বাঙলা নববর্ষ। রাজা সহিদুল আসলাম

0
560

বাঙলা নববর্ষ

রাজা সহিদুল আসলাম

বাঙলা নববর্ষ বাঙালি জীবনে ঐতিহ্যে রূপ নিয়েছে।

পহেলা বৈশাখ বাঙালির একটি সর্বজনীন লোকউৎসব।

এক সময় নববর্ষ পালিত হতো আর্তব উৎসব বা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। তখন এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল কৃষির, কারণ কৃষিকাজ ছিল ঋতুনির্ভর।

আলোকচিত্র: রাজা সহিদুল আসলাম।

অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। এটি পুরোপুরিই একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার। গ্রামে-গঞ্জে-নগরে ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রারম্ভে তাঁদের পুরানো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুন খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষে তাঁরা নতুন-পুরাতন খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতেন এবং নতুনভাবে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগসূত্র স্থাপন করতেন। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয়।

নববর্ষের উৎসব বাংলার গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণত নববর্ষে তারা বাড়িঘর পরিষ্কার রাখে, ব্যবহার্য সামগ্রী ধোয়ামোছা করে এবং সকালে স্নানাদি সেরে পূত-পবিত্র হয়। এ দিনটিতে ভালো খাওয়া, ভালো থাকা এবং ভালো পরতে পারাকে তারা ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলজনক বলে মনে করে। নববর্ষে ঘরে ঘরে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং প্রতিবেশীদের আগমন ঘটে। মিষ্টি-পিঠা-পায়েসসহ নানা রকম লোকজ খাবার তৈরির ধুম পড়ে যায়। একে অপরের সঙ্গে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় চলে। প্রিয়জনকে উপহার দেওয়ার মাধ্যমেও নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় হয়, যা শহরাঞ্চলেও এখন বহুল প্রচলিত।

নব আনন্দে জাগো আজি, নব রবি কিরণে, শুভ্র সুন্দর প্রীতি উজ্জ্বল নির্মল জীবনে।

বাংলা নববর্ষ প্রকৃতি ও তার সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা মানুষের জীবনাচরণকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া। এমন লোকায়ত এবং জনমানুষসম্পৃক্ত দিনলিপি খুব কম আছে বলেই বাংলা নতুন বছর বাঙালিকে শেকড়ের সন্ধান দেয়। পুরাতনকে বিদায় দিয়ে নতুনকে আলিঙ্গনের অনন্য উদাহরণ হিসেবে দিনটি সামনে আসে, আনন্দে মাতিয়ে আগামীর দিনগুলোর লড়াইয়ে সাহস যোগায়।
সেই পথ পাড়ি দিয়ে আরেকটি নতুন বছরে পা রেখেছি আমরা। কল্যাণ ও নতুন জীবনের প্রতীক এই নববর্ষ। অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় উদ্ যাপিত হয় নববর্ষ।

নতুন সূর্যোদয়ের মধ্য নিয়ে শুরু হয় আমাদের আরেকটি বছরের প্রথম দিবস। তখন মন গেয়ে ওঠে

এসো হে বৈশাখ

এসো ষড়ঋতুর মহা উদ্বোধনে

মদমত্ত প্রবলতায়,

ভেঙেচুড়ে চুরমার করো দিগ্বিদিক,

সৃজনের অমিত অহমিকায়।

শীর্ণ ডালে জীর্ণ পাতা মহাজনের খেরো খাতা

দমকা হাওয়ায় ভেসে যাক

এসো পক্ষপুটে বেঁধে নিয়ে, নবীণ কচি চির সবুজের ঝাঁকে, এসো তেজোদ্বীপ্ত

হে সূর্য, ছড়াও নব রাগ, ছড়াও বারি, ছড়াও ধারা

তোমার স্পর্শ জীর্ণ মলিন, সব মুছে যাক

এসো এসো হে বৈশাখ …

আলোকচিত্র: রাজা সহিদুল আসলাম।

বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় মূলত সম্রাট আকবরের সময় থেকে। কৃষিকাজের সুবিধার্থে মুগল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সন প্রবর্তন করেন। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসনকে ভিত্তি করে বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। নতুন সনটি প্রথমে ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল, পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়।

