পাশ্চাত্যে রবীন্দ্রনাথ – ড. নীলিম মহসীন রেজা

0
213

পাশ্চাত্যে রবীন্দ্রনাথ

ড. নীলিম মহসীন রেজা

ফ্যালন (Pierre Falon)-এর রচনা থেকে জানা যায় যে, রবীন্দ্রনাথ স্ব-মহিমায় আবির্ভূত হবার পরেও দীর্ঘদিন পাশ্চাত্যের কাছে অপরিচিতই রয়ে গিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ যখন পঞ্চাশ পেরিয়ে ষাটের দিকে রওয়ানা দিয়েছেন, ততোদিনে ভারতবর্ষের তামাম কবি ও লেখক-কুল, তাঁকে কবিগুরু তথা ভারতবর্ষের সাহিত্য সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি হিসেবে, রবীন্দ্রনাথকে স্বীকৃতি দিতে বাকি রাখেননি। ঠিক এরকম পর্যায়ে, অর্থাৎ ১৯১৩-র পর পূর্ণ বোধের কবি রবীন্দ্রনাথের বিস্ময়কর প্রতিভার ঝলকানিতে সচকিত হয়ে ওঠে পাশ্চাত্য। পাশ্চাত্যের বহু দেশই তাঁর কবি প্রতিভার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, অগাধ স্বতঃস্ফূর্ততা আর বন্ধনহীন আগ্রহ প্রকাশ করেছিলো। আর সেই বল্গাহারা ভালোবাসা তিরিশ, চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশক পেরিয়ে ষাট-এর দশক পর্যন্ত ছিলেন স্বতঃস্ফূর্ত ও অটুট। ষাটের দশকের শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ পুরো পাশ্চাত্য জুড়ে এক মহাজ্ঞানী সন্ত (Saint) বা আধ্যাত্মিক কবি হিসেবে বিবেচিত হন। তারপর ক্রমশ: রবিরেখা স্তিমিত হতে থাকে পাশ্চাত্যের মননের অন্তরালে। ৭০-এর দশকে পাশ্চাত্যের পাঠকেরা তাঁর শ্রেষ্ঠতম লেখাগুলো – সম্ভবত: বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ-গীতিকাব্যগুলো ভুলে যেতে থাকলেও, পাশ্চাত্যের কিছু সাহিত্য স্রষ্টা ও সাহিত্য বোদ্ধাগণ তখন পর্যন্ত মনে করতেন যে, বিশ্ব সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম প্রতিনিধিদের মধ্যে অনন্য এক নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯০৯ খ্রীস্টাব্দে রবিদত্ত কর্তৃক অনুদিত রবীন্দ্রনাথের ‘Echoes from East and West’ কাব্য গ্রন্থটি প্রথমবারের মত প্রকাশিত হয় ইংল্যান্ডে। কিন্তু এ কাব্যগ্রন্থটি ইংল্যান্ডবাসীর অগোচরেই থেকে যায়। এরপর পান্না লাল অনুবাদ করেন তাঁর ছোট গল্প- Hungry Stone’ (ক্ষুধিত পাষাণ) যা ইংল্যান্ডের Modern Review-তে ছাপা হয়। এই গল্পটি মারাত্মকভাবে আকর্ষণ করে ইংরেজ লেখক রোথেস্টাইন (Rothestein) কে। বছর দু’এক পর ১৯১২ তে জাহাজে চেপে মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ইংল্যান্ডে আসার পথে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘গীতাঞ্জলী’ কাব্যগ্রন্থ থেকে কিছু কিছু কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। লন্ডনে পৌঁছালে পর দেখা হয় Rothestien-এর সাথে। রবীন্দ্রনাথকে দেখে ও তাঁর সাথে কথা বলে আন্দোলিত হন Rothestien, আর রবীন্দ্রনাথ যেন প্রথম দর্শনেই জয় করে ফেললেন এই ইংরেজ লেখককে। Rothestien কাল বিলম্ব না করে দ্রুতই অন্যান্য কবি বন্ধুদের সাথে রবীন্দ্রনাথের পরিচয়, অত:পর নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ ও আড্ডার বন্দোবস্ত করে ফেলেন।
