প্রান্তিকজনের কথা – গ্রামশির দূরবীন – সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ

0
1082

গ্রামশির দূরবীন

সৈয়দ রিয়াজুর রশীদ

প্রান্তিক মানুষ

পণ্ডিতের কিতাবে নাই অথচ-বিরাজ করে জমিনে – মিলিত কণ্ঠে মানুষ লাঞ্ছিত-বঞ্চিত, চাপা পড়া মানুষ, লোক সমাজ। রক্তে কোনো প্রোব্লেম নাই-কিন্তু, মানুষে মানুষে উচ্চনীত ভেদাভেদ।
দেশে-দেশের, জমিনের সম্পদ মানুষ, বিদ্রোহ, বিপ্লবে জ্বলে ওঠে মানুষ; মরে বাঁচে; রুখে দাঁড়ায়, ঘুরে দাঁড়ায়-মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস যেখানে স্থান সর্বোচ্চ কিন্তু নির্বাসিত তবু-তার অস্থিত্ব-ইতিহাসের পাতায় উপেক্ষিত; মূল চরিত্র হতে প-িতগণের হাতে কলমে এই বিপুল বিশাল জনারণ্য উৎপক্ষিত; পার্শ্ব চরিত্র ঠাঁই নিয়ে ইহারা কেবল মানুষ, নামহীন গোত্রহীন চরিত্রহীন, ঠিকানাহীন।
ইতিহাসে পরবাসী মানুষরাই সৃষ্টি করেছে-
যা কিছু গড়েছেÑরক্তে-ঘামে-শ্রমে আর প-িতের তত্ত্ব তখন জেগে ওঠে অথচ ঝলসে যাওয়া এই সব নিচুতলার মানুষ, চালচুলাহীন মানুষ তখন বেখবর হয়ে যায়।
মানুষ গড়ে।
মানুষ মরে।
মানুষ লড়ে।
শক্তির উদ্বোধনে মানুষ অপরিসীম অথচ –
সাড়া নাই এই সব মানুষের – কোথাও খুঁজে যায় না পাওয়া উচ্চ বর্ণের ‘শাদা কলার’ মানুষের উচ্চধর্মী ইতিহাস বিদ্যায়। ইতিহাস চেতনা শ্রেণি চৈতন্যের সীমা অতিক্রম করতে পারে না। জন সমাজের উচ্চাসীন বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ক্রিয়াকলাপ ও চিন্তাধারা, তাদের ঐক্য অনৈক্য, গণমত ও গণজীবন সম্পর্কে তাদের ধারণা অর্জনের উৎস হয়ে শরীর বিচ্ছিন্ন মস্তকের মতো খ-িত, লঙ্ঘিতভাবে খ-িত চিত্তে, আকারে ও প্রকারে এক শ্রেণিগত সমাচার হিশেবে অররুদ্ধ।
বেলীবন্ধন নয় বরং ‘আমরা’ ও ‘ওরা’ এই ভিত্তিতে সমাজের মতো ইতিহাস চর্চাও নানা মাত্রায় নানা স্তরে বিন্যস্ত। ইতিহাস সৃজনে, সৃষ্টির কৃপায় পুরো আকাশের বদলে কেবল নক্ষত্র পুঞ্জি জ্বলজ্বল করতে থাকে। আকাশকে বিবর্ণ করে নক্ষত্রকে উজ্জ্বলতা দান করার মধ্য দিয়ে বৃহৎ ক্যানভাসের বদলে এককের প্রদর্শনী; লোক পরিসর, জনগণ পরিসর আবছা হয়ে ব্যক্তি ও বিশেষ গোষ্ঠীর ছায়া পরিসর মূর্ত থাকে। ফলে তা সমাজের পূর্ণ প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে পারে নাই। সামাজিক কাঠামোয়, কাঠামো অন্তগর্ত বিভিন্ন প্রতিক্রিয়ায় ও কর্মধারায় লোক সমাজের এই নিম্নকোটি মানুষের অংশগ্রহণ ইতিহাস চর্চায় বিরল হয়ে আছে।
ইতিহাসবোধে যে অভাব ইতিহাস চর্চাকে এক চোখা করে রেখেছে – এই দায়, অসম্পূর্ণতা কিংবা সমগ্রের প্রতি উপেক্ষার দায় স্বীকার করে নিয়ে কথা সাহিত্যের মধ্য দিয়ে প্রণীত মানবিক ইতিহাসে নিম্নকোটি-র সপ্রাণ উপস্থিতি প্রত্যক্ষ হয়। ইতিহাসের শেষ যেখানে মোহরের ছাপ মেরে রেখেছে – ঐ সীলগালা ভেঙ্গে নতুন অবলোকন সাহিত্যে বলবৎ আদি থেকে আজ পর্যন্ত। সাহিত্য হয়ে উঠে ইতিহাসের নত নির্মাণ; আরেক দলিল ইতিহাসের।
ইতিহাসে সকল মানুষের মিলিত ঐক্যের বদলে ইতিহাসবিদদের হাতে একেক সামাজিক শ্রেণি চিহ্নিত হয়েছে এবং সম্প্রদায়গত অভিব্যক্তির আলোকে ইতিহাসের গতি-প্রকৃতি ও ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে। আবহমান মানুষের আজন্ম লালিত সাংস্কৃতিক মনন ও সামাজিক মানস ইতিহাসের পাতায় নয়, সাহিত্যের গণ-অঙ্গনে স্থান করে নিয়েছে।
ইতিহাস চর্চায় এ পর্যন্ত পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী সমাজের উচ্চ কোটির মনোভবনা ও কার্যকলাপ প্রাধান্য পেয়েছে, সংখ্যায় অল্প হলেও প্রভাব ফেলেছে অনেকদূর।
বিশেষ বিশেষ উপজাতি, গ্রাম ও বর্ণের উপরও কিছু নৃতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক গবেষণা হয়েছে বটে তবে শিল্প-শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক সম্পর্কে ইতিহাস বরাবর বিভাজন ও শাসন করার মতো এই একই পদ্ধতি অনুসরণে ছোট লোকদের পৃথক ও অনুপস্থিত রাখা হয়েছে ইতিহাসে। ইতিহাস বিদ্যায় সচরাচর জনতার রাজনীতি স্থান পায় নাই।
সমগ্র জনসংখ্যা হতে উচ্চকোটি মানুষদের পৃথক রাজসিক অবস্থানের বাইরে যে বা যারা অবশিষ্ট থাকে তাদের অন্যতম হলো গরীব চাষী, শহুরে মুজর ছাড়াও মার খাওয়া মধ্যবিত্ত, হীনবল দরিদ্র অস্পৃশ্য – এই হচ্ছে জনতা, সাধারণ কিন্তু অবিচ্ছেদ্য। শক্তিহীনতার মধ্যে নিহিত আছে ইতিহাসের পাথরে চাপা অংশ। ইতিহাসে অংশীজনের সকলে মিলে অবয়ব পায় নাই।
ইতিহাসের এই দায় মিটিয়েছে শিল্প-সাহিত্য-সংষ্কৃতি। মনন ও সৃজনে ঝলসে উঠেছে মাটির মানুষ; হাসি-কান্না, লড়াই যাপন, বিশ্বাস, অভিজ্ঞতা অর্থাৎ মানুষের বয়ান নির্মাণ করেছে বাকি ইতিহাস; মানবিক ইতিহাস পূরণ করেছে প-িতের ইতিহাস চর্চার দৈন্য।
বাংলা সাহিত্যের আদিযুগের নিদর্শন চর্যাপদে অন্ত্যজদের জীবন চিত্র পাওয়া যায়। চর্যাপদের সিদ্ধাচার্যগণ সহজিয়াপন্থী সাধক হবার কারণে সমাজের উচ্চমহলের সঙ্গে সংস্রব না থাকার কারণেই যেন তা তাদের রচনাকর্মে দরিদ্র অস্পৃশ্য মানুষজনের কথা স্থান পায়। রূপকের আড়ালে সামাজিক বৈষম্যময় সত্যের প্রকাশ দেখা যায়। সন্ধানলাভ করা যায়।
তুর্কি আক্রমণের পর রচিত মঙ্গলকাব্যে দলিত বা তলানীর মানুষের জীবনচর্যার পরিচয় পাওয়া যায়। মঙ্গলকাব্যের পর রামায়ণ-মহাভারতযুগের চ-ালদের দেখা মেলে।
সমাজের অর্থনৈতিক দুর্বলেরা যে কিভাবে নির্যাতিত হতো তার জ্বলন্ত প্রমাণ একলব্য।
একলব্য নিষাদ পুত্র; সে পা-বদের অস্ত্র গুরু দ্রোনাচার্যের কাছে অস্ত্রবিদ্যা শিখতে গিয়ে নিরাশ হয়েছিল।
দ্রোন বলিলেন তুই হোস নীচ জাতি।
তোরে শিক্ষা করাইলে হইবে অ-খ্যাতি।
একলব্য তখন না জানিয়ে দ্রোনাচার্যকে গুরুর মর্যাদায় আসীন করে অস্ত্রবিদ্যা গ্রহণ যাত্রা-তা ছিল তার একাকী বিদ্যার্জন।
পরবর্তীকালে দ্রোনাচার্য একলব্যের কাছে গুরুদক্ষিণা দাবী করে।
একলব্যের বুড়ো আঙ্গুল দক্ষিণা হিসেবে তাকে নিবেদন করার জন্য নির্দেশ দিল।
একজন নিষাদপুত্র কিনা অস্ত্র বিদ্যায় পরাজিত করবে ক্ষত্রিয় রাজকুমার অর্জুনকে এই সম্ভাবনা থেকে গুরু দ্রোনাচার্য বুড়ো আঙ্গুল দাবী করেছিল যেন নিষাদ পুত্র অস্ত্র চালনায় অক্ষম হলে অর্জুনের জন্য কোনো উৎরাই থাকতে পারবে না।
রামায়ণ-মহাভারতের পর মধ্যযুগীয় সাহিত্য ধারায় কাহিনী নির্ভর নিদর্শন না পাওয়া গেলেও ভৈষ্ণব পদাবলী তো রাধা-কৃষ্ণের গীতিকাব্য।
বাউলদের গানে কোনো ভেদাবেদ লক্ষ্য করা যায় নাই। এসব গান সর্বমানবের মিলন আয়োজন। সেখানে উচু নিচু, ছোট-বড় কোনো ভেদাভেদ দাখিল হয় নাই।
বাংলার পূর্বপ্রান্ত এই বাংলাদেশে লোকমুখে প্রচারিত গীতিকা সাহিত্যে মানুষের ছবি ফুটে উঠেছিল; মাটির বুক থেকে উঠে আসা, একদল স্বভাব-কবি মুখে ঐ গীতমালা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, এই সব গীতিকা বাংলা সাহিত্যে ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ নামে পরিচিত।
‘মহুয়া’র পালায় বেদের জীবনের পরিচয় মেলে।
‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’ ছাড়া অন্য কোনো আকাক্সক্ষা অন্ত্যজশ্রেণির নির্লোভ মানুষের মধ্যে ছিল না।
পালযুগ বাংলা সাহিত্যের জন্ম ও উদ্ভবকাল, এবং এ-সময়ের সাহিত্যকারদের মধ্যে নিম্নবর্গের মানুষ ছিল সংখ্যায় বেশি। প্রাচীন বাংলার এই রত্নভাণ্ডারে ডুব দিয়ে প-িত-গবেষক হরপ্রসাদ-শাস্ত্রী, সুকুমার সেন প্রমুখ রত্ন-বর্ণ তারকা খচিত হয়েছেন।
অতীত সাহিত্যের প্রাচীন ধারা যুগবাহিত হয়ে উত্তরকালের বাঙালির সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেছে। তদানীন্তন মাতৃতান্ত্রিক সমাজের প্রভাব এদেশের মর্মমূলে প্রসারিত। ধর্মের অতীত আচার-আচরণ অনুষ্ঠান বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতির মূলমন্ত্র। আধুনিক কালের মানস-চিন্তায়ও অতীত লৌকিকতার নিরবচ্ছিন্ন প্রভাব রয়েছে।
লৌকিক সংস্কার নিম্নবর্গ মানুষের সমাজ ও জীবনের দর্পন।
লোক-সাহিত্য সমবেত মানুষের সৃষ্টি কোনো এককের কীর্তি নয়। লোক সাহিত্য প্রাচীন হলেও প্রতিবার নতুন রূপে দেখা দেয় বলেই বাংলার সাংস্কৃতিক এক বড় সম্পদ; প্রাচীনের সঙ্গে সেতুবন্ধন ঘটে নতুনের প্রাণ শক্তির প্রাচুর্য সৃষ্টি হয় বর্তমানের পরিসরে। লোক-সাহিত্য মানে পল্লী সাহিত্য; গ্রাম বাংলার মানুষের লৌকিক সংস্কার। ছড়া-গীত-প্রবাদ ও পুরানো কাহিনীর মধ্যে রয়েছে এই ধারা সৌন্দর্য।
আকুল ব্যকুল করা গান লোক সাহিত্যের বিরাট পুঁজি। বাংলার আউল-বাউলরা, হিন্দু-মুসলমানের মিলিত ধারায় জাতিভেদ ও বর্ণ দ্বন্দ্ব নাই, হানাহানি নাই এমন মিলে মিশে মহা মিলনের গান দিয়ে সাহিত্যের দিগন্ত, উজ্জ্বল করেছে। মুসলমানদের অবদানের সঙ্গে নিম্নবর্গের মানুষের অবদানও স্থান পেয়েছে এখানে।
লোক-সাহিত্যের ধারক-বাহক অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষের অংশ গ্রহণ উচ্চতর সাহিত্যে পাওয়া যায় না; আধুনিক সাহিত্যে এই যে তাদের প্রতিনিধিত্ব নাই – কারণ, শিক্ষা ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে যে পশ্চাতপদতা তাদের মধ্যে রয়েছে তা আরেকবার প্রাপ্তবর্তী করেছে তাদের।
লোক-সাহিত্য ও চর্যাপদের কাল বাদ দিয়ে আধুনিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে নিম্নবর্গের অবস্থান নেই যেমন অবদানও নেই তেমন বলা যেতে পারে।
আধুনিক ভাষা ও সাহিত্য যারা সমৃদ্ধ করেছেন, তারা সকলেই সংস্কৃতজ্ঞ তা কোনো না কোনো স্তরে সংস্কৃত পঠন-পাঠন করেছেন বলেই সহজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন যে, সংস্কৃত ভাষার উদরে বাংলা ভাষার সৃষ্টি।
কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতায় নির্মিত সাহিত্য শিল্প যখন অনিবার্য হয়ে উঠলো, দেখা গেল, এখানে সবচেয়ে বড়ো হয়ে আছে আঞ্চলিক ও উপ-ভাষার ব্যবহার। বিকল্প চেতনার উন্মেষ এখানে নিহিত রয়েছে।
থিম বা পুরান ভেঙে নতুন নতুন থিম, বিশ্বাস, নতুন উত্তরাধিকার তৈরি হচ্ছে এবং এই অবদানের ধারক ও বাহক তথাকথিত যারা সবার পেছনে ও তলায় পড়া মানুষ। তবুও সম্পূর্ণ রদবদল সম্ভব হয় না বলেই নিম্নবর্গের মানুষ স্রষ্টা রূপে দূরে থাক সৃষ্টির উপকরণ হিসেবে ঠাঁই পায় না।
নিম্নবর্গ থেকে কাউকে কপালকু-লা বা নবকুমার হিসেবে দেখা মেলে নাই – যদিও কপালকু-লা কাহিনীর প্রেক্ষাপট নিম্নবর্গ অধ্যুষিত এক জনপদ। উনিশ শতকীয় রেনেসাঁস সত্ত্বেও পথের পাঁচালীতে দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্যের ছায়া বড় করে ফেলতে গিয়ে, কাহিনীর পটভূমি ২৪ পরগনার নিশ্চিন্দিপুর অঞ্চলের দরিদ্রদের মধ্যে প্রান্তিক থেকে প্রান্তিকতর মানুষের বদলে ব্রাক্ষ্মণ পরিবারের ‘অপু-দুর্গা’-কে পাওয়া যায়। এখানে লেখকের সামাজিক অবস্থানের কারণেই মামুলি চরিত্রের নিচু তলার কোনো মানুষ কেন্দ্রে উঠে আসে নাই।
ব্রাত্য ও অন্ত্যজদের নিয়ে বেশ কিছু সাহিত্যিক কাজ লক্ষ্য করা যায়।
উপন্যাস অন্যতম মাধ্যম। শিল্প বিপ্লবের হাত ধরে সাহিত্যের এই নতুন ধারার সূত্রপাত। ইউরোপ যেখানে কলোনী স্থাপনের মাধ্যমে থাবা বিস্তার করেছে উপন্যাসও সঙ্গে সঙ্গে বিস্তারিত হয়েছে, আফ্রিকায়, লাতিন দেশে কী এশিয়া, ভারত মহাদেশে। তাই আমাদের উপন্যাসের ফর্ম-এখনো ইউরোপের অধ:স্তন হিসেবে বিরাজমান। ভুলে গেছি হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা সাহিত্য ধারা।
এই যে নিজস্ব কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলা এবং আলাদা স্বর খুঁজে নেয়া আরো উৎরাইয়ের সম্মুখিন হয়েছে যখন উপনিবেশিকতা নতুন চেহারায় বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় জুড়ে বসেছে।
বাংলা উপন্যাস পণ্য হিসেবে বাজারমাত করার প্রতিভা অর্জনের আগেই কোনো রকম তকমা লাগিয়ে সমাজের আপামর জনগোষ্ঠী জাত-পাত শ্রেণি পেশা নির্বিশেষে পিরামিডের মতো গঠিত সমাজ কাঠামোর নিচের ধাপের মানুষ ও তাদের জীবন নিয়ে উপন্যাস আরম্ভ হয়।
