সমকালীন গল্প। শরীরের বাজার। সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ

0
661

শরীরের বাজার

সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ

কত কী গোপন আছে, উল্লেখ রয়েছে কত কিছু – তবু জানার জগতে অজানার পাল্লা ভারি খুব। ভারবাহী মানুষ বহন করে চলেছে জ্ঞান ও শূন্যতা। শহর হতে দূরতম প্রান্তের যে বাসিন্দা বিহ্বল সে। বাস করে আর যে মানুষটা শহরের অন্তরে তাকেও টান মেরে নিয়ে যায় কাছে অৎান্তিক।
জানা হয় না, জানা হয় না, যে, বেড়া দিয়ে কাঁটাতারের এপার ওপার রুদ্ধ করা যায় কীনা!
অদ্ভুত চলাচল ঘটে যায়। কোনো ভূতের কারসাজি নয় – বেড়া ডিঙিয়ে এক মুল্লুক হতে অন্য মুল্লুকে উড়ে যায় যেন; দৃশ্য হতে অদৃশ্য, অদৃশ্য হতে পুনরায় দৃশ্যের অন্তর্গত।
এক দিক হর্ষ – আর অন্য দিকে বিষাদ তবু পারে বিষাদও মাঝে হরিষও আবারো। বিষাদে হরিষ!
কাটাতারের চেয়েও সহজতর বেড়া ডিঙিয়ে এক ভেলকিতে বদলে যাওয়া দিনের টগবগে সতেজ কথামালা অবিরাম অক্ষরপাতের মধ্য দিয়ে শিখ-ীকে নিয়ে শিখড় স্পর্শে সক্ষম। শিকড় ছিঁড়ে শিখরে যাওয়ার গল্প করা যাক এবার। সীমানা পাঁচিল তুলে দুই শরীক আলাদা হলেও ঘরেতে ভ্রমর এলো গুণগুণিয়ে বলে স্কুল ফেরতা বালিকাটি ইউনিফর্ম বদলাতে বদলাতে ঠোঁট নড়াচড়া করলে অপর পাশের সদ্য গোঁফের রেখা আঁকা বালকটির বুকর ভেতরটা টিপ্টিপ্ করবেই – তেমনি জমিন ভাগ কাঁটাতারের বেড়া ডিঙানো কঠিন কঠোর করে ফেললেও নদীতে জল আর নি:শ্বাস জুড়ে বায়ু অনর্গল এপাশ ওপাশ চলাচল করে; শ্যামল ও সুন্দর, শস্য ও সুফলা হতে কোনো বাঁধ ভেঙে দেয়া আদৌ জরুরি তাগিদ দেয় না।
পাঁচিল দুই শরীকের নৈকট্য – মধ্যিখানে দূরত্ব রচনা করলেও অন্তর্জগতে মানুষের ভেতর পাঁচিলের চুন সুড়কির গাঁথুনি শক্তপোক্ত হয়নি একেবারে কখনো; আবার, দিব্যি কোনো পাঁচিল কিংবা বন্ধ জানালা নাই অথচ সংযুক্তি বিযুক্তি যারপর নাই অবস্থিত বলেই মনের মধ্যে দরোজার কপাট কখন যেন সপাটে বন্ধ হয়ে গেছে।
বাতাসের গতিবেগ
মনের ভেতর আয়নায় প্রতিফলন
জলের তোরজোর
সবুজের ভেতর পটে আঁকা ছবির মতো
বিস্তারিত মানুষের জীবন
বাগান জুড়ে ফোটা গোলাপের সুরভি
হাস্নাহেনার সঙ্গে সাপের মিতালীর মতো বিচ্ছিন্নতার পাশে শুয়ে থাকা দীর্ঘশ্বাসের মতো অবারিত ও অধীর।
কাঁটাতারের বেড়া সবুজ প্রান্তর ভেদ করে সাপের মতো কিলবিলিয়ে যার যার ভূমি আলাদা করেছে।

বাস্তু সাপের মতো কাঁটাতার লকলকিয়ে আঁকাবাঁকাভাবে – এই এক আকাশের নিচে আকণ্ঠ পিপাসায় পানির তৃষ্ণার সমচ্চারণের ভেতরে – আমার দেশ তোমার দেশ বলে ভাগাভাগি করে দিয়েছে।
তারকাটার বেড়া প্রত্যেকদিন যারা চোখে দেখে – এই কাঁটাতারের সর্পিলাকার গতি ও আকার দেখে সাপের কথা, বাস্তু জুড়ে যেন বাস করবে আরও দিন, তাই – তেমনই মন- হতে থাকে; অভিজ্ঞতা হতে জ্ঞান, জ্ঞান হতে প্রজ্ঞায়।

একদল এখানে সাপের পিচ্ছিল গতি সর্পিল আকারের দিকে তাকিয়ে ভয়ে আর্তচিৎকৃত অনুভূতিতে ঠাঁই নিলেও আরও কিছু মানুষ ঐ দেখা যায় বাঁশি বাজায়, খেলা করে সাপ নিয়ে।

হলুদ শর্ষে ক্ষেতের পাশে কাঁটাতার অনেকদিন ঠাইনড়া হয়ে থেকে মানানসই হয়ে গেছে। এপার ওপারর মানুষজন দিব্যি ম্যানেজ করে ফেলেছে।
সিস্টেম হয়ে গেলে, ডাক পড়লে কাঁটার বেড়া টপ্কে দিব্যি হাজিরা দিয়ে আবার যথাস্থানে এসে মুখ লুকানো যায়। কোনো ভাষ্য থাকে না Ñ থাকে না কোনো অপ্রকাশ্য।

এখানে কিশোরীদের হৃদয়ে ভালোবাসা দুলে উঠলে উতলা বাতাসে শাড়ির আঁচল লুটিয়ে বধুটির মতো শুয়ে থাকে পাশে নিয়ে উষ্ণ উনুন।
কাঁটাতার বিভাজক হয়ে চোখ রাঙালেও কখনো কখনো কমনীয় কাঁটার আঘাতে বড়ো মধুর খেলা তখন আর পেটের শত্রু বলে বোধ হয় না। যেন বাগানে, ফুলের বনে ঘেরাটোপ।

এখন – তখন, কাঁটাতার খুনসুঁটি করার জন্য দাঁড়িয়ে আছে; এপাশে লোকালয়, ওপারে বেশ্যালয় ঠমকে গমকে জাতপাত ছাড়া আনন্দধ্বনি মন নাচায়, রক্তে চেচায়।

সব মাংসের স্বাদ এক Ñমুরগি-মাটন যেমন তেমন, আর…
বড় মাছটা, কচি মুরগি কিংবা সবুজ আনাজের কদর সবখানে; হাটের দিন লোক পারাবার।
মাখনের মতো নরম; যত খাও, তত চাও। চুলোয় হাড়ি চড়ালে রান্নার মম সুগন্ধি কাঁটাতারের বেড়া মানে না, টপকে চলে যায় দিগি¦দিক। জিহ্বায় লালা ঝরে খাই খাই ভাব এমনই প্রবল যে, পুরো শরীরটা উদোর তখন : বাসনার সেরা বাসা রসনায়। রসনায় চাই বাসনা। নারী ভোজন আয়োজনে কমতি দেখা যায় না এপার ওপার কোথায়ও।
আহার ব্যঞ্জনে নারীর স্পর্শ যেমন, তেমনি নারীও স্বাদে-ঘ্রাণে ইন্দ্রিয় সুখের তুঙ্গে।

কামনার শিখা একই রঙে রঙিন; মধুর রসে অঙ্গ হয় সিক্ত।
কাঁটাতা মানে না, কোনো বেড়া দিয়ে আলাদা করে রাখা যেতে পারে না এপারে ওপারে প্রাণ সঞ্চার যথা ডিম্বানুকে আক্রমণ করে শুক্রাণুর জয়। শুক্রাণুর তেজ ডিম্বানুকে গলিয়ে দেয় – মিশে যায় মাথার দিক্কার অংশটা ডিম্বানুর সঙ্গে।

খসে পড়ে লেজের দিকটা। খসে পড়ে যেন কাটা লেজ মাটিতে তড়পায়।
লেজ খসে গিয়ে কিলবিল করছে, কিলবিল অন্যদিকে নতুন করে শুক্রাণু যেন প্রবেশ না করতে পারে তাই সপাটে বন্ধ হয়ে যায় কপাট। একক তাই বৃদ্ধি প্রাপ্তি ও অত:পর পরিণতি।

এপারে ওপারে কোনে দিকেই এই যে গাদাগাদা মানুষের ভরপুর ঘরবাড়ি, হাট-বাজার সবকিছু – সেখানে এক কোষী প্রাণি যেমন তেমনি নিজে নিজেই বংশ বিস্তার করার ঘটনা নাই।

সাঁঝের মায়া শেষে রাত্রি গভীরতর হলে অন্ধকার কিংবা চাঁদের কাঁচা আলো জারী থাকালেও কোনো নড়াচড়া চোখে ধরা না দিলেও মানুষের কণ্ঠ শোনা যায়; ফিসফিসিয়ে অনেকে কথা বলছে কোথাও যেন, হিসহিস শব্দে ঘন শ্বাস ফেলছে – কানে আসছে মানুষের পদশব্দ – তবুও মাথার উপর চাঁদ ও মেঘের লুকোচুরি কিংবা অনন্তমুখী শূন্যতা সত্ত্বেও নিকষ কালো বাদেও আলোর ছটফটানির দেখা মিললেও বৃক্ষ ও পাতাবাহারের ছায়াচ্ছন্নতার ভেতর কোন দৃশ্য নাই যেখানে মানুষের দেহ ও আকার, বহন ও চলাচল উপস্থিত।
দৃশ্যের পর দৃশ্য, শব্দ ও ধ্বনি ছাড়া কোন উৎস নাই।
চাঁদ ডুবে গেলে কিংবা মসজিদের মিনার চূড়ায় চাঁদ জেগে উঠলে ফিসফিসানি ও পদধ্বনির গতি ও ঘনত্ব আরও আরো আরো জীবন্ত হয়ে ওঠে। দূর থেকে শোনা মাত্র মনে হয় কাছাকাছি।

সেই যুদ্ধকালে কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা ছিল না দুই পারের নিজ নিজ জায়গা জমিন উঠোন বৃক্ষ ও ফসলের মাঠ।
আজরাইল দাঁত খিচিয়ে নেমে পড়লে অজস্র মানুষ বাঁচবে বলে, পাক রাক্ষসদের কাছ হতে রক্ষা পেতে ওপারে যায়, ঠাঁই নেয় দলে দলে। প্রাণ বাঁচাতে আস্তানা গাড়ে পালিয়ে আসা মানুষের দল।
মৃত্যু সেখানেও হানা দেয়। দু’মুঠো খেতে পায় না বলে ঘোমটা দেয়া কিংবা আঁচলে ঢাকা মেয়েটি ঢাকনা খুলে ব্যয় বুঝে আয় করতে নেমে পড়ে। নারী জনম সার্থক হয়ে উঠেছিল চোখের সামনে।
বিন্দু মাসী তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যে, নিজের গতর আর না খাটিয়ে বসা দু’একজন বাবু বাদে অন্যদের জন্য বিপুল সংখ্যক নানা বয়সী নারী শরীরের পসরা বসাবে। নারী দেহ সুলভ ছিল, বেশি মূলধন লাগে নাই বিন্দু মাসীর। অচিরেই নতুন স্বাদে নানা বয়সী নারী দেহের ঠিকানা বানিয়ে পতঙ্গের মতো টেনে আনলো। জমে গেল মাসীর মাংসের কারবার।