Rothestien-এর বাসাতেই থেকে যান রবীন্দ্রনাথ। প্রতিদিন নিয়ম করে জমতো সাহিত্য আড্ডা। আর আড্ডায় নিয়মিত যোগ দিতে লাগলেন W.B. Yeats, George Barnard Shaw, H.G. Wales, A.C. Bardley, Galseworthy, Robert Bridge, Elice Meinel, Evelyn Underhill ও আরও অনেক খ্যাতিমান ইংরেজ, আইরিশ ও অ্যামেরিকান সাহিত্যিক। সে সময়কার আড্ডার বর্ণনা দিতে গিয়ে বিশ্বখ্যাত সাহিত্য সমালোচক A.C. Bardley লিখেছেন- “দল বেঁধে পড়তে যেতাম রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলী’র পাণ্ডুলিপি। আর শুধু মনে হতো, এতোদিনে একজন সত্যিকারের শ্রেষ্ঠ কবির সাক্ষাৎ পেয়েছি আমরা।”
মহান কবি রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্কারকালে W.B. Yeats ছিলেন সবচেয়ে বেশী উত্তেজিত। Yeats পরে লিখেছিলেন- ‘আমাদের যে কারোর থেকে শ্রেষ্ঠতর কবি ছিলেন রবীন্দ্রাথ। Ezra Paund-এর নেতৃত্বে একদল কবি আড্ডায় যোগ দিতেন নিয়মিতই। Pound সহ এই কবিদল রোজই পরম শ্রদ্ধাভরে কবিগুরুর পা’য়ের কাছে ঘনিষ্টভাবে বসে থাকতেন। ১৯১২’র ডিসেম্বর মাস। অ্যামেরিকান সাহিত্য পত্রিকা Poetry’র বিদেশ প্রতিনিধি Ezra Pound ছয়টি কবিতা বেছে নিলেন ‘গীতাঞ্জলী’ থেকে। ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ ছয়টি কবিতাই প্রকাশিত হল Poetry-তে। অ্যামেরিকায়। এর পরপরই The Indian Society of London কর্তৃক প্রকাশিত হল সম্পূর্ণ ‘গীতাঞ্জলী’। এই প্রথম প্রকাশিত ‘গীতাঞ্জলী’র মুখবন্ধ লিখেছিলেন W.B. Yeats, আর সেই সাথে দ্রুতই ইংল্যান্ডের পাঠকদের হাতে হাতে পৌঁছে যান রবীন্দ্রনাথ তার ‘গীতাঞ্জলী’র বদৌলতে। এরপর রবীন্দ্রনাথ অ্যামেরিকা ভ্রমণ করেন। বিভিন্ন সভা ও সেমিনারে বক্তৃতা করেন তাঁর ধর্মতত্ত্ব ও আধ্যাত্মিকতা বিষয়ে। Harverd University-তে দেয়া বক্তৃতাটি পরে ‘সাধনা’ (Sadhna) শিরোনামে প্রকাশিত হয়। বছর না ঘুরতেই ইংল্যান্ডের সেই সময়কার সবচেয়ে প্রভাবশালী পত্রপত্রিকাগুলো (Periodicats) রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও তাঁর আধ্যাত্মবাদ নিয়ে বেশকিছু সুদীর্ঘ নিবন্ধ প্রকাশ করে। ‘The Time’s Literary Supplement’ ‘গীতাঞ্জলী’র Review প্রকাশ করে ১৯১২ খ্রীস্টাব্দের নভেম্বরে। নভেম্বর মাসেই ‘The Nation’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা Underhill এর নিবন্ধ An Indian Mystic’ প্রকাশিত হয় ইংল্যান্ডে। ১৯১৩ খ্রীস্টাব্দের মার্চ মাসে ‘Fortnightly Review’-তে ‘গীতাঞ্জলী’ নিয়ে বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ করেন Ezra Pound আর ‘The Nineteenth Century’ পত্রিকায় Earnest Rhys ‘গীতাঞ্জলী’ সম্পর্কে লিখিত নিবন্ধে উল্লেখ করেন- ‘…the songs of Gitanjali even in the English Prose rhythm