সম্প্রীতি। শৈশব-তারুন্যের সম্প্রীতির স্মৃতি। ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান

0
800

শৈশব-তারুন্যের সম্প্রীতির স্মৃতি

ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান

আমাদের শৈশবের কানামাছি ভোঁ ভোঁ
অথবা ওপেনটি বায়োস্কোপগুলো কোথায়?
হাডুডু কিংবা ডাংগুলি
দাঁড়িয়াবাঁধা অথবা কাবাডি
মার্বেল অথবা ঘুড়ি।

সেই সব উজ্জ্বল দিনগুলো
বরষায় একটানা বরিষণে স্নান।
শবেবরাতের পূর্ণিমার রাতে মসজিদ ফাঁকি দিয়ে
সারারাত পথে পথে হৈ চৈ।
ঈদের চাঁদ দেখে বাবার দে’য়া লাল শার্টের গন্ধ,
সংক্রান্ত্রির মেলায় কাঠি লজেন্স আর গুড়ের জিলাপী
সারারাত আলপনা আঁকা।

দূর্গাপূজায় ঢোলের বাদ্য আর আরতির ঘণ্টা
লক্ষী পূজায় অল্প শীতে ধামের গান।
সেই সব দিনগুলো আজ সত্যি সত্যি কানা মাছি ভোঁ ভোঁ।
(কানামাছি ভোঁ ভোঁ : বৃক্ষ বন্দনা)

আমার শৈশবকাল কেটেছে ঠাকুরগাঁও জেলার সে সময়ের প্রত্যন্ত ও নিভৃত জনপদ রাণীশংকৈল উপজেলার রাজবাড়ীতে। সম্প্রীতির চাদরে মোড়া সোনামাখা শৈশব। হিন্দু-মুসলিম আলাদাভাবে ভাবার মতো অবকাশই হয় নি। শব ই বরাত, সেমাই ঈদ, বকরী ঈদ, দূর্গাপূজা, লক্ষীপূজা, সরস্বতী পূজা সবগুলোই আমাদের উৎসব ছিলো। সংক্রান্তি, পয়লা বোশেখ, একুশে ফেব্রুয়ারি, ২৬শে মার্চ, ১৬ই ডিসেম্বর সবমিলিয়ে উৎসব আর উৎসব। পুরো শৈশব উৎসবের রঙিন সুতোয় জড়ানো। আর উৎসব মানেই পিঠা-পুলি-পায়েশ-সন্দেশ মোড়ানো। তার সাথে সস্তাদামের নতুন পোষাক। আহারে, কী যে মজার শৈশব। এমনই মজার এক শৈশবে আমার বাবার সাথে গেছি দূর্গাপূজার মেলায়। মেলায় মিষ্টি মণ্ডা-মিঠাই খেয়ে বাবার সাইকেলে চেপে রাজবাড়ীতে ফিরে আসার সময় এক ঝাঁক মৌমাছি বাবাকে আর আমাকে হুল ফুটিয়ে যায়। মা ছুটে এসে আমাদের উদ্ধার করেন। আর চিকিৎসা করেন এক কবিরাজ।
সংক্রান্তি আর বিজয়া দশমীর মেলা
খড়ের গাঁদায় বসে ‘দি রওশন সার্কাস’
বাঘ-ভালুক আর বাঁদরের উল্লাস।
এক হাতে সোলার খেলনা আরেক হাতে গুড়ের জিলাপী
ভর সন্ধ্যায় বাবার হাত ধরে ফিরে আসা
আমাদের শৈশব। আহা! সোনালী শৈশব।
( আমাদের শৈশব: বৃক্ষ বন্দনা)

