বাংলাদেশের গল্প। অসিত বিশ্বাস

0
506

অসিত বিশ্বাস-এর গল্প

খরা বৃষ্টির গল্প

খনখনে খরায় কাক চিলের দেখা নেই, শৃগাল বেজিও খুঁজে পাওয়া ভার। বৃক্ষ অরণ্যের প্রতি দৃষ্টি গড়ালে চোখ ভরে এক একটি কঙ্কাল উঠে আসে। খাল বিল নদী নালা নিরন্ন রমনী যেন। মাঠগুলো মৃত সাপের খোশা। কোথায়ো এক চিলতে ফসল চোখে আঁটেনা। সকালের সূর্য ফোটামাত্র সর্বত্র গলগলে আগুন ঢেলে পড়ে। মাঠ ঘাট বিল অরণ্য পুড়ছে। পুড়ছে কলিজা। গত আশ্বিনে একটু বৃষ্টি গড়লেও এখন জ্যৈষ্ঠের শেষ। আকাশে দৃষ্টি গড়ালে চোখ ঠনঠন করে। রাতের জোসনাও মনে হয় ঝাঁঝালো রোদ। এলাকাটি এমন ছিলনা। কয়সন আগেও মৌসুমি রোদ ঝড় বৃষ্টি কুয়াশায় সবাই ভিজতো, পুড়–তো। এখন এক এক সন গড়ছে, প্রকৃতি এক এক রূপ নিচ্ছে। গেল বছর অকালবন্যায় মাঠ ঘর ডুবে গেল। এবার খরা। কলিজা ছেঁড়া খরা। গাছপালা মাঠ ঘাট নদী নালা চাম শরীর যত পুড়ছে, তার অধিক পুড়ছে পেট। চারদিকে বিদীর্ণ অভাব। মৌলিক অভাবেরা মাঠ-ঘাট, ঘর-উঠোনে নৃত্য করছে। কোরাস গাইছে। তবে সব ঘর উঠোনে নয়। কেউ পুড়ছে, কেউ কাঁদছে, কেউ বোগল বাজিয়ে গিরে গুনছে। খুনীর খড়গের মতো দিগন্ত বিস্তৃত অভাব। অভাবী মুখ ঝড়োপাখীর মতো ছিন্ন বিচ্ছিন্ন। মা-ছেলে, ভাই-বোন, বাপ-মেয়ে, একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, এবং অখাদ্যও খাদ্যে এনে ভক্ষণ করছে। বিড়াল বেজিও এখন এদের খাদ্য তালিকায়। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে যে যেমতো পারছে, খাচ্ছে। ধর্ম অধর্ম সব উধাও। এ দেখে সুযোগ সন্ধানীরা সম-অসম বাছ-বিচারহীন ছোট বড় দেহ – পান বিড়ির মতো খুচরো পয়সায় গিলছে, গোঁফ-মোচ উঁচিয়ে লম্বা পা ফেলে চলছে, ফিরছে। ঊনপঞ্চাশে এক শাল তেত্রিশ টাকায় তের বছুরে এক মেয়েকে ভোগ করলো, ভোগতো খুন করলো।

