লোকসংস্কৃতি: উত্তরের লোকসাহিত্য: পঞ্চগড় জেলা। দুলাল রায়

0
2265

উত্তরের লোকসাহিত্য: পঞ্চগড় জেলা

দুলাল রায়

‘লোক’ কোন ব্যাক্তি মানুষ নয়, গোষ্ঠী মানুষ। পল্লীর সহজ, সরল, সাধারণ মানুষের সাহিত্যই লোকসাহিত্য। লোকসাহিত্য মৌখিক সাহিত্য। এখানে ¯্রষ্টার পরিচয় একেবারেই গৌণ। বেশিরভাগ ক্ষেেেত্রই ¯্রষ্টার পরিচয় পাওয়া য়ায়না। প্রথমে ¯্রষ্টার দ্বারা কোন কিছু রচিত হলেও পরে তা হয়ে ওঠে সকলের সম্পদ। পল্লীর সহজ, সরল, সাধারণ মানুষের মতোই লোকসাহিত্য সহজ, সরল, অনাড়ম্বর ও আধুনিক হেঁয়ালি বর্জিত।
পঞ্চগড় জেলা বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের একটি জনপদ। এই জেলার তিন দিকেই ভারতীয় সীমান্ত পরিবেষ্টিত। ১৯৪৭ সালের পূর্ব পর্যন্ত পঞ্চগড় ছিলো অবিভক্ত বাংলার কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলার অন্তর্গত। দেশবিভাগের পর পঞ্চগড় মহকুমা হিসাবে দিনাজপুর জেলার অন্তর্ভূক্ত হয়। ১৯৮৪ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি পঞ্চগড় জেলায় রুপান্তরিত হয়। হিমালয় কন্যা পঞ্চগড় জেলার ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে হিমালয়ের পাদদেশীয় তরাই অঞ্চলের কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলা এবং দার্জিলিং জেলার সমভূমি অঞ্চলের ভাষা ও সংস্কৃতির যোগসূত্র সুদূর অতীত কালের। দুই বাংলার সমগ্র উত্তরবঙ্গের জনপ্রিয় লোকসঙ্গীত ভাওয়াইয়ার আদি জন্মভূমি তরাই অঞ্চলের কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলায়। পঞ্চগড় জেলার উত্তরে ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুর জেলা এবং দক্ষিণ পূর্ব কোণে নীলফামারী জেলা অবস্থিত। নৃতাত্ত্বিক বিচারে পঞ্চগড় জেলার জনগোষ্ঠী পলিয়া ও কোচ রাজবংশী বংশোদ্ভূত। বিভিন্ন ধর্ম ও স¤্রদায়ের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানেরা। এর পরে আছে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান এবং উপজাতীয়দের মধ্যে সাওতাল ও ওরাঁওদের বাস। স্বাধীনতার পর থেকে ভাটি অঞ্চল থেকে অনেক মুসলিম পরিবার এই অঞ্চলে এসে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেছে, এরা স্থানীয়ভাবে ‘ভাটিয়া’ নামে পরিচিত।
পঞ্চগড় জেলার লোকসংস্কৃতির মূল প্রবাহ রাজবংশী সংস্কৃতি। এই জনপদের বিপুল জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক জীবনে আছে বর্ণময় ও বৈচিত্র্যময় রুপ। পঞ্চগড় জেলার লোকনাটক, লোকসঙ্গীত, লোকছড়া, লোকপ্রবাদ-প্রবচন, লোকধাঁধা, লোকাচার, লোকদেবতা, লোকপোষাক, লোকখাদ্য, লোকপুরাণ, লোকধর্ম, লোকনৃত্যসহ লোকসাহিত্যের বিভিন্ন উপাদানে বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায় স্থান পেয়েছে এই অঞ্চলের মানুষের যুগযুগান্তরের ভাবনা ও আবেগ। পঞ্চগড় জেলার লোকসাহিত্যের এইসব বৈচিত্রময় উপাদপান যথাযথভাবে সংগ্রহ করতে পারলে উঠে আসবে এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ও লোকসংস্কৃতির বর্ণময় রুপ। লোকসাহিত্য লোকায়ত জীবন ও মানসেরই প্রতিচ্ছবি।

ভাওয়াইয়া গান
ভাবের গান ভাওয়াইয়া উত্তরবাংলার প্রাণের স¤পদ। উত্তর বাংলার মাটি ও মানুষের এ গানের কথা ও সুর এতোই মর্ম¯পর্শী ও করুণ রসের হয় যে শোনার সঙ্গে সঙ্গেই শ্রোতার হৃদয়কে বিগলিত করে, শ্রোতার হৃদয়কে ভাসিয়ে নিয়ে যায় শূণ্যে, জাগতিক সুর ইন্দ্রজালের উর্ধবলোকে। উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক ভাষা ও সুরের বৈচিত্র্যই ভাওয়াইয়ার প্রাণ। ভাব,ভাষা ও সুরের বিশেষ বৈচিত্র্যের কারনে ভাওয়াইয়া আজ শুধু উত্তরবঙ্গেই নয়, সমগ্র বিশ্বে একটি জনপ্রিয় ও সমৃদ্ধ লোকসঙ্গীতের ধারা হিসেবে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত।
ভাওয়াইয়া গানের নামকরণ নিয়ে প্রাজ্ঞজনের নানা মতামত প্রচলিত। কেউ বলেন ‘ভাব’ শব্দের প্রাকৃত ‘ভাও’ উত্তর ‘ইয়া’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ভাওয়াইয়া। কেউ বলেন স্থানবাচক ‘ভাওয়া’ থেকে ভাওয়াইয়া শব্দের উৎপত্তি। মরানদীর জলকাদাপূণ ভূমিতে গজিয়ে ওঠা এলুয়া, কাশিয়া, মথুয়া, নলখাগড়ার বনকে বলা হতো ‘ভাওয়া’ অঞ্চল। এই ‘ভাওয়া’ মহিষের উপযুক্ত চারণক্ষেত্র। মৈষালেরা মহিষ চরানোর সময় ‘ভাওয়া’ অঞ্চলে মহিষের পিঠে চড়ে দোতরা বাজিয়ে করতো এই গান।
‘ভাওয়া’ অঞ্চল থেকে এ গান ভেসে আসতো পার্শ্ববর্তী লোকালয়ে। তাই এই গানের নামকরণ হয়েছে ভাওয়াইয়া। কেউ বলেন ভাওয়াইয়া শব্দটি ‘বাওয়াইয়া’র বিবর্তিত রুপ। বাও মানে বাতাস। ‘ভাওয়া’ থেকে মৈষালের গান এবং নিধুয়া পাথার থেকে চাষী মজুরের গান বাও বাতাসে ভেসে আসতো লোকালয়ে তাই ‘বাওয়াইয়া’ কালক্রমে ভাওয়াইয়ায় রূপান্তরিত হয়েছে। আবার কেউ বলেন ভাওয়াইয়া ‘বাউদিয়া’ বা ‘বাউরা’ নামক সংসার বিমুখ উদাসী সম্প্রদায়ের গান, তাই বাউদিয়া বা ‘বাউরা’ থেকেই ভাওয়াইয়া শব্দের উৎপত্তি।
ভাওয়াইয়া ব্রাত্যজনের গান। গানের কথা সহজ সরল, নিরাভরণ, একেবারেই আধুনিক কৃত্রিমতাবর্জিত। উত্তরবঙ্গের ভূ-প্রকৃতি ও সমাজচিত্র যথাযথভাবে ধরা পড়েছে লোকসঙ্গীত ভাওয়াইয়ায়। ভাওয়াইয়া গানের প্রধান বিষয় যদিও প্রেম কিন্তু এ প্রেম অপার্থিব নয়, লৌকিক জীবনাশ্রয়ী, অধিকতর মর্তের গন্ধবাহী। পরকিয়া, কাম, শরীর,জীবনের ক্ষুদ্রতা, তুচ্ছতা, ছোট ছোট বাস্তবতা সবকিছুই ভাষা পেয়েছে ভাওয়াইয়ায়। বিবাহিতা নারীর কাছে তার স্বামীদেবতাটির পরিচয় এখানে ‘পানিয়া মরা’। আবার বিবাহিত পুরুষটির কাছে তার বাড়ির গৃহিনী এখানে ‘বাড়ির গিত্থানি’ নামেই অধিক পরিচিত। আখোয়াল (রাখাল), মৈষাল, গাড়িয়াল, বানিয়া, বৈদ, সাধু, সিপাই, ভাবের বন্ধুয়া, ভাবের দ্যাওরা, বাউদিয়া, অসের ঢ্যানা, বাড়ির পাশের চ্যাংড়া বন্ধু এ জাতীয় সম্বোধনের পুরুষরাই ভাওয়াইয়া গানের নায়ক, প্রকৃত ধারক ও বাহক। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো ভাওয়াইয়া গানে যদিও নারীমনের বিরহ-বেদনার কথাই অধিক প্রতিফলিত হয়েছে কিন্তু সকল ভাওয়াইয়া গানের রচয়িতাই পুরুষ।
অধুনা বাংলাদেশের বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর জেলা, পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলা, আসাম, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার রাজবংশী জনগোষ্ঠীর বিশিষ্ট লোকসঙ্গীত ভাওয়াইয়া।
ভাওয়াইয়া গান প্রধানত দুই প্রকারÑদীঘলনাশী ও চটকা। দীঘলনাশী টানা সুরের বিরহ-বিচ্ছেদের গান। চটকা দ্রুতলয়ের চটুল হাস্যরসের গান। এ দুইয়ের মাঝামাঝি আরেক শ্রেণির ভাওয়াইয়া গানের কথা বলা হয়েছে তা হলো ক্ষিরোল ভাওয়াইয়া। ক্ষিরোল নদীর নামানুসারে ক্ষিরোল ভাওয়াইয়া নামকরণ হয়েছে এমন মত প্রচলিত আছে। ক্ষিরোল ভাওয়াইয়া গানে দোতরার একধরণের বিশেষ ডাং এর প্রচলন আছে যা দোতরার উল্টা ক্ষিরোল ডাং নামে পরিচিত। উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক ভাষা ও সুরের আশ্চর্য মেলবন্ধনে লোকসংগীত ভাওয়াইয়া সাহিত্য ও সাংগীতিক উভয় গুণেই সমৃদ্ধ।
(১)
হামার অমপুরিয়া বিরাদর (বিরাদর-আত্মীয়)
না ভাবি হামরা তোমাক পর
সবায় মিলে আসেন বেড়েবা
হামার পঁচাগড়।

পঁচাগড়ত্ আছে হামার
বালা আর পাথর
মীর, হোসেন, দেবেন, রাজেন
আর ভিতর গড়।

পাঁচটা গড় মিলে হামার
জেলা পঁচাগড়
সবায় মিলে আসেন বেড়েবা
হামার পঁচাগড়।

চিনির কল আছে দেখার
আছে চা বাগান
রওশনপুরের মিষ্টি খাইলে
ভরে যাবে মন।
বাংলাবান্ধা গেলে দেখিবেন
হিমালয় পাহাড়।
সবায় মিলে আসেন বেড়েবা
হামার পঁচাগড়।

ভারতের হিমালয়
পঁচাগড়ের কাছাকাছি
তারে বাদে হামার জেলাত্
ঠাণ্ডা কনেক্ বেশি।
ভয় না করেন, গতরত্
দিমো গরম কাপড়
সবায় মিলে আসেন বেড়েবা
হামার পঁচাগড়।
(২)
দ্যাশটা হইছে ডিজিটাল
কমে গেইছে যে ভেজাল
পাওয়ার টিলার আসে
উঠে গেইছে গরুর হাল।

আগের দিনত্ হাল নেগাইছে
বিহানে উঠিয়া
উঠ্ উঠ্ বইস্ বইস্ করে সারাদিন
গেইছে চলিয়া
কুনোমতে হাল বহাইছে
বিশ তিরিশ ডিস্মল
পাওয়ার টিলার আসে
উঠে গেইছে গরুর হাল।

পাওয়ার টিলার আসি সবায়
আলসিয়া হইছে
হাল নেগেবার কাথা কারও
মনত্ না আসে
কইলে কয় দশদিনে হাল বহার থাকি
একদিনে বহায় ভাল্
পাওয়ার টিলার আসে
উঠে গেইছে গরুর হাল।
(৩)
ও বন্ধু সোনার চান
বেলা থাকিতে হামার বাড়ি যান
এখেতো বাইষ্যালি দেওয়া
কোত্তো নদীত্ উঠিছে বান
বেলা থাকিতে হামার বাড়ি যান।

কোত্তো নদীর বড় মাছ
রুই আর কাতেলা
ছোট বইরালি খাবার মজা
করিয়া সান্দেলা
খাইলে ভরে যাবে বন্ধু তোমার মন
বেলা থাকিতে হামার বাড়ি যান।
(৪)
ও মোর নদারি
শুনেক সুন্দরী
ভ্যান রিক্সার কামাই খালেক
আসি অটো গাড়ি।

রিক্সা ধরি বসি আছো
জালাসীর মোড়ত্
ভাড়ার বাদে সারাদিন
কাহ না আইসে বগলত্
অটোতে চড়িয়া সবায়
যাছে তাড়াতাড়ি।
ভ্যান রিক্সার কামাই খালেক
আসি অটো গাড়ি।

রিক্সার কামাই উঠি গেইছে
খালি যাছে ভ্যান
অটো গাড়ি কিনিবার মুই
পাইসা কুন্ঠে পাম
লোন অঠে দে এনজিওত্ তুই
ঢুকেক তাড়াতাড়ি
ভ্যান রিক্সার কামাই খালেক
আসি অটো গাড়ি।
(গানগুলির রচয়িতা সতীশ চন্দ্র পাল, বয়স ৪০ বছর, পিতা মৃত অবিরাম পাল, পেশা-কৃষি, বিশিষ্ট ভাওয়াইয়া ও পল্লী গীতির গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী, গ্রাম-অমরখানা, উপজেলা-দেবীগঞ্জ, জেলা-পঞ্চগড়)।
(৫)
কাটাখান ফিন্দাইছে মোর
কুন্ঠে না কুন্ঠে
গুতাছিস শালি তুই
যেইঠে আর সেইঠে
ও তুই দেখে দেখিন্না
তুইতো শালি কানারে কানা।

মাথাটা করেছে মোর কাট্টাউ কাট্টাউ
দেগে শালি কনেক্ সিদলের ভত্তা খাও
ও তুই দেখে দেখিন্না
তুইতো শালি কানারে কানা।

মাথাটা করেছে মোর ভাও ভাও
দেগে শালি কনেক্ পাটানির বাও
ও তুই দেখে দেখিন্না
তুইতো শালি কানারে কানা।
(গানটির রচয়িতা বিশিষ্ট জারি, ভাওয়াইয়া ও পল্লীগীতির শিল্পী মরহুম আলতাফ মিয়া, সংগ্রহ করা হয়েছে তাঁর মেয়ে জারি গানের শিল্পী মোছাঃ রহিমা খাতুন, বয়স ৩৫ বছর, স্বামী মোঃ সুজাত আলী, গ্রাম-পুর্ব ভাউলাগঞ্জ, উপজেলা-দেবীগঞ্জ, জেলা-পঞ্চগড় এর কাছ থেকে)।

