বাংলাদেশের গল্প। ইঁদুরের কপালে সিঁদুর জোটেনা। অসিত বিশ্বাস

0
565

অসিত বিশ্বাস-এর গল্প
ইঁদুরের কপালে সিঁদুর জোটেনা
মহানগরীতে যাওয়া আসার ব্যাস্ততম পথের ধারে গাঁও-গ্রাম বিতান। দৈর্ঘ্য প্রস্থ পরিমাপে বিতানখানা পাঁচখানা দোকানের সমান। এখানে বিক্রি – গ্রামীণ হাতের আতপ, সিদ্ধ, মোটা-চিকন, ঢেঁকিছাটা চাল, যাঁতায় পেশা মটর, মশুরি, খেশারি, ছোলার ডাল, পাটের শিকে, ফুল পাখী আলনা দোলনা…। মাটির হাঁড়ি কুড়ি থালা বাসন, ঘটি-বাটি, হাতি-ঘোড়া, বাঁশী, পাখী…। কাঠের টুল, চেয়ার, পিঁড়ি, হাতা খুন্তি ঘটি, গ্লাস, বাঘ, সিংহ, ছাইদানি…। লোহার দা, কাচি, নিড়ানি খোন্তা, কোদাল, হাতা খুন্তি, কুড়োল…। বাঁশের ঝুড়ি, ঝাঁকা, খালই, চালন, কুলো, সাঝি…। বেতের ধামা, কাঠা, ঢাক, ঢোল, দোলা…। সুতোর জাল, জালি, জামা, চাদর, বালশির খোল কত কী। এ সবই সূক্ষ্ম চোখ বোধে নরম কোমল শক্ত হাতের তৈরি। শুধু তৈরিই না, সবুজ সরল অন্তরের রঙে রঙ করাও। যা দেখে অন্যরা গাঁও-গ্রাম বিতানে উঠে আসে। এই বিতানে সকাল থেকে রাত কাস্টমারের ভিড় জমে। যে সব চোখ বোধ গ্রামকে ঘা-পাচড়ার মতো দেখে, সেই সব নগর-নাগর নাগরীরা এখানে ভিড় জমায়। এরা এই সামগ্রীতে ঘর সাজায় ও অহংকার উচ্চতায় অন্যকে তা দেখায়। শুধু দেখায়ই না, অশেকড়ে বসে দর্শকের কাছ থেকে শেকেড়ের প্রেম আদায় করে। তারপর এই দর্শকরাও ছোটে যাওয়া-আসার পথের ধারে গাঁও-গ্রাম বিতানে। বিতান মালিকের মুনাফাও আসে প্রচুর। কেন আসবেনা? বিল, বাওড়, খাল, নাল, ঝোপ, জঙ্গল ধূলো-কাদার গ্রামে নেমে এই বিতান মালিক এগুলো সংগ্রহ করে। সংগ্রহ করে – কথা ও ব্যাবহারের চাতুর্যে দু’শ টাকার সামগ্রী বিশ টাকায়। কখনো কখনো এই দরদাম সামান্য ওঠানামা করে। এটুকুতেই নির্মাতারা সন্তুষ্ট। তাতো হবেই, বৈশিক নগরপণ্যের দাপটে এদের কর্ম-রক্ত যখন অচল প্রায় তখন সচল শরীরে এই আয় কম কিসে! এটুকু আত্মসান্ত¦নায় এরা ঝুঁকে পড়ে কাজে হাত-মন চালায়। যত কাজ তত বিক্রি। কাজ, বিত্রি, অফুরন্ত।

