শামসুর রাহমানের কবিতা – কখনো আমার মাকে। রাজা সহিদুল আসলাম

0
666

কখনো আমার মাকে
রাজা সহিদুল আসলাম

ম্যাক্সিম গোর্কী লিখেছেন ‘মা’ উপন্যাস। পৃথিবীর সব পাঠকের মনে গেঁথে রয়েছে পাভেল আর পাভেলের মায়ের কথা। উপন্যাসে জায়গা থাকে অনেক, লিখবার। কবিতায় জায়গা সে তুলনায় অনেক কম। কবিতা সে কারণে সিডি’র মত। কমপেক্ট ডিস্ক। ইতিহাস, ঐতিহ্য, জীবন, ব্যক্তিগত দর্শন, মিথ, ভূগোল ইত্যাদি যাবতীয় গাদাগাদি হয়ে থাকে কবিতায়। তাই কবিতাকে কবিতা করবার জন্য কবিকে অনেক কিছু ভাবতে হয়। এজন্য দরকার মেধা দৃষ্টিভঙ্গি জ্ঞান দক্ষতাসহ অনেক কিছু। কবিতা তাই উচ্চ মার্গীয় এক শিল্প।
নর এবং নারী – এই দুইজনকে নিয়ে গোটা বিশ্বসংসার আবর্তিত। নর নারীর আবেগকে কেন্দ্র করে এগিয়ে চলেছে গ্লোবাল সংসার। সংসার-জীবন-রীতি নীতি – থেকে যায়, শুধু মানুষের যাওয়া আসা চলে। এই ক্ষণকালে নর নারী কতটুকু করে, কীইবা করতে পারে! তবু কারও কারও ত্যাগ, কর্মকা- সংসারে মহিমা ছড়ায়। পরবর্তী প্রজন্মকে দীক্ষা দেয়। গোটা সংসারকে অলীক-বাস্তব-মহৎ ধারণার দ্বারা পরিচালিত করে।
সংসারে নারী এক অতুলনীয় প্রাসঙ্গিক মানবী। পিতৃ গৃহে থাকে এক ভূমিকা। স্বামী গৃহে আর এক ভূমিকা। যখন সে ‘মা’, সেই অংশে তার আর এক ভূমিকা। বহু ভূমিকার এই নারী তাই বিশ্বসংসারের অনেকটা জায়গা অধিকার করে আছে।
শামসুর রাহমান ‘মা’ বিষয়ক কবিতা লিখেছেন পাঁচটি, আমার জানা মতে। তার মধ্যে ‘কখনো আমার মাকে’ একটি। অনেকবার পড়েছি এই কবিতা। মঞ্চেও আবৃত্তি করেছি বহুবার। কী এক ভালো লাগা অথবা উদাস করা অলীক কিছু লুকিয়ে রয়েছে এর ভেতর। কবিতাটি পড়বার আগের মন-মানসিকতা আর পড়বার পরের মন-মানসিকাতার মধ্যে অনেক পরিবর্তন লক্ষ করি নিজেরই মধ্যে। এমন এক অনুভূতি এমন এক ভাব অন্তরাকাশে ঘনিভূত হয় যা লেখ্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন বৈকি। মনোজগতে উদাস করা আবহ, খণ্ড খণ্ড চিত্রকল্প, নানা চিন্তা কোত্থেকে যেন উড়ে আসে। তখন পৃথিবীর যত মা আছেন, তাঁদের প্রতি অসীম এক মমতায় আমি আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি।
অতীতকাল থেকে শিশু বিবাহ হয়ে আসছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ যখন বাংলাদেশ ছিলোনা, ভারত বর্ষের অন্তর্ভূক্ত ছিলো, তখন অবস্থা ছিলো আরও ভয়াবহ। বিজ্ঞান বলছে প্রজনন স্বাস্থ্য মানব জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মানুষের শরীর বৃদ্ধি বা শরীরের বিকাশ ঘটতে থাকে ২১ বা ২৪ বছর বয়স পর্যন্ত। এই সময়ে