দিন গেল। মাংসের দর আগে যা ছিল তা আরো বৃদ্ধি হলেও মাংসের কোয়ালিটি পড়ে গেছে। গড়পরতা মাংসের স্তুপ পেরিয়ে কখনো কখনো সতেজ সবুজ ভরপুর স্বাস্থ্যময় মাংসের আঁশ – কামনা উস্কে দিতে; মন্থনের আস্বাদে শরীর মন জুড়িয়ে দিতে কোনো তুলনা হয় না এমন সব ত্বকের নিচে রগরগে মাংস কামনার অংশ হয়ে কামরাঙ্গায়িত চটচটে আঁধার গেঁথে ফেলে তারকাঁটার সর্পিল বিভাজনের এপার ওপার কোথাও টাকাকড়ির জন্য কোনো দেশ হয় না যেন; সব একাকার। টাকার কোন দেশ নাই – কোনো জন্মভূমি নাই।
বিনিময়ের ভাষা এখানে কেবল ১০০/১০/১০০০/৫০০ এমন যে কোনো সংখ্যা বিশিষ্ট অংক ভাষা। এই সংখ্যায়ই ভাবের আদান-প্রদান হয়। নকল টাকা দাঁত বের করে কামড় দিলেও দুই তরফের দুই ধরনের টাকার গায়ে খোদিত প্রতীক, সংকেত, অক্ষর, রঙবেরঙ ছাপাঙ্কিত খসখসে অনুভূতিতে কোনো পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায় না, বিনিময় হার বলেও অর্থনীতির সূত্র মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে।

অপর দেশ কি নিজের দেশ – যে কাঁটাতার চারপাশের পৃথক রাষ্ট্রময় লোকালয়, বাণিজ্যালয়, পতিতালয় মুদ্রা-পণ্যের বিনিময় সরলরৈখিক ও উদার। ফেল কড়ি মাখো তেল। কিনে নাও আর বেচে দাও – তাই কিনতে কিনতে – বেঁচতে বেঁচতে টাকা রূপি টাকা বিভাজন ভুলে একাট্টা।
এপারে ওপারে যে নদী – বহমান, তা একই সুরে গান করে। পাখিদের কলকাকলীর মধ্যে যে বিস্তার, তাতে ভিন্নতা কানে বাজবে না কান্না ও হাসি, শুরু ও শেষ হয় একই অঙ্গে।

উৎসবের সাজসজ্জা দু’পারের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে যায় – পরস্পর হতে, পরস্পরের মধ্যে – সবসময় একই লাস্যহাস্য কর্মে বিন্দু মাসীর ঘরে নতুন প্রাণি যোগ হলে চিত্ত চাঞ্চল্য জাগে রসিক যে জন তার মধ্যে।
হৃদয়ে ধূম লাগলে কোনো সীমানা বাঁধা হয়ে পারে না।
শরাফত মিয়ার বউ বকুল বিবি কিংবা ওপারের তরফদারের গিন্নি কাকলী টের পায়, কিন্তু ’রা করতে পারে না, কেবল দেখে যায় সাহেব আর বাবুরা কেমন আহলাদিতভাবে মিষ্টি মিষ্টি কথা টকটকাটক করে বলে চলেছে – সোহাগ তাদের উথলে ওঠে বাঁধা পড়া বউবেটিদের জন্য। যেন পটাচ্ছে – কিন্তু সাজছে, চুলে কলপ, পালিশ করা জুতো আর উর্দ্ধাঙ্গে রঙিন পোশাকের নিপাট ভাব চক্কর – ঠিক ঠিক বোঝা যায় নাগর চলেছে মধুচক্রে।
বলার চেয়েও বুঝতে পারে, মুখ বুজে নগদ আদরটুকু চেটেপুটে নিয়ে কোনো আবদার থাকলে তা পূরণের প্রতিশ্রুতি আদায় করে দীর্ঘশ্বাসের ভেতর কিছুটা খোলা হাওয়া হাতড়ে নেয়।
কচি নতুন চালান এসে বিন্দু মাসীর ঘরে দারুনভাবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা মাপতে মাপতে ঠিক-ঠাক অনুভব করে।

মাগীপাড়ায় নতুন মাগীর আবির্ভাব যে হয়েছে আর সাহেব-বাবুরা সেখানে গিয়ে দোল খাবে তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকে না। মাগীপাড়ায় নতুন মাগী আসতেই নড়েচড়ে ওঠে বেশি বেশি করে সেই সব হাবড়ার দল লেবেঞ্চুশ খাওয়ার মতো সময়টা উদযাপন করার জন্য পতœীকে মনে হয় পেতœীর মতো।
কাঠি লজেন্স খাওয়ার স্বাদ আলাদা; এখন শুধু ঢাকনা দেয়া একগাদা চিনির গোল্লা দেখলে গা গুলিয়ে বমি বমি লাগে।
বুড়া মুরগির হাড় মাংস কেমন ঘ্যাশঘ্যাশে কটাশমটাশ Ñ তার চেয়ে কচি মুরগি চিবিয়ে চুষে কুট্টুস কুট্টুস করে কামড়ে কামড়ে সুরুৎ সুরুৎ ঝোল খেতে সদ্য গোঁফ ওঠার সেই যৌবনের নতুন চুমকুড়ির সময় মাস্টারবেশানের যে দারুন মজা ছিল তা আবার ফিরে ফিরে আসে।
রুস্তম শেখকে এবার মজাতে পারে না। থতমত খেয়ে আছে সে। কানে কানে খবর এসেছে বিন্দু খান্কিটা একটা কচি মাল এনে ফেলেছে।
যে ভালো টাকা খসাতে পারবে তার জন্য অপেক্ষা ধূয়া ওঠা মাংস ও সুরুয়া।
টাটকা যোনীর আহ্বান উপেক্ষা করতে হলো রুস্তম শেখকে। গেলবার কুলসুম নামের কচি ছেমড়িটা এপার থেকে চালান হয়ে বিক্রি হয়েছিল মাসীর কাছে। রুস্তম শেখ ফুটিফুটি করে ওঠা মেয়েটার শরীরকে প্রবল চাপে ভচ্কে দিয়েছিল। শেখের পো’র মুখ দিয়ে লালা ঝরছিল, লালা ফেলতে ফেলতে সে কুকুর হয়ে গিয়েছিল।
মনের মধ্যে – রক্তপাতের স্মৃতি রেখায়িত হলো তার। রতির আঠা আরো ঘন করেছিল রক্তস্রোত।
যত প্রকার স্মৃতিময় এবং তাতে প্রকোপিত হোক না কেন, তার মধ্যে এক অন্য অনুভূতি যোনির মায়ায় আর আবিষ্ট করে না, রথের ঘোড়ার মতো যায় না টগবগিয়ে।
না, কাঁটাতার সব সময় বেড়া নয়, বরং গোলাপ ফুলের কাঁটার মতো – আঁচড়ে দিলেও গোলাপি আভা, গোলাপজল ও সুরভি রীতিমত মন ভোলাতে প্রাণ দোলাতে শুভাশীষ অশেষ করে দান।

কখনো কখনো গুলির শব্দ।
এই শব্দ, পরপর হয়
থেমে থেমে গর্জে ওঠে সীসায় ধাসা অস্ত্র
বারুদের গন্ধ বাতাসে মিশে থাকে। হয়তো আর্তনাদ উঠেছিল – ঢাকা পড়ে যায় হরেক শব্দের ঝংকারে।
জাতিসংঘ বলে, মৃত্যু পছন্দ করে না।
কান্তির কবুতর তবু ওড়ে না। ডানা ভাঙা পাখি থুবড়ে পড়ে থাকে জমিনে।
ভয়-ভীতি হাত-পা ছড়িয়ে বেষ্টন করে রাখে। একটা হীম শীতল সাপ অস্তিত্ব ঘোষণা করে সরসর করে ভয়ার্ত বাষ্প ছড়িয়ে চলতে থাকে।
ভয়ের পর বিষণœতা উড়ে উড়ে কাঁদে। বিষণœ ক্রন্দনের মধ্যে উড়– উড়– উড়–ভাব আছে।
ভীতি কাঁটলে হারানো জনের জন্য কান্না আর কান্নার ভেতর দিয়ে বুক হাল্কা করার, সান্তনা খুঁজে নেবার অশেষ সমর্পণ।
এক অদ্ভুত গভীর বিষন্ন সজল খ–বিখ- শোকাচ্ছন্ন বিষণœ বিরহী মুখ জলে। ছবি তোলে; বাতাসের কাঁপনে ভেসে চলে ভেসে চলে বিষণ্ন বিষণ্নতা
বিপন্ন, বিপন্নতা
রিক্ত, রিক্ততা –
আবার সহসা গুলির শব্দ পর্যন্ত। এইভাবে চেনা-অজানার দ্বন্দ্বে-ছন্দে দ্বি-ভাজিত এই জনপদ জেগে থাকে। ওপরে আকাশ – কালবেলায় রং বদলায়; মেঘ ছায়া দেয়, বৃষ্টি দেয়, আবার মোদের আড়াল শুছে না গেলে রোদে ভিজে প্রান্তর।
সরে গেলে আর বেঁচে থাকে না যারা, তাদের জন্য বিচ্ছেদও সময়কালে মিলিয়ে যায়; কেউ মেশে মাটিতে আবার কেউ ধূয়াঁ হয়ে আকাশে – তখন মন বিকল করা প্রহর নামে, তাপ-উত্তাপ ছাড়া স্বজনদের হৃদয়ে তখন আর কোনো অনুভূতি নাই; ভোঁতা অস্ত্রের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত থাকে।
রক্ত ঝরলেও – রক্ত বইলেও, ঝিমুনির ভেতর তলিয়ে যাওয়া শুরু কিংবা শেষ হয় কেবল। দু:খ দিনের প্রহরী আবার জাগে যখন ঘণ্টা বাজিয়ে বিদায় নেয় ব্যথা ও বিরহ।
আকাশে চাঁদ ভাসমান হয়।
স্বপ্নের রং বৃষ্টির মতো নামতে
থাকে, ঝরতে থাকে – বাজনা বাজে
এবং এবং তখন পুনরুত্থান।
যিনি প্রয়াত শান্তি হোক তার। ভালো থাকুক আর সকলে।
বারুদভরা বর্ষণের কীর্তি; দাগ আঁকে, দাগ মোছে প্রকৃতির স্থির চোখের সামনে উদাসী সময় বহে যায়। তারপর মানুষ আবারও হাটছে – বিশ্রাম নিচ্চে – খাচ্ছেদাচ্ছে-ঘুমাচ্ছে আর… ভেতরে, নিজের অভ্যন্তরে প্রবেশ পথ খোলা ছিল – ঢুকে পড়লো এলোমেলো বাতাস; কেঁপে উঠল রুস্তম শেখ।
রাত আরো বেশি ঠাণ্ডা হয়ে উঠছে বলে বোধ হয় তার। মধুর খেলা শেষে এবার বুঝি বিষাদ গাঁথার টানাটানি শুরু।
অন্ধকারের ভেতরে সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে ওঠা শুরু করলো সে।
বৃষ্টি নামে, সিঁড়ি ভিজলেও সাবধানী পদক্ষেপ বিপদ হতে দূরে রাখার জন্য পথ বাৎলায়। জন্ম ও মরণ এখন এই আলো-অন্ধকার। প্রেম কিংবা শিশু কিংমৃতদের মতো বৃষ্টি নামে
বৃষ্টি! বৃষ্টি!