নাগরিক সিং ক্যাঁতড়ের মতো মানিক নামক ছেলেটি এখন মানিক দা। এক দশকও গড়ায়নি গাঁও-গ্রাম বিতানের মালিক সেজে সারা রাজধানীর মানিক দা, অর্থ বিত্ত্বেও জ্যান্ত কুমির, রূপ চেহারায় সবুজ স্তন। সেই ফ্যাকাশে ঠোঁট চোয়াল এখন কাঁচা পদ্ম। এবং দু’খানা পা আজ নিউ মডেল চারখানা চাকায় রূপ নিয়েছে। শিল্প, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক যেকোনো অনুষ্ঠানে এর এখন সূর্যের মতো আমন্ত্রণ মেলে। মঞ্চে গলাও বাজায় ঢাক-ঢোলের ন্যায়। গ্রামীণ পণ্যে দু’বার পুরষ্কারও পেয়েছে। এবারও পাবে, ঘোষণা হয়েছে। পুরষ্কার মঞ্চে মানিকের কাঠ, পাট, বাঁশ, বেত, তাঁত, লোহা, মাটির সামগ্রীর গণ্ডা গণ্ডা আহলাদি প্রশংসা। (প্রশংসার মুখগুলোর এসব দ্রব্যের প্রতি অন্তরে ঘৃণা, বাইরে প্রেমের বেলুন ফাটানো বুলি।) এই প্রশংসায় মানিক মঞ্চে এক সরোবর হয়ে ওঠে।
মঞ্চে খানদানি মুখে মুখে নাচে মানিকের এই সামগ্রী আমাদের রক্ত-নাড়ির কথা বলে ও শেকড়ের ঐতিহ্য বহন করে। এ দেখামাত্র আমরা ফিরে যাই আমাদের আদি-র কাছে। মঞ্চে মানিক এ সময় গোপন রতœভা-ারের মতো স্থির থাকে। এবং মঞ্চ শেষে মানিক তলিয়ে যায় অটোগ্রাফ সংগ্রাহক ময়ূর ময়ূরীর ভিড়ে। চতুর মিডিয়াতো আছেই, চিৎ-কাত, উবুড় ও উল্টে-পাল্টে মানিককে নিয়ে নেয়, স্ব-স্ব বাক্স গুহায়।

মানিকের এখন বোঝা বোঝা ইজ্জত, বোঝা বোঝা গুনগান, পেশাদার খুনী, ইরোইনসেবি, ইয়াবা সুন্দর সুন্দরী, আদম ব্যবসায়ীও সেলুট ঠোকে। মানিক এখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রণে খায় ঘুমোয় লেট্রিন করে। বউকে বিন্যেঝাড় ভাবে, মা-বাবাকে দেখে বুড়ো-হাবড়া মাদার গাছের মতো। কলগার্ল রাখে, টাকাকে ভাবে বাজারের কেজি দরের টাকি। আর মানিক সামগ্রীর জনক-জননীরা কাক চিলের মতো খড়-নাড়ায় দিন-রাত্রি পার করে। এদের বউ সন্তানেরা গাও-গতর, রূপ-চেহারা, পোশাক-আশাকে মানুষ না মামদো ভূতের বাচ্চা তা বোঝা কষ্ট। সারা সূর্যই নয়, রাতের একটি অংশও এদের শ্রমে গড়ে।
তারপরও অষুধ পথ্য আত্মীয়-স্বজনতা শেষে এদের পেটে ভাত জোটেতো গায়ে কাপড় থাকেনা, গায়ে কাপড় থাকেতো পেটে ভাত আসেনা। এ দেখে, বুঝে এক সময় এরা Ñ অনেকে অন্য পেশায় হাত-মন গুঁজেছে। কেউ কেউ গ্রাম ছেড়ে শহরের আবর্জনার অংশ হয়েছে। কেউ কেউ রাতকে দিন করেছে ছুরি হাতে। কেউ জেল বানিয়েছে গৃহ। কারো আত্মজা শখের আহলাদি শরীরখানা বানিয়েছে শিয়াল শকুন পারাপারের সাঁকো।

