বাংলার লোকধর্ম : প্রেক্ষিত ঠাকুরগাঁও অঞ্চল। মোস্তাক আহমদ

0
738

বাংলার লোকধর্ম : প্রেক্ষিত ঠাকুরগাঁও অঞ্চল

মোস্তাক আহমদ

মানুষ তার দৈনন্দিন জীবন-যাপনে, ধর্মে-কর্মে, চিন্তন-দর্শনে, আচার-আচরণে, বিশ্বাস-সংস্কারে সর্বপরি ব্যবহারিক জীবনে বস্তু বা অবস্তুগত যে সব উপাদনের ব্যবহার করে তাই তার সংস্কৃতি। বাংলার সংস্কৃতি বহুমাত্রিক সংস্কারে ঋদ্ধ। আর এ সংস্কৃতির মধ্যেই পরিলক্ষিত হয় বাংলার লোকসংস্কৃতির আত্মপরিচয়। এছাড়াও বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির রয়েছে একটি সতন্ত্র পরিমণ্ডল। তেমনি বাংলার উত্তর জনপদের ঠাকুরগাঁও জেলারও একটি নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল রয়েছে। যা নানা ভাবে এ জনগোষ্ঠীকে প্রভাবিত এবং জীবনবোধকে পরিচালিত করছে।
বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি উল্লেখযোগ্য ভাবগত আচারিক শাখা হল লোকধর্ম। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের মত ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের লোকসমাজ শাস্ত্রীয় জৈন-বৌদ্ধ-ব্রাহ্মণ্য এবং ইসলাম ধর্মের অনুসারী হয়েও আদিম ঐতিহ্যের অনুসারী। তারা ব্যক্তিগত ও পরিবারিক দুঃখ-যন্ত্রনা, আপদ-বিপদ, রোগ-শোক থেকে পরিত্রাণ এবং ইহলৌকিক-পারলৌকিক জীবনে শান্তির প্রত্যাশায় পারিপার্শ্বিক জগতের অনেক দৃশ্য ও অদৃশ্যমান শক্তির কাছে আত্মসমর্পন করে থাকে। এজন্য তারা কোন মহাপুরুষের বাণী অথবা শাস্ত্র গ্রন্থের শরণাপন্ন না হয়ে অশুভ শক্তির প্রভাব থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় অনুসরণ করে চলছে লোকধর্মের। ঠাকুরগাঁও এর এই সাংস্কৃতিক উপাদানটি বৃহৎ অর্থে বাংলার লোকসংস্কৃতির অংশ বিশেষ।
ঠাকুরগাঁও বাংলার উত্তরাঞ্চলের একটি প্রান্তিক জেলা। ১৯৮৪ সালে এটি দিনাজপুর জেলার মহকুমা থেকে সতন্ত্র জেলায় পরিণত হয়। ভৌগোলিক দিক থেকে বর্তমানে ঠাকুরগাঁও জেলার উত্তরে পঞ্চগড় জেলা, পূর্বে পঞ্চগড় ও দিনাজপুর জেলা, দক্ষিণে দিনাজপুর জেলা ও পশ্চিমে ভারতের পশ্চিম বাংলা।
নৃতাত্ত্বিকদের ধারণা খৃষ্টপূর্বাব্দ দু হাজার বা ততোধিক সময়ের পূর্ব থেকে নিষাদ, শবর, পুলিন্দ প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর নিবাস গড়ে ওঠে উত্তরবঙ্গে। ইতিহাসে এরাই অনার্য নামে পরিচিত।১ তারা সংখ্যায় অধিক ছিল না। কিন্তু শৌর্য-বীর্য, ভাষা ও সাংস্কৃতিক চেতনায় ছিল ঐতিহ্যমণ্ডিত। এই উত্তর বঙ্গেই সর্বপ্রথম আর্যদের আগমন ঘটে।২ আর্যদেরও অনেক পূর্বে আসে অষ্টিক, দ্রাবিড়, মোঙ্গলীয় এবং আলপানীয় জনগোষ্ঠীর মানুষ। অষ্টম শতাব্দী থেকে শুরু হয় সেমিটিকদের আগমন। ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে মুসলিম শাসকদের ছত্রছায়ায় এই ধারা ক্রমবর্ধিত হতে থাকে।৩ পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে ধর্মপ্রচারক, পরিব্রাজক এবং বণিক বেশে আগমন শুরু হয় খৃস্টধর্মালম্বী ইউরোপীয়দের। অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্বেই পদ্মা-তিস্তা-করতোয়া-বহ্মপুত্র-যমুনা বিধৌত উত্তর বঙ্গের বাণিজ্য প্রধান এলাকায় আনাগোনা ঘটে পূর্তগীজ, ইংরেজ, দিনেমার, ফরাসী এবং আর্মেনীয়দের।৪ এইভাবে উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় ঠাকুরগাঁয়ের মানুষের সঙ্গেও নানা জাতি-উপজাতি, ধর্ম-বর্ণের মানুষের মিশ্রণ ঘটে। ঠাকুরগাঁও পরিণত হয় ‘রক্ত-সংকর’ জনগোষ্ঠীর আবাস ভূমিতে।
‘ধর্ম’ শব্দটি তৎসম শব্দ। ‘ধৃ’ ধাতু থেকে উৎপত্তি থেকে হয়েছে। এর সাথে মন প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘ধর্ম’ শব্দটির উদ্ভব। এর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ‘যা ধারণ করে’। ধর্মের উদ্ভব সম্পর্কে স্যার ফ্রেজার তার এড়ষফবহ নড়ঁময গ্রন্থে লিখেছেন-‘আদিম মানুষ যখন যাদু বিদ্যা দিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রন করতে পারল না তখন সে ভাবল এমন এক শক্তি নিশ্চয়ই রয়েছে যাকে যাদু নয় বরং প্রার্থনার মধ্যেমে সন্তুষ্ট করতে হয় এবং এভাবেই ধর্মের উদ্ভব হয়েছে।৫
আদিতে সব ধর্মই ছিল লোকধর্ম। ‘লোকসাধারণের আশা-আকাক্সক্ষা ও স্বপ্নকে ধারণ করে তাদের মধ্যেই সব ধর্মের উদ্ভব, বিকাশ ও বিস্তার। কিন্তু পরে প্রায় সব ধর্মই সাধারণের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়, সমাজের অধিপতি শ্রেণী ধর্মকে নিজেদের স্বার্থসাধনে নিয়জিত করে অথবা ঐশ্বরিক বানীতে সমৃদ্ধ হয়ে তৈরী করে শ্বাস্ত্রীয় ধর্মের। কখনো বা সরাসরি বল প্রয়োগে কখনো বা নানা ছল ও কৌশলের আশ্রয়ে লোকসাধারণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় সেই শাস্ত্রীয় ধর্ম।’ ৬ কিন্তু সেই শাস্ত্রীয় ধর্মবোধ, চিন্তন ও চর্যার প্রতি ধীরে ধীরে লোকসমাজের অনাস্থা গড়ে ওঠে এবং লোকসাধারণ ভেতরে ভেতরে তাদের নিজস্ব ধর্মকেই লালন করে যেতে থাকে।
লোকধর্ম সম্পর্কে ড. বরুণ কুমার চক্রবর্তী বলেন – ‘লোকধর্ম বলতে আমরা বুঝি লোকসমাজের দ্বারা আচরিত ধর্ম। এ ধর্ম বেদ-পুরাণ নির্ভর নয়, এ ধর্ম একান্তভাবেই লোকসমাজের বাস্তব অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত। এ ধর্মাচরণে ব্রাহ্মণ-পুরোহিতদের পৌরহিত্য লাগে না। কোনো সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ শোনা যায় না। উপচারের ক্ষেত্রেও সহজলভ্য উপাদানগুলির উপর নির্ভর করা হয়। পরিশীলিত ধর্মের মতো লোকধর্মগুলির লিখিত কোন বিধান বা নিয়মাবলি নেই। লোকধর্ম ব্যষ্টিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নয়; তা একান্তভাবেই সমষ্টির ঐহিক কল্যাণসম্পৃক্ত। কোনো মুক্তি, মোক্ষ বা স্বর্গবাস এ ধর্মাচরণের মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, মুখ্য উদ্দেশ্য লৌকিক কল্যাণ সাধন। প্রকৃতিতে লোকধর্ম প্রতিবাদী, সমাজের তথাকথিত অন্তজ শ্রেণিভুক্ত মানুষরাই মূলত এই ধর্মাচরণ করে থাকেন। লোকধর্মে মূর্তি পূজার চল তেমন নেই, গাছের ডাল, মাটির ঢিবি, প্রস্তর খণ্ড এসব অর্চিত হয়।’৭