ইউরোপের তল্পি বহনকারী নেটিভ ইন্ডিয়ানদের যে অংশ বর্ণ-উচ্চরা তাদের উপন্যাসে নিচু তলার মন্ত্রহীন শূদ্র, অস্পৃশ্য ও মুসলমান পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনের উপাখ্যান রচনা করতে না পারলেও, শ্রেণিগত সীমাবদ্ধতা ও মানসিকতার উর্ধ্বে উঠতে ব্যর্থতা সত্ত্বেও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী, অদ্বৈতমল্প বর্মন, অমিয়ভূষণ মজুমদার, কমলকুমার মজুমদার, মহাশ্বেতা দেবী উপজাতি ও প্রান্তিকজনদের নিয়ে রচনা করেছেন উপন্যাস; জীবনের মহাকাব্যের নামই তো উপন্যাস।
সতীনাথ ভাদুড়ী, ঢোঁড়াই চরিত মানস-এ উপন্যাস করে দেখিয়েছেন; অনুপ্রাণিত যোজনা এই যে, তার প্রতি কলমে ইউরোপীয় সংজ্ঞা ও সূত্র, শৈলীর বশ্যতা ছিল না বরং প্রান্তিকের প্রকৃত আশ্রয়ভূমিঅšে¦ষণে বিহারের পশ্চৎপদ অঞ্চলের সামাজিক চিরায়ত বাগবিধি, আচরণ, সংস্কার, স্বপ্ন, মুদ্রা ও মুদ্রা দোষ বিজড়িত হয়ে উপন্যাসটি এক গবেষণাধর্মী তথ্যভা-ার হয়ে উঠেছে। ঢোঁড়াইয়ের অশিক্ষিত মনের জাগরণ অনুভব যা পথের পাঁচালী পারে নাই, প্রান্তজীভনে অপু-দুর্গা বৃহৎ কোটি মানুষের প্রতিনিধি হয়ে যেন আমাদের কেন্দ্রীয় মনকে ততোধিক সিক্ত করতে পেয়েছিল।
ঢোঁড়াই-কে দিয়ে সতীনাথ রামায়ণের নিম্নবর্গীকরণ বা পুননির্মাণ করতে সচেষ্ট ছিলেন। শ্রেণি বিভাজন ও স্তর বিন্যাসের মতো সংস্কৃতি ও বিভাজিত ও খ-িত। তাই উপন্যাস কিংবা সাহিত্যে আংশিক জীবন, অংশের কথা পাওয়া যায়; বাকি কথা বাদ পড়ে যায় সাহিত্যের তথাকথিত মূলধারা প্রবাহে।
উচ্চশিক্ষিত মানুষ সমাজের বিশেষ শ্রেণির প্রতিনিধি। ব্রিটিশ সাম্রাজিক শিক্ষার পরিধিতে অগ্রগণ্য ছিল উচ্চ বর্গের হিন্দু জনতা। অস্পৃশ্যরা অস্পৃষ্ট থেকে গিয়েছিল।
যে সত্য জানা হয়ে গেছে তা হলো পলাশীর যুদ্ধে কোম্পানির সৈন্য হিসেবে যে জন-মানুষের প্রতিনিধি সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধ্যে অস্ত্র ধারণ করেছিল, সকলেই তারা ছিলেন অস্পৃশ্য সম্প্রদায়ের মানুষ। তাদের উপর ভর করে কোম্পানি ভারত-জয় করলেও শিক্ষাদান করা প্রশ্নে বর্ণহিন্দুদের প্রতি অনুরক্ত দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এই সব অস্পৃশ্য মন্ত্রহীন শূদ্রদের সমাজে শিক্ষা বিস্তারের ব্যবস্থা করে নাই।
সাহিত্য সংস্কৃতি অনিবার্যভাবে দুইভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে; একটা শিক্ষিত মানুষের, আরেকটা নিরক্ষণ মানুষের মৌখিক সাহিত্য নির্ভর। মৌখিক সাহিত্য হয়ে থাকে স্মৃতি নির্ভর। স্মৃতি থেকে আবিষ্কার হয় বংশানুক্রমিক উপ-কথা যা কিনা যে কোনো জাতির জন্য হয়ে উঠতে পারে মহাকাব্যিক উপাদানের প্রাচুর্য।
উপন্যাসে দেশের সজীবমূর্তি প্রকাশিত হবে রবীন্দ্রনাথের এই প্রত্যাশা পূরণের কথা মনে রাখলে স্বীকার্য যে, আখ্যান-ই-ঐতিহ্যম-িত, উপন্যাস আরোপ হয়েছে ইয়োরোপীয় উপনিবেশিক কায়দায় কিন্তু শ্রীকৃষ্ণকীর্তন মঙ্গল কাব্য, বেতাল পঞ্চবিংশতি কিংবা বত্রিশ সিংহাসন ছিল আখ্যান মালা, যা আখ্যায়িত করেছে উপনিবেশ পূর্ববতী সৃষ্টিশীল পরম্পরা।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের মঙ্গলকাব্যগুলিতে ছিল মৌলিক দেব-দেবী নির্ভরতা যা প্রধানত দলিত সমাজের সৃষ্টি। নিজ নিজ সমাজে এই সব দেব-দেবীর প্রতিষ্ঠার কাহিনী দলিত স্বভাব কবিদের সুকীর্তি। চণ্ডীঙ্গল কিংবা ধর্ম-মঙ্গলে হাজির হয়েছে দলিত সমাজ। পরবর্তীকালে এইসব নামহারা অজ্ঞাত নামা কবিদের মৌখিক রচনাকে ভিত্তি করে হাজির হয়েছে লিপিকুশল কবি সভার দলিত মানুষের জীবন চিত্র।

প্রান্তিকজন
সাহিত্য যখন মানুষের সন্ধান করে, সেখানে উচ্চ-নীচ ব্যবধান প্রকাশিত হয় না নইলে খণ্ডিত ও আহত মানুষ উঠে আসবে এবং পূর্ণাঙ্গ দলিল হয়ে উঠবে না। মুক্ত চিল, বাউল ও ভৈষ্ণব সম্প্রদায়, উচ্চবর্গী অবস্থান তাদের ছিল না। লোক-সাহিত্য ধারার ধারক বাহক নিম্নবর্গীয় মানুষ উচ্চবর্গীয় সাহিত্যে তথাকথিত আধুনিকতার গ-িতে প্রবেশাধিকারের অভাবে সুদূর প্রান্তিক হয়ে পড়েছে।
বাংলার লৌকিক সাহিত্য চিরন্তন মানবিক প্রবৃত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত সন্দেহ নাই। এখানে অন্তর্নিহিত ভাবের মধ্যে সার্বজনীন আবেদন থাকে। দেশকালোত্তীর্ণ শিল্প ও ভাব বিষয়ে লেখকের আত্মসচেতনতা যে উল্লম্ফন সৃষ্টি করে তাতে উচ্চতর সাহিত্যের গ-িতে প্রবেশ নিশ্চিত হয়।
কালের প্রবাহে বাংলার ইতিহাসের নানা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অভিঘাতে সমাজ বদলের ফলে বাউল ধর্মে যে উদ্ভব ও প্রসার হয়েছিল তা ক্ষীয়মান হলেও আজ তা ঐতিহাসিক গৌরবে দলিল আধুনিক সাহিত্য সংবাদ হতে পেরেছে কিন্তু দলিল হয়ে ওঠে নাই।
বাউলমন হারিয়ে যাচ্ছে আন্তর্জাতিকমান রক্ষার কুলীনদের নির্মিত প্রবণতা ও অক্ষরের কারসাজির মধ্যে। শিক্ষা ও আর্থিক দৈন্য ও সামাজিক অনাদর ও অবহেলার কারণে এই ধারা স্রোতহীন।
বাংলা সাহিত্য নিপীড়িত সাহিত্যের বিচারে মহান ও আন্তর্জাতিকতা অর্জন করেছে। এই চর্চা খ্যাতি ও যশলাভে মোক্ষ হয়েছে কিন্তু যেখানে পুরষ্কারে ধন্য ধন্য করে মাতম ছিল না, আকাক্সক্ষা ছিল না, সেই নীরব সময়ে স্তব্ধতার কাহিনী ও আখ্যান রচনা করতে শরৎ-মানিক-তারাশঙ্কর-বিভূতি-মহাশ্বেতা-সতীনাথ-দুই মজুমদারকে কোনো তাড়নার আশ্রয় গ্রহণ করতে হয় নাই।
নিপীড়িত সাহিত্যের যে অংশের স্রষ্টা দলিতবর্গ বা অস্পৃশ্য সমাজ তাই দলিত সাহিত্য।
তিতাস উপহার দিয়েছে অদ্বৈতকে, অদ্বৈত উপহার দিয়েছেন তিতাসকে। মানুষের জন্ম হয় প্রকৃতিতে, পরিবেশের মধ্যে; সে প্রকৃতিকে সুন্দর করে তোলে, পরিবেশকে করে অমর। মানুষ হচ্ছে অন্তর্দর্শী, চিন্তাশীল, সচেতন জীব। আপন জীবন চর্যার স্বকীয় অর্থবহতাকে ভুলতে পারে না। তাই দেখা যায়, দৈন্যতায় আক্রান্ত হলেও অনমিত সত্তা নিয়ে বাঁচে।
তিসাস কূলবর্তী জীবন চর্চার শরীক ছিলেন অদ্বৈতমল্ল বর্মন। জনগোষ্ঠীর বিস্তারে ও বিলুপ্তিতে দেশে দেশে নদীর যে নিয়ন্ত্রক ভূমিকা বিদ্যমান, এই নদীকূলের মানুষের যেমন জানা, অদ্বৈতেরও তা অজানা ছিল না। তাই তিতাস একটি নদীর নাম- উপন্যাসে পাওয়া যায় অতৃপ্ত চিরলাঞ্ছিত- প্রান্তিকায়িতবর্গের বিপুল কৃষ্ণমহাদেশের আখ্যান। বিধিবদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিকতার অভ্যাস দিয়ে এখানে স্পর্শ করা হয় নাই। অদ্বৈতমল্লকে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয় নাই। তিনি স্বত:স্ফূর্ত ছিলেন, সহজাত জীবনের আখ্যান এবং সময় ও পরিসরের নিগূঢ় সম্পর্কের তাৎপর্য জানতে লেখা-পড়া করতে হয় নাই; তিনি ছিলেন তিতাসের প্রান্তিকায়িত মালো জনগোষ্ঠীর একজন।
মালো জনগোষ্ঠীর নি:স্ব হয়ে যাওয়ার ইতিহাসে ছিল সুদখোর, মহাজন, দাদনদারদের শোষণ। এই শোষণ প্রক্রিয়ায় নদী কিংবা মানুষকে উপন্যাসের প্রধান চরিত্র তা নির্ণয় করা হয়ে ওঠে না যেহেতু অদ্বৈত প্রত্যক্ষ করেছিলেন মূলে থাকা দায়ী সেই প্রভুত্ববাদ। সাম্রাজ্যবাদীরা চিরকালই প্রভুত্ববাদী। তারাই শোষক। শোষিতের হাতে পুঁজি সঞ্চয়ের বদলে উৎপদান ব্যবস্থার উপাদানের মধ্যে পরিণতি অর্জন তাদের বেহাল ও লুণ্ঠিত করে সব পুঁজির সমাবেশ ঘটলো উৎপাদন ব্যবস্থায় ভূমিকাহীন মহাজন ও সওদাগরী কারবারীদের হাতে এবং সেই শোষিতদের বিশাল অংশ প্রায় সকলে শূদ্র। গোলাপ যে নামে ডাক শুনুক না কেন, গোলাপী-রক্তাভ পাঁপড়ি যেমন গোলাপের গল্প বলে যায় তেমনি শোষিত ও শূদ্রে যেমন তফাৎ নাই, তেমনি ক্ষেত মজুর, চাষী, জেলে, চামার, কুমোর, কামার, ধোপা, চাড়াল, মেথর – যাদের জন্য বরাদ্দ থাকে কঠিন ও নোংরা সব কাজ – এই লোকসমাজকেও দলিত বলা হয়ে থাকে।
ভারতবর্ষে স্বাধীনতার নামে ক্ষমতার হস্তান্তর ও শোষণ প্রক্রিয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হওয়ায় শোষণ পর্বের মাত্রাগত তারতম্য হয় নাই। শিল্প বিপ্লব কতটা এগিয়েছে তা থেকে বোঝা যায় না শিল্প শ্রমিক কোন অবস্থানে নিজেদের জাহির করছে বরং তারা যেমন শোষণের শিকার; তেমনি কৃষিজমির উপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর সর্বহারা হয়ে চলেছে।
সর্বহারার বাজনীতি হতে ডান-বাম-মধ্য পন্থী ধারার রাজনীতিতে শোষণ মুক্তির লড়াইয়ে যে নেতৃত্ব ব্যস্ত সেখানে সরাসরি শোষিতের অংশগ্রহণমূলক নীতি নির্ধারক, পরিণতির নির্বাচকের ভূমিকায় পাওয়া যায় নাই।
নিচের তলার জাত-পাতহীন শোষিত মানুষদের জীবন ও সহচার্য যন্ত্রণা নিয়ে যে সাহিত্য পাওয়া যায় তাদের সকলে যে দলিত পতিত জনের বাস্তবতায় জন্ম থেকে জ্বলে যাচ্ছেন এমন দাবী করা সঙ্গত না হলে তাদের কলমে সহানুভূতি ও হৃদয়ের ভালোবাসা ছিল।
সহানুভূতিশীল লেখকদের কলমে কৃপা ও অনুকম্পার বয়ান মাথা পেতে গ্রহণ না করে নিজেদের কথা জানানোর জন্য কলমকে হাতের মুঠোয় নিয়ে ঝাপিয়ে পড়া দুর্লক্ষণীয় নয় যদিও কলম লেখা অনুপ্রাণিত করেছে দলিতদের তাদের কলমে নিজেদের আখ্যান রচনার প্রয়াসে। প্রকৃত পক্ষে দলিত জীবন হতে যাদের আগমন প্রকৃত দলিত শিল্পী হয়তো তারা।
দলিত শব্দটি সংস্কৃতি শব্দজাত, অর্থ হলো: অত্যাচারিত, নিপীড়িত। দারিদ্র্য তাদের পরাজয়ের কারণ। অর্থনৈতিক দুর্বলতা হতে তাদের নিগৃহ।
এক সময়ে দলিত হিসেবে নির্নীত হতো চর্মকার, মুচি, চাষী, শ্রমিক, ধাভর, লোক সংগীত শিল্পী, মৃত পশুবহনকারী।
কালক্রমে গত শতাব্দীর সত্তর দশকের উপজাতি, ভূমিহীনদেরও দলিত আখ্যা দেয়া হয়েছিল। গান্ধী এই শ্রেণির নামকরণে দলিতের বদলে এদের হরিজন বলেছিলেন অর্থাৎ ঈশ্বরের সন্তান।
দলিত-শব্দটি ইংরেজি ভাষায় উঊচজঊঝঝঊউ-এর প্রতিশব্দ।
১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইন বলে নতুন নামকরণ হয় তফসিলী জাতি ও উপজাতি। নিম্নবর্গের মানুষ হিসেবে আধিপত্যহীন জনগণ, আদিবাসী, মুণ্ডা, গ্রামের মানুষ, নারী, প্রান্তিক জনগণ, উপনিবেশিক শিক্ষা-দীক্ষাহীন ধর্মভীরু মানুষকে, শ্রমজীবীদের সংগ্রাম ঠাঁই পায় ৪০’পরবর্তী সাহিত্যে।
জীবনের স্বর ও সঙ্গতি হারিয়ে নিম্নবর্গের যে ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ সাহিত্যে ঠাঁই পেয়েছে নানা ভাবে, নানা মাধ্যমে।
মুনসংহিতার নির্দেশকাল হতে শুরু করে এই উত্তর- উপনিবেশিক ও গ্লোবাইলাইজেশনের আধিপত্যকালে দেশের বৃহদাংশের মানুষকে বারবার নানা কৌশলে নিম্নবর্গে পরিণত করার ক্রিয়াকলা চললেও সামরিক বাহিনী তথা সামরিক সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত ইংরেজি শব্দ ‘ঝঁনধষঃবৎহ’ শিরোপাটি বিগত শতাব্দীর ৮০’র দশকের পূর্বে সামাজিক অধস্তন শ্রেণির জন্য প্রয়োগ স্বত:সিদ্ধ হয় নাই। সাহিত্যে নিম্নবর্গেরা ঠাঁই পেলেও আভিধানিক ভাষ্য মাথায় রেখে সাবঅলটার্ন অধ্যয়ন গতি পায় নাই।
আরিস্ততলের দার্শনিক বাচ্যে এই বচনটি এমন এক বচন ছিল যা অন্য বাচ্যের অধীন এক বাচ্য সার্বিক চিত্র উপস্থাপন করে। এই সাবঅলটার্ন তেমনই এক বচন যা বিশিষ্ট, মূর্ত কিন্তু সার্বিক নয়।
‘অধীন’ হওয়া সবদিক হতে গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণি বিভক্ত অসম বিকাশের সমাজবাস্তবতায় কর্তৃত্বের অধীন, ক্ষমতার অধীন, অধিপত্যবাদের অধীন।
প্রাতিষ্ঠানিক সমাজের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় একই মর্যাদার বৃত্তে কখনোই গৃহীত হয় নাই নিম্নবর্গ। মনুসংহিতার হিসেব মতে, প্রাতিষ্ঠানিক সমাজ বিন্যাসে নিম্নবর্গের স্থান চতুর্থে এবং তারপর অন্য কোনো বর্গ অনুপস্থিত। এছাড়া বাকি প্রথম তিন বর্গ দ্বিজ।
সামরিক সংগঠনযুক্ত সাব অলটার্ন, শব্দটি সাধারণত: কাপ্তেনদের অধ:স্তনদের বোঝাতো যেখানে তার আর পর নাই।
আভিধানিক ভাষ্য প্রণিধানযোগ্য।
টহফবৎ ঃযব পড়হঃৎড়ষ ড়ৎ রহভষঁবহপব ড়ভ ংড়সব ড়হব ড়ৎ ংড়সবঃযরহম ঃযধঃ রং সড়ৎব ঢ়ড়বিৎভঁষ.
