বাংলাদেশের গল্প। ধমনী। আশান উজ জামান

0
376

ধমনী

আশান উজ জামান

শিরা না ধমনী? কোনটা দিয়ে রক্ত বয়?
মনেই থাকেনা। কতবার যে পড়েছি! ভুলে যাই। বারবার পড়ি। আর গুলিয়ে ফেলি। বারবার।
আজ আবার সন্দেহ হচ্ছে। বই খুঁজলাম। পেলামনা। শুভ্রকে ফোন দিলাম। সবকিছুতেই ও তৃতীয় মাত্রা যোগ করে। হয়তো বলবে শিরাও না, ধমনীও না। কোনটাই রক্ত বয়না। কিম্বা বলবে দুটো মিলেই বয়। কিন্তু রিসিভ করলো না। আচ্ছা, একবার নেট ঘাটলেই তো হয়! মোবাইলটা বের করেই ফেলেছিলাম। হঠাৎ মনে হলো জেনেই বা কী লাভ? ব্লেড তো আর ডাক্তার না শিরা ধমনীর ভেদ বুঝবে। তার কাজ কাটা। ধারই তার ভার। পোঁচ দিলেই হলো। কোনটা শিরা কোনটা দড়ি দেখবেনা। কেটে ফেলবে। তাই চিন্তা ভুলে দিলাম যুতশই এক পোঁচ।
কিন্তু এসব নিয়ে গল্প না। গল্পের বিষয় আমি। আরো নির্দিষ্ট করে বললে আমার রক্ত।
হলে আমার এক বন্ধু ছিলো। এহসান। ছোটখাটো। হ্যাংলা। আর পিচ্চি চেহারার। নিষ্পাপ নিরীহ ওকেই আমি ডাকতাম রক্তচোষা। অকারণে এমন নাম দিইনি। কারণ ছিলো।
স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের একটা সংগঠনের কর্মি ও। শুধু কর্মি না একেবারে কাছা মেরে লাগা কর্মি।
দেখা হলে আমরা কুশল জানতে চাই। ও চাইতো রক্তের গ্রুপ।
যারা জানতো, তাদের স্মরণ করিয়ে দিতো কবে পরবর্তী রক্তদানের সময় হচ্ছে। যারা জানতো না, তাদের ধরে নিয়ে টেস্ট করাতো।
একটা নোটবুক সাথে থাকতো ওর। ছোট। লাল। ওর পাতা ভরা রক্তদাতার তথ্যে। কে কবে রক্ত দিলো। কার কী গ্রুপের রক্ত। দিন গুনে গুনে দাতাদের কাছে যেতো। রক্তদানের ব্যবস্থা করতো।
অনেকেই গাঁইগুঁই করতো। আজ দেবো, কাল দেবো। ফাঁকিবাজির চেষ্টা চলতো। তবে ও যে কোন কাঠের ছাই দিয়ে ধরতো জানিনা। পাকড়াও হতেই হতো। ছাড়া পাওয়া যেতো না। তবে আমি হলাম শিং মাছ। দারুণ মিথ্যে বলতে পারি। বন্ধুরা বলতো মিথ্যে বলাকে নাকি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছি। সেই শিল্পের জোরে ছাড়া পেতাম। বারবার। এহসান ফোন করলেই অসুস্থ্য হয়ে যেতাম! সামনাসামনি দেখা হলে তো আর অসুস্থ্যতার ভান চলেনা। তখন ধরতাম গল্প। আমার ছাত্রের এক চাচা গ্রাম থেকে এসেছেন। হসপিটালে ভর্তি। তার জন্য রক্ত দিতে গিয়েছিলাম। রক্ত লাগবে দুই ব্যাগ। অথচ আরেকজন ডোনার পাওয়া যাচ্ছে না। রোগীর অবস্থা এখন তখন। কী আর করা। আরেকবার শুয়ে পড়লাম। ডাক্তার একটু নারাজি ছিলেন। কিন্তু প্রয়োজনের কাছে নিয়ম খাটে? হার মানলেন। হলে ফিরে সেই যে ঘুমিয়েছি, এই মাত্র উঠলাম। ইত্যাদি ইত্যাদি। এহসান তখন ব্যস্ত হয়ে পড়তো আমাকে নিয়ে। দুই ব্যাগ রক্ত দিয়েছি। চাট্টিখানি কথা তো নয়! সেবাযতœ করবে না? কিসের তাহলে বন্ধু সে আমার।
