ফ্রাৎঞ্জ কাফকা। আলফাজ আইয়ূব

0
507

ফ্রাৎঞ্জ কাফকা

আলফাজ আইয়ূব

প্রসঙ্গত: অনুবাদে মূলের স্বাদ পাওয়া যায় না। দেয়াও সম্ভব নয়। মূলানুগ থাকার দৃঢ়বদ্ধ সংঙ্কল্পও অনুবাদকের ব্যক্তিসত্ত্বার উপস্থিতি ও রচনা শৈলীর স্বাতন্ত্র চাপা রাখতে পারে না। ছাপ থেকে যায়। পাঠক তা উপলব্ধি করেন। তবু পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখা এবং পাঠ নিবিষ্ঠ রেখে তাকে মূলের নিকটতম অনুভূতি প্রদানের সক্ষমতাই অনুদিত কর্মের সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। কাফকার গল্প অনুবাদের ক্ষেত্রে এ লক্ষ্য অর্জন দূরূহতম কাজ। কারণ নানাবিধ। তন্মধ্যে অন্যতম কাফকার রচনা-শৈলী। জার্মান ভাষারীতি অনুসরণ করতে গিয়ে কাফকা দীর্ঘ বাক্য রচনা করেছেন। কখনো কখনো তা কাগজের পাতার শেষভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। আকার অর্থের পূর্ণতা প্রদান এবং পাঠকের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে বাক্যের পূর্ণচ্ছেদ টানার পূর্বে ব্যবহার করেছেন বিশেষ রীতি। শব্দ বিশেষের সুনির্দিষ্ট প্রয়োগের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া। খণ্ড বাক্য গঠনে জার্মান ভাষায় ক্রিয়াকে পদায়ন করা হয় বাক্যের শেষে। সচেতনভাবে এবং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাফকা ব্যবহার করেছেন এই বাক্য গঠন রীতি। অনুবাদকালে জার্মান ভাষার বাক্যরীতির অনুসরণ কিংবা ইংরেজি বা বাংলায় অনুরূপ বাক্য গঠন আদৌ সহজসাধ্য নয়। এছাড়াও জার্মান ভাষার নামীয় শব্দ বিন্যাস ও বাক্যরীতিও একটি বিবেচ্য বিষয়। যার ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হয়েছে অনুবাদের বিভিন্নতা, বিশেষত: ইংরেজি অনুবাদের সচেতন ব্যবহার তার রচনায় সৃষ্টি করেছে বিশেষ ব্যঞ্জনা কিন্তু বহুতার্থের কারণে ভাষান্তর প্রক্রিয়াকে করে তুলেছে জটিল। এ সকল সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনায় রেখেই মূল টেক্সটের স্বাদ প্রদানের সচেতন প্রয়াস থাকে প্রতি অনুবাদকের, অত্র অনুবাদকও ব্যতিক্রম নয়।
ফ্রাৎঞ্জ কাফকার জন্ম হয় তৎকালীন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের বোহিমিয়ার প্রাদেশিক রাজধানী প্রাগের জার্মান ভাষা-ভাষী এক ইহুদি পরিবারে। অঞ্চলটি এখন চেক রিপাবলিকের অন্তর্গত। তাঁর জন্মকালটা ছিল ৩ জুলাই, ১৮৮৩ খৃস্টাব্দ। পিতা হারমান কাফকা তখন ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। মা জুলী কাফকার পূর্ণ নাম ছিল নী লোয়ী। অধিকাংশ প্রাগবাসী তখন চেক ভাষায় কথা বলতেন। চেক ও জার্মান ভাষীদের মধ্যে বিদ্যমান বিভাজন ছিল তখনকার এক সুস্পষ্ট বাস্তবতা। উভয় দলই ব্যাপৃত ছিল আত্মপরিচয় অনুসন্ধানে। ইহুদি সম্প্রদায় আটকে পড়েছিল এই দুই ভাবানুভূতির মাঝখানে। স্বভাবত:ই কোথাকার অধিবাসী তারা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয় তাদের।
