সংস্কৃতি প্রতিবেদন – ওয়াহিদুল হক

0
204

সংস্কৃতি প্রতিবেদন

ওয়াহিদুল হক

বাংলাদেশে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সম্মেলন-অনুষ্ঠান ও সেই অনুষ্ঠান সম্পাদন পরিচালনসূত্রে বর্তমান সম্মিলন পরিষদের উদ্ভব, কালক্রমে। আরম্ভের প্রেরণাটি ছিল-প্রয়াত দেশপ্রাণ রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী জাহিদুর রহিমের স্মৃতি সংরক্ষণ। সেই আকাঙ্ক্ষা থেকে উৎসারিত হয়ে দেড়যুগের নিত্যবাৎসরিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলন আরও প্রসারিত এক ক্ষেত্রে এসে দাঁড়িয়েছে। সম্মেলনের নিয়মিত অনুষ্ঠান, সম্মেলন সূত্রে মহকুমা পর্যন্ত বিস্তৃত রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রতিযোগিতা, দুই সম্মেলনের অন্তর্বর্তী সময়ে জেলায় জেলায় প্রশিক্ষণ শিবির পরিচালন ইত্যাকার কর্মকাণ্ডে দেশে সার্থকভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চার প্রসার, নিত্যনব মানুষের কণ্ঠে ও শ্রবণে এই সুধাময়ী সঞ্জীবক বাণী ও সুরধারা তার সত্য ও সৃজনশীলরূপে পৌঁছে দেওয়া এই যেন দাঁড়িয়ে গেল সম্মিলন পরিষদের কাজ-নি:সন্দেহে অতীব গুরুত্বপূর্ণ মহৎ কার্য। কিন্তু এই কাজে নিযুক্ত থাকতে থাকতেই ক্ষেত্রে যেন যায় আপনা থেকেই আরো বেড়ে – কারণ যাঁরাই সম্মিলন পরিষদে গভীরভাবে যুক্ত হয়েছেন তাঁদের মনের ভিতরে দেশের সমগ্র সংস্কৃতির প্রশ্নটি ছিল প্রবল। এবং দেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতেও তেমন করে বৃহৎ সামগ্রিক সাংস্কৃতিক প্রশ্নেই একটা দেশময় উদ্যোগের আহ্বান ছিল। এই বিশেষ আহ্বানটি উত্তর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট থেকে আসেনি, আসার কথা ছিল না- জোট প্রধানতঃ ক্রিয়াসিদ্ধ শিল্পে নিযুক্ত অসংখ্য দল ও গোষ্ঠীর রাজনৈতিক কারণে রাজনৈতিক যুথবদ্ধতা।

সম্মিলন পরিষদ্ দেশের ভয়াবহ সাংস্কৃতিক সংকটকে স্পষ্টভাবে তার কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য এখনও করেনি। কিন্তু কেবলই রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনুষ্ঠান উপস্থাপন ও মাস্টারির মধ্যেও পরিষদ্ আর আবদ্ধ থাকছে না। রবীন্দ্র-ভিন্ন গান, প্রধানত পঞ্চভাস্করের অন্যতম চার সূর্যের গান ও লোকগীতি, নৃত্য এবং আবৃত্তি সম্মেলনে উঠে আসছে যত্ন ও সম্মান সহকারে। পরিষদের কোন কোন জেলা সংগঠন নজরুলজয়ন্তী পালন করতে গিয়ে নিজ এলাকায় নজরুল গীতিচর্চারও মঞ্চ তৈরি করছে। এ কথাটা কার্যত পরিষদের জাতীয় কাউন্সিলে ও বার্ষিক প্রতিনিধি সম্মেলনে অনেক কাল ধরেই স্পষ্টভাবেই হয়ে আসছে যে রবীন্দ্রনামাঙ্কিত এই সংগঠন প্রকৃতপক্ষে বাঙালির সংস্কৃতি সমগ্রকেই লক্ষ্যে রেখেছে এবং ক্রমান্বয়ে সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে চেষ্টা করে যাবে। এই মনোভাবের ঐক্য এক জায়গায় গিয়ে বিভক্ত হয়েছে যখন ভাবনা এসেছে তাহলে কি এক পর্যায়ে বর্তমান নাম বদলানোর প্রয়োজন পড়বে না? অনেক জেলা শাখা থেকে কথা এসেছে এই সংগঠন নামে রবীন্দ্রসঙ্গীত নির্ভর হওয়াতে মানুষ একে সঠিকভাবে নিতে পারছে না, ক্লাসিক্যালের লোক নজরুলগীতির লোক ভাবছে এ আমাদের জায়গা নয়। এই নাম কি যেন সংস্কৃতি প্রশ্নের একটি খণ্ডিত এবং সেক্টরিয়ান মনোভঙ্গীর দ্যোতক।

পরিষদের প্রবৃদ্ধ অংশ এখনও, ঐ সমস্ত ভাবনা সত্ত্বেও, এখনকার নামটি বজায় রেখেছেন এবং তাদের যুক্তির মধ্যে এও আছে যে তাঁরা ভবিষ্যতেও তাই রাখবেন। যে-কোন সার্থক সংগঠনেরই আরম্ভে নামের সঙ্গে ‘কামের’ একটা সম্পর্ক রাখবার চেষ্টা থাকে। পরে কার্যক্ষেত্র বিস্তৃত হতে থাকলেই যে সেই অনুযায়ী নাম পর্যায়ক্রমে বদলে যেতে থাকবে তার কল্পনা-পর্যন্ত উদ্ভট। আরম্ভের আরাদ্ধটি নামের মধ্যে রক্ষিত থেকে একটি ধারাবাহিক ইতিহাসের জন্ম দেয় এবং পরবর্তী সকল বিকাশ ও বিস্তারকে এক ধরনের একটি কেন্দ্রিকতা দিয়ে সাযুজ্যময় করে, অভীষ্টে পৌঁছাবার কাজে কার্যকরিতা ও বেগ দেয়, সংগঠনকে দেয় চারিত্র। এই কথা তো সকল সংগঠনের জন্য প্রযোজ্য-কলকাতার মোহামেডান স্পোর্টিং যে ভাবনা থেকে আরম্ভ হয়েছিল এবং যে ভূমিকা সে ভারত ভাগের পূর্ব পর্যন্ত পালন করেছে, তার কিছুই এখন কোথাও টিকে নেই অথচ সেই দলটি সেই নামেই আছে। রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের ব্যাপারটি তো মোহামেডানের মত নেতিবাচক উদ্দেশ্যে আরম্ভ হয়নি। বরং বঙ্গ সংস্কৃতির উজ্জ্বলতম ফসলকে তার কেন্দ্রীয় বিষয় করে বাঙালির সংস্কৃতির অপরিহার্য এক উৎসমূল রবীন্দ্রনাথের নামকে ধারণ করে, অত্যন্ত ইতিবাচক একটি আরম্ভ তৈরি করেছে। কেবল বাঙালির সংস্কৃতিতে তো নন তিনি। পাকিস্তানকালের তেইশ বছর-জোড়া বাঙালির গণতন্ত্রের জন্য স্বাধিকারের জন্য বিরামহীন সংগ্রাম শেষে স্বধীনতার যুদ্ধ ও তার পরিণতিতে মুক্ত স্বাধীন স্বদেশভূমের উত্থান – এই প্রচণ্ড সামাজিক রাজনৈতিক বিপ্লবে রবীন্দ্রনাথ ধ্রুবতারার মত স্থির দিশারী থেকেছেন দিশাহারা বাঙালির মনে, তাঁর গান হয়ে উঠেছে অনিরুদ্ধ আয়ুত নিষ্পেষিত বঞ্চিত যুধ্যমান বাঙালির হাতে। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সমাজের সমগ্র জনকে স্পর্শ করবেনা বহুকাল, প্রধানত বিপুল নিরক্ষতার কারণে, ছবিও করবেনা তা, নাটকও করবে না।