নানা প্রকার মুখরতার ভিতর, এক ফোঁটা নীরবতার ভিতর নারীটি এই প্রকৃতি – সবুজ পাতা ও সর্ষে ফুল – নদীর স্রোত ও বাদামি নৌকা – এসব প্রকৃতিসম্বন্ধ হতে পৃথক হতে পারলো না।
সামাজিক ডাকা বাদ দিলে এখন সে নিজের নামে হারিয়ে ফেলা সত্তার মুখোমুখি হয়।
শরীরের ভেতরে এক নতুন ভূমি জেগে উঠছে। চোরাগোপ্তা মনে হয়, বলে সে যাও পাখি বলো তারে।
মাথার উপর ঝুলে আছে অন্ধকারের জাল; ফাঁক ফোঁকরও ধূসরতায় ভর্তি ফলে অখণ্ড অন্ধকার।
ফিনকি দেয় না আলো। দেশলাইয়ের কাঠি নাই যে, বারুদ পুড়িয়ে অন্ধকারকে ফাটল তৈরি করে দেবে যে, আলো আসে –
রূপহীন আলোহীন বর্ণহীন একটা আচ্ছাদিত জগৎ প্রগাঢ় শূন্যতা দেখায়।
এই অন্ধকার, ধাঁরালো ফলার মত এবং কালো আঁকা রঙের। অন্ধকারের ফলা দিয়ে কেটে কেটে, শরীরের ভেতর থোকা থোকা অনধকার হেটে চলে আসে।

থোকা থোকা অন্ধকার ঘুঙুরের মতো বাজে। একটা কষ্ট ভেতরে ধুকপুক করে – কেমন করা গন্ধ গুলিয়ে ওঠে প্রবিষ্ট অন্ধকারকে উগড়ে দিতে উদ্যত হলেই ভোঁ-চক্কর খায় মাথা; বনবন করে ঘুরপাক, তলপেট থেকে অনর্গল উদগীরিত বমি মুহূর্তে শরীরকে অবশ করে দিল।
হড়হড় করে শাদাভাত, গোলাপজল মাখা গোশত, খোসা আটকানো আলু – সব, কাদার দলার মতো জড়াজড়ি করে একাকার করে দিল সব।
বমি করতে করতে গন্ধে এখন নেশা জাগে। এই নেশার মধ্যে অবশভাব আছে। ক্রন্দনের খনন আছে। কাপুনির দমকা চাল আছে। কাঁপুনির ভতরে দুলুনি আছে – আর দুলুনির ভেতর স্মৃতির টান। তাতে আরো তীব্র হতে থাকে বমির স্রোত।
এভাবে এ প্রান্তে যখন বমির নিবেদন গেের্ভর গভীরে যে মাংসপিণ্ডের আকার তিল তিল করে আদম সুরৎ পাচ্ছে তেমনি না-শোনা কোথাও যেন আর্তনাদ তেড়ে ফুড়ে এলেও কাঁটাতারের বেড়া ডিঙ্গাতে পারলো না।

ধনুকের ফলা শরীর বিদ্ধ করলে ফোঁটা ফোঁটা যত রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে, সেই রক্তের সঙ্গে মিলিয়ে চোখ ঠিকরে রক্ত উচ্ছ্বাস যেন – অশ্র“ বিন্দুর মতো টপটপ ঝরে কান্না।

প্রবাহিত কান্না ও কদর্য চিৎকার যতটা শক্তি নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে তাতে আন্দোলিত বৃক্ষ ও পাতাবাহার সুড়সুড়ে করে এসে ধাক্কা মারে এ-পারে অজস্র বৃক্ষসারির চূড়ায় চূড়ায়। আতঙ্কে মগডালে পাখি ডানা ঝাপ্টায়। কাক ডাকে।
বমির প্রকোপে মাংসপেশী, অন্ত্র-তন্ত্র যারপর নাই এমন বেদমভাবে হাসে যে, শরীর করে ছটফট।

দু’টো নারী; ছায়া একটা। বিষম বাগিনী একটা। চিতার আগুন ও কবরের অন্ধকার – সীমা পার হয়ে – অন্ধকর দিয়ে তৈরি আগুনের মন্থন।

শরীর পোড়ে আগুনে। আগুন দেখে না বটে। আঁচ এসে গায়ে লাগছে রুস্তত শেখের। চেতনা রহিত হয়ে মুর্চ্ছা গেলে উপায় হতো তার। খাঁজ নাই, কোনো বাঁক নাই সামনে। যমন তেমন চাঁদ উঠলে শরীর হিম হয়ে এলো – পরি নেমে আসছে এখন। পরি নামলো, পেত্নী নামলো; পেত্নী ঘোমটা টানলে ঝুপ করে অন্ধকার। নিজের ভেতরে দোলাচাল। স্বপ্ন অথবা পতন; ঘড়ির কাটার মতো – আবার, উল্টো দিকে চলন্ত কাটা – একই সময় জুড়ে দুলতে দুলতে ঘন আবেশে জড়িয়ে থাকলে।
অর্ঘ্য সাজিয়ে এখন আর কোনো নারী নাই। ঘরে-বাইরে নারীর উষ্ণতা বাসী স্মৃতি।

রতি আছেদ আকাঙ্খা জাগছে কেবলই – কিন্তু, প্রস্তুত নাই মাংসের শরীর – শরীর জুড়ে জট পাকিয়েছে তারকাটার ¯িপ্রং। লাজুকতা ভেঙ্গে গেছে কবে, আরেক রাত্রিতে – ঘর জুড়ে যে ছিল, তার শরীর উপুর করলে কুসুম কুসুম তাপ করোটির ভেতরে প্লাবিত করেছিল।
মাংসের স্বাদ ও ঘ্রাণ, লালা জড়িয়ে নেকড়েকে প্রশান্ত করেছিল অরণ্য যেখানে নিবিড় হয়ে ছিল।

তৃষ্ণার জলের জন্য পায়ে পায়ে চলেছিল ভাঙতে থাকা নদীল কিনারায়, তলিয়ে যায়নি তখনও শেষ ঘরটি। নদীর পানি ছলাৎ ছলাৎ করে যাচ্ছিল। তৃষ্ণার চাবুক ছিটকে ফেললো নদীর গায়ে যেখানে ফঁসে উঠছিল তৃষ্ণার জল।

এছাড়াও, নক্ষত্রের রূপালি আগুন ভরা রাত ছিল আরেকদিন; বাতাসে ছিল ফুলের সৌরভ। তরতাজা বৃক্ষের শরীরে ঝুলন্ত সুপক্ক ডালিম বিদীর্ণ হয়ে সম্মুখে যেন অঙ্গরাগ, তাকে আসমানী টান উত্থিত করলো।
এমন রাতেও পরি নামলো। তখন ইশারা।
এবং ইশারা কামনা বটে।
তাড়িত হলো সে। ধাবিত করলো তাকে টগবগে রতির দাবী। শরীর ম্যাপী তাপ শীর্ষবিন্দুতে ঘনীভূত হলে মিলেমিশে একাকার হয়েছিল উচ্ছ্বাসিত টকটকে লালরসের সঙ্গে, অঙ্গে অঙ্গে অন্তরঙ্গে।
ডালিমের রস গড়ায় বীজের দিকে।

কাঁটাতারের বেড়া ভেদাভেদ তৈরিতে যথেচ্ছ ব্যবহৃত হলেও দু’পারের মানুষ জানে জমিন ও নারী হচ্ছে শস্যপূর্ণা। অন্নপূন্নাকে প্রণাম করে নির্বিশেষে সকলে।

রুস্তম শেখ আকাশ এবং পাতালে আঁকা ছবির মতো নদীর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে; টলমল জলে নদীর শরীরে মুখচ্ছবি একটা এবং সুনীল আকাশে অপর মুখশ্রী ধর্মাবলম্বনহীনভাবে ভেসে থাকে।
বৃক্ষের পাতা নড়ে দীর্ঘশ্বাসে।
রুস্তম শেখ দাপুটে মানুষ। হাকডাক ও তার বাজখাই আওয়অজ মেঘের গর্জনের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে। সে, ডাক দিল, তো, গর্জন ক রলো যেন আকাশের মেঘ। প্রতাপ ও প্রতিপত্তি হঠাৎ নিদারুন এক পরিস্থিতিতে নিরুপায় সঙ্গতি বলে অনুভূত হচ্ছে।

অনেকানেক অতিক্রান্ত বিপণœ সময়ের চেয়ে এবার সে মুখোমুখি আরও বেশি অস্থিরতার। ছটফট করে সে, এমনই এক ফাঁদে আটকে যাচ্ছে যে নিস্তার পেতে কোনো পথের আলো জ্বলছে না তার আশেপাশে।
মিথুন কালে এমন ভাবনা কী গ্রাস করেছিল যে, কখনো ঝড় উঠবে।
ঝড়ো বাতাসে পূর্ণিমা রাত কিংবা নিকষ রাত্রির কোনো না কোনো প্রহরে দেশ ও মাটি ভুলে, হিতাহিত দিগি¦দিক শূন্য চিত্তে সে তেজ ও বিদ্যুৎ উপুর করে ঢেলে দিয়ে ছিল।

শিৎকার তার প্রিয় শব্দ। এবং সে বিফল হয় নাই; মাংস রক্তময় জীবন নিয়ে খেলাধুলা, ফূর্তি, উল্লাসর পরেও মুষড়ে ফেললো। কোথাও কারো চোখ টাটাচেছ বলেই তড়পানি থেকে ধরপানি। রুস্তম শেখ নিজেকে বিপতœীক বলে যতবার বর্ণনা করেছে, আড়ালে আবডালে লোক মুখে ফিসফিসিয়ে শোনা গেছে অন্য কথা।

লোকের জিহ্বা আঠা দিয়ে আটকে রাখা যায় না। জিহ্বা ওদের লকলক করে, খারাপ কথা বলতে জিহ্বা চুলকা রুস্তম শেখ তলে তলে বিবাহ করেছে এ কথা প্রচারিত। গৃহকর্ম, পশুপালন ও ক্ষেতে নিড়ানির কাজে নিয়োজিত রমনীদের দেহ সৌষ্ঠব বেশ আটোসাটো। চিকন মেদ ছাড়া বাড়তি কিছু শরীরে আছে বলে মনে হয় না।

লোকমুখে প্রচারিত যে, সংসার কর্ম ও সং ধর্ম দু’টো বেশ জড়িয়ে আছে।
বরং সংসারের বোঝা ঠেলতে, ক্ষেতে কি গোয়ালঘরে মজুর খাটাতে জনপ্রতি খরচে চেয়ে এখানে সাশ্রয় বেশি। গুপ্ত সুখ হতে শুরু এবং অন্যান্য সুখের উচ্ছ্বাস এখানে নিহিত।

মন্দ লোকেরা বাড়তি কথা বলে, যে, টইটুম্বুর একেক প্রকার শরীর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আশ্লেষে স্বাদ বদলের গুণে সে আরও নবীন ও কৌণিক হয়ে উঠেছে। একেকটি পরিতৃপ্ত সংগম তাকে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। যখনই থমকে যায়, মনে হয়, একই পঞ্জিকার পাতা উল্টাচ্ছে, নতুন কোনো সম্ভাবনা অথবা কোনো ঘোষণা দেয়ার ক্ষেত্র নাই তখন নতুনের আগমন।

চক্রাকারে পরিবর্তমান রুস্তম শেখের জীবন প্রণালী যে অনেক দন্তহীন মানুষের শোচনার বিবিধ কারণ তা বেশ বোঝা যেত শব্দবানের মধ্য দিয়ে আক্রোশ ও ক্ষোভ জাহির করতে করতে আরো হিংস্র হয়ে উঠত এই মানুষগুলো যখন; ফলে তাদের মনোবেদনা গোপন থাকত না।

রুস্তম শেখের একবার কী হলো – এতসব প্যাঁচাল তাকে এক ঘেয়ে করে ফেলল – শফিকের বাপকে হাতের কাছে পেয়ে গেল একদিন – লোকটা, তার সম্পর্কে কু কথা রটায় কিন্তু রুস্তমকে দেখে সজোরে সালাম দিল, মনের ভিতর ঘাবড়ে গিয়েছিল কিনা জানা হয় না – রুস্তম শেখের পায়ের জুতা হাতে উঠে এল – তারপর জুতা পেটা।
জুতাপেটা করা হয়েছে, এমনভাবে, সে খবরটা ছড়িয়ে গেল।
শফিকের বাপের পিঠে দগদগে জুতার ছাপ মানুষের মুখে মোহর মেরে দিল যেন।
জুতার ভাষাটা লোকেরা ভালো করে বুঝে গেল।
কিন্তু, এখন, এবার কি করবে সে – যে তাতে আরেক ভীতি উৎপাদক ভাবার জন্ম নিবে এবং এপার-ওপার সবখানে সবাই খামোশ মেরে যাবে।

