বাংলাদেশ-ভারতের ছিটমহল : এক যে ছিল কাঁটাতারে জীবন। সসীম কুমার বাড়ৈ

0
199

বাংলাদেশ-ভারতের ছিটমহল : এক যে ছিল কাঁটাতারে জীবন

সসীম কুমার বাড়ৈ

ছিটমহল দর্শন
সালটা ১৯৯৩, তিনবিঘা আন্দোলনে অনেকটা শরতের পরশ লেগেছে। আমি এলাম তখন মেখলিগঞ্জে। না কোনো রাজকার্যে নয়, একজন সামান্য শিক্ষানবীশ সরকারি কর্মচারী হিসেবে আমার উত্তরবঙ্গে আগমন। তখনও কলকাতার খবরের কাগজ সৃষ্ট তিনবিঘা কেন্দ্রিক উত্তেজনা মাথায় গেঁথে ছিল। যার মধ্যে খানিকটা জাতীয়তাবাদ ও দেশের অখ-তার প্রশ্ন ছিল। অভিজ্ঞতার নিরিক্ষে তিনবিঘা, ছিটমহল নিয়ে তখনও আমরা নিজস্ব কোনো ধ্যান ধারণা ছিল না। মেখলিগঞ্জে তিস্তাপারে পি.ডব্ল.ডি-র ছোট একটি বাংলোয় আস্তানা জুটল। রোজ বিকালে তিস্তায় সূর্যাস্ত দেখতাম আর তিস্তার জল গড়ানো। একদিন সন্ধ্যাবেলা মহকুমা শাসক বললেন, চলো সসীম হলদিবাড়ি যাই। ওখানে বাংলাদেশ থেকে দহলা খাগড়াবাড়ি, কুচলিবাড়ি, পানিশলাসহ ৫টি ছিটমহলের অনেক মানুষ এসেছে। রাত গভীর, গিয়ে দেখলাম কতগুলো হতদরিদ্র মানুষ খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছে। তারা ভারতীয় নাগরিক, থাকে বাংলাদেশে ছিটমহলে। বাংলাদেশের স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে ঝামেলায় পালিয়ে এসেছে। মাথায় চেপে বসল ছিটমহল শব্দটা। পরে বুঝলাম মানুষগুলো আসলে ১৬২টি ছিটমহল নামক অস্তিত্বহীন রাজ্যের বাসিন্দা। আমার মধ্যে তিনবিঘা দেখার ইচ্ছা তীব্র হল। বাংলোর সামনে দিয়ে একটা বাস হাঁকতে হাঁকতে যায়-তিনবিঘা, কুচলিবাড়ি যাওয়ার শেষ বাস। ভাবতাম একদিন চড়ে বসবো তিনবিঘা যাওয়ার বাসে। শেষে সত্যিই সুযোগ এল, মেখলিগঞ্জ ব্লকের বি.ডি.ও শ্রী স্বরূপ পাল এই শিক্ষানবিশ প্রশাসককে নিয়ে চলল তিনবিঘা দেখাতে। প্রথম দর্শনে আমার প্রায় ভরকে যাওয়ার অবস্থা, আধুনিক সব অস্ত্রশস্ত্রসহ একদিকে বি.এস.এফ অন্যদিকে বি.ডি.আর। মাঝখানে ১৭৮ মিটার দৈর্ঘ্য ৮৫ মিটার প্রস্থ একফালি রাস্তা জুড়ে দিয়েছে বাংলাদেশি ছিটমহল দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা। ভারতের সর্বভৌমত্বকে অক্ষুণ্ন রেখে ৯৯৯ বছরের জন্য বাংলাদেশকে লিজ দেয়া হয়েছে। কিছু বাংলাদেশী মানুষ তখন লাউ-কুমড়ো, লাল ঝুঁটিওয়ালা মুরগি নিয়ে গেট খোলার অপেক্ষায়, দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা যাবে। এক ঘণ্টা পর পর গেট খোলে। এই সুযোগটুকু মিলেছে ২৬/০৬/১৯৯২ থেকে। তার জন্য মানুষগুলোকে অপেক্ষা করতে হয়েছে কত যুগ। গঙ্গা-পদ্মা-তিস্তায় গড়িয়েছে কত জল। দুই দেশের পেটের মধ্যে এখনও কত মানুষ বন্দি। তারা সব নেই রাজ্যের বাসিন্দা। চাক্ষুশ করলাম ছিটমহলের বিপন্নতা।

দাবার চালে গ্রাম