লোকধর্ম বলতে আমরা বুঝি ‘শাস্ত্রীয় ধর্মের কাছাকাছি, পাশাপাশি বা মধ্যে চর্চিত, সর্বজনীন আবাহন সম্বলিত, কঠোর কঠিন রীতি বিরুদ্ধ, লোকসমাজের অভিজ্ঞান প্রসূত ও লোকসমাজের দ্বারা আচরিত, ইহজাগতিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ধর্ম’।৮ লোকধর্মের সঙ্গে শাস্ত্রীয় ধর্মের স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ‘শাস্ত্রীয় ধর্মের প্রবর্তক মানুষ, লোকধর্মের প্রবর্তক মানুষের হৃদয়; শাস্ত্রীয় ধর্ম মহাপুরুষদের বাণী নির্ভর লোকধর্ম ঐতিহ্য নির্ভর; শাস্ত্রীয় ধর্মের উন্মেষ বিশেষ বিশেষ দেশ ও কালের আধারে, লোকধর্মের উন্মেষ ব্যক্তি ও সমাজের তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে; শাস্ত্রীয় ধর্মের উন্মেষ বিশেষ বিশেষ মহাপুরুষের জীবন দর্শনের প্রেক্ষাপটে, লোকধর্মের উন্মেষ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সর্ব চরাচরে, অনন্তকালের স্তরে স্তরে; শাস্ত্রীয় ধর্ম মানুষে মানুষে ভেদাভেদ সৃষ্টি করে, লোকধর্ম ভেদাভেদের প্রাচীর ভেঙ্গে অভেদাত্মার প্রাসাদ গড়ে; শাস্ত্রীয় ধর্ম পরধর্মের প্রতি বিদ্বিষ্ট মনোভাব গড়ে তোলে, লোকধর্ম পরধর্মের প্রতি মানুষকে শ্রদ্ধাশীল করে; শাস্ত্রীয় ধর্মের বিধি বিধান অনমনীয়, লোকধর্মের বিধি বিধান পরিবর্তনীয়। প্রকৃতপক্ষে পরিবর্তনশীলতাই লোকধর্মের প্রাণ; গতিশীলতাই লোকধর্মের মূল আকর্ষণ।’৯
ভৌগোলিক পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল বিবেচনায় বাংলার অন্যান্য অঞ্চল থেকে উত্তরবঙ্গের ঠাকুরগাঁও স্বতন্ত্র অঞ্চল।এ অঞ্চলের লোকসমাজ বংশ পরম্পরায় লোকসংস্কৃতিকে লালন করে আসছে। নগর সভতার স্পর্শ থেকে দূরে অবস্থান করার কারণে এখানকার লোকসমাজ যতটা ধর্মভীরু, ততটা ধর্মপরায়ন নয়।বহিরাগত সূফি- সাধকদের চারিত্রিক মাহাত্ম্য ও লৌকিক ক্ষমতায় মুগ্ধ হয়ে এ অঞ্চলের বর্ণবাদী হিন্দু সমাজের নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার নিুবর্ণ ও বিত্তের হিন্দু ও আত্মলুপ্ত বৌদ্ধদের বৃহৎ সংখ্যক মানুষ ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছে বটে কিন্তু জাতান্তরিত হতে পারে নি।যুগযুগান্তর ধরে এ অঞ্চলে বসবাসরত জড়োপাসক জনগোষ্ঠী সাঁওতাল, পলিয়া, ওরাওঁ, রাজবংশী, মাহাতো,কুকামার,গাংঘু প্রভৃতি আদিম জনগোষ্ঠী ছাড়াও কৃষিজীবী মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায় তাদের বিশ্বাস ও স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে আশ্রয় করে যৌথ প্রয়াসে গড়ে তুলেছে ঠাকুরগাঁও এর লেকধর্মকে।
লোকধর্মের আবেদন সর্বজনীন। এর স্পষ্ট প্রমান পাওয়া যায় ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের মুসলিম সমাজের ঐতিহাসিক ও কাল্পনিক পীর-আউলিয়ার মাজার বা থানের প্রতি অন্য সম্প্রদায়ের মানুষদের লোকধর্মাচার পালন এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের পৌরানিক বা কাল্পনিক দেব-দেবীর প্রতি অন্য সম্প্রদায়ের মানুষদের সুগভীর শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস সংস্কারনিষ্ট কর্মকাণ্ডের বিচিত্রমূখীনতায়।
ঠাকুরগাঁও-এ রয়েছে অনেক ঐতিহাসিক ও কাল্পনিক পীরের মাজার। ঐতিহাসিক পীরের মধ্যে হযরত নাছিরউদ্দীন হায়দার, শাহ সত্যপীর, পাগলাপীর , সিরাজউদ্দীন আউলিয়া ইত্যাদি। এছাড়া ঠাকুরগাঁও এর বিভিন্ন স্থানে এমন কিছু কাল্পনিক পীরের আস্তানা বা থান রয়েছে যেখানে মাজার-মসজিদ কিংবা খাদেমের কোন অস্তিত্ব নেই। কিন্তু লোকজীবনে রয়েছে তাদের অপ্রতিহত প্রভাব প্রতিপত্তি। এ প্রসঙ্গে যাদের নাম উল্লেখ করা যাতে পারে তারা হলেন ঘোড়াপীর, জটাপীর, কালুপীর, গাজীপীর, মাদারপীর, অখতপীর, খোয়াজখীজিরেরপীর, বুড়াপীর, জুড়াপীর, পাঁচপীর, কদমরসুলের পীর প্রমুখ। হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে রয়েছে গ্রাম ঠাকুরের থান, জান্নাহানীর থান এবং মুসলমানের ঘরেও রযেছে কানী বিষহরীর থান, সন্ন্যাসীর ঠাকুরের থান ইত্যাদি। এছাড়া এ অঞ্চলের দেব-দেবীর বিভিন্ন মন্দিরে শাস্ত্রীয় আচারের পাশাপাশি পালিত হয় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের লোকধর্মীয় আচার-সংস্কার।
ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের লোকসমাজ ও লোকজীবনে পীরবাদী প্রাবল্যের ধারাও আকস্মিক ঘটনার প্রতিফলন নয়। বঙ্গে ইসলাম প্রচারের ধারাবাহিকতার সঙ্গে রয়েছে এর ঘনিষ্ট সর্ম্পক। ‘পীর’ ফারসী শব্দ। আর আভিধানিক অর্থ- দীক্ষাগুরু, গুরুবাদী এই সাধনার বীজ নিহিত রয়েছে সূফী সাধনার অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ায়।১০ এই ‘সূফী সাধনার সঙ্গে ভারতীয় যোগতান্ত্রিক সাধনার ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।’১১
‘সূফীরা মানবতাবাদী ও উদারপন্থী যোগতান্ত্রিক সাধনার ধারা বঙ্গের মুসলিম সমাজে গড়ে তুললেও তারা মাজার ভিত্তিক সাধনার প্রতি মোটেও অনুপ্রেরণা যোগায়নি। কারণ শাস্ত্রীয় ইসলামে কোরান হাদীস এবং ইমামদের নির্দেশাবলীতে কোথাও পীর স্তুতির কোন কথা নেই।’১২ অনুমান করা যায় এ দেশীয় ধর্মান্তরিত মুসলমানেরা বৌদ্ধদের ‘চৈত্যপূজা’র দেখাদেখি তাদের সমাজে পীরপূজার রীতি গড়ে তুলে। মুসলমানদের দেখাদেখি দেশীয় হিন্দু ও আদিবাসীসমাজের অসংখ্য মানুষও চিরায়ত বিশ্বাসের ধারায় পীরের থানে মানত করে গভীর শ্রদ্ধা জানায় এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষেরাও হিন্দুর দেব-দেবীর থানে মানত ও গভীর ভয়-ভক্তি-বিশ্বাসে নানা আচার পালন করে থাকে। উল্লেখ্য যে, ‘থান’ শব্দটি সংস্কৃত ‘স্থান’ অথবা ফারসী ‘আস্তানা’ শব্দের অপভ্রংশ। দেব-দেবী, সাধু-সন্ন্যাসী, পীর-আউলিয়া প্রভৃতির স্মৃতিবিজরিত স্থানকেই সাধারণত ‘থান’ নামে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে।
লোকধর্মে পীরের মাজার : সত্যপীর