শৈশব থেকে বালকে রূপান্তরিত হওয়ার মাঝামাঝি সময়ে আমরা রাণীশংকৈল থেকে ঠাকুরগাঁও মহকুমা শহরে চলে আসি। নিশ্চিতন্তপুর, গোবিন্দনগর আর গোধূলি বাজারের সমন্বয়ে এক আধাগ্রাম-আধা শহর ঠাকুরগাঁও। আমার বালক বয়সে আমি ঠাকুরগাঁও শহর দেখে অভিভূত হই। শহরটিকে দু’ভাগে বিভক্ত করেছে টাঙ্গন নদীর উপর দিয়ে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত লোহার ব্রীজ। টাঙ্গনের জল কাকচক্ষুর মত স্বচ্ছ। ঝিরিঝিরি করে স্বচ্ছ হাঁটুজল পুরো বছর জুড়ে প্রবাহমান। শুধু বর্ষায় ভরে ওঠে টাঙ্গন। স্বচ্ছ জলের মধ্যে চেলী, বাঁশপাতারি, পুঁটি কত মাছের বাহার। যেন প্রাকৃতিক একুরিয়াম। আমার বালক জীবনের বিপন্ন বিষ্ময়। সে সময় বছর জুড়ে পুরো শহরে সাংস্কৃতিক উৎসব লেগেই থাকতো। রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত জয়ন্তী, বর্ষবরণ, সাধারণ পাঠাগারের সাংস্কৃতিক উৎসব, যাত্রাপালা, নাট্য উৎসব ইত্যাদি। আর বছর জুড়ে খেলাঘর আসর, তরুণ সংঘ, কচিকাঁচার মেলা ইত্যাদি অনেকগুলো শিশু-কিশোরদের সংগঠন। আমরা কয়েকটি সংগঠন গড়েছিলাম, তুষার ক্লাব, কিশোর-কলির আসর, টাঙ্গন সাহিত্য ও ক্রীড়া সংসদ। হিন্দু-মুসলমান চিন্তাও মাথায় আসেনি কখনো। আমার স্কুল জীবনে ঘনিষ্ট বন্ধু পুলক, শীতেন, সাপু, বিশ্ব, মিন্টু, হেলাল, সারোয়ার, শহীদ, কামরুজ্জামান Ñ এদেও কে হিন্দু, আর কে মুসলমান, আর কে খ্রীস্টান সেটি তো কখনো ভাবনায় আসে নি, তবে ভাবনায় ছিলো উৎসব গণনার ক্ষেত্রে। যেমন ঈদ মানে আমি, হেলাল, সারোয়ার, শহীদ, কামরুজ্জামান – আমাদের আয়োজন, আর দূর্গাপূজা, লক্ষীপূজায় পুলক, শীতেন, সাপু, বিশ্বদের বাসায় হৈ চৈ করে খাওয়া-দাওয়া আর বড় দিনে মিন্টুর বাসায়। শুধুই কি খাওয়া-দাওয়া? দলবেঁধে সারারাত শবেবরাত, ঈদ, দূর্গাপুজা আর বড়দিনে পুরো শহরে দাপিয়ে বেড়ানো। আর দূর্গাপূজা থেকে লক্ষীপূজা প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে ঢাকের বাজনা, কাঁশ ফুল, হালকা কুয়াশা,আরতি, ধামের গান বাজনা, যাত্রাপালা সব মিলিয়ে কী যে মধুরতম শৈশবকাল।
জাতীয় উৎসবগুলোতে এখন হয়তো অনেক জাঁক-জমক আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ দেখা যায়। কিন্তু আমাদের শৈশব-কৈশোরে পহেলা বৈশেখ, ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২৬ শে মার্চ, ১৬ই ডিসেম্বরে বাহুল্য বিহীন হৃদয়ের ছোঁয়া দিয়ে কলাগাছ আর দেবদারুর পাতার গেট, রঙিন কাগজ দড়িতে ঝুলিয়ে পুরো মাঠের চতুর্দিকে সীমানা তৈরি, মাটির ছোট গ্লাসে চুনকাম করে পুরো মাঠের চতুর্দিকে সাজিয়ে রাখা, সন্ধ্যয় শহরের ভবনগুলোতে (তখন ভবনও ছিল হাতে গোনা) প্রদীপের সাঁঝবাতি, কেবলমাত্র হারমোনিয়াম-তবলায় ব্যাটারী আর হর্ণ মাইকে (তখন সাউন্ড সিষ্টেম, পিএ সিস্টেম ইত্যাদি ছিলো না) ‘এই পদ্মা এই মেঘনা এই যমুনা সুরমা নদী তীরে’, সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তে তুমি, ‘আমায় গেঁথে দাওনা মাগো একটা পলাশ ফুলের মালা’ ইত্যাদি গানে কী অপূর্ব ঝংকার আমাদের মুগ্ধ করতো।

রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত জয়ন্তী
এখনকার ছেলে-মেয়েরা কি কিশোর কবি সুকান্তের নাম জানে? তার বিখ্যাত কবিতা ‘একটি দেশলাইয়ের আত্মকাহিনী’ ‘বোধন’ কিংবা ‘রানার’ কবিতা? আমাদের কৈশোরে রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত জয়ন্তী ঠাকুরগাঁও-এ পাড়ায় পাড়ায় উদযাপিত হতো। আমরাও আয়োজন করেছি কতবার। সে সময় ঠাকুরগাঁও-এ কোন মিলনায়তন ছিলো না। আমরা ঠাকুরগাঁও কলেজ মাঠে শাড়ি আর বিছানার চাদর দিয়ে মঞ্চ বানাতাম। আমরা একবার রবীন্দ্রনাথের ‘সামান্য ক্ষতি’ কবিতা অবলম্বনে গীতিনাট্য করলাম। কী বিপুল উৎসাহ। আমার জীবনে প্রথম ধুতি-পাঞ্জাবী পরে মঞ্চে অভিনয়। প্রয়াত রশিদ চাচা মেকাপ দিয়েছিলেন। আমাদের সেই কিশোরকলির আসরে শুভ, ন¤্রভাই, সাবুভাই, আসলাম ভাই, শীতেন, মিন্টু, প্রদীপ, বিকাশ দা, পাপন, পলাশ, মোখলেস স্যার সবাই মিলে আমরা নগ্নপায়ে ভোরবেলা নিজেদের অতি যত্নের ছ্ট্টো বাগান থেকে ফুল তুলে ফুলের তোড়া বানিয়ে কলেজ শহীদ মিনারে অর্ঘ্য নিবেদন করতাম।

