লোক সংস্কৃতি। আমরা সুরে বাঁচি সুরে মরি। খন্দকার মোহাম্মদ আলী সম্রাট

0
591

আমরা সুরে বাঁচি সুরে মরি

খন্দকার মোহাম্মদ আলী সম্রাট

সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা আমাদের এই সোনার বাংলা, আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। পৃথিবীর অন্য কোন দেশের সংগে তুলনা হবার নয় কারণ এর প্রকৃতি, রুপ ও সংস্কৃতি ব্যতিক্রম ও আলাদা। কৃষক যেমন মাঠে কাজ করার সময় উদাস উদাত্ত্ব কন্ঠে গান করে, মাঝি তার বৈঠার টানে, রাখাল, বালক, বালিকা, যুবক, যুবতি, বৃদ্ধ, বৃদ্ধা যার যা অবস্থান থেকে সুরের সাথে মিশে থাকে। এ দেশের মানুষ সুরে জন্মে আবার সুরে কবর বা শ্বশানে যায়। এর অর্থ বিশ্লেষণ করলে যা দাঁড়াবে তা একদিনে বা একবছরেও উপস্থাপন করা সম্ভব নয়।
কোন বাড়িতে নবজাতক জন্ম নিলে মুসলিম হলে মধুর সুরে আযান আর হিন্দু ধর্মাবলম্বী হলে উলু ধ্বনী দেয়া হয়ে থাকে। আবার কোথাও কোথাও স্থানীয় ভাষায় কিছু আচার অনুষ্ঠান করে গীত বা গান করা হতো যা এখন বিলুপ্ত বললে ভুল হবেনা। তেমন একটি –
নব জাতকের গান
কথা : সংগ্রহ
সুর : প্রচলিত
নয়া মাটির নয়ারে ফল
পাকিয়া হইছে টলোমল (পাকিয়া-ফল পাকা)
নয়া করি বাতি ঝলমলো হইচে ॥ (হইচে-হয়েছে)
আজা হউক আর আনিরে হউক (আজা-রাজা, আনি-রাণি)
কালা হউক আর গোরারে হউক (কালা-কালো, গোরা-ফর্সা)
বংশের বাতি উজালা হইচে ॥

নবজাতকের জন্মের পর ৭ দিন, ২১ দিন, ৩১ দিন, ৪১ দিন বা কোন বেজোড় দিনে বাড়িতে নাপিত ডেকে নবজাতকের সাথার চুল কাটা হয়। কোথাও বলা হয় ‘খেউর’ করা আবার কোথাও ‘পাষ্টি কামার গান’ বলা হয়। ঐ দিন বাড়িতে বিশেষ কিছু লোককে আমন্ত্রণ জানানো হয়। গ্রামের মোড়ল, স্থানীয় বিদ্যালয়েরর শিক্ষক, শিক্ষিকা, নবজাতকের মামা, নানা, নানী আর যাদরকে ডাকতেই হবে তারা হলো একদল গীদালি যারা ভালো গীত পরিবেশন করতে পারবে।
নাপিত যখন চুল কাটা আরাম্ভ করে তখন তার চারপাশ ঘিরে ঐ গীত বা পাষ্টি কামার গান পরিবশন করা হয়।
পাষ্টি কামার গান
কথা : সংগ্রহ
সুর : প্রচলিত

মাটিত কামায় নাউয়া চালোত কামায় কাউয়া (মাটিত-মাটিতে, কামায়-কাটে, কাউয়া-কাক)
দেরে গোলামের বেটা ভাল্ করি কামেয়া ॥
ছাওয়ার চাচায় আনছে কি, ছাওয়ার বেটি আনছে কি (ছাওয়ার বেটি – নবজাতকে ফুফু)
ছাওয়ার মামায় আনচে কি ডাঙ্গাও নাটি দিয়া ॥ (ডাঙ্গাও- মারো, নাটি- লাঠি)
(এই গান পরিবেশনের সময় মাটির পাত্র গীদালীরা পা দিয়ে ভেঙ্গে ফেলে এবং ভাঙ্গা টুকরোগুলো নব জাতক যে ঘরে থাকে তার উপর দিয়ে ঢিল মেরে ফেলে দেয়া হয়, কারণ হিসেবে জানা গেছে, মাটির পাত্র ভাঙ্গার সময় যেমন কড়মড় করে শব্দ হয়েছে নবজাতকের হাড় অমন কড়মড় করে শক্ত হবে।)