ঠাকুরগাঁও শহরের বি.ডি.আর ক্যাম্পের (বর্তমানে বি.জি.বি ক্যাম্প) পার্শ্বেই দিনাজপুর ঠাকুরগাঁও মহাসড়কে ‘সত্যপীর’ ব্রীজ। এই ব্রীজের পূর্ব পার্শ্বে ১০ গজ দুরেই অবস্থিত সত্যপীরের মাজার। উল্লেখ্য যে, এই পীরের নামানুসারেই এই ব্রীজের নাম হয়েছে সত্যপীর ব্রীজ। শুধুই উত্তরাঞ্চলীয় জেলা ঠাকুরগাঁও নয় গোটা ‘বাংলাদেশে সত্যপীরের প্রভাব সবচেয়ে ব্যাপক। অজ্ঞাত পরিচয় পল্লী কবি থেকে উচ্চ শিক্ষিত সভাকবি সকলেই সত্যপীরের ছড়া-কথা-পুঁথি-পাঁচালি রচনা করেছেন।’১৩ সত্যপীর কোন ঐতিহাসিক ব্যক্তি ছিলেন কি না এ পর্যন্ত তার কোন প্রমান পাওয়া যায় নি।১৪ মধ্যযুগীয় সত্যপীর বা সত্য নারায়নের পুঁথিতে তিনি বাঙালি হিন্দু মুসলমানের পারস্পরিক মিলন সেতু রচনাকারী কল্পিত দেবতা হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। তবে ঠাকুরগাঁয়ের সত্যপীরকে ঐতিহাসিক পীর বলেই এলাকার মানুষ দাবী করে। ‘আনুমানিক ৭ থেকে ৮শত বছর আগে জেদ্দা থেকে এই পীর এ অঞ্চলে আসেন ইসলাম প্রচারের জন্য।’১৫ পীরের পুরো নাম শাহ সত্যপীর। মাজারটি চার দিকে ইটের প্রাচীর ও উপরে টিন শেডের ঘরের মাঝখানে লাল সবুজ কাপড়ে ঢাকা। মাজারের উত্তরে রয়েছে দ্বিতল মসজিদ ও একটি কূপ এবং দক্ষিণে রয়েছে পাশাপাশি অবস্থিত ৯টি কবর। মাজারের খাদেম নূর মোহাম্মদ এর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল এর মধ্যে একটি ঝুড়িপীর বা জটাপীরের মাজার , একটি মাদার পীরের একটি কুতুবউদ্দীন আউলিয়ার, একটি কালুপীর একটি গাজীপীরের এবং অপর মাজার গুলো নামহীন পীরের। তিনি জানালেন পীরের নামে একটি পুকুরসহ প্রায় দুই একর জমি রয়েছে।
মাজারের আশেপাশের জনগণ অধিকাংশই মুসলমান। কিছু রয়েছে নিু বর্ণের হিন্দু ও আদিবাসী। কথা হলো বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে। সকলেই সত্যপীরের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধাশীল। মাজারের খাদেম জানালেন, প্রতি বছর ২২শে বৈশাখ মাজার প্রাঙ্গণে ঔরশ পালিত হয়। এক দিন একরাত ধরে চলে ঔরশ অনুষ্ঠান। সেদিন বিভিন্ন স্থান থেকে আগত লোকজন মাজারে খাসি, মোরগ, টাকা, চাল ইত্যাদি মানত করে থাকে। এসব মানতকৃত উপকরণ দিয়ে রান্না করা হয় সিন্নি। সেই সিন্নি আগত হিন্দু, মুসলমান ও উপজাতিসহ সকলে খেয়ে থাকে।
মাজারে কথা হল ঠাকুরগাঁও শহরের আশ্রমপাড়ার ৫৫ বছর বয়সী স্বাক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন পলি দাসের সঙ্গে। তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। তিনি এসেছেন তার দ্বিতীয় মেয়ে লাবনী দাসের বিয়ের জন্য মানত করতে। জানালেন ইচ্ছে পূরণ হলে তিনি পরের বছর একটি খাসি বলি দেবেন। তার অগাধ বিশ্বাস এবার তার মনবাসনা পূরণ হবে। বাজারে মানত করতে আসা নিশ্চিন্তপুরের বাসিন্দা হামিদুর রহমান জানালেন, তিনি ছেলেকে খাতনা দিবেন। এ সময় তার ছেলে যেন সুস্থ্য থাকে এ জন্য তিনি মানত করেছেন।
স্থানীয় লোকজনের বিশ্বাস পীরের কারণে আশেপাশের মানুষের কোন ক্ষতি হয় না। গভীর রাতেও নির্ভয়ে পথ চলতে পারে এবং সত্যপীরের উছিলাতেই সত্যপীরের ব্রীজে কখনো সড়ক দূর্ঘটনা ঘটে না।
সিরাজউদ্দীন আউলিয়ার মাজার :
ঠাকুরগাঁও এর পীরগঞ্জ উপজেলার রেজিস্ট্রি অফিসের সম্মুখে ‘জগথা’ গ্রামে মাজারটি অবস্থিত। মাজারটির চার দিক ইট সিমেন্টের প্রাচীরে ঘেরা, উপরে টিন শেড, ভীতরে বাধাইকৃত পাশাপাশি দুইটি কবর। কথা হল মাজারের খাদেম ৫৫ বছর বয়সী রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তার বাড়ী মাজারের পার্শ্বেই। তিনি জানালেন প্রতি বছর অগ্রহায়ন মাসের ২৫ তারিখে ঔরশ পালিত হয়। ঔরশের দিন হাজার হাজার লোক উপস্থিত হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা ৩৫ বছর বয়সী সালেহার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল-এই পীর কারও ক্ষতি করে না। যে যেটা মানত করে সেটাই পূরণ হয়। সালেহার দেখা মতে এই মাজারে মুসলমানদের তুলনায় হিন্দু ও বিহারী লোকসমাজের মানুষরাই অসুখে-বিসুখে, রোগে-শোকে, মনোবাসনা পূরণের জন্য মানত করে।
পাগলা পীরের মাজার :
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার পঞ্চগ-ঠাকুরগাঁও মহাসড়কের ভূল্লী বাজার নামক স্থান থেকে চার কিলোমিটার পশ্চিমে আউলিয়াপুর ইউনিয়নে মাদারগঞ্জ পাইকপাড়া গ্রামে পাগলাপীরের মাজার অবস্থিত। ১৯৯৬ সালে পীরের নামে এখানে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। মাদ্রাসার মাঠেই সিমেন্টের প্রচীরে ঘেরা পীরের মাজারটি। মাজারের পার্শ্বেই সিমেন্টের রিং বসানো একটি কূপ। কত আগে পাগলাপীর এখানে এসেছিলেন তা কেউ সঠিক ভাবে বলতে পারে না। মাদ্রাসার নাইট গার্ড জানালেন, পীরের নামে বৃটিশ রেকর্ডে আট একর আবাদি জমি রয়েছে। এখানে কোন ঔরশ পালিত না হলেও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পর থেকে ‘ইছালে ছাওয়াব’ উপলক্ষে শতশত নারী-পুরুষ সেদিন মাজারে দুধ, মুরগী, ছাগল, সিন্নি ইত্যাদি দিয়ে মানত পুরণ করে থাকে।
তিনি জানালেন মাজারের পার্শ্বে অবস্থিত কূপটি পীরের ব্যবহৃত কূপ ছিল। রোগে-শোকে ও মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্য এলাকার লোকজন কূপের পানি পান করে। তিনি জানালেন মাদ্রাসার ছাত্রদের কখনো পেট ব্যথা হলে অথবা কোন রোগ না হওয়ার জন্য মাঝে মধ্যে কূপের পানি পান করানো হয়। সুজন আলী নামক স্থানীয় এক বালক জানাল, সে কোন রোগ বালাই না হবার জন্য প্রতি বছর কূপের পানি পান করে। স্থানীয় মধ্য বয়সী এক অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন কৃষক বেলাল হোসেন সঙ্গে আলাপ হয়। তার মেয়ের কোন সন্তান না হওয়ায় সে পীরের কাছে ছাগল মানত করেছে। বেলাল হোসেন ও তার স্ত্রীর দীর্ঘ বিশ্বাস এবার অবশ্যই তার মনোবাসনা পূরণ হবে।
এই এলাকার অধিকাংশ লোক মুসলমান ধর্মালম্বী, তবে পার্শ্বে রয়েছে হিন্দু ও আদিবাসী ওরাওঁ সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। মাজারের পার্শ্বে বসবাসকারী ৪০ বছর বয়সী আফরোজা বেগম জানালেন, তাদের বাড়ীতে অনুষ্ঠান বা দাওয়াত হলে আগে পীরের উদ্দেশ্যে পায়েস রান্না করে লোকজনকে খাওয়ানো হয়।
পীরের ক্ষমতা নিয়েও লোকমানুষে অনেক রকমের কিংবদন্তীর প্রচলন আছে। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল এই গ্রামের মধ্যবয়সী জৈনিক এক মহিলা পীরের প্রতি অবহেলা দেখালে সঙ্গে সঙ্গে তার বমি আর পাতলা পায়খানা শুরু হয়। অতঃপর পীরের নামে অনেক প্রকারের মানত দিয়ে সে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে।
স্থানীয় এক ৪৪/৪৫ বছর বয়সী স্কুল শিক্ষক শফিউল ইসলাম জানালেন, এই এলাকায় কারও গাভীর বাছুর হবার পর পীরের নামে প্রথম দুধটা মানত না দিলে বাছুর হারিয়ে যায়। আবার মানত করলে সঙ্গে সঙ্গে বাছুর ফিরে আসে।