are irresistibly impressive’ (এপ্রিল, ১৯১৩)। ১৯১৩-র অক্টোবরে আয়ারল্যান্ড-এ The Dubline Reviewতে একটি অনবদ্য নিবন্ধ প্রকাশ করেন Father Martindale যার বিষয়বস্তু ছিলো- ‘রবীন্দ্রনাথের মরমী কবিতা’ বা the Mystic Poetry of Tagore । অহফৎব এরফব (Andre Gide) তখন ফ্রান্সে। এ সময় প্রথমবারের মতো ফ্রেঞ্চ ভাষায় ‘গীতাঞ্জলী’র অনুবাদ করেন আঁদ্রে জিঁদ। সে সময়ই সুইডেনের বিভিন্ন স্থানে প্রকাশিত হতে থাকে বাংলা ও ইংরেজী উভয় ভাষায় প্রকাশিত ‘গীতাঞ্জলী’ নিয়ে বেশকিছু গবেষণা প্রবন্ধ। খুব সম্ভবতঃ ১৯১৩ খ্রীস্টাব্দের অক্টোবরে রবীন্দ্রনাথ ইউরোপ ও অ্যামেরিকা ভ্রমণ শেষে ফিরে এলেন ভারতবর্ষে তথা বাংলায়, আর সে বছরই নভেম্বর মাসে সাহিত্যে অনবদ্য অবদানের জন্য সুইডিস একাডেমি তাঁকে নোবেল পুরস্কার প্রদান করে। সে বছর রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি নোবেল পুরষ্কারের জন্য আরও মনোনীত হন বিশ্বখ্যাত ঔপন্যাসিক Thomas Hardy, Anatole France সহ বিশ্ব সাহিত্যের বেশ কিছু দিকপাল কবি ও লেখক। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন এঁদের মধ্যে সবচেয়ে স্বল্প পরিচিত একজন লেখক। আর তাই এই প্রায় অপরিচিত কবির নোবেল বিজয়ে অনেকেরই কপালে ফুটে উঠেছিলো বিস্ময়ের বলিরেখা। কিন্তু ইতিমধ্যে রবীন্দ্রনাথ বিশ্ব-ব্যাক্তিত্বে পরিণত হলেন। প্রাচ্যে তো বটেই, অতিদ্রুত পুরো পাশ্চাত্য জুড়ে পাঠকের মুখে মুখে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য প্রতিভা-র আলোচনা শোনা যেতে লাগলো সে সময়। ইউরোপের প্রতিটি ভাষাতেই তাঁর ‘গীতাঞ্জলী’সহ অন্যান্য সাহিত্য কর্মগুলো প্রকাশিত হতে থাকে একের পর এক।

রবীন্দ্রনাথের জীবনী ও তাঁর সাহিত্য-কর্মের ওপর বিভিন্ন গবেষণা ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে থাকে জার্মান, সুইডিস, ইংরেজি, ইটালিয়ান ও ফ্রেঞ্চ সহ অন্যান্য ভাষায়। ক্রমেই পাশ্চাত্যের পাঠকের কাছে প্রিয়-পরিচিত জন হিসেবে আবির্ভূত হন রবীন্দ্রনাথ। তবে ছোট গল্প, নাটক, প্রেমের কবিতা বা দেশাত্মবোধক গীতিকাব্যের তুলনায় তাঁর নয়া আধ্যাত্মবাদ অনেক বেশী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো ইউরোপের মনোজগতে। রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতা প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের মনোজগৎকে সমানভাবেই আন্দোলিত করেছিলো সে সময়। আসলে রবীন্দ্রনাথের মরমীবাদ পাশ্চাত্যীয় মরমীবাদি সাহিত্যের নিবিড় নৈকট্য লাভ করেছিলো বলেই পুরো ইউরোপ জুড়ে হৃৎকম্পণ সৃষ্টি করেছিলো তার মরমীবাদি কবিতা ও অন্যান্য সাহিত্য কর্মগুলো। আসলে দীর্ঘদিন নিরস ও সংকীর্ণ বিভ্রান্তিতে নির্মিত Positivism এবং Scientism-এর তত্ত্বে জর্জরিত ইউরোপীয় মনন ক্রমেই হয়ে পড়েছিলো অস্থিরতা ও অসন্তোষ ভারাক্রান্ত। বিশেষ করে ইউরোপীয় অভিজাত সম্প্রদায়গুলোর