তিস্তাপাড়ের রাত ভাবনার কপাট খুলে দিত। ভাবতাম এই ছিটমহলের জন্মের ইতিহাস কী? না, সেই অর্থে কোনো লিখিত ইতিহাস নেই। তিস্তাপাড়ের রাজবংশী মানুষেরা কোচ রাজাদের মহিমায় আচ্ছন্ন, বিগলিত। তাদের কথায় ওঠে রূপকথার মত প্রচলিত ইতিহাস – কোচবিহারের মহারাজা ও রংপুরের রাজার (মতান্তরে ফৌজদার) ছিল দাবার নেশা। রাজায় রাজায় দাবা খেলা বলে কথা। এক প্রকার যুদ্ধের সমতুল। তবে বন্ধুত্বপূর্ণ দাবাযুদ্ধ। পাইক, পেয়াদা, বরকন্দাজ, বাবুর্চি, হলুইকারের দৌড়ঝাঁপ হুটোপুটি কী নেই এই যুদ্ধ কেন্দ্রিক। দুই রাজা ডুবে আছেন দাবায়। বাজি রেখেছেন আস্ত একটা গ্রাম। ধরা যাক কোচবিহারের রাজা জিতলেন অমনি তোপোধ্বনি বেজে উঠল, উড়ে গেল একটি সাদা পায়রা, সেই পায়রা রংপুরের যে গ্রামে নামল সেটি হয়ে গেল কোচবিহারের রাজার জায়গীর। তেমনি রংপুরের রাজা যখন জিতলেন তার পায়রা এসে নামল কোচবিহারে। এমনই ১১১টি গ্রাম জিতলেন কোচবিহারের রাজা আর রংপুরের রাজা জিতলেন ৫১টি। যদিও সংখ্যা নিয়ে কিছুটা দ্বিমত আছে। কোচবিহারের রাজবংশীরা গর্বিত, তাদের রাজার দাবা নৈপুণ্যে। রংপুরের রাজার গল্পের পায়রা বসেছিল পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন গ্রামে। রাজা-রাজায় মেকি-যুদ্ধে উলুখগড়ার মতো মরল কত সাধারণ মানুষ।
অবশেষে ইতিহাসের সমর্থন মিলল। দীর্ঘদিন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছিল কোচবিহার রাজ ও মুঘল সাম্রাজ্যের সাথে। মুঘলরা কিছু জেলাও নাকি দখল করে নিয়েছিল। ১৭১১ এবং ১৭১৩ সালে। দুই রাজত্বের মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি হয়েছিল, উভয় পক্ষ সীমান্তের স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে সম্মত হয়েছিল। সম্ভবত কোচরাজ রূপেন্দ্র নারায়ণ-এর সাথে এই চুক্তি হয়েছিল। কারণ ২১ বছর শাসন শেষে তিন ১৭১৪ সালে মারা যান। রক্তবন্যা এড়ানো গেল। সীমানা অপরিবর্তিত থাকল এবং তখন থেকেই ছিটমহলের অস্থিত্ব নথিভূক্ত হল।

কাঁটাতারে জীবন
ততদিনে চাকরিতে গায়ের থেকে শিক্ষানবিশত্ব ঘুচেছে ১৯৯৪-এ। পোস্টিং পেলাম সিতাই ব্লকে বি.ডি.ও হিসেবে। ব্লকটি দিনহাটা মহকুমার বলতে গেলে বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপ। পুবদিকে মানসাই নদী। উত্তর-পশ্চিম কোণে শীতলখুচি ব্লক বাকি আড়াই দিকে বাংলাদেশের সীমানা। কোচবিহার জেলায় এমন বিচ্ছিন্ন জায়গা আছে বলে আমার ধারণা ছিল না। গিয়ে শুনলাম সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া শুরু হয়েছে, স্থানীয় প্রশাসক হিসেবে আমারও একটা ভূমিকা আছে। দেশভাগ হয়েছিল আগেই এবার যে মাতৃভূমিকে বেড়া দিয়ে পাকাপাকি ভিন্ন করে দেওয়া। আস্তে আস্তে মাথা তুলল কাঁটাতারের বেড়া। তাতে অনুপ্রবেশ, চোরাচালান হয়ত