সে সময় বাংলার কৃষকরা চৈত্রমাসের শেষদিন পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূ-স্বামীর খাজনা পরিশোধ করত। পরদিন নববর্ষে ভূস্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এ উপলক্ষে তখন মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। ক্রমান্বয়ে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে পহেলা বৈশাখ আনন্দময় ও উৎসবমুখী হয়ে ওঠে এবং বাংলা নববর্ষ শুভদিন হিসেবে পালিত হতে থাকে।

অপরূপ এই পৃথিবী। সবুজ গাছপালা, বয়ে যাওয়া নদী, পাখির কলতান, সোনালী বিকেলে সবুজ ফসলের মাঠে ঝিরি হাওয়া – মুগ্ধ করে মানব হৃদয়। জগতের অপূর্ব সৌন্দর্যর সহোৎসব। সবই সৃষ্টিকর্তার দান।

বাংলাদেশের প্রথা ও ঐতিহ্য বিচিত্র এবং আকর্ষণীয়। এর অনেকগুলি এসেছে প্রাগৈতিহাসিক স্তর থেকে। অনেক প্রথা যুগে যুগে বহন করে নিয়ে এসেছে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এই উপমহাদেশে আগত শত শত আদিবাসী। এসব আদিবাসীরা আজও তাদের সংস্কৃতি নিয়ে বসবাস করছে বাংলাদেশের সমতল ভূমিতে এবং পাহাড়-পর্বতে। এদের পূর্বপুরুষরা ছিল হয় নেগ্রিটো অথবা প্রোটো-অস্ট্রালয়েড বা প্রোটো-মঙ্গোলয়েড কিংবা ককেশিয়াড। এদের পরে পশ্চিম এশিয়া থেকে আসে আর্যগণ। বাংলাদেশের বহুজাতিক জনগোষ্ঠী সৃষ্টির পেছনে রয়েছে দেশটির নদীবিধৌত ভূমির উর্বরতা, নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া এবং ধন-সম্পদের দুনিয়াজোড়া খ্যাতি। এসবের আকর্ষণে এসেছে বহু আদিবাসী, আগ্রাসী ভিনদেশি, ব্যবসায়ী ও অন্যান্য ভাগ্যান্বেষী। বহু জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণে সৃষ্ট বাঙালি জাতির এক প্রধান অংশ ছিল অনার্য। উর্বর জমি এবং খাল-বিল, নদ-নদীর প্রাচুর্যের ফলে কৃষি এবং মৎস্য আহরণ হয়ে দাঁড়ায় জনগণের উপার্জনের প্রধান উপায়। চাল, সবজি এবং মাছ তাদের প্রধান খাদ্য হয়ে ওঠে। ফলে অনেক প্রথাই হয় কৃষিভিত্তিক।

এ এক দেশ, যেখানে হাত থেকে বীজ পরে গেলে গজিয়ে ওছে চারা গাছ। এ এমন এক প্রকৃতি খুব স্বাভাবিকভাবে ভরে ওঠে পুষ্প আর ধন ধান্যে।

বাঙালির নববর্ষ এখন উৎসব। সব ধর্মর বাঙালি এ দিনটিকে পালন করে। এ উপলক্ষে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান, বৈশাখী মেলা, খেলাধুলা, সাংস্কৃকিত অনষ্ঠান, মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন হয়ে থাকে দেশব্যপী। বাংলাদেশের সরকার এ জন্য চাকরিজীবীদেরকে নববর্ষর উৎসব বোনাস প্রদান করছেন।

তথ্য সংগ্রহ: বাংলা পিডিয়া।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here