জারি গান
ফারসি ভাষার শব্দ ‘জারি’ অর্থ বাংলায় বিলাপ বা ক্রন্দন। অন্য অর্থে প্রকাশ্যে জাহির বা প্রচার করাকেও বোঝায়। ঐতিহাসিক কারবালার মরু-প্রান্তরে ফোরাত নদীর তিরে হযরত ইমাম হাসান হোসেন ও তাঁর স্বজনদের মর্মান্তিক বিয়োগান্তক ঘটনাকে অবলম্বন করে প্রতি বছর মহরম মাসে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে মর্সিয়া ও জারি গান পরিবেশিত হয়। কারবালার প্রান্তরে ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহম্মদ (সঃ) এর দৌহিত্র ইমাম হাসান হোসেনের সঙ্গে মাবিয়ার পুত্র এজিদের যুদ্ধ হয়। এজিদের সৈন্যরা অন্যায়ভাবে ফোরাত নদীর পানি অবরুদ্ধ করে রাখে। ইমাম হোসেনের শিশুপুত্র এক ফোঁটা জলের জন্য ছটফট করতে থাকে। জলের জন্য ক্রন্দনরত অবস্থায় শত্রু শিবিরের নিক্ষিপ্ত তীরের আঘাতে শিশুটির মৃত্যু হয়। মা সন্তানের জন্য বিলাপ করতে থাকে। ইমাম হোসেনের স্বজনরাও মরুভূমির দাবদাহে পানির জন্য ছটফট করতে করতে প্রাণ ত্যাগ করে। পুত্রহারা ইমাম হোসেন প্রবল পরাক্রমে যুদ্ধ করে ফোরাত নদীর পানি অবমুক্ত করেন। তিনি হাতের আঁজলায় পানি নিয়ে পান করার সময় তৃষ্ণার্ত শিশুপুত্র ও স্বজনদের কথা চিন্তা করে পানি পান না করে অস্ত্র ত্যাগ করেন এবং শত্রুদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এই করুণ ও হৃদয়বিদারক কাহিনী স্মরণ করে মুসলিম বিশ্বে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রতি বছর মহরম উৎসব পালিত হয়। মর্সিয়া বিশেষ সুরের ছোট আকারের লোকসঙ্গীত আর জারি গান দীর্ঘ কাহিনীমূলক লোকসঙ্গীত। মহরম পরবে মর্সিয়া ও জারি গান ছাড়াও লাঠিখেলা, শোক মিছিল, তাজিয়াসহ মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে নানারকম লৌকিক আচার পালিত হয়। একসময় শুধু কারবালার শোকগাথা নিয়েই জারি গান পরিবেশিত হলেও পরবর্তীতে সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, অতিলৌকিক, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরিবার পরিকল্পনা, শিক্ষা সচেতনতাসহ বিভিন্ন সমসাময়িক ঘটনাবলি নিয়ে জারি গান পরিবেশিত হতে থাকে এবং তা দর্শকদের কাছে প্রচুর জনপ্রিয়তা লাভ করে। এছাড়াও দুই জারিয়াল দলের মধ্যে কবি গানের মতো নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলমান, গুরু-শিষ্য, শরিয়ত-মারফত ইত্যাদি বিষয় নিয়ে পালাগানও অনুষ্ঠিত হয়। জারিয়াল দলের প্রধান গায়ককে বলা হয় বয়াতি। বয়াতির সঙ্গে থাকে দোহার ও বাদক দল। প্রশ্নোত্তরমূলক পর্বের মধ্য দিয়ে কবি গানের মতো দুই জারিয়াল দলের পালাগান অনুষ্ঠিত হয়। আজকাল মহরম পর্ব ছাড়াও বিভিন্ন মেলা, উৎসব ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে জারি গানের আয়োজন করা হয়।
(১)
দ্যাশে আইলো বন্যার জল
বাড়লো মাছের দ্বিগুন বল
মাছে মাছে কোলাহল
বিবাদ গুরুতর।

ট্যাংনা পুঠি ডারকিনায়
সবার কাছে বিচার চায়
শোল মাছ ক্যানো এ্যাতো দৌড়ায়
পানির উপর।
নামলে আমরা বেশি জলে
আসিয়া ধরে বোহালে
পাবলিক আমরা সবায় মিলে
যাবো থানার ঘর।
মাছে মাছে কোলাহল
বিবাদ গুরুতর।

যেখানে কচুরিপানা
সেখানে মাছের থানা
সাক্ষী নিয়া কয়েকজনা
চলিলো সত্বর।
গলসা ট্যাংনা টাকি পাবও
হেরা কয় আমরাও যাবো
মনের মতো সাক্ষী দিবো
যাবো থানার ঘর
মাছে মাছে কোলাহল
বিবাদ গুরুতর।

শোল বাবু সেকেন্ড দারোগা
বলে ব্যাটা হতভাগা
তাড়াতাড়ি মামলা লাগা
কেসটা খুব সুন্দর।
পয়ায় বলে বাইন কেরাণি
লেখো এক দরখাস্তখানি
ঠিক করবার আমরা জানি
সরকারি চাকর
মাছে মাছে কোলাহল
বিবাদ গুরুতর।

ইলিশ মাছ মুক্তারি পাস
হোগল মারে মুচকি হাস
দশ টাকার হইলো কাজ
মোর টাকার নাই খবর।
পকেট কাটা কই মাছে
কানটা তাহার নাচিতেছে
তোরা কেস লাগাইছস কার কাছে
সব ব্যাটাই বান্দর
মাছে মাছে কোলাহল
বিবাদ গুরুতর।
(২)
দোয়েল পাখি ইন্সপেক্টর
কাউয়ায় পাইলো মেম্বারি
হারগিলারে কে দিলো ভাই মাত্বরি

শিমুল গাছের আগডালোতে
কানি বগিলা হোটেল দিছে
চিলা ব্যাটায় নাস্তা খাইছে
কেচেরি ব্যাটায় দেয় ফাঁকি।
শৃগাল দিলো গোশতের ভাগা
শেগুন নিছে পাইকারি
হাড়গিলারে কে দিলো ভাই মাত্বরি।

চিলায় বগায় সাধন করে
মাছরাঙায় মিটিং করে
পেঁচা ব্যাটায় ভয়ে মরে
ঝেচু করে ফৌজদারি
হাড়গিলারে কে দিলো ভাই মাত্বরি।
(৩)
গোল আলু দেখিয়া
বেগুন যায় পালায়া
কপি বলে মরি লাজে
মূলা কয় কপি ভাই
চলো আমরা ভারত যাই
সন্ধ্যার পরে লাগায়
দুই টাকা ধারা।

মূলা কয় ওরে বেগুন
তোর কপালে আছে আগুন
কিছুদিন গেলে ধরে
ভিতরে পোকা
মসারি বলে খেসারি ভাই
আফসোস করে লাভ নাই
কাবলি বুটে বাড়ায়
গরীবের সন্মান।

মিষ্টি কুমড়া মিটিং করে
পানি কুমড়া লেকচার মারে
কদু বলে মরি লাজে
বাঙ্গি বলে তরমুজ ভাই
কুনো ব্যাটার রেহাই নাই
বাসায় গেলে হামাক
করিবে জবাই।

(৪)
শিক্ষা ছাড়া হইলাম দ্যাশের কানা
পাগল মনা
শিক্ষা ছাড়া হইলাম দ্যাশের কানা।

মূর্খ যারা এই জগতে
কেউ না ভালোবাসে তাকে
মূর্খের দ্বারায় কুনো কাজ চলেনা
পাগল মনা
শিক্ষা ছাড়া হইলাম দ্যাশের কানা।

গেলে অফিস আদালতে
যদি কয় দরখাস্ত দিতে
আঙ্গুল একখান বাইর করে তখন
অফিসারে ধমক মারে
যাওনা ব্যাটা দূরে সরে
লেখাপড়া তুমি ক্যান জানোনা
পাগল মনা
শিক্ষা ছাড়া হইলাম দ্যাশের কানা।

তাই সরকার বলছে বারে বারে
ছয় হইতে নয় বৎসর বয়সে
পাঠাও সন্তান স্কুলেতে
অন্ধ করে ঘরে কেউ রাইখোনা
পাগল মনা
শিক্ষা ছাড়া হইলাম দ্যাশের কানা।

তাই সরকার বলছে বারে বারে
এই সুযোগ দিওনা ছেড়ে
ভুল করিলে হইবে লাঞ্ছনা
পাগল মনা
শিক্ষা ছাড়া হইলাম দ্যাশের কানা।
(গানগুলির রচয়িতা বিশিষ্ট জারি গানের বয়াতি মরহুম আলতাফ মিয়া, সংগ্রহ করা হয়েছে তাঁর মেয়ে মোছাঃ রহিমা খাতুন, বয়স ৩৫ বছর, স্বামী মোঃ সুজাত আলী, পেশাÑগৃহিনী এবং জারি গানের শিল্পী, গ্রাম-পূর্ব ভাউলাগঞ্জ, উপজেলা-দেবীগঞ্জ, জেলা-পঞ্চগড় এর কাছ থেকে)।

বিয়ের গীত
বিয়ে মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। বর ও কনের বিবাহ অনুষ্ঠানকে সামাজিক দৃষ্টিতে অত্যন্ত শুভকাজ বলে বিবেচনা করা হয়। শুভ পরিণয়ের মাধ্যমেই একজন যুবক ও একজন যুবতী সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে দা¤পত্য মিলনের বৈধতা পায়। সৃষ্টির ধারা অব্যহত রাখতে নর ও নারীর এই মিলন অপরিহার্য। সামাজিক উৎসবের মধ্যেও বিবাহ অনুষ্ঠান সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ ও আনন্দমুখর একটি উৎসব।
মুসলিম ও হিন্দু উভয় রীতিতেই বিয়ের বিভিন্ন পর্বকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন লোকাচার পালিত হয়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিবাহের বিভিন্ন পর্বে আইয়ো বা গীদালিরা দল বেঁধে সমবেত কন্ঠে বিয়ের গীত পরিবেশন করে। নগরকেন্দ্রিক জীবনে বিয়ের গীতের খুব একটা প্রচলন না থাকলেও সনাতন পল¬ীর বিয়ের গীতগুলো আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে ধারণ করে আছে বঙ্গীয় লোকসংস্কৃতির এক প্রাচীণ ঐতিহ্য।
বিয়ের গীত একান্তই নারীমনের ভাবনা থেকে উৎসারিত। এতে পুরুষের কোনও ভূমিকা নেই। শতাব্দির পর শতাব্দি বিয়ের উৎসবকে কেন্দ্র করে নারীদের মুখে মুখেই বংশানুক্রমে এই গীতগুলো প্রচারিত হয়ে আসছে। এর কোন লিখিত রূপ নেই। পঞ্চগড় জেলার বিয়ের গীতগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই অঞ্চলের ব্যবহারিক ভাষার মৌলিক শব্দের ব্যবহার। এই অঞ্চলে বিয়ের গীত পরিবেশনের সময় কোন বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার করা হয়না। অনেক সময় কনে ও বর উভয় পক্ষের গীদালিরাই এক পক্ষ অপর পক্ষকে উদ্দেশ্য করে গীত ও ছন্দের মাধ্যমে কটুবাক্য নিক্ষেপ করে থাকে। এসময় তারা শ্লীলÑঅশ্লীলতার ধার ধারেনা। এই অঞ্চলের বিয়ের গীতগুলোতে একদিকে আছে প্রচুর হাস্যরস, কৌতুক ও মশকরা, অপরদিকে আছে নারীজীবনের অন্দরমহলের কথা, নারীমনের প্রাচীন সংস্কার, নারীমনের আকুতি ও আর্তির কথা। সনাতন পল¬ীর ঐতিহ্যবাহী বিয়ের গীত এখন আর শোনাই যায়না। এখন বিয়ের আসরে চড়া ভলিউমে চটুল হিন্দি বা পপ সঙ্গীতের সঙ্গে উঠতি ছেলে মেয়েদের উদ্দাম নৃত্য করতে দেখা যায়।
(১)
ওকি জিগিনি
গছ্ কাটিলে গছে ঝুরে পানি রে
ওকি জিগিনি
কই পড়ে তোর মায়ের চোখের পানি রে
ওকি জিগিনি
তোর মাও বেড়াছে যত বৈরাতি জড়েয়া রে
ওকি জিগিনি
গছ্ কাটিলে গছে ঝুরে পানি রে।

ওকি জিগিনি
কই পড়ে তোর ভাউজের চোখের পানি রে
ওকি জিগিনি
তোর ভাউজ বেড়াছে যত বৈরাতি জড়েয়া রে।
ওকি জিগিনি
গছ্ কাটিলে গছে ঝুরে পানি রে।
(২)
ডাইলও ত্যালানি গে দিছুং
মাই মুই হিরা জিরা দিয়া রে
প্রসুন আবিনে গে মাই মুই
ডাইলত্ নাই দেও ঢাকা রে
অতে পইছে গে মা মোর
ভন্দা বিলাইর বাচ্চা রে
পাত্রর বহনাই যে আইচ্চে
বড়য় হুতাশ হয়া রে
তায় না বসাবে বাছার হলদারে
এখে থাবায় খাইল্
ভন্দা বিলাইর বাচ্চা রে।
(৩)
সেরকিয়া বোতলে রে
মা মোর জ্বলে ঘিয়ের বাতি
মা মোর জ্বলে মোমের বাতি
জরম কাঙ্গালের বেটি গে চাহিছে
কোমর মিলনের শাড়ি
সেও শাড়ি মিলাইতে মিলাইতে
মোর ভাইয়া হয়রান হইচে।

সেরকিয়া বোতলে রে
মা মোর জ্বলে ঘিয়ের বাতি
মা মোর জ্বলে মোমের বাতি
আধও ঘাটায় যায়া মাও গে
নিভিল্ ঘিয়ের বাতি
নিভিল্ মোমের বাতি
জরম কাঙ্গালের বেটি গে চাহিছে
হাতের মিলনের চুড়ি
সেও চুড়ি মিলাইতে মিলাইতে
মোর বাবা হয়রান হইচে।
(৪)
ভাইয়ার দুয়ারে পাকা পাকা আমও রে
চলগে দিদি আম বা পাড়াইতে যাইও রে
আম বা পাড়াইতে ছিড়িল্ কোমরের শাড়ি রে
এইনা দ্যাশের কুন্ কুন্ তাতি ভালো রে
এইনা দ্যাশের নালচন তাতি ভালো রে
হাতের ইশিরায় শাড়ি বা বানেয়া দেয়ও রে
চোখের ইশিরায় শাড়িয়া বানেয়া দেয়ও রে।

বাবার দুয়ারে পাকা পাকা আমও রে
চলগে দিদি আম বা পাড়াইতে যাইও রে
আম বা পাড়াইতে ছিড়িল্ গালার হারও রে
এইনা দ্যাশের কুন্ কুন্ বানিয়া ভালো রে
এইনা দ্যাশের নালচন বানিয়া ভালো রে
হাতের ইশিরায় হার বা বানেয়া দেয়ও রে।
(৫)
পাত্রর ভাইটা সাজিয়া আইচ্চে
শিয়াল বরণ গাও রে
আনো শিয়ালক্ বান্ধ ছাগলের মাঝে রে
খাউক ছাগল দেখুক সর্বলোকে রে।

পাত্রর বহনাইটা সাজিয়া আইচ্চে
কুকুর বরণ গাও রে
আনো কুকুরক্ বান্ধ টারুয়ার মাঝে রে
খাউক টারুয়া দেখুক সর্বলোকে রে।
(গানগুলি সংগ্রহ করা হয়েছে নূরজাহান বেওয়া (গলের মাও), বয়স ৭০ বছর, স্বামী মৃত তফিরদ্দিন, পেশা-গৃহিনী, গ্রাম-ভেলাকোপা, উপজেলা-দেবীগঞ্জ, জেলা-পঞ্চগড় এর কাছ থেকে)।
(৬)
(কনেকে স্নানের পিড়িতে চড়ানোর গীত)
পিড়াত চড়িতে না করিস
শরমও গে মাহি
তোর শাশুরি তোর শাশুড়ি
মিস্তিরি ভাতারি গে মাহি।
বিনা পাইসায় কিনিয়া আনিমো
পিড়া গে মাহি।
(৭)
(বর স্নানের গীত)
হামার বাপোইর সাতও বইনি রে
সাতও বইনি ঘেরিয়া ধোইচ্চে
ডিমা মাউরিয়ানিটার কাহয় নাইও রে
ডিমা মাউরিয়ানিটা মঞ্জরিছে।

হামার বাপোইর সাতও ভাইও রে
সাতও ভাইও ঘেরিয়া ধইচ্চে
ডিমা মাউরিয়ানিটার কাহয় নাইও রে
ডিমা মাউরিয়ানিটা মঞ্জরিছে।
(৮)
(কনের গায়ে হলুদের গীত)

শুকান সরিষার ত্যালও দিদি
বাড়ির কাচা হলদি
অল্প করিয়া মাখো দিদি
বাড়ির কাচা হলদি।
অল্প করিয়া মাখো দিদি
বড়য় দুলালের বেটি
বেশি করিয়া মাখো দিদি
জরম হাউরিয়ার ব্যাটাক।
(৯)
(বরযাত্রী আসার গীত)