সামান্য আটকানো গেল কিন্তু বৃদ্ধি পেল বেদনার চর, বিশেষ করে ছিটমহলের বাসিন্দাদের বুকে। ছিটমহলের উৎপত্তির ইতিহাস যাই হোক না কেন ১৯৪৭, ১৫ আগস্ট পর্যন্ত বাসিন্দাদের সেই অর্থে বিশেষ কোনো সমস্যা ছিল না। ১৭৫৬ সালে ব্রিটিশদের কাছে মুঘলদের পরাজয়ের ফলে ক্রমান্বয়ে সিন্ধু থেকে বঙ্গদেশ চলে যায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে। তখন ছিটমহলের গ্রামগুলি ছিল স্বাবল¤ী^, রাষ্ট্রীয় সীমারেখার জটিলতা ছিল না। পাসপোর্ট ব্যবস্থা ছিল না। এক দেশের মানুষ অনায়াসে অন্য দেশে প্রবেশ করতে পারত। তাছাড়া কোচবিহার ছিল ৬০০ প্রিন্সলি ইস্টেটের একটি অন্যতম রাজ্য। যা ভারতের অন্তর্ভূক্ত হয় দেশভাগের পরে। ২৮ আগস্ট ১৯৪৯ সালে ভারতের গভর্ণর জেনারেল ও কোচবিহার মহারাজ জগদীপেন্দ্র নারায়ণ-এর সাথে চুক্তি বলে ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৯ থেকে কোচবিহার ভারতের অন্তর্ভূক্ত হল। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে স্থিতাবস্থায় রয়ে গেল ছিটমহলগুলো। বাসিন্দারা থাকে যে দেশে সে দেশের তারা নাগরিক নয় আবার যে দেশের নাগরিক সে দেশে প্রবেশ প্রায় দুরূহ। ফলে ছিটমহলগুলোর মানুষের নাগরিক অধিকার বলতে যা বোঝায় তা কিছুই রইল না। তাদের ভোটাধিকার ছিল না, খাদ্য-বস্ত্র-আশ্রয়ের কোনো সংস্থান ছিল না। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিদ্যুৎ, পরিকাঠামোহীন এক অন্ধকার রাজ্যের বাসিন্দা হয়ে রইল তারা। জীবনের ন্যুনতম নিরাপত্তা ছিটমহলে ছিল না। মধ্যদিয়ে ছিটমহলগুলো হয়ে দাঁড়াল আন্তর্জাতিক অপরাধীদের মুক্তাঞ্চল। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের এক্তিয়ার ছিল না কোনো সমস্যারই সমাধান করার যেহেতু ছিটমহল মানে ঘরের মধ্যে বিভুঁই। সমস্যা আরো গভীর করে তুলল কাঁটাতার। কাঁটাতারের বেড়া কার্যত তাদের নিজেদের দেশে যাতায়াতের স্থায়ী অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল। কাঁটাতারে বন্দি মানুষ, বন্দি ছিটমহল। সিতাই অবস্থানকালে দেখেছি কাঁটাতারে ঝুলন্ত কত লাশ। হতভাগ্য ছিটমহলবাসী কাঁটাতার ডিঙোতে গিয়ে বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে ঝুলে থাকত কাঁটাতারে।
কাঁটাতারের বিপন্নতা শুধু ছিটমহলবাসীদেরই ছুঁলো তা নয়, সীমান্তে বসবাসকারী অনেক ভারতীয়দের জীবনও করে তুলল দুর্বিসহ। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে সীমান্ত রেখার ১৫০ মিটারের মধ্যে কোনো রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো নিমাণ করা যায় না। ফলে সীমান্ত রাস্তা ও কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হল সীমান্তরেখার ন্যুনতম ১৫০ মিটার ছেড়ে। সীমান্তরেখা মূলত বক্রাকৃতি। ফলে অনেক জায়গায় প্রায় ভূখ- থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তাদের মূল ভূখ-ে চলাচল নিয়ন্ত্রিত, বি.