সমগ্র সমাজে যুগযুগের প্রস্তুতি ছাড়াই রবীন্দ্রনাথ ছড়াতে পারেন শুধুই তাঁর গানের জোয়ারে। এবং জনগণের সর্বাগ্রে প্রয়োজন রবীন্দ্রনাথকে – সকল সৃজনশীল সংস্কৃতি ব্যক্তিত্বের মধ্যে। তিনি সবচাইতে সার্থকভাবে সকলকে পরিশীলনের পরিচর্যাময় মানসিক মানবিক চরিতার্থতার মধ্যে নিয়ে যেতে পারবেন, তিনি সবচাইতে কার্যকরভাবে বাঙালিকে তার অতীত অযুত বৎসরের সুকৃতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারবেন এবং বাঙালির জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ-ধারা সম্পৃক্তিতে মনুষ্যত্বাপহারক বিশাল ছেদ, ইতিহাসের ছেদ সংস্কৃতির ছেদকে পারবেন মোচন করতে। তাঁর গানে ভর করে রবীন্দ্রনাথ জনগণের ভিতর যেতে আরম্ভ করবেন। রবীন্দ্রসঙ্গীতের এই ভূমিকাটি কান্তগীতি, দ্বিজেন্দ্রগীতি, নজরুলগীতি কিংবা কীর্তন রামপ্রসাদীর ভূমিকার মত নয় আদৌ। দেশের জন্য রবীন্দ্রনাথকে পাওয়াটা জরুরি তার আরম্ভটা তাঁর গান দিয়ে হলে ফলটা ব্যাপক এবং নিশ্চিত উভয়ই হয়। বিগত দুই দশকে এদেশের বাঙালি কেবল বিভক্ত হতে থেকেছে, ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর সতত সংঘাতশীল খণ্ডে বিভক্ত রয়েছে এ-সমাজ। এ-যেন আর সমাজ নেই। বাঙালির হাতে এখন সমাজে প্রত্যাবর্তনের সবচাইতে কার্যকর ও তাৎপর্যময় উপায় রবীন্দ্রসঙ্গীত। সংস্কৃতি ফসল হিসেবে রবীন্দ্রসঙ্গীতের বাঙালি জীবনে অপরিহার্যতা রয়েছে ঐ ভাবে। তার শিল্পের গুণাগুণ-নিরপেক্ষভাবেই আমাদের জাতীয় জীবনে বিশেষ করে রাজনৈতিক সমস্যা মোচনে এমন কি মরণপণ যুদ্ধে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভূমিকা তাকে আমাদের জীবনে অনিবার্য করে তুলেছে। তার উপরে রয়ে গিয়েছে এই গানের শিল্পগুণের দিক-তাঁর সঙ্গীত, তাঁর কাব্য, এসবের বিষয়-বৈশিষ্ট্য। ভারতবর্ষীয় উপমহাদেশের অভ্যগ্র সঙ্গীত তাঁর গান, জগতের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ গীতিকাব্যে বিধৃত। এবং এই এত অর্জন সবই বাংলা সুরে, বাংলা ভাষায়-বাংলা ভাবে। তাঁর কথামতই বাঙালিকে তাঁর গান তো গাইতেই হবে, তিনি কেবল অনেক গীতিরচয়িতাদের মধ্যে একজন মাত্র-এ কখনও সত্য নয় সত্য-বাঙালির কাছে। যে বিষয়-বৈশিষ্ট্যের কথা এসেছে তারও অধিকাংশ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ার মত, কাশের গুচ্ছে, জোনাকির নিশীথ প্রদীপথালিকার মত বাংলারই নিসর্গের মহিমা কীর্তন। ঈশ্বরে প্রণতি, মানবে-মানবীতে পরস্পর নিবেদন, আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মউদ্বোধন – তাঁর গানের সর্ব বিষয়ে মানুষের, বিশেষ করে বাঙালির অন্তরতম উপলব্ধি ধরা পড়েছে এবং সেই সঙ্গীতের স্পর্শমাত্র বাঙালির ভিতর এই গভীর উপলব্ধির জগত সৃষ্টি হয়।

এই গানের চর্চাকে সনিষ্ঠ করতে প্রসারকে বিস্তার দিতে বেগ দিতে যে সংগঠন দাঁড়াবে সে মহত্তম একটি কাজ তুলে নেবে। এই গানকে কেন্দ্র করে যদি বাঙালির সমাজে এখনও যেটুকু শুভ বোধ টিকে আছে তার একত্র হবার মঞ্চটি গড়ে ওঠে তাহলে তো খুবই যথার্থ কাজ হবে। রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ ঐ প্রথম কাজটি থেকে যাত্রারম্ভ করে ক্রমেই দ্বিতীয় কাজটিতে ধাবিত হচ্ছে। নাম পরিবর্তন না করে, বরং নামের ভিতরে আদি উদ্দেশ্য ও চলমান ইতিহাসকে ধারণ করে বাংলা সংস্কৃতির মহামানুষের নামকে পতাকা করে সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবন নির্মাণের কাজে সম্মিলন পরিষদ্ অত্যন্ত সঠিকভাবে লগ্ন আছে।