এই ভাষ্যকে সম্প্রসারণ করলে নিম্নবর্গের লোক সমাজকে চেনা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ পরিচালিত হয় ক্ষমতা দিয়ে এবং এই সূত্রে কষাঘাত হয়ে আসে সাংস্কৃতিক দমননীতি, কখনো সামাজিক, কখনো আর্থনীতিক বা রাজনৈতিক দমননীতি। দমননীতি তাই কর্তৃত্ব, ক্ষমতা, প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ কিংবা আধিপত্যবাদের নির্লজ্জ্ব প্রকাশ।
উপনিবেশ পূর্ব সময়কাল হতে উত্তর-উপনিবেশ কালবেলায় জগৎসংসার এক মহাপরিবার যা কিনা নানা বিবর্তনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তাহলেও আর্থসামাজিক কাঠামো পিরামিড সদৃশ মহাস্থবির হয়ে আছে।
অর্থাৎ- দমননীতি ওপর হতে ধাবিত হয় নিচের দিকে।
জগৎ সংসার যে এক সহাপরিবার সেখানে মানুষ মাত্র গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এমনটি এক আলেখ্য রচনা করা হল যে, সমমর্যাদা হতে বিচ্যুতি পরিবারের মূল মানুষদের প্রান্তকায়িত নিম্নবর্গ করে চলেছে। শাসক সহায়ক গোষ্ঠীর সৃষ্টি ইন্দ্রিয়পরায়নতায়, ক্ষমতার স্বপ্নে। ১৯২৯ হতে ১৯৩৫ সালে অন্তবর্তীকালে আন্তনিও গ্রামশী মুসলিনীর কারাগারে বন্দিদশায় বন্দির কথন লিখছিলেন Ñ তার রূপকধর্মী গ্রন্থে মার্কসীয় দৃষ্টি ভঙ্গিতে সাব অলটার্ন ‘শব্দটির প্রয়োগগত অর্থে সরাসরি প্রলেতারিয়েত প্রতিশব্দ গ্রহণ করছিলেন Ñ সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথ ১৯৩০ সালে ভাই রথীন্দ্রনাথকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন,
চিরকালই মানুষের সভ্যতায় একদল
অখ্যাতলোক থাকে, তাদের সংখ্যা বেশি,
তারাই বাহন; তাদের মানুষ হবার সময়
নেই; দেশের সম্পদের উচ্ছিষ্টে তারা
পালিত। সবচেয়ে কম খেয়ে, কম পরে,
কম শিখে বাকি সকলের পরিচর্যা করে;
সকলের চেয়ে বেশি তাদের পরিশ্রম
সকলের চেয়ে বেশি তাদের অসম্মান।
কথায় কথায় তারা উপোস করে মরে। উপরওয়ালাদের
লাথি ঝাঁটা খেয়ে মরেÑ জীবনযাত্রার জন্য যত কিছু
সুযোগ সুবিধে সবকিছুর থেকেই তারা বঞ্চিত।
রবীন্দ্রনাথ, গ্রামশি সকলেই যেন একদ-ে প্রভূত্ব ও অধীনতা, শোষণ প্রণালী প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের প্রেক্ষাপটে উপলব্ধি করেছিলেন।
একদা ভারতে শিল্পাঞ্চলে, বোম্বের সুতাকল ও অন্যান্য শিল্পে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের ফলে মার্কসবাদী চেতনা ও কমিউনিস্ট সংগঠন ব্যাপক প্রসারিত হলে দেখা যায়, এই আদর্শে উদ্বুদ্ধরা হিন্দুধর্মের চতুবর্ণকে আর্থনীতিক শ্রেণির দ্বারা ভাগ করে এক ধরনের ব্যাখ্যা হাজির করেছে।
তারা মনে করতেন শ্রেণি ব্যবস্থার ধ্বংস করা আবশ্যক। একজন হিন্দু অস্পৃশ্য যদি নিজেকে হিন্দু অস্পৃশ্য হিসেবে আলাদা করেন তাহলে সর্বহারা বা প্রলেতারিয়েত ভাবা যাবে না।
প্রলেতারিয়েত শব্দে বা ধারণায় দলিতদের আত্মপরিচয় নিয়ে বিশিষ্টতা ছিল না।
সর্বহারার পরিচয়ের মধ্যে জাত-পাত-বর্ণ হারিয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি ছিল।
কমিউনিস্টরা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে একই চৈতন্যে ও বহি:প্রকাশ হিসেবে দেখতেন।
ক্রমে দেশে-দেশে সার্কসবাদীদের মধ্যে পেতি বুর্জোয়া ভাইরাস ছড়ালে সার্কসবাদ আর হয়ে উঠতে পারে নাই নিম্নবর্গের অবস্থানগত ভাষা ও মুক্তি। দারিদ্র্য মানুষকে সমাজ-পরিবেশে নিম্নবর্গ করে তোলে আর যেহেতু মার্কসবাদের দীর্ঘকালীন লড়াই দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে বলেই নিম্নবর্গের অবলম্বন হওয়ার প্রেক্ষিত বিদ্যমান ছিল।
পারিপার্শ্বিক চাপ ক্রমে এত তীব্র যে মার্কসবাদ ও বিশ্বায়নের অশুভ আঁতাতের মার্কসবাদ পরিচালিত বিশ্বায়নের পরিবর্তে বিশ্বায়ন পরিচালিত মার্কসবাদ নিম্নবর্গের উদ্দেশ্য সাধন করতে অক্ষম।
‘১৯৪৬-৪৭’ কবিতায় বহু আগে জীবনানন্দ দাশ যে গভীর নির্দেশী উচ্চারণ করেছিল – ‘উঁচু লোকেদের দাবী এসে সবই নিয়ে যায়, নারীকেও নিয়ে যায়’- তা অকাট্য বলে মান্য করতে হয়।
আরো আছে, সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখলেন একটি মোরগের কাহিনী-
‘তারপর সত্যি-ই সে একদিন প্রসাদে ঢুকতে পেল
একেবারে সোজা চলে এল
ধাবধবে সাদা দামি কাপড়ে ঢাকা খাবার টেবিলে
অবশ্য খাবার খেতে নয়
খাবার হিসেবে।
ধনীর পরিচালিত সমাজ দেখে দরিদ্র হতচকিত হয়। আকাক্সক্ষা তার এই সমাজের জন্য হয় তৈরি। কিন্তু সমাজের জন্য অপর হয়ে ওঠে। বড়ো বাড়িতে ঢোকার স্বপ্ন দেখেও ভেতরে যাবার পর ভোগের উপকরণ হয়ে গেল।
সমাজ শ্রমিক নিম্নবর্গের মানুষ বরাবর অস্তিত্ববিলোপী পরিস্থিতির খাদ্যে পরিণত।
শিল্পায়নের হাত ধরে বিশ্বায়ন নয়া প্রতাপ বাদের নিশান উড়িয়েছে।
শিল্পায়ন ও বিশ্বায়ন মোহাবিষ্ট করে রাখে মধ্যবিত্ত শ্রেণিটাকে যেমন তেমনি অন্তর্গত LOST PARADISE-এর বিভীষিকায় আক্রান্ত মার্কসবাদী, তৃতীয় বিশ্বের এক সময়কার দীক্ষিত ব্যক্তিগণ শ্রেণিচ্যূতির স্বপ্ন মায়াজাল ছিঁড়ে বিশ্বায়নকে ব্যবহৃত করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। ক্ষমতার রাজনীতি, আগ্রাসনের নতুন ছদ্মবেশ এই বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে লাগসই বিরুদ্ধ প্রণালী সৃষ্টি করতে অসমর্থ হয়ে বিভ্রমের শিকার।
তাই নিম্নবর্গ অবলম্বনহীন। প্রলেতারিয়েতরা নিজেদের সংস্কৃতি হারিয়ে নিম্নবর্গ। ধনতান্ত্রিক ঘবড় ঐবমব সড়হু যে পণ্যায়নের অর্থনৈতিক সামাজিক অস্তিত্বের তত্ত্বাবধান করছে তাতে নব্য প্রান্তিকায়িত প্রলেতারিয়েত এবং অপরাপর নিম্নবর্গীয় জনসমাজ একাদিক্রমে অরণ্য, নদী, শ্রমক্ষেত্র হতে উচ্ছেদ হচ্ছে।
দেশের বৃহৎ উৎপাদনের প্রধান অবলম্বনগুলো, ক্ষেত, মাঠ, জল, অরণ্য হতে অধিকার হারাচ্ছে নিম্নবর্গ। উৎপাদক শ্রেণি, পুরাণ হতে আজ পর্যন্ত নিচুস্থান অর্জন করে আছে আর যে জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক নাই উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি মোকাবেলায় অথচ তাদের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব হয়েছে অপরের শ্রমের ফসল।
অতীতে ছিল যে চেহারা, একই সত্তার ভিন্ন সৌষ্ঠবে নতুন পদ্ধতির শোষণ, নতুন পদ্ধতিতে বঞ্চনা অব্যহত। মধ্যবিত্ত যে শোষণের সহায়ক শক্তি তারা উচ্ছিষ্ট পেয়ে সন্তুষ্ট। তাতে অবস্থান সৃষ্টি হয়েছে এই যে, না হতে পেরেছে শোষক দলের অন্তর্ভূক্ত এবং আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে মূল স্নোত, শোষিত মানুষের আত্মার বাইরে।
প্রতারক ও অবিশ্বাসী তাদের অবস্থান।
একদিকে শাসকবর্গ লুণ্ঠনে ব্যস্ত, অন্যদিকে তাদের সহায়ক মধ্যবিত্তজনরা এক ধরনের ভোগবাদী সংস্কৃতিতে নিমজ্জিত তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নাই।
আত্মদর্শন জ্ঞানে সংরক্ষণশীল প্রক্রিয়ায় ব্যস্ততার ফলে চলমান আগ্রাসন ও আত্মপরতার চালচলনের ফলে নিম্নবর্গ শেকড় হারাতে থাকছে ফলে এতটা নিঃস্ব যাত্রা যে তিমির বিনাশ হয় না তাদের।
ত্রিস্তরীয় সমাজ কাঠামো দুর্বল হচ্ছে না, টিকে আছে, দৃঢ় হচ্ছে।
এই যে ডেমোগ্রাফিক্যাল ডিস্ট্রিবিউশানে পরিলক্ষিত পিরামিড কাঠামো, যেখানে এই গঠনের তলদেশে সর্বাপেক্ষা প্রসারতা তাতে অবস্থান করতে থাকা তলার মানুষ অথচ প্রকৃত পক্ষে মূলবাসিনী যাবতীয় উৎপাদন শ্রম-ঘাম-রক্তে সম্পন্ন করে ওপর তলার কৌণিক অবস্থানের উচ্চবর্গের পদতলে নিবেদন করে থাকেন বলেই সুবিধাবাদী চক্র এই পিরামিড ভাঙার সংগ্রামে কেনো দিন যুক্ত হতে পারবে না।
ডিক্টেটরশীপ অব দ্য প্রলেতারিয়েট এমনই প্রত্যয় মার্কসবাদে।
প্রলেতারিয়েতদেও কথা বলতে বলতে উচ্চবর্গ ও মধ্যবর্তী সুবিধাবাদীরা ক্ষমতা দখল করে উচুঁ তলার মানুষদের স্বার্থকে আরো বিকশিত করার জন্য।
মার্কসবাদ চর্চা চলে যে zlite দের তত্ত্ব বিশ্বে সেখানে শ্রেণি সংগ্রামের মন্ত্র পাঠ হলেও নিজেদের শ্রেণিগত অবস্থানে আঁচড় পড়ে না; এই পরিস্থিতি মেনে নিতে পারে না, অজান্তে, শ্রেণিজ মনেন।
মার্কসবাদ অনেক ক্ষেত্রে মানুষের দারিদ্র্য ঘোচাতে পারে নাই। স্বপ্ন দেখিয়েছে কিন্তু প্রতারিত হয়েছে মাটির মানুষরা।
‘দু’হাতে সরাব জঞ্জাল এবং এই পৃথিবী মানুষের বাসযোগ্য করে যাব আমি’ – এই শপথ, কোনো তারতম্য তৈরি করতে পারে নাই। যেমন পারে নাই, `To bring the society from vertical to Horiz ontal’.