সবসময় ভাষা কাজ করে না; কখনো জোরাতালি দিয়ে মেলাতে হয়; এতক্ষণে সে দিশা পেল, অপেক্ষা করতে লাগলো সময়ের জন্য। এবং সে আরও অনুভব করছে অনন্তকালের ব্যাপার নয় কিংবা অকস্মাৎ ঘটবে এমনও নয় – ঘড়িতে বাঁধা সময়ের মতো বিষ্ফোরণকে বন্দি করে ফেলতে হবে যখনই উপস্থিত।

দাড়ি-গোঁফ কামাতে শুরু করার পর কয়েক বছরের মধ্যে বিয়ে করেছিল রুস্তম শেখ। সে কোনো অরিজিনাল শেখ নয়। স্বাধীনের বৎসরে শেখের নামে জয়ধ্বনি যখন চলছিল তাতে আর দেরি না করে রুস্তমের পিতাজি ছেলের নামের সঙ্গে শেখ জুড়ে দিয়ে – ভবিষ্যতে ছেলে যে তার এমনই নামডাকের অধিকারী হবে নিশ্চিত এই খুশিতে বিভোর হয়েছিল।

ছেলে আজ নামডাক পেয়েছে তবে ত্যারাব্যাকা।
পিতাজির মুখ ফ্লরসেন্টের মতো বাতির এক ওয়াট উজ্জ্বলতায় বিচ্ছুরিত দ্যুতিময় হলো কিনা তা কবরে নেমে দেখা যায় না বলে খবরাখবর ধূসর ও ঝাপসা রয়ে গেল
চারিদিক ধূসর বলে ধূসরতা নতুন কোনো রূপ বদল করে না; মলিনতাকে কতখানি টেনে নামাতে পারলো ধূসরতার উৎপাত Ñ তা নির্ণয়ের বাইরে রয়ে গেল।

রুস্তম শেখ বিয়ে করেছিল Ñ প্রথম বলে দাবি করা যেতে পারে Ñ ১৩৭৮ বঙ্গাব্দের শেষ প্রান্তে কোনো এক কার্তিক মাসে। মরা কার্তিক তখন।
বছর না ঘুরতেই বউয়ের পেট স্পষ্ট হয়ে উঠলো। পেটে বাচ্চা আসতেই বউয়ের আকৃতিতে পরিবর্তন সে তখন দু’চোখ ভ’রে দেখতো।
যুদ্ধ শেষে দেশের চালচলনও দেখার মতো ছিল তখন। পেট বাঁধানোর পর অনতিবিলম্বে বউয়ের সঙ্গে ক্রিয়াকলাপে বিধিনিষেধ আরোপ হলে রুস্তমের মন তো মানে না। শিশ্ন নিয়ে ভারি বেকায়দা তার। শরীরের ভেতর যে উষ্ণতা জাগতো, তা দমাতে মনের ওপর জোর খাটাতে হলো তাকে। তখনই বিন্দু মাসী ডেড়ার সংবাদ না কিন্তু মীনা কুমারীর এক আখড়ার খবর এলো, যেখানে কাঁচা মাংস সুলভে আস্বাদ করার জন্য মজুদ থাকত। সুড়ঙ্গ পথতো ছিল না, তবু ছিল অবারিত পথ – বুদ্ধিনাশ হলে যা হয়, তখন বেড়ার বালাই ছিল না কোনো – এপার হতে কেরোসিন পাচার হতো দিব্যি – সেও ওপারে রথ দেখা ও কলা বেচার মত দারুন কর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ল। কাঁচা পয়সা আর কাঁচা মাংসের স্বাদই আলাদা।

বলতে দ্বিধা নাই, যে সব আমদানী ছিল তখন তা আর লভ্য নয় এখন। আগে প্রেমে পড়ার মতো নারী জুটতো। সব দিত সব যেমন ইচ্ছা তেমনি রকম। সে রকম মাংস স্মৃতির। এখন আর অমন পাওয়া যায় না। পয়সা নিতে যতটা আগ্রহ, বিনিময়ে মাপা কাজ; সামান পরিমাণ এড়ে না; বোনাস বা ডিসকাউন্ট নাই। ফেল কড়ি মাখো তেল।

এইডস বা ইবোলা জাতীয় অসুখ বিসুখ ছিল এ কেবল মধুক্ষরা ছাড়া আর কিছু ছিল না। কনডম বিনাকা জটিল বৈকল্য দূরে থাকুক, কোনো প্রকার শিশ্ন বিঘ্ন ঘটতে দেখা যায়নি। ভেতরে প্রবেশ ও বিচ্ছুরণ অজস্র তোপধ্বনির মতো ফেটে পড়া হাত চলে স্থান বিশেষে – একবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো, মনের ব্যথা জড়ালো না বরং তুষের মধ্য হতে আগুন ছড়ালো। সব-ই ঘটলো ভাবতে ভাবতে মীনা কুমারীর পর সরলা দাসী হতে বিন্দু মাসী পর্যন্ত বিস্তর প্রাপ্তি তার। তবে, যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ – এই কথার পরেও ভালো-মন্দের শেষ গন্তব্য বলেও কিছু নাই। কোথাও নাই শুরুর শেষ অথবা শেষ – আরেকটা শুরু করবার জন্য।

তবে এপার ওপার যাত্রা সব সময় অনায়াস হয় নাই। কুরবানী ঈদের সময় যত সহজে পৌঁছানো মাংসের দোকানে Ñ তখন দোরসে চলে; আবার ওপারে ভোট হলে কিংবা কোথাও কোথাও বোমা পড়লে কিংবা কোনো নেতা নেত্রী বেঘোরে প্রাণ হারালে সীমানা জুড়ে ভোল এমনই পাল্টায় যে বুদ্ধিনাশ হলেও যমের দরোজা পার হতে স্বাদ জাগতো না। উত্থান পর্ব বিফলে মাথা কুটে মরতো। শরীরের মধ্যে চুমকুড়ি জাগলেও গোত্তা খেয়ে নিজের অঙ্গ শোভা দেখা ছাড়া পথ ছিল না কোনো।
মানুষ সুলভ, খাদ্য দুর্লভ একটা সময় তখন চলছিল। পুরুষ মানুষরা শহরে ভাগছিল। কাজকর্ম জুটাতে শহর দুয়ার খুলে আয় আয় করে ডাকছে।
শহরে যেতে থাকে মানুষগুলি, তারপর বহু সময় লা-পাত্তা। খাবারের জন্য পশু-মানুষ একাকার।

রুস্তম শেখ হরবোল দিতে জানতো Ñ আর যে কোনো বাড়তি অভিজ্ঞতার তো ফায়দা থাকে।
কামাবেগ জাগলে যে ডাক দিত Ñ আহ্বানের সময় আরেক ডাক Ñ নারীকে মুঠো ভাতের লোভ দেখিয়ে পটিয়ে Ñ সময় মতো রাত্রি গভীর হলে ডাক ছেড়ে ঘর বাইর করার ডাক আরো মনোরম। ডাকের সঙ্গে সঙ্গে ম্যাজিকের মতো সে রূপান্তরিত হতো অন্যান্য জন্তুতে।
ডাকের ভেতর কখনো কোমল স্বর, কখনো কর্কশ স্বরক্ষেপের মধ্য দিয়ে তার মনের রং প্রকাশ হতো। নিজে তা উপভোগ করত; কিন্তু ফাঁস হতে গেলে ডুপ্লিকেট বেরিয়ে পড়তে পারে এমন একটি শংকা তার মনের ভেতরে জংকার মতো বাজতো।

বর্ডারে যে বোল ছুড়তো Ñ তাতে যে প্রাণিটির চিত্র ডাক শোনার পর মনে করতে পারত লোকজন তা একটু অন্যরকম, অন্যমাত্রা।
এক ডাক বারবার ব্যবহার করতো না। আবার ডাকের চরিত্র বদল জানানো না থাকলে আসল উদ্দেশ্য মার খেয়ে যেত Ñ কারণ বিশেষ ডাক শুনতে পেলে পাইক-সেপাইরা সজাগ প্রহরার ভেতর আকষ্মিক উদারতা নির্ভর হয়ে পড়তো বলে কাজ হাসিল সুগম হতো।

গরু চড়িয়ে নিয়ে যাওয়া আর ঠিক তেমনি নারীর দলকে ফোঁস ফোঁস করতে করতে নিয়ে যাওয়ার মধ্যে শিহরণ একই রকম খেলা করত।
চালান আসতো অনেক এলাকা ভেঙ্গে। সে যা পকেটস্থ করতো তা এক সময় সংসারে খরচ করার প্রয়োজনীয় মুক্ত হয়ে গেলে সে এইখাতে উপার্জন যথা খাতে বিপুল ব্যবহার করা আরম্ভ করেছিল।

বিন্দুর মওজুদ ভরপুর করতে রুস্তম শেখের অবদান মানতে হবে।
সে সাপ্লায়ারও যেমন ছিল তেমনি আবার সিরিয়াল ফায়ার করত।
গৃহপালিত পশুর মাংসের মধ্যে যে পেলবতা, অনায়স, সুস্বাদ ভরপুর থাকত তেমনি গার্হস্থ্য আঙিনা থেকে তুলে আনা এইসব মেয়ে মানুষ হাত দেয়া মাত্র গলে গলে যেত। ভেতরে প্রবেশ কখনো ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে ফেলত।
আর মহাসুখে স্বর্গাতপে বিভোর হয়ে এতটা বিগলিত তখন হয়ে পড়ত যে, মুখে আতিশয্যে এক ধরনের ঘোৎ ঘোৎ শব্দ মুড়িয়ে শরীর শিথিল হতে হতে একেবার বিলীন হয়ে পড়তো; শুয়োর ঘোৎ ঘোৎ করে আর বিবস্ত্র দলিল মথিত নারীদেহ আতঙ্কে যখন কম্পমান Ñ তখন কেউ যেন ঘুম আনতে দোল দোল দুলুনি দিয়ে চলে Ñ শুয়োর হয়েও শান্তি নামে রুস্তমের কেশ শীর্ষ হতে শিশ্ন অবশেষে পর্যন্ত।
তো, মরা কার্তিকে বিয়ের বাজা বাজানোর ফল কীনা কে বলতে পারবে Ñ জুলেখা প্রসব করেছিল এক মরা কাকের বাচ্চা।
সন্তানের সঙ্গে যোনিপথে আপদ-বিপদ বেরিয়ে পড়ে Ñ তাতে অকল্যাণ নিহিত থাকে বলে, সন্তান প্রসবের আগে আগে আকাশ বাতাস ফাটিয়ে চিৎকার মারা শুরু করতেই ঠাঁই মেলে গোয়াল ঘরের পাশেই দড়মার বেড়া দিয়ে কেবল দু’পাশ ঘিরে নতুন এক জানালা নাই, আলো নাই, বিছানা নাই এমনই এই এক ঘর Ñ যেখানে সময় এসে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকে।

গোয়ালঘরের মধ্যে গাভি ছিল। পাল দিয়ে নিয়ে আসার পর গর্ভিনী তার প্রসব মুহূর্তের জন্য অপেক্ষারত।
তীব্র রবে গাভিটি থেমে থেমে ভরাট করছে শূন্যতা।
সেই গর্ভ ফুঁড়ে। সেই আর্তনাদে।