দুই
বাংলাদেশের উত্থানের পিছনে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বড় মাপের অবদান ছিল। এমনটাই ইতিহাসে হয়ে এসেছে। ফরাসী বিপ্লবের পথ কেটেছিলেন রুসো ভলটেয়র মতেঁস্কু দার্শনিকত্রয়ী এবং দিদেরো দালেমবেয়ার প্রমুখ বিশ্বকোষ প্রণেতা পণ্ডিতকুল। একটা জায়গায় বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনের সংস্কৃতি ও রাজনীতি পক্ষের লোকেরা মিলিত হয়েছিলেন। বাংলার স্বাধীনতা সপক্ষের সমস্ত রাজনীতিক ধর্মনিরপেক্ষ, গণতন্ত্রমনা ও সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। বাংলার সংস্কৃতিতে জারিত সাংস্কৃতিক যোদ্ধারাও সকলেই তাই দিলেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক নেতৃত্বের পশ্চাতে ঐ সমস্ত মানুষ ষাটের দশক জুড়ে জমায়েত হতে থাকে, যেমন ঐ একই কাল ধরে ছায়ানটের সাংস্কৃতিক নেতৃত্বেও সবার মন আপন সত্য ঘরটিতে ফিরতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধে দুই শক্তি পৃথক অবস্থানে থেকেও একই বিন্দুতে আপন শক্তিকে পূর্ণ নিয়োগ করে- তাজউদ্দীনের নেতৃত্বে সরকার পরিচালন ও রণাঙ্গণে যুদ্ধ চলতে থাকে, কামরুল হাসান, ওয়াহিদুল হক, জহির রায়হান, সন্জীদা খাতুনের নেতৃত্বে সাংস্কৃতিক যুদ্ধ চলতে থাকে। দেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধু ডাক দিলেন দেশ গড়ার। সে ডাক যেন পৌছুল না সংস্কৃতিকর্মীর কাছে। তারা রইল দূরে, চিরকাল তারা তাই থেকে এসেছে, দলীয় রাজনীতি থেকে সম্মানজনক ব্যবধানে, – সে আওয়ামী লীগ হোক, হোক কমিউনিস্ট পার্টি – কিন্তু জাতীয় রাজনীতির অতি সন্নিকটে, প্রায় গর্ভগৃহে। সংস্কৃতি-কর্মী মানে তো বহুবিস্তারসময়ের চালে চলে যে গভীর – সন্ধানী রাজনীতি অর্থাৎ মানবের বাস্তব সংগঠন ব্যবস্থার নিয়ামক প্রক্রিয়ারই কর্মী।
তাঁরা রইলেন দূরে এবং বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর দেশে বিরাট সাংস্কৃতিক উত্থান দূরে থাক, কোনও প্রকার ভবিষ্যতাভিসারী জনগণ যোগসঞ্চারী সত্যসঙ্গীত সৎসাহিত্য প্রকৃত শিক্ষার উদযোগের নিতান্ত অনুপস্থিতিতে এক সাংস্কৃতিক উষরতায় প্রবেশ করল। ব্যতিব্যস্ত রাষ্ট্রশক্তিকে গায়ে পড়ে আরো ব্যতিব্যস্ত করবার উপায় ছিল না সাংস্কৃতিক শক্তির।
যখন আঘাত এল পঁচাত্তরে দেশ কি কেবল রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে গেল? না, সাংস্কৃতিকভাবেও পিছিয়ে গেল এক লাফে ছিচল্লিশে। এবং ক্রমে ক্রমে যেন আরো পিছনে, শতাব্দীর পর শতাব্দী। কত শতাব্দীর কত শত কোটি মানুষের বিসর্জনযজ্ঞের পথ বেয়ে যে সমস্ত জয় নির্মিত হয়েছিল তার প্রধান কয়টি স্তম্ভীভূত রূপ পেয়েছিল বঙ্গবন্ধুর এক বৎসরে গড়ে তোলা সংবিধানে। গণতন্ত্রকে পায়ে দলে এক এক সেনানায়ক এসে বন্দুকের কুঁদো দিয়ে দিল সেই স্তম্ভগুলো হেলায় সরিয়ে- ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র গেল কাটা। স্বামী বাইরে থাকলে রাত্রি গভীরে স্ত্রীর একলা ঘরে স্বামীর কণ্ঠ ও চেহারা ধরে ভূত আসে বলে বিশ্বাস করে গ্রামের মানুষ। জাতীয়তাবাদকে মেরে ফেলে তার ছদ্মবেশে ভূত এল অসহায়া বধূবেশী বাংলাদেশকে ধর্ষণ করতে। গণতন্ত্রকে কিছুই করার দরকার হয়নি, দুই দফায় প্রায় সতের বছর শুধু গণতন্ত্র কেন স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব দেশের অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক ভবিষ্যত সবকিছুকে সেনাছাউনিতে গুম করে রাখা হল। যাঁরা তা করলেন তাঁরা জাতীয়তাবাদী এবং স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী, জাতীয় বীর, এই প্রচারে বাংলার আকাশ ঢাকল। এই আঁখি থেকে সে আকাশ এখনও মুক্ত হল না।
এই মারে বাংলামুখী, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রমুখী রাজনীতি ছিন্নভিন্ন হয়ে তলিয়ে গেল, রাজনীতিকেরা ভয় পেলেন, বিক্রি হলেন, আপোষ করলেন, বসে পড়লেন, সরে গেলেন। খুনীর হাতের রক্ত না শুকাতে তাকে প্রেসিডেন্ট করে মন্ত্রীসভা হয়েছে আওয়ামী লীগ এবং সঠিক বামের লোক নিয়ে- তাঁরা ভয় পেয়েছিলেন, কেউই তাঁরা মরতে পারেননি। সংস্কৃতিকর্ম মার খেয়েছে, সংস্কৃতিকর্মীদের ক’জন আপোষ করেছে, বিক্রি হয়েছে? গায়ক চিত্রী এদের তো পেশার অঙ্গই হল মুজরা ধরা, কমিশন ধরা। কয়টা রাজনীতি-সচেতন গায়ক-গায়িকা বিক্রি হয়েছে? যাঁরা সংস্কৃতিকর্মের ধারের কাছে ছিলেন না কর্তাভজা ‘সেই মুজিব বাইয়া যাওরে’র দল বিক্রি হয়েছে অবশ্য কিন্তু যাঁরা আন্দোলনে ছিলেন তাদের কেউ? না, একজনও নয়।
এবং তাঁরা আশি সনের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। একমঞ্চ হয়েছেন। জাহিদুর রহিম স্মৃতি কমিটি সেই মঞ্চ। একটাই ক্ষতি ঠেকানো গেলনা এর মধ্যে। ঐ মঞ্চ যাঁর নামে হল তাঁকে হারিয়ে তবে মঞ্চ হল। পঁচাত্তরে বাংলার প্রাণভোমরাকে খুন করা হল- বঙ্গবন্ধু এবং তাজউদ্দীন এবং যাঁরাই ধরতে পারতেন হাল নিধন হলেন সব। ছিয়াত্তরের মধ্য এপ্রিলে কি রমনা অশ্বত্থমূলে পহেলা বৈশাখ হয়নি জিয়াউর রহমানের জ্বলন্ত রোষের মুখে ছাই দিয়ে? বাংলা নববর্ষ উদযাপনের পহেলা নম্বর লেখক – শত্রু ছিলেন খন্দকার আবদুল হামিদ, ওরফে স্পষ্টভাষী ওরফে মর্দে-মুমিন। পাকিস্তানী আমল থেকে তিনি কতই-না ‘মন্ত্রের সাধন নয় শরীর পাতন সংগ্রাম করেছেন, একাই ঐ হিন্দুয়ানী প্রকৃতি পূজার বিরুদ্ধে। ছিয়াত্তরে আবারও তিনি বিষোদগার করেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করলেন জিয়াউর রহমান খন্দকার হামিদকে দিয়ে। জিয়া যদি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ঈশ্বর তো খন্দকার তার পয়গম্বর। হেরার গুহায় নয়, বাংলা একাডেমীতে নাযেল হল প্রথম ওহী। এই ঘটনাসূত্রে দুই প্রতিভাতে আদর্শিক ঐক্য হবার পরে একদিন দেখা গেল জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক দল ছায়ানটকে প্রায় উৎখাত করে ঐ রমনা বটমূলেই পহেলা বৈশাখের উৎসব করল এবং কাগজে-কাগজে খন্দকার হামিদ লিখলেন পহেলা বৈশাখ যে কত ভাবেই না বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের জাতীয় উৎসব-এই আকবরী ফসল সন-ভিত্তিক উৎসব তো হিন্দুরা করে না, আমরা করি ইত্যাদি। আয়ুবকে গিলতে হয়েছিল রবীন্দ্র-শতবর্ষ জয়ন্তী, জিয়াউর রহমানকে গিলতে হল পহেলা বৈশাখ। শতবার্ষিকীর পরের বছরই হয় বাষট্টির আন্দোলন, চৌষট্টিতে নির্বাচন দিতে বাধ্য হন আয়ুব, যদিও বিডির নির্বাচন। জিয়া কর্তৃক পহেলা বৈশাখ গৃহীত পরে-পরেই জাহিদুর রহিম স্মৃতি পরিষদ ও প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত উৎসব। পরের বছর থেকে আরম্ভ হল জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলন, রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের ব্যবস্থাপনায়। কেটে গেছে এক যুগ তারপরে। জিয়া গেছেন, আমরা আছি। এরশাদও গেছেন, আমরা আছি। বাংলাবিরোধী সংস্কৃতি বিরোধীদের কাজ এখনও যায়নি, তাঁরাও যাবেন, আমরা থাকব। আমরা যারা বাংলার পক্ষের, এই ভাষা এই সংস্কৃতি, এই দেশ, এই দেশের মানুষের পক্ষের যারা তারা থাকব। আবার আমাদেরই জলসিঞ্চনে বাংলামুখী রাজনীতিতে প্রাণসঞ্চার হবে, সেই রাজনীতির নৌকার পালে লাগবে আমাদেরই শিল্পে উত্থিত হাওয়া।