পললের মা যার ঘরে ঝাটা-বারুনের মতো অভাব নিত্য খেলা করে, তয় কোনো দীনতা তাকে স্পর্শ করেনা। সেও এখন উদাসীন। মেয়েটি ঘরে না বাইরে চোখ করেনা। ওর মুখের প্রতি তাকালে চোখদুটো শুঁকটো কুমড়ো ফুলের মতো দেখায়। গোলক কয়, মানুষ এখন ফড়িং। মৃত্যুও ছড়াচ্ছে প্রতিদিন। শিশু বুড়ো সহ অনেক মৃত্যুর খবর হচ্ছে দৈনিক। জাতীয়তা, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র উধাও। ওদের ফুকচিও কোথায়ো নেই। সময় যত গড়ছে গাছপালা, মাঠ-ঘাট, নদী অন্তর তত পুড়ছে। মানুষ ও মালপোকা বিভাজন করা এখন দুরহ। সবাই দ্বিগি¦দিগ ছুটছে। মুগুরের মতো হাত-পাওয়ালা করাতি শুকুরের ছেলে ঝড়–, যার শরীর স্বাস্থ্য অনেকটা বাবার আদলে কিন্তু করাত পায়নি, পাবে কী করে? এ বাবু সাহেবি জামানা না? কল টিপলেই হাতী গণ্ডারের লাশের মতো গাছ-গুঁড়ি ফরফর করে চেড়ে ফাড়ে। এখন এজন্য ঝড়ুদের আজ কি থাকলো, কি থাকলোনা, এ দেখার সময় কই? আজ ঝড়ুরা শুধু সুমারির খাতা পুরনের বস্তু। এরা কে কোথায় কিভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস গড়ালো কী গড়ালোনা, এ কারো দেখা জানার কিছুনা। মাঝে শুধু ভোট এলে এরা প্রয়োজনীয় হয়, ভোট গেলে খড়কুটো। নরু পাটনি এ দেখে দেখে কয়, এ বাবু সাহেবি হিসাব, নাঙ ভাতারি পীরিত পীরিত হিসাব।
খরায় খরায় গরু বাছুর ছাগল ভেড়া জমি জিরাতও অবিক্রি, কেউ কেউ ফেলে রেখে সরে যাচ্ছে। নিধু দুটো গাই টাকায় নয়, পয়সায় অন্যের হাতে ধরিয়ে দিয়ে সরে গেল। কোথায় গেল, সে নিজেও জানেনা। ঝড়ুর গাভীটা মা হবে, সে এখন এর প্রতি তাকাতে পারেনা, তাকালে চোখ ফেটে জল আসে। অনেক কষ্ট যত্নের সম্পদ এ। অভূক্ত প্রাণিটা দিনভর বুড়ো নীমতলা বাঁধা থাকে, ঝড়– ডাল-পাতা ভেঙে এনে সামনে ধরে, খায়। এ খাবারে পশুটির পেট না ভরলেও ঝড়ুর কিছুটা মন ভরে। এখন গাভী যতনা তার অধিক এর পেট। এ দেখে ঝড়ুর মধ্যে এক শঙ্কা দুরুদুরু করে।
সকাল এখন। গাভীটি অস্থির। একবার শোয়, একবার দাঁড়ায়। ঝড়–ু কাছ থেকে সরেনা। বিয়োবে, বাচ্চার দু’খানা পা বেরিয়ে আসে। অশান্ত ঝড়ু। বাচ্চা আর বাইরে এগোয়না। মা আছাড়ি পিছাড়ি করে। খালাশ হয়না। ময়নার মা ও ঝড়ু কসরত করে। বেশক্ষণ। এক সময় পশুটি চোখ উল্টে জীভ বার করে শীতল। এ দেখে ঝড়ু শিশুর মতো ভেউ ভেউ করে কেঁদে ওঠে। আরো একটু সময় গড়ে। মা-সন্তান দুইই নিথর হয়ে যায়। ঝড়ু আরো জোরে কাঁদে।
ময়নার মা কয়, ওরে – পোড়া কপালে কাঁদে কি করবি, ভরাপড়া খাইকুন্নি খরা ইবার গরীব দুককের সব কিচু ধুয়ে মুচে না খায়ে খাবিনানে। ঝড়ু কাঁদতেই থাকে।