কিন্তু চোর যখন হয়েছি, ধরা তো পড়তেই হবে। তাছাড়া গৃহস্থ হিসেবে এহসানও কম চালাক না। ফলে পাকড়াও হলাম। ঘটনাটা মনে আছে। স্পষ্ট।
তখন শীতকাল। খুব সকালে উঠি। ফুটবল খেলতে যাই। তারপর ক্লাস।
সেদিনও খেলতে বেরিয়েছি। শর্টস জার্সি পরা। হাতে ফুটবল। গেটের মুখে এহসানের সাথে দেখা। চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখেই এগিয়ে এলো। বুঝলাম ঘটনা আছে। এবং সেটাই ঘটলো। রক্ত দিতে হবে। গল্প একটা সাজানোই ছিলো। আমাদের এক স্যার ক’দিন ধরে হসপিটালে। এ্যাকসিডেন্ট করেছিলেন। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছিলো। স্যার আমাদের হলের হাউস টিউটর। ফলে সবাই জানতো ঘটনাটা। ওটাকেই প্রেক্ষাপট করলাম। স্যারের জন্য প্রতিদিন একব্যাগ করে রক্ত দিতে হচ্ছে। পরশু আমি দিয়েছি। ইনিয়ে বিনিয়ে যখন বলছি, ও দেখি হাসছে। কথা শেষ হলে শুরু করলো ও। স্যারের জন্য রক্তের ব্যবস্থা ওই করছে প্রতিদিন। পরশু দিয়েছে ওর এক ছোটভাই। কাল দিয়েছে ও। এর আগেও যতবার মিথ্যে বলেছি, বুঝতে পেরেছে। ধরা দেয়নি। কিন্তু আজকের ব্যাপারটা সত্যিই সিরিয়াস। আমার রক্তের গ্রুপও দুর্লভ। ফলে এতটা দায়িত্বহীন হওয়া ঠিক না। আমিই যদি এমন করি, অন্যরা কী করবে! মিথ্যে বলে গল্প ফেঁদে আর কত? বড় হচ্ছি তো। আরেকটু সভ্য তো হতেই পারি। ইত্যাদি ইত্যাদি।
কিছু বলার মুখ আর ছিলোনা। রাজি হয়ে গেলাম।
এক বৃদ্ধার জন্য রক্ত লাগবে। গ্রাম থেকে এসেছেন। পিজি হসপিটালে ভর্তি। সাথে তেমন কেউ নেই, যে রক্ত জোগাড় করবে। খবর পেয়ে এহসান দায়িত্ব নিয়েছে। রোগির অবস্থা খুব খারাপ। যত দ্রুত রক্ত দেয়া যাবে তত ভালো।
রওনা হতে হলো। খেলার পোশাকেই!
রক্ত দিলাম। এত সহজ! আগে জানলে যেচে দিতাম। শুধু শুধু ফাঁকি দিয়েছি। এহসানকে বললাম। ও হাসলো শুধু। আমার জন্য এক বোতল পানি এনেছিলো। আর জুস। খেতে খেতে হলে ফিরলাম। সুযোগ পেলে একটু বিশ্রাম নিতে বললো ও। কিন্তু বিশ্রামের সুযোগ হলো না। ক্লাসে গেলাম। তারপর টিউশনি। সন্ধ্যায় এহসানের সাথে দেখা। মেস-এ খাচ্ছি তখন। মন খারাপ করা খবর দিলো। মহিলা মারা গেছেন। কী যে খারাপ লাগলো! আর খেতে পারলাম না। মহিলাকে এক নজর শুধু দেখেছিলাম। তার শরীরে আমার রক্ত বইবে, ভাবতেই ভালো লাগছিলো। কিন্তু এখন আর তিনি নেই। কী ঠুনকো আমাদের জীবন!