স্বরস্বতি পূজা আয়োজন
টাঙ্গন নদীর তীরে-গোধূলি বাজারের বিপরীতে আমাদের টাঙ্গন সাহিত্য ও ক্রীড়া সংসদের আমি ছিলাম প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। সম্ভবত: ১৯৮৩ সালে তখন আমি দশম শ্রেণীর ছাত্র, ক্লাবের পক্ষ থেকে সরস্বতি পূজা করার সিদ্ধান্ত হ’লো। স্বাভাবিক কারণেই সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমি পূজা কমিটিরও সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় সাপু, লাকু, বিশ্ব, সুদাম, মনা, খুকুদি, সীমাদী, অঞ্জলীদী, সারোয়ার, আরজু, শহীদ, মাযহারুল ভাই সবাই মিলে আমরা সরস্বতি পূজার আয়োজন করি। প্রত্যেক দর্শনার্থীকে আপ্যায়িত করা হয়েছিল কলাপাতায় লুচি আর বুন্দিয়া দিয়ে। এরপরে আরও দু’বার টাঙ্গন সাহিত্য ও ক্রীড়া সংসদের উদ্যোগে সরস্বতি পূজার আয়োজন করা হয়েছিল। আমি টাঙ্গন সাহিত্য ও ক্রীড়া সংসদ ছেড়ে আসার পর আর আয়োজন হয়েছে কি না জানি না।

১২ই রবিউল আউয়াল-ঈদ ই মিলাদুন্নবী
ঠাকুরগাঁও জেলা শহরের নর্থ সার্কুলার রোডে আল আমিন স্টোরের উদ্যোগে প্রতিবছর রাতভর ১২ই রবিউল আউয়াল-ঈদ ই মিলাদুন্নবীর আয়োজন হয়। আমরা কৈশোর-তারুণ্যে ফি বছর ঈদ ই মিলাদুন্নবীর এই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে। গভীর আনন্দ-ভালবাসা-শ্রদ্ধায় উদযাপন করেছি ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী। গভীর রাতে মুনাজাত শেষে খুরমা আর জিলাপীর স্বাদ ছিল একেবারে অন্যরকম।

চার্চে ফাদারের বিদেশী চকোলেট আর বড়দিনের কেক
আামাদের কলেজ পাড়ার বাসার পাশেই ক্যাথলিক চার্চ। অনেকটা জায়গা জুড়ে উঁচু বাউন্ডারী দেয়া চার্চের ভেতরটা ছিল খুবই সুন্দর। সবুজ গাছ-পালা আর অসংখ্য ফুলে ভরা চার্চে এক ধরনের নিস্তব্ধতা বিরাজ করতো। পাশেই সাঁওতাল পল্লী। তারাই মূলত: চার্চে যাতায়াত করতো। আমাদের শৈশবে চার্চে ইতালিয়ান একজন ধর্মযাজক ছিলেন। একটা ভ্যাসপা মোটর সাইকেলে তিনি ঘুরে বেড়াতেন। আমরা চার্চের গেটে উঁকি দিলেই আদর করে ভেতরে ডেকে নিয়ে যেতেন। আমাদের প্রত্যেককে দিতেন বিদেশী টফি অথবা চকোলেট। বড়দিনে আমাদের বন্ধু মিন্টু জারিয়েলের সাথে আমরা চার্চে যেতাম। প্রার্থনা শেষে খোলা মাঠে গান আর নাচের অনুষ্ঠান। আদিবাসী ছেলেমেয়েরা অংশ নিতো। আমরা গভীর আনন্দে উপভোগ করতাম সে অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠান শেষে কেক কাটা হতো। আমাদেরকেও দেয়া হতো কেক, মিষ্টি আর ফল। সে এক আনন্দদায়ক উৎসব।

শব ই বরাতের হালুয়া-রুটি আর সারারাতের শহর প্রদক্ষিণ
শব ই বরাত আমাদের শৈশবের আরেকটি আকর্ষণীয় উৎসব। দুপুরের পর থেকে চালের আটার রুটি, বুটের হালুয়া আর সম্ভবত: রোলেক্স কোম্পানীর সেমাই। আমাদের হিন্দু-বন্ধুরাও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো হালুয়া রুটির উৎসবে যোগ দেয়ার জন্য। সন্ধ্যার পর পাজামা-পাঞ্জাবী আর টুপী পড়ে বড় মসজিদে আমরা নামাজ পড়তে যেতাম। এশার নামাজের পর দীর্ঘ মুনাজাত। সারা বছর যেন ভালো যায়, পরীক্ষার ফলাফল যেন ভালো হয় সেজন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা। আমাদের হিন্দু বন্ধুরাও মসজিদের বাইরে থেকে প্রার্থনায় যোগ দিতো। মুনাজাত শেষে আমরা মসজিদ থেকে বেরিয়ে সবাই মিলে পুরো শহর পায়ে হেঁটে হেঁটে ঘুরে বেরিয়েছি।