এলাকার প্রবীন ব্যক্তিরা জানালেন, এই পীর সাহেব একবার তার বোনের বাড়ীতে দুটো ছোট ছোট মাটির পাতিলে ভাঁড় সাজিয়ে পায়েস নিয়ে যায়। এদেখে তাঁর বোনের বাড়ীতে লোকজন ঠাট্টা করে বলে যে, এতে ছোট পাতিলের পায়েস সে নিজে খাবে নাকি তার বোনের বাড়ীতে লোকজন খাবে। এ কথাতে পীর সাহেব একটি বড় কড়াই নিয়ে আসতে বলে ।কড়াই নিয়ে এলে এতে পাতিলের সব পায়েস ঢেলে দিয়ে সেই বাড়ীর মানুষ, পাড়া প্রতিবেশীসহ সকলকে খাওয়াতে বলে। এরপর যদি কড়াইতে পায়েস থাকে তাহলে আমি ও আমার বোন খাব। পীরের কোরামতিতে বাড়ীর লোকজন ও পাড়া প্রতিবেশী খেয়েও পাতিলের পায়েস ফুরাতে পারে না। এই ঘটনার পর থেকেই তিনি পাগলা পীর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
এলাকায় কিংবদন্তিমূলক লোককাহিনী প্রচলিত আছে যে, পাগলা পীরের একটি বাঘ ছিল। বাঘটির পীঠে চড়ে পীর বিভিন্ন স্থানে ভ্রমন করত। পীর মারা যাবার পর বাঘটি তার কবরের পার্শ্বেই সব সময় থাকত। এলাকাবাসীরা ধীরে ধীরে ক্ষতিকর মনে করলে বাঘটিকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় এবং স্থানীয় এক সাহসী যুবক লোহার বল্লম দিয়ে বাঘটিকে মেরে ফেলে। বাঘটি মারা যাবার আগে বল্লমের আঘাতে প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে যুবকের ঘরে আগুন লেগে আসবাব পত্র পুড়ে ছাই হয়ে যায় কিন্তু ঘরের কোন ক্ষতি হয় না। স্থানীয় লোকসমাজের বিশ্বাস যে, পীরের বাঘটিকে মারার কারণেই পীর যুবকের এই ক্ষতি করেছে।
পাচঁপীরের মাজার :
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর ইউনিয়নের পাঁচপীরের ডাঙ্গা নামক গ্রামে আবাদি জমির মধ্যে অবস্থিত পাঁচপীরের মাজার। উল্লেখ্য যে, পাঁচপীরের নামেই এ গ্রামের নাম করণ হয়েছে। গ্রামের অধিকাংশই মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ। মাজারের তত্ত্বাবধায়কের নাম আব্দুস সামাদ। বয়স প্রায় ৮০ বছর। তিনি জানালেন এক পাগল এই মাজারে বসে থাকত। প্রতি বৃহস্পতিবার সে সবার কাছে টাকা পয়সা নিয়ে মিলাদ মাহফিল করত। মিলাদের সঙ্গে মারফতি গান বাজনাও হত। হঠাৎ একদিন পাগলটি মাজারের পাশ্বে অবস্থিত আব্দুস সামাদের বাড়ীতে এসে তার স্ত্রী নূর জাহানকে বলল ‘কিরে তোরা কেউ এই মাজারটির সেবা যতœ করিস না, এখানে তো পাঁচপীর আছে’ । এই বলে পাগলটি এলাকা ছেড়ে চলে যায়। এই পাগল কোথা থেকে এসেছিল তা কেউ জানে না। তখন থেকেই নিরক্ষর আব্দুস সামাদ ও তার স্ত্রী মাজারের দেখাশুনা করে আসছে। নূর জাহান জানালেন, মনোবাসনা পূরণের জন্য লোকজন মোমবাতি, আগরবাতি, মোরগ, টাকা, ছাগল ইত্যাদি মানত স্বরূপ তার হাতে দিয়ে যায়। তিনি এগুলো দিয়ে পীরের উদ্দেশ্যে একই নিয়েমে সিন্নি তৈরী করে এবং মিলাদ ও মারফতি গানের আয়োজন করে।
এই পীরের নাম পাঁচপীর হলেও মাজার রয়েছে একটি। কেন পাঁচপীর নামকরণ হয়েছে তা জানা যায় নি । উল্লেখ্য যে, ঠাকুরগাঁও এর ন্যয় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে পাঁচপীরের মাজার ও থান রয়েছে। এর নাম করণ নিয়ে পণ্ডিতদের নানান মতামত রয়েছে। মনছুরউদ্দীন লিখেছেন ‘পাকপাঞ্জাতন’১৬ হতে পাঁচপীরের ধারণার উৎপত্তি।
ড. এনামুল হক হিন্দু-মুসলমানের ধর্ম শাস্ত্র ও পুরাণ কাব্যাদিতে মানুষ-স্থান-গুণ-ভাববাচক পাঁচ সংখ্যার সাদৃশ্যে পাঁচপীরের নামের উদ্ভব কল্পনা করেছেন। বৌদ্ধদের মহাযানী শাখায় ‘পঞ্চতথাগত’ বা পঞ্চধ্যানী বুদ্ধের ধারণা আছে।১৭ বস্তুত ধর্মান্তরিত নিু বর্ণের হিন্দু ও আত্মলুপ্ত বৌদ্ধদের পূর্বসংস্কার বসত ধারণা থেকে পাঁচপীরের কল্পনা করা হয়েছে। ঠাকুরগাঁও এর এই মাজারটিও একই ধারায় সৃষ্টি হয়েছে বলে অনুমিত হয়।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল – হিন্দু, মুসলমান ও উপজাতিসহ সব স্তরের মানুষ এই পীরের প্রতি শ্র্দ্ধাশীল। প্রকৃত পক্ষে এই মাজারে পেছনে কোন ঐতিহাসিক সূত্র খুজে পাওয়া যায় না। সবই গড়ে উঠেছে লোককাহিনীর আকারে। পাচঁপীরের কোন রেকর্ডকৃত জমি নেই। মাজারের জমির মালিক পার্শ্ববর্তী শিংপাড়ার বাসিন্দা মাজেদ আলী বিশ্বাস করেন যে, মাজারটি আছে বলেই তার জমিতে বেশী আবাদ হয়। তাই তিনি সাধ্যমত জিনিস পত্র টাকা পয়সা প্রতিবছর মাজারের উদ্দেশ্যে দিয়ে থাকেন বলে গ্রামের কয়েকজন জানাল।
সবার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল অসংখ্য অলৌকিক ঘটনার কথা। এই গ্রামের ৩৫ বছর বয়সী স্বল্পশিক্ষিত জবেদা জানাল – মাজারের পার্শ্বের জমিতে একদিন দেবর-ভাবী এক সঙ্গে ক্ষেতে ধান কাটছিল। এমন সময় কুদৃষ্টিতে ভাবীর দিকে তাকালে সঙ্গে সঙ্গে দেবরের চোখ ফুলে যায়, রাত হতে না হতেই সে আর দেখতে পায় না। এর পর পীর তাকে স্বপ্নে কৃতকর্মের জন্য মাফ চেয়ে মানত করতে বলে। পরের দিন সে পীরের উদ্দেশ্যে একটি মোরগ এনে দিলে ধীরে ধীরে তার চোখ ভাল হয়ে যায়। ভক্তদের হৃদয়ের বদ্ধমূল ধারণা পীরের সাথে কোন প্রকার প্রতারণা বা বেয়াদবীর আশ্রয় নিলে তার পরিনতি হবে ভয়াবহ। ভক্তিপ্রবণ বাঙালি লোকমানসের এই বিশেষত্ত্বের কারণেই লোকধর্ম বিকাশের ধারা আজও সক্রিয় রয়েছে।
লোকধর্মে পীরের থান : ঘোড়াপীর
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর ইউনিয়নের চৌধুরী হাট থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে মোজাদি পাড়া গ্রামে কাচা রাস্তার ধারে অবস্থিত ঘোড়া পীরের থান। এই থানে চারটি পিরামিড আকৃতির দুই ফিট লম্বা মাটির ঢিবি রয়েছে। প্রতিটি ঢিবির সামনে রয়েছে ৪/৫টি সারিতে প্রায় সাতশটি মাটির তৈরি ঘোড়া। ঘোড়াগুলো বিভিন্ন আকৃতির। ছোটটি উচ্চতায় ৫ ইঞ্চি। বড়টি প্রায় ১০ ইঞ্চি।
থানের আশেপাশের জনগণ অধিকাংশ মুসলমান সম্প্রদায়ের। কিছু রয়েছে নিু বর্ণের হিন্দু। কথা হল থানের তত্ত্বাবধায়কসহ সকল স্তরের মানুষের সঙ্গে। সকলে ঘোড়াপীরের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধাশীল। এলাকার লোকজনের বিশ্বাস এই পীর মানুষের চোখের আড়ালে জীবন যাপন করে। সে কখনো মরে না।