একখান যে ভাই দুন আইসেছে
চৌমন ঢলিয়া বাও বহেছের, ব্যাটারঘর
হে ব্যাটা সেবক জল
হে শুনেক মোর মন্তরের চদন।

আইছো ব্যাটারঘর বইছো চালিত্
পসাদ বাটেয়া দ্যাছি আমি রে, ব্যাটারঘর
হে ব্যাটা সেবক জল
হে শুনেক মোর মন্তরের চদন।

এ্যালা ব্যাটারঘর জানেন কি না জানেন তুমি
তমার চৈদ্দ পুরুষের ধাগর আমি রে, ব্যাটারঘর
হে ব্যাটা সেবক জল
হে শুনেক মোর মন্তরের চদন।
(১০)
খলতোত্ আছে মাই মোর
চন্দন বিরিক্ষের গাছও রে
তার তলে অসিয়া বাপই
শুইয়া নিদ্রা যায়ও রে
বায়চা কুটির বেটিটা
এতো নাটক জানে রে
নিন্দেরও বাপই হামার
হ্যাটেলে চেতন করে রে
কোন্ঠেনা গেলোরে
মাহির ছোট ভাইও রে
উল্লাস করিয়া দ্যাখো
কুন্ জাইতার বেটি রে।
(১১)
নদীর বানারসি পবনে উড়িয়া যায়
ফেন্নাটা যে চিকন ধাগেরা
আয়না চিরনির দোকান দেয়
ফেন্নিটা যে চিকন ধাগিরি
আয়না বেছিয়া নেয়।
(১২)
যে ঘরে ফেন্নি থাকে
সে ঘরে কদু ফলে
কদু ছিড়িয়া পইল
তোর বুকে গে ছি নারী
হামাত্তিকার চ্যাংড়াগেলার
উচ্চকে মন গে ছি নারী
ডাইঘরাত্ পাড়িয়া
মজা মারে গে ছি নারী।

(১৩)
এতের কাকই বেতের কাকই
দোনোপুখে ধার
মাথাত্ চড়িয়া কাকই
করে অবতার
ফেন্নি থাকে ফুলের বিছিনাত্
ফেন্না ক্যানে যায়
আপন কারও বইনি হলে
বুকত্ চড়িবার চায়।
(১৪)
(পাশা খেলার গীত)

একইশ গা-া কড়িরে দিছু
হায় হায় পাশা খেলেবার বাদে
গে মাহির ভাই
কোনঠে পাম মুই সলঙ্গারে দুধকুশি
ফেন্নি শালিটার বাদে।

ফেন্নি শালিটা কারুণা করেছে
হায় হায় বকরা পাঠার বাদে
কোনঠে পাম মুই বকরারে পাঠা
ফেন্নি শালিটার বাদে
কি মাহির ভাই
কোনঠে পাম মুই সলঙ্গারে দুধকুশি
(১৫)
সাকালে উঠিয়া ফেন্না হাল ববার যায়
যতো নদারী মাইয়া গাও ধুবার যায়
নাঙ্গল জঙ্গাল ফেলেয়া ফেন্না অত্তি দেখিয়া অয়
ফেনারে ওহ্
ও তুই কাথার না বুঝিস আগাল গোড়
খালি করিস গ-গোল
ও তুই ঝোলে আমলে করেছিত্ মিশোল।

পাট্টা শাগের খাটারে মোর নাফা শাগের ঝোল
তাক খায়া ফেন্না শালা দ্যাছে হরিবোল
ফেন্নারে ওহ্
ও তুই কাথার না বুঝিস আগাল গোড়
খালি করিস গন্ডগোল
ও তুই ঝোলে আমলে করেছিত্ মিশোল।

আরও একটা কাথা শুনো দশমনি সোগল
উশুনি পবয়া দেখিয়া কছে ফেন্না অইলায় মুনি ঝোল
ফেন্নারে ওহ্
ও তুই কাথার না বুঝিস আগাল গোড়
খালি করিস গন্ডগোল
ও তুই ঝোলে আমলে করেছিত্ মিশোল।
(গানগুলি সংগ্রহ করা হয়েছে নুনীবালা, বয়স ৭০ বছর, স্বামী মৃত প্রফুল¬ রাম রায়, পেশা-গৃহিনী। রসমনি বালা, বয়স ৭৫ বছর, স্বামী মৃত পলাশ চন্দ্র রায়, পেশা-দিনমজুরি। দ্রৌপদী বালা, বয়স ৩০ বছর, স্বামী মৃত সমারু রাম রায়, পেশা-গৃহিনী। অন্নবালা, বয়স ৫৫ বছর, স্বামী নিবারণ রায়, পেশা-গৃহিনী। আলনশ্বরী, বয়স ৩৫ বছর, স্বামী খুলুরাম রায়, পেশা-গৃহিনী, সর্বসাং-বলরামপুর, উপজেলাÑদেবীগঞ্জ, জেলা-পঞ্চগড় এর কাছ থেকে)।

তুক্ষার গান
তুক্ষা তান্ত্রিক সহজিয়া বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের গান। স্থানীয়ভাবে এদেরকে বলা হয় সাই ও গোঁসাই। নারীদেরকে বলা হয় সাই ও পুরুষদেরকে বলায় গোঁসাই। সাই ও গোঁসাই একসঙ্গে বসে গান পরিবেশন করে। তাদের সঙ্গে সঙ্গত থাকে। দোলপূর্ণিমা, মাঘিপূর্ণিমা, কোজাগরি পূর্ণিমা, একাদশী, বিভিন্ন পার্বণ ও তিথি উপলক্ষ্যে কারো বাড়ির উঠোনে ঘরোয়াভাবে তুক্ষার গানের আসর বসে। গান চলে সারারাত ধরে। গানের ভাব বোঝানোর জন্য গানের ফাঁকে ফাঁকে তারা গানের ব্যাখ্যাও দিয়ে থাকে। যেমনÑহে সঙ্গতগণ, তাই পদখানা বলিতেছে, এই ভবের বাজারে আর কয়দিন, তারপরই গোঁসাই হয়তো আবার গান ধরেÑ“ওরে ভবের হাটে গন্ডগোল/ আপন আপন বোঝা তোল” ইত্যাদি। তুক্ষার গানের বাদ্যযন্ত্র খমক, খঞ্জনি, খোল ও করতাল। এ গানের মাধ্যমে রবোধ (অবোধ) মনকে জগতের নশ্বরতা স¤পর্কে শিক্ষা দেওয়া হয় বলে একে মনশিক্ষার গানও বলা হয়। তুক্ষার গানের শ্রোতা হয় সাধারণত বয়স্ক লোকেরা। দেহতত্ত্ব ও ভাবতত্ত্ব সমৃদ্ধ আধ্যাতিœক চেতনার এ গান পঞ্চগড় জেলার লোকসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
(১)
এমন দয়াল বান্ধব নাই মোরে
এ দুখ বলবো কার আগে

দুখে দুখে আমি হলেম সারা
তাই বুঝি আমার কপাল পোড়া
দয়াল আমার ভাইগ্যে এই কি ছিলো
এ দুখ বলবো কার আগে।

শুইয়া ছিলাম আমি জননীর কোলে
দংশিলো আমায় কালিয়া সাপে
ও সর্পের বিষ ঝাড়িলে নামে
প্রেমের বিষ মোর উজান ধায়
এ দুখ বলবো কার আগে।

চলে গেলাম আমি ফিরে আইলাম
পরার জইন্যে প্রাণ সঁপিলাম
পর ভাবি পরকাল গেলো রে
দয়াল আমার ভাইগ্যে এই কি ছিলো।
(২)
দিদি ঝুরে নারীর মন
সরু ধারের বাইজ বাজেছে
অন্তরে অন্তর।

দিদি কি বলিবো দুঃখের কাথা
বড় বাড়ির কাম
আইতে দিনে কাম করেছো
দিদি নাই আরাম বিরাম।

দিদি পঞ্চজনে মোর ভাবের স্বামী
পঞ্চজন মোর নাঙ
তারাই হইল মোর ঢ্যামনা স্বামী
তারাই হইল মোর নাঙ।

দিদি দেহার মাঝে আছে মোর
পঞ্চ ইন্দ্রিজন
তারাই হইল মোর কর্মচারি
তারাই হইল মোর নাঙ।

দিদি স্বামীর সেবা অতি সেবা
অতি বড় ধন
স্বামী সেবা না করিলে
নরকে গমন।
(গান দুটি সংগ্রহ করা হয়েছে আলনশ্বরী, বয়স ৩৫ বছর, স্বামী খুলুরাম রায়, পেশা-গৃহিনী, গ্রামÑবলরামপুর, উপজেলা-দেবীগঞ্জ, জেলাÑপঞ্চগড় এর কাছ থেকে)।
(৩)
ভজ মন আপনা আপনি
কেউ নাই সংসারের মাঝে রে
হাটতে তোর মুখ আন্ধারি
পন্থে ডুবিল্ বেলা
সাপটার ভিতর খাল্টা সন্দাইল্
কি হবে এ্যালা!

স্যালা আজার বাড়ি চুরি যাছে রে
পোখড়ির পাড়ত্ সিং
আর বাঁশের আগালিত্ খাট পালংকি
জলত পাড়ে নিন।
(গানটি সংগ্রহ করা হয়েছে হেমদিনী বালা, বয়স ৬৫ বছর, স্বামী সুরেন্দ্র নাথ রায়, পেশাÑগৃহিনী, গ্রাম-বলরামপুর, উপজেলা-দেবীগঞ্জ, জেলাÑপঞ্চগড় এর কাছ থেকে)।
(৪)
কি চমৎকার দেখিয়া আইলাম
ভব নদীর কূলে
সর্পের মাথাত্ ব্যাঙের নৃত্য
ময়ূর দেখি হাসে রে
কি চমৎকার দেখিয়া আইলাম
ভব নদীর কূলে।

চরায় গেলো চুরি করিবার
গারস্থ পোল্লে¬ক ধরা
আর বিচার গেলো হাইকোটতে
হাকিম গেলো মারা।
(গানটি সংগ্রহ করা হয়েছে ননীবালা (চাপো), বয়স ৬০ বছর, স্বামী মৃত উকুন্দু রাম রায়, পেশাÑদিনমজুরি, গ্রাম-বলরামপুর, উপজেলাÑদেবীগঞ্জ, জেলাÑপঞ্চগড় এর কাছ থেকে)।
(৫)
আজি মন তোতা ময়নারে তোর
কঠোর হিয়া
ওরে যাবার বেলা ছাড়িয়া যাছিত্ ময়না
মোক ফাঁকি দিয়া।

ও মোর ময়না ময়না রে…
ওরে তুই থাকিস ময়না ওইনা দ্যাশে
মুই থাকিনু ময়না এইনা দ্যাশে
তোর সঙ্গে মোর দেখা না হবে জীবনের তরে।

ও মোর ময়না ময়না রে…
ওরে বাচ্চা থাকি পুষিনু ময়না
দুধও ভাতও খয়া
এ্যালা যে ছাড়িয়া যাছিত্ মোক ফাঁকি দিয়া।
(৬)
পাড়ের কেউ না দিবে খেওয়া রে
আগম দরিয়ার মাঝে
নাও নাই কা-ারি নাই
নাইরে কেলার ভুরা
ওই পাড়ে চৈতনের বাজার ডে
সময় যায় তোর চলিয়া রে।

কাগা হইল তোর দাড়িরে মাঝি
ওনা শেগুন হইল বেপারি
বনেরও শৃগাল হইলোরে অবুঝ মন
ও তোর এই দেহার অধিকারী।
(৭)
কি বলিবো মাঝি রে
কি বলিবো আর
যেইখান নৌকায় উটুডুবূু
সেইখান নৌকায় তোমার।

তরঙ্গ তুফানেরে মাঝি
নৌকা করে মাঝি উজান ভাটি
মাঝি আয়রে আয়
তোমার নৌকারে মাঝি
জলে ভাসিয়া যায়।

দিনে যেমন সূর্যরে উঠে
সূর্য ডুবিলেরে মাঝি
অন্ধকার হবেরে মাঝি
মাঝি আয়রে আয়
তোমার নৌকারে মাঝি
জলে ভাসিয়া যায়।
(গানগুলি সংগ্রহ করা হয়েছে যোগেন্দ্র নাথ রায় (কুনি), বয়স ৮৯ বছর, পিতা মৃত নন্দ মোহন রায়, পেশাÑকৃষি, গ্রামÑবলরামপুর, উপজেলাÑদেবীগঞ্জ, জেলাÑপঞ্চগড় এর কাছ থেকে)।
(৮)
প্রেম কইরোনা প্রেম সজনী হে
যুদি না হয় এখোরে মরন
প্রেম করিয়া না করো অমন।

আশি তলায় বান্ধরে সের
আগে মারো পাল্ল¬ার ফের
চলি¬শ সেরে মন বান্ধিয়া
আগে বান্ধ নিজের মন
ও প্রেম করিয়া না করো অমন।

(৯)
(দুই জনের পালটি গান)

গোঁসাইর গানঃ
উজান পুখে মুই বান্ধিচুগে আলি
ভাটি পুখে বসাইচু ফান্দি
পালেয়া যাবো কোনঠে মাই গে
সোনার মাছ খিলি।

আকারি খায়া মাই তোর হইচেগে লোভ
সন্দাইচিত্ মাই তুই ঘেরার ভিতরত্
তোক মারিয়া শুকটা করিম চৈত মাসের ওদোত্।

সাই এর গানঃ
মাও মরা মাউরিয়ার মতন
মুই একেলায় বহেচরে হাল
ওরে খন্তি দিয়া খুড়িয়া দেখেচো
তোর নাই জমিনত্ সার।

তাহেরপুরীর নাঙ্গল ও জঙ্গাল রে
ও তুই জার্মান দ্যাশের কিনিয়া আনিলো ফাল্
হালের গরু নাই কিনিতে
তুই কিনিলো নাঙ্গল আর জঙ্গাল
ওরে খন্তি দিয়া খুড়িয়া দেখেচো
তোর নাই জমিনত্ সার।
(গান দুটি সংগ্রহ করা হয়েছে পবীন চন্দ্র রায়, বয়স ৩০ বছর, পিতা শরৎ চন্দ্র রায়, পেশাÑদিনমজুরি, গ্রামÑবলরামপুর, উপজেলাÑদেবীগঞ্জ, জেলাÑপঞ্চগড় এর কাছ থেকে)।
(১০)
জন্ম হবার সময়রে মন তোর
আসিবার বেলা
সেইদিনে হবার পারিন্নাই
সোনা আর রুপা।

সোনা যুদি হোলো হয়রে মন
কতয় পালো হয় সন্মান।

গুরু যেমন দেয়রে মন তোর
কর্ণে ভরিয়া
ঐ রকম থাকিলো হয় তুই
কর্ণে ঢুলিয়া।
(গানটি সংগ্রহ করা হয়েছে যদুনাথ রায়, বয়স ৬৫ বছর, পিতা মৃত নরেন্দ্র নাথ রায়, পেশাÑকৃষি, গ্রামÑবানেশ্বর পাড়া, উপজেলাÑদেবীগঞ্জ, জেলাÑপঞ্চগড় এর কাছ থেকে)।
(১১)
তুই হলো রঙ্গিলা নিতাই
কি রঙ মাখালো হায়রে হায়
ষোলটা গাছের গোড়া কুন্ জাগায়।

ও ভাই নিতাই নিতাই রে…
ডিমার ভিতর ছিদ্র নাই
কেমন করিয়া জীব সন্দাইল্
এইটা কাথার উত্তর দিলে সাধু চিনা যায়।

ঘর পোড়া গেল মাড়োয়াল ফুটিল
ধোঁয়া উঠিল ব্যোমকিয়া
শূন্যের ঘর মোর শূন্যতে অহিল্ ডে
খালি মাঝিয়াখান গেল্ পোড়া।
(গানটি সংগ্রহ করা হয়েছে গিরিজা কুমার রায়, বয়স ৫০ বছর, পিতা মৃত মনোহর রায়, পেশাÑহোমিও চিকিৎসক, গ্রামÑবলরামপুর, উপজেলাÑদেবীগঞ্জ, জেলাÑপঞ্চগড় এর কাছ থেকে)।
(১২)
কি করিবো ওরে মন তুই
কপালক্ দুষিয়া
ওরে কর্মদোষে সব হারালো
দ্যাখেক ভাবিয়া।