এরপর দিলাম ঢাকা মেডিকেলে। বৃদ্ধ লোকটাকে দেখেও খুব মায়া হচ্ছিলো। আমি হওয়ার আগে দাদা মারা গেছেন। লোকটাকে দেখে দাদা ভাবছিলাম। দাদা থাকলে এমনই হতেন। এমনই বুড়ো। এমনই অসুস্থ্য। কিন্তু রসিক। আপন। এমনই।
এই লোকটাও মারা গেলেন।
এরপর দিলাম এক শিশুকে। বাঁচলোনা।
আরেকজন বৃদ্ধ। তিনিও কাঁদিয়ে গেলেন আমায়।
এরপর আর রক্ত দিইনি। নিশ্চয়ই আমার রক্তে সমস্যা। না হলে এমন হতোনা। কাকতালে এত মানুষ মরতে পারেনা। এহসান বোঝায় আমাকে। সমস্যা থাকলে তো ক্রস ম্যাচিংয়েই বাদ পড়তো। তাছাড়া আমি যাদেরকে রক্ত দেইনি, তাদের কেউ কি মারা যাননি? মোক্ষম প্রশ্ন। জবাব ছিলো না আমার কাছে। দিইওনি। কিন্তু রক্ত দেবার আর সাহস হয়নি। মনে হতো আমি রক্ত দিলেই গ্রহিতা মারা যাবে।
বন্ধুরা রক্ত দিতো। পরের ক’দিন কী গর্বমাখা মুখ ওদের! একজন মানুষকে তো বাঁচানো গেলো। এই গর্বের অধিকারী হতে পারিনি কোনদিন। কী অলুক্ষুণে আমি! বেশ ক’বার চেষ্টা করেছিলো এহসান। কিন্তু আর শোয়াতে পারেনি আমায়।
এরমধ্যে পড়াশোনা শেষ হয়েছে। চাকরি পেয়েছি। জীবনের রং বদলেছে। স্বাদ বদলেছে। গন্ধও।
রক্ত দেয়ার দুর্যোগ আর আসেনি। ও না, একবার এসেছিলো। বসের মেয়ের জন্য রক্ত দিতে হতো। গিয়েছিলামও। কিন্তু দেয়ার আগেই সে সুস্থ হয়ে গেলো।
তারপর অনেক ক্যালেন্ডার বুড়িয়েছে। ফুরিয়েছে। অনেক সময় হারিয়েছে। কাল আবার বিষয়টা সামনে এলো। এবার নিজের ঘরে।
আমার বোন অসুস্থ্য। অপারেশন হবে। রক্ত লাগবে। আমি দেবোনা ঠিক করেছিলাম। ডোনার ঠিক করা ছিলো। দু’জন। কিন্তু লাভ হলোনা। কাল বিকেলে ব্লাড ড্র করার কথা ছিলো। দু’জনই রওনা হয়েছে শুনলাম। তারপর একাজ। সেকাজ। ব্যস্ত প্রহর। এদিকে অপারেশনের সময় হয়ে যাচ্ছে। ডোনাররা আসছেনা। ঘটনা কী?