দিবা-রাত্রির গরম এখন বিভাজনহীন। খড়খড়ে চাষারও মাটিতে পা রাখা কষ্ট। খোলা মাঠে দৃষ্টি গড়ালে চোখ-কুঁচকে আসে। আকাশে চোখ তোলা দুরহ। মজিদের খালা ডুমুরতলা বসে কুঞ্চিত চোখ উপরে তুলে কয়, উ-উ-রি খোদা! আহাশ এ্যাহেবার ন্যাপা! আহাশ মাগী কি ভাঁজা অয়ে গেল!
পাশে বরকত বুড়ো মাটিতে চোখ গুঁজে ঝিমোচ্ছে।
গোবিন্দর বউ পা ছড়িয়ে মাটিতে জাবড়ে বসে দূরে দৃষ্টি ছড়িয়ে ছোট ছেলেটার বুক চাটাচ্ছে। নরেনের ছাগল জিকেতলা জীব বার করে হাঁফাচ্ছে। গোবিন্দর বৌয়ের পাশ দিয়ে একটা গোখরা ন্যালব্যালিয়ে চলে গেল। নদী বৃক্ষ চুপচাপ। এঁদো ডোবায় দু’টো সারমেয় গা-জবড়ে বসে রয়েছে। এখানে ওখানে জলবাহিত রোগ। জ্বর। পাড়ায় পাড়ায় ব্যাঙের বিয়ে হচ্ছে, গাওয়া হচ্ছে গীত – আল্লা মেঘ দে, পানি দে…, মানুষের ঘাড়-মাথা পশুর মতো নিচু। চোখগুলো আমলকি বয়রার মতো শুঁকটো, হাত পাগুলো দড়াদড়ি। কাজ নেই, পেট আছে, পেট যন্ত্রণায় মায়া-মমতাহীন সব এদিক ওদিক বাড়াচ্ছে পা। রাষ্ট্রযন্ত্র প্রতিদিন স্ব-চরিত্র উগড়াচ্ছে – খরা আছে, অভাব নেই, পর্যাপ্ত খাবার ও সেচ্ছাসেবক প্রস্তুত। খরা কবলিতরা এ শুধু শোনে, দেখেনা কিছু। কেউ বলে, খরা আর কতদূর এগোলে, কতপ্রাণ ঝরলে, এই যন্ত্র মানুষের কাছে আসবে? এ রাষ্ট্রযন্ত্র শোনে, কিন্তু গায়ে মাখেনা, মিটমিটিয়ে হাসে।