ধর্মের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা আর Anglo-Saxon দেশগুলোতে আধ্যাত্মিকতা বিরোধী Protestantism-এর বেড়ে চলা আধিপত্যই ইউরোপের এই অসন্তুষ্ট চিত্তের কারণ, রবীন্দ্রনাথের কবিতা পাশ্চাত্যের অগণিত মানুষের মনোজগতে সেই সব শব্দ, ভাব ও ভাষার সঞ্চার করেছিলো, যে সকল শব্দ ও ভাষার প্রয়োজনীয়তা ও অনুপস্থিতি দীর্ঘদিন থেকেই উপলব্ধি করছিলো ইউরোপের গণমানুষ- যে ভাষায় হৃদয় নিংড়ে দিয়ে নিমগ্ন হওয়া যায় ঈশ্বরের আরাধনায়- যার অভাবে পাশ্চাত্য বহুকাল প্রকাশ করতে পারেনি তার মনের আকুতি, আর সে ভাব ও ভাষা-ই তারা খুঁজে পেল রবীন্দ্রনাথের ছোট ছোট কবিতায়। ১৯১৪ থেকে শুরু হয়ে ১৯১৮ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত চললো ১ম বিশ্বযুদ্ধ। এরই মধ্যে ১৯১৬-তে জাপানে গিয়ে হাজির হলেন রবীন্দ্রনাথ। জাপানে দেয়া বক্তৃতামালায় রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত দৃঢ়তা ও সাহসীকতার সাথে তীব্র প্রতিবাদ ব্যক্ত করেন বিশ্বযুদ্ধ ও উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনার বিরুদ্ধে – যা কিনা সুইজারল্যান্ডে অবস্থানরত রোমাঁরঁলা (Romain Rolland) কর্তৃক প্রতিধ্বনিত হতে থাকে ইউরোপ জুড়ে। এর পরই রবীন্দ্রনাথ পাড়ি জমান মার্কিন মুল্লুকে। যুক্তরাস্ট্রেও অনুষ্ঠিত হয় ধারাবাহিক লেকচার সিরিজ যার মূল প্রতিপাদ্য ছিলো- ‘The Cult of Nationalism এবং রবীন্দ্রনাথের পাশ্চাত্য দর্শনও প্রচারিত হয় এসময় অ্যামেরিকা জুড়ে। তাঁর পাশ্চাত্যদর্শন কড়া সমালোচনার শিকার হলেও অনেকের কাছ থেকেই তা উচ্ছসিত প্রশংসাও লাভ করে একই সাথে। এরপর ১৯১৯ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ ভারতবর্ষেই কাটান। ১৯২০ খ্রীস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ আবারও সাগর পাড়ি দিলেন অমিত প্রশংসা ভূমি ইউরোপের উদ্দেশ্যে। প্রিয়তম জার্মানীই ছিলো প্রথম গন্তব্য। জার্মানী থেকে একে একে পাড়ি জমান ফ্রান্স, হল্যান্ড, বেলজিয়াম হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। শীতকালটা কাটালেন অ্যামেরিকাতেই। শীত পেরোলে পর আবার ফিরে এলেন ফ্রান্সের প্যারিসে। এবারে ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত হলো লেকচার সিরিজ ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে, ভিন্ন ভিন্ন উপলক্ষে চললো এই বক্তৃতামালা অনুষ্ঠান। ১৯২১ খ্রীস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ ষাট-এ পদার্পণ করেন। তাঁর ষাটতম জন্ম বার্ষিকী পুরো দেশ জুড়ে ঘটা করে উদযাপন করে জার্মানী। উৎসবে মুখরিত হয় পুরো জার্মানী – তাঁর অগণিত ভক্ত ও প্রিয়তম বন্ধু-বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের দেশ জার্মানী। সেখান থেকে ভ্রমণ ও বক্তৃতার উদ্দেশ্যে সফর করেন সুইডেন ও সুইজারল্যান্ড। অত:পর ফিরে আসেন আবারও জার্মানীতে, বক্তৃতা করেন, Berlin এবং Munich শহরে। তারপর