ঘটনা দু:খজনক। একজন পথে দুর্ঘটনায় পড়েছে। আরেকজন গ্রামে চলে গেছে। যেতে হয়েছে। তার বাবা স্ট্রোক করেছেন।
আমার তো মাথায় বাজ। কী করবো এবার? এহসানকে ফোন করলাম। ওর সংগঠনের বর্তমান কর্মিরাই দু’জনকে ঠিক করেছিলো। আর কাউকে পাওয়া যায় কি না দেখবে বললো। পেলোনা।
শুভ্র। আমার বন্ধু। ওরও এক গ্রুপের রক্ত। ফোন করলাম। ধরলোনা। ব্যস্ত আছে হয়তো।
কিছুই করার ছিলোনা। আমার অভিশপ্ত রক্ত আর কাউকে দেবোনা পণ করেছিলাম। ভাঙতে হলো। বোনটা আমার খুব কষ্ট পাচ্ছে। ওর দিকে তাকিয়ে আর থাকতে পারিনি। এহসানের কথা মনে পড়ছিলো। আসলেই তো, রক্তে সমস্যা থাকার তো কথা না। কাকতালই নিশ্চয় ছিলো মৃত্যুগুলো। তাই যেনো হয়।
অপারেশন সফল হলো। রাত তখন এগারোটা। বোনের কাছে মাকে আর ওর ভাবিকে রেখে আমি বাসায় এলাম। রক্ত দেয়ার পর ঘুমাতে হয়। ঘুমালাম। ঘুম ভাঙলো বউর ফোনে। বোনটা আর নেই! আমি কাঁদতে পারছিলাম না। বারবার ওর চোখদুটো ভেসে উঠছিলো। বারবার বলছিলো অপারেশন করানোর দরকার নেই। না করলে হয়তো বেঁচে থাকতো। কী করলাম আমি। নিজ হাতে মুচলেকা দিয়েছি। কিছু হলে ডাক্তারদের কোন দায় থাকবে না। আসলেই তাদের কোন দায় নেই। দায় তো আমার। আমার রক্তের। কোনভাবেই আমি বুজ দিতে পারিনি নিজেকে। বোনকে নিয়ে এসেছি। বাইরে অপেক্ষা করছে ও। ছোটভাইটা অনেক দূরে থাকে। আসতে দেরি হচ্ছে। পৌঁছলেই অপেক্ষার শেষ। কিন্তু আমি আর পারছিনা।
মন বলছে দেহে এ রক্ত রেখে কী লাভ! যা অভিশাপ ডেকে আনে। না, রাখার দরকার নেই। এই লেখার শুরুতে তাই ব্লেড বসিয়েছি। কব্জিতে। দিয়েছি টান। শিরা ধমনি মাংশ সব কেটেছে।
রক্ত ধরার জন্য কাপড় কাচা গামলাটা নিয়ে রেখেছিলাম। সেটা যে কখন উপচে পড়েছে খেয়াল করিনি। খুব মন দিয়ে লিখেছি তো!
দরজায় ঠক। ঠক ঠক নক। কেউ ডাকছে। ছোটভাইটা এসে পড়েছে হয়তো। কিছুক্ষণ আগে কান্নার জোর বেড়েছে শুনেছি। আবার শব্দ। হোক। আমি বের হবোনা। আগে শাপমুক্ত হই। তারপর বেরোবো।
মাথাটা ঝিম ঝিম করছে। কলম ধরতে পারছিনা । চোখ বুজে আসছে। আমার কি একটু ঘুমিয়ে নেয়া উচিৎ? হ্যাঁ।
আর একটা কথা। একাজ কেউ করবেন না। খুব কষ্ট হচ্ছে আমার। কেমন কষ্ট কতটা কষ্ট বোঝাতে পারছিনা। অন্য সময় হলে পারতাম। আমার লেখার হাত ভালো। কিন্তু এখন মাথা কাজ করছে না। ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে ভুল করেছি। অভিশপ্ত হলেও আমার রক্ত তো। ভেতরেই রাখতে হতো। কিন্তু কিছু করার নেই।

লেখাটা কেউ পড়বেন না। জানি।
