বাংলাদেশের গল্প। হাসি । রাজা সহিদুল আসলাম

0
878

গল্প

হাসি

রাজা সহিদুল আসলাম

ভদ্রলোকের বাড়ি জেলা শহরে। অনেক টাকা, অনেকগুলো বাড়ি, দামি গাড়ি, ছেলে মেয়ে, সবকিছুই আছে। সবকিছু। কিন্তু তার সুখের সামনে ‘অ’ এসে হাজির হয় হঠাৎ। তার টাকা-গাড়ি-বাড়ি কোন কিছুই ‘অ’কে ধ্বংস করতে পারে না।
পুরানো সেই কথা – টাকাকড়ি থাকিলেই সুখশান্তি আসে না, সুখশান্তি হইলো . . .
ছেলে মেয়ে জামাই বৌমা ব্যস্ত-চিন্তিত। ভদ্রলোক নিদ্রাহীন। কবিরাজের কাছে তারা যায়নি। চিকিৎসা চলছে। কোন অগ্রগতি নেই। অনেক ডাক্তার অনেক ওষুধ-পথ্য চললো, চলছে। অসুখ ডিটারমাইন্ড – সে যাবে না। ডাক্তার রেফার্ড করলো ঢাকায়। অবশেষে ঢাকা। দেশের শ্রেষ্ঠ ডাক্তার, শ্রেষ্ঠ ল্যাব থেকে পরীক্ষা নিরীক্ষা। জটিল পরিস্থিতি। অপারেশন ছাড়া উপায় নেই। দেশে অসম্ভব।
ইউকে মানে লন্ডন। সেখানে সম্ভব। দেশের ডাক্তার সেখানে রেফার্ড করলো। টাকার অভাব নেই। ভদ্রলোক চলে গেলেন। সেখানে সেরা ডাক্তার। হার্টে ব্লক অনেক। বোর্ড বোসলো। সূক্ষ্ম অপারেশন দরকার। রিস্কি। চিন্তিত তারা। অপারেশন সাকসেস হতে পারে আবার নাও হতে পারে। অবশেষে সেরার সেরা এক ডাক্তার বললেন – অপারেশন ছাড়া রোগীকে সুস্থ করা সম্ভব, রোগী যদি জোরে অট্টহাসি দিয়ে ওঠেন তাহলে ব্লকগুলো খুলে যেতে পারে।
ভদ্রলোক বহু বছর ধরে হাসেননি। প্রাণ খোলা হাসি কাকে বলে তিনি ভুলেই গেছেন। টাকা টাকা এবং টাকা। টাকার পেছনেই ছুটেছেন তিনি।
সুস্থতা এবং হাসি – ভদ্রলোক আরও গম্ভীর হয়ে যান। সুস্থতার জন্য হাসি? টাকা পয়সা ধন দৌলত সবই তুচ্ছ?
হাসি এখন দুষ্প্রাপ্য। হাসি নামের মেয়েরাও হাসতে ভুলে গেছে কারণ তাদের স্বামীরা অনেক টাকা আয় করতে পারছে না। অবিবাহিত হাসি নামের মেয়েরাও চিন্তিত, বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের অভাব, দুই কোটিরও বেশি বেকার ছুটোছুটি করছে। কর্মসংস্থানের অভাব মানে পাত্রের অভাব। বেকার যুবকরা তাদের দিকে তাকায় বটে কিন্তু সে দৃষ্টি শুষ্ক, করুন, ব্যর্থতা মাখানো। হাসিরা সারা দিতে পারে না, কর্মহীন পুরুষ মানেই…। তাই অবিবাহিত হাসি নামের মেয়েরাও হাসছে না।
সত্যিই কি হাসিকে পাওয়া এখন দুঃসাধ্য?
একজন ছিদ্রান্বেষী কলমচাষী এ ব্যাপারে বলেছেন – যুবকদের জন্য অবিবাহিত মেয়েরা দোয়া করছে না বলে এই অবস্থা। বেকার যুবকদের মুখেও হাসি নেই। তারা হাসতে ভুলেছে হাসিকে না পাওয়ার বেদনায়।
সম্প্রতি কেউ কেউ চিন্তিত, ভবিষ্যতে কি হাসি দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠবে? কিন্তু এই মুহূর্তে ভদ্রলোককে বাঁচানোর জন্য হাসি জরুরি।
জীবনের জন্য হাসি।
তাকে হাসানোর জন্য অনেক লোক নিয়োগ দেয়া হলো।‘হাসি’র খাতে অনেক ব্যয় হয়ে চললো। তুচ্ছ বিষয়। ইতঃপূর্বে ‘হাসি’ কেউ কেনেনি, কেউ বিক্রিও করেনি। ইউরোপ আমেরিকায়ও একটা হাসির দোকান নেই। আশ্চর্য! এত কিছু করেছে অথচ একটা হাসির দোকান তারা খুলতে পারেনি।
সামান্য একটা হাসি।
এই গল্পটা পনের বছর আগে পরিচয় হওয়া মাই ডিয়ার এক ভদ্রলোক আমাকে বলছিলেন প্রায় সাড়ে তিন মাস আগে। হঠাৎ তার মোবাইল ফোন বেজে উঠলে গল্পটা গর্তে পড়ে যায়। আমি কোন প্রকার চেষ্টা চালাইনি গর্ত থেকে গল্পটা তুলে আনার কারণ ভদ্রলোক যার কাছে টাকা পেতেন তিনি টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন সঙ্গে হুমকি দিয়েছেন।
গল্পটা তিনি শেষ পর্যন্ত শেষ করতে পারেননি। আমার খুব আগ্রহ ছিল ওই ভদ্রলোক হাসতে পেরেছিলেন কি না। তিনি সুস্থ হয়েছিলেন কি না। আমি মাঝে মধ্যেই গল্পকারকে ফোন করতাম শেষটুকু জানার জন্য। তিনি বলেননি। আমি মরিয়া হয়ে উঠি। মনটা সারাক্ষণ খারাপ থাকে। আমি হাসতে ভুলে যাই। শুনেছি গল্পকারও হাসতে ভুলে গেছেন, টাকার শোকে নাকি অন্য কিছুর জন্য জানি না।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে গল্পটা একদিন আমার কাছে এসে হাজির, গল্পকার আমাকে ফোন করলেন, ফোন রিসিভ করতেই তিনি উচ্চস্বরে হাসতে লাগলেন, হেসেই চলেছেন … । আমি বরলাম – ব্যাপার কী, এত হাসছেন কেন? বললেন – সেই ভদ্রলোক হেসেছেন, একটু আগে ডাক্তার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বলেছেন তার ব্লকগুলো খুলে গেছে, হা হা হা…, জানো, তিনি আমার পিতা।‘হাসি’কে তুই কী দিয়া রুধিবি বালির বাধ?
১৪ নভেম্বর ২০১২ খ্রি:
গল্পটি ‘চালচিত্রে’ প্রকাশিত।
আরও গল্প পড়তে ভিজিট করুন www.chalchitro.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here