এসো হে বৈশাখ এসো এসো
চৈত্র সংক্রান্তির রাতে সারারাত শহরের বিভিন্ন রাস্তায় আমরা আলপনা আঁকতাম। ভোরবেলা নিক্কনের বর্ষবরণ উৎসবে বটতলায় সবাই এসে জুটতাম। গভীর আনন্দে অনুষ্ঠান শেষ করে পিঁচকিরি দিয়ে রঙের খেলায় মেতে উঠতাম। এর ফাঁকেই মায়ের বানানো মুড়ি আর পায়েসের আস্বাদন। তখন পান্তা-ইলিশের তেমন চল ছিল না। শেষ চৈত্রের রাতে মা ভাতে জল দিয়ে রাখতো। পহেলা বৈশাখে সেই পান্তার সাথে মরিচ আর আলুভর্তা দিয়ে আমরা দিনের সূচনা করতাম। সে যেন অমৃত। যে স্মৃতি মনে হলেই আবার শৈশবে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। তখন সবেমাত্র আলপনার বৈশাখী মেলা শুরু হয়েছে। এখনকার মতো এমন জাঁকজমক পূর্ণ নয়। তারপরও সে মেলায় আমরা দলবেঁধে যেতাম। গুড়ের জিলাপীর মজা পহেলা বৈশেখে একেবারেই অন্যরকম ছিল।

সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ-সোনালী কৈশোর বিনষ্টে কারোকারো অপচেষ্টা
আমি ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। আজ থেকে তেত্রিশ বছর আগে স্কুল থেকে পাশ করে বেরিয়েছি। এতো বছর পর কোন শিক্ষকের নাম উল্লেখ করতে চাই না। তবে একজন শিক্ষক অত্যন্ত হীনভাবে সাস্প্রদায়িক বিভাজনের যে বীজ কৈশোরের সোনালী মননে প্রোথিত করার অপচেষ্টা করতেন এটা ভেবে আজও খারাপ লাগে। আমাদের কাছে শিক্ষকরা ছিলেন দেবতার মতো। বোধকরি আজও ছাত্রদের কাছে তেমন-ই। তিনি ক্লাসে কথাচ্ছলে বলতেন – ‘শোনো তোমরা , কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি। তিনি রবীন্দ্রনাথের চাইতেও বড় কবি ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ষড়যন্ত্র করে তার মেয়ে প্রমিলার সাথে কবি নজরুলের বিয়ে দেন। প্রমিলা খাবারের সাথে স্লো পয়জনিং করে নজরুলকে পাগল এবং বোবা বানিয়ে দেন, যে কারণে নজরুল নোবেল পান নি।’ কিশোর মননে চরম ভ্রান্তিকর সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ানোর কী নিকৃষ্ট অপচেষ্টা। আমাদের সৌভাগ্য, আলোকিত পরিবার ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের কারণে আমরা পরম পূজনীয়(?) এ-সব শিক্ষকের নষ্টগল্পের দ্বারা বিভ্রান্ত হইনি। আমার তো মনে হয়, আজও দেশের কোন কোন প্রান্তে কোন না কোন পূজনীয়(?) শিক্ষক এ-কাজটিই করে যাচ্ছেন পরিকল্পিতভাবে এবং কোন না কোন এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য। সরকার এবং বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের এ-বিষয়ে বিশেষ নজর দেয়া দরকার।
এমনই অভিজ্ঞতা আরও অনেক রয়েছে। বোধ করি অন্যদেরও রয়েছে। খুবই ঠাণ্ডা মাথায় বাঙালি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টা । যেমন: শহীদ মিনারে ফুল দেয়া আর পূজা করা একই কথা, পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান বিদাত, মেয়েদের কপালে টিপ দেয়া হিন্দুয়ানী ইত্যাদি ইত্যাদি। বাঙালি সংস্কৃতি যেটি জাতি হিসেবে আমাদের শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্য, যা কোনভাবেই ধর্মাশ্রিত নয় বরং বাঙালি জাতি হিসেবে গর্বের ধন সেটিকে মুছে ফেলার এমন অপচেষ্টা রুখতে হবে আমাদেরকেই। সম্মিলিতভাবে।
যাক, এসব অভিজ্ঞতা অবশ্য আমাদের আনন্দ অভিযাত্রার ধারাবাহিকতাকে কখনোই এতটুকু পরিমাণেও ম্লান করতে পারেনি।