এস.এফ-এর মর্জি নির্ভর। চোরাচালানকারীদের উৎপাত, নাগরিক পরিষেবাহীন বিচ্ছিন্নতা সীমান্তে দৈনন্দিন সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। সন্ধ্যা ৬টায় কাঁটাতারের গেটে তালা পড়ে যায়, খোলে সকাল ৬টায়। এই সময় তাদের জন্ম-মৃত্যুর সাক্ষী পর্যন্ত কেউ থাকে না। নিরাপত্তাহীন জীবন। ফসল আর নারী রক্ষা পায় দুস্কৃতকারীর দয়া দাক্ষিণ্যে। তাদের অন্তহীন কান্না ছিটমহল বাসিন্দাদের কান্নায় একাকার হয়ে যায়। আমি কোনোদিন এই কান্নার জলের ঠাঁই পেতাম না।

ছাড়িব না সূচাগ্র মেদিনী
বুঝে পেতাম না কোন ফিতায় বন্দি ছিটমহল বিনিময় চুক্তি। আমার উপলব্ধি দিয়ে বুঝে গিয়েছিলাম ছিটমহলের সাথে তথাকথিত দেশের কোনো সম্পর্ক নেই। তাহলে দেশের রাষ্ট্র প্রধানদের মধ্যে অনুষ্ঠিত ছিটমহল বিনিময় চুক্তি কেন বাস্তবায়িত হচ্ছে না? পরে প্রশাসক হিসেবে স্থানীয় আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি, মানুষের আবেগ ইত্যাদির সাথে পরিচিত হই। আমার কাছেও একাধিকবার ভারত বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় সমিতি’র নেতারা এসেছেন। তাদের প্রাথমিক দাবি ছিল সূচ্যগ্র ভূমিও ছাড়া যাবে না। কমপক্ষে সমপরিমাণ জমি বাংলাদশে থেকে আদায় করতে হবে। অনেকের মধ্যে এক ধরনের আহত অনুভূতি কাজ করে, যেমন তিনবিঘা কড়িডোর তৈরি করে ভারতের কোনো লাভ হয়নি। উপরন্তু ১১১টা ভারতীয় ছিটমহল যার আয়তন ১৭১৬০.৬৩ একর বিমিয়ে ৫১টি বাংলাদেশী ছিটমহল থেকে আসবে মাত্র ৭১১০.০২ একর জমি। তাছাড়া ভারত বাংলাদেশের প্রতিকূল দখলে আছে যথাক্রমে ২৭৭৭.০৩৮ একর ২২৬৭.৬৮২ একর জমি। যেমন নদীয়া জেলায় হোগলবাড়ি থানায় ভারতের দখলে পাকুরিয়া। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালায়ে মোট ১২টি (১। বেরুবাড়ি এবং সিংপাড়া-কুদিপাড়া, পঞ্চগড়-জলপাইগুড়ি জেলা ২। পাকুরিয়া, কুষ্টিয়া-নদীয়া ৩। চর মহিষকান্দি ৪। হরিপাল/পাটরাই ৫। পিরদিওয়া, মেঘালয় ৬। লিংখাট-১ ৭। লিংখাট-২ ৮। লিংখাট-৩ ৯। দ্বকি/তামাবিল ১০। নীলজুরি-১ ১১। নীলজুরি-২ ১২। চন্দননগর, মৌলভি বাজার-ত্রিপুরা) ভূমিখ- ভারতে আসবে এবং ৬টি ভূমিখ- (১। বৌসমারি-মাধুগারি, কুষ্টিয়া-নদীয়া ২। আন্ধারকোটা ৩। বেরুবাড়ি , পঞ্চগড়-জলপাইগুড়ি ৪। লোবাচেরা-নানচেরা, মেঘালয় ৫। ঠাকুরানি বাড়ি-কালাবাড়ি, কুড়িগ্রাম-ধুবড়ি ৬। পাল্লাথাল, মৌলভি বাজার-করিমগঞ্জ) যাবে বাংলাদেশে। এখানে বসবাসকারী লোকদের যন্ত্রণাও অসীম।