নবজাতকের হঠাৎ করে জন্ম নিয়ে প্রকৃতির সাথে খাপ খাওয়াতে পারে না। কখনো সকালে ঘুমায় দুপুরে জেগে থাকে কখনো বিকালে ঘুমায় রাতে জেগে থাকে। বাড়ির দিদা, দাদী, নানী, বুবু, দিদি অর্থাৎ বয়স্করা নবজাতকের নিয়মিত ঘুমের অভ্যাসের জন্য এক ধরণের কাল্পনিক, আজগুবি, কল্পনায় এক ধরণের গান গেয়ে নবজাতককে ঘুমানোর চেষ্টা করা হয়। সেউ গানই ঘুমপাড়ানী গান।
ঘুমপাড়ানী গান
কথা : সংগ্রহ
সুর : প্রচলিত
বাচ্চা বাইওরে সোনার চাদ (বাচ্চা বাইও- ছোট ছেলে)
গরু দুইটা আনি দাগাত বান্ধ (দাগাত-গরুর পানি খাওয়ার চাড়ি, বান্ধ- বেধে রাখ)
হামার বাড়িত মাগুর মাছের গান ॥ (হামার-আমাদের)
মাগুর মাছে গান কয়
টেংনা মাছে মোচ পাকায় ( মোচ পাকায়- গোফ নারায়)
ট্যাপা মাছে ডুগডুগি বাজায় ॥
পাঙ্গাস মাছে আন্ধে বাড়ে ( আন্ধে বাড়ে- রান্না করে)
পাবো মাছে মাঞ্জে ঘসে (পাবো – পাবদা, মাঞ্চে ঘসে- থালা বাটি পরিস্কার করে)
বৈইল মাছে প্যাট করে টান টান ॥ (প্যাট করে টান টান- বোয়াল মাছ রক্ষুসে মাছ সে পেট ভর্তি করে খায়)
নবজাতক আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে, তারা ঘর বাড়ি পেরিয়ে বন্ধু বান্ধবীকে নিয়ে হাওড়, বাওড়, খাল, বিল, নদী, নালা, পুকুরে দল বেঁধে গোসল বা স্নান করে। এ সময় তারা এক ধরণের খেলা ও গান করে সেই খেলাকে স্থানীয় ভাবে ঝম্পলি খেলা বলা হয়ে থাকে।
ঝম্পলির গান
কথা : সংগ্রহ
সুর : প্রচলিত
ঝম্পলি খেলাইতে গাও ধুতে মোর নাকের সোনা (ঝম্পলি-গোসলের গান, গাও-শরীর)
ঐ জলে হারাইছে ॥
ভালোক না কঁও ভাল ও মুই (ভালোক-ভালকে, কঁও-বলা)
মন্দোক না কও ভাল (মন্দোক-খারাপ)
মোর হইছে কম্বক্তির নসিব (কম্বক্তির-অবহেলিত)
পোড়া মোর কপাল ॥ (কপাল-ভাগ্য)

নবজাতিকা যখন কিশোরীতে পরিণত হয় তখন চারিপাশে দেখে বাল্য বিবাহ, যৌতুক, নারী নির্যাতন তখন সে আপন মনে ভাবতে থাকে, তার নিজেরও এমন ধরণের ঘটনা ঘটতে পারে। পারেনা মনের কথা কাউকে বলতে, পারেনা নিজেই এর সমাধান করতে। তখন সে আপন মনে গান করে –
কিশোরী গান
কথা : সংগ্রহ
সুর : প্রচলিত
বাবা ব্যাচেয়া না খান হালুয়া দামান্দোক দিয়া (ব্যাচেয়া-বিয়ে দেয়া, দামান্দ-জামাই)
বাবা তাঁইসেন মারিবে হাতের পেন্টি দিয়া ॥ (তাইসেন-তখন সে)
বাবা ব্যাচেয়া না খান গাড়িয়াল দামান্দোক দিয়া
বাবা তাঁইসেন মারিবে হাতের ছড়ি দিয়া ॥
বাবা ব্যাচেয়া না খান কামলা দামান্দোক দিয়া (কামলা-কৃষাণ)
বাবা তাঁইসেন মারিবে ঘাড়ের বাউংকা দিয়া ॥ (বাউংকা-মালামাল পরিবহনের বাঁশের বাতা)
বাবা ব্যাচেয়া খাইবেন মাস্টার দামান্দোক দিয়া
বাবা তাঁইসেন পড়াইবে মনের মতো করিয়া ॥