আজি বাপের কালের সাড়ে তিন কাঠা রে
জমি ভাগতে পালো
ওরে গাড়িবার কইছে নুনিয়া ধান
ওলকচু নাগালো।

আজি হাউস করিয়া নাগালোরে মন
ও তুই জামুরি অস ভাদোই ধান
কাটিয়া মারিয়া দ্যাখেক মন তুই
সকলি পাতান।
(গানটি সংগ্রহ করা হয়েছে হরিকিশোর রায়, বয়স ৫৫ বছর, পিতাÑশশীলাল রায়, পেশাÑকৃষি, গ্রামÑবলরামপুর, উপজেলা-দেবীগঞ্জ, জেলাÑপঞ্চগড় এর কাছ থেকে)।

গোমিরা খেলার গান
পঞ্চগড় জেলার রাজবংশী জনগোষ্ঠীর অন্যতম উৎসব চড়কপূজা উপলক্ষ্যে চৈত্র মাসে গোমিরা খেলার গান হয়। চৈত্রসংক্রান্তির চার পাঁচ দিন আগে শুরু হয় গোমিরার খেলা ও গান এবং শেষ হয় চৈত্রসংক্রান্তির দিন বিশ্যাল খেলার মধ্য দিয়ে। দশ বারোজন যুবকের একটি দল মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খেলা দেখায় ও গান শোনায়। তারা সকলেই শিবের ভক্ত এবং ‘খেলটুক’ নামে পরিচিত হয়। খেল্টুকদের পরনে থাকে সাদা ধুতি ও গেঞ্জি। চৈত্রসংক্রান্তির আগ পর্যšন্ত তাদের ¯œান করা এবং পোষাক বদলানো নিষেধ। গৃহস্থের বাড়ির বাইরের খোলানে তারা ঢাকের তালে তালে মাটিতে শুইয়ে, বসে, গড়িয়ে গড়িয়ে ও দাঁড়িয়ে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিতে গোমিরার খেলা দেখায়। খেলা শেষে কোন কোন বাড়িতে গোমিরার গানও শোনায়। ঢাকের তালে তালে একবার ডানে এবং একবার বামে গিয়ে হাতে তালি দিয়ে তারা নৃত্যসহ গান পরিবেশন করে থাকে। গোমিরার গান মাটিয়া তালযুক্ত মধ্যম লয়ের গান। এতে আদিরসের আধিক্য লক্ষ্য করা যায়।
(১)
আসিছে গোমিরা পূজা
করিম দিদি ধোয়া মুছা
ও মোর দিদিগে
তুই মোক বাড়ি নিগি থো।

নানাগে মোক সাওদা পাতি
ওগে নানাগে মোক ঝাল্ল¬ক চোটি
খালি ও মোর দিদিগে
তুই মোক বাড়ি নিগি থো।
আসিছে গোমিরা পূজা
করিম দিদি ধোয়া মুছা।
(গানটি সংগ্রহ করা হয়েছে মতি বালা, বয়স ৬০ বছর, স্বামী যোগেন্দ্রনাথ রায় (কুনি), পেশাÑগৃহিনী, গ্রামÑবলরামপুর, উপজেলাÑদেবীগঞ্জ, জেলাÑপঞ্চগড় এর কাছ থেকে)।
(২)
হে দুনিয়াইর ভাবনা
গুনগুন জ্বালা ও মোর প্রাণে সহেনা
স্যালা এক চিন্তা করে কামেলা
যায় করে ভাই মামেলা
তার চাইতেও অধিক চিন্তা রে
ওরে বেটির ঝামেলা।

বেটি হইল মোর একেনা
ধান ভুকিবার পারেনা
কেমন করিয়া ওরে দাদা
মুই সাগরের জলে দিম্ ভাসেয়া।
(৩)
আজি মন কেমন করেছে
ও মোর বৌদি গে তোকে দেখিয়া

ও মোর বৌদি গে-
আইতের ক্ষণ মুই ঘর যায়া
বিছিনাখান পাড়িয়া
একেলায় থাকিয়া আছো ও মোর বৌদি গে
ও মুই বালিশটা নিয়া।

আজি কি ময়হা নাগালো
ও মোর দ্যাওরা রে একদিন আসিয়া

ও মোর দ্যাওরা রে-
তুইরে দ্যাওরা আলসিয়া
খোলই যাছে ভাসিয়া
পাড়ায় পাড়ায় বেড়াইস ও মোর দ্যাওরা রে
ও তুই মোবাইলটা নিয়া।

ও মোর বৌদি গে-
আইতের ক্ষণ মুই পাও স্বপন
মোর নদারী তোর মতন
গালাটা ধরিয়া ও মোর বৌদি গে
কতয় করো আলাপন।
(গান দুটি সংগ্রহ করা হয়েছে পবীন চন্দ্র রায়, বয়স ৩০ বছর, পিতাÑশরৎ চন্দ্র রায়, পেশাÑদিনমজুরি, গ্রামÑবলরামপুর, উপজেলাÑদেবীগঞ্জ, জেলাÑপঞ্চগড় এর কাছ থেকে)।
(৪)
আজি বুক ভিজে মোর পড়ে চোখের পানি
বনুরে নাখাও সোদর তুই মোক বাড়ি নিগি থো।

ও বনু যেমন তোমার পাড়ার লোক
পীরিতি করিবার কহেছে মোক
ওইলাতে মোর মনটা কহেছে ছি ছি বনুরে ও
না খাও সোদর তুই মোক বাড়ি নিগি থো।

ও বনু যেনং তমার ঢং চলন
উচাং চাং করেছে মন
ওইলাতে মোর ঘরে রয়না মন
কি বনুরে ও
না খাও সোদর তুই মোক বাড়ি নিগি থো।
(গানটি সংগ্রহ করা হয়েছে অখিল চন্দ্র দেবসিংহ, বয়স ৪০ বছর, পিতা অতুল চন্দ্র দেবসিংহ, পেশাÑকৃষি, গ্রামÑবলরামপুর, উপজেলাÑদেবীগঞ্জ, জেলাÑপঞ্চগড় এর কাছ থেকে)।

চোর চুন্নীর গান
চোর চুন্নির গান পঞ্চগড় জেলার লোকসঙ্গীতের জনপ্রিয় একটি ধারা। চোর ও চোরের স্ত্রী চোরনীকে পটভূমিকায় রেখে চোর চুন্নীর গান পরিবেশিত হয়। ‘চোরনী’ শব্দটি দ্রুত উচ্চারণের ফলে অপভ্রষ্ট হয়ে চুন্নীতে রূপান্তরিত হয়েছে। লোকবিশ্বাস আছে যে, আশ্বিন মাসের অমাবস্যার রাতে চোর যদি গৃহস্থের বাড়ি থেকে কোন জিনিস চুরি করে এনে পরের মাসের অমাবস্যার রাতে অর্থাৎ কালীপূজার রাতে সেই চুরি করা দ্রব্যটি গৃহস্থের অজান্তে তার ঘরে নির্বিঘ্নে ফিরিয়ে দিয়ে আসতে পারে তাহলে সেই চোর সারাবছর সাফল্যের সঙ্গে চুরি করতে পারবে। চোর চুন্নীর গানের এই লোকবিশ্বাসটির সঙ্গে আদিম যাদুক্রিয়ার স¤পর্ক আছে এতে কোন সন্দেহ নেই। অন্য কারণও আছে, একসময় এ অঞ্চলে কার্তিক মাসকে বলা হতো মঙ্গার মাস। এসময় মানুষের অভাব অভিযোগ লেগেই থাকতো। অভাবের কারণে সমাজে চোরের উপদ্রপও যেতো বেড়ে। চুরি ছিলো এতদঞ্চলের মানুষের নিত্যদিনের সমস্যা। এই সামাজিক সমস্যার ওপর ভিত্তি করেই চোর চুন্নী গানের উৎপত্তি। চোর ও চুন্নী দ¤পতির কথপোকথনের মাধ্যমে উঠে আসে তাদের দা¤পত্য ও গার্হস্থ্য জীবনের চিত্র, সমাজের বাস্তব সমস্যার চিত্র।
চোর চুন্নীর গান শুরু হয় কালীপূজার দশ বারো দিন আগে এবং শেষ হয় কালীপূজার রাতে। দশ বারোজনের একটি দল বাড়ি বাড়ি গিয়ে উঠোনে দাঁড়িয়ে চোর চুন্নীর গান পরিবেশন করে। গান চলে আধ ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা ধরে। একজন মাথায় টোপর পড়ে মুখে হাড়ির কালিঝুলি মেখে চোর সাজে সঙ এর বেশে। আরেকজন পুরুষ শাড়ি-ব¬াউজ, সিঁদুর, পরচুলা ও হাতে চুড়ি পড়ে নারীর বেশে চুন্নী সাজে। বাকিরা কেউ দোহার, কেউ বাদ্যযন্ত্রী। চোর চুন্নীর গানে হারমোনিয়ম, ঢোল, করতাল, বাঁশি ইত্যাদি লোকজ বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয়।
চোর চুন্নীর গানে দুটি অংশ থাকে। একটিতে থাকে চোর অথবা চুন্নীর প্রশ্ন এবং অন্যটিতে থাকে চোর অথবা চুন্নীর উত্তর। চোর যখন চুন্নীকে সংলাপ ও গানের মাধ্যমে প্রশ্ন করে তখন চুন্নী সংলাপ ও গানের মাধ্যমে উত্তর দেয় আবার চুন্নী যখন চোরকে প্রশ্ন করে তখন চোর উত্তর দেয়। উত্তর দেবার সময় চোর ও চুন্নী উভয়েই একসঙ্গে গান ধরে। তাদের সঙ্গে দোহার ও বাদ্যযন্ত্রীরাও গান ধরে। চুরি যদিও সমাজে একটি ঘৃণিত পেশা কিন্তু চোর চুন্নীর গান শুনে যে নির্মল আনন্দ পাওয়া যায় তাতে চোর ও চুন্নীর প্রতি ঘৃণা না এসে বরং তাদের প্রতি ভালোবাসারই জন্ম হয়।
চোর চুন্নীর উক্তি ও প্রত্যুক্তিমূলক গীতি-সংলাপ, হাস্য-কৌতুক, ব্যঙ্গ ও বিদ্রুপের মাধ্যমে তারা অবতীর্ণ হয় সমাজের নিরপেক্ষ সমালোচকের ভূমিকায়। সমাজে ঘটে যাওয়া অতীতের কলংক কাহিনী, সমসাময়িক আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাবলির নিরপেক্ষ চিত্র চোর চুন্নীর গানে যথাযথভাবে ধরা পড়ে গ্রামীণ লোককবিদের রচনায়।
(১)
চরার গান –
আজি ভালে আসিলো হামার বাড়ি
ও মোর বৌদি গে
একটা উপায় দিয়া যা।

ও মোর বৌদি গে….
ওগে বাংলাদেশের আইন জারি
হটাত্ বন্ধ হইল্ গে বিড়ি
বিড়ি ছাড়া অহিবার না পারে গে
ও মোর নয়া নদারী।

চুন্নীর গান –
আজি কি কাথা শুনালো
ও মোর দ্যাওরা রে
মন মোর পাগল করিলো
ওরে স্বামীধন মোর মরিয়া
মন আখিছু বান্ধিয়া
বান্ধা চিত্ মোর আউলিয়া ওঠালো রে
তুই মোর প্রাণের বন্ধুয়া।

চরার গান –
ও মোর বৌদি গে
ওগে বিছিনাতে থাকিয়া
মুখ্খান অছে ফিরিয়া
মনটা কছে বালিশটা ধরিয়া গে
ও মুই ফেলাও ছিড়িয়া।

চুন্নীর গান –
ও মোর দ্যাওরা রে
ওরে মুই নারীটা রবলা ( অবলা)
পেম পীরোতি জানোনা
কিভাবে চলিতে হবে দ্যাওরা রে
তুই মোক নিবো চালেয়া।

চরার গান –
ও মোর বৌদি গে
ওগে কাথা বুঝার সময় দ্যাছো
মনের কাথা খুলি কছো
যুদি করিস হতভাগার দয়া গে
হুটাক এ্যালায় ছাড়েছো।

চুন্নীর গান –
ও মোর দ্যাওরা রে
ওরে যারে দ্যাওরা দিনু কাথা
মুই নারী না বান্ধ খোঁপা
শাড়ির অঞ্চল বুকতে অহেনা রে
ও তোর কাথা শুনিয়া।
(২)
চরার গান Ñ
চুন্নী আউলা খোঁপা টেরিয়া সিতা পাড়িছিত্ যেমন
ওগে বেশ সাজিছিত্ মনের মতন
ও মোর চুন্নী গে
দখিনা দ্যাশের মাঘিটার মতন।

চুন্নী সদায় তোর উচ্চক মন
পিন্দিয়া বেড়াছিত্ তহবন
নাল গামছাখান ফতার কানিত্
কোমরে গুঞ্জন
এ্যালানি সাজিবার চাছিত্
নয় নদারীর মতন।
(গানটি সংগ্রহ করা হয়েছে হরিকিশোর রায়, বয়স ৫৫ বছর, পিতা শশীলাল রায়, পেশাÑকৃষি, গ্রামÑবলরামপুর, উপজেলাÑদেবীগঞ্জ, জেলাÑপঞ্চগড় এর কাছ থেকে)।
(৩)
চরার গান –
চুরি না করিলে গে চুন্নী খাবো আরো কি
ও তুই শুকাবো পুন্দি
সুখে কি বিলাই গছ্ চড়ে
বড়য় চদনে ধনী দ্যাশ ছাড়ে।

চুন্নীর গান –
চরা কিসের আশা তোর
তুই কি যোইগ্যে হবার পারিস মোর
ওরে দাঁত ভাঙ্গা পকলা বুড়া
দেহাত্ নাই তোর জোর
কিসের বস্তু আছেরে চরা
তোর দেহার ভিতর।
(গানটি সংগ্রহ করা হয়েছে সন্তোষ কুমার রায় (হুদু), বয়স ৪৫ বছর, পিতা মৃত সূর্যমোহন রায়, পেশাÑদিনমজুরি, গ্রাম-বলরামপুর, উপজেলাÑদেবীগঞ্জ, জেলাÑপঞ্চগড় এর কাছ থেকে)।

ছিটা গান

ছিটা গান হলো প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের গান। এরা কেউ দিনমজুর, কেউ ভূমিহীন প্রজা, কারো বা সামান্য জমিজমা আছে, কেউ নিরক্ষর আবার কেউ বা সামান্য অক্ষরজ্ঞান স¤পন্ন মাত্র। কর্মক্ষেত্রে বা অবসর সময়ে তাদের একান্ত ব্যক্তি হৃদয় থেকে উৎসারিত প্রেম ভালোবাসা, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, আবেগ-অনুভূতির কথাগুলো সাজিয়ে তারা আপন মনে মুখে মুখেই গান বাঁধে, সুরারোপ করে গায়। ব্যক্তির রচিত গান সমষ্টিগতভাবে পরিপুষ্টতা পেয়ে একসময় তা মুখে মুখেই প্রসার লাভ করে। পঞ্চগড় জেলার নিভৃত পল¬ীর সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এইসব গান ‘ছিটা গান’ নামে পরিচিত। প্রান্তিক চাষী-মজুরের একান্ত ব্যক্তি হৃদয়ের অনুভূতি থেকে উৎসারিত ছিটা গানের কথা ও সুর বড়ই করুণ ও আবেদনশীল।
(১)
সারা দিন কাটিলোরে বগুলা
পুঠি মাছের চিল্কন দেখিয়া
ওরে ওইতানে তোর নাম পোইছে কানি বগুলা।

ওরে মাছও নাই কাকেড়াও নাইরে
সদায় বগরির গছত্ আছিত্ ধেয়ান ধরিয়া
ওরে ওইতানে তোর নাম পোইছে কানি বগুলা।
(গানটি সংগ্রহ করা হয়েছে তাপস কুমার রায়, বয়স ৩৫ বছর, পিতা গজেন চন্দ্র রায়, পেশাÑচা ও বিস্কুটের দোকান, গ্রামÑনগরকুমারী, উপজেলাÑবোদা, জেলাÑপঞ্চগড় এর কাছ থেকে)।
(২)
মানসিকেনা মুই যেমন গে তেমন
নামটায় হইল্ মোর জারি
ছোটতে মরিছে সোয়ামী গে
আই মোর পাঙ্খার পাড়ত্ বাড়ি।