একটানা সাত দিন জার্মানীর Darmstadt শহরে Keyserling’s School of Wisdom-এ এবং এই লেকচার সিরিজের পরই তাঁকে ‘Spiritual Leader of Germany’ খেতাবে ভূষিত করে তাঁর প্রিয় জার্মানী, তাঁর ঘাঁটি (Camp) হিসেবে আদৃত জার্মানী। যাহোক, ‘School of Wisdom’-এর লেকচার সিরিজ শেষ করে রবীন্দ্রনাথ যাত্রা করেন অস্ট্রিয়া এবং যুগোস্লাভিয়া। প্রথমে Vienna এবং পরে Prague শহরে বক্তৃতা করেন তার আধ্যাত্মিকতাবাদ নিয়ে। ইচ্ছে থাকলেও সেবারে আর জার্মানীতে ফেরা হলোনা। টানা ১৪ মাস ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বক্তৃতানুষ্ঠান শেষে বাংলায় ফেরেন কবি। ১৯২১ এ জার্মানীর সাহিত্য পত্রিকাগুলো ভরে যায় রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক নিবন্ধ ও প্রবন্ধে। সব পত্রিকা জুড়েই রবীন্দ্রনাথের ১৪ মাস ব্যাপী ইউরোপ সফরের কাহিনী ফলাও করে প্রচারিত হয় বেশ কিছুদিন ধরে। এবছরই Engelhardt রচিত ৪৫০ পৃষ্ঠার জীবনী গ্রন্থ Biograply of Tagore’ এবং Kurt Wolf Verlag সম্পাদিত ‘Tagore’s Collected Works’ জার্মানীতে প্রকাশিত হলে দুটি গ্রন্থই বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করে। এ দু’টি গ্রন্থের বদৌলতে মিলিয়ন মিলিয়ন জার্মান পাঠকের কাছে সমাদৃত হন রবীন্দ্রনাথ।
১৯২৪ খ্রীস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ পাড়ি জমালেন দক্ষিণ অ্যামেরিকা। উদ্দেশ্য পেরুর শতবর্ষপূর্তি উৎসবে রাষ্ট্রপতির বিশেষ অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে যোগদান করা। কিন্তু আর্জেন্টিনা পর্যন্ত যেতে না যেতেই ভয়াবহ ফ্লু-তে আক্রান্ত হলেন কবি। সঙ্গী হিসেবে তাঁর সঙ্গে ছিলেন ব্যাক্তিগত সহকারী, যুক্তরাস্ট্রের Colonel University’র গ্রাজুয়েট, ইংল্যান্ডের নটিংহ্যামশায়ার-এর যুবক Leonardo Elmharst, যাহোক, সে যাত্রায় elmharst তাঁকে আল্পস পর্বত পাড়ি দিয়ে পেরু যাওয়া থেকে অনেক কষ্টে নিবৃত করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেলেন। কিন্তু কবি নাছোরবান্দা। তিনি পেরুতে যাবেনই। এদিকে ডাক্তার বললেন কমপক্ষে এক সপ্তাহ বিশ্রাম এবং ঘর তথা বিছানা থেকেও ওঠা বারণ। এমন পরিস্থিতে আর্জেন্টিনার বুয়েনস আয়ার্স শহরের তরুণ লেখিকা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো এসে হাজির কবি’র বাংলোয়। বলে রাখা ভালো ওকাম্পো নামক এই রবীন্দ্র ভক্ত তরুণী এবং আর্জেন্টিনার উদীয়মান সাহিত্যিক তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছেন- ’১৯২৪ সালটি ছিলো আর্জেন্টিনার জন্য গোলাপের বছর। এত অজস্র গোলাপ ফুল এর আগে কখনও ফোটেনি। আর ১৯২৪ সালটি আমার জন্য ছিলো রবীন্দ্রাপেক্ষার বছর। একটাই নিয়মিত রুটিন – রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলী পড়া, সতত: অশ্রুবর্ষণ আর অপেক্ষা – যদি সে আসে।” দুর্ভাগ্য অথবা সৌভাগ্যবশত: শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ এলেন এবং অসুস্থও হয়ে পড়লেন, ঈশ্বর যেন ওকাম্পো’র মনের ডাকে বাস্তবে সাড়া দিলেন। আর ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক এক সপ্তাহতো বটেই, ওকাম্পোর পীড়াপীড়িতে রবীন্দ্রনাথ একমাসেরও বেশী সময় কাটালেন আর্জেন্টিনায়। ওকাম্পোর সাহচর্যে লিখলেন অনেক কবিতা যা পরে ‘পূরবী’ নামে প্রকাশিত হয়েছিলো, আর উৎসর্গ করেছিলেন ওকাম্পোকেই। ১৯২৬-এর মে মাস। এবার রবীন্দ্রনাথের ৮ম বারের মতো আন্তঃমহাদেশীয় ভ্রমণ চলছে। ইতিমধ্যে অনেক আন্তর্জাতিক রাজনীতিবিদ রবীন্দ্রনাথের সাথে ঘনিষ্ঠ হবার সুযোগ ও তাঁর নাম ব্যাবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা চালাতে শুরু করেছেন। ল্যাটিন আমেরিকার স্প্যানিশ ভাষাভাষি দেশগুলোতে রবীন্দ্রনাথ ব্যাপক সুখ্যাতি লাভ করেছেন। ল্যাটিন অ্যামেরিকা থেকে ভারতে ফেরার পথে বিশ্রামের জন্য ইটালির উত্তর প্রান্তে মাসখানেক অবস্থান করেন রবীন্দ্রনাথ। বিশ্ব রাজনীতির বাজারে তখন অন্যতম বাটপাড় ও ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার মুসোলিনি তখন ইটালির রাষ্ট্রনায়ক। মুসোলিনি রবীন্দ্রনাথকে রাজার সম্মানে সংবর্ধনা দিতে এবং নিজেকে একজন কাব্য প্রেমিক রবীন্দ্র ভক্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াসে বারবার রবীন্দ্রনাথকে নিমন্ত্রণ জানান। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ মুসোলিনির পাতা ফাঁদে পা দেয়ার মানুষ নন। তিনি সুকৌশলে মুসোলিনির ফাঁদ এড়িয়ে সুইজারল্যান্ডে আসেন। কিন্তু ইতিমধ্যেই রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য বিকৃত করে নিজের রাজনৈতিক গৌরব বৃদ্ধির চেষ্টা করেন মুসোলিনি। ইটালি থেকে সুইজারল্যান্ডে এসে বন্ধু রমাঁ রলাঁ’র কাছে ওঠেন রবীন্দ্রনাথ। সুইজারল্যান্ড থেকেই ইংল্যান্ডের ‘Manchester Guardian’ পত্রিকায় একটি চিঠির মাধ্যমে ইটালীয় প্রেস রিপোর্টের প্রতিবাদ জানান রবীন্দ্রনাথ।
এরপর নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক ভ্রমণ শেষে আবারও প্রিয় জার্মানিতে চলে আসেন। Berlin শহরে এসে বিজ্ঞানী বন্ধু আইনস্টাইনের সাথে দীর্ঘ আলাপচারিতায় অংশ নেন কবি। এরপর Dresden এবং Cologne শহরে বক্তৃতা করেন। জার্মানী থেকে যুগোস্লাভিয়ার Prague শহর হয়ে মধ্য ইউরোপের প্রতিটি দেশই ভ্রমণ করেন রবীন্দ্রনাথ। হাঙ্গেীর Budupest এবং বেলজিয়ামের Belgrade শহরে বক্তৃতা করেন। বুলগেরিয়া, রুমানিয়া ও গ্রীস রাজাগণ রবীন্দ্রনাথকে রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা প্রদান করেন। ইউরোপ থেকে রবীন্দ্রনাথ পাড়ি জমান আফ্রিকার পথে। মিশর পরিদর্শনের মধ্যমে শেষ করেন এবারকার ভ্রমণ পর্ব। Falon লিখেছেন – এ পর্বের ভ্রমণ শেষ হয় ১৯২৬ এর ডিসেম্বরে। আর রঁমা রঁলা লিখেছেন – “Concluded in December this great tour of conquest not as a tyrant, but as a teacher”.