আমার বন্ধু স্বপন: যার হাত ধরে ঢাকা শহরে চলা
এসএসসি পাশ করার পর এইচএসসিতে ঢাকা কলেজে ভর্তি হই। ঢাকা শহর তখন ঠাকুরগাঁও থেকে অনেক- অনেক দুরের এক বৃহৎ শহর। ঠাকুরগাঁও’র ছেলেমেয়েরা এসএসসি পরীক্ষায় ভালো করলে দিনাজপুর সরকারি কলেজ, রংপুর কারমাইকেল কলেজ, সর্বোচ্চ রাজশাহী কলেজে ভর্তি হতো। আমার ক্ষেত্রে আমার বাবা একটু সাহস করে প্রচলিত ধারা ভেঙ্গে আমাকে ঢাকা কলেজে ভর্তি করার মনস্থির করেন। আমার বড়ভাই আখতারুজ্জামান সাবু আমাকে ঢাকা কলেজে ভর্তির জন্য ঢাকায় নিয়ে যায় এবং ঢাকা কলেজে আমি ভর্তি হই। এসএসসি’র ফলাফল খুব ভালো থাকার কারণে শুরুতেই দক্ষিণ ছাত্রাবাসে সিট পেয়ে যাই। দোতলায় ২০৫ নং কক্ষে। আমার ব্যাচে ঢাকা কলেজে ঠাকুরগাঁও জেলার কোন ছাত্র ছিল না। একেবারেই নি:সঙ্গ। প্রথম বন্ধুত্ব হয় স্বপনের সাথে। স্বপনের গ্রামের বাড়ী ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া কিন্তু ওরা ঢাকাতেই স্থায়ী অধিবাসী। আজও স্বপনদের ভজহরি সাহা স্ট্রীটের বাড়ীটি আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সেটা এরশাদের সামরিক-আধা সামরিক শাসনের যুগ। কথায় কথায় কলেজ বন্ধ হয়ে যেতো। আমার তথন ঢাকা শহরে তেমন কোন আত্মীয় ছিল না। কোচ ছাড়তো ঢাকা থেকে একবারই এবং সেটি বিকাল সাড়ে তিনটা বা চারটায়। অথচ হল ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হতো সকাল ন’টা অথবা কোচ চলে যাওয়ার পর। সেই ক্ষেত্রে হৃদয়হীন ঢাকা শহরে বিরাট হৃদয় নিয়ে অপেক্ষমান থাকতেন ভজহরী সাহা স্ট্রীটে মাসি মা। স্বপনদের বাসায় সবজির কথা ভুলবো কি করে? পুরো ঢাকা শহর আমাকে স্বপনই চিনিয়েছে। পুরনো ঢাকার স্টার হোটেলে প্রথম ‘ফালুদা’ খাওয়া কিংবা ‘আনন্দ সিনেমা হলে ‘টাইটানিক’ সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা তা-ও স্বপনের সৌজন্যেই। এইচএসসিতে স্বপন ঢাকা বোর্ডে সম্মিলিত মেধা তালিকায় অষ্টম এবং মানবিক বিভাগে প্রথম ষ্ট্যান্ড করেছিল। স্বপন আমাকে চিনিয়েছে বায়তুল মোকারম জাতীয় মসজিদ, ঢাকেশ্বরী মন্দির, আর্মেনিয়ান চার্চ, বলদা গার্ডেন আর ঢাকা স্টেমিয়ামে প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগ খেলা দেখা।

হ-য-ব-র-ল ইনষ্টিটিউট আর ভাসানী স্মৃতি পাঠাগার
ঢাকা কলেজে পড়াকালীন আমরা ঠাকুরগাওয়ে প্রতিষ্ঠা করি হ-য-ব-র-ল ইনস্টিটিউট। আমাদের প্রথম দিকে আড্ডা ছিল ঠাকুরগাঁও কলেজে কৃষ্ণদার ক্যান্টিনে। তারপর কলেজপাড়ায় সুধীরদার হোটেলে । আমি ছিলাম হ-য-ব-র-ল ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা আহবায়ক। শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, সমাজসেবা, বিজ্ঞান, রাজনীতি, অর্থনীতি সবকিছুর মিলিত একটি প্রতিষ্ঠান ছিল হ-য-ব-র-ল ইনস্টিটিউট। হ-য-ব-র-ল ইনস্টিটিউট থেকে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান পরবর্তীতে আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি। টাঙ্গন বিজ্ঞান সংসদ, মওলানা ভাসানী স্মৃতি পাঠাগার এসব প্রতিষ্ঠানের সূচনা ঘটেছে হ-য-ব-র-ল ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে। যাহোক, আমি ছাড়াও সন্তোষ, স্বপন, নিবিড়, যামিনী, পরিমল, শীতেন, নিত্যানন্দ, নির্মল, মিন্টু, রিপন, রুবাইয়াত, চঞ্চল, বিকাশদা সবাই হ-য-ব-র-ল ইনস্টিটিউটের সক্রিয় সদস্য ছিলো। আমরা হ-য-ব-র-ল ইনস্টিটিউট থেকে অনেকগুলো কাজ করেছিলাম। প্রথম সম্মেলনে উদ্বোধক হিসেবে শিশু শ্রমিক বাদাম বিক্রেতা শুক্কুর আলীকে দিয়ে আমরা পতাকা উত্তোলন করিয়ে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার বিরূদ্ধে একটি প্রতীকী প্রতিবাদ করেছিলাম। সে সময়ে কলেজপাড়া এলাকায় খুব জুয়া খেলা হতো, আমরা সম্মিলিতভাবে এই জুয়া খেলা বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। আমরা একটা ছোট্ট লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ, আমার ঢাকা কলেজ জীবনের প্রিয় শিক্ষক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার আমাদের ভাঙ্গা বেড়ার টিনের চালার ১৮ফুট বাই ১০ ফুটের ছোট্ট ঘরে এসেছিলেন। তিনি বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের পুরো এক সেট বই আমাদেরকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে আমরা এই উৎসাহেই মওলানা ভাসানী স্মৃতি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করি।