পৃথিবীতে বাঙালি বলে একটি সাংস্কৃতিক-নৃতাত্ত্বিক জাতি আছে, ফিরে তার সত্য আবাসভূম হবে এই ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ, সরদার ফজলুল করিম যার নাম দিয়েছিলেন, এই সম্মেলন মঞ্চেই, রবীন্দ্রবঙ্গ। এই অপরূপ আবাসভূম যেখানে আরো কত জাতিসত্তা খুঁজে পাবে তাদেরও আবাসভূমি। পৃথিবীতে বাঙালি বলে একটি সংস্কৃতি ছিল, এই বাংলাদেশ হবে তার লীলার, বিকাশের পীঠস্থান। কীভাবে হবে? বাংলামুখী রাজনীতি তাকে গড়বে। প্রেরণা দেবে সংস্কৃতিকর্মী, সেই ইতিবাচক ভবিষ্যতটি গড়বে সংস্কৃতিকর্মী।

তিন
ঐ রকমটাই হবার কথা। এবং হবে। কিন্তু হচ্ছে না কেন তবে? পঁচাত্তরকে ডিঙিয়ে আগুনকে জ্বালিয়ে রাখা গিয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন যে পৃথিবীর ও আমাদের সত্তর বছরের সকল শুভযোগের, সকল মনুষ্যে-নিবেদিত ত্যাগের, আমাদের সকলের আত্মার শ্রেষ্ঠ অর্জনটির পতন। কিন্তু তবুও টিকে থাকে কিউবা। এবং লাতিন দুনিয়ার সকল মুক্তিযুদ্ধ এবং ভিয়েতনামের বিনির্মাণ। এবং চীন আদায় করে নিতে থাকে সাম্রাজ্যবাদের সমীহ। এবং পূর্ব ইউরোপে ফিরে আসতে থাকে হারিয়ে যাওয়া মানুষ, হারানো শক্তি। কিন্তু এই বাংলাদেশে আর যেন জোড়া লাগাবার নয় শুভবোধের কেন্দ্রগুলি। সমস্ত ল-ভ- হয়ে যাবার পর শেষ আঘাত আসে ৬ ডিসেম্বর’৯২। বাবরি মসজিদ। অবিশ্বাস্য। অবিশ্বাস্য সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিষ্ফোরণ নয়- শুভ বুদ্ধির মানুষগুলির সরে থাকা। কোনই চি‎হ্নিত ভালো মানুষ অর্থাৎ ত্যাগী রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক কর্মী বেরিয়ে আসেননি ঘরের কোণ থেকে, দাঁড়াননি রাস্তায়। আশ্চর্য, লক্ষ লক্ষ মানুষ, গুণ্ডা নয় মস্তান নয়, বুভূক্ষু হাভাতে- হাঘরে নয় পরিষ্কার ভদ্র মানুষ এবং একটি পরিষ্কার ভদ্রভাবে দুই যুগে এই প্রথম ক্ষমতায় আসা একটি সরকার প্রকাশ্যে স্পষ্ট দ্ব্যার্থহীন অবস্থান নিল: ভারতে ওরা যা করেছে তার তুলনায় আমরা কিছুই করলাম না- এইটুকু শিক্ষা দেওয়া দরকার- মানুষ তো মারিনি, যাতে ইন্ডিয়াতে গোলমাল করতে চিন্তা করতে হয় সেই ব্যবস্থা হল। যে ছুরি মারে, যে আগুন দেয় অবিকল তার যুক্তি। কাকে হানছ তুমি, পাঁচটা পঁচিশটা পাঁচশোটা মন্দির ভেঙ্গে, দশটা একশটা নারী ধর্ষণ করে তুমি তোমার রাষ্ট্রকে মারছ, সমাজকে মারছ, জাতিকে-জাতীয়তাকে মারছ, ভবিষ্যতকে খাচ্ছো, নিজকে নষ্ট হচ্ছ বন্ধুবান্ধব সন্তানসন্ততিসহ- কেবল বাংলা এবং সংস্কৃত নাম থাকার অপরাধে তুমি কোটি মানুষকে মানুষের মর্যাদা দিচ্ছ না, নিজেকে ভাবছ বেড়াল তাদেরকে ভাবছ ইঁদুর, তাদরেকে তোমার থেকে আলাদা করে ভাবছ তাদের বুঝি নাগরিকতার কোন রাষ্ট্রীয় অধিকারও নেই- নেই মৌলিক অধিকার যা রাষ্ট্রসত্তারও পূর্বগামী-এ যে ইজরায়েলে ইহুদিও আরবের বিষয়ে করে না। ইজরায়েলকে-অস্বীকার-করা আরব ঐ রাষ্ট্রে যতটা মানুষ এবং নাগরিক বলে ইহুদি কর্তৃক গৃহী, আমাদের কোটিতে গণনীয় স্বজাতি স্বদেশী বাঙালি সেই আরবদের মতও ন্যূনতম অধিকার এবং মানবিক মর্যাদা ও সমতার সম্পর্কের ভিতরে গৃহীত হচ্ছে না। দক্ষিণ আফ্রিকায় সাদারা কালোকে যা করে এসেছে, ভেবে এসেছে এতকাল, সেই জিনিস দেখলাম স্বাধীন বাংলাদেশে।

মন্দির তো ভাঙল না, মন ভাঙলো সবার, যেটুকু মন ছিল। রাজনৈতিক মারকে পার হওয়া গিয়েছিল, মার ভিতরটাকে মারে, সব কিছ্ইু অর্থহীন করে তোলে, সমাজ আর সমাজ থাকে না, মানুষের জীবন বলতে কোন জীবন থাকে না। সংস্কৃতিকর্মী, সংস্কৃতিমনস্ক অর্থাৎ বিশ্বমনা মানুষ সোভিয়েতের পতনকে হজম করে কতটুকুইবা টিকে ছিল, এবারে তার প্রত্যয়-প্রতীতীর সব গেল।

রবীন্দ্রনাথের গান কে করবে, কারা করাবে? সম্মিলন পরিষদ্ কারা করবে, কেন করবে? শিল্পচর্চার কোন কি অর্থ থাকল যেখানে চর্চা কেবলি সম্পত্তি দখলের এবং শিক্ষা দেবার, মানুষকে গরু ছাগলের চাইতে তুচ্ছ করবার? লেখাপড়া চাকরি-বাকরি ব্যবসা-বাণিজ্য যেখানে কেবলই আত্মপ্রষ্ঠিার এবং অপরকে পায়ের তলায় ফেলবার প্রাণপণ প্রয়াস, যেখানে শিল্পও পঁচে গিয়ে ওই মত ঘটনারই দারুণ খাসা পণ্য হয়ে দাঁড়ায়। রবীন্দ্রসঙ্গীত তো আজ বৃহৎভাবে যে-কোন কৌশলে আত্মপ্রতিষ্ঠা ও গ্ল্যামার- অর্জনের খুবই লাগসই হাতিয়ার হয়েছে, দরদহীন, ভাবনাবিহীন, সমাজবিরোধী মানুষগুলো তাকে খুব কাজে লাগাচ্ছে। এবং রবীন্দ্রসঙ্গীতকে, সঙ্গীতকে, সকল শিল্পকে সকল বিদ্যাচর্চাকে মানসচর্চাকে তাদের প্রধান ও একমাত্র ভূমিকা ও তাৎপর্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে কেবলই বেশ্যার মত ব্যবহার করা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে সম্মিলন পরিষদ্ কিভাবে তার কার্যক্রম চালাবে, এই কার্যক্রমেরই কি কোন মানে আছে, কোন ভবিষ্যৎ আছে? যখন মফঃস্বলে কথা ওঠে আপনারা রবীন্দ্র-রবীন্দ্র করে আপনাদের কর্মের ক্ষেত্র সংকুচিত করছেন কেন? কিংবা কম চালাকিপূর্ণ সাদা জিজ্ঞাসা আসে নজরুল পরিষদ করছেন না কেন আপনারা, মুসলমানকে পছন্দ নয়? ঐ উভয় প্রশ্ন কেবল একই কারণে জাগতে পারে, সংস্কৃতিক্ষেত্রে বৃহত্তর উদযোগ লক্ষ্য নয় তার, একটি হিন্দু মানুষের নামকে মাথায় রেখে এই মুসলমানের দেশে এতটা লাফালাফি ঠিক হচ্ছে না- এই মেসেজটাই পুরে দেওয়া আছে ঐ প্রশ্নদ্বয়ে। এই প্রশ্ন এক ভয়াবহ রাজনৈতিক-সামাজিক ও প্রধানত সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির ফসল, বিরাজমান পরিস্থিতিকে সে তুলেই ধরতে পারে, আরো খারাপ করতে পারে না।

