রবীন্দ্র-জন্ম শতবার্ষিকী । সন্ জীদা খাতুন

0
274

রবীন্দ্র-জন্ম শতবার্ষিকী

সন্ জীদা খাতুন

একষট্টি সাল এল। আমি আর ওয়াহিদুল ছেলেমেয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম সেগুনবাগানে। এক সাইকেল আরোহী আমাদের রিক্সা থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন – ‘এখানে সন্জীদা খাতুন কোন বাড়িতে থাকেন, বলতে পারেন’? পরিচয় দিতে একটা চিঠি দিলেন আমার হাতে। মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী লিখেছেন, সেদিন বিকেল চারটেতে জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট গোবিন্দ দেব-এর বাড়ির প্রাঙ্গণে রবীন্দ্র-জন্মশতবর্ষ বিষয়ে সভা হবে – আমি যেন অবশ্য যাই। সেই বিকেলে সভাতে শতবার্ষিকী উদযাপনের জন্যে জাস্টিস্ মুর্শেদকে প্রধান করে একটি কমিটি হয়েছিল।

ওয়াহিদুল ঘুরে ঘুরে খবর আনতেন ঢাকার কোথায় কী হচ্ছে। গোপীবাগের দিকেও একটা কমিটি হয়েছিল। ওয়াইজঘাটের বুলবুল একাডেমী-ভবনে ভক্তিময় দাশগুপ্ত আর আতিকুল ইসলাম চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যের মহড়া দিচ্ছিলেন। ওয়াহিদুল সেখানে যেতেন সকালের দিকে, যখন আমি কলেজে থাকতাম। সন্ধ্যায় আমরা যেতাম র্যা ঙ্কিন স্ট্রীটে। কখনো ডাক্তার নন্দীর বাড়িতে, কখনো সিধু ভাই (মোখলেসুর রহমান)-এর বাড়িতে। এখানে হতো শ্যামা। ডাক্তার নন্দীর বড় মেয়ে ইন্দিরা গান গাইত। শ্যামার ভূমিকায় নাচত ওঁদের ছোটো মেয়ে মন্দিরা নন্দী। ‘নহে নহে এ নহে কৌতুক’ গানের সঙ্গে ওর ভাব-অভিব্যক্তি হচ্ছিল কাতর-ব্যাকুল। আমি বললাম গানের ওই বাক্যটির পরেই ‘আ’বলে চঞ্চল তানে যে সুর-বিহার রয়েছে, তাতে হৃদয়চাঞ্চল্যের আনন্দ উচ্ছ্বসিত হয়েছে। ওই সুরে নায়িকার ভালো-লাগার খবর ধরা পড়েছে। ও আমার ব্যাখ্যাটি মেনে নিতে পারল না মনে হলো। আমি বিষয়টা ঘাঁটাঘাঁটি না করে এড়িয়ে গেলাম।

শ্যামাতে বজ্রসেন হয়েছিল কামাল লোহানী। চিত্রাঙ্গদার মঞ্চায়ন করেছিলেন ভক্তিময় দাশগুপ্ত। এর মধ্যে এক কাণ্ড হলো। ভক্তিময় বাবু বিলকিস নাসিরুদ্দিনকে চিত্রাঙ্গদার গানগুলো গাইতে বলেছিলেন। অনুষ্ঠানের দুদিন আগে দুপুরবেলা ওয়াইজঘাটের মহড়া থেকে ফিরে ওয়াহিদুল আমাকে খবর দিলেন, বিলকিস আপা জানিয়ে দিয়েছেন উনি চিত্রাঙ্গদার গান গাইবেন না! বাড়িতে চিত্রাঙ্গদার স্বরলিপি বার করে কাগজে টুকে আনা তালিকা দেখে দেখে প্রয়োজনীয় গানগুলোতে পেন্সিলে টিক চি‎হ্ন দিয়ে ঘোষণা দিলেন, এখন চি‎হ্নিত গানগুলো স্বরলিপি থেকে তুলে নিয়ে গাইতে হবে তোমার! না মহড়া, না কিছু! প্রথমে ভেবেছিলাম,ও তুলে নেওয়া যাবে। কিন্তু তুলতে গিয়ে দেখি সব গান আমার পরিচিত নয়। লীনু বরং লংপ্লে রেকর্ড শুনে শুনে শ্যামা চণ্ডালিকা চিত্রাঙ্গদা বেশ গাইতে পারে। কিন্তু ওর সাবসিডিয়ারি পরীক্ষা চলছে তখন! চিত্রাঙ্গদা হবে দুদিন। লীনুর পরীক্ষা শেষ হবে পরের দিন বিকেলে। কাজেই প্রথম দিন আমাকেই গান গাইতে হলো। মোটামুটি বেশ চলে যাচ্ছিল মঞ্চে। হঠাৎ একটা জায়গায় ভক্তিময় বাবু যতই গাইতে ইশারা করেন আমাকে, আমি দেখি সে-গানটা তো তুলিনি মোটেই! উপায়ান্তর না পেয়ে তিনিই গাইতে শুরু করলেন আর ডেজি (পরবর্তী কালে অভিনেতা বুলবুল আহমেদের স্ত্রী) ধরে দিল তাঁর সঙ্গে। ডেজি রোজ মহড়া করেছে বলে সব গানই তুলে ফেলেছে শুনে শুনে। মঞ্চে নাচের সময়ে চিত্রাঙ্গদার হঠাৎ থমকে যাওয়ায় আর অন্যরকম গলায় গীতাংশ শুরু হওয়াতে, সবাই বুঝল কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে।
পরদিন পরীক্ষার হল থেকে সরাসরি এসে গপগপ করে টিফিন খেয়ে নিয়ে লীনু মান রক্ষা করল।