টাঙ্গান বিজ্ঞান সংসদ
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বিজ্ঞানচর্চা বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। আমরা কিন্তু সেই আজ থেকে তিন দশকের বেশী সময় পূর্বে বিজ্ঞান চর্চার জন্য টাঙ্গন বিজ্ঞান সংসদ প্রতিষ্ঠা করি। আমাদের টাঙ্গন বিজ্ঞান সংসদ জেলা পর্যায়ের বিজ্ঞান মেলায় বরাবর প্রথম হতো। আমাদের বিজ্ঞান সংসদের সদস্য অর্জুন সিংহ পাপন জাতীয় পর্যায়ে বিজ্ঞান মেলায় তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিল।

সাপ্তাহিক প্রতীক্ষা প্রকাশ
সে সময়ে বিএডিসি ফার্মে সার ও বীজ নিয়ে নানা ধরনের দুর্নীতি হতো। আমরা একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করি ‘সাপ্তাহিক প্রতীক্ষা।’ প্রথম সংখ্যার লীড নিউজ ছিল ‘বিএডিসির পরিহাস-চাষীর গলায় দড়ির ফাঁস,’ সম্ভবত: পাঁচটি সংখ্যা বেরিয়েছিলো সাপ্তাহিক প্রতীক্ষার। সে সময়ে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা চলছিল। তখন ডিস এন্টেনা ছিল না। বিটিভি’র মাধ্যমে গভীর রাতে বিপুল উৎসাহের সাথে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানীর পক্ষ-বিপক্ষ হয়ে খেলা দেখতাম।

মহান ২১ শে ফেব্রুয়ারি
মহান ২১ শে ফেব্রুয়ারি আমরা মহা সামরোহে সকালে নগ্নপায়ে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পনের পর দুপুর থেকে সন্ধ্যা অবধি শুদ্ধভাবে বাংলা উচ্চারণ এবং সুন্দর হাতের লেখা প্রতিযোগিতা করতাম। যে কার্যক্রমের নাম ছিলো ‘এসো কিছু শিখি’। দাবা ও ক্যারাম টূর্নামেন্টের আয়োজন করেছি আমরা অনেকবার ।

দূর্গাপূজা
প্রয়াত সন্তোষের দাদা আমাদের সকলের দাদা বীরেনদা যিনি নিজেও মাঝে মধ্যে আমাদের আড্ডায় বসতেন, হঠাৎ এসে বললেন – কলেজপাড়ায় কোন দূর্গাপূজা হয়না, তার খুব ইচ্ছে কলেজপাড়ায় একটা পূজা মল্ডপ হোক। প্রস্তাব উত্থাপনের সাথে সাথে আমরা এক লাফে রাজী হয়ে গেলাম। দূর্গাপূজার আরাধনাটাতো এখানে মূল বিষয় নয়, বরং আশ্বিনের এই উৎসবে নিজেদের রঙীন করার জন্যই তো আমাদের সকলের তুমুল উৎসাহ। যা হোক, কুয়াশায় গুড়ের জিলাপী আর মসলাদার বারভাজার মুখরোচক আস্বাদনের সাথে ধুমধাম করে দূর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হলো। আজও কলেজপাড়ায় দূর্গাপূজার আয়োজন চলমান।

বিসর্জনের পরের সপ্তাহে পূজা সম্মিলনী
দূর্গাপূজার বিসর্জনের পরের সপ্তাহে পূজা সম্মিলনী। মূলত: শহরের সবগুলো পূজা কমিটির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে নৈশভোজ আর কীর্তনের অনুষ্ঠান। কলেজপাড়া পূজা কমিটির নেতৃস্থানীয় হিসেবে প্রতিনিধি দলের আমিও একজন সদস্য। সেবার পূজা সম্মিলনীর আয়োজক ছিল কালিবাড়ী পূজা কমিটি। কী অপূর্ব মুগডালের খিচুরী আর বেগুন ভাজা। এতগুলো বছর পরেও যেন তার স্বাদ অনুভব করি। কীর্তনের অনুষ্ঠানে বৈষ্ণব পদাবলী কীর্তনের রস আস্বাদন করার উপলব্দিও তৈরি হয় তখন থেকেই।