আসলে সুযোগ পাবেন না পড়ার। লেখাটা যাতে ছাপা না হয়, সে ব্যবস্থা আমি নিয়েছি। তবু। কোন ব্যবস্থাই ঠিকমতো কাজ করেনা। ফলে কেউ যদি হাতে পেয়েই যান, আর পড়তে শুরু করেন, তাদের কাছে একটা স্বীকারোক্তি আছে। ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি আগেই। উপরের অংশ টুকুতে সত্যের চে’ মিথ্যার রঙই বেশি। সারাজীবন চেষ্টা করেছি লেখক হবো। হয়ে উঠিনি। লেখক হওয়ার কোন গুণই আমার নেই। শুধু সত্য মিথ্যার মিশেল করা ছাড়া। কিন্তু আজ আর মিথ্যে বলবো না।
ঘটনা হলো আমার কোন বোনই নেই। ফলে উপরের লেখার অধিকাংশই যে বানানো, বুঝতে পারছেন।
তবে রক্ত সম্পর্কিত অন্য ঘটনা সত্য। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন কয়েকজনের মৃত্যুর কারণ আমি হয়েছিলাম। এহসান সত্যিই আমার বন্ধু। সত্যিই ও এমন ছিলো। শুভ্রও আমার বন্ধু। খুব মোটা ও। হাতির মতো। এবং হাতির মতোই গায়ের রং। কিন্তু নাম যেহেতু শুভ্র, তাই আমি সাদাহাতি বলি।
কদিন আগে প্রচুর ঘুমের বড়ি খেয়েছিলাম। অবস্থা খারাপের দিকে। হাসপাতালে নিতে হলো। সেরে উঠে ফিরছিলাম। হঠাৎ দেখি শুভ্র। সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলাম জানতে পারলে আস্ত রাখবে না। ফলে এড়িয়ে যাওয়াই কর্তব্য। তবু ডাক দিলাম। ডাকছি। ও শুনছে না। শুনছে না তো শুনছেই না। মনে হলো আগের মতো হয়ে যাই। সাদাহাতি বলে ডাকলাম। এবং ও শুনলো। আশ্চর্য না?
লেখাটা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। মন এখন অস্থির খুব। স্থির হতে পারছিনা। চেষ্টা করছি যদিও।
লিখেছি আমি চাকরি করি। সত্য। একটা ব্যাংকে আছি। বেসরকারি ব্যাংক। জাকজমকপূর্ণ অর্থহীন জীবন আমার। চরম অনিচ্ছায় চলছে। প্রতিদিন অফিস যাবার সময় মনে হয়, আর যদি না যেতে হতো!
এমন নিরেট বিরক্তির জীবনটা আমার আনন্দময় হয়ে উঠলো। হঠাৎ!
বছর তিনেক আগের কথা।
পাশের ডেস্কে বসেন রীতা আপা। আমারচে’ বছর পনেরোর বড়। তিনি আমার প্রেমে পড়েছেন। তার দেখাদেখি আমিও পড়েছি।
ব্যাংকে যেতে মুখিয়ে থাকি। গিয়ে অপেক্ষা করি কখন বিকেল হবে। কখন সন্ধ্যা। কখন আঁধার! কখন আড়াল।
যখন আসে, তখন সন্ধ্যা পার। আমি বের হই। কিছুদূর গিয়ে অপেক্ষা করি। রীতা আপা আসেন। এক রিকশায় উঠি। হুড তুলে দিই। আর হারিয়ে যাই। খুঁজে পাই তার বাসার সামনে গেলে। নামিয়ে দিই। তারপর ঘরে আসি। গুরুদেব চেয়ে আনন্দ পেতেন, আর আমি পাই চলে। আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ!