ভাই কান্দে ভাতিজা কান্দে গে
আই মোর কান্দে ভাতের হাড়ি
অকারণ করিয়া কান্দে গে
আই মোর ডাইল ঘাটা নাখিরি।
(গানটি সংগ্রহ করা হয়েছে পবীন চন্দ্র রায়, বয়স ৩০ বছর, পিতা শরৎ চন্দ্র রায়, পেশাÑদিনমজুরি, গ্রামÑবলরামপুর, উপজেলাÑদেবীগঞ্জ, জেলাÑপঞ্চগড় এর কাছ থেকে)।
(৩)
ঢকের নদারী মোর মরিয়ারে গেল্
ফাকুন্দা পড়িলেক্ মোর নারিকোলি বোতলের ত্যাল

স্যালা নাঙ্গলে জঙ্গালে দিলেক হরির নাম
হুটা পাগেলা নিতাইর কাম।

গলি আর পচ্চি
সুতি আর বাড়ি
দিলেক হরির নাম
হুটা পাগেলা দেবারুর কাম।
(৪)
চালত্ ফলিছে চালকুমড়া মাই- মাই গে
ও তোর ঝিকত ফলিছে কদু
এখে সাথে মান্ষি হনো মাই- মাই গে
ও তোর পরে খাবে মধু।

ওকি মাই মাই গে…
যেইঠে তোক মাই ব্যাচেয়া গে খাবে
ওইঠে যাম্ মুই চাখিরি (চাখিরিÑচাকরি)
ছান্ ফেলাইতে দেখা করিস মাই- মাই গে (ছান্Ñগোবর)
ও মোক খোয়াইস্ পানের খিলি।
(গান দুটি সংগ্রহ করা হয়েছে সন্তোষ কুমার রায় (হুদু), বয়স ৪৫ বছর, পিতা মৃত সূর্যমোহন রায়, পেশা-দিনমজুরি, গ্রামÑবলরামপুর, উপজেলা-দেবীগঞ্জ, জেলাÑপঞ্চগড় এর কাছ থেকে)।
(৫)
আর সোয়ামী মরিছে ঢেল্ দিনে
ওরে এ্যালাও দ্যাখো মুই স্বপনে
দুই চোখে জল পড়ে মোর আপনে।

আর হাল ধরি যাবে পুব্ কান্দর
মারিয়া আনিবে মাছ কাকড়
মুখের আগত্ দিয়া কহিবে গে হে
নদারী চাইট্টা খাবার কর।

আর সোয়ামী ছিলো মোর হায়রে হায়
ওরে এ্যালাও দেহাটা মোর পোড়া যায়
আর গাওত্ হ্যালানি দিয়া রে হে
নিন্দাবে আর কায়।
(গানটি সংগ্রহ করা হয়েছে হরিকিশোর রায়, বয়স ৫৫ বছর, পিতা শশীলাল রায়, পেশাÑকৃষি, গ্রামÑবলরামপুর, উপজেলাÑদেবীগঞ্জ, জেলাÑপঞ্চগড় এর কাছ থেকে)।
(৬)
তুই মোক ছাড়িয়া পালালো রে
ওরে বৈদেশী
ও তোর খমকের বাইজনে
বাঁশিরও সুরে
মন করিলো মোর উদাসী
ওরে বৈদেশী।

বাপ ছাড়িনু মাও ছাড়িনু
ছাড়িনু শিরের সোয়ামী
ওরে বৈদেশী।
(গানটি সংগ্রহ করা হয়েছে গিরিজা কুমার রায়, বয়স ৫০ বছর, পিতা মৃত মনোহর রায়, পেশাÑহোমিও চিকিৎসক, গ্রামÑবলরামপুর, উপজেলাÑদেবীগঞ্জ, জেলাÑপঞ্চগড় এর কাছ থেকে)।

অন্তিম পর্বের গান
মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তি সকলের কাছে প্রিয় হয়ে যায়। মাথার কাছে ধুপ বা আগরবাতি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এই সময় মৃতের বাড়িতে সকল আত্মীয়-স্বজন এসে উপস্থিত হয়। মৃতের নিকটাত্মীয় মহিলারা বিলাপ করতে থাকে। বিলাপ বা ক্রন্দনে আছে স্বজন হারানোর বেদনার সুর।
কোন হিন্দু ব্যক্তি মারা গেলে মৃতদেহকে তুলসীতলায় উত্তর শিয়রী অবস্থায় শুইয়ে দেওয়া হয়। মৃতের শিয়রের কাছে ধুপ ও দীপ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। মৃতের শিয়রের কাছে বসে কেউ সুর করে গীতাপাঠ করে। বাড়িতে মৃতের নিকটাত্মীয় মহিলারা ‘মড়া কান্দনি’ শুরু করে। এই মড়া কান্দনিতেও আছে স্বজন হারানোর বেদনার সুর। দুইজন কীত্তিনিয়া ঠাকুর (কীর্তনিয়া ঠাকুর) মৃদঙ্গ এবং ঝাপতাল বাজিয়ে কীর্তন গান করেন। পঞ্চগড়ের স্থানীয় ভাষায় এই কীর্তন গানকে বলা হয় ‘মড়াখোওয়া গান’।

শবযাত্রার গান
মৃতদেহকে বাঁশের চতুর্দোলায় চড়িয়ে তাঁর স্বজনেরা বাড়ি থেকে বের করে মুখে “বল হরি, হরিবোল” বলতে বলতে শ্মশান ঘাটে নিয়ে যায়। এই সময় কীর্ত্তনিয়া ঠাকুরের দল মৃদঙ্গ এবং ঝাপতাল বাজিয়ে গান ধরে—

আরো ওমোর প্রাণের স্বরূপ রে…
মন কান্দে মোর শ্রীরাধা বলে
স্বরূপ যারে দ্যাখে তারে পুষে
মন কান্দে মোর শ্রীরাধা বলে।

স্বরূপ বেপার করতে এসেছিলাম ভবের বাজারে
বেপার স্যাপার সব হারাইলাম মায়ার কারণে
ও স্বরূপ রে মন কান্দে মোর শ্রীরাধা বলে।

ও স্বরূপ বজে (ব্রজে) থাকা হলনারে
দ্যাশে যাওয়ার সময় হল রে
ও স্বরূপ রে মন কান্দে মোর শ্রীরাধা বলে।

ও স্বরূপ যায় করিছে দয়ামায়া
তায় গেইছে সইন্যাসী হয়া
ভাবের মানুষ গেল ছাড়িয়া
ও স্বরূপ রে মন কান্দে মোর শ্রীরাধা বলে।

ও স্বরূপ হাটেরে চিনা পথের চিনা
চিনা পরিচয়
হাট ভাঙ্গিয়া গেল মনরে
ও তোর কাহয় কাহ নয়।

পিণ্ড দানের গান
আদ্যশ্রাদ্ধের দিন মৃতের উদ্দেশ্যে পি-দান করা হয়। শ্রাদ্ধ অর্থ শ্রদ্ধাপূর্বক দান করা আর পিণ্ড অর্থ হচ্ছে মৃতের উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাতের মুঠি। শাস্ত্রমতে মৃতের উদ্দেশ্যে অনেক শ্রাদ্ধের কথা আছে। আদ্যশ্রাদ্ধ হচ্ছে মৃতের উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত প্রথম ও পূর্ণাঙ্গ একটি শ্রাদ্ধ। এইদিন মৃতের উদ্দেশ্যে আতপ চাল, দুধ, কলা ও ক্ষির দিয়ে পি- দেওয়া হয় এবং ব্রাহ্মণ বা পুরোহিত, ক্ষৌরকার (নাপিত) ও কীত্তিনীয়া ঠাকুরকে সাধ্য অনুযায়ী অন্ন, বস্ত্র ও অর্থ দান করা হয়। মৃত ব্যক্তি যাতে সহজেই যমদ্বারে অবস্থিত তপ্ত বৈতরণী নদী পার হতে পারে সেজন্যে আদ্যশ্রাদ্ধের দিন “বৈতরণী পার” নামক একটি বিশেষ অনুকরণমূলক অনুষ্ঠান করা হয়। শ্রাদ্ধের স্থানে একটি কৃত্রিম পুকুর কেটে সেখানে জল ভর্তি করে একটি গোবৎস সেই কৃত্রিম পুকুরে সাঁতার দিয়ে পার করানো হয়। লোকবিশ্বাস, মৃত ব্যক্তি গোবৎসের লেজ ধরে বৈতরণী পার হয়ে গেলো। পি-দানের সময় কীর্ত্তনীয়া ঠাকুরের দল মৃদঙ্গ আর ঝাপতাল বাজিয়ে গান ধরে—

আমার দানে আরাধনা দানে উপাসনা দানে ভবপার
আর পিতা মাতার ছাইদ্দে (শ্রাদ্ধে) যেজন দান খইরত্ করে
তাহারো পিতা মাতা স্বর্গে গমন করে
আমার দানে আরাধনা দানে উপাসনা দানে ভবপার।

পিতা মাতার ছাইদ্দে যেজন ছত্র (ছাতা) দান করে
তাহারো পিতা মাতা স্বর্গে গমন করে
পিতা মাতার ছাইদ্দে যেজন মাল্য দান করে
তাহারো পিতা মাতা স্বর্গে গমন করে
আমার দানে আরাধনা দানে উপাসনা দানে ভবপার।

দান খইরত্ করিয়া যেজন নিন্দা ঘোষণা করে
শত বংশ তার নরকে বাস করে
পিতা মাতা ছাইদ্দে যেজন গীতা দান করে
মহাপাপী হলেও সে স্বর্গে গমন করে
আমার দানে আরাধনা দানে উপাসনা দানে ভবপার।

ধূমালির গান
ধূমালি হচ্ছে মৃতের আত্মাকে নিকটাত্মীয়দের মর্তধাম থেকে স্বর্গে চালান দেওয়ার একটি প্রাচীন ঐন্দ্রজালিক প্রক্রিয়া। মানুষ মনে করে মৃত্যুর পরও মৃতের আত্মা ঘরের আনাচে-কানাচে পরিবারের লোকজনের সঙ্গেই অবস্থান করে। শ্রাদ্ধ শেষে ঐদিনই রাত্রিবেলা ধূমালির মাধ্যমে নিকটাত্মীয়রা মৃতের আত্মাকে স্বর্গের উদ্দেশ্যে চিরবিদায় জানায়। মৃতের ঘরে চাল বা আটা ভর্তি একটি থালা রেখে দিয়ে ঘরের সব দরজা-জানালা বন্ধ করে বাতি নিভিয়ে দেওয়া হয়। উঠোনে বিভিন্ন উপচার সহযোগে পূজা বসিয়ে পুরোহিত বেদমন্ত্র পাঠ করেন। মৃতকে যে ছেলে (ছেলে না থাকলে মেয়ে) মুখাগ্নি করেছে সে মাথায় একটি কুলা (কুলায় সামান্য চাল, একছড়ি কলা, পান-সুপারি ও একটি প্রদীপ থাকে) নিয়ে পুজোর স্থানে পাঁচ বা সাত পাক ঘোরে। মৃতের নিকটাত্মীয়রাও তার পেছনে একে অপরকে ছুঁয়ে লাইন ধরে একসঙ্গে ঘোরে। পাঁচ বা সাত পাক ঘুরে সবাই মাটিতে সাষ্টাঙ্গে শুইয়ে পড়ে। এই সময় মহিলাদের মড়াকান্দনি আর কীর্ত্তনীয়া ঠাকুরের ধূমালির গানে অন্যরকম এক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। মৃতের আত্মা স্বর্গে যাওয়ার সময় ঘরে রাখা চাল বা আটার থালায় হস্ত বা পদচিহ্ন রেখে গেছে বলে মহিলারা প্রচার করে।

আলন্দে হরিবল ভজ নিতানন্
নিতাইকে ভজিতে গেলে পাবে শ্রীগুরুর চরণ
শীগুরু পরম গুরু পরম সিন্দুর
এহকাল পরকাল চিরকালের বন্দু
তাক থেইয়া তাক থেইয়া মিদংগ বাজে
নিচে আছে বিন্দাবন, বিন্দাবন ধামে।

তুমি হইলা বটবৃক্ষ আমি হইলাম লতা
দুই চরণ বেড়িয়া ধরবো ছাড়িয়া যাইবেন কোথা
আলন্দে হরিবল ভজ নিতানন্
নিতাইকে ভজিতে গেলে পাবে শ্রীগুরুর চরণ।

কৃষিকাজে লোকাচার
বাংলা কৃষিপ্রধান দেশ। গ্রামীন অর্থনীতি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। গ্রামবাংলার আশি ভাগ লোকই কৃষিজীবী। অতীতে কৃষিকাজ ছিলো গরুনির্ভর। কৃষক পরিবারে তাই গরুর আদর চিরকালই। হিন্দুরা গরুকে ভগবতী বলে মান্যতা করে। কৃষকের প্রধান ফসল ধান। ধান্যরোপণ, ধান কাটা, ফসল তুলে ঘরে আনা থেকে শুরু করে কৃষক পরিবারে বিভিন্ন ঋতুতে বিভিন্ন উৎসব ও লোকাচার পালিত হয়। কৃষিজীবী মানুষের জীবনচর্যার স্বত:স্ফূর্ত প্রকাশ ঘটে এইসব লোকাচারে। পঞ্চগড় জেলার কৃষিভিত্তিক লোকসমাজে কৃষিকাজকে কেন্দ্র করে কৃষিনির্ভর অনেক লোকাচার পালিত হয়। এখানে তার কয়েকটি তুলে ধরা হলো Ñ

হালযাত্রা
হালযাত্রা হয় জৈষ্ঠ মাসের শেষে অথবা আষাঢ়ের প্রথম দিকে। এই দিন কৃষক জমিতে আড়াই পাক হাল বহার মাধ্যমে সারাবছরের জন্য হালের সূচনা করে। পঞ্জিকায় শুভদিন দেখে সকালবেলা লাঙ্গল, জোয়াল ও গরু নিয়ে কৃষক জমিতে যায়, হাল জুড়ে। জমির পূর্ব পাশ দিয়ে হাল বহা শুরু করে। আড়াই পাক হাল বহার পর কৃষক প্রথমে ভূমিতে প্রণাম করে, তারপর হালের গরু, লাঙ্গল ও জোয়ালে প্রণাম করে হাল ছেড়ে দেয়।

গোচিপুনা
‘গোচি’ অর্থ ধানের চারা আর ‘পুনা’ অর্থ স্থাপন বা রোপণ করা। শ্রাবণ মাসে ভূমিতে প্রথম আমন ধানের চারা স্থাপন বা রোপণ করাকেই পঞ্চগড়ের আঞ্চলিক পরিভাষায় গোচিপুনা বলা হয়। একে ভূমিপূজাও বলা যেতে পারে। বর্ষাকালে কৃষক হালচাষ দিয়ে জমি তৈরি করে জমির এক কোণায় কাদামাটি দিয়ে একটি ছোট বেদি তৈরি করে। একটি কলাগাছের চারা, একটি পাটগাছ, একটি কালো কচুর গাছ খাড়া করে পুতে দিয়ে বেদিটিকে জল কাদা দিয়ে ভালোভাবে লেপে দেয়।
গোচিপুনা করার জন্য একটি কাকড়া সংগ্রহ করে রাখা হয়। পূজার উপকরণ হিসেবে বাড়ি থেকে সিঁদুর, কাঁচা দুধ, সোনা-রুপা ধোয়া জল ও কাকড়াটি নিয়ে কৃষক জমিতে যায়। কাদামাটির বেদির সামনে কৃষক হাটুগেড়ে বসে প্রথমে কাকড়াটিকে কাদার বেদিতে আঙ্গুল দিয়ে চেপে ধরে ভালোভাবে বসিয়ে দেয়, এরপর কলাগাছ, পাটগাছ, কালোকচুর গাছের গোড়ায় ও কাকড়ার পিঠে সিঁদুর লাগিয়ে দেয়। কৃষক এবার ডান হাতে এক গোছা ধানের চারা নিয়ে বাম হাত দিয়ে কাদার বেদিতে রোপণ করে। রোপন করা হয়ে গেলে কলা গাছ, পাট গাছ, কালোকচুর গাছ, রোপা ধানের চারার গোড়ায় ও কাকড়ার পিঠে কাঁচা দুধ এবং সোনা-রুপার জল ঢেলে দিয়ে বেদিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে।
হিন্দুদের পূজা-পার্বণ ও শুভকাজে সিঁদুর, সোনা-রুপার জল, কাঁচা দুধ মাঙ্গলিক উপচার হিসেবে ব্যাবহৃত হয়। কলা গাছ এখানে বংশবিস্তারের প্রতীক, পাট অর্থকরী ফসলের প্রতীক, কালোকচুর গাছ ঈশাণ কোনের কালো মেঘের প্রতীক এবং কাকড়া ভূমিকর্ষণ ও উর্বরতার প্রতীক।

