শিল্পী সমর মজুমদার। বাংলাদেশ

0
1326

শিল্পী সমর মজুমদার

রাজা সহিদুল আসলাম

প্রায় ৩২/৩৩ বছর আগে ঠাকুরগাঁওয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর আয়োজনে ও ঠাকুরগাঁও জেলা শিল্পকলা একাডেমীর ব্যবস্থাপনায় একটা প্রদর্শনী হয়েছিল। সেখানে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, কামরুল হাসার, কাইয়ুম চৌধুরী, মর্তুজা বশীর, সমর মজুমদার, ফরিদা জামানসহ বেশ কয়েকজন শিল্পীর ছবি ছিল। আমি সেখানে স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকায় ছিলাম। এই রকম প্রদর্শনী সম্ভবত এটাই ঠাকুরগাঁওয়ে প্রথম। অনেক দর্শক হয়েছিল। আমারও পেইন্টিংস দেখা বা প্রদর্শনী দেখা প্রথম। আমাদের ওপর দায়িত্ব বর্তালো দর্শকদের ছবি বুঝিয়ে দিতে হবে। আমরা তো অন্ধ অন্যদেরকে কীভাবে ছবি বুঝাবো? গৌতমদা, গৌতম রায় অনেক কিছু বুঝিয়ে দিলেন। মনতোষ স্যারও কিছু টিপস্ দিলেন। সেই সময় বুঝলাম – রঙ, রেখা, বিষয় ইত্যাদি বিষয়ে। যেহেতু কবিতা লিখবার প্রচেষ্টায় অনেক পড়তে হচ্ছিল, সে জন্য কিছু কিছু বিষয় খুব সহজে মাথায় ঢুকে গেল। নীল বিষাদের রঙ, লাল বিপ্লব বা প্রতিবাদের, সাদা শান্তির, সবুজ সতেজতা বা যৌবনের – এই রকম মানে। রেখার কৌশল, রেখা বা রঙের ভেতরে রঙের ব্যবহারের ব্যাখ্যা – অনেক কিছু। বিমূর্ত ছবি, মূর্ত ছবি, কোলাজ – এসবও তখন প্রথম শোনা। প্রদর্শনীতে সমর মজুমদারের একটা ছবি ছিল, নাম – প্রসাধন। প্রথম দেখায় তেমন কিছুই কনে হয়নি। কিন্তু যখন ওই ওরিয়েন্টেশনের মত ছবি দেখার সূত্রমুখগুলো আমাদেরকে বুঝিয়ে দেয়া হল তখন ‘প্রসাধন’ ছবিটাকে বেশ মনে ধরলো। একটি নারী হাতে আয়না নিয়ে প্রসাধনে ব্যস্ত। এক গ্রামীণ নারী। নারীর মুখ আঁকা নীল রঙ দিয়ে। তখন এই ছবির নানা রকম ব্যাখ্যা আমার মধ্যে আনাগোনা করতে লাগলো। দর্শকদের যখন ছবি বিষয়ে ব্যাখ্যা করছিলাম তখন ভিন্ন ভিন্ন দর্শকের কাছে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা আমার কাছ থেকে বেরিয়ে আসছিল। অর্থাৎ ছবিটার দিকে নতুন করে তাকালে নতুন কিছু ধরা পড়ছে। নিজের কাছেই অবাক লেগেছে। হঠাৎ করে মনেও হয়েছে – আমি ভুল ব্যাখ্যা করছি না তো?