কোন কোন দিন আমরা ক্যাম্পাসে যাই। চেনা হাওয়া। চেনা ঘাস। চেনা ঝোপ। চেনা আঁধার। তার ভেতরে আমি আর রীতা আপা। কী দারুণ গাঢ় সময়! মাঝে মাঝে হাতধরে হাঁটি। গল্প করেন রীতা আপা।
তার ছাত্রাবস্থায় ক্যাম্পাস এমন ছিলো। অমন ছিলো। এ ছিলোনা। ও ছিলোনা। এ করতেন। তা করতেন। সেসময় কেন আসিনি। আসিনি যখন, এখন কেন দেখা দিয়েছি। ইত্যাদি প্রশ্ন করেন। আমি উত্তর দিই না।
ভাইয়ার কথা বলেন। এই পথ দিয়ে একসাথে হাঁটতেন। সন্ধ্যায় আমরা যা যা করি, করতেন। বলেন।
তার দুই মেয়ে। একটা স্কুলে পড়ছে। আরেকটা কলেজে। তাদের কথা বলেন। আমি শুনি।
সম্পর্কটা গাঢ় হচ্ছে। এমন সময় মাথাচাড়া দিলো আমার চিরভীরু আমি। তাই ফাক খুঁজলাম। পালানোর। ছোট বেলা থেকেই আমি একটু কম সাহসী। কে কি বলে কে কি ভাবে ভাবতে ভাবতে সময় যায়।
আচ্ছা, আমার সম্পর্কে একটু বলা দরকার। তাহলে লেখাটা বুঝতে সুবিধে হবে। কিন্তু আমাকে কি আমি ভালো করে চিনি? না। কাউকে সবচে বেশি চেনে তার বন্ধু। আমাকে সবচে ভালো চেনে সাদাহাতি। ক’দিন আগে আমার জন্মদিন গেলো। আমাকে নিয়ে একটা লেখা লিখেছে ও। ফেসবুকে। লেখার একটা অংশ তুলে দিই।
প্রচণ্ড খেয়ালি মানুষ খবিশ, ওর নাম খলিল, আমি খবিশ বলেই ডাকি। হলে আমরা একসাথে থাকতাম। এক বিছানায়। হরিহর আত্মা। কিন্তু দু’জনের চরিত্র ছিলো দুই মেরুর। খুব প্রভাবিত হয় ও। ছোটবেলায় ছিলো পুরো জঙ্গিটাইপ। পাড়–ইপাড়ার পাশ দিয়ে স্কুলে যেতো। যাবার সময় থুতু ফেলতো। আসার সময় আবার। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই ইউটার্ন। হুমায়ূন আজাদের লেখা পড়ছে তখন ও। নাস্তিক নাস্তিক কথা বলে। ভাব নেয়। দু’বছর পর সে ভাব দূর হলো। এরপর হিমু। হলুদ পাঞ্জাবি পরে। খালি পায়ে হাঁটে। উল্টোপাল্টা কাজ করে। আর মার খায়। বুঝলো সবাই হিমু হতে পারেনা।
ইন্ডিয়ার এক নায়ককে খুব পছন্দ ওর। তার মতো করে দৌড়ায়। হাঁটে। কথা বলে। মুখ বাঁকায়। বরাবরই এমন ও। স্থিরতা নেই। সকালে যে পণ করে বের হতো, দুপুর না হতেই ভেঙে ফেলতো। নিশ্চয় অন্য কেউ বুঝিয়েছে, বুঝে নিতাম। কিছুদিন আগে দেখি দাড়ি রেখেছে। একেবারে হুজুর।
আমি ওর সবচে’ কাছের বন্ধু। সবচে’ কাছের শত্রুও। আমার ভালো সবচে’ বেশি চায়। আবার আমাকেই সবচে’ হিংসা করে।
তখন হলে থাকি। একরাতে ঘুম ভাঙতেই দেখি ও বসা। হাতে বালিশ। কী ব্যাপার? আমার মুখে চেপে ধরবে বলে অপেক্ষা করছিলো। বলে কী! দম বন্ধ হলে কেমন লাগে দেখাতে চেয়েছিলো। কেন? কারণ ওর দম বন্ধ হয়ে আসছিলো। সেদিন বিকেলেই আমাদের রেজাল্ট বেরিয়েছে। আমি ওর চেয়ে ভালো করেছি কেন? এই হচ্ছে ওর দমবন্ধ হওয়ার কারণ। জিজ্ঞেস করলাম অপেক্ষা করছিলো কেন। ওর নাকি কষ্ট হচ্ছিলো খুব। আমাকে খুব ভালোবাসে তো! বুঝুন অবস্থাটা। ও হ্যাঁ, বলা হয়নি। ওর চেয়ে মাত্র এক নম্বর বেশি পেয়েছিলাম! মাত্র এক।
ওর ভয়ে তটস্থ থাকি। সারাক্ষণ। কখন কী করে বসে। কখন কী বলে বসে। ভয় কাজ করে মনে। কিছু একটা গণ্ডগোল করবে।
উল্টো ঘটনাও আছে..’