করিমন বিবি সাফ জানিয়ে দিয়েছিল তার বউয়ের পেটে দাপাচ্ছে যে বাচ্চা Ñ তা ছেলে না হয়ে যায় না; মায়ের পেটে উল্টাপুল্টা ঘূর্ণ খেতে-খেতে, পদাঘাত কী মুষ্ঠাঘাতে, মায়ের শরীর দুমড়ে মুচড়ে কুঁকড়ে দিয়ে চলেছে Ñ ডাক ছাড়ছে, তাতে এই রাত নামার পর চারপাশে গাছগাছালির শাখা-প্রশাখায় ঘুমাতে থাকা, জড়ো হওয়া পাখ-পাখালি চিল চিৎকারে উড়ে যেতে থাক Ñ ডানা ঝাপ্টাতে, ঝাপ্টাতে সব মিলিয়ে এক বেদম পরিস্থিতি।

করিমন বিবি সন্তান জন্মের সময় হাজিরা দিয়ে পেট থেকে বাচ্চা খালাশ করতে নামডাক অর্জন করেছে Ñ এমনও হয়েছে, বাপের পর ছেলের পর পুতের পোলাপান মাতৃজঠর থেকে অবমুক্ত করেছে সে। মৃত্যুহার নিয়ে তেমন কোনো তথ্য না পাওয়া গেলেও এখনও অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় মডার্ণ সুযোগ-সুবিধা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে করিমন বিবিকে ডাকা হচ্ছে।
মন্দলোকেরা নানা কুকথা রটায়। কেউ বলে, বাচ্চা টেনে বের করার জন্য মায়ের পেটে পা দিয়ে এ্যায়সা দাবানি দেয় যে, পেট খুলে নাড়িনক্ষত্র ছিঁড়ে বাচ্চা পৃথিবীতে হাজির হয় Ñ কিন্তু রটনা এই যে, বাচ্চা এক চোটে না বেরুলে কখনো জন্মদ্বারে অর্ধেক আটকে গেলে নরম তুলতুলে শরীর ছ্যাড়াব্যাড়া হয়ে নির্গত হলে মানুষ না অন্য কিছু এই যে, সদ্য ভূমিষ্ঠ অত:পর, ঠাহর করা যায় না তখন। আলাই বালাই ষাট হয়েছে করিমন বিবি মরা কান্না ছাড়ে Ñ পাড়া মাত্ হয়ে যায় তখন। গৃহস্থ বেকুবের মতো কখনো শায়িত, কখনো দাঁড়ানো কিংবা মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে বসে থাকে; সকলের কান্না ও বিলাপ, শোক ও মাতম একত্রে ধারণ করে কাঁদে করিমন।

সমাধিপিঠ দুইভাগে দু’দিকে সরে গিয়ে পুনরায় লীন না হওয়া পর্যন্ত মরা কান্না তরঙ্গায়িত হয়ে চলে।
যে নারী বাচ্চা বিয়ালো Ñ মরা ছাও, তার কী অবস্থা খবরা খবর, শ্বাস চলছে না মরেছে Ñ এ নিয়ে মাথা ঘামবার চেয়ে আবার সন্তান সম্ভাবনার জন্য নতুন করে আরেকটা নারীদেহ Ñ যেখানে পুটলি বাঁধবে বীর্যশক্তি Ñ তা মনের মধ্যে রঙের গাছ হয়ে ঝিরঝির বাতাসে এক ধরনের সুখানুভূতি পুলকিত চকিত চমকিত হয়ে থাকে যা কিনা বিনা জিজ্ঞাসায় মেনে নেয়া যেতে পার।

মানুষ নানা প্রকার অকথা কুকথা বলে থাকে, এইসব চিত্রবিচিত্র কথার পিঠে হরি মেরে জন্মজয়ী সন্তানেরা যে কখনো মায়ের পেট থেকে দৃশ্যমান হয় না Ñ এ কথা হলফ করে বলা যায় না, বরং পরি বিবির কথা শুনলে মনে হবে করিমন বিবির সন্তান প্রসবে ধাত্রী সুলভ পারদর্শীতা প্রশ্নবিদ্ধ করার নানা তালবাহানা নিতান্ত কিছু কুচুটে মানুষের যারপর নাই কুটকচালি; হিংসায় কিংবা নানা ক্রিয়াকলাপে তাদের পশ্চাৎদেশে জ্বালাধরা; পরি বিবি উপায় বাতলেছে যে, লোহার রডখানা গনগনে করে ঠা-া প্রান্তটা জায়গামত ঢুকিয়ে দেয়া Ñ তাতে অপর প্রান্ত যা কিনা অপ্রবিষ্ট, গনগনে উত্তপ্ত হওয়ায় মুঠোয় করে লোহার ঠা-া প্রান্ত টেনে বের করতে অক্ষমতায় পশ্চাৎদেশে দ-সহ শাস্তি প্রদান হয়ে উঠবে মোক্ষম ব্যবস্থা।

পরি বিবির বাপের ঠিক নাই বলে কথা চালু আছে। আর মহিলার স্বামী এক যৌনতাড়ুয়া Ñ সে নিজের বোন ও মা-কে উপগত হওয়ার এক দুর্লভ দৃষ্টান্ত হয়ে বাংলার বাগানে ফুটে আছে।

পরি বিবি নিযুক্ত করে বাচ্চা প্রসবের জন্য করিমনকে। পরি বিবি শুলুক দিয়েছে রুস্তমকে। পরি বিবির সঙ্গে সম্পর্ক কী রুস্তম শেখের তা এত কা- বর্ণনার পরে আর কিছু যুক্ত করার অপেক্ষা রাখে না।

যোনি বিদীর্ণ হয়ে সন্তান প্রসবের পূর্বক্ষণে ভ্যা ভ্যা করে বউয়ের পাড়াকাঁপানো চিৎকার এবং গোলে গর্ভমোচনের প্রাক্কালে গর্ভিনী গাভীর হাম্বা হাম্বা ধ্বনি Ñ প্রকৃতির ভেতর প্রাকৃতিক মাতম সৃষ্টি করলো এমনই যে রুস্তম শেখ এক অনির্বচনীয় উত্তেজনায় থরথর। ঘোৎ করে এক অবিমিশ্র অব্যয়ধ্বনি স্বত:স্ফূর্তভাবে মুখ নিসৃত হয়ে ত্রি-মাত্রিক উদযাপন ঘটতে লাগলো বেলতলী গ্রামে।

রুস্তম শেখ তাকালো উর্ধ্বগগণে। আকাশে যেন অজস্র কাচ্চাবাচ্চা বেশুমার লাফালাফি করছে; হাত ধরে খেলা করচে কচি-কাঁচারা। লাল পরি ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে আর একদল হাতে করে রঙীন পাখা পিছুপিছু চলছে তো চলছে।

আকাশে লাল-নীল-সবুজ জামা গায়ে শিশুর দল একটা সাত রঙা ডিঙি চালাচ্ছে; ডিঙিটা বুঝি ময়ূরপঙ্খী Ñ তদ্রুপ তার চলা, ভাসতে-ভাসতে ওড়া, উড়তে উড়তে চলছে অন পরির দেশে গোলাপী চাদরের আড়ালে চলে যেতে থাকে। গোলাপি বাতাবরণের ভেতরে ময়ূরপঙ্খী আবছা চলতে চলতে থামলো রঙের গাছের তলায় Ñ ডালপালা নুয়ে আছে, ছুঁয়ে রয়েছে গোলাপি তরল Ñ শাখা প্রশাখাময় বৃক্ষের শরীরে পাতার ঝিকিমিকি ফাঁকে দুলতে থাকে ছোট্ট-ছোট্ট বল; বলগুলো নিয়ে লোফালুফি চলে, লোফালুফি

হঠাৎ ফোঁয়ারা, আলোর ঝরণা। আবর্তন করে চলে; ঝরণাধারা রঙীন বল ছুড়ে দিয়ে আবার কুড়িয়ে নিতে থাকে কুড়িয়ে লুফিয়ে কুড়িয়ে Ñ এই খেলা চলে, খেলা চলে, খেলা হঠাৎ ধপ্ বসে সে বসে পড়েছিল; টানটান উত্তেজনা কখন যেন দাঁড়িয়ে পড়েছিল আকাশের দিকে তাকিয়ে, যেখান এতক্ষণ নীরবতা ও শূন্যতার বদলে আলোর খেলাঘর।
খেলাঘর হয়ে যে স্বপ্ন ওড়াচ্ছিল আকাশে কোনো নটরাজ, Ñ হঠাৎ তছনছ হয়ে গেল কালোর প্রলেপ এসে যখন হামলা চালিয়ে সমস্ত রং কেড়ে নিল Ñ
রুস্তম আলীর মাথায় ভেঙ্গে পড়লো আকাশ।

এতক্ষণ সন্তানের আশ্বাসে, নি:শ্বাস গায়ে মেখে গর্ভিনী মা হয়ে উঠল। গাভিটি বাছুর বিয়ানোর পরপরই যেভাবে মসৃণ স্বরে হাম্বা হাম্বা করে সেখানে ছিল বাৎসল্যরস ও মাতৃত্বের উচ্ছ্বাস। বড় ভালো ছিল এই সময় তখন। চারিদিকে বিরাজ করছিল চিকন মসৃণতার পরশ। এক্ষণে চাবুকের চিকন স্পর্শে কেঁপে উঠেছিল, বিহবলতা ভেঙ্গে গেল; যে আকাশ এতক্ষণ স্বপ্নের আঁকাআঁকিতে ভূবন ভরিয়ে রেখেছি, Ñ মাথায় এবার ভেঙ্গে পড়লো আকাশটা Ñ চৌচির হয়ে গেল। নিজের ভেতরে ছত্রাখান হয়ে নিজেও। খসে পড়া, ভেঙ্গে যাওয়া আকাশের সংঘাতে বিলুপ্ত সম্বিত ফিরে আসে রুস্তমের।
দূরে কোথাও ধ্বসে পড়লো পাথর, ক্ষয়ে যাচ্ছে Ñ ক্ষয়িত স্রোতে ফোঁটা ফোঁটা অশ্র“ দানা Ñ বিন্দু বিন্দু টগবগে রক্তাংশ Ñ বহন করে স্মৃতির পাহার যেনবা;

রুস্তম, অশ্বের ডাক Ñ হ্রেষাধ্বনিতে নিজ অস্তিত্ব বিলোপের ঘোষণা অবগত হলো।
সে দুর্বার, Ñ অবশ্যই জাগবে, ফিরবে জাগ্রত।
তবে এখন, প্রাণত্যাগী চিৎকারের ধাক্কায় অনুরূপে শ্রবণ করলো ভয়ার্ত ডাক Ñ কানে এসে পৌঁছালো গোয়ালঘরের ভিতর থেকে।
বুক ফাঁটা বিলাপের অস্থির তা-বে উড়ে গিয়ে হাজির হলো; দেখে, দাপাচ্ছে বিবস্ত্র এক নারী।
কাটা প্রাণির মতো তড়পিয়ে স্থির হয়ে গেল।
ফেলে আসা দিনগুলো মনে করতে পারলো না সে। তবে কী কোথাও এই দিনগুলোর কোনো ছায়া-প্রচ্ছায়া নাই।
বিলাপময় করিমন বিবিকে মুহূর্তে এক লাথি বাগিয়ে দৌঁড়ানি দিয়েছিল।
এবং যখন করিমন বিবির পশ্চাদ্দেশে আধা মন ওজনের লাথি আঘাত মারলো Ñ ছিটকে গেল উঠোন টপকে অন্ধকারে।
মাথার চুল খামচে ধরে আছে রুস্তম শেখ। শূন্য চোখে সামনের দৃশ্য অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে।

রক্তে ভাসছে শরীর। লাল টকটকে রক্ত। পরনের শাড়ি ছিল লাল Ñ কোন এক এলোমেলো বাতাসে আঁচল উড়িয়ে সারাঘরময়।
জননদ্বার বিস্ফারিত; জরায়ূ উৎকটভাবে দ্বারপথে ঝুলে আছে।
রক্ত-মজ্জা-পানিতে ডুবে আছে নারী শরীর, পরনে নাই সুতো।
আজান দিয়ে কোনো নতুন মানুষের আগমনের সংবাদ দিতে হবে না।
জন্মদ্বার দিয়ে যুগপৎ নাড়িÑভূড়ি ও একটি ছিন্নভিন্ন গোশতের পি- দলা দলা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