চার
পরিস্থিতির ভয়াবহতাই নিরাময় উদযোগকে আরও শক্ত করে ধরবার বিষয়টি অত্যাবশ্যক করে তুলছে। হতাশা করা পরিস্থিতিতে হতাশ হয়ে পড়া বিধেয় নয়, নতুন করে আশার সঞ্চার হয় তাতে যেতে হয়। বিশেষত হাল ছাড়ার একটাই মানে যেখানে তলিয়ে যাওয়া, সেখানে ফিরে দাঁড়াবার, সমাজের পক্ষে মানুষের পক্ষে মানবতার পক্ষে, সত্য এবং সৌন্দর্যের, জ্ঞান এবং প্রেমের পক্ষে রুখে দাঁড়াবার চেষ্টার চাইতে গৌরবজনক আর কোন পন্থা নেই, বস্তুত কোন পন্থাই নেই। গান গেয়ে-গেয়ে পরিষদ করে করে গানের এবং পরিষদের অর্থ-তাৎপর্য ও সমাশুভকর ভূমিকা ফিরে দাঁড় করাতে হবে। আজকের পরিস্থিতিতে প্রথম বড় কাজ তলিয়ে দেখা কেন এমনটা হতে পারল। হাজার হলেও সাংস্কৃতিক ব্যাপারটা রাজনৈতিক সামাজিক এমনকি অর্থনৈতিক পতন প্রক্রিয়ার সঙ্গেই অন্যান্য সম্পর্কে-ওয়ান-টু-ওয়ান সম্পর্কে ব্যবর্তিত হয় না। মহৎ শিল্পকর্ম জাতির নিতান্ত দুর্যোগের সময়ও সৃষ্টি হতে পারে, ঘোর অন্ধকার দিনে জাতি সবচাইতে আলোকিত ত্যাগ ও আদর্শকে পায়। পেরিক্লিসের এথেন্সেই কেবল সংস্কৃতি বিকশিত হয় না। চরম ঔপনিবেশিক দাস্যের অপমানপঙ্কের তলা থেকে রবীন্দ্রনাথ-বিদ্যাসাগরের মত মানুষ উঠে এসেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের যোগ্যতার। দু:সময়ের কোনও দোহাই দিয়ে আমাদের দায় এবং যোগ্যতার প্রশ্নকে এড়ানো যাবে না। আমাদের সত্য আদর্শের শক্তি দিয়ে, প্রজ্ঞা ও ত্যাগের শ্রেয়তা দিয়ে যদি আমরা পাকিস্তান নামের রাক্ষসকে বিদায় করে থাকতে পারি, তবে সেই একই পাকিস্তানিতার কাছে আজ এই আঠারো বছর ধরে হারতে হারতে যে দেয়ালে পিঠ ঠেকেছে তার পিছনেও আমাদেরই কর্মের ফল কাজ করছে, এই সোজা কথাটা ঐ প্রথম গৌরবের সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে আছে।

আমরা সংস্কৃতিকর্মীরা তথা শিল্পচর্চায় নিযুক্ত মানুষেরা, নানাবিধ বুদ্ধিপ্রধান পেশার মানুষেরা ও মননচর্চায় নিরত বুদ্ধিজীবীরা কোথায় কী ভুল করেছি কর্তব্য নির্ধারণে কিংবা তার পালনে যার ফোকর গলে একটা গোটা দেশ হাইজ্যাক হয়ে যেতে পারল, ভেবে দেখতে হবে। রাজনৈতিক ব্যর্থতার বয়ান রাজনীতিকরা করুন সাংস্কৃতিক ব্যর্থতাকে আমাদের আজ বাঁচবার প্রয়োজনে খটখটে আলোয় বিশদ করে উপস্থিত করতে হবে।

গোড়াতেই যে ভুল হয়েছে সেটা সর্বাত্মক এবং মারাত্মক। রাজনৈতিক কর্মী ভালো আছে মন্দ আছে- এক ধরণের মানুষের কাজেকর্মে রাজনীতি, হয়তো প্রধানত দলীয় এবং আপন পেট পূজারই রাজনীতি, প্রধান ভাবনা পায়, প্রধান অংশ পায়। সংস্কৃতিকর্মী বলে কেউ কি আছে, কিংবা সংস্কৃতিকর্ম? গান-নাচের সান্ধ্য আসরকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বলবার হাস্যকর বিভ্রম বিষয়ে আমরা অনেকেই সচেতন কিন্তু সেই ভুল আমরা এখনও ছাড়িয়ে উঠতে পারিনি। সংস্কৃতি ও শিল্প দুই পৃথক শব্দ, তাদের দ্যোতনা অভিধা, এলাকা, এলাকার ভিতর-বার বিশিষ্ট এবং সকলকালে সমপাতী নয়। শিল্পের প্রায় সবটাই সাংস্কৃতিক ঘটনা হলেও সংস্কৃতির খুবই কম অংশ জুড়ে শিল্প। এবং শিল্পেরও রয়েছে রাজনীতি, সমাজতত্ত্ব মায় ফিজিকস্ পর্যন্ত। সংস্কৃতিতে জন্মে মানুষ, সংস্কৃতিকে আচরণ করে মানুষ। যেমন সে ভাষাকে আচরণ করে। ব্যক্তি মানুষ কখন একাই ভাষা নির্মাণ এবং ব্যবহার করে না। শিল্পেও মানুষ জন্মায় বই কি, শিল্পের বহমান স্রোত আছে প্রজন্ম থেকে ও প্রজন্মান্তরে। রাঢ়ের গ্রামের পটুয়াদের মত, মনিপুরের নৃত্যচিত্ত মানুষের মত অধিকাংশ শিল্পী শিল্পের কালশায়ী স্রোতে জন্মায়, আজীবন নিত্য অবগাহন করে। তবু শিল্পী তার নির্মাণ কর্মে তার সৃজন প্রক্রিয়ায় একা, একক। কেবলি সংস্কৃতিতে সে সকলের সঙ্গে যুক্ত। শিল্পের নির্মাণে সে একা- সে শিল্প যখন সংস্কৃতি হয়ে ওঠে তখন সে তার ভিতর দিয়ে সকলের সঙ্গে মিলনে পৌঁছায়। সংস্কৃতি যেন স্বভাবের মতই একটা পেয়ে যাওয়া কিছু, করে নেওয়া নয়। শিল্পের প্রায় সবটাই নিয়ে-নেওয়া অনেকটাই করে নেওয়া। শিল্পের মধ্যে সৃষ্টি অংশটা মূখ্য, তা নির্মাণেই- অধিকাংশ আটকে থাকলেও। ঐ সৃজনমুখী নির্মাণ প্রক্রিয়ায় মানুষ নিজের ভিতর নিজে হয়ে উঠতে থাকে, তার ফসল দিয়ে অন্যের হয়ে ওঠাকে উসকিয়ে দেয়। সুনীতি সদাচার সংস্কৃতির মূল ধারক-বাহক-প্রকাশক। সুনীতি-সদাচারলগ্নতা মানুষকে চারিত্র দান করে, ভিতর থেকে বদলায় না, সংস্কৃতির চৌহদ্দি এবং রূপরস বাড়ায় না।