কাফকা পরিবার ততদিনে চেক সম্প্রদায়ে অঙ্গীভূতি হয়ে পড়েছে। তথাপি প্রাগ নগরীর জার্মান ভাষী অভিজাতদের মধ্যে স্বীকৃতি লাভের সুপ্ত বাসনা সর্বদাই ক্রিয়াশীল ছিল পরিবারটির মধ্যে। স্বভাবতই চেক স্কুলের পরিবর্তে ফ্রাৎঞ্জ কাফকাকে প্রেরণ করা হয় জার্মান স্কুলে। মধ্যবিত্ত পরিবারের এই অন্তর্লীন প্রত্যাশার প্রদীপ দীপ্যমান রাখার দায়িত্ব যেন অবধারিতভাবে নেমে আসে কাফকার স্কন্ধের উপর। কারণও ছিল। তিনি ছিলেন পিতা-মাতার জ্যেষ্ঠ এবং একমাত্র জীবিত পুত্র সন্তান। স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা করা হতো পরিবারের পরিকল্পিত জীবন পথই অনুসরণ করবেন কাফকা। কিন্তু তা হয়নি। ঘটেছে বরং উল্টোটাই। শৈশব থেকেই পিতার হতাশার কারণ হয়ে ওঠেন তিনি। পিতার তুলনায় নিজেকে অকিঞ্চিৎকর হিসেবে উপলব্ধি করতে শুরু করেন। এটি যুক্ত হয় জার্মান ও চেক সম্প্রদায়ের মধ্যের দ্বিবিভাজন হতে সৃষ্ট কাফকার বিচ্ছিন্নতাবোধের প্রাথমিক অনুভূতির সঙ্গে। চেক ও জার্মান উভয় ভাষাই সাবলীলভাবে ব্যবহারে সক্ষম ছিলেন কাফকা, তবে জার্মানকেই তিনি গণ্য করতেন মাতৃভাষা হিসেবে।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাফকাকে আইন অধ্যয়ন করতে হয়। এ উদ্দেশ্যে তিনি প্রাগের জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ে গমন করেন। সেখানে আইন অধ্যয়ন সমাপ্ত করে ১৯০৬ সালে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। কিন্তু আইন পেশায় নিজের সাফল্য সম্ভাবনা নিয়ে আদৌ সন্তুষ্ট ছিলেন না কাফকা। সে কারণেই প্রাগের এক ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি গ্রহণ করেন। ১৯০৮ সাল থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত কাফকা এ পেশাতেই নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু ১৯১৭ সালে তিনি যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন। রোগটির প্রবল প্রকোপে ক্রমশ: দুর্বল হয়ে পড়েন কাফকা। ফলে চাকরি থেকে অবসরে যেতে তিনি বাধ্য হন। ১৯২২ সনে অবসর গ্রহণের পরবর্তী জীবনটা কাফকা অতিবাহিত করেন বিভিন্ন স্যানাটরিয়ামে। ২ জুন, ১৯২৪ সনে অস্ট্রিয়ার কিয়েলিং-এর একটি স্যানাটরিয়ামে তাঁর মৃত্যু হয়।
কাফকা অবসর সময়ে লিখতেন। শুরুটা ছোট গল্প দিয়ে। কিন্তু পছন্দের এই কাজটিতে আত্মনিবেশের জন্য সময় না পাওয়ার অভিযোগ করতেন তিনি সর্বদা। কাফকার গল্পের এত ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে পাঠককে রীতিমতো ধন্ধে পড়তে হয়। বলা হয়ে থাকে যে, শেক্সপীয়রের পরে কাফকা ব্যাতীত আর কোন লেখকের রচনার এত বেশি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ আর হয়নি। বহুমুখী সেসব ব্যাখ্যার একটি হল আত্মজৈবনিক উপাদান কেন্দ্রিক। দাবী করা হয় সে গল্পের চরিত্রগুলো – বিশেষত: কেন্দ্রিয় চরিত্রগুলো কাফকার আত্মছবিরই চিত্রায়ণ। তার গল্পে তুলে ধরা হয়েছে বিবাহিত ও অবিবাহিত জীবনের দ্বন্দ্ব, সংশয়বাদ ও ধর্মবিশ্বাস মধ্যে বিদ্যমান দ্বন্দ্ব। এছাড়াও আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান, অংশীদারিত্বে নিপতন, স্বাধীনতা অর্জন ও বর্জন, অসহিষ্ণুতা ও সহনশীলতা, সময়ের পরিবর্তন, ক্ষত, নির্মাতা, অব্যাখ্যাত নিষ্ঠুরতা ইত্যাদি।