এদিকে বিশ্বায়নের তরিকা সমাজকে নিয়ে যাচ্ছে এক আত্মবিনাশী আয়োজনে ন্যানো প্রযুক্তি তথ্য প্রযুক্তি সম্পৃক্ত ব্যবস্থা যে পরিস্থিতি আগামী দিনের জন্য নির্দেশ করছে তাতে মানুষের আইডেনটিটি থাকবে কীনা, এখানেও আরেকটি আশঙ্কা থেকে যায়।
ভৌগলিক অবস্থান অনুযায়ী বিভিন্ন সভ্যতায় বন্দি মানুষের মধ্যে আসন্ন সংঘর্ষের আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। দারিদ্র্য ও বিশ্বায়িত অসাম্য থেকে পৃথিবী জুড়ে হিংসা হানাহানি, যা নির্মূল করতে পারে না প্রযুক্তির ক্ষমতা। প্রান্তিকায়ন আারও সুদূর প্রসারী হয়ে চলেছে। বাঁধাহীন গতিতে স্ফীত হচ্ছেÑপ্রান্তজনসংখ্যা ।
কার্ল মার্কসের কথা সূত্র ধরে বলা যাচ্ছে না, প্রলেতারিয়েত হবে সকল মানুষ বরং দেখা মিলছে মানব সমাজ জুড়ে ব্যাপক সাবঅলটানাইজড। একে বলা যায় সাবঅলতানাইজেশন। গ্লোবাল ভিলেজ কী এমন কোনো গ্রাম যেখানে বসবাস সম্ভব ধনকুবের ছাড়া অন্যান্য বর্গের।
মানুষ এখন ন্যানো প্রযুক্তি ও প্রস্তর যুগে একই সংগে বসবাস করছে।
নিচতলার চাপা পড়া মানুষের হাতে পাথর যুগের সরঞ্জাম এই প্রায় শতভাগ মানুষের বিপরীতে মুষ্টিমেয় ধনীর দল যারা রাষ্ট্রক্ষমতা বাইরে থেকে গ্লোবাইজেশন সূত্রে দেবতা বলে গিয়ে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবর্তীণ।
মুক্ত বাজার বসেছে ভূ-গ্রাম জুড়ে; এখানে গ্লোবাইজেশন কিনলে ফ্রি যেন উন্নয়ন সমগ্রের উন্নয়নের বদলে হাতেগোনা কিছু মানবদানবের উন্নয়ন।
গ্লোবাল সমাজ তৈরি হওয়া সত্ত্বেও দেখা যায় বিভাজন, অধ:ক্রম: ধনী-মধ্যবিত্ত প্রান্তিক মানব। এই প্রান্তিক মানুষের কোনো স্থান নির্ধারিত নাই – এই গ্লোবাল সমাজে। বৈষম্য দীর্ঘায়িত হয়েছে গ্লোবাজাইশেনের প্রেক্ষাপটে। পুঁজির ধর্ম কী-তা আর বিবেচ্য নয়; এই পুঁজি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সারা বিশ্বময়; এভাবেই পুঁজির বিশ্বায়ন।
গ্লোবাল মার্কেটে প্রবেশের অধিকার সংরক্ষিত; ধনীরা অগ্রগণ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে শিরোমনি। ফলে রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে প্রান্তিকায়ন ঘটে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছায় নির্ভর করে পুঁজি কোথায়, কিভাবে কাজ করবে। অস্ত্র, ক্ষমতা-প্রভাব এবং পুঁজি, দেশটির কুক্ষিগত বলে বাকিরা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে হয়ে থাকে সাবঅলতার্ন।
গ্লোবালাইজেশন পৃথিবীর কিছুদেশের কিছু অংশকে আলোকিত করতে পারলেও অধিকাংশ অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকায় কেন্দ্র ও প্রান্তের সংজ্ঞা নতুন রূপ ধারণ করছে।
গরীব ও গরীব দেশের ঘরে শূন্যতা দীর্ঘতর সারিবদ্ধ হচ্ছে – মিথ্যা উন্নয়ন প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। Globalization-এর ফলে ২০০ ফ্যারাও এর জন্য ৫০০,০০০০০০০০ কীতদাস তৈরি হচ্ছে।
প্রান্তিকজনের মধ্যে প্রান্তিকতর হচ্ছে নারী। এমনকি নিম্নবর্গীয় নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রান্তিক। এই প্রান্তিক নারীর কোন স্বর নাই, তাদের কথা বলেন শিক্ষিত ও তুলনামূলক ক্ষমতাবান নারী। এখানেও নারীতে নারীতে প্রান্তিকতা।
বিশ্বায়ন মারাত্মক আঘাত হানে নারীদের কারণ তারা জীবিকা ও সংসার প্রান্তরে অসংগঠিত। এই বিশ্বে প্রধান ব্যবসা, অস্ত্র-ব্যবসার সঙ্গে নারী মাংস বেচাকেনা।
বাজারে পণ্য বিপণনের জন্য উসকে দিতে হাজির করা হয়েছে নারী পণ্যকে, বিজ্ঞাপনে উলঙ্গ হয়েছে নারী। যাবতীয় পরিষেবায় ব্যবহৃত উপাদান নারী। নারী মাংস আমদানী রপ্তানিযোগ্য পণ্য।
মানুষ যে দারিদ্র্যরেখার নিচে চলে যাচ্ছে সেখানে ৭০ ভাগ নারী ও পুরুষ স্থান অলংকার করে আছে।
শতকরা ২০ জন ধনী হয়েছে আর বাকিরা গরিব। এই গরিবি তাদের কেন্দ্র চ্যূতি ঘটিয়ে প্রান্তিক মানব করেছে।
যে কর্পোরেশনগুলো মুনাফা দস্যুতায় লিপ্ত সেখানে কম মজুরিতে নারীদের কর্মযোগ হলেও বৈষম্য ও নিরাপত্তা মিলে এক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় তাদের নিপতিত করেছে।
অস্থায়ী ও সাময়িক চুক্তি ভিত্তিক কাজের বিনিময়ে নারীর শস্তা শ্রম মুনাফা যোগাচ্ছে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানকে। শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে নারীর সংখ্যা হাতে গোনা।
নারীর নিয়তি অবধারিতভাবে প্রান্তজনের। পৃথিবীর যে কোনো দেশের প্রান্তিক অবস্থানে নারীরা আছে।
নিম্নবর্গ নানা মাত্রিক। এই শব্দের উৎস সাবঅলতার্ন। সাবঅলতার্ন ধারণার উৎস ইতালীয় আন্তনিও গ্রামশির ‘PRISONE’S BOOK’। গ্রামশির উদ্ভাবিত এই শব্দ এখন তত্ত্ববিশ্ব ও জীবন চর্যায় ক্ষমতার চৌহদ্দিতে প্রধান বিশ্লেষণ করা হচ্ছে শোষণ, শাসন, ক্ষমতা ও নীতি নির্ধারণের অব্যহত ব্যবস্থা।
আকাক্সক্ষা ছিল যে, এই বিশ্বে সর্বেসর্বা হবেন প্রলেতাবিয়েত কিন্তু জগৎ জুড়ে সাবঅলতার্ন সমাজ সকল আসন অধিকার করে যেন প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ করে ফেলেছে।
প্রান্তজনকে হাতকড়া পরিয়ে যে দর্শন ও তত্ত্ব প্রদান করা হয়েছে তাতে ধারক ও বাহকের ভূমিকা আন্তনিও গ্রামশির।
এই ধারণা এত তীব্র ও ব্যাপক যে সহসা হটিয়ে দেয়া যাচ্ছে না বরং নতুন নতুন সংযোগ ও ডাইমেনশন একে একে উপস্থিত হচ্ছে।
মার্কসবদের জনকদের পর তাদের নিয়ে অনেকটা এগিয়েছেন গ্রামশি।
সভিয়েত ইউনিয়নের পতন যে অন্ত:ক্ষরণ সৃষ্টি করেছিল একদা তা নিভে যায় না বরং উসকে দেয় নতুন আলোকপাত – সাবলর্তান প্রসঙ্গ।
বাংলা ভাষার শব্দ ‘নিম্নবর্গ’ কিংবা প্রান্তজন তুলনায় সাবঅলর্তান, শব্দে অধীনতা অর্থে সকল প্রকার অবদমন, পীড়ন যুক্ত হয়ে বহুমাত্রিক চরিত্র সৃষ্টি করেছে বলে অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি এই সর্বস্তরে Dominated ও Dominant-কে এক নামে অপরের সাপেক্ষে আরেকটিকে সঠিক উপলব্ধি করতে সক্ষম হচ্ছি। নানা প্রকার অভিধাকে এক শব্দে প্রকাশ করেছে সাবঅলতার্ন। মূল শব্দের নিহিতার্থ ব্যাপক।
নিম্নবর্ণ ও নিম্নবর্গ আলাদা; সকল নিম্নবর্ণ মানুষ নিম্ন বর্গ হলেও নিম্নবর্গ মাত্রই নিম্নবর্ণ নয়।
ইতালীয় কমিউনিস্ট নেতা গ্রামশির প্রিজন নোটবুকস-এর সাবঅলটার্ন শব্দে সকল অর্থই তবে একীভূত হয়েছে। প্রলেতারিয়েতরাও বিলীন হয়ে গেছে সাবঅলতার্নদের মধ্যে; প্রতিশব্দ হিসেবে সূত্রপাত ঘটলেও সময়ের পরিসরে অর্থ নতুন হয়েছে অনুধাবন গভীর হয়েছে, যুক্ত হয়েছে নানা সত্তা, অধীনতার কোন সীমানা টানা যায় না। দলনের শিকার দলিতরা যেমন আছেন তেমনি ভূমিজ আদিবাসীরা থাকছেন।
শ্রেণি বৈষম্য সমাজের কথা মাথায় রেখে গ্রামশি সাবঅলতার্ন শব্দটি গ্রহণ করেছিলেন মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে।
ক্ষমতার অধিকারী উচ্চবর্গরা সর্বত্র চায় অধীনস্থ ক্ষমতাহীন সাবঅলতার্নদের করায়ত্ত করতে।
শোসক
শাসক
উচ্চবর্গ
>> শোষিত
শাসিত
নিম্নবর্গ
মুসোলিনী জেলে বন্দি করলে, কুড়ি বৎসরের কারাদ- দিয়ে মস্তিষ্ক অকেজো করে রাখার অভিপ্রায় সত্ত্বেও ইতালির কমিউনিস্ট নেতা ও দার্শনিক আন্তনিও গ্রামশি (১৮৯১-১৯৩৭) যে মার্কসীয় আলোচনা লিপিবদ্ধ করেছিলেন তা কারাগারের নোটবই নামে খ্যাত হয়ে আছে। ১৯২৯ হতে ১৯৩৫ পর্যন্ত কারাগারের অন্তরালে লেখালেখি করেছিলেন তিনি। মার্কসবাদের বিভিন্ন তত্ত্ব সম্পর্কে ব্যাখ্যা লিপিবদ্ধ হয়েছিল তার কলমে।
লেখালেখির সময় তিনি ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠীর শ্যেন দৃষ্টি এড়াতে চেয়েছিলেন, চেষ্টা করেছিলেন লেখাগুলি নষ্ট হবার আশংকা মুক্ত রাখতে।
এক ধরনের রূপক ভাষার উদ্ভাবন করেছিলেন গ্রামশি, মার্কসীয় আলোচনার ক্ষেত্রে যে তত্ত্ব ও পরিভাষা ব্যবহৃত হয়ে আসছিলো তার উপযুক্ত প্রতিশব্দ খুঁজে নিয়েছিলেন তিনি রূপক ভাষার ব্যবহারের জন্য।
পুঁজিমালিক বা বুর্জোয়োসি = হেগেমনিক
শ্রমিক শ্রেণি বা
প্রলেতারিয়েত = সাব-অলতার্ন।
সাবঅলতার্নের প্রতিশব্দ হিসেবে বাংলা শব্দ নিম্নবর্গ ব্যবহার করা হলেও কোথায় যেন পূর্ণাঙ্গ ভাব প্রকাশ হয় না বলেই শোষক/শাসক কিংবা শোষিত/শাসিত শ্রেণি ধারণার বিকল্প ছিল না হেগেমনিক/সাবঅলতার্ন।
‘Subaltern’   শব্দটির বঙ্গজরূপ ‘নিম্নবর্গ’ প্রতিশব্দটির প্রথম ব্যবহার করেন রণজিৎগুহ। এই নিম্নবর্গ দিয়ে বোঝানো হয়েছিল সেই সব মানুষ যারা সমাজের একেবারে প্রান্তিক, ব্রাত্য মানুষ হিসেবে বসবাস করছে এবং যারা আর্থিক দিক থেকেও খুবই দুর্বল, যারা নানা কারণে, নানাভাবে উপেক্ষিত, শোষিত, বঞ্চিত, উপেক্ষিত, সেই সব মানুষের পরিচয় এখানে ‘নিম্নবর্গ’, অন্য অর্থে প্রলেতারিয়েত।
তবে ইত:মধ্যে এই নিম্নবর্গ ধারণার পরিসর আস্তে আস্তে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রলেতারিয়েত তো বটেই সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষেরাও নিম্নবর্গ-এর অন্তর্ভূক্ত।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে নিম্নবর্গ নিয়ে নতুন বিবেচনার সময় এসেছে।
ভদ্রসমাজে মর্যাদাহীন জনগোষ্ঠী বিশেষ জনগোষ্ঠীর জীবন প্রণালী, নিম্নবর্গের মানুষ, নিঃসঙ্গ মানুষ, ভূমিহীন কৃষক, প্রান্তকায়িত ব্রাত্য মানুষ, দলিত ও অস্পৃশ্য সকলকে এই বর্গের আওতায় আনা যায়।
সমকামী নারী পুরুষ সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। কমলকুমার মজুমদারের ‘মল্লিকা বাহারে’ এমন একাকী আনন্দে বিভোর মানুষেরা সমাজের মূল স্রোতে মিশে যেতে পারে না।
সময় কাল-সমাজ-অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে নিম্নবর্গের পরিধি পুন:সংজ্ঞায়নের জন্য বর্তমান নিরিখে উন্মুখ।
যে শ্রমিক কারখানায় সাবঅলতার্ন, সে কিনা নিজের পরিবারে ডমিন্যান্ট হয়ে উঠতে পারে। নিম্নবর্গ কে? এই প্রশ্নের খোঁজে অন্যপক্ষ কোনো মানুষ বা মানবগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা যায় না; যে কোনো সময় সাবলঅতার্নকে চিনে নিতে হয় সাপেক্ষ সম্পর্কে।
গ্রামের কৃষিজীবী ও শহরের বস্তিবাসী আর্থিক কারণে নিম্নবর্গের অন্তর্ভূক্ত।
প্রকৃতপক্ষে গ্রামশির ‘সুবলতোর্নো’ শব্দটির ব্যাপকতা বাংলা প্রতিশব্দে নাই।
মার্কসবাদী গ্রামশির কারাগারের নোটবই-এ ধনতান্ত্রিক সমাজের অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রসঙ্গে ইতালীয় ভষায় ‘সুবলতোর্নো’ বলে শব্দটি প্রয়োগ করেছিলেন। সেই আধিপত্যের নিরিখে তলানীর মানুষরা নানা কৌশলে ক্ষমতাহীন সুবলতোর্নো বা সাব-অলতাার্ন।
গ্রামশির এই সাব-অলটার্ন ধারণা থেকেই রনজিৎ গুহ ভারতীয় ইতিহাস চর্চায় এই সাব-অলটার্ন তত্ত্ব গ্রহণ করেন এবং এ যাবত প্রচলিত নানা মত ও পথের আলোকে রচিত ইতিহাস চর্চার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।
ভারতের জাতীয় ইতিহাস, মার্কসীয় ইতিহাসসহ অন্যান্য দর্শন-ভিত্তিক ইতিহাসকে সুপার-অলটার্নদের ইতিহাস বলে চিহ্নিত করেছেন যেখানে সাব-অলটার্নদের কোনো উপস্থিতি নাই।
এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে সাব-অলটার্ন স্টাডিজের সূত্রপাত। এই নবধারার ইতিহাস প্রণেতা জ্ঞানেন্দ্র পান্ডে মত দিয়েছিলেন যে, অখ- ভারতবর্ষের ইতিহাস রচনায় জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকেরা জাতীয় চৈতন্যকে জোর দিয়েছেন।
বাংলা সাহিত্যে, বিশেষত কথা সাহিত্যে যথার্থ আঞ্চলিকতা ও প্রান্তিকতার সূচনা ঘটে বিশশতকের তিরিশ দশকের শেষভাগে। বাংলা সাহিত্যে এই ধারার পথিকৃৎ শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় (১৯০১-১৯৭৬); গল্পের নাম কয়লাকুঠী; প্রকাশ পেয়েছিল ১৯২৯ সালে।
ইতিহাসে প্রান্তিকায়িত মানুষ নিয়ে সাব-অলটার্ন স্টাডিজের সূত্রপাত হয় বিংশ শতাব্দীর আশির দশকে। ফলে কথাসাহিত্য বিশেষত উপন্যাসের ভূমিকা এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য।
প্রচলিত ইতিহাস-চর্চার সমালোচনা করে ১৯৮২-সালে সূচনা হয় এই উপলব্ধি সহকারে যে, রনজিৎ গুপ্তর কথায় আমরা ইতিহাস বিদ্যার একটা সঙ্কটের মধ্যে আছি।
সংকট:- ইতিহাস-চর্চা প্রচারিত ইতিহাস দর্শনে, তত্ত্বে ও অভ্যাসে, আটকা পড়েছে এক কানাগলিতে।
এই ইতহাস সমাজের উচ্চবর্গ, এলিটদের নিয়ে ব্যস্ত থেকেছে।
নৈব্যক্তিক ও নিরপেক্ষ হওয়া ইতিহাসের পক্ষে সম্ভব না; সমাজে বসবাসকারী মানুষ যখন ইতিহাস রচনায় ব্যপিত হয় তার পক্ষে সমাজ ও জীবনকে লক্ষ্য করার দৃষ্টিভঙ্গিতে ভিন্নতা রয়েছে। সমাজ ব্যবস্থায় বসবাস করে এই সমাজের প্রতি নিজ দৃষ্টিভঙ্গি উপেক্ষা করে ইতিহাসকে দেখা হয়ে উঠে না; অসম্ভব কাজ।
ইউরোপের হাত ধরে, অনুসরণ ও অনুকরণে, বাংলায় উপন্যাস চর্চা আমাদের চিরকালীন আখ্যান রচনার ঐতিহ্যকে পিছু ফেলে আধুনিকতার মোড়কে আবির্ভূত হয়ে বঙ্কীমচন্দ্রের কলমে উপনিবেশিকতার অধীনস্ত হয়েছিল তেমনি উপনিবেশিক শাসনের প্রারম্ভে ভারতে ইতিহাস রচনার উদ্যোগটি এসেছিল প-িতম্মন্য ইংরেজ ও এদেশীয় প্রশাসনে নিযুক্ত আমলাদের প্রয়োজনীয়। এদের রচনার মাধ্যমে ভারতবর্ষের সঙ্গে ইংরেজ জনসাধারণের প্রাথমিক পরিচয়। স্বদেশে প্রগতিশীল হিসেবে চিহ্নিত হলেও তাদের ইতিহাস রচনার ছত্রে ছিল বিজেতার দম্ভ; শ্বেতকায় মানুষের দায়িত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা প্রকাশ পায়। ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নৈতিক যথার্থতা ও বিভিন্ন জাতি ধর্ম-ভাষা অধ্যুষিত অধ:পতিত ভারতীয় উপমহাদেশে জ্ঞানদীপ্ত, মঙ্গলময় ব্রিটিশ শাসনের অনিবার্যতার তত্ত্বটি প্রচারের প্রয়োজন হয়। সাম্রাজ্যবাদ বৈধকরণের মূল উদ্দেশ্য নিয়ে অষ্টাদশ শতাব্দীতে উপনিবেশিক সাহিত্য চর্চার সূত্রপাত ভারতেতিহাসে কেবল সাম্রাজ্যবাদী অহংবোধ কাজ করে নাই; বরং তথ্যগত বিভ্রান্তির সঞ্চার করা হয়েছিল।
উপনিবেশিক সাহিত্য চর্চার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ জাতীয়তাবাদী ইতিহাস চর্চার উৎপত্তি। উপনিবেশিক শাসনাধীনে ভারতের অর্থনৈতিক শোষণের ভয়াবহতার বিবরণ ছিল সেখানে। সময়টা তখন নব পর্যায়ের জাতীয়তাবাদের উন্মেষের যুগ।
চিকালের নব্য উপনিবেশিক ঐতিহাসিকগণ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিকাশকে ভারতীয় সমাজের চিরপুরাতন গড়নের বহি:প্রকাশ হিসেবে যখন ব্যাখ্যা করলেন তার অব্যবহিত পরেই মার্কসবাদী ধাঁচে ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে ব্যাখ্যা করলেন মানবেন্দ্রনাথ রায়।
তার মতে, উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত কোনো অখ- ভারতীয় জাতিসত্তা গড়ে না উঠলেও, অভ্যুদয় হয়েছিল এক নতুন বুর্জোয়া ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত এক শিক্ষিত সম্প্রদায়ের। আধুনিক ভারতের জাতায়তাবাদ ছিল এক বুর্জোয়া শ্রেণির রাজনৈতিক মতাদর্শ ও আশা-আকাক্সক্ষার বহি:প্রকাশ।
কংগ্রেস গঠন, দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব, দলের ক্রমবর্ধমন জনপ্রিয়তা, জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বন্দের বক্তৃতা ও রচনাবলী, বঙ্গভঙ্গ কেন্দ্রিক সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন। ভারতে বিপ্লববাদ-পরিবর্তন বয়ে আনলো উপনিবেশিক সাতিহ্য চর্চায়।
প্রাচ্য বিদ্যাও শুরু হলে প্রভাব পড়লো ইংরেজ ভারত বিশারদদের ওপর।
উপনিবেশিক ভারতের অর্থনৈতিক চরিত্রের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে রজনী পাম দত্ত বামপন্থী ইতিহাস চর্চার মূল কাঠামো তেরি করে দেন।
পেশাদারী ইতিহাস চর্চার পাশাপাশি ১৯২০-৫০ সালের মধ্যে জাতীয় ভারতীয় নেতৃবৃন্দের আত্মজীবনীমূলক রচনা প্রকাশিত হতে থাকলে জাতি, জাতীয়তাবাদ, ভারতীয় সত্তা নিয়ে অস্পষ্টতা খোলাশা হতে শুরু করে।
উপনিবেশিক ঐতিহাসিকগণ মুসলমান যুগের ভারতের তুলনা সমসাময়িক ব্রিটেনের উন্নত বুদ্ধিবিভাষ ও নৈতিক প্রগতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ব্রিটিশ শাসনের গুণমান, সুবিধা ও সুযোগ বিধৃত করার পাশাপাশি মুসলিম রাজত্বকালকে অন্ধকার সময় হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস ছিল।
ব্রিটিশ শাসনের সুফলগুলি উপলব্ধি করানোর জন্য আরেক ধরনের মিশনারি ব্রত ছিল তাদের।
জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকদের সবচেয়ে বড়ো অবদান হলো মধ্যযুগীয় ভারতীয় ইতিহাসের ধর্ম নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা কিন্তু উপেক্ষিত হয়েছিল আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি।
বিশ শতকের ছয়ের দশক পর্যন্ত আমরা ইতিহাসের বেশ কয়েকটি ধারার সঙ্গে পরিচিত হই –
১. পৌরানিক ইতিহাস চর্চার ধারা
২. জাতীয়তাবাদী ইতহাস চর্চার ধারা
৩. কেব্রিজ অক্সফোর্ড ইতিহাস চর্চার ধারা
৪. সাম্রাজ্যবাদী ইতিহাস চর্চার ধারা
৫. মার্কসবাদী ইতিহাস চর্চার ধারা
৬. সাব-অলটার্ন ইতিহাস চর্চার ধারা
৭. পোস্ট-মডার্ন ইতিহাস চর্চার ধারা
পৌরাণিক ইতিহাস চর্চার মধ্যে আরবি-ফারসি ইতিহাস চর্চা আছে- রাজকাহিনী মূলত:- ইতিহাসের নায়ক রাজা বা সম্রাট। প্রজাদের কোন স্থান নাই। জনগণের স্বর অনুপস্থিত।
পরে ইতিহাসে প্রধান হয়ে এলো সা¤্রাজ্যবাদী প্রভু – যারা বিভিন্ন উপনিবেশে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য তাদের আদর্শে রচিত সাম্রাজ্যবাদী ইতিহাস চর্চার মডেল তৈরি করলেন। এইসব ইতিহাসের নায়করা সাম্রাজ্যবাদী প্রভু।
সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের তৈরি আদিকল্পের স্থান নিল কেমব্রিজ-অক্সফোর্ড ইতিহাস চর্চা, এদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে জাতীয়তাবাদী ইতিহাস চর্চার ধারা প্রতিষ্ঠিত হলো। এখানে নায়ক উচ্চবর্গের মানুষেরা। বিদেশী প্রভু তার সাম্রাজ্যবাদী মুখোশ বদলালো কেমব্রিজ-অক্সফোর্ড ইতিহাস চর্চায়। আর বিদেশি প্রভুর মুখোশ ধারণ করলেন জাতীয়তাবাদী ইতিহাস চর্চাকারীগণ। এরাও পক্ষপাত দেখালেন উচ্চবর্গের প্রতি, নিম্নবর্গর বিদ্রোহ ও আন্দোলনকে মূল্যায়ন করলেন না। ফলে কোনো ইতিহাস চর্চায় জনগণ নায়ক হলো না। এমন কি তাদের খুঁজে পাওয়া গেল না। রইলো নীরবতা।
এ সময় পশ্চিমের চোখে আমরা দেখতে শুরু করলাম, নিজেদের ইতিহাস বিচার-বিশ্লেষণ করলাম। পশ্চিমি দুনিয়া আমাদের ইতিহাস চর্চার প্রাচ্য বিদ্যা নির্মাণ করলো। যা দেখা গেল এদয়োর্দ সাইদ-এর ওরিয়েন্টালিজম নামক কেতাবে।
এশিয়াটিক সোসাইটি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উপনিবেশিক ব্রিটিশ প্রভুরা ভারতবর্ষের সমাজ ও সভ্যতা আবিষ্কারে যে প্রাচ্য বিদ্যা চালু করলেন সেখানে বিদেশি প্রভুরা এমন একটা ইমেজ তৈরি করলেন, যেন অসভ্যতার অন্ধকার হতে মুক্তি দিতে এদেশে দেবদূত হিসেবে তাদের আগমন।
ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি বা ভারতীয়রা কেমব্রিজ-অক্সফোর্ডের প্রাচ্য বিদ্যার আদিকল্পটি নিজেদের মতো করে অনুধাবনসহ জাতীয় ইতিহাস চর্চার ধারা বলে উপস্থিত হলেন। রচিত হলো জাতীয়তাবোধের ইতিহাস।
পশ্চিম ইউরোপের ইতিহাসের অনুকরণে তৈরি মার্কসবাদী ইতিহাস চর্চার যে যান্ত্রিক ধারা রজনী পাম দত্তের মাধ্যমে চালু হয়েছিল তা ভেঙ্গে এশিয়ান মোড অব প্রকাশন জায়গা দখল করলো – পশ্চিম ইউরোপের থেকে আলাদা। ইতিহাসের এইসব তত্ত্ব সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে কেবল ওঠে নাই উপরন্তু রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শন, রাষ্ট্রনীতি, নৃতত্ত্ব ও সমাজতত্ত্বে প্রভাব বিস্তার করে।
মার্কসবাদী ইতিহাস চর্চায় শ্রেণির প্রসঙ্গ এল, কিন্তু সমাজের নানা শ্রেণির মানুষের আইডেনটিটি, বিশেষত নারী, প্রান্তিক কৃষক, পালিত, নি¤œবর্গের মানুষজন উপেক্ষিত রয়ে গেল। ইতিহাসের পাতা বরাদ্দ রইল উচ্চবর্গ, এলিট শ্রেণি নেতা-নেত্রীদের জন্য।
শিল্প বিপ্লব, বিশ্বযুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দা, ঠাণ্ডা যুদ্ধ, মহাকাশ যুগ, ক্যুদেফাত আরব ভূখণ্ডে তেল সংকট, উপনিবেশগুলোর স্বাধীনতা – এশিয়া, আফ্রিকায়, ভিয়েতনামের যুদ্ধ, ফ্রান্সের ছাত্র আন্দোলন, ৬৮র ঘটনাসমূহ ইতিহাসের তত্ত্বসমূহের ওপর প্রভাব বিস্তার করলে ইতিহাস-তত্ত্বগুলির কাঠামোয় ভাঙ্গুর চালাতে লাগলো।
বিশ শতকের আশির দশক পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইতিহাসে আধিপত্য বিস্তার করেছে উচ্চবর্গ ও এলিট শ্রেণি।
মার্কসবাদী ইতিহাস চর্চাও বুর্জোয়া যুক্তিবাদের উন্নত সংস্করণ বলে উপলব্ধি থেকে সাব-অলটার্ন স্টাডিজ এর মাধ্যমে নিম্নবর্গর ইতিহাস রচনার মাধ্যমে নি¤œবর্গের মানুষের চোখে ইতিহাসকে দেখার এক সমান্তরাল পাঠকৃতি তৈরি হলো। কৃষি প্রধান দেশে যেহেতু পশ্চিম ইউরোপের মত করে ধনতন্ত্রের সুষম বিকাশ ঘটে-নাই, সেখানে বিভিন্ন শ্রেণির নানা স্তরভেদ থেকে গেছে, নিম্নবর্গ ও উচ্চবর্গের মধ্যেও স্তরভেদ দেখা গেছে- এইসব নিম্নবর্গর মানুষের স্বর তুলে আনতে সাব-অলটার্ন ইতিহাসের সূত্রপাত হলো।
রণজিত গুহ, জ্ঞানেন্দ্র পান্ডে, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিডার্ক, গৌতম ভদ্র প্রমুখের কৃতবিদ্যে তুলে আনার প্রয়াস ছিল নি¤œবর্গের মানুষের চাপা পড়া বাকি ইতিহাস যাতে উঠে আসলো সেইসব মানুষের বিদ্রোহ ও সংগ্রাম।
পুঁজিবাদী দেশেও এই ধারার চর্চা বিস্তারিত হলো তারপর। ভারতীয়দের প্রবর্তিত এই ইতিহাস চর্চা চলেছে সারা পৃথিবী জুড়ে এবং নানা তর্ক-বিতর্ক, ডিসকোর্স পরিলক্ষিত হয়েছে।
এই ইতিহাস চর্চার রাস্তা ধরেই মিশেল ফুকো, জ্যাাঁক দেরিদা, জাকা লাকাঁ, রোলা বার্থ ইতিহাস চর্চার পোস্ট মডার্ণ ধারার সূত্রপাত করেন। এই ধারায় ইতিহাসের কোনো মহা-আখ্যান বিশ্বাস করা হয় না। এই দুই ধারার ইতিহাস চর্চা প্রায় স্থায়ী ইতিহাসের আদিকল্পগুলিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, এল হতে ইতিহাসকে দেখা।