উল্লেখ্য যে, ঠাকুরগাঁও এর যে কোন থানের তত্ত্বাবধায়ক ‘মাড়েয়া’ হিসেবে পরিচিত। তেমনি ঘোড়া পীরের মাড়েয়া ৬৫ বছর বয়সী স্বাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন রিজিয়া জানালেন- এই থানের সমস্ত ঘোড়াই লোকজনের মানতের ঘোড়া। কার্তিক মাসে কালীপূজা উপলক্ষ্যে পার্শ্ববর্তী টাংগন নদীর অদূরেই বাসিয়াদেবীর মেলা বসে। মেলায় নানা রং ও আকৃতির মাটির ঘোড়া বিক্রি হয়। সেই ঘোড়া মানতকারীরা কিনে এনে পীরের সামনে বসিয়ে দেয়। এই থানে মাঝে মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয় ‘ধামালী’১৮ অনুষ্ঠান। স্থানীয় ৪৫ বছর বয়সী গৃহিনী তাহেরনের বর্ণনা মতে, লোকসমাজের প্রায় সবাই বিয়ের আগে পীরের থানে এসে মাটির ঢিবি গুলোকে দুধ-কলা দিয়ে ধুইয়ে দেয়। তাদের গভীর বিশ্বাস এর ফলে তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের হয়। এছাড়া খাৎনা-আকিকাসহ যে কোন অনুষ্ঠানের আগে দাওয়াতের প্রথম খাবারটি দিয়ে যায়। নইলে তাদের অকল্যাণ হয়। মাজারের পার্শ্বে টাংগন নদী। সেখানে ট্রাক্টরে বালু তুলছিল শ্রমিকরা। সেই ট্রাক্টরের ড্রাইভার জানাল, নদী থেকে বালু নিয়ে আসার সময় কখনো গাড়ী না উঠলে তারা পীরের কাছে মাটির ঘোড়া মানত করলে গাড়ী আবার উঠে আসে।
এছাড়া রোগে-শোকে, বিপদে-আপদে কোন জিনিস হারিয়ে গেলে বা সন্তান হাটতে না পারলে পীরের উদ্দেশ্যে মাটির ঘোড়া মানত করে। লোকসমাজে ‘ঘোড়াপীরের সংস্কারটি যাদু বিদ্যার প্রভাবজাত। ঘোড়া দূতগামী প্রাণী। খোঁড়া ব্যক্তির ঘোড়ার মত চলতে পারবে এরুপ কামনা এতে সংগুপ্ত।’১৯
যুগযুগ ধরে এই থান এলাকার লোকজীবনে প্রচণ্ড প্রভাব বিস্তার করে আছে। এই পীর কোথা থেকে কিভাবে, কখন এখানে এসেছিলেন তার ঐতিহাসিত কোন সূত্র খুজে পাওয়া যায় না। সবই গড়ে উঠেছে কাহিনী কিংবদন্তির আকারে।
মাদর পীর :
ঠাকুরগাঁও পঞ্চগড় মহাসড়কের বোর্ড অফিস নামক স্থান থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে কাচা রাস্তার ধারেই মাদার পীরের থান অবস্থিত। থানটি সিমেন্ট দিয়ে ৫/৬ ফিট উচ্চতায় বাঁধানো। অনুমিত হয়,এই পীরের নামানুসারেই এই মৌজার নাম হয়েছে মাদারগঞ্জ। পাচঁপীরের ন্যয় বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে মাদার পীরের থানের সন্ধান পাওয়া যায়। মাদার পীর বাংলাদেশে কখনো এসেছিলেন কি না তার তেমন কোন ঐতিহাসিক প্রমান পাওয়া যায় না। তবে মধ্যযুগীয় পুঁথি সাহিত্যে ‘দমমাদার’ সম্পর্কে বলা হয়েছে-আল্লাহর ফেরেস্তা হারুত ও মারুত যথাক্রমে মানব মানবীর রূপ নিয়ে পৃথিবীতে আসেন ভোগ কামনায়। মাদার তাদেরই সন্তান। পুঁথি সাহিত্যের মাদারের কথা এসেছে এভাবে-
খেচিয়া উঠিল মাদার ব্রহ্মতালু হৈতে
দম মাদার বলিয়া নাম রহিল দুনিয়াতে।
দমেতে খেচিয়া মাদার দম মাদার হৈল
কালে কালে সেই নাম জাহের রহিল।
অনুমিত হয়, পুঁথি সাহিত্যের এই প্রাবল্যে দম মাদার বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় ঠাকুরগাঁও-এ মাদারপীর হিসেবে লোকপূজ্য হয়ে আসছে। অবশ্য স্থানীয় এক প্রবীণ ব্যক্তি জানালেন, থানের কাছে একটি মাদারের গাছ ছিল। এই গাছের নামানুসারেই পীরের নাম করণ হয়েছে-‘মাদারপীর’। বর্তমানে মাদারের থান তত্ত্বাবধান করে ২৫ বছর বয়সী আনোয়ার হোসেন। সে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। থানের ১০ গজ দূরে রয়েছে তার মুদিখানার দোকান।
আনোয়ার হোসেন জানাল-মনোবাঞ্ছা পূরণের জন্য প্রতিদিন লোকজন দুধ, কলা, আগরবাতি, মোমবাতি, টাকা ইত্যাদি দিয়ে মানত পূরণ করে। পাশ্বের রাস্তা দিয়ে কেউ গরু ছাগল বিক্রি বা কিনতে গেলে পীরের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে হাটে যায়। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল এই থানে মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকেরা সাধারণত আগরবাতি, মোমবাতি, সিন্নি ও টাকা-পয়সা মানত করে। আর স্থানীয় উপজাতিরা মানত করে বিভিন্ন খাদ্য দ্রব্য। কিন্তু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা জৈষ্ঠ্য মাসে মৌসুমী ফল পাকলে কলা গাছের খোলে ফলমুল, দুধ, চিনি ও পায়েস নিয়ে বাঁশি, ঢোল ও কাঁশী বাজিয়ে থানের চারদিক ঘুরতে থাকে। প্রত্যেকটি থেকে কিছু অংশ থানের উপর দিয়ে কলার খোলসহ পার্শ্বেই প্রবাহিত সেনুয়া নদীতে ভাসিয়ে দেয়।
এই থান নিয়ে নানা লোককাহিনী প্রচলিত আছে। ৬৫ বছর বয়সী বেলাল হোসেন জানাল, একদিন সে একটু নাপাক অবস্থায় থানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, এমন সময় কোন ঝড় বৃষ্টি ছাড়াই পার্শ্ববর্তী আমগাছের ডাল ভেঙ্গে তার সামনে পড়ে।
অখতপীর :
মাদারপীরের থানের অদূরেই দক্ষিণ দিকে রয়েছে আরেকটি থান। এ থানের নাম অখত পীরের থান। থানের উপরে রয়েছে একটি বড় প্রস্তর খণ্ড। থানের আশেপাশের লোকজন এতে মনোবাসনা ও বিপদ-আপদ থেকে রক্ষার জন্য মানত করে থাকে। এই পীরের নামেই গ্রামের নাম হয়েছে অখত পীরের ডাঙ্গা।
এই পীর সম্পর্কে কিংবদন্তিমূলক লোককাহিনী আছে যে, থানের পাথরটি একবার হারিয়ে যায়। কোথাও খোঁজাখুঁজি করে পাওয়া না গেলে পীর স্থানীয় এক ছোট ছেলেকে স্বপ্নে পাথরের সন্ধান জানিয়ে দেয়। পরে ছেলেটির কথা মত পার্শ্বের সেনুয়া নদী থেকে আবার তুলে এনে স্থাপন করা হয়।
পার্শ্বের গ্রামে বুড়াপীর নামে আরেকটি থান লক্ষ্য করা যায়। এই পীরকে নিয়েও লোকমানসের ব্যাপক প্রভাব এবং নানা কাহিনী ও কিংবদন্তি স্থান করে আছে।
খোয়াজ খিজিরের পীর :
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ভূল্লী বাজার থেকে ৫ কিমি পশ্চিমে পাকা রাস্তার ধারেই খোয়াজ খিজিরের দীঘির পাড়েই ‘খোয়াজ খিজিরের পীর’ এর থান অবস্থিত। থানটি সিমেন্ট দিয়ে পাকা করা। এই এলাকার অধিকাংশ মানুষ মুসলমান সম্প্রদায়ের। কিছু রয়েছে নিু বর্ণের হিন্দু।
লোকসংস্কৃতির অঙ্গনে খোয়াজ খিজির একটি পরিচিত নাম। ‘আরবীয় পৌরানিক দরবেশ খাজা খিজির বাংলাদেশে খোয়াজ খিজির বা খোয়াজ পীর নামে পরিচিত। তিনি সর্বত্র পানির মালিক হিসেবে পরিগণিত ও সম্মানিত হয়ে আসছে।’২০ মধ্যযুগীয় পুঁিথ সাহিত্যেও খোয়াজ খিজিরকে আধ্যাতিক গুরু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় শতাধিক বছর আগে এখানে জমিদারের এক নায়েব এসেছিলেন। তিনি ছিলেন বুজুর্গ-কামিল ব্যক্তি। তবে লোকসমাজে তাকে নিয়ে কিংবদন্তিমূলক কাহিনী প্রচলিত আছে যে, এলাকার কোন লোকের বাড়ীতে দাওয়াত করার প্রয়োজন হলে পুকুরের কাছে গিয়ে সন্ধ্যা বেলায় প্লেট চাইলে সকাল বেলা পুকুরের ধারে প্লেট এসে জমা থাকত। আবার প্লেট ভাল করে ধুয়ে পুকুরের কাছে রেখে আসলে রাতে তা পুকুরের ভেতরে চলে যেত। বর্তমানে স্থানীয় হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ বিপদ-আপদে, ক্ষয়-ক্ষতিতে সিন্নি মানত করে থাকে।