মরা কাকের ছাঁ চোখের সামনে ভাসে, সে বসে পড়ে, কাঁপতে থাকে …
ফিরে এলো মরা কার্তিক অভিশাপের মতো, হিসহিসিয়ে সাঁপের মতো, ছোবল উঁচিয়ে।

এখন এক ফোঁটা আলোময় অন্ধকার রাত; তেজী আলোর শিখাকে স্মরণে রেখে বাতাস উঠেছে। পশু-পাখি নাই; প্রান্তর বিস্তারিত হচ্ছে কোথাও এখন হয়তো।
এই ছিল প্রকাশ্যে আয়োজন; শুরুর শেষ অথবা না হয় শেষ Ñ যখন শুরু।
কেন্দ্র ছাড়া যেমন বৃত্ত হয় না, Ñ তেমনিও তার জীবন।

এখনও তার কানে বাজে, লোকমুখের শতকথা। ওরে রুস্তমের বউ একখান কাউয়ার মরা বাচ্চা জন্ম দিয়ে পাতালে চলে গেল রে …
এই আতঙ্ক তাকে ধাওয়া করে। পিছু টানে ভয়। ভয়ের হাতে ১১ আঙ্গুল। আঙ্গুলগুলো খামচে ধরে রেখেছে তাকে। টানছে কোনো গুহার দিকে। একটু টানে-টানে সরে যাচ্ছে সে।

নাদ ও নিষাদের মধ্যে এবার যেন নিদাঘ নিষাদ।
সুতো আলগা হয়ে সময় হেঁটে চলে; কোনো তাড়া নাই, তাই দৌঁড়াচ্ছে না সময় Ñ দৌঁড়াচ্ছে না।
নিজের ভেতরে অনেকদিন নিশ্চুপ ছিল সে অনেকদিন।
যেন, দ্রবীভূত সত্তা। Ñ দ্রাবক খুঁজে নিচ্ছে দ্রবণ। এবং দ্রবীভূত হতে হতে

নিমজ্জিত অনেক দিন অবধি সে থাকল; খলবলিয়ে উঠলো না; কোনা উৎসব নাই; কোনো উদযাপন নাই Ñ করতালি নাই, হর্ষধ্বনি নাই, Ñ কেবলই নিদাঘ নিষাদ।
ক্রমে নিস্তব্ধতার গভীরে ফাটল Ñ ফাটল চিড়ে শোনা যায় কান্নার শব্দ Ñ ভেতরে কেউ কাঁদছিলো, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, অনেকক্ষণ যাবত কান্না, অস্পষ্ট ফুপিয়ে ওঠা কান্না, Ñ অনবরত আক্ষেপ অতপর তাকে পৌঁছে দিল, শূন্য হতে প্রত্যাবর্তনের মতো, নতুন জমিনে পদক্ষেপের মতো, Ñ সীমানা টপকে চলে গেল উন্মুখ অপর এক প্রান্তরে।

একটা ধাক্কা। আতঙ্ক। মেরুদ- বেয়ে সর্পিলকা যেন ঠা-া সাপ পথ খুঁজে পেয়েছে; ভয়-আতঙ্ক। নির্বিকারে হাঁটছে Ñ এবং ভিতরে প্রবেশ এখন এ গোখরার।

এমনটা হয় যে, কখনো অনুভব করা যায় ভেতরে ভেতরে দাপাচ্ছে প্রব এক উত্তেজনা, Ñ শরীর কাঁপে Ñ আবার কখনো হাজির হয় আশঙ্কা হাত ধরে আতঙ্কের চোরা স্রোত Ñ অবশ-বিবশ করে ফেলে, আচ্ছন্ন করে ফেলে ঠা-ার তাপ।

রুস্তম শেখ নিজের ভেতর এই দুই অনুভূতির সংক্রমণ টের পেল Ñ ক্রমে তাকে গ্রাস নিচ্ছে।

একটু আগে যে প্রকর ছিল দু:সহ স্বপ্ন Ñ স্বপ্নবাজির তা-ব Ñ জীবনের সেই অংশ, মরা কার্তিকের বেশুমার লগন লাগার পর কার্নিশের কিনারায় স্মৃতি আলোড়িত, কম্পমানভাবে দাঁড়া করে রেখেছিল তাকে Ñ ঘাম ঝরিয়ে, কাঁদিয়ে, ভাসিয়ে তাকে যেন মুক্তি দিতে সক্ষম হলো Ñ ক্ষণস্থায়ী; জাগরণে এখন বেঁচে থাকার আশ্বাস যেন নাই Ñ আরেকবার লড়ে যাওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত, বেঁচে থাকা শেষ, কোনো রকমে টিকে থাকা শুরু।

কখনো বা কুমারি মায়ের সন্তান অথবা যদি বেহুলার মতো নারীর মৃত লখিন্দর, Ñ তেমনি মিষ্টি বউটি নাই সংসার নাই এমনই এক উড়নচ-ী মানুষের সন্তান লাভ Ñ টুকটুকে শিশুটা হামাগুড়ি দিল, টলমল পায়ে হাঁটলো, মা ডাক তরঙ্গায়িত হয়ে হাসি-খুশি ছড়িয়ে গেল। কোথাও কোনো প্রসব বেদনা নাই, কোনো ক্রন্দন নাই, ছেঁড়া নাড়ির চিহ্ন নাই দুধের জমা ফোঁটা নাই, ধাত্রী মঙ্গল নাই : কোনো নারীর গর্ভ হতে নয়, Ñ মৃত কাকের ছাঁও প্রসবের রক্তাক্ত স্মৃতি প্রবল সেখানে।

বাজীকর যেন রুস্তম শেখ। দশ মাস দশদিন সে অপেক্ষা করে নাই, Ñ কোনো গর্ভাশয় তাকে অপেক্ষমান রাখে নাই ততদিন; তার মতো একক বাবার কোলে উজ্জ্বল আলো বিচ্ছুরণ করে সন্তান এলো। ভাঙ্গা স্বপ্নের ভ্রুণ থেকে জন্ম নিল রহিম।
আদর করে ডাকা হলো রহিম বাদশাহ। খোঁজ করতে লাগলো মায়ের দুধ Ñ পবিত্র ঝরণার মতো যা তাকে শক্তি দিবে, প্রাণবান রাখবে।

কথা বলে উঠেছিল রূপবানের শরীর, Ñ গড়িয়ে গড়িয়ে নামলো রজ:রক্ত ফোঁটা; তাপে উষ্ণ ছিল শরীর, অন্ধকারের পর্দা ঘেরা ছিল চারপাশে, তবুও খসে যায় সুতা, শরীরের রেখা যেন সদ্য আঁচড়ে প্রস্ফুটিত। জ্যোৎস্না ও অমাবশ্যা লুকোচুরি করে খাঁজে-খাঁজে।
রাতের বেলায় আঁচল খসে গেলে নারীর জোড়া স্তন দাঁতে-জিহ্বায় শিহরিত, কম্পিত ও রাঙা হয়ে ওঠে। ফলবতীকালে দুধের ধারা বহন করে শিশুর চুমুকের জন্য অপেক্ষা চলে থরথর।

মায়ের বুকে জমা হলে দুধের ধারা শিশুর মুখে গড়িয়ে গড়িয়ে নামবে। দুধের ধারায় ফুলে ওঠে, নত হয় স্তনদ্বয় Ñ সন্তান থাকবে বেঁচে বর্তে।
জায়া ও জননী হয়ে ওঠে। জায়ার মধ্যে কতবার খুঁজে যাওয়া Ñ জননীর সন্ধান; জননীকে হারিয়ে বধুটির মধ্যে খুঁজে পাওয়া; কন্যা-জায়া-জননী যেমন নহ-মাতা-বধু-কন্যা কতবার একমবে লীন।

নদীতে পিপাসার জল যেমন সকলের কাছে স্তনপূর্ণ ফেনিল দুধ এক হয়ে যায়। মায়ের বুকের দুধের গন্ধ একই রকম শিশু ও পুরুষের কাছে।
রূপবান এক অলৌকিক আলোয় নিজের পুরুষের জন্য, জঠরে বেড়ে ওঠা সন্তানের জন্য স্তনভারে অবনত থাকে।
এখন তার কানে পৌঁছায় না এমন কোনো মন্দকথা আর নাই।
মানুষের উচ্চারিত প্রতিটি শব্দকণায় যে ঘৃণা তা কখন ছোবল মারতে অক্ষম হয়ে পড়েছে যেন।
দুষ্টু লোকেরা মিষ্টি কথা বলাবলি করে সামনে। রাক্ষস-খোক্কস হয়ে তলে-তলে এবং যাবতীয় রটনা পেছনে Ñ সামনে থেকে দূরে গিয়ে করতে থাকে।

পাদু হোসেন পেট খারাপ করে ঘুরে বেড়ানো লোক এই তল্লাটে।
এই মহল্লায় খারাপ বাতাস ছাড়ে সে। কখনো সে এমনসব কথা বলে তাতে মনে হয় সত্য কথায় দুর্গন্ধ আছে। কারণ পাদু হোসেনের দাবী মিথ্যা সে বলে না।
তবে, পাদু হোসেন রূপবান কন্যা সম্পর্কে যেসব কথা উদ্গার করতে লাগলো তাতে কেউ কেউ সত্যের আভাষ পাচেছ বলে বোধ সৃষ্টি হতে লাগলো।

পাদু হোসেনের আন্দাজি কথায় সরবও। থাকলেও থাকতে পারে। পরের বউ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার স্বভাব সর্বজনবিদিত। আর নিজ মুখে হামেশা বলে থাকে যে, বোনের সঙ্গে তার বিয়া হইছে Ñ আর বউ তো কারো কারো বোন না হয়ে যায় না Ñ বাপেরও বিয়া দিয়েছে সে; সত্যিই সে এক অনবদ্য বাইন্চোত।

তো, পাদু হোসেনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এই যে, রুস্তম শেখের এত বয়সেরও খাসল্ত শুদ্ধ হয় নাই; পোলার নাম কইর‌্যা ভোগ করেছে রূপবানকে।
পোলায় দুধ খাওয়ার আগে বাপে দুধ খাইছে। খাইতে খাইতে রূপবানের পেটে ডিম আসছে; বুকে দুধ জমছে; রজ-বন্ধ হইছে।

রুস্তম শেখের শরীর মাটিতে পুতে পাথর মারা উচিৎ Ñ নাকের ডগায় শুয়ে রূপবান ভোগবিলাস।

কতিপয় ট্যারাব্যাকা লোক এইসব কথা আমল দিচ্ছে বলে তার মালুম হয় আর গন্ধবাজ গন্ধে ভরিয়ে তুলেছে বলে নাকে রুমাল চাপা দিয়ে কষে গালি তো মুখের ভিতর এবার গন্ধ প্রবেশ হলো।

পাদু হোসেনকে ধরে আনা হলো। লুঙ্গি তুলে জাঙ্গিয়া খুলে মুখটা হা করে ফেলে তাতে গুজে দিল জাঙ্গিয়াটা। তারপর গেঞ্জি দিয়ে মুখটা আটকে পশ্চাদ্দেশে বেদম লাথ কষিয়ে মুক্ত করে দিল। এভাবে পাদু হোসেনের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা সত্ত্বেও যে প্রকার গন্ধ কলরব করছে মানুষের চিত্তে ও পিত্তে, তাকে দমন করার কোনো পন্থা আর পাওয়া গেল না।
শালার গায়ে মুতে দিতে পারলে ভালো হতো!