নিম্নবর্গের ইতিহাসে রাজা-বাদশার কাহিনী না, বরং নিচতলার মানুষগুলোর গণসমাবেশ, প্রান্তিক, আদিবাসী ও নারীদের ভূমিকার কথা গুরুত্ব পেল, নিম্নবর্গের ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতিকে প্রভাবিত করে ভারতবর্ষের অলীক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কীভাবে উচ্চবর্গের আধিপত্য চালিয়ে যাচ্ছে তাও ডিসকোর্সের মধ্যে ঢুকে পড়লো।
কৃষকদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা, ধ্যান-ধারণা ও শ্রেণি চেতনার সীমাবদ্ধতার কথাও আলোচিত হয়েছে – বলা হলো, এই চেতনা খ-িত, নির্জীব, পরাধীন। প্রভুদের মতাদর্শের আবরণে কৃষকদের চেতনা আচ্ছন্ন থাকে বলেই প্রভুদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলেও তা বিপ্লবে পরিণত হয় না, বরং নতি স্বীকার করে, তাই তাদের চেতনা নেতিবাচক।
মার্কসীয় তত্ত্ব ছিল ইউরোপের অভিজ্ঞতা নির্ভর; পশ্চিম ইউরোপের রাষ্ট্রকেন্দ্রীক সমাজ জীবনের সঙ্গে ভারতের সমাজ সংস্কৃতি কেন্দ্রিক সমাজ জীবনের পার্থক্য রয়েছে।
ফলে ইউরোপের ছাঁচে ইতিহাসের বিচার-বিশ্লেষণ করা ভুল বলে সাবলটার্ন ধারার ঐতিহাসিকগণ ভারতের কলোনিয়াল ইতিহাস সমাজ-পিরামিডের নিচ হতে দেখার প্রয়াস গ্রহণ করেছিলেন। রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কও আলাপে আসলো। জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বুর্জোয়া কর্তৃত্বে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা, মিডিয়ার ভূমিকাও এসে যায়।
কৃষক বা নিম্নবর্গের চেতনা লোক-মানস নির্ভর। রাষ্ট্রের আইনের তুলনায় অনেক সহজ সরল ও গভীর জীবনবোধ এক্ষেত্রে বিশ্বায়ন অকেজো যদিও ফ্রি-মার্কেটের পণ্য গ্রামে-গঞ্জেও পৌঁছে যাচ্ছে, কিন্তু তাতে তাদের স্বাভাবিক ন্যায়-অন্যায় বোধ বদলায় না।
প্রতিষ্ঠানিক ধর্মের চাপ লোক মানসের ওপর থাকলেও সাবঅলটার্নরা জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কতটুকু গ্রহণ করবে অথবা করবে না তা ঠিক করতে সক্ষম।
প্রভু শ্রেণির ধর্ম বিশ্বাস আর অধীনস্তের ধর্ম বিশ্বাসের স্তর, আকার ও চরিত্র আলাদা, কিছু ক্ষেত্রে বিরোধীতা থেকে জন্ম নেয় প্রতিরোধ, বিদ্রোহ। প্রভু শ্রেণি বিপদগ্রস্থ হয়। নি¤œবর্গের চিন্তার, চেতনার সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা আছে।
মার্কসীয় তত্ত্ব কাঠামোতে কেবল পাওয়া যায় শ্রেণি চেতনা।
মার্কস এঙ্গেলসের বিচার-বিশ্লেষণ-বিবেচনায় স্থান পেয়েছিল পশ্চিম ইউরোপের আদিম সাম্যবাদী ব্যবস্থা- দাস প্রথা, সামন্তশ্রেণির আধিপত্য, ভৌগোলিক আবিষ্কার নতুন নতুন উপনিবেশ, শিল্প বিপ্লব, বুর্জোয়াদের সামাজিক কর্তৃত্ব, সাম্য-মৈত্রী-গণতন্ত্র, ব্যক্তি ও যুক্তিবাদী সমাজ দর্শন, প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা।
এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় প্রতিকল্প মার্কসীয় তত্ত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অনুপস্থিত ছিল এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা। এই সব অঞ্চলে অন্যভাবে ইতিহাসের বিবর্তন হয়েছিল। ফলে নিম্নবর্গের ইতিহাসও রচিত হচ্ছে। শ্রেণি দ্বন্দ্বের বিকাশ ও প্রকাশ বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন। আবার এই শ্রেণি দ্বন্দ্ব জটিল ও পরিবর্তনশীল।
মার্কসীয় মডেল পশ্চিম ইয়োরোপ কেন্দ্রিক। উচ্চ ও নিম্নবর্গের পরস্পর বিরোধী ধারণা দু’টি কিন্তু পৃথিবীর সর্বত্র সব সমাজ বিদ্যমান।
ইতিহাস রচিত হয় উচ্চবর্গের প্রয়োজনে। কলোনীর ইতিহাসে পাওয়া যায় নিষ্ক্রিয়, অনুগত ও ভারু-জীব যারা অন্যদের দ্বারা পরিচালিত। কলোনীর প্রভুদের বিরুদ্ধে অসংখ্য বিদ্রোহ সংঘটিত হলেও ইতিহাসে গুরুত্ব পায় নাই।
ভারতবর্ষের উপনিবেশিক পর্বের ইতিহাস পাঠ করলে মনে হয় সমাজের উচ্চবর্গের কয়েকজন এলিট ব্যক্তির কৌশলে ইংরেজদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন হয়েছে।
সাবঅঅলটার্ন স্টাডিজ উপনিবেশিক ও দেশীয় দু’ধরনের উচ্চবর্গের উদ্দেশ্য ও পদ্ধতির সঙ্গে নিম্নবর্গের রাজনীতির পার্থক্য যেমন দেখানো হয়েছে, তেমনি নিম্নগামীয় চেতনার নিজস্বতা কোথায় তাও দেখানো হয়েছে। প্রান্তিক মানুষ যখন বিদ্রোহ করে শাসক গোষ্ঠীর কাছে তখন অনুভব হয় নিম্নবর্গেরও নিজস্ব স্বার্থ ও উদ্দেশ্য আছে; সংগঠন ও কর্মপদ্ধতি আছে।
সাবঅলটার্ন ইতিহাসের নানামুখী সমালোচনা রয়েছে। উচ্চবর্গ বা নিম্নবর্গ রাজনীতির ক্ষেত্রে এরকম ভাগ করলে নানা ধরনের বিভেদকামী, বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতি তাতে প্রশ্রয় পায়।
নিম্নবর্গীয় চেতনা নিয়ে প্রগতিশীলদের আপত্তির কারণ হলো- মানব সভ্যতার ইতিহাস অনুন্নত আদিম অবস্থা থেকে ক্রমান্বয়ে উন্নত চেতনার দিকে এগিয়েছে। জাতীয়তাবাদী ও মার্কসবাদী ঐতিহাসিকরা মনে করেন নি¤œবর্গের ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ জাতিরাষ্ট্রের ধারণা বাতিল হয়ে যায়।
এ পর্যন্ত যে ইতিহাস রচিত হয়েছে, তা উচ্চবর্গের ইতিহাস বলেই আংশিক ইতিহাস যেহেতু নিম্নবর্গের কোনো স্বর বা অবস্থান নাই অতএব এই শ্রেণির ইতিহাস রচনার মাধ্যমে একটা জাতির ইতিহাস সম্পূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বুর্জোয়া ইতিহাসে যে মানব বা আদর্শ নাগরিকের কথা বলা হয়েছে তারা সকলে উচ্চবর্গের।
গায়ত্রী স্পিভাক চক্রবর্তী মানব বা আদর্শ নাগরিকের স্থানে নিম্নবর্গকে বিকল্প নায়ক বা নাগরিক করার পক্ষপাতী ছিলেন না। তিনি মনে করেছেন, নি¤œবর্গ তার নিজের কথা কখনোই বলতে পারে না। অতএব তাদের কথা উপস্থাপন করছেন ঐতিহাসিকগণ তাদের পক্ষে রাজনৈতিক সদিচ্ছায়। গায়ত্রী স্পিভাক প্রতিষ্ঠা করতে তিনি দাবী করলেন ইতিহাসের হাজার স্বরের ভেতরে থেকে নিম্নবর্গের স্বর তুলে আনা অসম্ভব এবং যে স্বর আবিস্কার করা যাবে তা অপরের নির্মাণ।
সাধারণ অর্থে বুঝে নিতে পারি একদিকে নিম্নবর্গের নিজস্ব ইতিহাস ও কন্ঠস্বর পাবার আকাক্সক্ষায় গায়ত্রীর চাওয়া এমন এক নিম্নবর্গের ইতিহাস রচয়িতা যার জন্য অপেক্ষা, যিনি সামাজিক অস্বীকৃতি এবং সামাজিক পদ্ধতিগুলোর ভেতর থেকে নিম্নবর্গের অস্তিত্ব তুলে আনবেন, শনাক্ত করবেন, তাদের নিজস্ব কন্ঠস্বর স্থাপন করবেন।
রণজিৎ গুহ, যিনি সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন সাবঅলটার্ন স্টাডিজ, তিনি আকাক্সক্ষা পোষণ করেন যে, ইতিহাসের বিভ্রমে গড়ে ওঠা ‘অলীক রূপকথা’ ভেঙ্গে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করবে। শোষক/শাসকে প্রকৃত ভূমিকা উন্মোচিত হবে।
কিন্তু স্পিভাক কাক্সিক্ষত সেই নিম্নবর্গের দিক নির্ণয়ী ঐতিহাসিক যেমন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, অনুরূপভাবে রণজিৎ গুহের প্রস্তাব মোতাবেক মুক্ত ইতিহাস বিদ্যাও আজ অনুপস্থিত।
সামাজিক পদ্ধতিগত বিন্যাসে এবং ইতিহাসাশ্রয়ী বিভ্রান্তময় খোলশে এই নিম্নবর্গ অন্যের দৃষ্টিতে বিকশিত।
‘যারা যুগে যুগে ছিল খাটো হয়ে
তারা দাঁড়াক একবার মাথা তুলে।’
রবীন্দ্রনাথের এই আবেদনের মধ্যে সাহিত্যিক হৃদয় সংবেদনা পাওয়া যায়।
ইতিহাসের নিয়ম হচ্ছে, যতদিন শাসকবর্গ ও তাদের সমর্থক বিত্তশালীরা থাকবে, ততদিন নি¤œবর্গ থাকবে; বীজের ভিতর অঙ্কুর হয়ে তারা থেকে যাবে।
অতএব, বিভিন্ন কালপর্বে দেখা যায় নিম্নবর্গ নাম পাল্টায় কিন্তু অবস্থানের পরিবর্তন হচ্ছে না।
প্রাক-উপনিবেশিক যুগ- বর্ণের দিক থেকে মানুষ নিম্নবর্গ
উপনিবেশিক যুগ- শিক্ষার দিক থেকে মানুষ নিম্নবর্গ
উত্তর উপনিবেশিক যুগ- অর্থের দিক থেকে মানুষ নিম্নবর্গ।
অর্থও নিয়ামক শক্তি। অর্থের প্রবল প্রতাপ সামাজিক সংগঠনের জীবন্ত সম্পর্কগুলো ধ্বংস করে দেয়। অর্থ-ই সকল ক্ষমতার উৎস। ইতিহাস লেখা হয় ক্ষমতা পোষণ বিবেকের হাতে।
গণতান্ত্রিক বাস্তববাদ-এর পটভূমিতে এ কথা অনস্বীকার্য যে এক কেন্দ্রীক বিশ্ব, এক কেন্দ্রিক মহূর্ত সৃজন করেছে এই বাস্তববাদ। শক্তির কবিতায় তাই নিম্নবর্গের জন্য ভাত নাই, পাথর রয়েছে।
চোখ ফেটে রক্ত পড়বার মতো কান্না আজকাল নিম্নবর্গের জীবনে বিদ্যমান।
ইতিহাস ও ভূগোলে নির্বাসিত জন নিম্নবর্গ, তাতে মাটি নাই, প্রকৃতি নাই। উন্নয়নের বাতাবরণে সেগুলো ক্রমে বিলীন।
জীবজন্তু গাছপালা কৃষি স্থাপত্য শিল্প ঐতিহ্য, ঘরবাড়ি, নদী, নিসর্গ অসংযমী পায়তারা দিয়ে পুঁজির বিস্তৃতির কাছে নির্মূল হচ্ছে।
কেবল গ্লোবালাইজেশন একমাত্র দায়ী নয়; আমাদের নিজের ত্বক মসৃণ ও চেকনাই রাখার স্বার্থপর মানসিকতা সব কিছু উসকে দিয়েছে। ভোগের জন্য ছিনিমিনি খেলা আগেও ছিল এবং ছিল ভারসাম্যময় মানসিকতা যা এখন হারিয়ে গেছে বলেই গ্লোবালাইজেশনের

Net-price Global warming. Acid Rains –

photochemical smog-030ne

layer depletion- Global warming;

নিঃসন্দেহে Chain- Reaction। ভোগবাদকে উন্নয়ন হিসেবে দেখার ফলে ধনকেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ হচ্ছে Industrial Animal. আর ভোগসর্বস্ব সমাজ Neo-barbarism  এর প্রতিরূপ। এখন এখানে কামড়াকামিড়ির প্রতিয়োগিতা চলছে পার্থিব সম্পদের মালিকানা নিয়ে, যেমন ছিল পুরাণিত অমৃতের প্রতিযোগিতা অপেক্ষাও ভয়ঙ্কও আয়োজন।
প্রযুক্তিগত বিপ্লবে পার্থিব সম্পদের মালিকানা যখন কুক্ষিগত হয় তখন তা নিম্নবর্গের সম্মতিক্রমে ঘটছে না।
‘Every being is a co-being’ ’ এই উপলব্ধি কবে চলে গেছে।
Co-being এর ওপর ভিত্তি করে গ্রামশির কল্পনায় ছিল মানবিক সত্তার সামগ্রিক স্থায়িত্বের প্রকল্প। কার্ল মার্কসের জন্য তা ছিল শ্রেণিহীন সমাজ ব্যবস্থার সংরচনা। কিন্তু Co-being হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় লোকায়ত ভূমি-বীজ ও প্রকৃতি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, গ্রাস হয়ে গেছে, চলে গেছে অর্থ লোভী মানুষের করতলে। যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেই-করুনার আলোড়ন নেই।পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
বৃহৎ অংশের মানুষকে বারবার নিম্নবর্গে পরিণত করা হয়েছে।
প্রক্রিয়ার কোন শেষ নাই; লক্ষ্য প্রান্তিকায়ন না হলেও ফলাফল সাক্ষ্য দিয়ে যাচ্ছে – ইতিহাসকে।
মূলত জ্ঞান ও প্রতাপতত্ত্বের ক্রমাগত আক্রমণ শাসকবর্গের লুণ্ঠন প্রবৃত্তির পরিচয়।
কেড়ে নেয়া হয়েছে প্রেক্ষাপট ও কন্ঠস্বর। এই কেড়ে নেয়ার পেছনে সময় পরিক্রমায় সাম্রাজ্যবাদী এলিট কখনো ভূমিকা রেখেছে। আবার জাতীয়তাবীদ এলিটও ভূমিকা পালন করেছে অর্থাৎ পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিতরা।
Imperialist Elite Ges Nationalist Elite সকলেই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে তাদের পরিকল্পিত সন্ত্রাসকে সংযত করে নাই।