দু’দেশের ছিটমহলের বাসিন্দাদের নাগরিকত্ব নিয়ে সীমাহীন দ্বিধাদ্বন্দ্ব। যুক্তির যুক্তিতে আবেগ থাকলেও বাস্তবতার খুব অভাব, তারা বুঝতে চায় না যে আন্তর্জাতিক সীমা আর পরিবর্তন কারা সম্ভব নয়। অন্য দেশে ছিটমহলে শারীরিকভাবে আর প্রবেশও অসম্ভব। পরে অবশ্য বুঝলাম শুধু আন্দোলন, আবেগ ইত্যাদিই মূল অন্তরায় নয়। নেহেরু-নুন-চুক্তি-১৯৫৮র পরেও এতগুলি বছর কেন চলে গেল? আসলে ভারতের সংবিধান সংশোধন ছাড়া এ চুক্তি বাস্তবায়িত করা সম্ভব ছিল না। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব সব চাইতে বড় অন্তরায়। কখনও ইংরেজদের সৃষ্ট কুখ্যাত দ্বিজাতি তত্ত্বর মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয় কাজ করেছে দুই দেশের নেতাদের মধ্যে। যার খেসারত দিতে হয়েছে উলুখাগড়ার মতো সাধারণ মানুষকে।

চুক্তির চুক্তি মুক্তির চুক্তি
যক্ষ্মা পাকিস্তানের স্বপ্নভঙ্গ করে দিল। ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮ পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলি জিন্নার মৃত্যু হল যক্ষ্মায়। অচিরেই ভেঙ্গে পড়ল জিন্নার ‘পাকিস্তান একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ভাবনা।’ পাকিস্তান রাতারাতি হয়ে গেল মুসলিম রাষ্ট্র। ফলে প্রতিবেশি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ভারতের সাথে সংঘাতের জায়গা আরো প্রসারিত হল। যার প্রথমেই থাকল সীমান্তরেখা সমস্যা। শুধু পূর্ব পাকিস্তানের সাথে ভারতের প্রায় ৪০৯৬.৭ কিলোমিটার দীর্ঘস্থল সীমান্তরেখা ছিল। Radcliffe Commission-এর সুপারিশ অনুসারে র্যা ডক্লিফ লাইন (Radcliffe Line) মেনে সীমান্ত সমস্যার সমাধান খোঁজা চলল ঠিকই দ্বন্দ্বের জায়গা একেবারে নিরসন হল না। এর মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরু ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নুন ১৯৫৮ সালে একটি চুক্তিতে উপনীত হলেন, ভূখণ্ডের লাভ লোকসানের কথা না বিবেচনা করে ছিটমহল বিনিময় হবে। এবং (Radcliffe Award) অনুসারে দহগ্রাম, আঙ্গরপোতা ছিট দু’টি আসবে ভারতে বিনিময়ে বেরুবাড়ি যাবে পাকিস্তানে। ১৯৬০ সালে ভারতের সংবিধানের ৯ম সংশোধনী অনুসারে এই বিনিময় হল। কিন্তু বাকি ছিটমহল থেকে গেল সেই তিমিরে।
এক নদী রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হল। স্বাভাবিক কারণেই আর একটা চুক্তির চুক্তি দরকার হল। চুক্তি হল ইন্দরা গান্ধী ও শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে ১৯৭৪ সালে, বিবাদমান প্রায় সব বিষয় নিয়ে। বরঞ্চ একটা মীমাংসিত বিষয়ে পাশা উল্টে গেল। দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ফিরে গেল বাংলাদেশে আর বেরুবাড়ির অর্ধেক ফিরে এল ভারতে। এই চুক্তি স্বাভাবিকভাবেই অনেক বিতর্ক উসকে দিল। জন্ম নিল ‘কুচলিবাড়ি সংগ্রাম কমিটি’র যারা পূর্ণশক্তি দিয়ে বিরোধিতায় নামল এই চুক্তির। দু’টি এলাকাই আবার ফিরে পেল ছিটমহল তকমা। অন্য ছিটমহলের যন্ত্রণা এদেরকেও আবার সম্পৃক্ত করল। একই বিষয় নিয়ে জেনালে এরশাদ সরকারের সাথে ইন্দরা গান্ধীর আবার একটি চুক্তি হল ১৯৮২-এ। চুক্তির মূল উপপাদ্য বিষয় ছিল – বাংলাদেশকে ১৫.