গাভীটা হারাবার পর হুতুম প্যাঁচার মতো এক রাত গড়িয়ে আপন উঠোন থেকে ঝড়ু বাইরে পা বাড়ায়। কোথায় বাড়ায়? কোনদিকে বাড়ায়? তা বোধে রাখেনা। যেতে হবে এটাই তার গভীরের তাড়া। দু’দিনপর ঝড়ু এক গন্ধ অনুভব করে, এই গন্ধ তার গভীরে স্বর্গ মর্ত কড়মড়িয়ে উদরস্থ করার ঝড় তোলে। সে এখন ডাইনে মুখ করে পা মারে, হাঁটতে হাঁটতে প্রাসাদসম গৃহ, গৃহের ভেতরে বাইরে অজস্ত্র ঝকঝকে মুখ আর মুখ, আড়ং মেলার মতো খুশীর তরঙ্গ ছড়াচ্ছে। ঝড়ু বকুলতলা দাঁড়ায়। শুকনো জিকে নলার মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বসে, পঁচা খড়-গাদার মতো হাঁটুভেঙে বসে থাকে। পাশে গোটাকয় কুকুর একই ভঙ্গিতে। কিছুপর চতুষ্পদগুলো ঘেউ ঘেউ করতে করতে প্রাসাদের পশ্চিমধারে ছোটে, পিছে ঝড়ুও। এবং প্রাণিগুলো যেখানে নেমে যায় সেখানে দূর থেকে ছুঁড়ে দেওয়া উচ্ছিষ্ট এসে পড়ছে। সারমেয়রা কামড়া কামড়ি করে তা নিজ নিজ দখলে নিচ্ছে। গিলছে। এ প্রাসাদের ছোট্ট খুকীর জন্মোৎসবের উচ্ছিষ্ট এ। ঝড়ুও ওই প্রাণিগুলোর সঙ্গী এখন, এবং ওদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে, এরা এখন যে যেভাবে পারে উচ্ছিষ্ট দখলে নেবার চেষ্টা করে। প্রাসাদ গভীরে খুশীর ধুম চলছে। অতিথিরা প্রজাপতি যেন, যে যেমন পারছে পাখা মেলে ভাসছে।
বুড়ো, বুড়ি, যুবক, যুবতী, কিশোর-কিশোরী সব এক হয়ে গেছে। ঝোলাবুক, ভাঙা চোয়াল, রাঙাঠোঁট, সব একাকার, চেনা-বোঝা দু:সাধ্য। অন্তর নয় অঙ্গ এখানে মূল। যে অঙ্গে যত রঙ, যত ঝলকানি, সে তত বিদূষ-বিদূষী। এই সব শরীর মনে কখনো খরা বন্যা ছাপ ফেলেনা। এরা সর্বক্ষণ সর্বত্র হাসে, নাচে, ওড়ে। উচ্ছিষ্ট ফেলা খড়খড়ে ডোবায় থেকে থেকে ঝগড়া হচ্ছে, এক পক্ষ দাঁত উঁচিয়ে ঘেউ ঘেউ করে ঝড়ুকে যেন বলছে, তুই কেডা? সর। ঝড়ুও হাত তুলে বলছে, তোরা সর।
এ দেখে একগাদা এঁটো খাবার এনে একজন ঝড়ুর সামনে ধরে, ঝড়ু তা হাভাতের মতো হাতে নিয়ে পিছন ফেরে, এবং সোজা পৌঢ় বটতলা এসে বসে, খায়, গেলে। গিলতে গিলতে অপারগ বাঁকি খাবারটুকু কলাপাতায় মুড়ে স্থির বট শিকড়ের উপর বসে থাকে। এখন বিকাল গলতে গলতে সূর্যটা পাকাকেশ রাঙা। হঠাৎ আকাশে চাঙড়া চাঙড়া মেঘ, গরম আরো ক্ষিপ্র। ঝড়ু শিকড়ে বসে পিঠে গাছ ঠেকিয়ে নটে শাকের মতো নিরব। এ সময় নিরব একখানা মুখ, বয়স বিশ-একুশ, তামারাঙা গাত্রবর্ণ, আটো-সাটো শরীর বোঝালেও খাদ্যাভাবে শুকটো দেখাচ্ছে। মুখখানা কলাপাতার পুঁটলির পরে চোখগেড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ঝড়ু পুঁটলিটা বামধার থেকে ডানধারে সরিয়ে নেয়। চোখ দু’টোও ওখানে সরে যায়। ঝড়ু বিব্রত বোধ করে ডানকাতে সরে বসে। গরম এখন ক্রমেই উগ্র। নির্বাক মুখখানা এগিয়ে এসে পুটলিটা ধরতে চায়।
ঝড়ু ওর হাতখানা চেপে ধরে। তারপরও হাতখানা পুটলির পরে এগোবার জন্য ঝড়ুর হাতের মধ্যে প্রাণপণ চেষ্টা করে মোচড় খায়। শেষে এগোতে না পেরে সামান্য পিছিয়ে কোমরের জীর্ণ বস্ত্রটুকু সরিয়ে তলপেট উন্মুক্ত করে, ঝড়ু ওদিকে চোখ রাখতেই ভেতরটা দুলে ওঠে। ভেসে ওঠে মা হতে যাওয়া গাভীটা। সে এখন কলাপাতার পুঁটলিটা সামনে আনে, এগিয়ে ধরে শুকনো পাতার মতো মুখখানার প্রতি, এবং পুটলি উন্মুক্ত করে এসময় কলাপাতায় যা দেখে তা যৎ সামান্য। এ দেখে ঝড়ু উঠে যায়, সামনের ছিলছিলে জলাশয়ের ধারে গিয়ে বসে, গলায় আঙুল চালায়, বমি করে, তা থেকে যতটুকু বার হয় তার সবটুকু ধুয়ে কচুপাতায় করে ওই মুখখানার সামনে ধরে। মুখখানা কাকের মতো এ গিলে নেয়। ঝড়ু স্থির বসে থাকে। চাঙড়া চাঙড়া মেঘ এখন বেশ জমাট। বিকালও ঝুলেপাড়া স্তনের মতো নেতিয়ে এসেছে। খাওয়া শেষ করে মুখখানা বটের শেকড়ের উপর ঝড়ুর গায়ে গা ঘেষে বসে। ঝড়ু এখন খরা নয়, এক ওম অনুভব করে। এই ওমের পাশের ঠোঁট দুখানায় ছিলছিলে ঝরণার মতো এক প্রবাহ গড়ে। আর কিছু পরই সন্ধ্যা ঘনায়, বৃষ্টি ঝরে।
দুটি মুখ এখন মানুষের মতো দেখায়।
আরও গল্প পড়তে ভিজিট করুন www.chalchitro.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here