কদম রসুলের পীর :
খোয়াজ খিজিরের পীরের থান থেকে দুই কিলোমিটার দক্ষিণে কদম রসুলের পীরের থানা অবস্থিত। পীরের নামে এখানে হাট গড়ে উঠেছে। থানের পার্শ্বে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। এই থানকে নিয়ে রয়েছে নানান কিংবদন্তি। লোকসমাজের বদ্ধমূল ধারণা রাসুল মুহম্মদ (স) কোন এক সময় এখানে এসেছিলেন। এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল এই থানে এক সময় মুহম্মদ (স) এর পদচিহ্ন অঙ্কিত পাথর ছিল। পরে সেটি চুরি হয়ে যায়। তবে বর্তমানে থানে সিমেন্ট দিয়ে অঙ্কিত একটি পদচিহ্ন রয়েছে।
হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ এই পীরের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধাশীল। প্রতি বছর বৈশাখ মাসে এখানে দিনব্যাপী মানত পালনের অনুষ্ঠান করা হয়। এতে সিন্নি, টাকা পয়সা, কবুতর ইত্যাদি দিয়ে উভয় সম্প্রদায়ের লোকজন মনোবাসনা পূরণের জন্য মানত করে।
জুড়াপীর :
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার গড়েয়া হাট থেকে ৩/৪ কিলোমিটার পশ্চিমে ভূল্লী-গড়েয়া পাকা রাস্তার ধারে অবস্থিত জুড়া পীরের থান। থানের চিহ্ন হিসেবে বর্তমানে সেখানে রয়েছে শুধু একটি ছোট শেওড়া গাছ। নেই কোন তত্ত্ববধায়ক, নেই কোন ঘর। তবুও লোকসমাজে এই পীরের রয়েছে অসম্ভব প্রভাব। এটি লক্ষ্য করা যায়, কার্তিক মাসে গড়েয়া হাটের অদূরেই গরু মহিষের কালীমেলা বসলে রুহিয়া, বড়গাঁও, আউলিয়াপুর, বালিয়া, মুন্সীরহাট, ভূল্লী প্রভৃতি এলাকার লোকসমাজের কৃষক-মজুররা এই রাস্তা দিয়ে গরু-মহিষ মেলায় নিয়ে যায়। তারা প্রত্যেকেই মেলায় যাবার সময় পীরের সন্তুষ্টির জন্য থানের সামনে খড় পেঁচিয়ে ‘জুড়া’ তৈরী করে তা থানের উপরে দিয়ে যায়।
লোকমানসের বদ্ধমূল ধারণা যে, পীরের সন্তুষ্টির জন্য জুড়া দিয়ে গেলে গরু-মহিষ ভাল দামে বিক্রি হবে।
লোকধর্মে দেব-দেবীর থান : সন্ন্যাসী ঠাকুরের থান
ঠাকুরগাঁও পঞ্চগড় মহাসড়কের বোর্ড অফিস নামক স্থান থেকে পশ্চিমে কাচা রাস্তা ধরে ২০ গজ দূরেই রাস্তার পার্শ্বে ৭০ বছর বয়সী দছিমউদ্দীন এর বাড়ীর সামনে ‘সন্ন্যাসী ঠাকুরের থান’ অবস্থিত।
থানটির চার দিকে বাঁশের বেড়া ও উপরে মাটির টিন। ভীতরে কোন মূর্তি নেই তবে রয়েছে সাতটি ছোট ছোট মাটির ঢিবি। থানটি বাড়ীর মালিক দছিমউদ্দীন ও তার স্ত্রী তফেজা দেখাশুনা করেন। আশেপাশে অধিকাংশই মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। স্থানীয় লোকসমাজ গভীর ভয়-ভীতি-শ্রদ্ধা-সংস্কারে সন্ন্যাসী ঠাকুরকে মেনে চলে। রোগে-শোকে, বিপদে-আপদে এবং গরু ছাগল হারিয়ে গেলে সন্ন্যাসী ঠাকুরের থানে ধান, চাল, টাকা-পয়সা, সিন্নি ইত্যাদি মানত করে।
বাড়ীর মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তিনি ও তার স্ত্রী গরুর মাংশ খান না। কারণ তাদের বিশ্বাস উক্ত ঠাকুর গরুর মাংশ পছন্দ করেন না। এমনকি ঠাকুরের সম্মানে তারা ঈদে গরু কুরবানী করেন না, করেন খাসি কুরবানী।
সন্ন্যাসী ঠাকুরকে নিয়ে এলাকায় নানা লোককাহিনী প্রচলিত আছে। স্থানীয় এক প্রবীণ ব্যক্তি জানাল, এই ঠাকুর অত্যন্ত শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান। একবার একজন রিক্সাওয়ালা থানের পার্শ্বে শিমুল গাছের গোড়ায় প্রসাব করে। পরে রিক্সা নিয়ে রাওনা দিলে সে পার্শ্বের পুকুরে পড়ে যায়। এরপর সে ঠাকুরের কাছে মাফ চেয়ে মানত না করা পর্যন্ত পুকুর থেকে রিক্সা তুলতে পারে না।
কানী বিষহরীর থান :
ঠাকুরগাঁয়ের অসংখ্য স্থানে মুসলমান লোকসমাজে ‘কানী বিষহরীর থান’ লক্ষ্য করা যায়। এ রকম একটি থান পার্শ্বের গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি আবুল কাশেমের বাড়ীর রাস্তার পার্শ্বে অবস্থিত। এই থানটি আগে তার বাড়ীর আঙ্গীনায় ছিল। পরে ১৯৭০ সালে এটি লোকসমাজের সবাই একত্রিত হয়ে ঢাক ঢোল বাজিয়ে রাস্তার ধারে নিয়ে স্থাপন করে। বর্তমানে এর চারিদিকে বাঁশের বেড়া, উপরে টিনের চালা। বিপদে-আপদে, রোগে-শোকে মানত করা ছাড়াও গ্রামবাসী সার্বিক মঙ্গল কামনায় প্রতিদিন থানে চিড়া, দুধ, কলা, চিনি, বাতাসা (এক প্রকার মিষ্টান্ন) ইত্যাদি দিয়ে পূজা করে।
এ থান নিয়েও এলাকার জনমনে রয়েছে নানা রহস্যময় কল্পকাহিনী। প্রকৃত পক্ষে এ অঞ্চলের নিু বর্ণের ধর্মান্তরিত মুসলমান তাদের আদিম ঐতিহ্যকে পরিহার করতে না পেরে সৃষ্টি করেছে লোকধর্মের।
জান্নাহানী :
ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় মহাসড়কের ১১ মাইল নাম স্থান থেকে ১ কি.মি পশ্চিমে সদর উপজেলার দেবীপুর ইউনিয়নের ভেলাইপুকুরের পাড়ে প্রতি বছর বৈশাখ মাসের ৩য় শনিবার মানত পালন উপলক্ষে দিনব্যাপী ‘জান্নাহানী’ মেলা বসে। এটি ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের লোকধর্ম পালনের একটি বিস্ময়কর ক্ষেত্র। উল্লেখ্য যে, জান্নাহানী শব্দটি জান্নাহানি শব্দের অপভ্রংশ ‘জান্না’ শব্দটি ‘জানান’ বা মহিলা থেকে এবং হানী শব্দটি হাটি বা হাট থেকে উৎপত্তি। অনুমতি হয়, এই মেলায় মহিলাদের আগমন বেশী ঘটে। তাই এর নাম করণ হয়েছে জান্নাহাটি>জান্নাহানী, অথবা মেলায় মানত পালন উপলক্ষে‘দেহরী’ ব্যক্তিটি মহিলার বেশ ধারণ করে বলে এর নাম করণ হয়েছে ‘জান্নাহনী’।
জান্নাহানীর পার্শ্বেই পঞ্চগড় এর আটোয়ারী উপজেলার বলরামপুর গ্রাম। আশেপাশে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। জান্নাহানীতে স্থাপিত হয়েছে পাশাপাশি দুই কক্ষবিশিষ্ট দুটো স্থায়ী মন্দির। মন্দিরের ফটকদ্বয়ে লেখা আছে ‘ওঁমা কালী’ ও ‘চণ্ডী কালী’। পার্শ্বেই অস্থায়ীভাবে নির্মিত মাদারপীরের থান। মন্দিরের সামনে একটি প্রাচীন বটবৃক্ষ।