১৩০ একর জমি স্থায়ীভাবে লিজ দেওয়া হবে কড়িডোর নির্মাণ করার জন্য, অন্যদিকে ভারত বেরুবাড়ি যাতায়াতের জন্য একটি ফ্লাইওভার অথবা ভূগর্ভস্থ পথ নির্মাণ করতে পারবে ভারত। বাংলাদেশকে শেষ পর্যন্ত ভারতের সুপ্রীম কোর্টের রায় বলে ১৯৯০-এ ৩.২১ একর জমি লিজ দেওয়া হয় যা কিনা পরিচয় পেল তিনবিঘা হিসেবে। অনেক লড়াই সংগ্রাম, মৃত্যুর মধ্যদিয়ে জন্ম নিল তিনবিঘা করিডোর ২৬/০৬/১৯৯২ তারিখ। অন্যদিকে বেরুবাড়ি পর্যন্ত ফ্লাইওভার বা ভূগর্ভস্থ পথ নির্মাণ হয়ে উঠল না মূলত অর্থনৈতিক কারণে। অথবা ছিটমহল হস্তান্তর আশু সমাধান ভেবেই হয়ত ভারত সরকার এ বিষয়ে আর উৎসাহ দেখায়নি।
নেহেরু-নুন চুক্তি ১৯৫৮-র পরে একের পর এক চুক্তি হল প্রায় একই বিষয়ে কিন্তু মূল সমস্যার কোনো সুরাহা হল না। ছিটমহল বিনিময়, প্রতিকূল দখলীকৃত ভূখণ্ড বিনিময় (Adverse Possessions), বিবাদমান সীমান্তরেখার পুনর্বিন্যাস যে তিমিরে ছিল সে তিমিইরেই থেকে গেল। প্রথম দু’টি বিষয়ে আগেই বলা হয়েছে। দেখা যাক তৃতীয় সমস্যাটি কি? প্রায় ৬.১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য স্থলসীমা চিহ্নিত করণের কাজ তখনও বাকি ছিল। ডাইকহাটা-৫৬ (পশ্চিমবঙ্গ), মুহুরি নদী-বেলোনিয়া (ত্রিপুরা) এবং লাথিটিলা-ধূমাবাড়ি (আসাম) এলাকায় সীমান্তবিবাদ দীর্ঘদিনের। জমির দীর্ঘ জরিপ, জনসমীক্ষা, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অধিবাসিদের জমির ব্যবহার, নদীর গতি প্রকৃতির মতো বিষয়গুলো উভয় দেশই বিচার বিচেনা করে এই সীমান্ত সমস্যার একটি সৌহাদ্যপূর্ণ সমাধানে এল ২০১১ সালে। তিনটি বিষয় নিয়েই ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং-র ঢাকা অবস্থানকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে ৬ সেপ্টেম্বর ২০১১ একটি প্রটোকল (Protocol) স্বাক্ষরিত হয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষায় অবসান শিখা যেন প্রজ্জ্বলিত হল। এই প্রটোকল-ই অনেক কান্নায় জল থামানোর পথ দেখাল।

২ স্বাধীনতা+৩ স্বাধীনতা=১ মুক্তি