ধানের আগ নেওয়া
পঞ্জিকায় শুভদিন দেখে কার্তিক মাসে ধানের আগ নেওয়া হয়। ধানের আগ নেওয়া অর্থ হচ্ছে মাঠের লক্ষীকে বরণ করে ঘরে নিয়ে আসা। একটি পাচন অথবা কাস্তে নিয়ে চাষী তার যে কোন একটি ধানের ক্ষেতে যায়। পাঁচ অথবা সাতটি শিষ দেখে একটি ধানের গোছা বা ঝাড় মাটিসহ তুলে বাড়িতে নিয়ে আসে। ঠাকুরবাড়িতে লক্ষীকে বরণ করে নেওয়ার জন্য পূজার আয়োজন করা হয়। পূজার উপচার দুধ, কলা, ঘি, মধু, ইত্যাদি। চাষী গৃহিনী সাদা কাপড় পড়ে পূজার স্থানে হাটু গেড়ে বসে বাম হাতে কাস্তে নিয়ে উলুধ্বনি দিয়ে ধানের গোছাটির মাঝামাঝি কাটে। এরপর শিশক কলার পাতায় মুড়িয়ে আঁটি বেঁধে পাঁচটি সিঁদুরের ফোটা দিয়ে ধানের আগটিকে ফুলের মালায় জড়িয়ে বরণ কুলায় রাখে। বরণ কুলায় আরও থাকে এক ঝুকি বেজোড় খাঁটি মালভোগ কলা ও একজোড়া পান সুপারি। চাষী গৃহিনী শাড়ির আঁচলে ঘোমটা টেনে বাম কাঁখে বরণ কুলাটি ধরে দৃষ্টি সামনের দিকে রেখে পেছনের দিকে হেঁটে হেঁটে গোলাঘরের দিকে যায়। এই সময় একজন এক লোটা জল গোলাঘরের চালে ঢেলে দেয়। চাষী বউ তখন গোলাঘরের দিকে মুখ ফিরিয়ে ভেতরে ঢোকে এবং ধানের আগটি গোলাঘরের খুঁটিতে বেঁধে রাখে।

গরুচুমা বা গোবাং পূজা
কার্তিক মাসে কালিপূজার পরের দিন হিন্দু গৃহস্থঘরে গরুচুমা বা গোবাং পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এইদিন সকালবেলা বাড়ির পুরুষেরা গোয়ালঘরের সকল গরু-বাছুরকে পুকুরের জলে ¯œান করিয়ে ফুল ও যাত্রাশি পাতার মালা পরিয়ে দেয়। গরুর কপালে সিঁদুরের টিপ পরিয়ে দেওয়া হয় এবং শিং এ তেল মাখিয়ে দেওয়া হয়। সূর্য় ডোবার সময় গরুগুলিকে চালকুমড়ার ফালি, লবণ, হলুদ, রসুন, পিঁয়াজ, চিতিবাখর মাখিয়ে খাওয়ানো হয়। তবে গাভীন গরুকে খাওয়ানো হয়না। মহিলারা বরণকুলায় মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে উলুধ্বনি দিয়ে আরতির ভঙ্গীতে গরুগুলোকে বরণ করে নেয় এবং গরুর কপালে চুমু দিয়ে গোয়ালঘরে ঢোকায়।

বুড়াবুড়ি খেলা
কোথাও আষাঢ় মাসে প্রথম আউশ ধান কাটা এবং মাড়াইয়ের দিন আবার কোথাও আমন ধান কাটা ও মাড়াইয়ের শেষ দিনে লোকাচারটি পালিত হয়। এই লোকাচারটি পালনের জন্য দুইজন শিশুর প্রয়োজন হয়। একজন ছেলে এবং একজন মেয়ে। ছেলেটিকে সাজানো হয় বুড়া এবং মেয়েটিকে সাজানো হয় বুড়ি। দুইটি খড়ের জুড়া বা সোঁটা একটি লাঠির দুই মাথায় বেঁধে বুড়ার কাঁধে বহনের জন্য ধানের ভার সাজানো হয়। আরেকটি খড়ের জুড়া ধানের বোঝা হিসেবে বুড়ির মাথায় বহনের জন্য সাজানো হয়। উঠোনে ধানের স্তুপের মাথায় উপচার হিসেবে একটি শিলদূর্বা রাখা হয় এবং একটি মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। বুড়া আর বুড়ি ধানের স্তুপে প্রণাম করে। এরপর বুড়া লাঠির মাথায় খড়ের জুড়ার ভার বাঁকুয়াটি কাঁধে তুলে নেয় এবং বুড়ি তার খড়ের জুড়াটি ধানের বোঝার প্রতীক হিসেবে মাথায় তুলে নেয়। বুড়ার হাতে থাকে একটি হালুয়া পেন্টি। বুড়ি থাকে আগে এবং বুড়া থাকে পেছনে। ধানের স্তুপের চারপাশে বুড়া এবং বুড়িকে পাঁচ বা সাত পাক ঘুরতে হয়। ঘোরার সময় বুড়া হালুয়া পেন্টি দিয়ে বুড়ির পাছায় একটি করে ডাং দেয় আর বলে Ñ ‘বুড়ি কয় কৌটি?’ বুড়ি উত্তরে বলে Ñ ‘বুড়া বাহান্ন কৌটি।’ অর্থাৎ বাহান্ন কৌটি ধান। পাঁচ বা সাত পাক ঘোরার পর খড়ের সোঁটাগুলোকে আগে পুকুরে ফেলে দিয়ে আসতে পারে এই নিয়ে শুরু হয় বুড়া আর বুড়ির দৌড় প্রতিযোগিতা। বুড়ার শক্তি যেহেত বুড়ির চেয়ে বেশি তাই বুড়াই সাধারণত আগে ফেলে দিয়ে আসতে পারে। এবার বাড়ির গৃহিনী একটি কুলা নিয়ে ধানের স্তুপের সামনে হাটুগেড়ে বসে। এক কুলা ধান ভরে তার ওপর শিলদূর্বা আর মাটির প্রদীপটি বসিয়ে দিয়ে ধানের কুলাটি গোলাঘরে রেখে আসার সঙ্গে সঙ্গে লোকাচারটি সমাপ্ত হয়।

অন্যান্য লোকাচার ও প্রথা
ত্যারেয়া ফেলা: ফাল্গুনের তেরো তারিখে ‘ত্যারেয়া ফেলা’ নামক লোকাচারটি পালিত হয়। প্রতিবছর এই লোকাচারটি পালনের মাধ্যমে ঠাণ্ডা এবং জড়তাকে বিদায় জানানো হয়। সুপারি গাছের একটি শুকনো খোলে গোয়ালঘরের মাটি, গোবর, পুরোনো ঝাড়–র তিনটা অথবা পাঁচটা কাঠি, সঙ্গে খৈল অথবা সাবান এবং এক লোটা জল ও তুলসির পাতা নিয়ে বাড়ির কোন মহিলা বা মেয়ে তিন রাস্তার মোড়ে যায়। তিন রাস্তার মোড়ে সুপারি গাছের খোলটি রেখে জল ও তুলসির পাতা দিয়ে গতান বা নিবেদন করে ভক্তি দেয়। তারপর মাথায় খৈল বা সাবান মেখে লোটার জল নিজের মাথায় ঢেলে দিয়ে পেছন ফিরে এক দৌড়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা দেয় যাতে শীত অথবা জড়তা আর তার নাগাল ধরতে না পারে। দৌড়ানোর সময় আর পেছনের দিকে ফিরে তাকানো যাবেনা কিংবা রাস্তায় থামাও যাবেনা, তাহলে শীত ও জড়তা আবার তার সঙ্গে বাড়িতে ফিরে আসবে।

বট পাকুড়ের বিয়ে
নি:সন্তান দম্পতি সন্তানলাভের আশায় এবং রোগ-শোক, জরা-ব্যধিগ্রস্ত ব্যক্তি মুক্তিলাভের আশায় বট পাকুড়ের বিয়ে দেয়। বট (বটেশ্বরী) কনে এবং পাকুড় (অশ্বত্থ) বর। সাধারণত একই স্থানে বট ও পাকুড়গাছ থাকলে সেই জমির মালিক এবং সার্বজনীন স্থানে থাকলে গ্রামবাসী মিলে বট পাকুড়ের বিয়ে দেয়। ঘট, গছা, চাইলনবাতি সহ হিন্দুর বিবাহ উপচারে বিবাহকার্য সম্পন্ন হয়। পঞ্জিকায় দিনক্ষণ দেখে শুভদিনে বিয়ের আযোজন করা হয়। বট এবং পাকুড় গাছকে শাড়ি ও ধুতি পরানো হয়। বটগাছের ডালে সুতা দিয়ে শাখা বেঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। পুরোহিত মন্ত্রপাঠ করে সাতপাক ঘুরিয়ে, সিঁদুরদান ও মালাবদল করে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করেন। সাতপাক, সিঁদুরদান ও মালাবদলের কাজটি বট পাকুড়ের হয়ে অন্য কেউ করে। বিয়ের সময় দানসামগ্রী হিসেবে অতিথিরা যে টাকা-পয়সা দেয় তা বট পাকুড় গাছের গোড়ায় পুতে রাখা হয় নয়তো সার কিনে গাছের গোড়ায় দেওয়া হয়। বিয়ে সমাপনান্তে বরযাত্রীসহ অতিথিরা প্রীতিভোজ খেয়ে যে যার বাড়িতে ফিরে যায়।

আকাশবাতি
আশ্বিন মাসের শেষ দিন থেকে কার্তিক মাসের শেষ দিন পর্যন্ত পুরো এক মাস বাড়ির আঙ্গিনা (ঠাকুর বাড়ির তুলশিতলা) থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় উর্ধ্বাকাশে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে আকাশবাতি দেওয়া হয়। বাঁশের কাঠি বা ছাতার কাঠি দিয়ে একটি খাঁচা তৈরি করে তার ওপর রঙ্গিন কাগজের ছাউনি দিয়ে একটি তেল সলতের মাটির প্রদীপ খাঁচাটির ভেতরে বসিয়ে দেওয়া হয়। খাঁচাটিকে রশি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ঠাকুরবাড়ির আঙ্গিনায় পুতে রাখা লম্বা বাঁশের আগায় কপিকলের সাহায্যে ওঠানামা করা হয়। স্বর্গবাসী পূর্বপুরুষগণের উদ্দেশ্যে আকাশবাতি দেওয়া এই অঞ্চলের হিন্দু সম্প্রদায়ের এটি একটি পুরোনো লোকাচার।

ভেড়ারঘর পুড়া
ভেড়ারঘর পুড়া নামক লোকাচারটি পালিত হয় দোলপূর্ণিমার আগের দিন ফাল্গুনী শুক্লা চতুর্দশীর রাতে। এই দিন গাঁয়ের কিশোর ও যুবক ছেলেরা দল বেঁধে দোলাবাড়িতে বনভোজনের আয়োজন করে। তারা বয়স অনুযায়ী বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে দোলাবাড়ির নির্জন রাতকে সেদিন মুখরিত করে তোলে। বনভোজন এবং ভেড়ারঘর পুড়া উপলক্ষ্যে তারা আগে থেকেই শুকনো গাছের ডাল, বাঁশ ও খড় সংগ্রহ করে রাখে এবং দোলাবাড়িতে একটি ছোট চালাঘর তৈরি করে। এই উৎসব পালনের সময় কিছু আদিরসাত্মক ছড়া ও গানের প্রচলন আছে। তারা দোলবাড়িতে রান্নাবান্না করতে করতেই ছড়া ও গানগুলি জোরে জোরে বলতে থাকে। একজন এক লাইন বললে বাকিরা দোয়ারী হিসাবে পরের লাইনটা বলে। রান্নাবান্না ও খাওয়াদাওয়া শেষে তারা রান্নার অবশিষ্ট খড়ি, বাঁশ ও খড় চালাঘরের ওপরে রেখে আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুণ্ডের চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে তারা আরও জোরে জোরে এই আদিরসাত্মক ছড়া ও গানগুলি উচ্চারণ করতে থাকে।
প্রচলিত মিথকথায় আছে যে, হিরণ্যকশিপুর বোন হোলিকা একজন রাক্ষসী। হিরণ্যকশিপু যখন তাঁর ছেলে বিষ্ণুভক্ত প্রহলাদকে নানাভাবে চেষ্টা করেও হত্যা করতে পারলেন না তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন হোলিকার কোলে প্রহলাদকে বসিয়ে আগুনে পুড়িয়ে মারার। হোলিকা ভগবানের বর পেয়েছিলো সে আগুনে কোনদিন দগ্ধ হবেনা। সেই অনুযায়ী দেবতারা হোলিকাকে অগ্নিকু-ের সিংহাসনে বসালেন এবং তার কোলে শিশুপুত্র প্রহলাদকে। হোলিকার গায়ে জড়ানো ছিলো অগ্নিনিরোধক শাল কিন্তু সেই শাল উড়ে গিয়ে ঢেকে ফেললো প্রহলাদকে। অগ্নিনিরোধক শাল গায়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হোলিকার ওপর দেওয়া ভগবানের বর নষ্ট হয়ে যায়। অগ্নিদগ্ধ হলো হোলিকা। ভক্ত প্রহলাদ অক্ষত রয়ে গেলেন। সেই প্রথা অনুযায়ী ‘ভেড়ারঘর পুড়া’ নামক এই লোকাচারটি প্রতিবছর পালিত হয় পঞ্চগড় জেলার লোকায়ত গ্রামাঞ্চলে। হোলিকা থেকেই ‘হোলি’ নামের উৎপত্তি। ভেড়ারঘর পুড়ার আদিরসাত্মক ছড়া ও গানগুলো নিচে প্রদত্ত হলো—

১. হোর হোর হুলিরে
…ং ধরি ঝুলিরে।

২. হোর হোর নয়া চানরে
সিদল বেচির …ংরে।

৩. টাখি মাছটা ভুলকাইছে
কইনাবেটির …ংখান চুলকাইছে।

৪. …ং ডোং ডোং টিংগালি মোটা
বামনেঘরের ভাঙ্গা নটা
উঠ্গে শালি নম্ফ জ্বলা
চু… …ংখান ধুইয়া ফেলা।

৫. খড়ি কাটো মুঠি মুঠি
…ংগত্ ধইচ্চে নাল নুটি।

৬. চুয়াত পইচ্ছে টুকুনি
…ংগত্ ধইচ্চে উখুনি।

৭. উত্তর ঘরত্ নাউয়ের কুশি
মাইয়াক চুদে আপন খুশি।

৮. হাং ডে হাং
বুড়ায় চুদে বুড়ির …ং
…ং দেখিয়া হইলাম খুশি
এক টাকাদি তিনবার চু…।

৯. চ্যাটে …ং এ কয় কাথা
টিংগালি টকটকায় মাথা
…ং কছে বুঝিছু মুই
নিশ্চই চু… তুই।

১০. আজা …ং এর ভাজারে ভাই
ডিমালি …ং এর ঝোল
…ংগত্ ঢালিয়া দিছে
নাফা শাগের ঝোল।

১১. আলু থুইচু চাংগত্
আলু বুলিয়া হাত বাড়ানু
সলেয়া সন্দাইল্ …ংগত্।

১২. একেনা বুড়ি ভাত চড়াইছে
সিন্জার অঘুন (আগুন) দিয়া
ওইকেনা বুড়ির …ং পোড়া গেল্
ফুরুংগির অঘুন দিয়া।

শ্বশুর কান্দে শাশুড়ি কান্দে
আরও কান্দে নাঙ
কেমন করি পুড়িলো তুই
অত সুন্দর …ং !