আমি গান করি এবং করাই, তামান্না নাচে, নাচ করায়। আমিনুল আঁকে এবং আঁকায়। আমরা শিল্পী হতে পারি, শিল্প সংলগ্ন মানুষ হতে পারি। আমরা কি সংস্কৃতি কর্মী? আমাদের বিষয় যতটা শিল্প, সংস্কৃতি নয় মোটেও ততটা। সংস্কৃতির দুঃসময়ে শিল্পীরা হতেই পারেন প্রচণ্ড অসংস্কৃত অপরিমার্জিত আত্মপর সংকীর্ণচিত্ত মানুষ, এখনকার শিল্পীদের সাংস্কৃতিক অবস্থান লক্ষ্য করলে সেই দুঃসময়কে চাক্ষুস করা যাবে। তা হলে সংস্কৃতিকে অনুধাবন করে, কে করবে তার দ্যাখশোন্? সংস্কৃতি যদিও একা মানুষের সৃষ্টির ব্যাপার নয়, নির্মাণেরও নয় তবু তারও একটা গতি-অগতি আছে। একটা জাতি অর্থাৎ অভিন্ন সংস্কৃতির পরিচয়ে ভিতরের একটি সমানভূক্ত মানুষ তো অনবরতই মার খেতে পারে কিন্তু যতক্ষণ-না সে সংস্কৃতিতে মার খাচ্ছে ততক্ষণ সে সামলে উঠতে পারে। শিল্পের অবক্ষয় সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের সূচক, সাংস্কৃতিক অবক্ষয় সমাজ তথা মানব অবক্ষয় অর্থাৎ যারপর আর ধ্বসং নেই, পঁচন নেই তাই। যারপরে আর মৃত্যু নেই, তাই। এই সংস্কৃতিরূপী জাতির প্রাণভোমরাটির সুদিন-দুর্দিন, স্বাস্থ্য-অস্বাস্থ্য কি কারোই দেখবার নয়? চিকিৎসক তো মানুষ সৃষ্টিও করে না, নির্মাণও করে না। সে তো শরীরের ভালোমন্দের তদারকি করে, সাহিত্যিক শিল্পী তো অবশ্যই মনের তদারকি করে, এত করেই করে যেন প্রায় গড়েই নেয়। সংস্কৃতি তো বহুজনমানস, তার দ্যাখভালের ব্যাপার নেই? সাম্প্রদায়িকতার মূল প্রেরণাটি নিতান্ত লোভ-লালসা, বিষয়বুদ্ধিগত সংকীর্ণ স্বার্থান্ধতা- কিন্তু তার অস্ত্রটি সাংস্কৃতিক যে, অস্ত্র দিয়ে সাম্প্রদায়িক ক্লীব নিজেকে প্রথমে হনন করে পরে অপরকে হানে।

ভাষা-আন্দোলনের সময় আমরা সাম্প্রদায়িকতার একটি বিপরীত পর্যায়ে কাজ করেছি। নিতান্ত ঐহিক, নিতান্ত বাস্তব স্বার্থবোধ সেখানেও কাজ করেছে, কিন্তু সেখানেই সাংস্কৃতিক আত্মরক্ষার মধ্য দিয়ে জাতির নিজেকে রক্ষা করবার ব্যাপারটি প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংস্কৃতি সেখানে বিষয়, কোন কিছু উদ্ধারের অস্ত্র নয়। সেই মানসিকতা সামাজিকতা আন্দোলনকারীর নিজেকে মারেনি, অপরকেও কাটেনি। অথচ কী আশ্চর্য ফলই না দিয়েছে। একটা পতিত আত্মবিস্মৃত জাতিসত্তাকে উঠিয়ে দাঁড় করিয়েছে, বড় মাপের রাজনৈতিক সুবিধা ও সম্ভাবনা এনে দিয়েছে। পরিপূর্ণ জাতীয় বিকাশের একটা স্বপ্ন এঁকেছে।

ষাটের দশকের সাংস্কৃতিক আন্দোলন ঐ ভাষা-আন্দোলনেরই নব – পর্যায়। জাতিকে তার আত্মপরিচয় উদ্ধারে উদ্বুদ্ধকরণ তার মূল কাজ ছিল। পাকিস্তানিতার বিনাশী প্রপঞ্চের স্বরূপ হল ধারাসম্পৃক্তিচ্ছেদ, ইতিহাস ছাড়া করা, ঐতিহ্যলগ্নতাকে হনন করা। মানুষ মানেই সমকালে শত কোটিতে অনুভূমিক বিস্তৃত মানুষের সংসার এবং আরো অনেক অধিক করে কালের উল্লম্ব বিস্তারে গ্রথিত লক্ষ লক্ষ কোটি মানুষের সমগ্র অস্তিত্ব ও উদ্বর্তনের সঙ্গে গ্রথিত মানুষ। মানুষের এই কালিক মাত্রার নাম সংস্কৃতি। আমেরিকার তথাকথিত নতুন পৃথিবীর নিতান্ত পুরাতন মানুষগুলি, যারা এশীয় ভূখ- থেকে ত্রিশ থেকে বিশ হাজার বছর আগে ওখানে গিয়ে আবাদ করেছে, ষোড়শ শতাব্দী থেকে হারিয়ে যেতে আরম্ভ করল। তাদেরকে সংস্কৃতি ছাড়া করতে প্রয়োজন হয়েছিল স্পেনীয় কংকিস্তাদোরকে, হালাকু-চেঙ্গিস যাদের কাছে নস্য। বাঙালি কোন কংকিস্তাদোরের মার না খেয়েই, প্রায় যেন যেচেনেচেই নিজের সকল উৎস, সকল ধারা, সকল অতীত সকল ঐতিহ্যকে হত্যা করে সাম্প্রদায়িক হিংসাকে একমাত্র অবলম্বন করে কোথাও যেতে চেয়েছিল, অপর ধর্মসম্প্রদায়ের মানুষকে জীবনের সুবিধার দিকগুলিতে পশ্চাৎ থেকে হঠাৎ লাফিয়ে, পিছনে ফেলতে চেয়েছিল। ফল ভালো হয়নি, ফল তো হয়েছে জাতি হিসেবে, সমাজ হিসেবে, মানুষ হিসেবে লোপ পাওয়া। হঠাৎ যখন নজর হল কারা যেন এই প্রক্রিয়ায় বেগ জোগাচ্ছে, দিচ্ছে বাহবা, চাপড়াচ্ছে পিঠ, এবং আমাদেরই ঘরেরটা খেয়ে সাফ করছে সেই সঙ্গে। সম্বিত ফিরলো অনেকের, এই পথে, কিংবা নিতান্তই নিজের পরিস্থিতি বুঝতে পারার কিংবা নিজের প্রতি শ্রদ্ধার রোধ নিঃশেষে শেষ হবার আগের জ্বলা ওঠাটির সূত্রে। ভাষা-আন্দোলনও তো ঐ ছিল মূলে, ভিতরে। এবারে আন্দোলন দাঁড়ালো প্রধানত গানকে বাহন করে। ষাটের সে আন্দোলন কি ছিল সঙ্গীতে উৎকর্ষ নির্মাণের আন্দোলন, নাকি ভাষা আন্দোলনই ছিল বাংলা ভাষার উন্নয়ন চেয়ে আন্দোলন? ভাষা আন্দোলন আগাপাস্তলা একটি নির্জলা রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল, যার উপলক্ষ্যটি সাংস্কৃতিক, পোশাকটি সাংস্কৃতিক – এবং রাজনৈতিক নগদ – ফায়দার ব্যাপার পেরিয়ে অন্তরে যা অন্তরতমভাবে সাংস্কৃতিক। ষাটের সাংস্কৃতিক আন্দোলনও ছিল তাই। পাকিস্তানিতার মুখোশ উন্মোচন করে তার প্রত্যাখ্যান নির্মাণ কিন্তু অন্তঃসারশূন্য নেতিমূলক মানসিকতায় নয়, নিজের সত্যসংস্কৃতির প্রতি ফিরে তাকাবার সদর্থক উপাদানকে ভিত্তি করে দাঁড়িয়েছিল সেই আন্দোলন।