এরপর ভালো ভালো কথা। আমার সম্পর্কে ভালো কথা বলার সুযোগ আর নেই। তাই ওটুকু দিলাম না।
যাহোক। একটু হলেও বোঝা গেলো আমি কেমন। আসলেই আমার মধ্যে ইউটার্ন প্রবণতা প্রবল!
মূল কথায় আসি। একটা টার্ন নেয়ার সময় হয়ে গিয়েছিলো। আবার!
সারাজীবন দুর্নামের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলেছি। রীতা আপাকে ছেড়ে দিলাম। দুর্নামের ভয়ে।
কিন্তু চিন্তা হলো, একই অফিস। জটিলতা বাড়তে পারে। তাই সরাসরি না বললাম না। আসলে পারলাম না হয়তো। মধ্যবিত্তদের না বলতে পারার ক্ষমতা নেই। ইনিয়ে বিনিয়ে এড়িয়ে যায়। আমিও তাই করলাম। একটু একটু করে এড়িয়ে চললাম। কিন্তু বুঝে ফেললেন তিনি। অভিজ্ঞ তো! শুরু হলো তার অত্যাচার। আবেগের। বাঁচা দায়!
কদিন পরে স্বস্তির খবর এলো। রীতা আপার বদলি হয়েছে। যাক! পনের দিন পর চলে গেলেন তিনি।
এরপর দু’জোড়া জুতো পুরোনো হয়েছে। মাত্র দু’জোড়া।
আমার নিস্তরঙ্গ ব্যাংকার জীবনে অনেক ঢেউ উঠেছে। মিলিয়েও গেছে। কিন্তু এই ঢেউটা বোধহয় মিলাবে না কোনদিন। ভাসিয়েই নেবে। আমাকে।
একটা কেলেংকারী ঘটে গেছে। মহা কেলেংকারী।
আজমল সাহেব আমাদের বড় ক্লায়েন্ট। কোটি টাকা তার সঞ্চয়ী হিসাবে জমা থাকে! তার হিসাবে গরমিল দেখা গেছে। বড় ধরনের গরমিল। লাখ চল্লিশেক টাকার ব্যাপার। টাকাটা নাকি আমি সরিয়েছি! আমার স্বাক্ষর আছে লেনদেনটাতে!
কদিন ধরে তোলপাড় চলছে। আরো যেসব জালিয়াতি ধরা পড়েছিলো তার সাথেও জুড়ে দেয়া হচ্ছে আমাকে। দোজখ হয়ে গেছে জীবনটা। খবর ছেপেছে পত্রিকায়। আমার ছবিও। ইশ! কতবার স্বপ্ন দেখেছি কোন পুরস্কার পাচ্ছি। ছবি ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। তাতে আমি হাসছি। উঁচু দুটো দাঁত বেরকরা হাবাগোবা হাসি। কিন্তু স্বপ্নের সাথে মিল নেই এই ছবির। এখানে আমি হাসছিনা। রহস্যজনক একটা লুক নিয়েছি। চোয়ালবন্ধ খুনি খুনি একটা ভাব। লাখ লাখ টাকা আত্মস্মাৎ করা মানুষের এরকম লুক থাকতে হয়।
ধাক্কাটা সামলাতে পারবোনা জানতাম। পারলামও না। ঘুমের বড়ি খেলাম। এ কথা তো বোধহয় আগেই বলেছি, না? থাক তাহলে না বলি। যাহোক বেঁচে গেলাম। কিন্তু মুখ দেখাতে পারছি না যে! কী করি! কেউ বিশ্বাস করছে না আমাকে। কেউ বলছে না এমন একটা কাজ খলিল করতে পারেনা। আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু কিছু করার নেই।