১৯৪৭ সালে উপমহাদেশের স্বীধনতা, এই দু’শ্রেণির মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তর বললে অত্যুক্তি হবে না। তাতে সুবিধাবাদী ভাগ্য তৈরি হয়েছে।
ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে সুবিধাবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে- অচ্ছুৎ থেকে গেছে নিম্নবর্গ। পুরানো জ্ঞান সমাজ ভেঙে নতুন জ্ঞান সমাজ এবং নতুন জ্ঞান সমাজের কল্যাণে উদ্ভুত জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে নিম্নবর্গ নিরাকার হয়ে আছে।
এই Knowledge Economic world-এ নিম্নবর্গের প্রয়োজনীয়তা নাই। শুধুমাত্র কৃষক শ্রমিক কিংবা অপাংক্তেয়রা-ই নিম্নবর্গ নয়, বৃহৎ সম্প্রসারিত অর্থে জীবিকাহীন ও জীবিকা সন্ধানী ভাসমান মানুষেরাও নি¤œবর্গ জ্ঞান সমাজ তাদের গ্রহণ করে না, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি তাদের নিয়ে ভাবে না। ফলে, কৃষক শ্রমিক অন্ত:বাসীর মতো আরো এক ধরনের বর্হিস্কৃত জনগোষ্ঠী নিম্নবর্গের তারিকায় চলে আসছে।
শিল্প সমাজ রূপান্তরিত হয়ে শিল্পোত্তর সমাজে পরিণত হলেও নিম্নবর্গের রূপান্তর স্তানান্তর ঘটে না; বিশ্বায়ন কাম্য হলেও নিম্নবর্গ তা নয়।
বাজার অর্থনীতি দিয়েছে কর্মসংস্থান নীতিস্ফীতি ফলে কর্মহীনতা সৃষ্টি করেছে আরেকদল নিম্নবর্গ।
শ্রমের মূল্য না থাকলে এক শ্রেণির মানুষ অপাংক্তেয় হয়ে যায়। দেশজ জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশ উদ্বৃত্ত হলে তাদের ইতিবৃত্ত প্রান্তিকায়িত হয়ে ওঠে।
সামাজিক নিরাপত্তা প্রদানে আগ্রহী নয় পুঁজিবাদী একমুখী বিশ্ব।
পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শিল্পোত্তর সমাজে দ্রুত অতিদ্রুত ভেঙ্গে পড়েছে Micro এবং SME-র ধারণা। দেশজ অর্থনীতি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে নিজের ভূমিকা খনিজ সম্পদ, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদ প্রভৃতির নিজস্ব মালিকানা থেকে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গুরুত্ব না পাবার কারণে কর্মসংস্থান যেমন নাই তেমনি নি¤œবর্গ কায়িক শ্রম নিয়ে অসহায়। এই অবস্থায় গ্রামীণ জনশক্তি আরবানাইজেশনের মধ্যে মিশে আরও অস্তিত্বহীন, অনিরাপদ।
উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে বিভক্ত হয়েছে বিশ্ব। বিশ্বায়নের কৌশলে উন্নত কতিপয় দেশের বিপরীতে অজস্র গরীব উন্নয়নকামী দেশ উচ্চবর্গ বনাম নিম্নবর্গ সূত্রে বিন্যস্ত হয়েছে।

শক্তির শাসন ও আইনের শাসনে অবরুদ্ধ এবং যুগে যুগে পৃথিবীর প্রাচুর্যময় প্রেক্ষাপটে বিশ্বজনসংখ্যার সবচেয়ে সর্বাপেক্ষা দরিদ্রতম অংশ, উন্নতির ভ্রান্তি বিলাসে ক্রয়-ক্ষমতাহীন নিম্নবর্গ।
অবস্থানগত বাস্তবতা Positional objectivity-র মধ্যে কেন্দ্র ও প্রান্তিকের ব্যবধান প্রলম্বিত হচ্ছে।
সর্বার্থে কেন্দ্রের ভূমিকা হলো একাধিপত্যের প্রতিষ্ঠা। এই জন্য কেন্দ্র মর্মমূলে এমন এক সংস্কৃতি জারী রেখেছে যেখানে নিজ সুবিধার্থে নিয়োজিত রয়েছে –
পুলিশ
মিলিটারি
আইন
নৈতিকতা
ভাষা
যন্ত্র
জ্ঞান
সংবিধান ও মগজ।
আনুগত্য লুটে নেয় তেলখনি।
প্রকৃতি।
চলেছে দখল প্রক্রিয়া।
সাম্রাজ্যবাদের কাছে হার মানে উপনিবেশ।
ধনীর কাছে গরীব।
অভিজাতের কাছে অনভিজাত; উঁচুজাতের কাছে নিচুজাত; সরকারের কাছে বিরোধী পক্ষ।
যত হার, তত নিম্নবর্গ-ততভাবে নিম্নবর্গের উদ্ভব।
মাথার ওপর অবস্থান করে যে প্রভুশক্তি – এই শক্তি স্থানিক পর্যায়ে তৃণমূলে পর্যন্ত আধিপত্য বিস্তারের জন্য বিভিন্ন স্থানিক প্রভুর জন্ম দেয়।
নিম্নবর্গের চোখে মূল শক্তি নয় – স্থানীয় শক্তি দৃশ্যমান থাকে। স্থানিক Hegemonic তৈরি করে বশে রাখে নি¤œস্তনদের। বশে রাখার জন্য প্রয়োগ করা হয় কখনো বশীকরণ, কখনো নিপীড়ণ।
বন্দনা শিবা বলেছিলেন, খুবই প্রণিধানযোগ্য – আর্থিক প্রগতির ছদ্মবেশে যে উন্নয়নের পরিকাঠামো রচিত হয়, সেই উন্নয়ন বস্তুত এক নয়া উপনিবেশবাদের সংক্রমণ যা দ্বারা সমাজের যাদের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, তাদের কাছ থেকে সহজেই সম্পদ শোষণ করা যায়।
বনভূমি, বাসস্থান ও প্রাকৃতিক জীবনের ছন্দ হতে উচ্ছেদের মাধ্যমে উন্নয়নের ব্যাপকতায় উদ্বাস্তু হলো যে আদিবাসী জনতা, সেই সব মানুষ নিম্নবর্গের পরিধিকে বিস্তৃত করেছে।
পণ্য বাজারে প্রবেশের অধিকার কেবল ২০-২৫% এবং বাজারে প্রবেশের ও থাকবার সামর্থ্য তৈরি করে দেয়া হয়েছে ধনতন্ত্র রক্ষা করার স্বার্থে। এভং বাদ বাকিরা অপাংক্তেয়, নেই-মানুষ; আত্ম-সংরক্ষণের আইনি কবচ তাদের নাই।
ক্ষমতার রাজনীতি হতে শৃঙ্খলা, কোনো পর্যায়েই তারা আবশ্যকীয় নয় বলে Inclusive Growth  এর মধ্যে তাদের Include করার প্রেক্ষিতে থাকে না।
খেয়ে পরে বাঁচার মতো দান-ভিক্ষা (Subsistance wage) দেয়া হতে পারে যখন মানবাধিকারের আলোকে হৈ চৈ পড়ে যায়।
যে ব্রাক্ষ্মণ উচ্চবর্ণ-উচ্চে অবস্থান করেন; মন্দা সময়ে, যুদ্ধে দুর্ভিক্ষে, বাঁচার তাগিদে পরিস্থিতির দাপটে নিম্নবর্গ চরিত্র অর্জন করে। পুরাণ কথায়, নারী হয়েও দেবী মনসা হয়ে ওঠে উচ্চবর্গের প্রতিভূ বেহুলা কোনো দিন, কোনো কালে পরাজিত হয় না তবু সে প্রান্তিক যেমন নারী মাত্র প্রান্তজন।
পুরুষের সমান ক্ষমতা কোনো একক নারী ব্যক্তিগতভাবে অর্জন করলেও নারীর প্রান্তিকায়িত সামগ্রিক অবস্থানের হেরফের হয় না।
সাবঅলটার্ন স্টাডিজ বা উত্তর আধুনিকতায় প্রান্তিক নারী উঠে এলেও তারা উচ্চ বর্গের নির্মাণ। প্রান্তিক মানুষ সেখানে নিজের কথা বলতে না পারার কারণে কোন রকম মর্যাদাহীন তাদের অবস্থান, তেমনি প্রান্তিক নারী তো ততোধিক নিপীড়িত।
নি¤œবর্গ- (১) সামাজিক অধিকার নাই, (২) ক্ষমতা তন্ত্রের বিরোধী (৩) মর্যাদাহীন (৪) জাতিভেদের শিকার ও (৫) দারিদ্র্য।
নারী মাত্রই নিম্নবর্গ – প্রান্তিক নারী, প্রান্তিকতা ছাড়া অন্য নিয়তি অনুপস্থিত।
সভ্যতার ইতিহাসে মানুষের ইতিহাস হচ্ছে পুরুষের ইতিহাস – পুরুষতান্ত্রিক ইতিহসাসে নারীর কোনো অবস্থান নাই, নারীকে সার্বভৌম হিসেবে ভাবা হয় নাই, পুরুষের অধীনে হিসেবে দেখা হয়েছে।
রাষ্ট্র ক্ষমতায় প্রান্তিক নারীর অবস্থান।
পুরুষ শাসিত সমাজ  নারী  প্রান্তিক নারী
প্রান্তিক নারী প্রান্তিকেরও প্রান্তিক।
প্রান্তিকতার নক্্শা লক্ষ্য করলে – একই দেশে- একের ভেতরে অন্য একটি, অন্য একটির ভেতরে আরেকটি প্রান্তিক অঞ্চল বিদ্যমান।
প্রতি ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রান্তিক অঞ্চল ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্র।
ক্ষমতার অন্যতম উৎস রাষ্ট্র; রাষ্ট্র ক্ষমতা পুলিশ, আমলা, আইন আদালত নিয়ে গঠিত।
এছাড়া, অন্যান্য ক্ষমতার উৎস হচ্ছে –
কর্পোরেট হাউস
শিল্প পতি
জোতদার
মহাজন
রাজনৈতিক দল।
এনজিও ও অন্যান্য
সুশীল সমাজ।
উপরিউক্ত বর্ণনা মোতাবেক সারা দেশ, জগৎ জুড়ে আরও বিছানো আছে প্রান্তিক মানুষের বিপদ ও নিরাপত্তাহীনতার কেন্দ্রগুলো।
ক্ষমতা প্রসঙ্গে গ্রামশি ও মিশেল ফুকোর প্রেক্ষিত বিবেচনার দাবী রাখে।
ইত: মধ্যে অবগত যে, মুসলিনীর কারাগারের কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি এড়িয়ে গ্রামশি তার কারাগারের নোট বইয়ে প্রচলিত মার্কসীয় ভাষা বর্জন করতে বাধ্য হয়েছিলে।
মার্কসবাদকে বলেছেন, প্রাকিসসের দর্শন। ব্যবহার করেন নাই মার্কসের নাম; উল্লিখিত ছিল প্রাকিসসের দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে।
প্রতিশব্দ উদ্ভাবনের ফলে মার্কসীয় ধারণাগুলো অক্ষত রাখা যায় নাই – যুক্ত হয়ে গেছে নতুন ব্যঞ্জনা। বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যবহৃত রূপকধর্মী ভাষার বদলে প্রচলিত পরিভাষা প্রতিস্থাপন করলে বিপদ আছে গ্রামশির চিন্তার জটিলতা, অভিনবত্ব বহুলাংশে হারিয়ে যাবে। অতত্রব সাবঅলটার্ন শব্দ হিসেবে প্রলেতারিয়েতের প্রতিশব্দ নয়। এখানে এমন অনেক ধারণা আমরা ইত:মধ্যে অনুধাবন করেছি যার বিকল্প সাবঅলটার্ন শব্দ ছাড়া অন্য উপযুক্ত শব্দ নাই।
শ্রমিক শ্রেণি/বুর্জোযা শ্রেণি, এই বিশেষ অর্থে সাবঅলটার্ন হেগিমনিক শ্রেণির সামাজিক সম্পর্কের বিষয়ে গ্রামশির বিশ্লেষণে গুরুত্ব পেয়েছে সেই এক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে বুর্জোয়া শ্রেণি কেবল শাসনতন্ত্রে তার প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করে না, সৃষ্টি করে এক সামাজিক কর্তৃত্ব বা হেগেমনি।
কেবল রাষ্ট্রীয় শক্তিকে অবলম্বন করে নয়, সাংস্কৃতিক ও ভাবাদর্শের জগতে এক আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে হেগেমনিক বুর্জোয়া শ্রেণি শাসনের নৈতিক ভিত্তি হিসেবে সাবঅলটার্নদের সামাজিকভাবে সম্মত করে।
অতএব রাষ্ট্রের পাশাপাশি বৃহত্তর নাগরিক সমাজের সম্পর্ক, জাতি, জনগণ ও বুর্জোয়া শ্রেণি ও অন্যান্য শাসক গোষ্ঠীর পারস্পরিক সম্পর্ক, জাতীয় জীবনের একচ্ছত্র প্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা বুর্জোয়া শ্রেণির সার্বিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা প্রশ্নের জন্ম দিবে।
পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় নয়, শ্রেণি বিভক্ত সমাজের অন্যান্য কালপর্বেও সাবঅলটার্নরা রয়েছেন। গ্রামশি নানা ঐতিহাসিক কালপর্বে বহুক্ষেত্রে কর্তৃত্ব, প্রভুত্ব, শাসন – এই শব্দগুলিকে সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করে গেছেন। সুতরাং এই সব ক্ষমতার অধিকারের মধ্যে কী পার্থক্য তা বোধগম্য হয় না।
গ্রামশি কৃষকচেতনার সীমাবদ্ধতার কথা যেমন উল্লেখ করে ক্ষান্ত হন নাই তেমনি বলেছেন শ্রেণি বিভক্ত সমাজে প্রভুত্ব/অধীনতার বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক প্রসঙ্গে।
কৃষক চেতনা সম্পর্কে নেতিবাচকতা তার লেখার পাওয়া গেলেও কৃষক চেতনার বাস্তব প্রকাশের সময় ইতিবাচক ভূমিকা দৃম্যমান হয় যেহেতু লোকসমাজের উপাদান সমূহের সমূহে রয়েছে আশ্চর্য শক্তি-নীতিবোধ যেমন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ও আইনের তুলনায় অনেক সহজ, গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী।
শাসকবর্গের ধর্মবিশ্বাস ও তার অধীনের ধর্মবিশ্বাসে প্রাতিষ্ঠানিক সাযুয্য থাকলেও আকার ও চরিত্র পৃথক এমনকি বিরোধপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাতে জন্ম নেয় সাবঅলটার্ন শ্রেণির প্রতিরোধ ক্ষমতাশীল শ্রেণিকে বিপদে ফেলে দেয়।
গ্রামশি শ্রমিক শ্রেণির সঙ্গে অন্যান্য নিম্নবর্গীয় শ্রেণির সম্পর্কের বিষয়টি কল্পনায় বলশেভিক বিল্পব প্রাধান্য দেন নাই।
তিনি ধরে নিয়েছিলেন এক ধরনের বৈপ্লবিক শ্রেণি জোট হবে। কাউন্টার হেগিমনিক ধারণা গ্রামশির মৌলিক অবদান। বিকল্প কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কৌশল হিসেবে war of position  আলোচিত হয়েছে।