সেই আন্দোলনের সবচাইতে চেনা ধ্বজাটি অবশ্যই রবীন্দ্র-নামাঙ্কিত, রবীন্দ্রসঙ্গীতে ফেরার আন্দোলনও যেন ছিল সেটা। প্রকৃত ঘটনা ধ্বজা অনেকই ছিল। মুড়ি-মুড়কিতে ফেরা ছিল। শাড়ি পাজামা পাঞ্চাবীতে ফেরা ছিল। ছিল বাংলা নববর্ষে প্রতিষ্ঠা ঋতু-উৎসব অনুষ্ঠান। নাচ গান নাটক চিত্র শিল্প চলচ্চিত্র সব কিছুতে নবযাত্রা নির্মাণ, সাহিত্যেও তাই, এও তো কত গৌরবের ধ্বজা ছিল।

পঞ্চাশের ভাষা আন্দোলনে, ষাটের সঙ্গীতভিত্তিক আন্দোলনে অনেক অনেক মানুষ আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাস্থ্য-অস্বাস্থ্যের বিষয়েই ভাবিত হয়েছেন, উদযোগ গ্রহণ করেছেন। সকলে সমান সচেতনতভাবে করেননি। অনেকে রীতিমত অচেতনভাবেই হয়তো করেছেন। এই সংস্কৃতি আন্দোলনের আরম্ভটা হয়েছিল রবীন্দ্রজন্ম শতবর্ষ উৎসব পালনের মধ্যে দিয়ে। তাতে যাঁরা যুক্ত হয়েছিলেন তাদের সকলেই তার পুরো অর্থ বুঝে যোগ দেননি। যারা যোগ দেননি এবং বিরোধিতা করেছেন সেই বাঙালি কবি সাহিত্যিক গায়ক গায়িকারা এবং পাকিস্তানের সরকার বরং অনেক বেশি করে রবীন্দ্রশত বার্ষিকের তাৎপর্য বুঝেছেন এবং তার ভিত্তিতে সাংস্কৃতিক তথা জাতীয় জাগরণকে আঁতুড় ঘরেই বিনাশ করতে চেষ্টা পেয়েছেন। এমনটা ভাষা আন্দোলনের ব্যাপারেও ঘটেছিল। তার সূচনালগ্নেই পাকিস্তানবাদীরা শুনতে পেয়েছিল পাকিস্তানের দূরাগত মৃত্যুঘণ্টা, যা আন্দোলনবাদীদেরই অনেকে বুঝতে পারেননি এবং পারলে হয়তো অনেকে সরেও পড়তেন।

আমাদের বর্তমান সাংস্কৃতিক সঙ্কটকে মোকাবেলা করবার জন্যে হয়তো প্রয়োজন ঐ ভাষা আন্দোলনেরই নবতম পর্যায়, তৃতীয় তরঙ্গ। ভাষা-আন্দোলন অর্থাৎ সুস্পষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্যের উপর নজর স্থির করে সাংস্কৃতিক ইস্যুকে অবলম্বন করে প্রকৃতপক্ষে শেষ পর্যন্ত আত্মবিষ্মরণকে জয় করে জাতীয় হীনম্মন্যতাকে অতিক্রম করে একটা সৃজনশীল জাতীয় অস্তিত্ব নির্মাণের আন্দোলন। ভাষা-আন্দোলনে, ষাটের আন্দোলনে ভাষা ও সঙ্গীতের উন্নয়ন নয় দেশমুখী সংস্কৃতিমুখী একটা রাজনীতি নির্মাণই প্রধান ছিল আড়াল থেকে। এখনকার রাজনৈতিক চেতনাপ্রখর সাংস্কৃতিক জোটের দলগুলি পর্যন্ত হয় তো সেই রাজনীতিকে দেখতে পায় না, পায়না কোনই সাংস্কৃতিক ইস্যু।

এই নতুন আন্দোলনের সৈনিক কে? সংস্কৃতিকর্মী। সংস্কৃতির কর্মী কে? গায়ক, চিত্রশিল্পী, কবি? এঁরা সকলেই নিজের নিজের এলাকার ঝুটঝামেলা নিয়ে ব্যস্ত, সংস্কৃতিক সঙ্কট দূরে থাক, তার পুরো ব্যাপারটিই অধিকাংশের জন্যে থেকে যায় আড়াল, সারা জীবন ধরেই আড়াল। হয়ত শিল্প জিনিসটার ভিতরেই, তার নিবিষ্ট চর্চায় যেমন, তার অভীষ্ট লাভেও তেমনি একটা ভোলা আত্মমগ্নতা কিংবা হয়তো আত্মপর আত্মমগ্নতাও থাকে শিল্পে মগ্ন মানুষদের অধিকাংশ জীবনকে সমাজকে মিলিয়ে কিছু দেখবার কিছু পাবার কথা তেমন করে আপনা থেকে বোধ করেন না। বিভিন্ন বিষয়ের মানুষের অনেকে সঙ্গীত কিংবা চিত্রকে উচ্চমানেই পেয়েছেন, কিন্তু সঙ্গীতজ্ঞ কিংবা চিত্রশিল্পী বড় মাপে বিজ্ঞানে কিংবা সাহিত্যে প্রবেশ পাননি। কেবলি শিল্পের ভিতরের আলোর সন্ধানী মানুষ বাইরের অন্য আলোকে সত্যকে সুন্দরকে না-জানবার ফলে কত সময়ই আত্মমগ্নতার মধ্যে সংকীর্ণ অনুদার ঈর্ষিত আত্মপরায়ণতার পাঁকেই যান আটকে। তবুও তো সকল সজ্ঞান সচেতন সংস্কৃতিকর্মের পুরোধা শিল্পীই। তাকে বাদ দিলে সংস্কৃতি আন্দোলন হবে দিনেমোর যুবরাজহীন হ্যামলেট নাটকের মত। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই বলতে হবে কেবল তাঁদেরকে দিয়েই হবেনা এ আন্দোলন। সংস্কৃতিতে সকলেই আছেন ডুবে, তার বাইরে কেউ নয়। তবু তাবৎ লোকে সংস্কৃতির চেতনাস্পৃষ্ট মানুষ কম সংস্কৃতি মনস্ক সেই স্বল্পমানুষের দলকে প্রয়োজন আন্দোলনের সৈনিক হিসেবে, শিল্পীর হাত থেকে শিল্পীকে অনেক সময়ে শিল্পকেও, রক্ষা করবার জন্যে। সচেতন সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রী মানুষের মধ্যে শিল্পী ছাড়াও পাওয়া যাবে সাহিত্যিক ও অন্যতর সকল প্রকারের লেখক এবং নিবিষ্ট পাঠক, অধ্যাপক ও অগ্রসর ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক ও অন্যান্য পেশাজীবী নরনারী। এঁরা সকলে মিললে এলাকা খুব ছোট হবে না। এই বড় দলে সমাজ চেতনা, সংস্কৃতি চেতনার মাপে শিল্পীরাই পড়বেন পিছন সারিতে। চেতনার কারবার সরাসরি লেখক-সাহিত্যিকের-কবির, প্রাবন্ধিকের, ঔপন্যাসিকের। সংস্কৃতিকর্মে লিপ্ত সকল জনের সম্মিলনে কোন ক্ষেত্র প্রস্তুত হলে সকলেরই নিজ নিজ অভাব পূরণের সুবিধা হয়, সকলের মিলিত সংস্কৃতি শক্তি সমাজ-শক্তিতে রূপান্তরিত হবার পূর্ণ সম্ভাবনা দেখা দেয়। সেই রূপান্তর প্রক্রিয়ারই নাম সংস্কৃতি আন্দোলন। শুভদা ফলদা জঙ্গম মূর্তিপরিগ্রহণের পূর্বশর্ত যদি সকল সংস্কৃতিমনস্কের উদার ও দায়বদ্ধ মিলনক্ষেত্র নির্মাণ হয়, তবে এর চরিত্র তথা ইনটেগ্রিটির নিত্য উৎস হতে হবে প্রত্যেকের নিজ নিজ ক্ষেত্রে গুণ তথা কোয়ালিটির প্রশ্নে আপোষহীনতা তথা নিটোল সততা।