কাফকা আধুনিক মানুষের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত বিন্যাসের ধ্রুম ও ধ্বংসকে নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। এই সক্ষমতার কারণেই কাফকা বিংশ শতাব্দির গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের অন্তর্ভূক্ত হয়েছেন। সমালোচকদের মতে ব্যক্তিগত যন্ত্রণাকে সার্বজনীন উপাখ্যানে রূপান্তরিত করার ক্ষমতা লেখক হিসেবে কাফকাকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন করেছে। তাঁর কোন অগ্রপুরুষ নেই – মনে হয় কোনখান থেকেই আগত নয় তার সৃজনকর্ম এবং তার সত্যিকারের কোন উত্তরাধিকারও নেই। স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্র এবং নাজী হত্যাযজ্ঞের সম্পর্কে এক ধরনের ভবিষ্য বাণী হিসেবে গণ্য করা হয় কাফকার লুজান কর্মকে। এছাড়াও তার সাহিত্য কর্মের মধ্যে ইহুদি সুফিবাদ নামহীন অজানা সুফিবাদ এবং ঈশ্ববিহীন মানুষের যন্ত্রণা উঠে এসেছে। তার উপন্যাস আধুনিক মানুষের একাকীত্বকে, আত্মানুসন্ধানকে। একারণেই তার সমস্ত গল্পে আত্মজৈবনিক সুস্পষ্ট উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। কাফকা ছিলেন সত্যিকারে একটি প্রতিভা এবং মানব আচরণের সাধারণ গণ্ডির বাইরে নিয়ে বিচার করলে দেখা যায় তিনি একজন ঋষি।
কাফকার রচিত সাহিত্যকর্মের তালিকা খুব দীর্ঘ নয়। ৩টি অসমাপ্ত উপন্যাস, দুই ডজন ছোট গল্প, রূপক কাহিনী ও খণ্ডচিত্র সদৃশ সংক্ষিপ্ত রচনাবলী এবং সুবিখ্যাত ‘পিতার নিকট পুত্র’কে তার অন্যতম সৃষ্টি হিসেবে গণ্য করা হয়। এছাড়াও নিয়মিত ডায়রী লিখতেন এবং প্রিয়জনকেও লিখেছেন অসংখ্য পত্র। গল্পে বাস্তবতাকে অতি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন কাফকা, তথাপি অনেকেই এগুলোকে স্বপ্ন বা দু:স্বপ্ন হিসেবে এক কথায় তুলে ধরেন। আমলাতন্ত্রের সুবিস্তৃত জাল ও সৈরাচারের সুকঠিন নিগঢ়ে আবদ্ধ আধুনিক মানুষের জীবন যন্ত্রণাকে চিত্রিত করতে গিয়ে কাফকা রাজনৈতিক শক্তির পর্যালোচনা করেছেন, এমনকি ব্যঙ্গ করতে দ্বিধা করেননি।
জীবতকালে লেখক হিসেবে স্বীকৃতি, পরিচিতিও তেমন একটি জোটেনি কাফকার ভাগ্যে। আপন সৃজনশীল কর্মের মূল্য সম্পর্কেও তিনি খুব বেশি সচেতন ছিলেন না। হয়তো তাই বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে তার সমস্ত রচনা পুড়িয়ে ফেলার অনুরোধ জানিয়েছিলেন কাফকা। কিন্তু ম্যাক্স ব্রড বন্ধু কাফকার মৃত্যুকালীন অনুরোধ রক্ষা করেননি। কাফকার রচনাসমূহ পোড়ানোর পরিবর্তে তিনি বরং প্রকাশ করেছেন। ফলে কাফকার অনন্য প্রতিভার আলো দ্যুতি ছড়াতে পারছে বিশ্ব সাহিত্যে। তাঁর গল্প অনুবাদ করতে গিয়ে এই লিখেছেন অনুবাদক আলফাজ আইয়ূব। – এডমিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here