আকচা গ্রামে লক্ষীপূজা আর ধামের গান
আমাদের হযবরল ইনস্টিটিউটের সক্রিয় সদস্য শীতেন আর বৈদ্যর বাড়ী ছিল পূর্ব আকচা গ্রামে। সে সূত্র ধরে আকচা গ্রামের সুবলদা, বিপ্লবদা, বৈদ্য’র বাবা হরেন কাকু, হৃদয়দা, জাম্বুদা এরাও সুধীরদার চায়ের দোকানে আমাদের আড্ডার নিয়মিত সভ্য ছিলেন। একবার তারা আমাদের প্রস্তাব দিলেন লক্ষীপূজা থেকে ধামেরগান পর্যন্ত পুরো এক সপ্তাহ আড্ডাটা যেন পূর্ব আকচা গ্রামে স্থানান্তর করা হয়। এটা যে শুধুই নিমন্ত্রণ নয় একটু কথা বার্তা হতেই বুঝলাম। শহরের কিছু বখাটে ছেলে গেল বছর ধামের গানে নানাভাবে ঝামেলা করেছে। উঠতি বয়সী কিশোরী -তরুণীদেরকে নানাভাবে হয়রানীর চেষ্টা করেছে। যে কারণে এ বছর এই আয়োজনে তাদের মধ্যে এক ধরনের দ্বিধাগ্রস্থতা কাজ করছে। পুরো বিষয়টি জানার পর আমরা তো রীতিমত ক্ষুব্ধ। কেন গেল বছর আমাদের জানানো হলো না। এবারে আমরা দলবেঁধে আমাদের আড্ডাটি সুধীরদার হোটেল থেকে আকচা গ্রামে এক সপ্তাহের জন্য স্থানান্তর করলাম। বিপ্লবদা, সুবলদা সহ অনেকের বাড়ী থেকে নারকেলের নাড়ু, মুড়ির মোয়া সহ বিভিন্ন মিষ্টান্ন আমাদের উৎসবকে রঙিন করে তুললো। লক্ষীপূজা শেষে ধামের গান। এর আগে দূর থেকে দেখলেও এত ঘনিষ্টভাবে ধামের গানের সাথে আমি যুক্ত হইনি। দিবা-রাত্রী মুক্ত মঞ্চে ধামের গান চললো। নানা জায়গা থেকে ধামের গানের দল আসে। আমাদের বন্ধু বৈদ্য ধাম কমিটির অধিকারী। তার হাতে একটা কাঁসার ঘণ্টা। প্রত্যেক দলের জন্য উপস্থাপনার সুনির্দিষ্ট সময় পেরুলেই ঘণ্টা ধ্বনি ঢং ঢং। শ্রেষ্ঠ ধামের দলের জন্য পুরস্কারও ছিল – হ্যাজাক, হারিকেন, ছাগল, ইত্যাদি। ধামের গানের আনন্দে আমরা আপ্লুত হই। আজও ধামের গানের কথা শুনলেই আমি ছুটে যাই।

যামীনির গ্রামের বাড়ীতে মহিষের দই সহযোগে মধ্যহ্নভোজ
আমাদের হযবরল ইনস্টিটিউটের সক্রিয় সদস্য যামিনীর গ্রামের বাড়ী ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের কচুবাড়ী গ্রামে। প্রতিবছর দূর্গাপূজার পরদিন দুপুর বেলা যামিনীর গ্রামের বাড়ীতে আমাদের নিমন্ত্রণ থাকতো এবং গত তিরিশ বছর ধরে সে নিমন্ত্রণ চলমান আছে। মধ্যহ্নভোজের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মহিষের দুধের দই। মহিষের দুধের ফ্যাট পার্সেন্টেজ বেশী থাকার কারণে চিনিপাতা এই দই’র মজাটাই আলাদা।