গাঁও-গ্রাম বিতানে ঢেঁকিছাটা চাল দিতে দিনভর অন্যের খেতে বনশুয়োরের মতো খেটে রুগ্ন বউয়ের স্বামী বকুল যখন রাতে ঢেঁকি পারায় তখন প্রতিবেশি একপা খোঁড়া চান্দির মা ঝুলপেড়ে পেড়ে এগিয়ে এসে বকুলের মুখোমুখি চোখ ঝিজিবিজি করে কয়, কিরে বকুল, তোর জেবন না জাহান্নাম!
পায়ের নিচে ঢেঁকি চলতেই থাকে।
বউ মাগী একবার মরতি বয়চে, ইবার তুইও মরবি।
ঢেঁকি চলতেই থাকে।
পাও থামা, থামা বকুল।
থামাবো কি চাচী, এই পাও চালায়েই বউডার দুডে অসুধ কিনতিচি, দিনি খাটে যা আয় করি তাতে প্যাট চলে, অষুধ চলেনা।
তুই যে কাংলাশ অয়ে গেলি, তা-কি দেহিস?
ঘরেরডা থুয়ে নিজির দ্যাহার সুমায় কই?
প্রতিরাতে ছোট মেয়েটি সাথে নিয়ে বকুল এভাবে ঢেঁকি পারায়।
এর থেকে যে চাল আসে তা মহানগরে গাঁও গ্রাম বিতানে চলে যায়। বকুল এখানে স্থানীয় বাজার মূল্য থেকে কিছু বেশি পায়। মানিক লাভ করে তার কয়েকগুণ বেশি। এ চাল বকুলের হাতে যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ সাধারণের খাদ্য, মানিকের দখলে গেলেই নামি-দামি সম্মানীয় ভোগ্য। গাঁও-গ্রাম বিতানের সব পণ্যের বৈশিষ্ট্যই এই।

জাকজমক সরস আয়োজনে পুরষ্কার বিতরণের দিন এসে গেল। মঞ্চে মানিক ও গাঁও-গ্রাম বিতানের সামগ্রীর প্রশংসা কাঁচা-পাকা বক্তাদের মুখে মুখে নাচলো। শুধু কি নাচলো? প্রশংসার যত অভিধা আছে সব মানিকের গলায়, মাথায় পরিয়ে পরিয়ে নাচালো। মঞ্চে উপবিষ্ট মানিক এ সময় যেন সাড়ে সাতটনের এক হাতী। শেষে মানিককে কিছু বলতে বলা হলে আবেগে আহলাদে চোখের জল, বুকের পশম এক করে তোলে। মানিক এখন সারা মিডিয়ার ক্যামেরা এই অনুষ্ঠান চিৎ, কাত, উবুড় করে এবং দেশ সহ বাইরেও এই বার্তা ছড়িয়ে দেয়, আর নগর মুখে আলোচনার ঝড়তো থাকেই।