শতবার্ষিকী উপলক্ষে ড্রামা সার্কেলের তাসের দেশ নাটকেও এক কাণ্ড হয়েছিল। ভিতরে গিয়ে শুনি, সবই ঠিক আছে, তবে ‘গোপন কথাটি রবে না গোপনে’ গানখানি গাইবার কেউ নেই! আমাকেই ‘মুশকিল আসান’ হতে হলো। কিন্তু সরকারি চাকরি করি, আমি গাইলে কী জানি কী ঝামেলায় পড়তে হয় পরে! তখন আর সময় নেই। চট করে ঝোলা থেকে একটা রুমাল বার করে মুখে পুরে নিয়ে গেয়ে ফেললাম। কণ্ঠস্বর বিকৃত হলো তাতে। নাটকের পরে আহাদ ভাই আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন – ‘ওই গানখানি কে গাইলো বল তো? বেশ তো গাইলো!’ আমি কথা না বাড়িয়ে চট করে সেখান থেকে কেটে পড়লাম।

সেবার মঞ্চে গান গাইবার জন্য ডি পি আই-এর কাছ থেকে মৌখিক অনুমতি নিয়ে নিয়েছিলাম টেলিফোনে। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ফজলুর রহমান সাহেব বললেন – ‘আপনার অনুভূতি আমি বুঝতে পারছি। গেয়েই ফেলুন, কিছু হবে না’।

শতবার্ষিকীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের কথাটা বলি। প্রথম গান ছিল ফাহমিদার একক কণ্ঠে। তাল ছেড়ে গাওয়া ‘হৃদয় আমার প্রকাশ হল অনন্ত আকাশে’। মঞ্চের পিছনের পটে অন্ধকারে রবীন্দ্রনাথের ছবির ওপরে প্রথমে স্পট লাইট পড়ে আলোয় বৃত্ত ক্রমান্বয়ে বড় হতে থাকল। মনে হলো রবীন্দ্রনাথের হৃদয়টি ক্রমশ আকাশে ছড়িয়ে যাচ্ছে যেন! দারুণ ভালো গেলেছিল পরিকল্পনাটা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের একক সম্মেলক সব গানই খুব ভালো হয়েছিল সেদিন। আমরা সবাই খুশী!

যতদূর মনে পড়ে রবীন্দ্র-জন্মশতবর্ষের জন্যে নানান কমিটি হলেও শেষ পর্যন্ত সকলে একত্র হয়েই ইনজিনিয়ারস ইনসটিট্যুটে কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠান করা হয়েছিল। বাধা এসেছিলো তো বটেই! সুফিয়া খালাম্মাকে ডেকে চিফ সেক্রেটারি আজিজ আহমেদ ধমকের সুরে জিজ্ঞেস করেছিলেন – ‘ইয়ে সব কেয়া হো রাহা’? খালাম্মা শান্ত সুরে জানিয়েছিলেন – ‘সারা পৃথিবীতে যা হচ্ছে এও তাই’! সুফিয়া খালাম্মার কমিটির সেক্রেটারিকে (আনোয়ার জাহিদ) তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের ছুতোয় ফুলবাড়িয়া স্টেশন থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাতে কাজ চালাবার কোনো অসুবিধা হয়নি। সব মিলিয়ে শতভাগ সাফল্য এসেছিল শতবার্ষিকী উদযাপনে।
লেখাটি রাজা সহিদুল আসলাম সম্পাদিত ও জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, নীলফামারী শাখা প্রকাশিত ‘তিমিরদুয়ার খোলো’ সংকলন থেকে প্রকাশ করা হলো। – এডমিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here