এক ভয়ানক রাতে মুখোমুখি রূপবানের।
রহিম বাদশাকে কোলে নিয়ে বসে আছে, এবং সামনে শ্বশুর সাহেব Ñ তিনি চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছেন তার শরীর।
শরীরের দেখা আগে হয়ে যাওয়ার পরও এমন হতচ্ছাড়ার দৃষ্টি কেন তা ঠাহর করে উঠতে পারছিলো না রূপবান।
রতিক্রিয়ার সময় রহিম বাদশাহ-ও ছিল।
কোলে ঝুলছিল।
এমন অনেক দিনই তো হয়েছিল; সে যখন ঘনঘন আন্দোলিত হচ্ছিল, Ñ আন্দোলনের সঞ্চার তো জন ছিল কিনা পতি ছিল Ñ তাদের অঙ্গে অঙ্গে বিরাজ করেছিল।
রূপবান, শরীরের ওপর Ñ রহিম বাদশাহর কোমল সাঁতারের অনুশীলন উপভোগ করেছিল।
কখনো কখনো সাঁতার কাটা দেহ Ñ রহিম আর হিম থাকত না
সে তো চোখ বুজে রাখত। অঙ্গের ক্রীড়া উপভোগের।
স্পর্শের ভিতর সংকেত থাকে Ñ উত্তাপ থাকে সন্তানের দেহে প্রবেশ করতো পিতার শরীর Ñ এই মানুষটা কী সে-ই মানুষ Ñ এই তবে কেমন মানুষ
তার নিজের শরীরটা রাত্রিময় বলে মনে হতে থাকে। রাতের মধ্যে কত না রহস্য আসা-যাওয়া করে, নতুন গল্প-কাহিনী রচনা, কবি করে চলে অবিরাম অক্ষরপাত চিত্রকর ছবি আঁকে …
বর্ষার নদীর মতো ভরা যুবতী তৈরি করছে নিজেকে, পুষ্ট শরীরে বীজ জমা করবে, Ñ শ্যামল বরণ শরীর কামজাগানিয়া অপেক্ষা করছে …
রূপবান প্রত্যক্ষ করে চলে আকুতি, ভাবনা তাড়িত করে তাকে, শরীরে শরীরে কোনো পার্থক্য থাকে না Ñ আলাদা করা যায় না, স্পর্শ এক, ধর্ম এক কেবল শ্রবণ-দর্শন আলাদা করে দেয় Ñ আর বাকি সব ইন্দ্রিয় শীতের বিকালে আগুনের আঁচ।
নিশ্চয়ই রূপবান শ্রবণ করলো সেই উচ্চারণ, প্রশ্ন যেখানে খোদিত হয়ে আছে;Ñ
এবং এই কথা কানে পৌঁছানো মাত্র অন্তরাত্ম বলে উঠলো নাউজুর্বিলাহ।
কোনো উত্তর না পেয়ে, রূপবানের সামনে বসে থাকায় ক্রমাগত অস্থিরতায় তড়পাতে তড়পাতে কখন যেন সে জায়গা ছেড়ে পা বাড়ালো।
রূপবান প্রস্থানপর্ব লক্ষ্য করে খিলখিল হাসিতে খানখান হয়ে গেল। কাকের পা’ সারা শরীরে কাতুকুতু দিচ্ছে।

আরেকবার এই অসম্ভব আতংকের মধ্যে পতিত হয়েছিল রুস্তম শেখ।
বিন্দুমাসীর ঘরে সেই নারীটি ছিল তবক দেয়া পান যেন Ñ সমস্ত মুখ রঙিন রসে ভ’রে যেত।
মালের চালান সবসময় ছিল ভালো Ñ বিন্দুমাসীর ঘরে।
নতুন শরীর, নতুন ঘ্রাণ, টাটকা আমেজ, ভরপুর উৎসব।
ভাঁজ খুলতে খুলতে, ডুব দিতে দিতে এক সময় আর কোনো উন্মোচন ভালো লাগতো যখন তখন নেশার মত টান মারতো সেই নারী, Ñ পুরানো হয় না বরং বারবার নতুন করে তাকে নিয়ে শয্যায় তোলে।
একেকবার তুখোর সংগম তাকে গভীর ঘুমে নিমজ্জিত করতো।
প্রত্যেকবার নতুন ঘ্রাণ।
অনাঘ্রাতা নারীটি তাকে বারবার করতো সিক্ত ও রিক্ত।
যে খবর তার কাছে পৌঁছে গিয়েছিল, বিন্দুমাসী তারের বেড়ার ওপারে তবু কথা চলে আসে যেমন সে রাতের আঁধারে সীমানা মুছে দিয়ে সংগোপনে নিজেকে নিয়ে যেত ওপারে, তেমনি চালাচালি হয়ে চলে আসে সংবাদ।
খবর ছিল এই যে, নারীটি তাকে স্বামীতুল্য জ্ঞান করেছিল। গর্ভে ধারণ করেছিল বীজ। বৃক্ষ সৃষ্টি সম্ভাবনা পরিচয়ের আবরণ বদলে দিয়েছিল তার।
শরীর জুড়ে বৃষ্টি নামতে দিয়েছিল Ñ কোনো আড়াল তৈরি করে নাই।
কাস্টমার কমতে থাকে। অনটনের আনাগোনা শুরু হলেও পেছানা হয় না, Ñ প্ররোচিত হয় না শত প্রলোভন ও ভয়-ভীতিকর বার্তা এবং নানা সংকেত ও ইঙ্গিতে।

ফলনের অনুকূলে বর্ষণে ভিজতে থাকে। সত্তার গভীরে নতুন শিহরণে যাবতীয় আনন্দের উর্দ্ধে উঠে গিয়েছিল চোখের জলে ভাসতে ভাসতে।
আবর্তনে নিয়মিত যে ক্ষরণ রক্তের হতো অনিবার্য ও স্বত:স্ফূর্তভাবে Ñ সহসা ছেদ পড়েছিল তা মালিনীর জীবনে; রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থান ঘটে গেল Ñ মাথা চক্কর, বমিবমিভাব Ñ শরীরের অন্দরমহলে নিভৃত যতেœ কী যেন জেগে উঠলো তাই বদলে গেল দুনিয়া।

এখন ক্ষরণ অন্যত্র, শরীরময় নানা প্রকার স্রোতধারা। উথালপাথাল স্রোত নাড়ির কাটায় বাজে। পোয়াতি হলে Ñ পেট বাঁধালে হাটে হাঁড়ি ভাঙ্গলো। বিন্দুমাসীর জবান এমনই চালু হলো যে ধারালো বাক্যবান ও প্রযুক্ত শব্দ সকল প্রান্তে, Ñ এমন কী বর্ডার অতিক্রম করে চলে আসলো। রীতিমত দিশাহারা। সব ক্রোধ, আক্রোশ রীতিমত তুঙ্গে উঠলো পায়ের নুপুর ও চুড়ির ঝনাৎকার স্তব্ধ বলে রুজি না থাকলেও পুঁজি ভেঙ্গে পেটেরটার জন্য নিজের প্রতি মনোযোগ দিল আর বিন্দুমাসীর খাস্তা খাস্তা গালিতে মাঝেমাঝে নিজের নাম ভুলে যেতে লাগলো।

বিন্দুর কালেকশনের মধ্যে চেকনাই মারা মোস্ট ওয়ান্টেড হচ্ছে এই সেই মালিনী। তো মালিনীর চাহিদা ব্যাপক বলেই বিন্দু অন্যদের চেয়ে খায়খাতির বেশি করতো তাকে। আর সে কিনা গুড়ে বালি দিল।
মালিনীর দিনে ৩/৪ জনের বেশি লোক বসাতো না আর সপ্তাহে হাফডে উপভোগ করত। বিন্দু এমনিতে দ্রুত গাঙ বানাতে অন্যদের বেলায় তৎপর থাকলেও মালিনীর ক্ষেত্রে সংরক্ষণ নীতি মেনে নিয়েছিল। বরং যে কাস্টমার বেশি টাকা গুজে দিত তাদের মধ্য হতে লোক পাঠাবে মালিনীর ঘরে।
অতি মালকড়ি খরচ না করলে Ñ মালিনী এত সস্তা ছিল না যে, কেউ পকেটে হাত ঢুকিয়ে মার্বেল খেলতে খেলতে দিব্যি নিত্য আহারের মৈথুন করতে সক্ষম ছিল।
মালিনী তাই মনে মনে তল্লাশি চালায় হাতে হাতে গণনা করা যায় এইসব কাস্টমারের মধ্যে কোন বানচোত এই কুকামটা করে পালিয়েছে।
মালিনীর কোনো উচ্চবাচ্য নাই। মা হওয়ার উজ্জ্বল আভায় সে বুদ্ হয়ে আছে। তার শরীরের বাজার নিয়ে আদৌ মাথা ব্যথা নাই। পেটের মধ্যে যে বীজ বড়ো হচ্ছে, ছেলে নাকি মেয়ে Ñ এ নিয়েও কোনো টানাপোড়েন নাই।
যত মাথা ব্যথা সব জমা হয়েছে বিন্দুর মধ্যে। আর এদিকে খুশিতে পেখম মেলে গলা শোনা যায় মালিনীর।
করবীতে ফুল শুকালো
কাননের ফুল ফুটলো বনে॥
দিনের আলো প্রকাশিল,
মনের সাধ রহিল মনে॥
মালিনীর ওপর আরো রাগাক্রান্ত হয়ে বিন্দু সাফসাফ জানিয়ে দিল, যতই ধেই ধেই করে নাচুক না কেন, ছেলে হলে নুন দিয়ে মারবে আর মেয়ে জন্ম নিলে তো কথা নাই, ঐ পেটের ছাওকে বউনি করাবে।
বিছানায় লুটাবে মা ও মেয়ে। মায়ের পর ভোগে যাবে মেয়ে।
সেই এক চাঁদের আলো রাতে বিন্দুমাসীর ঘরের উঠোনে দাঁড়িযে চিৎকার শুনেছিল রুস্তম। খামচে ধরেছিল বুক।
তবু একবার … যেহেতু পকেট ছিল গরম এবং সব শুনেও অসম্ভব মনে হয়েছিল যা কিছু Ñ অতএব বাঘের দুধ টাকা দিলে পাওয়া যায় বলেই উত্থিত ও পরাক্রান্ত পুরুষ যেন রুস্তম পরখ করে নিতে পেরেছিল মালিনীকেও তার মাতৃত্বের স্বাদকে। তখন তার শরীরে ছিল ঘাম, চঞ্চল ছিল রক্ত, ঠোঁট ছিল ভেজা।
সে রাতে জ্যোৎস্নায়, সুখ ছাড়া, সাধ ছাড়া আর কিছু ছিল না। আগুনে জ্বলছে হৃদয় তার। বুকের দুধের গন্ধটা মাথার মধ্যে জাঁকিয়ে বসে আছে।
ব্লাউজ খুলে চোখে পড়েছিল অস্থির এক জোড়া স্তন তাকিয়ে আছে। স্পর্শ করলো, অনুভব করলো, জিহ্বা-ওষ্ঠ-দাঁত জুড়ে বুক ভরা দুধ গলে গলে মেখে গেল।

করুণ অভিশাপের মতো জন্ম হয়েছিল যে শিশুর Ñ একেবারে বৃথা গেল, মায়ের মতো আরেকটা যোনি নিয়ে, টইটুম্বুর স্তনের সম্ভাবনা নিয়ে বিন্দুমাসীর দালানে হেসে উঠলো না।

তখন সেই এক রোদপোড়া দিনে সে অবিশ্বাস করতে চেয়েছিল যে, একদা তার স্ত্রী তার বীজ ধারণ করে কাকের বাচ্চাকে জন্মদান করেছিল।

মালিনীর শরীরের নিয়মিত অতিথি ছিল, যাতায়াত করেছিল অসংখ্যবার, অকাতরে ঢেলে দিয়েছিল বীজ, Ñ বীজে ছিল বৃক্ষের কল্পনা।
সন্তান পাওয়ার আগে মায়ের দুধের স্বাদ ও গন্ধ অন্তরে-অন্দরে প্রবাহিত করেছিল কুসুম ফোটা বাগানের নারীটি।