১৯২৯ খ্রীস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ কানাডা ভ্রমণ করেন। ১৯৩০-এ আবার শুরু হয় ইউরোপ ভ্রমণ। এই ভ্রমণ রবীন্দ্রনাথকে নতুন রূপে উপস্থাপন করে ইউরোপে।
রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলার প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় Paris, London, Berlin এবং Moscow শহরে। অর্থাৎ আবার ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মানী ও রাশিয়া ভ্রমণ করতে হয়। এবারের সফরে অন্যতম বক্তৃতানুষ্ঠান রবীন্দ্রনাথের Hibbert Lectures on the Religion of Man যা পুরো Oxford মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় শ্রবণ করে। ইংল্যান্ড, জার্মানী, ফ্রান্স হয়ে সুইজারল্যান্ড ও ডেনমার্ক হয়ে রাশিয়াতে আসেন। রাশিয়া থেকে আবারও জার্মানী। অত:পর জার্মানী থেকেই ইউরোপকে বিদায় জানিয়ে অ্যামেরিকা মহাদেশের উদ্দেশ্যে চেপে বসেন ব্যাক্তিগত জাহাজে। সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আবারও মার্কিন মুল্লুক। যুক্তরাষ্ট্রের Boston এবং New York শহরে অনুষ্ঠিত হয় রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা প্রদর্শনী।
Pierre Falon লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের মোট সাত বৎসর পাশ্চাত্যে indian Ambassador to West বা পাশ্চাত্যে ভারতবর্ষের দূত হিসেবে অতিবাহিত করেন। তাঁর গীতাঞ্জলী ইংরেজি, জার্মান, স্প্যানিশ, ইটালিয়ান, হাঙ্গেরিয়ান, ড্যানিশ, সুইডিশ, ডাচ, চেক, লাটভিয়ান, ফ্রেঞ্চ, সুইজ, রাশিয়ান ভাষাসহ আরও বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয়। এসব ভাষায় প্রকাশিত তাঁর অন্যান্য সাহিত্য কর্মগুলো হল – The Gardener, The Cresent Moon, The King of Dark Chember, The Post Office, Fruite Gathering, Stray Birds, Lover’s Gift, Mashi and Others Ges The Home and the World (ঘরে-বাইরে)। পাশ্চাত্যের প্রায় প্রতিটি ভাষায় তাঁর অনুদিত সাহিত্য কর্ম – Fireflies, My Reminiscence, The Cycle of Spring, The Parrot’s Training, Broken Ties ইত্যাদি।
অন্যদিকে পাশ্চাত্যের লেখকগণ যাঁরা রবীন্দ্রনাথের ওপর গ্রন্থ রচনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য – ইংরেজ লেখক Edwar Thompson (Rabindranth Tagore, Poet and Dramatist, London, 1948), চেক গবেষক , 1920), R. Assagolio (Florence, 1921), L. Valliat (Paris, 1922), B.K. Roy (Stockholm, 1916), Dr. A Aronson (Rabindranath throyh Western Eyes), M.J. Dave (La Poesie de Robindranath Tagore, Montpellier, 1927), J. Masson (Belgium, 1940), C.F. Andrews, E. Piecynska (Tagore Educator, Paris, 1921) ইত্যাদি। এছাড়া তাঁর ধর্মতত্ত্ব নিয়ে গবেষণাধর্মী গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন Von Farquhar Glassenapp Heiler, Otto, Winternitz এবং আরও অনেকেই।
ইউরোপ ও অ্যামেরিকা মহাদেশ তথা পাশ্চাত্যে রবীন্দ্রনাথের অবস্থান সম্পর্কে Pierre Falon লিখেছেন- “রবীন্দ্রনাথ নিজেও জানতেন যে, তাঁর জীবদ্দশায় পৃথিবীর কোন কবি নিজ দেশের বাইরে ততোটা সম্মান, মর্যাদা ও সাফল্য অর্জন করতে পারেননি, যতোটা পেরেছিলেন তিনি।”

===///===

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here