উত্তর থাকি আসিল্ বুড়া
কাংগে নিয়া ইশ (ইশ–লাঙ্গল টানার বাঁশ বা কাষ্ঠ দ-)
ওইকেনা বুড়া ঝাড়িবার পারে
পোড়া …ং এর বিষ।
(‘…ং’ এর স্থলে স্ত্রী যৌনাঙ্গের উল্লেখ ছিলো)।

লোকদেবতা
আদিম মানুষ বিরুপ প্রকৃতির কাছে ছিলো অসহায়। ঝড়, জলোচ্ছাস, ভূমিকম্প, বন্যা, বজ্রপাতসহ প্রকৃতির নানা বৈচিত্র্যের রহস্য ও কার্যকারণ সম্পর্ক ভেদে অসমর্থ, স্বভাবত ভীরু, বিস্ময় বিমুঢ় মানুষ জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে অলৌকিক শক্তির কাছে মাথা নত করেছে। বিপদ আপদের হাত থেকে রক্ষা পেতে বিভিন্ন লৌকিক দেব-দেবীর কল্পনা করেছে। শাস্ত্রীয় দেব-দেবীর বাইরে এইসব লৌকিক দেব-দেবীর পূজা মানুষ আজও করে। শাস্ত্রীয় দেব-দেবীর তুলনায় লৌকিক দেব-দেবীর নাম, আকৃতি-প্রকৃতি ও পূজাপদ্ধতিতে বৈচিত্র্যও বেশী। লোকদেবতাদের সাধারণত কোন মূর্তি থাকেনা। পারলৌকিক নয়, মানুষ ইহজাগতিক সুখ ও সমৃদ্ধি কামনায় এইসব লোকদেবতার পূজা করে থাকে। এখানে পঞ্চগড় জেলার কয়েকটি লোকদেবতার উল্লেখ করা হলো Ñ

মাহাবারিক ঠাকুর
মাহাবারিক ঠাকুর হচ্ছে বাসগৃহের অধিপতি দেবতা বাস্তুদেব। গৃহারম্ভ, নতুন গৃহপ্রবেশ প্রভৃতি অনুষ্ঠানে এই লোকদেবতার পূজা দেওয়া হয়। পুষুনা বা পৌষসংক্রান্তিতে রাত্রে ঘরের চালে পাটখড়িতে পিঠা গেঁথে মাহাবারিক ঠাকুরকে দেওয়া হয়। নয়া খৈ বা নবান্নের রাত্রে কলার ঢনায় (কলাগাছের খোলে) নতুন ধানের ভাত, মাসকলাইয়ের ডাল ও পোড়া মাছ জল ও তুলসির পাতা দিয়ে নিবেদন করে ঘরের চালে মাহাবারিক ঠাকুরকে দেওয়া হয়।

গারাম ঠাকুর
গারাম (গ্রাম) ঠাকুর গ্রামের অধিপতি লোকদেবতা। গ্রামকে সকল বিপদ-আপদের হাত থেকে রক্ষা করাই তাঁর প্রধান কাজ। গ্রামের ঠাকুর বলে এ ঠাকুরের থান হয় সাধারণত বাড়ির বাইরে। গাঁয়ের লোকের বাড়িতে কোন ক্রিয়াকর্ম বা অনুষ্ঠানে আগেই গারাম ঠাকুরের পূজা দিতে হয়। কারো গরুর বাছুর হলে সেই গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রী একমাস সেই গরুর দুধ খাননা। নতুন বাছুর হওয়া গরুর দুধ দিয়ে দই পাতিয়ে গারাম ঠাকুরের গ্রাম মাঙ্গলিক থানে দই চিড়া দিয়ে পূজা দেন এবং গাঁয়ের লোকজনদের খাইয়ে তারপর তারা নিজেরা খান। কারো গরুর বাছুর হারিয়ে গেলেও গারাম ঠাকুরকে মানত করে এবং বাছুর পাওয়া গেলে দই চিড়া দিয়ে পূজা দেয়। কারো বিয়ে-শাদী হলে মহিলারা বর ও কনেকে গারাম ঠাকুরের থানে নিয়ে যায় এবং ভক্তি করায়। এই সময় মহিলারা গান ধরে Ñ
গারাম ঠাকুরের দুয়ারত্ কিসের বাইজন বাজে
ফেন্নাটা যে আজেলা এ্যালানি গারাম পূজে।

ধরম ঠাকুর
ধরম ঠাকুর বা ধর্ম ঠাকুর পঞ্চগড় জেলার রাজবংশী হিন্দু সম্প্রদায়ের অতি প্রাচীন লোকদেবতা। ধরম ঠাকুরের পূজা অনুষ্ঠিত হয় বৈশাখ মাসে। বৈশাখ মাসে হয় বলে এ মাসকে ধর্ম মাস বলা হয়। ধরম ঠাকুরের কাছে মানুষ পুত্র, কন্যা ও সংসারের মঙ্গল কামনা করে। এই লোকদেবতার পূজা করে মহিলারা। যে পূজা করবে তাকে সারাদিন উপবাস থাকতে হয়। বৈশাখ মাসের শেষ বিকেলে কুলায় এক ছড়ি আঠিয়া কলা, দুইটা হাঁসের ডিম, একজোড়া কবুতর, দুইটা ধুপ, এক জোড়া পান সুপারি এবং পাঁচটা প্রদীপ জ্বালিয়ে বাড়ির বাইরে খোলা জায়গায় পূজা করা হয়। কুলার মাথায় পাচঁটা সিঁদুরের ফোটা দিতে হয়। হাঁসের ডিম, কলা, পান সুপারি এবং কবুতরের মাথায়ও সিঁদুরের ফোটা দিতে হয়। মাথার চুল ছেড়ে দিয়ে উলুধ্বনি দিয়ে সূর্যের দিকে কুলাখানি তিনবার আরতির ভঙ্গিতে ঘোরাতে হয়। এই সময় ছেলে-মেয়েরা ডিম, কলা ও কবুতর নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করে। যে যেটা কেড়ে নিতে পারবে সেটা তারই। ধরম ঠাকুরের নামে অনেক সময় পাঠাও ছেড়ে দেওয়া হয়।

বুড়াধেল্লা ঠাকুর
ছোট বাচ্চার একটানা কয়েকদিন কাশি হলে অভিাবকরা বুড়াধেল্লা ঠাকুরকে শিরনি মানত করে। বুড়াধেল্লা ঠাকুর কাশের লোকদেবতা। একটি পুরোনো বাঁশের মাথায় জীর্ন ও ভাঙ্গা ঢাকি, কুলা, ভোরঙ, খোলই, বারুন ইত্যাদি রশি দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে রেখে বাঁশটি তিন রাস্তার মোড়ে খাড়া করে পুতে বুড়াধেল্লা ঠাকুরের থান স্থাপন করা হয়। বুড়াধেল্লা ঠাকুর কানে কম শোনেন, তাই মানত করার সময় খাড়া করা বাঁশটি ধরে ঝাকুনি দিয়ে জোরে জোরে বলতে হয় Ñ ‘বুড়াধেল্লা ঠাকুর, হামার ছাওয়ার খুব কাশ, যুদি কাশ পালায় তোক তিনকড়া শিন্নি দিম।’ তারপর কাশি ছেড়ে গেলে অভিভাবকরা বুড়াধেল্লা ঠাকুরকে কলার পাতায় চিনি অথবা বাতাসার শিরনি দেয়। শিরনি দেওয়ার সময় বুড়াধেল্লা ঠাকুরকে তিনবার সালাম করতে হয়। সালাম করার পর খাড়া করা বাঁশটি ধরে ঝাকুনি দিয়ে জোরে জোরে বলতে হয় Ñ ‘বুড়াধেল্লা ঠাকুর, হামার ছাওয়ার কাশ পালাইছে, তোক তিনকড়া শিন্নি দিনু।’

পাগলাপীর
ফাল্গুনের তেরো তারিখে রাখাল পূজা উপলক্ষ্যে ছোট ছেলেরা পাগলাপীরের নামে বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা মাগন করে বেড়ায়। পাটের আঁশ টুকরো করে কেটে তাতে রঙ লাগিয়ে মান্দার গাছের ফুল দিয়ে একটি লম্বা রশিতে তারা মালা গাথে। তারপর একটি চিকন লম্বা কাঁচা বাঁশের লাঠিতে মালাখানি পেচিয়ে তারা সেই লাঠিটিকে পাগলাপীর সাজায়। পাগলাপীরের লাঠিটি খাড়া করে ধরে গৃহস্থের বাড়ির দুয়ারে গিয়ে তারা জোরে জোরে সুর করে বলে Ñ‘পাগলাপীরের নিমস্তে ভুল্লাল্লা।‘ ঐ বাড়িতে সমবয়েসী কোন ছেলে থাকলে তাদের সুরে সুর মিলিয়ে সেও বলে ওঠে -‘তোর কটিত্ সন্দাইছে ডাংবল্লা।’ পাগলাপীরের দল এই কথা শুনে তার সুরে সুর মিলিয়ে আবার বলে ওঠেÑ‘ডাংবল্লার বড়য় বিষ/ মোর চ্যা …টা ঘাড়ত্ নিস।’ বিকেল বেলা পাড়ার সব পাগলাপীরের দল এক জায়গায় জড়ো হয়ে পাগলাপীরের লাঠিগুলো লাইন দিয়ে একসঙ্গে খাড়া করে পুতে দেয়। তারপর পাগলাপীরের নামে দুধ, কলা ও চিনি শিরনি দিয়ে সবাই পাগলাপীরকে সালাম করে। শিরনি দেওয়ার পর অবশিষ্ট চাল ও টাকা দিয়ে তারা বনভোজন করে।

লোকউৎসবঃ বিষুয়া
বর্ষচক্র চৈত্রসংক্রান্তির দিন পঞ্চগড় জেলার রাজবংশী হিন্দু সম্প্্রদায় প্রতিবছর বিষুয়া উৎসব পালন করে। বিষুয়া এই অঞ্চলের একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী লোকজ উৎসব। নানা লোকাচারের মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের মানুষ বিষুয়া উৎসবের দিনটি পালন করে। এই দিনে সকালে সবাই খালি পেটে নিম পাতা, বাসক পাতা, আনারসের কচি পাতা, পটল পাতা, বিষ্টি ফল ইত্যাদি খায়। উদ্ভিদের অনেক ভেষজ গুণ আছে, এগুলো প্রাচীন ভেষজ চিকিৎসা পদ্ধতিরই একটি সংস্কার মাত্র। এই দিন রাজবংশী হিন্দু রমনীরা ঘরের মেঝে, বাড়ির উঠোন, বাড়ির খুলি ও আশপাশ এলাকা ঝকঝকে পরিস্কার করে গোবর জল ছিটিয়ে পরিশুদ্ধ করে। গোবরে প্রাকৃতিক এন্টিসেপটিক গুণ আছে। ঘর থেকে উড়ন-গাইন, পিঁড়ি, খড়ম, ঢাকি, কুলা, দন সবকিছু বের করে জলে ধুইয়ে ঢাকি, কুলা, দনে নতুন করে গোবর লেপন করে। রাজবংশী চাষী পুরুষরা লাঙ্গল, জোয়াল, মই, হালুয়া পেন্টি পুকুরের জলে ¯œান করায়। খানিক পরে বাড়ির রমনীরা খড়ম, পিড়ি, উড়ন, গাইন থেকে শুরু করে লাঙ্গল, জোয়াল, মই, হালুয়া পেন্টি, ঢাকি, কুলা, দন সবকিছুতে সিঁদুর ও খড়িমাটির ফোটা দেয়। বাড়ির কর্তা গোয়াল ঘরের মেঝে, বাড়ির উঠোন, খুলি, গাছের গোড়া ও বাঁশের গোড়ায় কোদাল দিয়ে বিষুয়ার বিষমাটি দেয়। এই দিন পাড়ার কিশোর, যুবক ও মধ্যবয়সী লোকেরা বিষুয়ার বিষলাঠি নিয়ে দল বেঁধে শিকারে বের হয়। বনমোরগ, ঘুঘু, খরগোশ যা পায় তাই শিকার করে নিয়ে আসে। বিষুয়ার এই শিকার ভাবনার সঙ্গে আদিম মানুষের জীবনযাত্রার একটা চিত্র খুঁজে পাওয়া যায়।
বিষুয়ার দিন দুপুরবেলা ভাত খাওয়া আগে সবাই ‘চাউল কালাই’ (পঞ্চশস্য) খায়। যেমন Ñ চাল ভাজা, গম ভাজা, চিড়া ভাজা, ডাল ভাজা, সরিষা ভাজা ইত্যাদি। ভাতের সঙ্গে সবাই ‘সাতশাগি’ খায়। সাতশাগি হচ্ছে সাত প্রকার শাক। যেমন Ñ পাটশাক, কলমিশাক, ঢেকিশাক, বথুয়াশাক, খুঁড়িয়াশাক ইত্যাদি।
বিষুয়ার দিন পঞ্চগড়ের রাজবংশী হিন্দু সম্প্রদায় তাদের প্রতিটি ঘর এবং ঠাকুরঘরের চালে জোড়ায় জোড়ায় রসুন ও পিঁয়াজ রশি দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখে। এছাড়াও তারা বিষ্টি গাছের ডাল, পানিমুথারি গাছের ডাল, গঞ্জিকার ডাল, বাসকপাতার ডাল ইত্যাদি টুকরো টুকরো করে কেটে ঘরের চালে গুঁজে রাখে। লোকবিশ্বাস, এতে ভূত, প্রেত ও অপদেবতা বাড়িতে ঢুকতে পারবেনা। বিষুয়ার দিন বিকেল বেলা এই অঞ্চলে চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষ্যে চড়কের মেলা বসে।

লোকপুরাণ: সিং এর বিয়াও
লোককথায় প্রচলিত আছেÑ ‘সনের বারো ভাদরের তেরো’। অর্থাৎ শ্রাবণের বারো দিন থাকতে সিং যায় বিয়ে করতে পূর্ব থেকে পশ্চিমে এবং বিয়ে করে ফিরে আসে ভাদ্র মাসের তেরো তারিখে। সিং এর বিয়েতে বরযাত্রী যায় যায় তার জারজ ছেলে। এই সময় দোলাতে কাশিয়ার ফুল ফোটে। সিং এর জারজ ছেলে রাস্তায় পায়খানা করলে সিং কাশফুল দিয়ে তার টিকা (পাছা) মুছে দেয়। সিং এর বিয়েতে ঢাটকাউয়া, ত্যালসারো, ঢাডোসারো ও আরো অন্যান্ন পাখি সাঙ্গিভার ও দানের জিনিস বহন করার জন্য সঙ্গে যায়। এসময় এইসব পাখির মাথা নিমুন্ডুরিয়া (ন্যাড়া) হয়। সিং বিয়ে করে ফিরে আসার আগেই পঞ্চগড় জেলার রাজবংশী মহিলারা ঘরের সব কাপড়-চোপড় বের করে ধোয়া-পাখলা করে। না হলে সিং এর জারজ সন্তান কাপড়-চোপড়ে পায়খানা করবে এবং সেই দাগ আর উঠবে না। চাষীরা সিং ঘুরে আসার আগেই জমিতে হালচাষ ও হেউতি (আমন) ধানের চারা রোপণ করে। সিং ঘুরে আসার পর আর ধানের চারা রোপণ করা যাবে না। সিং এর গর্জনে তখন ঠা-া নামবে। পঞ্চগড় জেলার রাজবংশী কৃষিজীবী মানুষের মুখে এই লোকপুরাণ (গুঃয) এখনও চালু আছে।

লোকপোশাক
ফতা
ফতা শব্দটি বোডো ভাষা ‘ফাথং’ থেকে এসেছে। জায়গা বিশেষে ফতাকে কেউ কেউ পাটানি বা বুকুনিও বলে। বিবাহিতা ভাটি বয়সের মহিলারা বুক থেকে হাটুর নিচ পর্যন্ত ফতা পরিধান করে। ফতা সাধারণত লম্বায় চার হাত এবং চওড়ায় আড়াই হাত হয়। ফতার চল এখন আর আগের মতো নেই। ফতার নানা রকম নাম আছে। যেমন- ডোরাডুরি, বুকঢালা, সাদা, ঘুগুপাড়ি, সৈষ্যাফুলি ইত্যাদি। সাদা ফতা পরে বয়স্কা বিধবা রমনীরা। পঞ্চগড় জেলার বিয়ের গীতে ফতার উল্লেখ পাওয়া যায়—