মালিনীর পুরুষ্ট স্তনে, দুধভারে অবনত গঠনে আকুলভাবে মুখ রাখলে ঝলকে অনুভব করেছিল মাতৃস্তনের গন্ধ ও স্বাদ, আঁকড়ে ধরে পৌঁছে গিয়েছিল শিশুবেলায় এবং উপর্যুপরি পুরুষ হয়ে উঠলে ক্রমে স্তনশুদ্ধ লোফালুফি করতে করতে পৌঁছে গিয়েছিল সেই এক দারুন শিহরিত জগতে যেখানে কামনার উত্থান কেবল ঋতুমতী নারীতে, ভরা যুবতী, নদীর মতো যেন তাকে তলিয়ে দিয়েছিল। সে এক আশ্চর্য রৌদ্র, নিদারুন পূর্ণিমা বড় বিস্ময়কর। থমকে গিয়েছিল সে, চমকে উঠেছিল।

রূপবানকে সহসা মনে পড়ে গেল কিন্তু নতুনভাবে প্রত্যক্ষ করলো যে, এক স্তনে প্রবহমান শিশুর জন্য দুধের স্বাদ আর অন্য স্তনে তরঙ্গায়িত যেন কামনা অপর পুরুষের জন্য কম্পমান।
এই অশেষ সময়ে সব সীমানা বিলিন। কোন পার্থক্য হয় না নারীর Ñ তারকাটার বেড়া থাকেন না। এপার ওপার নারী একাকার।

ইদিপাস! ইদিপাস! ফ্রয়েড মরেছে, ভূত হয়েছে মরে এবং চেপে বসেছে ঘাড়ে।
রূপবান ভাবনা নতুন অঙ্গে ফিরে পেয়েছিল রুস্তম।
রুস্তম শেখ অর্ধেক বাস্তবতা, বাকিটা দু:স্বপ্ন অতিক্রম করে ফিরে এলে দুর্ভাবনায়।
রূপবান।
Ñ এক ভরা যুবতী।
ঋতুমতী সে পোয়াতি।
নিরুদ্বিগ্ন। ক্রমে, স্নিগ্ধ; কল্লোলিনী।

দু:স্বপ্নকাল কী ফিরে আসছে আবার যখন রূপবানের জরায়ূ ছিঁড়ে জন্ম হবে অমানবদেহ এবং আকাশে বাতাসে রটে যাবে খরব; খবর গিয়ে পৌঁছে যাবে কাকের বাসায়।

রুস্তম আলীর চোখের সামনে তাই এখন শুধু কাকের পা।
সে অকুল পাথরে খুঁজতে থাকে লক্ষ্মীর পা।

সব সংবাদ শুভবার্তা বহন করে না এবং কেনা জানে যে, মন্দ বার্তাবহনকারী সংবাদ-ই উৎকৃষ্ট সন্দেশ হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে এখানে-ওখানে, যেখানে-সেখানে।
সুতরাং বিশেষ সংবাদ এই যে, দুগ্ধ পোষ্য জামাই নিয়ে নারীটি কোনো এক ভীষণ উপায়ে গর্ভধারণ করেছে।

স্বামী ক্রোড়ে রূপবানের গর্ভসংবাদ প্রচারিত হতে কানে কানে কানবার্তা যথেষ্ট ছিল। কিন্তু কৃষ্ণ-টি কে? Ñ এ প্রশ্নের তীর ক্ষুরধার ও বেগবান। গর্ভ মা ছাড়া রুস্তমের সন্তান লাভ এবং দুধের শিশুর প্রযতেœ রূপবানের গর্ভসঞ্চার এমনই এক সুতায় গাঁথা মালা Ñ চাঞ্চল্যকর; সকলের চোখ-কান-নাক ট্যারাব্যাকা হয়ে গেল। অচিরেই সকলের মনে পড়ে গেল যে, রুস্তমের প্রথম কাগজে-কলমে করা ও কলেমাপড়া বউ প্রসব করেছিল কাকের বাচ্চা কাক Ñ জন্মের পর মায়ের কামড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল যে শরীর Ñ অসন্তোষে ও আক্রোশে।

নিজেকে নিজে ভয় পাচ্ছে রুস্তম। ভয় আরো শিকড় বিস্তার করে এবং ডালপালা ছড়াতে থাকে সকলের মধ্যে।

কাকে ঠোঁটে করে বীর্য নিয়ে এলে সতী-অসতী, পূন্যবতী গর্ভবতী হয়, এই শোনা কথা নারীকে পক্ষী হতে পৃথক করলো না। কোনো তফাৎ রইলে না কাকে ঠোকরানো নারীর সঙ্গে কাকের। যেন এখানে পুরুষের কোনো প্রভূত্ব নাই; রুস্তম নিয়মিত স্পৃষ্ট হয়ে বসে থাকে।
জাগরণে আজ বিভাবরী।
আশ্বিনের কোজাগরী জ্যোৎস্না সেজেছে মাঠ-ঘাট, ঘর-বাড়ি, নদী-দীঘি Ñ চরাচর।
হৈমন্তিক শস্যের সম্ভার সোনার আলোয় ভরে গেছে।
আলো জ্বালানি রূপ ঝলমল করছে।

বড়ো আশ্চর্য দিন আসছে।
ধান, মুগ, তিল, মুসুরি, মটরদানায় ভরে যাবে উঠোন।
লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে লুকানো ধানের শীষ শস্য মূর্তির মতো এলোকেশী এক নারীর সম্মুখে দাঁড়িয়ে ঝাঁকড়া মাথাভর্তি হলুদ বর্ণা স্বর্ণলক্ষ্মীর মতো অপরূপ রূপ ধারণ করবার জন্য অপেক্ষায় নমিতা থাকে। অলক্ষ্মীকে কুলায় ঝেড়ে বিদায় করতে করতে শস্যফলন যেন লক্ষ্মীর দোয়া হোক। এখানে শক্তি দরকার। পূণ্য দরকার। তাই মঙ্গল কামনা Ñ পবিত্রতা ছড়াতে আলপনা বিবর্তিত হয় একটি বিন্দুকে কেন্দ্র করে, বিন্দুকে ঘিরে তৈরি হয় বৃত্ত। এই বৃত্তের নিহিতার্থ উর্বরতা ছলাকালা Ñ জাদুবাজি।

চালের গুড়ো দিয়ে রচনা করা আলপনা, Ñ এই আঁকার সময়, স্নান করে চুল এলিয়ে নিকানো উঠোনে, চৌকাঠে, পিঁড়িতে, ধাপে ধাপে আঁচড় ফুটিয়ে রূপবান সুর করে বলে চলেছে এখন, তারপর Ñ ‘আঁ-কি-লা-ম পদ-দু-টি Ñ’।
অমনি আঙ্গুলের টানে ফুটে উঠছে লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ দু’টি।
ও বলছে, ‘আঁকিলাম ধান’। ফুটে উঠলো ধানের শীষ।
এমনি করে বলতে লাগলো, ‘আঁকিলাম লতা-পাতা, ফুল আর পান। আঁকিলাম লক্ষ্মী-পেঁচা জোড়াপদ্ম আর কলমীলতা দোপাটিলতা Ñ
সে আঁকে মনের আনন্দে। কাউকে খুীশ করতে সে আঁকছে না।
প্রাণ ঢেলে ছবি আঁকে; মানুষের মূর্তি নাই Ñ আছে কেবল প্রকৃতি চিত্র, Ñ এবং থাকে চন্দ্র, সূর্য, যমুনা; এবই আঁকা চলে, মাটির সরা, মাটির হাড়ি, শরীরে, দেয়ালে…
লক্ষ্মীর পা আঁকলো, হাতি-ময়ূর-পাখি যা মনে হয়, সে আঁকতে থাকলো, Ñ আলপনা পারে অলক্ষ্মী তাড়াতে আর কোন অন্য কিছু যেন পারবে না ক্ষতিকর হতে তাই আরো ধ্যানমগ্ন হয়ে রূপবান কন্যা মেপে-মেপে সাতসের আলো ধান বিছিয়ে দিতে থাকে আলপনায় আঁকা লক্ষ্মীর চরণে, মাছ ও পদ্মফুলে।
কপালে টিপ দিল লাল সিঁদুর রঙের।
লাল শাড়িতে শরীর আবৃত।
ঘোমটা টানা রূপবান প্রসব বেদনায় ঘরের ভেতর আলো চালের ধানের ওপর শুয়ে রইলো। আলো চাল হয় পুরাতন ধান দিয়ে Ñ এবং অপেক্ষা তারপর নতুন ধান ওঠার। চন্দনের গন্ধে ভ’রে গেল ঘর।

লক্ষ্মীর আরাধনায় মন্ত্রোচ্চারণের জন্য পুরোহিত অনাবশ্যক হয়ে ওঠার মতো প্রসূতি সে, কোনো ধাত্রীর প্রয়োজন বোধ করলো না; তাতে স্বরূপ প্রকাশিত।

যে স্বামী কালে-পিঠে এতদিন ছিল দুধে-ভাতে সেইজন এবার যেন লক্ষ্মীর ডাক করে উঠলো। অলক্ষ্মীকে বিদায় করতে পাটখড়ি জ্বালিয়ে সে রাখলো, শ্যামারাত্রি দুনিয়ায় সবচেয়ে অন্ধকার এক রাত্রি। আজান-ঘণ্টা-শঙ্খধ্বনির ভেতর দিয়ে নিমগ্ন চৈতন্যে ভাসতে-ভাসতে অ-লক্ষ্মীর বিদায় এবং এক দ্বিপান্বিতার আহ্বানে লক্ষ্মীর আবির্ভাব এতদ্বারা সন্নিবিশিত হলো এই শ্যামরাতিত্রে।
রুস্তম শেখ, যে এতক্ষণ ছিল হতভম্ব, এই প্রথম শরীর সুখে উৎরাই অনুভবতাকে করে ফেলেছে নিশ্চল; হঠাৎ এখন নাভিকুঞ্জে ক্রমে পুঞ্জিভূত হতে থাকা অজস্র ঝংকার, বাদ্য, কাসর মথিত হয়ে একটি নিনাদ উৎপন্ন করলো Ñ বিলীন হয়ে গেল তল-ব্যাস-বেধ Ñ সৃষ্টি-প্রলয়, প্রলয়ের সৃষ্টি রূপবান কন্যার প্রসববেদনা জাগিয়ে আলোর মিনার থেকে ভেসে ঐকতানে পৃথিবীর গড়নে নতুন আকার ও আকৃতির দিশা সৃষ্টি করলো।

পোয়াতি নারী নদীতে নামলে যে ভূত তখন হতে পিছু নিয়েছিল Ñ পালিয়ে গেল।
এখন শব্দ। এখন ক্রন্দন নাই। এখন শুধু ভূ-কম্পন। এখন নিয়তি পরাজয়ের ইশতেহার ঘোষণা করলো। দুনিয়া তাই ভরে গেল আলোতে। কুচকাওয়াজ আলোর মিছিলের। সৃষ্টি মুহূর্তে একত্রিত হয়েছে নারীর সঙ্গে পুরুষটি।
শব্দ ব্রহ্ম। শব্দ সৃষ্টি। শব্দ পৃথিবী।

নতুন পৃথ্বী নতুন।

সৃষ্টির রসায়নে নারী-পুরুষের সমান অংশীদারী নতুন করে উরিøখিত হলো।

ভাগ্য অবতরণ করে আকাশ থেকে
এবং আল্লাহ করেন যা তার ইচ্ছা।

গমস্ত বিষয়ই আল্লাহ থেকে।
প্রতিদিন তিনি জাঁকজমকপূর্ণ প্রকাশে আছেন।

এবং তাঁর কাছে সিদ্ধান্ত অপরিবর্তনীয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here