঘণ্টার কিছু কম সময় সম্ভবত এরকম দেখে থাকি। সাড়েসাতটার দিকে বাতি নিভে এল। আগের দিনের চেয়ে যেন খানিকটা তাড়াতাড়ি। আমি যেখানটাতে দাঁড়াই ওখান থেকে মনে হয় সবকিছুকেই যেন অন্ধকারের পুরু চাদর দিয়ে মুড়ে দেওয়া হল। কিছু সময় অপেক্ষা করি। এই বুঝি বাতি জ্বলে উঠবে। কিন্তু তা আর কখনও হয়নি। এটাই আমার শেষ হাতিদর্শন।’
‘তাহলে, ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এই হাতি তার বাধা গলিয়ে না বের হয়ে যাওয়াতক ছোট হতে থাকে। অথবা ধরা যাক কোনকিচ্ছুতেই নয়, জাস্ট মিলিয়ে গেল। এইরকম নাকি?’
‘আমি বলতে পারছি না।’ এরপর আমি বলি, ‘আমার নিজের চোখে যা দেখেছি আমি কেবল তাই স্মৃতি থেকে তুলে আনলাম। যতটা নিখুঁত করে পারা যায় আর কী। তারপর আমি এ নিয়ে বিস্তর ভেবেছি। দৃশ্যমান ইমেজটা এতই স্পষ্ট। বিশ্বাস করুন, প্রাকটিক্যালী এটার বাইরে অন্যকিছুই আমি কল্পনা করতে পারছি না।’
হাতি উধাও নিয়ে আমি এতটুকুই বলতে পারি। এবং আমার এখন মারাত্মক আশঙ্কা হচ্ছে এইরকম একটা ককটেলপার্টিতে, কেবল দেখা হওয়া সম্পূর্ণ নতুন একজন মেয়ের সঙ্গে, কথোপকথনের অন্যতম বিষয় হাতি উপাখ্যান, একেবারে যাচ্ছে তাই হয়ে গেল। গল্প থেমে গেলে একটা অদ্ভুত নিরবতা ঘিরে ধরে আমাদেরকে। হাতি উবে যাওয়ার গল্পের পর আর কী এমন কথা বলে এই স্থবিরতা কাটানো যায়? মানে হাতিউপাখ্যানের উপসংহার টানার মতও তো কোন ছুতো নেই। মেয়েটা গ্লাসের প্রান্তে ওর আঙুল নিয়ে খেলে। আর আমি কোস্টারটাতে যা লিখা তা বার বার করে পড়ি। এখন মনে হয়, হাতির উপাখ্যানের অবতারণা করাটা একদমই ঠিক হয়নি। এটা এমন কোন গল্প নয় যে আপনি যাকে তাকে যখন তখন খোলা মনে বলতে পারবেন।
‘আমি যখন খুব ছোট্ট মেয়েটি ছিলাম, আমাদের বিড়ালটা উধাও হয়ে গিয়েছিল।’ দীর্ঘ নিরবতা ভেঙে মেয়েটা বলতে শুরু করে। ‘তবে এটা ঠিক। কোথায় বিড়াল আর কোথায় হাতি! দুটো এক ব্যাপার নয় অবশ্য।’
‘হে: হে:। আসলেই – দু’টোতে তুলনা চলে না। মানে আকৃতির পার্থক্যটা।’
ত্রিশ মিনিট পর হোটেল থেকে বেরিয়ে ওকে বিদাই দিই। মেয়েটার হঠাৎ করে লাউঞ্জে ছেড়ে আসা ছাতাটার কথা মনে পড়ে। তো কী আর করা এলিভেটরে চেপে উপর থেকে ছাতাটা এনে ওর হাতে দিই। লম্বাডাটির ইটলাল রঙের ছাতা।
‘ধন্যবাদ।’ ও কৃতজ্ঞ।
‘শুভরাত্রি।’ আমি বিদায় সম্ভাষণ জানাই।
মেয়েটার সাথে অই আমার শেষ দেখা। আর্টিকেলটার বিষয়ে আমরা একবারই ফোনে কথা বলি তারপর। ফোনে ওকে আমি ডিনারের দাওয়াত দেয়ার কথাটা ভীষণরকম অনুভব করি। কিন্তু আমি কথা শেষ করি। দাওয়াত না দিয়েই। তখন আমার এই ব্যাপারটা কিছুই বলে মনে হয়নি অথবা হয়েও থাকতে পারে। আমি জানি না।
হাতি উবে যাওয়ার পর এরকম অভিজ্ঞতা অনেকবারই হয়েছে। আমি ভাবতে শুরু করি। কিছু একটা করা দরকার। তারপরেই আমি ধন্দে পড়ি কী করব- কেন করব Ñ করাটা কী ঠিক হবে – না করলেই বা জগৎসংসারের কী এমন হবে। এইসব আর কী। প্রায়শই আমি এমত অনুভব করতে থাকি আমার চারপাশের সবকিছুই ভারসাম্য খুইয়ে বসছে। হতে পারে আমার প্রেক্ষিত আমার সঙ্গে কোন চালাকী করছে। হাতি উপাখ্যানের পর আমার নিজের ভেতরের কোথায় যেন ভারসাম্য হুড়মুড় করে ভেঙে পড়েছে। আর হতে পারে এজন্যই, আমি ঠিক বলতে পারব না, বাইরের বস্তুজগৎটার এই অস্বাভাবিক পরিবর্তন আমার চোখেই কেবল ধরা পড়ে। মনে হয়, আমার মনের ভেতরেই কিছু একটা ঘটে চলেছে।
আমি আগের মতই রেফ্রিজারেটর-টোস্টারওভেন-কফিমেকার এই ধর-তক্তা-মার-পেরেক-মার্কা পৃথিবীতে বিক্রি করতে থাকি। আমি আরও যুতসই হয়ে উঠতে চেষ্টা করি। আর বিক্রি বেড়ে চলে। আমাদের ক্যাম্পেইন ধারণাতীত সফলতা লাভ করে। আর আরও বেশি লোকের কাছে নিজেকে বিক্রি করি। খুব সম্ভব মানুষ এটাই চায় – কিটচিনে ঐকতান। পৃথিবীটাকে আমরা এমন করেই জানি। ডিজাইনের ঐক্য, রঙের ঐক্য, কার্যকারিতার ঐক্য।
নিউজপেপারগুলো আর হাতিটাকে নিয়ে লিখে না। মানুষ হয়তো ভুলেই গিয়ে থাকবে – আমাদের শহরে একদা একখানা নিজস্ব হাতি ছিল। এখন খেদার ঘাসগুলি মরকুটে। এলাকাটা মনে হতে পারে শীতার্ত।
হাতি আর মাহুত চিরদিনের জন্য উবে গেল। হ্যাঁ, ওরা আর কোনদিনই ফিরে আসবে না।
—///—
গল্পটি ‘চালচিত্র’ ২০১৬ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here