মেলায় গিয়ে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল- এক সপ্তাহ আগেই মেলার পার্শ্বেই ‘দেহরী’র বাড়ীতে মুর্তি তৈরী করা হয়। মেলার নির্ধারিত দিনে সকালে দেহরীর বাড়ী থেকে বিভিন্ন ধরনের ফলমূল, আতপচাল, চিড়া, দুধ, দই, মিষ্টি, খৈ, মুরকী, ধুপধুনা, আগরবাতি, ঘাস, ফুল, বেলপাতা একসঙ্গে একটি বড়পাতিলে নিয়ে ঢোল, খোল, বাঁশিসহ বাজনা পার্টির বাজনার তালে ভেলাইচণ্ডী কালীর মূর্তি কাধে নিয়ে স্থানীয় লোকসমাজের বিভিন্ন বয়সের শতশত মানুষ দলবদ্ধভাবে এসে মন্দিরে মূর্তি স্থাপন করে। কিছু পূজার্চনার পরেই শুরু হয় দেহরীর নৃত্য ও মানত পর্ব। সকালে মেলায় গিয়ে দেখা গেল-স্থানীয় ও দূরদুরান্ত থেকে আগত হাজার হাজার নারী পুরুষে মেলা কানায় কানায় ভরপুর। মেলায় আগত পুরুষদের তুলনায় নারীরাই বেশী ‘দেহরী’র সামনে গিয়ে নানা রোগ-শোক, বিপদ-আপদ থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় একে একে গিয়ে মানত করছে। রোগমুক্তি বা মনোবাসনা পূরণ হলে পরের বছর একই দিনে তা পূরণ করবে। মানত হিসেবে তারা রুপার মেডেল, টাকা, ধূতি, লুঙ্গী, ছাগল, পাঁঠা, মুরগী, কবুতর ইত্যাদি দিয়ে থাকে। এভাবে দিনব্যাপী চলে আগত লোকসমাজের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মানত পালন। এদের মধ্যে অধিকাংশই দেবীর সামনে গিয়ে এবং পার্শ্বের মাদারপীরের থানে ভক্তিভরে মাথা নত করছে। জান্নাহানী, ভেলাইপুকুর ও প্রাচীন বটবৃক্ষটি সম্পর্কে এ অঞ্চলে রয়েছে নানান কিংবদন্তিমূলক লোককাহিনী। এর আটদিন পরে চতুর্থ শনিবার একই ধরণের অনুষ্ঠান পার্শ্বের গ্রামের ক্ষেত্র মোহনের বাড়ীতে অনুষ্ঠিত হয়।
স্থানীয় প্রবীণরা জানাল, জান্নাহানীর এই লোকাচার পালন শতবছর পূর্ব থেকে এ অঞ্চলে পালিত হয়ে আসছে। শাস্ত্রীয় ধর্মের কাছাকাছি থেকে সর্বজনীন এই আচার পালন এ অঞ্চলের লোকধর্মের একটি উজ্জল দৃষ্টান্ত।

গ্রাম ঠাকুরের থান :
বাংলার লোকসমাজে গ্রাম ঠাকুর একটি পরিচিত নাম। গ্রামের মানুষের দুঃখ-যন্ত্রনা ও ক্ষয় ক্ষতি থেকে পরিত্রাণের প্রত্যাশায় গ্রামবাসী গড়ে তোলে গ্রাম ঠাকুরের বিশ্বাস ও আচার-সংস্কার। ঠাকুরগাঁও এর গ্রাম-গঞ্জে এ রকম অসংখ্য গ্রাম ঠাকুরের থান লক্ষ্য করা যায়। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বড়গাঁও ইউনিয়নের কেশুরবাড়ী গ্রামে ‘গ্রাম ঠাকুর’এর থানে আচার পালন অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ ঘটে। এই গ্রামে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। থানটি গ্রামের পার্শ্বে ধান ক্ষেতের মাঝখানে অবস্থিত। থানটিতে এই গ্রামের বাসিন্দা নির্মলা প্রতি সন্ধ্যায় বাতি ও ধূপধূনা জ্বালিয়ে দেয়। বৈশাখের শেষে যে কোন শনিবার বিশেষ পূজাপালন ও দেহরীর মাধ্যমে গ্রামের মানুষের বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি কল্পনা করা হয়।
‘দেহরী’ বাজনার তালে তালে বড় আকারের পাঁঠা বলির ছুরি হাতে নিয়ে আগত গ্রামবাসীর সমস্যা শুনে মানত দেয়ার শর্তে সমাধান করে দেয়ার আশ্বাস দেন। মানত হিসেবে তারা রুপার পদুকা, টাকা, পাঁঠা, কবুতর ইত্যাদি দিতে রাজি হয়। এ অনুষ্ঠানে আশে পাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে আগত ভক্তদের সমাগম ঘটে। ভক্তদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমানসহ উপজাতিদেরও মানত করতে দেখা যায়।
বস্তুত প্রাচীন বাঙালির দেবকল্পনায় গ্রাম দেবতা বা গ্রাম ঠাকুরের একটা বিশেষ স্থান ছিল। ‘গ্রামের বিভিন্ন থান বা স্থানে এঁরা পূজিত হতেন। গ্রামবাসী তাদের মঙ্গলাকাক্সক্ষায় ভয়-ভক্তিতে মানত করত এবং গ্রাম দেবতার সন্তুষ্টিতে বিভিন্ন পাঁঠা বলি দিত।২১ এরই ধারায় আজও এ অঞ্চলের লোকজীবনে তা টিকে আছে।
চৌদ্দহাত কালী :
ঠাকুরগাঁও শহর থেকে আড়াই কিলোমিটার পূর্বে ঠাকুরগাঁও-গড়েয়া পাকা সড়কের পার্শ্বে অবস্থিত চৌদ্দহাত কালী মন্দির। মন্দিরের আশেপাশে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। কিছু রয়েছে আদিবাসী সম্প্রদায়ের। ‘মন্দিরের পার্শ্বেই সেলুনের মালিক ৫১ বছর বয়সী রাজেনের ভাষ্য মতে- কালী দেবীর প্রতি লোকসমাজের সকলের রয়েছে সমান শ্রদ্ধা। এই মন্দিরে প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মানুষ আসে মানত করতে। মানত হিসেবে দেয় ঘরের টিন, কেউ সোনার মেডেল, কেউ রুপার, কেউ দেয় কবুতর অথবা পাঁঠা। এই কালী দেবীকে নিয়ে এ অঞ্চলে প্রচলিত রয়েছে নানা কিংবদন্তিমূলক লোককাহিনী।
সত্তর বছর বয়সী জোহরা বেগমের ভাষ্য-এই দেবীকে যে অবহেলা করে সে সহজে বাঁচে না। একবার পূজা চলাকালীন সময়ে ধামের গান ও কালী দেবীকে দেখতে এসে এক ব্যক্তি কালীর দাঁত ও আকৃতি দেখে অবহেলা করে এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং সঙ্গে সঙ্গে তার নাকমুখ দিয়ে রক্ত বের হয়ে মারা যায়। এ বছর জোহরা বেগম নিজে পায়ের ব্যথার জন্য রুপার পদুকা ও কবুতর মানত করেছে।’২২
ঠাকুরগাঁও সদরের ঢোলকালী হাটে কালীর মন্দিরেও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে রোগ-শোক, বিপদ-আপদ থেকে মুক্তির আশায় মানত করার রীতি লক্ষ্য করা যায়।
বাংলার লোকজীবনে কালী দেবীর প্রতি ভয়-ভক্তির সংস্কার প্রাচীন কালের। হিন্দু শাস্ত্রীয় ধর্মে কালীর নানা দৈবশক্তির বর্ণনা আছে। এর প্রভাব বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় ঠাকুরগাঁও এর হিন্দু সমাজে যেমন বিদ্যমান তেমনি মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকজীবনেও রয়েছে এর প্রতি প্রচণ্ড ভয়-ভক্তি-বিশ্বাস।
প্রকৃতপক্ষে এ অঞ্চলের মুসলমানরা এক ঈশ্বরবাদী ইসলাম ধর্মের আদর্শ বহন করলেও হিন্দুর সঙ্গে দীর্ঘ দিনের একত্রবাস এবং মজ্জাগত সংস্কার বসত এসব আচার-সংস্কার পালন করে থাকে। যা এ অঞ্চলের লোকধর্মের একটি উল্লেখযোগ্য দিক।
বাংলাদেশ লোকধর্ম ধারা উৎপত্তির উদার ও সরস ক্ষেত্র। এ দেশে ধর্মীয় সমন্নয়ের মধ্যেও সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য লোকধর্মীয় সম্প্রদায়ের। ‘তার মধ্যে প্রধান সম্প্রদায়গুলো হলো- বৈষ্ণব, বাউল, সুফি, মতুয়া, মাইজভাণ্ডার, বলাহাড়ি, জগমোহনী, কিশোরী ভজন, ভগবানী, সৎসঙ্গী ইত্যাদি।’২৩ কিন্তু ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের লোকধর্ম স্বতত্র ধারায় বিদ্যমান। লোকজীবনের মনন উদ্ভূত, ইহলৌকিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সামষ্টিক ধর্মীয় সমন্নয়ের মধ্যে গড়ে উঠেছে এ অঞ্চলের লোকধর্ম। এ অঞ্চলের জনপ্রিয় লোকনাট্য ‘ধামগান’এ এর প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। এতে ‘লোকসমাজের নিজ ধর্মের কালী, গঙ্গা প্রভৃতির প্রতি যেমন বিশ্বাস প্রতিফলিত হয় তেমনি অন্য ধর্মের প্রতিও সমান আস্থা পরিলক্ষিত হয়। এ গানে পীর বন্দনার মাধ্যমে বাংলার লোকধর্মের প্রতি চিরায়ত বিশ্বাসের চিত্র ফুটে ওঠে।যেমনঃ একটি বন্দনা গানে শিল্পীরা গাইছে-