অবস্থাটা এমন যেন স্বাধীনতা আসে স্বাধনিতা যায় ছিটমহলবাসীর পরাধীন জামা গায়। সেই জামা সেঁটে বসেছে ১৯৪৭ সাল থেকে। হিসাবে ওটি ছিল প্রথম স্বাধীনতা দু’দেশের ছিটেই। যদিও এই স্বাধনিতার ক্ষত অনেক গভীর; দেশভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি, ছিন্নমূল মানুষের বিরামহীন কান্না। আবার ১৯৭১-এ বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করল। সেটি বাংলাদেশী ছিটমহলের কাছে আর একটি স্বাধীনতা হওয়ার কথা। কিন্তু স্বাধীনতার মূলকথা নাগরিক অধিকার অর্জন, বস্তুত তা থেকে মানুষগুলো বঞ্চিতই থেকে গিয়েছিল। ভারতের সংবিধানের একশতম সংশোধনী এক ধাক্কায় সমস্ত লালফিতার ফাঁস মুক্তির রাস্তা উন্মোচন করে দিল। ঢাকায় ৬ জুন ২০১৫, ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শ্রীমতি মমতা বন্দোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে হস্তান্তরের রোড ম্যাপ ঘোষণা করলেন। ২২টি বিষয়ে চুক্তির মধ্যে Land Boundary Agreement (LBA)-এর রূপায়ণ অন্যতম। ত্বরান্বিত হল স্থলসীমা চুক্তির রূপায়ণে ছিটমহল বিনিময়। ছিটবাসীর কাছে আর একটি স্বাধীনতা। অনেক বয়স্ক ছিটবাসীর কাছে স্বাধীনতার সংখ্যা দাঁড়াল ২ (ভারতীয় ছিটমহল) এবং ৩ (বাংলাদেশের ছিটমহল) যার যোগফল দাঁড়াল প্রথম মুক্তি। জীবনে এক এবং অদ্বিতীয় মুক্তি। দীর্ঘ ৬৮ বছরের উৎকণ্ঠার অবসান। ১৪-১৭ জুলাই ২০১১ সালে এক যৌথ জনগণনায় লোকসংখ্যা ছিল ভারতের ১১১টি ছিটমহলে থাকে ৩৭,৩৩৪ জন এবং বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলে ১৪,২১৫ জন বাসিন্দা, সর্বমোট ৫১,৫৪৯ জন। ভারতের প্রাপ্ত ৫১টি ছিটমহলের সব বাসিন্দাই ভারতে থাকার সম্মতি প্রদান করেছে। বাংলাদেশের প্রাপ্ত ১১১টি ছিটমহলের ৯৭৯ জন মাত্র বাসিন্দা স্বেচ্ছায় ভারতে চলে আসার জন্য নাম নথিভূক্ত করেছে। যদিও সংখ্যাটা নগণ্য তবু মানুষগুলোর আবার শুরু হবে বেদনাময় উদ্বাস্তুযাত্রা। তাদের মধ্যে হয়ত বাংলাদেশের সংখ্যালঘু শ্রেণির অস্থিরতা কাজ করেছে। যা নিরসনে গণতান্ত্রিক সরকারের আরো সদার্থক ভূমিকা থাকবে বলে আমরা আশাবাদী। তবু এ যেন এক রাহুমুক্তি।
এই মৈত্রীর আবহে দু’দেশকে করে ফেলতে হবে আরো কতগুলি কাজ : তিস্তার জলবণ্টন চুক্তি, রেল-সড়ক যোগাযোগে ট্রানজিট ব্যবস্থার উন্নয়ন ইত্যাদি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে কমবেশি একটা মৈত্রীর বাতাবরণ রয়েছে এবং পূর্বে ফারাক্কার জলবণ্টন চুক্তিসহ একাধিক বিষয় সুমীমাংসা হয়েছে। ফারাক্কা জলবন্টন চুক্তিতে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু একটি সদার্থক ভূমিকা নিয়েছিলেন। আশা করি উভয় দেশের নেতৃবর্গ এসব বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সমর্থ হবেন। কোচবিহারের গীতালদহ থেকে সেই হারিয়ে যাওয়া ট্রেনটা আবার কু-ঝিক-জিক করতে করতে স্বপ্নের যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশের মধ্যদিয়ে বেলাবেলি পৌঁছে যাবে শিয়ালদহ।
উজ্জ্বল রোদ : দাঁড়াবার সময় নেই