… অনেক পরে জেনেছি প্রকৃত শিল্পের ব্যাখ্যা অনেক রকম হতে পারে। পরবর্তীতে সমর মজুমদারের আরও কিছু ছবি দেখেছি, গুরুত্বপূর্ণ অনেক বইয়ের প্রচ্ছদ দেখেছি। সমর মজুমদারের ছবি দূর থেকে দেখলেই বোঝা যায় এটা সমর মজুমদারের ছবি। এই বৈশিষ্ট্য তিনি অর্জন করতে পেরেছেন বলে তিনি শিল্পী। তিনি সব সময় ডার্ক কালার ব্যবহার করেন। আমার দেখা যত ছবি সেগুলোর কোথাও তিনি উজ্জ্বল কালার ব্যাবহার করেননি। এমন কি বইয়ের প্রচ্ছদেও কড়া উজ্জ্বল রঙ ব্যবহার করেননি। ভারতবর্ষর চিত্রকলার যে ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি তা তিনি সফল ব্যবহার করেছেন। বিষয়ের দিক থেকেও তিনি তাঁর ছবিতে এনেছেন বাঙালি চরিত্র, বাঙালি মানুষ। তবে ফেসবুকের কল্যাণে তাঁর টাটকা কিছু ছবি দেখতে পাচ্ছি। বর্তমানের ছবি আর অতীতের ছবির মধ্যে কিছু পার্থক্য লক্ষ করা যায়। যেমন আগের ছবিতে তিনি ধূসর বা ডার্ক কালার ব্যবহার করতেন। বিমূর্ত ছবিতে শিল্পীর বক্তব্য বা গূঢ় রহস্য লুকানো থাকতো। দর্শক ছবি দেখার পর ভাবিত হতেন বা শিল্পী কেন এই ছবি এঁকেছেন তা নিয়ে চিন্তিত বা মানে খোঁজার চেষ্টায় রত হতেন – এই রকম কিন্তু বর্তমানের ছবিগুলোতে নেই। অর্থাৎ তিনি এখন সরাসরি ছবি আঁকছেন। ছবি দেখলেই সাবজেক্ট বোঝা যায়। আর রঙের ক্ষেত্রেও শিল্পীর পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে তিনি অনেক উজ্জ্বল রঙ ব্যবহার করছেন। তবে বর্তমানের ছবিগুলো বাংলাদেশের ছবি, বাঙালির ছবি – এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। যে কোনো শিল্পীর ছবিতে বাঙালিয়ানা থাকা উচিৎ। যেমন এখন মাঝে মধ্যে শুনি, বাংলাদেশে যারা কবিতা লিখছেন সেগুলো কি বাংলাদেশের কবিতা? বাঙালির কবিতা? বাংলাদেশের কবিতা কেমন হবে, বাঙালির কবিতা কেমন হবে – সেটাও ভাবা উচিৎ বৈকি। সে ক্ষেত্রে সমর মজুমদারের ছবি বাংলাদেশের ছবি, বাঙালির ছবি। এই মুহূর্ত-এ তাঁর ‘দিদি’, ‘শৈশব’ – এইসব ছবির কথা মনে পড়ছে। তাঁর আগের ছবি আর পরের ছবির মধ্যে যে পার্থক্য লক্ষ করা যাচ্ছে, তা আমার কাছে মনে হয়েছে – তিনি নিজের বৃত্ত নিজেই ভেঙেছেন। এটা ইতিবাচক, শিল্পী নিজের বৃত্ত নিজে ভেঙে সামনে এগিয়ে চলেছেন।… এই যে ৫২৬ টা শব্দ আমি লিখলাম এ আমার নিজস্ব অনুভূতি। কোনো রকম ভনিতা ছাড়াই, চিত্রকলা বিষয়ক পড়াশোনা না করে, শুধু একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে আমার অনুভূতি প্রকাশ করলাম।

এখানে শিল্পীর সাম্প্রতিক কিছু ছবি উপস্থাপন করলাম –

দিদি

আমার রবীন্দ্রনাথ

হাওরজীবন।

চুকনগর গণহত্যা ১৯৭১

 

গণহত্যা ১৯৭১

মৃন্ময়ী

খাদিজা বুবুর পিঠা দোকান।

বাবা

১৯৭১ (পাকিস্তানী সেনারা নারীদের উপর অত্যাচারকে বাঙালি অবদমনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলো)

সোহাগী

ঘাটের কথা

ঘুম

ফটোগ্রফার

///-///-///

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here