দুপুর এখন, গদাই ঋষি বাঁশতলা বসে ঝাঁকা বুনছে, জগবন্ধু পাল ছেঁড়া মাদুরের মতো মুখ করে গদাইয়ের মুখোমুখি হয়, গদাই একখানা পিঁড়ি এগিয়ে বলে, বসো।
জগোবন্ধু বসে – কিচু কি শোনেচো?
কি?
ওই যে লোকটা তোমার আমার বাঁশ বেত মাটির জিনিষ নিয়ে যায়, সেই মানুষটার কা-কারখানা।
কী কা-কারখানা?
জিনিষ করি আমরা, চালায় তার নামে, আবার পুরষ্কারও পায়।
কও কি!
হয়, সব খবরে তাই পোরচার করতিচে।
এখানে আরো কয়েকজন এসে দাঁড়ায়, কথার পর কথা বৃদ্ধি পায়। যে লোহা-সামগ্রী দেয়, সে হাঁফর থামিয়ে হাতুড়-ছেনি গুছিয়ে মাথায় তেল ঘষতে ঘষতে ডুবোতে যাবার পথে এগিয়ে এসে এদের কথা শোনে, শুনে কড়মড়ে মুখ বলে, যে পুতরা মানিকরে পুরষ্কার দিলো, গুনো কেত্তন করলো, ওরা কারা? ওরা এই মাটির মানুষ না? নাকি ওরা চাঁদেরতে আয়চে? এ মাল কাগের? কারা তয়ার করে জানেনা?
তন্তু কারিগর বলে Ñ তা জানেনা? জানে। সব জানে, ওরাতো আহাশেরতে আসিনেই, কিন্তুক স্বভাব যাবি কনে? পরের জম্মানে ছাওয়ালের মুহি বাপ ডাক শুনার এ্যাক জাত থাহে, ওরা সেই জাত।
সূত্রধর বলে – তাইতো অবি, এ অবিনে ক্যা? এ কতি ওগেরতো কষ্ট করা লাগেনা। দিনভর যদি কাঠ, লোয়া, তাঁত, বাঁশ, মাটি খাপায়ে তয়ার করে করতি অতো তা ফচফচ করে অত কওয়া আসতোনা, এ অচ্চে চাল-ডাল আমার, গৌরাঙ্গ তোমার। তাছাড়া ওগের মুখ-গুয়া চেনা-বোঝা কষ্ট। চাষা বিল্লাত কয় ঠিক কইচো, ওরা মহি কয়, গাং কাঁদলি মানুষ কাঁদে, গাং নাচলি মানুষ নাচে। গাং মানুষ এ্যাক মুহি কতা কয়। আবার সুযোগ পালিই সেই গাঙের গলাটিপে ধরে। এ করে করে সবগুলো গাং ওরা শ্যাষ করে ফেললো। এ কতা ওরা একবারও কয়না, ভাবেওনা, তা তোমার আমার কতা কি কবি?
গদাই ঋষি টাক চুলকাতে চুলকাতে বলে – এ্যাতো কতাতো কতানারে, কতা অলো কলা থুয়ে খোশার কদর বাড়ে গেলি সেই মাটিতে কলা না জম্মে খালি খোশাই জম্মে। আমিতো মাল আর দিতি চাচ্চিনে।
বিল্লাত বলে – না দিয়ে যাবা কনে? তুমি দিবানা, তোমার প্যাট দিবি। ওই প-িতরা এ জানেই তোমার গাওনা না গায়ে মানিকের গাওনা গায়।
কতাইতো তাই।
জগবন্ধু পাল কয়, বুড়ো বঙ্কোপালের মাটির কাজ খালি অন্যরাই না, পালেরাও চায়ে চায়ে দেখতো, সেই বঙ্কো বুড়োর মদ্দি এ্যাক লোভও ছিল, মেডেলের লোভ, তার সোন্দর কাজের লাগে এ্যাকখান মেডেল পাওয়ার জন্যি মানুষটা বুড়ো কালেও দিন-রাত খাটে কত রঙে চঙে কত পোরকার মাটির কাজ করেচে, কিন্তুক এ্যাকখান মেডেল সে পালোনা, মরার কালে মাঝে মাঝেই কতো, ইঁদুরির কপালে সিঁদুর জোটেনারে। অথচ কত অজাত কুজাত মেডেল পাচ্চে।
তাইতো পাবি, এই মেডেল পাওয়া-পাওয়ি এ্যাক তামেজগিরি খেলা। তা যদি না-অবিতা যে বাঁশ, ব্যাত, তাঁত, ঢেঁকি, হাঁফর, নাঙল চেনেনা, সে তার পুরষ্কার পায়? এ মাটিতে এই খেলাই চলতিচে।
তাতো চোহির সামনেই ঘটলো। চুরি, ছ্যাঁচড়ামি, খুন, খারাপি করে জাম্বুল কয়ডা টাহার মালিক যেই অলো, সেই থানা-জেলা উঠে পড়ে তারে কৃতি সন্তানের পুরষ্কার দিলো। যারা রোদ ঝড় বিষ্টি আঁধারে খাটে পিটে দ্যাশটারে খাওয়ায়ে পরায়ে বাঁচায়, এগের কেউ ধূলোও মনে করেনা, বলে ফোঁস ফোঁস করে বিল্লাত। এই ফোঁস ফোঁস বিল্লাতের বাপও করেছে, তার বাপও। কিন্তু সামনে কেউ পা এগোয়নি। যদি কেউ এগোতে চেয়েছে, পাশ থেকে বলেছে, যাও, নিজির গুয়া নিজি কাচিদে ফাড়োগে।
এ দেখে, শুনে, ভ-ুল এক সময় বলতো, ঘরে বউ কোঁকায়, বারান্দায় মা, চান্নিক রাতের মতো পোয়াতী মায়েডা শুহোতি শুহোতি নেড়িকুত্তো, ভাগাড় আর উঠোন ছাওয়ালের কাছে এ্যাক, তারপরও এদের কান নড়েতো মাথা নড়েনা।
গদাই ঋষি তার বিড়ির কৌটো খুলে হাতে হাতে এক একটা বিড়ি দেয়, সবাই ধূয়ো উড়োয় আর বলে, এইতো আমাগের পাওনা। এইতো দিন-কাল।
গল্পগুলো ‘চালচিত্রে’ প্রকাশিত।
আরও গল্প পড়তে ভিজিট করুন www.chalchitro.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here