এইমত সংস্কৃতিকর্মে লিপ্ত এবং সংস্কৃতিমনস্ক সকল জনের মহামিলনক্ষেত্র রচনার প্রারম্ভিক উদযোগই জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের মূল বিষয়। রবীন্দ্রসঙ্গীতের শিল্পী, শিক্ষক ও প্রেমী প্রথম হোতা এই যজ্ঞের এবং একাজে তাদের অধিকার এবং যোগ্যতা সংশয়াতীত, রবীন্দ্রনাথের কারণে, তাঁর জারণক্ষমতার কারণে। কিন্তু এইখানেই থেমে গেলে পরিষদ নিতান্তই একটি সঙ্গীতোন্নয়ন প্রতিষ্ঠানে শেষ হবে। বিগত এক যুগের পরিষদ-অভিজ্ঞতা বলে, সকল শুভশক্তির মনোযোগ পরিষদের কর্মকাণ্ড আকর্ষণ করলেই এখানে সঙ্গীত-ভিন্ন অন্যতর সংস্কৃতি-অঙ্গনের মানুষ নিজের ক্ষেত্র খুঁজে পান না। প্রয়োজন এখন পরিষদকে সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীত তো নয়ই, বাঙালির সকল সঙ্গীত, কেবল সঙ্গীত তো নয়, সকল শিল্প, কেবলই শিল্প নয়, সাহিত্য নয়, সংস্কৃতিকর্মে নিযুক্ত সকল মানুষ, বস্তুত সংস্কৃতিমনস্ক সকল মানুষ যেন এখানে তাঁদের আপন ঠাঁইটি পান, সেই মত করে এই সংগঠনের পরিচালনের প্রয়োজন।

যে কোন জেলা শহরের সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির দিকে তাকালেই কর্তব্যকর্মের একটা ছবি পাওয়া যায়। রয়েছে সেখানে শিক্ষিত মানুষের ঘনবসতি-যারা হতে পারতেন লেখক গায়ক চিত্রী সাহিত্যিক কিংবা নিদেনপক্ষে এতৎক্ষেত্রের রসাস্বাদী মানুষ। বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত মানুষ বিশেষ করে শিক্ষক-অধ্যাপক-ছাত্রছাত্রী, ব্যবহারজীবী, চিকিৎসক-প্রকৌশলী মানুষের পক্ষে সংস্কৃতি কর্মে যুক্ত হবার কথা আপন তাগিদেই। কিন্তু এটি হয়নি কোথায় যেন একটা কি বাধা তাঁদের অধিকাংশকে নির্লিপ্ত করে রেখেছে। কেবলি সঙ্গীতের অনুশীলন প্রসারণ কর্ম দিয়ে এদেরকে উদ্যোগী সংস্কৃতিকর্মের চত্বরে টানা যাবে না। তাই সম্মিলন পরিষদের কর্মকে আরো ব্যাপ্ত করা প্রয়োজন। প্রথমেই যেদিকে কাজকে মেলে ধরা যায় তা হলঃ
১। নিয়মিত সঙ্গীত বিদ্যালয় পরিচালন যার অনুশীলনের মূল বিষয় রবীন্দ্রসঙ্গীত হলেও অন্য চার প্রধান সঙ্গীতকারের গানেরও চর্চা হবে ও ভিত্তি-সঙ্গীত হিসেবে রাগসঙ্গীতের প্রাথমিক পাঠ থাকবে নিত্যচর্চার বিষয়।
২। এই মঞ্চটি থেকে বাংলা শুদ্ধ উচ্চারণ ও আবৃত্তি চর্চার ব্যবস্থা করতে হবে। এর জন্যে বৎসরে অন্তত দুইটি কর্মশিবির করে সঙ্গীত চৌহদ্দির বাইরের তরুণশক্তিকে যুক্ত করতে হবে।
৩। পরিষদের জেলা পর্যায়ে সঙ্গীতসূত্রে কিংবা আবৃত্তি ইত্যাদি সূত্রে যুক্তি মানুষকে নাট্যপ্রয়াসে উদ্বুদ্ধ করবার ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪। প্রতিটি জেলা শাখায় পাঠচক্র গড়ে তুলতে হবে। এবং পাঠাগারের সূচনা করতে হবে।
৫। চিত্রাঙ্কনের বিভাগ সম্ভবমত সর্বত্র খুলতে হবে স্থানীয় সুযোগের ভিত্তিতে। কেন্দ্রীয় সহযোগিতা উপরের সকল উদ্যোগের জন্য অপরিহার্য এবং তা নিশ্চিত করতে হবে।
গান, আবৃত্তি, নাটক, ছবি, সাহিত্য এই চারটি বৃহৎ ক্ষেত্রকে জেলায় প্রতিষ্ঠা করবার চেষ্টায় অনেক অনেক অধিক মানুষ এই মঞ্চে সমাবিষ্ট হয়ে পরিষদকে সত্যিকার একটি সংস্কৃতি-প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে। এবং এইখান থেকে সূচনা হবে নিজেকে চেনার-জানার সকলকে সাক্ষর ও শক্তিমান করবার সর্বপ্লাবী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের। রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের এই মুহূর্তে এই মূল কাজ। এই কাজ সফল করবার চাবিকাঠি অবশ্যই থাকবে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্ষেত্রে পরিষদের সৎ আপোষহীন তাৎপর্যপূর্ণ সম্প্রসারণ কর্ম, সেই সঙ্গীতের অমৃত-নিষেকের মধ্য দিয়ে সকল মানুষের মধ্যে সংস্কৃতিপ্রাণতা তথা জীবনের স্নিগ্ধ সুষমার দিকে যাবার আকাঙ্ক্ষার সঞ্চারণ।
লেখাটি রাজা সহিদুল আসলাম সম্পাদিত ও জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, নীলফামারী শাখা প্রকাশিত ‘তিমিরদুয়ার খোলো’ সংকলন থেকে প্রকাশ করা হলো। – এডমিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here