এই কিশোরী এক সময় বড় হলে স্বাভাবিক ভাবেই তার বিয়ের ব্যবস্থা হয়। আর এই বিয়েতে বেশ কিছু আচার অনুষ্ঠানাদি করতে হয়। বিয়ের কথাবার্তা শেষ হলে দু পক্ষের সম্মতিক্রমে বিয়ের দিন ঠিক করা হয়। সে দিনকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় পানপত্র বা পান কাটার দিন। এই পানকাটার পর বর ও কনে পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে হলুদের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় স্থানীয় ভাষায় বলা হয় কুরের অনুষ্ঠান। আর এই হলুদ বা কুর তৈরি হয় একটি বিশেষ নিয়মে। (৪জন এ্যাঁও বা রাইও প্রতিজনের পড়নের কাপড় দিয়ে অন্যজনের কাপড়ে গিট ঁেবধে দেয়া হয়। তারপর ভিতর আঙ্গিনা থেকে দল বেধে হলুদের গাছ পর্যন্ত বিশেষ নিয়মে গিয়ে হলুদ তুলে এনে তা পরিস্কার করে কাঠের তৈরি উড়–ন গাইনে করে তা পিসে কুর বা হলুদ তৈরি করা হয়।) আর এই হলুদ তৈরির সময় যে গান বা গীত করা হয় তাই হলুদ কোটার গান।
হলুদ কোঠার গান
কথা : সংগ্রহ
সুর : প্রচলিত

হলদি বানো বানোরে যতন করিয়া (হলদি-হলুদ)
সোনা হামার ঝলমল করবেরে হলুদ মাখিয়া ॥
বাবা মায়ের কষ্টরে তাকো না বুঝিয়া
বালী হামার যাইবেরে হামাকো ছাড়িয়া ॥ (বালী-নববধু)
উপ্ বালীর ঝলমল করেরে (উপ-রুপ)
দেখোতা আসিয়া ॥
আবার এই হলুদ তৈরি হলে কনেকে বিশেষ ভাবে বসিয়ে বাড়ির সকল বয়জ্যেষ্ট সহ হলুদ বা কুর মাখানো হয়।
হলুদ মাখার গান
কথা : সংগ্রহ
সুর : প্রচলিত
মাথা কুরও নাদিও ওরে পঞ্চ রাইও (কুর-হলুদ, নাদিও-দিওনা, রাইও-যারা হলুদ দেবে)
মাথা দেখং বেলের মতো (দেখং- দেখি)
কোনবা ঠাকার সওদাগড় বালিক জন্ম দিছে (কোনবা ঠাকার- কোথাকার, বালি-বধু)
ভালো যতনে উদরে আকিছে ॥ (উদর-পেট)
মুখ কুরও নাদিও ওরে পঞ্চ আইর
মুখ দেখং বাটারো মতোন
কোনবা ঠাকার সওদাগড় বালিক জন্ম দিছে
ভালো যতনে উদরে আকিছে ॥
হাতো কুর ও নাদিও ওরে পঞ্চ রাইও
হাত দেখং বেলুনের মতোন
কোনবা ঠাকার সওদাগড় বালিক জন্ম দিছে
ভালো যতনে উদরে আকিছে ॥
এই হলুদ মাখার পরদিন বা তার পরদিন অনুষ্ঠিত হয় বিয়ের মূল অনুষ্ঠান। বিশেষ ভাবে রঙিন কাগজ দিয়ে কনের বাড়ি সাজানো হয়। আত্মীয় স্বজন বাড়িতে গিজগিজ করে। বাড়ি থাকে সাজসাজ রবে। কোন একটি নির্দিষ্ট সময় বর ও বরযাত্রী এসে হাজির হয়। বাড়িতে বরযাত্রী পৌছার পর থেকে শুরু হয় বিয়ের গীত।
বিয়ের গীত
কথা : সংগ্রহ
সুর : প্রচলিত
গাবরুর বওনাই আসিছেরে ও তাই ভরা সভার মাঝে (গাবরু-বর)
ভরা সভার লোক গুলারে ও তাই মুচকি মারি হাসে ॥
তোর কি বরুর বওনাই নাই সাথে করিয়ে কেনে আইসেন নাই (বরু-বর,বওনাই-বোন জামাই)
আছে বওনাই তার জামা নাই সেই শরমে তাই আইসে নাই ॥
তোর কি বাড়িত ছালা নাই তাকে পিন্দিয়া ক্যানে আইসে নাই ॥ (ছালা-চটের বস্তা)
তোর কি বরুর বইনো নাই সঙ্গে করিয়া কেনে আইসেন নাই (বইনো- বোন)
আছে বইন তার শাড়ী নাই, সেই সরমে তাই আইসে নাই ॥
তোর কি বাড়িত চটও নাই তাকে পিন্দিয়া ক্যানে আইসে নাই ॥ (পিন্দিয়া- পরিধান করে)