গ্রামশি দীর্ঘ স্থায়ী কৌশলের কথা বলেছেন যা শ্রমিক শ্রেণির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেয়েও ব্যাপক।
গ্রামশি উল্লেখ করেছেন আধুনিক সমাজে শ্রেণি ক্ষমতার সবচেয়ে কার্যকর ও শক্তিশালী প্রয়োগ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বা তার আইন, পুলিশ, মিলিটারি, সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং ক্ষমতা হচ্ছে সামাজিক এমন কি ব্যক্তিগত জীবনের দৈনন্দিন খুঁটিনাটির মধ্যে ছড়ানো যা পরিবার, শিক্ষালয়, পরিষেবা, মিডিয়া, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে, এমনকি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব রাখতে সক্ষম।
বুর্জোয়া শ্রেণি তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা জাহির করার বদলে দৈনন্দিন সমাজজীবনই এমন ভাবে পরিচালিত যা শাসনের অনুকূল। অতএব বিকল্প সামাজিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য সামাজিক অনুশাসন ব্যবস্থা দরকারী। রাষ্ট্রীক্ষমতা দখল অবলম্বন হতে পারে না।
মিশেল ফুকোর বিশ্লেষণ থেকে ক্ষমতার তিনটি পৃথক মাত্রা পাওয়া যায়।
সার্বভৌমত্ব, ডিসিপ্লিন বা অনুশাসন, আর প্রশাসনিকতা বা গর্ভনমেন্টালিটি।
সার্বভৌমত্ব সনাতন রাষ্ট্র ক্ষমতা যা প্রয়োগ করা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের কোন রাষ্ট্র প্রধানের বরাতে, এমন কী তা প্রয়োগ হয় জনম-লীর ওপরেও। এই ক্ষমতার আওতায় চলে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ; আইন লঙ্ঘনকারীর শাস্তিদান।
সার্বভৌমত্ব তাই দণ্ড প্রদানের উৎস।
আধুনিক সমাজে ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্রের কব্জায় থাকে না। ক্ষমতাতন্ত্র চলে অনুশাসন ডিসিপ্লিনের ছকে। আইন অমান্যকারীর বিরুদ্ধে শাস্তিবিধান অমানবিক হিসেবে মেনে নিয়ে শাস্তির উদ্দেশ্য হয়েছে পাল্টা হিংসা চরিতার্থ নয় বরং সংশোধন করা দোষীকে।
অনুশাসনের উদ্দেশ্য সার্বভৌম শক্তির ভয়-ভীতি প্রদর্শন নয়, বরং উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বশাসন।
আধুনিক সমাজের নাগরিক নিজের বিচার বুদ্ধি প্রয়োগ করেই বুঝে নেবে, তার শাস্তি হবে বলে নয়, নিজের মঙ্গলের জন্য কর্মক্ষেত্রে যোগ দিবে, সন্তানকে স্কুলে পাঠাবে,।
অসুস্থ হলে হাসপাতালে ভর্তি হবে।
ক্ষমতার উৎস অতএব হয়ে উঠবে অনুশাসনতন্ত্র।
আমরা ভাবি মঙ্গলের জন্য কাজ করছি কিন্তু প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে যারা পরিষেবা দিচ্ছে তারাও সার্বভৌম নয় নজরদারীর আওতায় থাকছে ঠিকভাবে কাজ করা চলছে কিনা তাও নজরদারীর সীমানায় থাকছে। ফলে সম্পূর্ণ সমাজে এমন কোনো কেন্দ্র নাই যেখানে নজরদারীর অবসান হয়েছে। আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্রের প্রধান উৎস তাই সার্বভৌমত্ব নয় < অনুশাসন।
ক্ষমতার তৃতীয় মাত্রা হলো গভর্মেন্টালিটি। ফুকো গভর্মেন্টকে পৃথক করেছেন এখানে। প্রশাসনিকতা বলা যেতে পারে যা দিয়ে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হবে জনগণের কল্যাণের জন্য – বিশেষ গোষ্ঠীর বিশেষ কল্যাণের জন্য সরকারি নীতি কার্যকর করতে হলে ক্ষমতা প্রয়োগ দরকার। যেমন জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য শক্তি প্রয়োগ না করে আর্থিক ব্যবস্থা নেয়া।
এখানে ক্ষমতা প্রয়োগের প্রধান উপাদান জনগোষ্ঠী সম্পর্কে প্রশাসনিক জ্ঞান। বস্তুত:statistics কথাটার আক্ষরিক অর্থ হলো রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞান।
আধুনিক সমাজে প্রশাসনিকতা যত বিস্তারিত হয়েছে ততই গড়ে তোলা হয়ে জনগণকে শ্রেণিবদ্ধ করে তাদের সম্পর্কে সরকারি তথ্য সংগ্রহ। যেমন, আধুনিক আদম শুমারি।
মানুষের জন্ম হতে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি দৈনন্দিন কর্ম সামাজিক কিংবা ব্যক্তিগত সরকারি কিংবা পারিবারিক, শারীরিক বা মানসিক সবই কোন না কোনভাবে নথিবদ্ধ হয়ে প্রশাসনিক জ্ঞানভা-ারে চলে যাচ্ছে।
এই জ্ঞানের ভিত্তিতে রচিত হচ্ছে সমাজনীতি জনগোষ্ঠীর কল্যাণের জন্য এবং তা কার্যকর করছে শুধু রাষ্ট্রেযন্ত্র নয়, অন্যান্য রাষ্ট্র বহির্ভূত প্রতিষ্ঠান, যারা প্রশাসনিকতার অংশ।
মিশেল ফুকোর সূত্র ধরে পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মধ্যে ক্ষমতা। প্রয়োগের প্রকরণগত পার্থক্য নাই।
ক্ষমতা প্রয়োগের প্রকরণগত ব্যর্থতার জন্য সোভিয়েত ও পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্র ব্যবস্থা পতিত হয়েছে যা কিনা সমাজতন্ত্রের পতন বলে গণ্য করা সঠিক হবে না।
আধুনিক ক্ষমতাকেন্দ্রর কোনো নির্দিষ্ট অধিকারী নাই; কোনো আধার নাই, কোনো কেন্দ্র নাই।
রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত কোনো শক্তিকে হটিয়ে দিলেও ক্ষমতাযন্ত্র নিজস্ব গতিতে চলতে চলতে থমকে যাবে না।
প্রতিরোধ আছে কিন্তু তা সম্পূর্ণভাবে ক্ষমতার কাঠামোকে টলিয়ে দিতে পারে না। সাময়িক বিব্রত করতে পারে।
এই সাময়িক প্রতিরোধ কাটাতে পারলে ক্ষমতাতন্ত্র হয়ে ওঠে আরো পরিব্যাপ্ত।
গ্রামশি জনহিতকর ক্ষমতার ধারণাকে উপেক্ষা না করে কীভাবে এই ধারণা নির্দিষ্ট সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারণার মধ্য দিয়ে সমাজচেতনার রূপ ধারণ করবে – এই বিশ্বাস তার ছিল।
এই সমাজ চৈতন্যকেই ফুকো বলেছেন আধুনিক ক্ষমতাতন্ত্রের চালিকা শক্তি।
আধুনিক সমাজে ক্ষমতা প্রয়োগ কার্যকর হয়ে ওঠে যদি তা জনহিতকর প্রকল্পের আওতায় উপস্থাপিত হয়। খুচরা প্রতিরোধ ক্ষমতাতন্ত্রকে টলাতে পারে না। তবে বুদ্ধিজনিত এই সব নৈরাশ্যের মধ্যে প্রত্যয়জনিত আশার সঞ্চার করে।
সুতরাং ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত।
আশা-নিরাশার দোলাচলে জঁ ফ্রাঁশোয়া লিও তার ক্ষমতার কথা বলেছেন।
নিম্নবর্গের প্রতিবাদ ও বিদ্রোহকে ভাষা দিয়ে দাবিয়ে রাখা চলে।
উচ্চবর্গ আইন তৈরি করলে নিম্নবর্গ তা নির্বাচনের মাধ্যমে অনুমোদন করে।
নিম্নবর্গের সংস্কৃতি যে শিক্ষা দেয় তা হলো উচ্চবর্গের প্রতি আনুগত্য ; তাদের বিচারে শ্রেষ্ঠত্ব। এছাড়া তাদের সংস্কৃতি থেকে যা যা তথ্য পাওয়া যায় তা হলো-পৌরাণিক কাহিনী, উপকথা, আচার-অনুষ্ঠান, রীতিনীতি, বিশ্বাসের জগৎ।
মৌখিক লোককথায় পাওয়া যায় অতীন্দ্রিয় ভাব-প্রবণতা ও অজ্ঞাত প্রতীকের প্রতি ভয়, সমীহ। যুক্তি মানেনা, অলৌকিকতার প্রতি বিশ্বাস রাখে, প্রকৃতি তাদের কাছে দ্ব্যর্থবোধক জাগতিক ও আধ্যাত্মিক। নিম্নবর্গের ইতিহাস পাঠে এই বিষয়গুলি গুরুত্ব পেয়েছে।
সাবঅলটার্ন শুধুমাত্র শোষিত অর্থে গৃহীত হতে পারে না।
এমনকি সমাজে তপশিলি জাতি বা উপ-জাতির মানুষ সাবঅলটার্ন নন।
সাবলটার্ন হলো সেইসব মানুষ যারা অন্যের দ্বারা কোনো না কোনোভাবে পীড়িত, প্রেষিত, প্রতারিত হয়ে চলেছে। শ্রেণি বৈষম্য, অর্থ ও বর্ণ বৈষম্য দেখা যায়। এরা যে বঞ্চিত হয় এবং প্রগতির কোনো অর্থ বোঝে না, বিজ্ঞান বুদ্ধির ধার ধারে না, এমনকি দেশের সম্পর্কে কোনো খবর রাখে না।
অর্থ-প্রতিপত্তি যার করায়ত্ব বিশ্বায়নের বিশ্ব ব্যাপ্ত ধারণায় সেই মানুষ উচ্চবর্গ শিক্ষা, দীক্ষা, রুচি এক্ষেত্রে আবার কোনো Matter করে না।
এখন সৃষ্টিকর্তা ছাড়া সবাই সাবঅলটার্ন। উচ্চবর্গ ও নিম্নবর্গের ধারণা, তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি, নন্দনতত্ত্বের নান্দনিক বিশ্বক্রম বিবর্তিত হচ্ছে। সাধারণ ভাবে ইতিহাস চর্চার উপাদানগুলির মধ্যে নিম্নবর্গ প্রতিফলিত হয়েছে ভীরু, উদ্যোগহীন, অনুগত জীব হিসেবে। কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধের কালে তার মধ্যে যে সক্রিয়তা দেখা যায় তা নিবিধ প্রতিপন্ন হতে বাধ্য।
সাবঅলটার্ন স্টাডিজ-এ নিম্নবর্গীয় ধারণা গঠিত হয়েছে দু’টি বিষয়ের ওপর ভিত্তি কওে – উপনিবেশিক ভারতে উচ্চ ও নিম্নবর্গের রাজনৈতিক ক্ষেত্রের স্বাতন্ত্র্য ও কৃষক চৈতন্যের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য।
নিম্নবর্গের যাপননামায় প্রাধান্য পেয়ে এসেছে –
আহার-নিদ্রা-মৈথুন।
যৌনতার প্রয়োগে কখনো-বা প্রচ্ছন্ন থেকেছে ক্ষমতায়নের গোপন কেরামতি; নিজেকে আড়াল রেখেই নিজের বিস্তার।
যৌনতা, ক্ষমতাকে ছিন্ন করে না বরং তার বাতাবরণকে আরো শক্ত করে।
যৌনতাকে নানা অবদমন থেকে মুক্ত করার কথা ওঠে যখন, তখন দৃষ্টি নিবন্ধ হয় না বরং, ক্ষমতার বিরোধীতা নয়, আসলে তার সাথে সহযোগিতা করে যৌনতা -`To say that sex is not repressed, or rather that the relationship between sex pawer is not characterised by repression, is to risk falling into a sterile paradox.’ (The history of sexnality (vol-1), Michael Foucault, First Edition, Penguin Books, India, 1981, P-126) … সুতরাং বোধগম্য যে, ইতিহাসের জ্ঞান সব সময় স্থির নয়, পরিবর্তমান। ভবিষ্যত প্রতিনিয়ত বর্তমানের মাটিতে দাঁড়িয়ে বেরিয়ে আসে অতীতের খোলস ছেড়ে।
উৎপাদন সম্পর্ক, জৈবতার সম্পর্ক, প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানের সম্পর্ক অনুসারে উচ্চ-নিম্ন, বিত্ত-বর্ণের পর্যায় সারণী অনুসারে তৈরি হতে থাকে ভিন্ন এক মানদ-। এই আর্থ-সমাজ সাংস্কৃতিক কিংবা জৈবতা-যৌনতার মানদ-ে তৈরি হয়েছে বহমান সময়ের বহু আলোচিত এক ডিসকোর্স; বর্তমান পরিভাষায় সাবঅলটার্ন যার নাম।
যেখানে সাবঅলটার্ন গ্রামশির দূরবীন দিয়ে দেখা এই সাবঅলটার্নদের পুনর্গঠন ও পুনর্নিমান নাই বলে নতুন লেন্স লাগিয়ে অনুবীক্ষণিক চোখে সম্প্রসারিত অর্থে আবিষ্কার জরুরি এবং তা নতুন লেন্স লাগিয়ে গ্রামশির দূরবীন দিয়ে নতুন করে দেখা পুনরুচ্চারণ করি।
তথ্য সূত্র
১. গৌতম ভদ্র ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়, নিম্নবর্গের ইতিহাস, কলকাতা-১, আনন্দ পাবলিশাস, ২০১০।
২. গ্রামশি চর্চা, নির্মল বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, প্রথম সংস্করণ, কৃষ্টি, কলকাতা, ডিসেম্বর ২০১০।
৩. দলিত সাহিত্যের রূপরেখা, মনোহরমৌলি বিশ্বাস, বাণীপ্রকাশ, কলকাতা, ফেব্রুয়ারি ২০০৭।
৪. নিম্নবর্গের বিশ্বায়ন, জহরসেন মজুমদার, পুস্তক বিপনি, কলকাতা, জুলাই ২০০৭।
৫. ইতিহাস চর্চা: বিষয় সাম্প্রদায়িকতা, অঞ্জন গোম্বামী, চিরায়থ প্রকাশন, কলকাতা, এপ্রিল ২০০৩।
৬. ইতিহাস চর্চা নির্মাণ অবিনির্মাণ বিকৃতি, রাজকুমার চক্রবর্তী, এবং মুশায়েরা, কলকাতা, নভেম্বর ২০১০।
৭. ইতিহাসের উত্তরাধিকার, পার্থ চট্টোপাধ্যায়ে, আনন্দ, কলকাতা, এপ্রিল ২০০০।
৮. ‘বাংলাসাহিত্যে নিম্নবর্গ’ বিপ্লব মাজী, সন্ধান, বিল্পব মাজী সম্পাদিত, কলকাতা, ২০১৩।
৯. ইকোফেমিনিজম নারীবাদ ও তৃতীয় দুনিয়াব প্রান্তিক নারী…, বিপ্লব মাজী, অঞ্জলী পাবলিশার্স, কলকাতা,
১০. বাংলা উপন্যাস ২০০ বছর, বিপ্লবমাজী, অঞ্চলী পাবলিশার্স, কলকাতা, মে, ২০০৮।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here