৩১ জুলাই ২০১৫, একদল ছেলেবুড়ো পাগলের মতো দৌড়াচ্ছে, হাতে তেরঙ্গা পতাকা, টিনের বেড়া বাজাচ্ছে, উলু ধ্বনি দিচ্ছে, আকাশে বাতাসে শঙ্খধ্বনি-আযানের সুর, আজ তারা স্বাধীন। গলায় বাঁধনছাড়া চিৎকার-বন্দেমাতরম, বন্দেমাতরম। সকালের উজ্জ্বল রোদে উদ্ভাসিত একদল মানুষের প্রাণখোলা হাসি। আবার কেউ কেউ আনন্দে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে চোখের জলে। বুকের থেকে এক ঝটকায় নেমে গেছে চাপা জগদ্দল পাথর। এখন আর কোনো শিশুকে বাবার নাম পরিচয় লুকিয়ে ছিটমহলের বাইরে লোককে পিতা সাজিয়ে স্কুলে ভর্তি হতে হবে না, মশালডাঙার গর্ভবতী মহিলাকে প্রসব যন্ত্রণা নিয়ে হাসপাতালের সামেন পুলিশের জেরায় পর্যুদস্ত হতে হবে না, অন্য ভারতীয়দের মতো তারা ভোটের লাইনে দাঁড়াতে পারবে, যেতে পারবে দেশের অভ্যন্তরে যে কোনো জায়গায়, আহা কী আনন্দ! টিভির পর্দায় ভেসে উঠছে অনেক চেনামুখ। মনে হচ্ছে কলকাতা এক ছুট্টে চলে যাই তিস্তার পারে, দহগ্রাম-আঙ্গরপোতায়। দেখে আসি মুক্তির উচ্ছ্বাস। কাঁটাতার আছে দেশের বুক চিরে তবু নাগরিক অধিকারের জন্য আর কাঁটাতারে ঝুলতে হবে না। এখন তারা সব নাগরিক অধিকারের হক দাবিদার। কিন্তু তারা এখনও প্রায় নেই রাজত্বের বাসিন্দা। তাদের প্রতিবেশীদের চেয়ে কয়েক’শো যোজন পিছিয়ে। তাদের ঘরে কর্ম, খাদ্য, শিক্ষা, বিদ্যুৎ শুদ্ধ পানীয় জল, শৌচাগার নেই। বর্ষায় এক হাঁটু কাদা মাটির রাস্তা। রাষ্ট্র অঙ্গীকার করেছে নব ভারতীয়দের সব নাগরিক সুযোগ সুবিধা দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু অর্থও বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু রূপায়ণ ও নাগরিকদের কাছে সুযোগ পৌঁছানো বিস্তর ফারাক। তবু আশাবাদী হতেই হবে। শুধু উজ্জ্বল রোদ্দুরটুকুই দেখে দাঁড়ালে চলবে না, যেতে হবে অনেক পথ। ছিটমহল যেদিন দেশের সাথে মিশে গেল সেদিন ছিল আমাদের প্রিয় প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালামের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার দিন। তিনি বলে গেছেন, তাঁর মৃত্যুতে ছুটি নয় কাজ করলেই তাঁকে যথার্থ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হবে। তাঁর একটি উক্ত দিয়ে এই মিশে যাওয়ার দিনটির উদযাপনের তোরণ সাজিয়েছিল এলাকার মানুষ। তাতে লেখাছিল – ‘যা ঘুমের মধ্যে দেখো, সেটা স্বপ্ন নয়। স্বপ্ন সেটাই, যা ঘুমোতে দেয় না।’ ঠিক, এখন জেগে স্বপ্ন দেখার সময়। স্বপ্ন বাস্তবায়নের অনেক কাজ বাকি।
লেখাটি ‘চালচিত্র’ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সংখ্যায় প্রকাশিত।
‘চালচিত্র’ পড়তে ভিজিট করুন www.chalchitro.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here