লেনদেনটাতে আমি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। আমার আইডি থেকেই প্রসেসড হয়েছে। এটা কীভাবে সম্ভব? ভাবছিলাম। ভাবতে ভাবতে মনে হলো আমার পাসওয়ার্ড আর কে কে জানতো? সবখানেই আমি একই পাস ব্যবহার করি। আমার বউ জানে এটা। কিন্তু জীবনে কোনদিন সে আমার অফিসে ঢোকেনি। আর জানতো রীতা আপা। রীতা আপারটাও আমি জানতাম। তাই জানিয়েছিলাম। ভালো যে বাসি তার প্রমাণ স্বরুপ। সে কি করতে পারে কাজটা? না। আমাকে এত ভালোবেসেছে। তাছাড়া তার কোন দরকার ছিলো না। ভাইয়া ভালো চাকরি করেন। সম্পদের অভাব নেই। কী জন্যে তিনি এটা করবেন? তবু খতিয়ে দেখলাম আরেকবার। ঘটনা যে তারিখে ঘটেছে তার আগেই ট্রান্সফার হয়েছে আপার। এরপর প্রায়ই বেড়াতে আসতেন। বসতেন তার ডেস্কে। আমার পাশেই। অস্বস্তি লাগতো। ব্যস্ততার ভান করে থাকতাম। ছুটোছুটি করতাম। হতেই পারে সুযোগ নিয়েছেন। কিন্তু প্রমাণ করার উপায় নেই।
কেন যেনো মনে হলো রীতা আপাকে জানানো দরকার কথাটা। আজ ফেরার আগে ফোন করলাম। এবং আকাশ থেকে পড়লাম। তিনি নেই। কানাডা চলে গেছেন। বছরখানেক হলো।
এমন একটা পরিস্থিতি, দু’দিক থেকেই কাটছে আমায়। কাউকে বলতেও পারবোনা কোনদিন। রীতা আপার ব্যাপারটা জানাজানি হলে বউ বিষ খাবে। বাচ্চাটার জীবন শেষ। আবার চুপ থাকলে জালিয়াতির কারণে জেল। বাঁচার কোন পথ আছে আমার? পাইনি খুঁজে। তাই নিশ্চিত মৃত্যুর পথ খুঁজেছি।
তাই হাত কেটে দিয়েছি। হ্যাঁ, সত্যিই। গামলাটা সত্যিই উপচে পড়েছে। সত্যিই নক পড়েছে দরজায়। কিন্তু কান দিইনি।
যতটুকু সময় পাই, লিখে যাই সবকিছু। ভেবেছিলাম গল্প লিখবো। তাই প্রথম দিকে অনেক কিছু এসেছে কল্পনা থেকে। বোনের প্রসঙ্গটাও সেজন্য এনেছি। মৃত্যুটাকে গৌরবান্বিত করতে! ব্যাংক জালিয়াতি করে আত্মহত্যা লজ্জার। বোনের শোকে মরা গৌরবের। জীবনকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা আমাদের। মৃত্যুর জন্যও একটু করলাম। কিন্তু ব্যাপারটা ভালো হতো না। একদিন সবাই জানতো সত্যটা। তখন আরো থুতু ফেলতো আমার নামে। তাই শুধরে দিলাম।
সময় ফুরিয়ে আসছে। কেমন যেনো লাগছে আমার। বোঝাতে পারছি না। শরীরের সব রক্ত বেরিয়ে গেলে কেমন হয় তা আগে বুঝিনি। কিন্তু লিখেছিলাম। বানিয়ে। এখন বুঝতে পারছি। কিন্তু লিখতে পারছিনা।
থাক। রেখে দিই।
ওহ! আরেকটা কথা। আমার বউ এসবের কিছুই জানেনা। বাসায় ফিরে আজ ঝগড়া বাধিয়েছিলাম। ইচ্ছে করে। তারপর বের করে দিয়েছি ঘর থেকে। এসে দেখবে আমি নেই। ভাববে ঝগড়া করে মরেছি। সেই ভালো। ওর ভুলটা ভাঙাবেন না। লেখাটা ওকে পড়তে দেবেন না। এই শুধু অনুরোধ। শেষ অনুরোধ। রাখবেন না?
===///===

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here