ওকি ও মরি রে…
শারালির গছত্ ফতা অহিল্ নাগিয়া
দেরে ফেন্না ফতাটা ভাই পাড়েয়া
ফেন্নি আছে জোড়হাত করিয়া।

ফেন্নির আছে উচ্চা খোঁপা
কায় নাড়িবে মাই তোর বাসিয়া ফতা
দেরে ফেন্না ফতাটা ভাই পাড়েয়া
ফেন্নি আছে জোড়হাত করিয়া।

নাই চোটি নাই ধকরা
মাঝিয়াতে মাল্লেক মজা।

গোজি
বিয়ে না হওয়া যুবতী ও ভরযুবতী মেয়েদের পরনের কাপড় ছিলো গোজি। গোজি তৈরি হতো মোটা সুতা দিয়ে। এখন গোজির চল একেবারেই নেই। গোজি পড়তো ফতার মতোই বুক থেকে হাটুর নিচ পর্যন্ত। এক বাড়ির মেয়ের একটি দামি গোজি দিয়েই আশপাশের অনেক বাড়ির মেয়ের বিয়ে হতো। গোজির ওপরে মেয়েরা লম্বা হাতাওয়ালা একধরণের নেটিগেঞ্জি পড়তো।

মাঠা
মাঠা একধরণের সাদা মার্কিন কাপড়। মাড় দেওয়া থাকে বলেই হয়তো নাম হয়েছে মাঠা। পঞ্চগড় জেলার পলিয়া ও কোচ রাজবংশী হিন্দু বয়স্ক লোকেরা কোমর থেকে হাটু পর্যন্ত ধুতির মতো করে মাঠা পড়ে।

বীজনেংটি ও খাড়া নেংটি
পঞ্চগড় জেলার পলিয়া ও কোচ রাজবংশী নৃ-গোষ্ঠীর প্রাচীন ঐতিহ্য বীজনেংটি। বীজনেংটি হলো পুরোনো একফালি কাপড় যা লম্বায় দেড়হাতের বেশি হবেনা। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের বয়স্ক হিন্দু লোকেরা দুই নিতম্ব অনাবৃত রেখে কোমরের ডুরির সঙ্গে এই এক ফালি কাপড় সামনে এবং পেছনে গুঁজে দিয়ে কোনরকমে লজ্জা নিবারণ করে। এই অঞ্চলে আরেক ধরণের নেংটির ব্যাবহার সচরাচর লক্ষ্য করা যায়। কেউ গাছে ওঠার সময়, পানিতে কাজ করতে নামার সময় কিংবা অন্য কোন ভারি কাজ করার সময় পরনের লুঙ্গি বা গামছা ভিড়িয়ে পেছনে শক্ত করে গুঁজে দিয়ে সাময়িক যে নেংটি পড়ে তাকে খাড়ানেংটি বলে।

লোকখাদ্য
ছ্যাকা
পঞ্চগড়সহ প্রান্ত উত্তরবঙ্গের সর্বত্রই ছ্যাকা খুব জনপ্রিয় লোকখাদ্য। এই অঞ্চলে লোকখাদ্য হিসেবে বিভিন্ন প্রকার ছ্যাকার প্রচলন আছে। যেমন Ñ কচুর পাতার ছ্যাকা, মানকচুর ডাটার ছ্যাকা, কচুর মুড়ার ছ্যাকা, মাসকলাইয়ের ডালের ছ্যাকা, আলু, বেগুন, মুলা, পাতাকপি, শিম, লাউ প্রভৃতি সবজির একত্রে রান্না করা ছ্যাকা। ছ্যাকা একটি বিশেষ জলীয় পদার্থের নাম। তরকারিতে যখন এই বিশেষ জলীয় পদার্থ মিশিয়ে রান্না করা হয় তখন তাকে পঞ্চগড়ের আঞ্চলিক ভাষায় বলে ‘ছ্যাকা শাগ’। একটি কলাগাছের শক্ত গুড়িকে কেটে টুকরো টুকরো করে রৌদ্রে শুকিয়ে সেগুলোকে আগুনে পোড়ানো হয় যতক্ষণ না ছাইয়ে পরিণত হয়। এই ছাইগুলোকে পঞ্চগড়ের আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয় ‘কোলমুড়ার ধূলা’। রান্নার আগে একটি ছোট ফুটো করা মৃৎপাত্র নেওয়া হয়। এক টুকরো পাটের আঁশ বা কাপড়ের টুকরো পাকিয়ে গুঁজে দিয়ে ফুটোটিকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিছু ‘কোলমুড়ার ধূলা’ মৃৎপাত্রে রেখে তাতে জল ঢেলে দিয়ে মৃৎপাত্রটিকে একটি মালসার ওপর স্থাপন করা হয়। মৃৎপাত্রের কাপড়ের গুঁজির মধ্য দিয়ে পরিশ্রুত জলীয় পদার্থ ফোটা ফোটা করে পড়ে মালসায় জমা হয়। মালসায় জমা হওয়া এই জলীয় পদার্থকেই বলা হয় ছ্যাকা। পঞ্চগড় জেলায় ভাদ্র মাসে মানকচুর ছ্যাকা খাওয়ার রীতি অনেক পুরোনো কালের।

সিদল
পঞ্চগড়সহ উত্তরবঙ্গের অধিকাংশ মানুষের অত্যন্ত প্রিয় খাদ্যদ্রব্য সিদল। রৌদ্রে শুকানো গুড়ো মাছের শুটকি উড়ন ও গাইনে গুড়ো করে একটি পাত্রে নামিয়ে রাখতে হয়। কিছু কালোকচু বা মানকচুর ডাটার তাজা টুকরো ও রসুনের কোয়া উড়ন গাইনে ভালোভাবে পিছিয়ে নিতে হয়। এরপর শুটকির গুড়োগুলো উড়নে ঢেলে দিয়ে কাঠের বা বাঁশের হাতা দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে ঘন পেস্টির মতো করতে হয়। এরপর এগুলোকে একটি পাত্রে নামিয়ে ‘ছ্যাকা’ মিশিয়ে ছোট ছোট গুলি করে রৌদ্রে শুকাতে হয়। শুকানো হয়ে গেলে মাটির ভাড়ে ছাই দিয়ে সারা বছরের খাবারের জন্য সংরক্ষণ করে রাখা হয়। সিদল রান্না বা ভর্তা করার আগে আগুনে পুড়িয়ে বদগন্ধমুক্ত করতে হয়। বর্তমানে ছোটমাছের অভাবে সিদল খুবই দুর্লভ খাদ্যবস্তু।

পেলকা
পেলকা উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যদ্রব্য। লাফাশাক, বথুয়াশাক, শবশাক অথবা কচুর পাতা ও সজনে পাতা অথবা চিকন পুঁইশাক মিহি করে কেটে ‘ছ্যাকা’ বা খাবার সোডা মিশিয়ে লবণ, কাঁচামরিচ, আদা ও রসুন দিয়ে পেলকা রান্না করা হয়। পেলকার সঙ্গে যদি হয় শুটকি বা গুড়া মাছের ভাজি তাহলেতো কোন কথাই নেই। পিচ্ছিল জাতীয় তরকারি বলে পেলকা শিশু ও বৃদ্ধদের কাছে খুবই লোভনীয় ব্যঞ্জন। মুখে ভাত তোলার সঙ্গে সঙ্গেই গলার নিচে নেমে য়ায়।

শুকাতি
কচি পাটশাক শুকিয়ে রান্নার জন্য সংরক্ষণ করে রাখা হয়। ‘ছ্যাকা’ বা খাওয়ার সোডা মিশিয়ে লবণ, কাঁচামরিচ ও রসুন দিয়ে শুকাতি রান্না করা হয়। পাটশাক শুকিয়ে রান্না করা হয় বলে এর নাম শুকাতি।

ফোকতোই
কচুর পাতার সঙ্গে লবণ, কাঁচামরিচ, আদা, রসুন, চিড়া বা আতপচালের গুড়া এবং ‘কোলমুড়ার ধূলার ছ্যাকা’ দিয়ে ফোকতোই রান্না করা হয়। কচুর পাতা ছাড়াও কায়তা বা অন্য কোন সবজি দিয়েও ফোকতোই রান্না করা যায়। ফোকতোই খুবই উপাদেয় খাদ্যবস্তু।

জলত্যালানি
কড়াইয়ে সরিষার তেলে রসুন, পিঁয়াজ, কাঁচামরিচ ভেজে জলে গুলমরিচের গুড়া গুলিয়ে কড়াইতে সেঁচকি দিয়ে জলত্যালানি রান্না করা হয়। জলত্যালানি পোয়াতিরা খায়। জলত্যালানি খেলে পোয়াতির নাড়ি শক্ত হয়।

খাটাশাক
খাটা শব্দের অর্থ টক। পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুর জেলায় পাটশাকের খাটা, লাফাশাকের খাটা, কলমিশাকের খাটা খুবই জনপ্রিয় লোকখাদ্য। পাটশাক, লাফাশাক অথবা কলমিশাকে কাঁচা আম, বড়ই অথবা জলপাই দিয়ে ঝোল করে খাটাশাক রান্না করতে হয়।

নাতারি পিতারি শাক
নাতারি পিতারি অর্থ লতা পাতা জাতীয় শাক। বিভিন্ন প্রকার শাক একসঙ্গে ঝোল রান্না করলে তাকে নাতারি পিতারি শাক বলা হয়।

লোক নাম
পঞ্চগড় জেলার রাজবংশী জনগোষ্ঠী জাতকের নামকরণ করে দিন, মাস, বছর, ক্ষণ, তিথি, পার্বণ, জাতকের গায়ের রঙ, গায়ের গড়ন, স্বভাব চরিত্র ইত্যাদির সঙ্গে মিল রেখে। যেমন Ñ শুক্রবার জন্ম হলে জাতকের নাম রাখা হয় শুকুরু, শনিবারে শনিধর, দেওবার (রবিবার) জন্ম হলে পুত্রসন্তানের নাম রাখা হয় দেবারু, কন্যাসন্তানের নাম রাখা হয় দেবারি, সোমবারে জন্ম হলে পুত্রসন্তানের নাম রাখা হয় সমারু এবং কন্যাসন্তানের নাম রাখা হয় সমারি, মঙ্গলবারে জন্ম হলে পুত্রসন্তানের নাম রাখা হয় মঙ্গলু বা মঙ্গলা এবং কন্যাসন্তানের নাম রাখা হয় মঙ্গলি, বুধবারে জন্ম হলে পুত্রসন্তানের নাম রাখা হয় বুধারু, কন্যাসন্তানের নাম রাখা হয় বুধে, বিষ্যুদবার জন্ম হলে জাতকের নাম রাখা হয় বিষু, বিষাদু বা বিষারু, মাসের ক্ষেত্রে বৈশাখ মাসে জন্মগ্রহণ করলে জাতকের নাম রাখা হয় বৈশাগু, আষাঢ় মাসে আষারু, ভাদ্র মাসে ভাদু, কন্যাসন্তান হলে ভাদরি, আশ্বিন মাসে অশ্বিনী, পৌষ মাসে পুষুনাথ, ফাল্গুন মাসে ফাগুমন, চৈত্ বা চৈত্র মাসে জন্মগ্রহণ করলে জাতকের নামকরণ হয় চৈতু বা চৈতা এবং মাসের শেষ দিন অর্থাৎ দোমাসির দিন জন্ম হলে জাতকের নাম রাখা হয় দোমাসু। পৈসাঞ্জ বা সাঁঝের বেলা জন্ম হলে পুত্রসন্তানের নাম রাখা হয় পৈসাঞ্জু এবং কন্যাসন্তানের নাম রাখা হয় পৈসাঞ্জি, পোহাতি সময়ে জন্মগ্রহণ করলে জাতকের নাম রাখা হয় পোহাতু, অন্ধকারঘটি বা কৃষ্ণপক্ষের রাতে জন্মগ্রহণ করলে জাতকের নাম রাখা হয় আন্ধারু, জোনাক বা শুক্লপক্ষের রাতে জন্মগ্রহণ করলে পুত্রসন্তানের নাম রাখা হয় জোনাকু এবং কন্যাসন্তানের নাম রাখা হয় জোনাকি, আকাল বা দুর্ভিক্ষের সময় জন্ম হলে পুত্রসন্তানের নাম রাখা হয় আকালু এবং কন্যাসন্তানের নাম রাখা হয় আকালি, ঝড়ের সময় জন্মগ্রহণ করলে জাতকের নামকরণ হয় ঝরু, ভইশাল যাওয়ার সময় (ভূমিকম্পের সময়) জন্মগ্রহণ করলে ভইশালু, আমাতির সময় (অম্বুবাচির সময়) জন্ম হলে আমাতু, পিঠাখোয়া বা পৌষপার্বণের সময় জন্মগ্রহণ করলে নাম রাখা হয় পিঠালু, বর্ষাকালে জন্ম হলে বাইষ্যালু, খরার সময় জন্মগ্রহণ করলে খরু, বিয়ের অনেকদিন পর সন্তান জন্মগ্রহণ করলে পুত্রসন্তানের নাম রাখা হয় নমলা এবং কন্যাসন্তানের নাম রাখা হয় নমলি, যে ছেলের গায়ের রঙ ফর্সা তার নাম রাখা হয় ধলু বা ধলা এবং মেয়ের ক্ষেত্রে নাম রাখা হয় ধৌলি, গায়ের রঙ কালো হলে পুত্রসন্তানের নাম রাখা হয় কালা, কালাটু, কাল্ঠু বা কালাচন এবং কন্যাসন্তানের নাম রাখা হয় কাল্ঠি, ছোটবেলায় প্লীহার জন্য যার পেট মোটা হয়েছে তার নাম রাখা হয় টেপু বা টেপাসু, স্বাস্থ্য ভালো ও পেট মোটা হলে পুত্রসন্তানের নাম রাখা হয় ঢেপড়া এবং কন্যাসন্তানের নাম রাখা হয় ঢেপড়ি, শরীর শুকিয়ে গেলে জাতকের নাম রাখা হয় শুকাতু, শরীর নরম ও তুলতুলে হলে নেত্পেতু, দেখতে খাটো হলে জাতকের নাম রাখা হয় বাংগুরু, কন্যাসন্তান চালাক চতুর হলে নাম রাখা হয় চালকি, যে ছেলে হাতাশ বা ভয় খায় তার নাম রাখা হয় হাতাসু, ভাইয়ের নামের সঙ্গে নাম মিলিয়ে অন্য ছেলের নাম রাখা হয় বাতাসু, যে ছেলে কাচাল বা ঝগড়া করে তার নাম রাখা হয় কাইচালু, ছোঠবেলায় ঘন ঘন আমাশয় বা পাতলা পায়খানা করলে জাতকের নাম রাখা হয় চেরকেটু, যে ছেলে দুষ্ট প্রকৃতির হয় তার নাম রাখা হয় নটখটু, যে ছেলে ধড়ফড় করে তার নাম রাখা হয় ধরফরু, ছোটবেলায় বেশি কান্নাকাটি করলে পুত্রসন্তানের নাম রাখা হয় কান্দুরা এবং কন্যাসন্তানের নাম রাখা হয় কান্দুরি, ছোটবেলায় যে ছেলে বেশি ঘুমায় তার নাম রাখা হয় নিন্দালু, যে ছেলের কথাবার্তা ও চলাফেরা এলোমেলো বা অসংলগ্ন তার নাম হয় নেলভেলু, ছোটবেলায় যে ছেলের মুখ দিয়ে লালা বা লোল পড়ে তার নাম রাখা হয় নাল্টু, যে ছেলের কথাবার্তা কর্কশ তার নাম রাখা হয় খাক্কাউ, পাথারে বা প্রান্তরে জন্মগ্রহণ করলে জাতকের নাম রাখা হয় পাথারু এবং জঙ্গলে জন্মগ্রহণ করলে নামকরণ হয় জঙ্গলু।

লেখাটি ‘চালচিত্র’ ২০১৭ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত। আরও লেখা পড়তে ভিজিট করুন

www.chalchitro.com
====///===

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here