সঠিক খাদ্য গ্রহণ ও প্রজনন স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়া জরুরি। একটি মেয়ে শিশুর বিয়ে হওয়া মানেই সে পরিণত বয়সের আগেই মা হবে। মা শিশুটির প্রয়োজনীয় খাদ্য এবং গর্ভের শিশুটির খাদ্য, অথাৎ দ্বিগুণ খাদ্য দরকার। ব্যপক জনগোষ্ঠির সংসারে এটি সাধারণত ঘটেনা। মা শিশুটি অপুষ্টিতে ভুগতে থাকে। উল্টোদিকে গর্ভের শিশুটি মায়ের শরীর থেকে খাদ্য শোষণ করতেই থাকে। এজন্য আমাদের দেশের মায়েরা অল্প বয়সে বুড়িয়ে যায় এবং নানা রকম রোগে আক্রান্ত হয়। আরও একটি বিষয় – মা শিশুটির গর্ভ জায়গা বা ইউট্রাস স্বল্প পরিসর হওয়ায় গর্ভের শিশুটি সঠিকভাবে বেড়ে উঠবার সুযোগ পায়না। গর্ভের স্বল্প পরিসর এবং অপুষ্টি – একত্রিত হয়ে শিশু বিকলাঙ্গ বা প্রতিবন্ধী হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক প্রসূতি মারাও গেছে সন্তান প্রসবের সময়। এই মৃত্যুর পরিসংখ্যান বেশ দীর্ঘ।
‘কখনো আমার মাকে’ পড়লে অনেক কথা মনে আসে। কবি শুরুতেই লিখেছেন –
কখনো আমার মাকে কোনো গান গাইতে শুনিনি।
সেই কবে শিশু রাতে ঘুম পাড়ানিয়া গান গেয়ে
আমাকে কখনো ঘুম পাড়াতেন কি না আজ মনেই পড়ে না।
মা যেন নিস্তরঙ্গ নদীর মতো। নদী স্বাভাবিক নিয়মে কুলুকুলু ধ্বনি তুলে বয়ে যায়। মাও তো তেমন হওয়ার কথা। ওই বয়সে বেণি দুলিয়ে, উচ্ছ্বলতায় গান গাইবে, খিলখিল করে হাসবে, আঙিনার ছোট্ট গাছে চড়ে পেয়ারা পাড়বে। এই সময়েই তার বিয়ে হলো। বাবার বাড়ির পুকুর থেকে শ্বশুর বাড়ির পুকুরে ফেলা হলো। দাম্পত্য জীবন, সংসার, দেবর-ননদ, শ্বশুর-শাশুড়ী – নতুন এক পরিবেশ। কোন কিছু বুঝে উঠবার আগেই হঠাৎ এতসব তাকে নির্বাক করবে এটাই স্বাভাবিক। ছোট্ট জীবনে ছন্দ পতন তো ঘটবেই। ফলে শৈশব-কৈশোরের স্বাভাবিক চাপল্য, চঞ্চলতা, উচ্ছ্বাস, দুরন্তপনা – সবকিছুর মৃত্যু ঘটে। অল্প বয়সে সাংসারিক কাজ-কর্ম করতেই সময় শেষ হয়ে যায়। গান গাইবার মানসিক অবসর তার নেই।
যখন শরীরে তার বসন্তের সম্ভার আসেনি,
যখন ছিলেন তিনি ঝড়ে আম-কুড়িয়ে বেড়ানো
বয়সের কাছাকাছি, হয়তো তখনো কোনো গান
লতিয়ে ওঠেনি মীরে মীরে দুপুরে সন্ধ্যায়,
পাছে গুরুজনদের কানে যায়।
বাবার বাড়ি বা শ্বশুর বাড়ি। খুব একটা ব্যবধান নেই। বাবার বাড়িতেও নানা বিধি-নিষেধের মধ্য দিয়ে চলতে হয় মেয়েদের। এটা করা যাবেনা, ওটা করা যাবেনা। বাড়ির উঠানে যে আম গাছ, গাছে থোকা থোকা আম, আমের ভর্তা বা চাটনি খেতে যে কোনো মেয়েরই সাধ জাগবে। সেই গাছে উঠতে হলে সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে তবেই উঠতে হবে। বয়স-স্বভাবের চপলতায় গলা ছেড়ে গান গাইবে অথবা গুনগুন করে গাইবে তার পছন্দের কোনো গান তাও সে পারেনা। গুরুজনদের কানে পৌঁছালে সেটা বেমানান হবে। নিজেকে সামলে নিয়ে চলতে হয় সারাক্ষণ। কবি লিখেছেন –