এই সময় কিছু কনে পক্ষের সদস্য বা সদস্যা বর পক্ষ হয়ে কথা ও গীতের উত্তর দিয়ে থাকে।
একটা সময় বিয়ে হয়ে গেলে বর কি পরিবহন দিয়ে কনেকে নিয়ে যাবে তার উপরেও ভাওয়াইয়া গান পরিবেশন করা হয়। যদি পালকিতে নিয়ে যাওয়া হবে তাহলে কনের পক্ষ থেকে ভাওয়াইয়া গান করা হয়।
ভাওয়াইয়া
কথা : আব্দুল আজিজ
সুর : প্রচলিত
ও মুই পালকিতে না চরোও ঢুলা নাগিবে
সোয়ারীতে না বসিম গাও এড়াইবে
ও মুই ছইয়া গাড়িত না চরিম
ও মোর মাথা বিশাইবে ॥
এইযে বাড়ি বগলে ঘাটা ও ঘাটা সানে বান্দাইচে—-

এক সময় উত্তরবঙ্গের বাহন ছিল গরু বা মহিষের গাড়ি। আর এই গাড়িতে করেই কনেকে বরের বাড়িতে আনা হতো। শুধু তাই নয় বিয়ের পরও যাতায়তের সময় এই গাড়িই ব্যবহার করা হতো। তখন ঐ বধুকে বলা হতো নাইওরী।
ভাওয়াইয়া
কথা : মহেশ চন্দ্র রায়
সুর : প্রচলিত
ধীরে বোলাও গাড়ীরে গাড়িয়াল
আস্তে বোলাও গাড়ি
আর এক নজর দেখিয়া নেও মুই
দয়ার বাপের বাড়িরে
গাড়িয়াল ধীরে বোলাও গাড়ি ॥

তার পর নববধু এক সময় সংসার করতে করতে ম্বামীর বাড়িই নিজের বাড়ি হয়ে যায়। স্বামী বা স্ত্রী যে কোন এক সময় মৃত্যু বরণ করে স্বামী মারা গেলে স্ত্রী সুর ধরেই কান্না করে।
আরে মোর ভাই ধন রে
দই খাবার চাইছেনরে ভাইমোর
আইজ থাকি আর কাঁই চাইবে রে ॥
(স্ত্রী তার সকল অতীত স্মৃতির কথা সুর করে বলতে থাকে)

আবার স্ত্রী মারা গেলে স্বামী গান করে
ভাওয়াইয়া
কথা : খন্দকার মোহাম্মদ আলী সম্রাট
সুর : ওস্তাদ অনন্ত কুমার দেব
উড়িয়া যায়রে সাদারে বগা বগা মাথার উপর দিয়া
জোড়া হারেয়া কান্দেরে বগা সাথী না পায়রে খুজিয়া ॥
জোড়া হারার কিযে জ্বালা জানে যার গেইছে ভাঙ্গিয়া
তুষের আগুনের মতো জ্বালা জ্বলেযে ঘুসিয়া ॥
দিশা হারা হয়া বগা যায়রে উড়াল দিয়া
বাশের আগালোত পরি কান্দে সাথী হারা হয়া ॥
(সমাপ্ত)
লেখাটি ‘চালচিত্রে’ প্রকাশিত।
আরও লেখা পড়তে চাইলে ভিজিট করুন – www.chalchitro.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here