আজি যুগযামানা উল্টে গেছে, কলি যুগের কী নাম হবে
ঈশ্বরভক্তি গুরুর পূজা স্মরনে থাকে না ও কি মাগো মা।
পূর্বে বন্দনা করি ধর্ম মায়ের চরণ ধরি প্রণাম করি,
উত্তরে বন্দনা করি কালী মায়ের চরণ ধরি ও কি মাগো মা,
পশ্চিমে বন্দনা করি পীর সাহেবের চরণ ধরি প্রনাম করি,
দক্ষিণে বন্দনা করি গঙ্গা মায়ের চরণ বন্দি….. ।’২৪
গ্রামের মানুষ বিপদে পড়লে বা কোন উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য মানত করার প্রতি লোক সমাজের যে গভীর বিশ্বাস তার চিত্র ফুটে ওঠে এ অঞ্চলের একটি জনপ্রিয় ধামগান ‘চিলকীসরী ভাসুরবাউধিয়া’য়। যেমন – বৌদি(গানের সুরে) : আজি বিহা বিহা করেছি দেওরা বিহা তোর হয় না। তরে বাদে আজি দেওরা জিতুয়ারে মানা।’২৫
এ ছাড়া ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের লোকধর্মে সমন্নয়ের অনন্য দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করা যায় ‘কপালি সংগীতে’। এ সংগীতের প্রতি লোকসমাজের রয়েছে অসম্ভব ভক্তি-শ্রদ্ধা। ‘কপালিরা হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কৃষক পরিবারের আঙ্গিনায় গিয়ে গোহাল ঘরের সম্মুখে উপবেশন করে এবং খঞ্জরী বাজিয়ে সুললিত কন্ঠে সঙ্গীত পরিবেশন করতে থাকে।’২৬ এ সংগীতে মুসলমানের সত্যপীর ও হিন্দুর সত্যনারায়নের অনুরূপ মুসলমানের মানিক পীর, নাথ সম্প্রদায়ের গোরক্ষনাথ এবং হিন্দুর শিব দেবতাকে অভিন্ন সত্ত্বায় খুঁজে পাওয়া যায় । যেমন –
‘আল্লাহ আল্লাহ বল ভাইরে ইয়াদ আল্লাহ বল,
ঘরদমে আল্লাহর নাম নিতে কেন ভুল।……
ডাইনেতে প্রণাম জাইনে বামে খাড়া হইল,
গোরক্ষনাথের তবে কথা বলিতে লাগিল।….
ওমা শিব লক্ষ্মী তোমায় দিলে বর,
ধনে জনে বৃদ্ধি করুক ভোলা মোহেশ্বর।’২৭
ঠাকুরগাঁও অঞ্চলের লোকধর্মের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সমন্নয়ধর্মীতা ও লোকবিশ্বাসজাত কাহিনী কিংবদন্তির মাধ্যমে এবং এ ধারা লোকসমাজে আজও সক্রিয় রয়েছে। বিজ্ঞানের আশির্বাদে মানুষ যখন ‘জিনেটিক্স’ নিয়ে গবেষনা করছে বা তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে গোটা পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় পেয়ে গেছে, সেখানে বাংলার লোকসমাজ পীর বা কাল্পনিক দেবদেবীর থানে মাটির ঘোড়া,কবুতর,সোনা-রুপা ইত্যাদি মানত করে বা কূপের পানি খেয়ে রোগ-শোক থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় দিন গুনছে। লোকমানসের অন্ধ বিশ্বাসের এই দূরারোগ্য ব্যাধির নিরাময় একমাত্র বিজ্ঞানের কল্যানেই সম্ভব।

তথ্যসূত্র
১। নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস, আদিপর্ব, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৯৯৩, পৃ.৬০।
২। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, প্রথম খণ্ড, মডার্নবুক এজেন্সী প্রাঃ লিঃ কলিকাতা, ৪র্থ সংস্করণ, ১৯৮২, পৃ.৩৪।
৩। পূর্বোক্ত, পৃ.৩১।
৪। ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল, উত্তরবঙ্গের আদিবাসী লোকজীবন ও লোকসাহিত্যঃওরাওঁ, বিশ্বসাহিত্য ভবন, ঢাকা, ১৯৯৯, পৃ.৪১।
৫। স্বামী সোমেশ্বরানন্দ, ধর্ম কুসংস্কার ও লোকাচার, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৯৯৬, পৃ.২।
৬। গণমুক্তিপত্রিকা, নমব উদ্যোগ, মার্চ ২০০৮, ঢাকা, পৃ.২৬।
৭। অনুপম হীরা মণ্ডল, বাংলাদেশের লোকধর্মঃদর্শন ও সমাজতত্ত্ব, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ২০১০, পৃ.২৮।
৮। পূর্বোক্ত, পৃ.৩০।
৯। ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল, লোকসংস্কৃতির অঙ্গনে, আফসার ব্রাদার্স, ঢাকা, পৃ.৬০।
১০। পূর্বোক্ত, পৃ.৬১।
১১। পূর্বোক্ত, পৃ.৬১।
১২। পূর্বোক্ত, পৃ.৬২।
১৩। ওয়াকিল আহমদ, বাংলার লোকসংস্কৃতি, গতিধারা, ঢাকা, তৃতীয় সংস্করণ, ২০০৪, পৃ.২০৫।
১৪। পূর্বোক্ত, পৃ.২০৫।
১৫। রুকসানা খানম, টার্মপেপার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
১৬। ‘পাকপাঞ্জাতন’ নামে বটতলার পুঁিথতে হযরত মহম্মদ, বিবি ফাতেমা, হযরত আলী, ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেন কে পাকপাঞ্জাতন বলা হয়েছে। ওয়াকিল আহমদ, পূর্বোক্ত, পৃ.২২২।
১৭। পূর্বোক্ত, পৃ.২২২।
১৮। ‘ধামালী’ ঘোড়া পীরের থানে পালিত একটি আচার অনুষ্ঠান। এই পীর স্বপ্নে এলাকার লোকসমাজের কোন ব্যক্তিকে স্বপ্ন দেখায় ধামালী দেয়ার জন্য। তখন স্বপ্নে আদিষ্ট ব্যক্তিটি তুলারাশির কোন ব্যক্তিসহ লোক সমাজের শতশত মানুষ থানের উদ্দেশ্যে বাদ্য-বাজনা বাজাতে বাজাতে পীরের থানে এসে হাজির হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে থানের সামনে ধূপকাঠি ও মোমবাতি জ্বালানো হয়। একটি পাতিলে দুধ, কলা, চিড়া, মুড়ি, আতপচাল, চিনি ও মিষ্টি এক সঙ্গে মিশিয়ে মাটির ঢিবি গুলোর উপর ঢেলে দেয়। এরপর তুলারাশির ঐ ব্যক্তির উপর পীর ভর করে। যাকে স্থানীয় ভাবে ‘দেহরী’ বলা হয়। দেহরীর উপর পীর ভর করলে সে নাচতে থাকে এবং উপস্থিত শতশত লোক দেহরীকে নানা সমস্যার কথা একে একে বললে দেহরী তার সমাধানের আশ্বাস দেয়। বিনিময়ে দেহরী টাকা পয়সা অথবা মাটির ঘোড়া দাবী করে।
১৯। ওয়াকিল আহমদ,পূর্বোক্ত, পৃ.২৩৬।
২০। পূর্বোক্ত, পৃ.২২৪।
২১। অনুপম হীরা মণ্ডল, পূর্বোক্ত, পৃ.৫১।
২২। রুকসানা খানম, টার্ম পেপার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
২৩। অনুপম হীরা মণ্ডল, পূর্বোক্ত, পৃ.৭৪।
২৪। মোস্তাক অহমদ, প্রবন্ধ,বাংলার উত্তরাঞ্চলের প্রন্তিক জেলার লোকনাট্য : ধামগান,
দৈনিক লোকায়ন, ১০ অক্টোবর,২০০৯।
২৫। পূর্বোক্ত।
২৬। ড. মুহম্মদ আবদুল জলিল, পূর্বোক্ত, পৃ.১০৬।
২৭। পূর্বোক্ত, পৃ.১১১।
লেখাটি লিটল ম্যাগাজিন ‘চালচিত্রে’ প্রকাশিত।
আরও লেখা পড়তে চাইলে ভিজিট করুন – www.chalchitro.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here