… হয়তো তখনো কোনো গান
লতিয়ে ওঠেনি মীরে মীরে দুপুরে সন্ধ্যায়,
এ হলো কবির আক্ষেপ। গান লতিয়ে ওঠেনি তা নয়। মনের গভীরে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের ফোয়ারা তিনি অনুধাবন করেন। কিন্তু তিনি চেয়েছেন মায়েরা/মেয়েরা অচলায়তন ভেঙে বেড়িয়ে আসুক।
কবি লিখেছেন –
… এবং স্বামীর
সংসারে এসেও মা আমার সারাক্ষণ
ছিলেন নিশ্চুপ বড়ো, বড়ো বেশি নেপথ্যচারিণী। যতদূর
জানা আছে, টপপা কি খেয়াল তাঁকে করেনি দখল
কোনোদিন। মাছ কোটা কিংবা হলুদ বাটার ফাঁকে
অথবা বিকেলবেলা নিকিয়ে উঠোন
ধুয়ে মুছে বাসন-কোসন
সেলাইয়ের কলে ঝুঁকে, আলনায় ঝুলিয়ে কাপড়,
ছেঁড়া শার্টে রিপু কর্মে মেতে
আমাকে খেলার মাঠে পাঠিয়ে আদরে
অবসরে চুল বাঁধবার ছলে কোনো গান গেয়েছেন কি না
এতকাল কাছাকাছি আছি তবু জানতে পারিনি।

যেন সব গান দু:খ-জাগানিয়া কোনো কাঠের সিন্দুকে
রেখেছেন বন্ধ করে আজীবন, এখন তাদের
গ্রন্থিল শরীর থেকে কালে ভদ্রে সুর নয়, শুধু
ন্যাপথলিনের তীব্র ঘ্রাণ ভেসে আসে।
কবি এখানে ‘গান’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এটি প্রতীকী অর্থে। ‘গান’-এর মানে হলো – আনন্দ-উল্লাস-ইচ্ছা-বাসনা, সবকিছু। চাওয়া-পাওয়ার সমস্তকিছুকে তিনি জলাঞ্জলি দিয়ে নিবিষ্ট মনে শুধু কাজ করে গেছেন। রান্না-বান্না, স্বামী-শ্বশুর-শাশুড়ীর প্রতি দায়িত্ব পালন, সন্তান লালন-পালন, পরিবারের কোনো সদস্য অসুস্থ হলে তার সেবা-যত্ন করা – চোখ-মুখ বুজে করে যান একনিষ্ঠ কর্মীর মতো।
মায়ের ইচ্ছা-অনিচ্ছা-সাধ-আহ্লাদকে বন্ধ করে রাখা বাক্সটি খুললে দেখা যাবে সে সব এখন শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে এক মহিরুহে রূপান্তরিত হয়েছে। যার মূল্য কোন সন্তান দিতে পারবেনা।
তাই সংসারে ‘মা’ একটি মহিমান্বিত চরিত্র, গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একমাত্র ‘মা’ই নি:স্বার্থভাবে নিজেকে বিলিয়ে চলেছেন। কবিতার গুণে শামসুর রাহমানের ‘মা’ শুধু একজনের ‘মা’ নয়। সবার ‘মা’ হয়ে যায়।
এই কবিতাটি পাঠ করলে মনোজগতে এক উপনিবেশ তৈরি হয়। যেখানে পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি মাথা নত হয়ে আসে।
১৪/০৮/২০১৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here