শৈশব-কৈশোরের, তারুণ্যের সম্প্রীতির যে গভীর বন্ধন – যে ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েই জীবনের বাকী পথ চলছি। ছোট্ট, শান্ত, নিস্তরঙ্গ মফ:স্বল শহর ঠাকুরগাঁও এখন অনেক বেশী ব্যস্ত। শহর সম্প্রসারিত হচ্ছে অতি দ্রুত। সুউচ্চ ইমারত আর অনেক মোটরগাড়ীতে ঠাকুরগাঁওকে এখন আর মফ:স্বল শহর মনে হয়না। তবে শহর সম্প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে কি আমাদের হৃদয় সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মাঝে মধ্যে এমনটা মনে হয়। রবীন্দ্র -নজরুল-সুকান্ত জয়ন্তী তো পাড়ায় পাড়ায় দূরের কথা পুরো শহরেও সেভাবে হয়না। ঈদ, শব ই বরাত, দূর্গাপূজা, লক্ষীপূজা, বড়দিন, আমাদের শৈশব-কৈশোরে কেবল ধর্মীয় উৎসব ছিল না। আমাদের সকলের বিশেষত: সব শিশু-কিশোরদের মন রাঙিয়ে দিতো, আজকাল এ উৎসবগুলো একেবারে সম্প্রদায় ও ধর্মীয় গণ্ডীর মধ্যে বাঁধা পড়ে যাচ্ছে। এগুলো সকলের না হয়ে ‘আমাদের-তোমাদের’ এমন সূক্ষ্ম বা মোটাদাগে বিভাজন হচ্ছে। উৎসবের চাকচিক্য, আলোকসজ্জা, রোশনাই, আধুনিক বাদ্যযন্ত্র আর সংখ্যা সব কিছুই বেড়েছে কিন্তু হৃদয়ের সীমাবদ্ধতায় উৎসবের গণ্ডী সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।
পেছন ফিরে দেখি – পুলক ইন্ডিয়ায়, বিপ্লবদা শিলিগুঁড়িতে যেয়ে মারাও গেছেন, পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন বিকাশদা, সুবলদা, সন্তোষ বাবু। তারা কি সাথে করে সম্প্রীতির কিছুটা ঐশ্বর্য্যও নিয়ে চলে গেছেন, জানি না? তবে সুখের বিষয় আজও ঠাকুরগাঁও’র মানুষ অসাম্প্রদায়িক। যাদের অন্তরে সাম্প্রদায়িতকতার বিষবৃক্ষ রয়েছে তারা এখনো অসাম্প্রদায়িক সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের চাপে গর্তে লুকিয়ে আছে। তবে এই চেতনাকে লালন করতে হবে, প্রতিনিয়ত জল সিঞ্চন করতে হবে যেন গর্ত থেকে বেরিয়ে বিষধর সাপ কখনো সম্প্রীতির ভালোবাসার-বাঙালি চেতনার প্রিয় মাতৃভূমিতে ছোবল দিতে না পারে। আমার ‘বৃক্ষবন্দনা’ কাব্যগ্রন্থের ‘আমাদের শৈশব’ কবিতাটি সম্প্রীতির স্মৃতির সাথে খুবই প্রাসঙ্গিক বিধায় যুক্ত করলাম এই লেখাটির সাথে।

আমাদের শৈশবগুলো সোনায় বাঁধানো ছিল না
সোনা কিংবা রূপোর চামচের স্বাক্ষাত মেলে নি
অনেক পোষাকের ছড়াছড়ি নয়।
খেলনা বলতে চার আনার কাগজের ঘূর্ণি
বাতাবী লেবুর শক্ত ফুটবল
দশ পয়শার হাওয়াই মিঠাই অথবা লাঠি লজেন্স
ঝাল-টক-মিষ্টির তীব্র আস্বাদনে হজমী জারক
তারপরও আমাদের শৈশবগুলো উজ্জ্বল আলোয় ভরা।

সংক্রান্তি আর বিজয়া দশমীর মেলা
খড়ের গাঁদায় বসে ‘দি রওশন সার্কাস’
বাঘ-ভালুক আর বাঁদরের উল্লাস।
এক হাতে সোলার খেলনা আরেক হাতে গুড়ের জিলাপী
ভর সন্ধ্যায় বাবার হাত ধরে ফিরে আসা
আমাদের শৈশব। আহা! সোনালী শৈশব।

শবে বরাতের রাতে হালুয়া রুটি
মসজিদে মসজিদে কলাপাতায় ফিরনী
রাতভর মুক্ত বিহঙ্গের মত দল বেঁধে ঘোরা
ক্লান্ত শরীরে নিমিষেই নিদ্রা।
আমাদের শৈশব। বিষ্ময় ভরা শৈশব।

একুশে ফেব্রুয়ারির ভোরে সারি বেঁধে শহীদ মিনার
বুকে কালোব্যাজ, মুখে ‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো’
হৃদয়ে সালাম-বরকত-রফিক-জব্বার।

পয়লা বোশেখে সারারাত পীচঢালা পথে আলপনা আঁকা
পান্তা -ইলিশ আর টকটকে মরিচের আলুভর্তা
কাদা মাটিতে উৎসব, উল্লাস
পিচকিরিতে রঙের বাহার।

পউষের পিঠা-পার্বন
গোরুর গাড়ীতে গ্রামের বাড়ীতে যাত্রা
ইস্কুল নেই-কেবলই উৎসব
ভোরবেলা ওম ওঠা ভাঁপা পিঠার সুঘ্রাণ
বছরের শুরুতে নতুন বই’র আস্বাদন
পুরনো ক্যালেন্ডারে চকচকে মলাট
সুলেখা কালিতে কলমে হাতে খড়ি
কুকীজ বিস্কুটের জিভে জল আসা ঘ্রাণ।

ঈদের আগের রাতে সারারাত জেগে থাকা
নতুন লাল জামা আর স্পঞ্জের প্রতি মুগ্ধতা
মায়ের হাতে বানানো সুজি, হালুয়া, সেমাই
এক সাথে ঈদের নামাজ, কোলাকুলি, সোলার ঘূর্ণি।

আমাদের শৈশব
আমাদের সোনা মাখা শৈশব
আমাদের উচ্ছল, উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত শৈশব।

লেখাটি ‘চালচিত্র’ ২০১৭ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত। আরও লেখা পড়তে ভিজিট করুন –
www.chalchitro.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here