নাচোল বিদ্রোহ এবং ইলামিত্র। আলফাজ আইয়ূব

0
633

নাচোল বিদ্রোহ এবং ইলামিত্র

আলফাজ আইয়ূব

১.
ক্রমাগত বিরূপাচরণ থেকে জন্ম নেয় ক্ষোভ। নিপীড়িতরা হয় প্রতিবাদী। গড়ে ওঠে প্রতিরোধ। এই পরিণতি অনিবার্য। কারণ অস্পষ্ট নয়। বিরূপাচরণ সন্দেহাতীত ভাবে নেতিবাচক ও নিবর্তনমূলক এক প্রক্রিয়া, বঞ্চিত ও শোষণ করারই অবগুণ্ঠিত কৌশল। কিন্তু বূর্গটিতার আশ্রয়ে ন্যায়্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার নিপীড়ণমূলক এই অপ-কৌশল সাময়িক ভাবে ফলপ্রসূ হলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা কার্যকর থাকে না। অব্যাহত বঞ্চনা আর নিপীড়নে বিক্ষুদ্ধ মানুষের ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়। প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ পথে ঘটে এর বিস্ফোরণ। অকালে বিনষ্ট হয় অমূল্য অনেক জীবন। রক্তাক্ত এই প্রতিক্রিয়া নিপীড়িত মানুষের অদম্য সংগ্রামী চেতনারই সরব প্রকাশ। এদেশের ইতিহাসে নাচোলের বিদ্রোহ তেমনি এক সংগ্রামেরই মাইলফলক। ১৯৪৯-৫০ সালের সময় ব্যপ্তিতে সংঘটিত এই বিদ্রোহের পশ্চাৎপটে উকণীপক হিসেবে ক্রিয়াশীল ছিল সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক বিন্যাস, ভূমি মালিকানা, সাঁওতাল সম্প্রদায় এবং অতি আবশ্যক ভাবেই ইলামিত্র।
২.
নাচোল থানাটি বর্তমানে বাংলাদেশের নবাবগঞ্জ জেলার (চাঁপাই নবাবগঞ্জ হিসেবে সমধিক অবহিত) অন্তর্গত। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের শাসনামলে এই থানা ছিল মালদহ জেলার এবং বৃহত্তর পরিসরে বঙ্গ প্রদেশের Bengal presidency) অধীনে। সাম্রাজ্যবাদী কর্তৃত্ব স্থাপনের পর বৃটিশ উপনিবেসিক শাসকরা সমগ্র ভারতীয় উপ-মহাদেশকে বিভক্ত করে পনেরটি প্রদেশে। বঙ্গ প্রদেশ ছিল এদের অন্যতম। এটি গঠন করা হয়েছিল বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা ও আসামের কিছু অংশ নিয়ে। প্রশাসনিক সুবিধার্থে লর্ড কার্জন ১৯০৩ সনে এই বঙ্গ প্রদেশকে দু’টি প্রদেশে বিভক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। বঙ্গ প্রদেশকে বিভক্ত করে পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলা নামে দু’টি পৃথক প্রদেশ গঠন করা হয় ১৯০৫ সনের ১৬ই অক্টোবর।
নতুন প্রদেশ ‘পূর্ব বাংলা’ গঠিত হয় প্রাক্তন বঙ্গ প্রদেশের পূর্বাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল এবং আসাম এর সমন্বয়ে। বাদ পড়ে দার্জিলিং। কিন্তু জলপাইগুড়ি, পার্বত্য ত্রিপুরা এবং নতুন জেলা মালদহকে এর অন্তর্ভূক্ত করা হয়। তৎপূর্বে মালদহ ছিল বিহারের অংশ। রাজধানী হয় ঢাকা। অন্যদিকে ‘পশ্চিম বাংলা’ গঠিত হয় প্রাক্তন বঙ্গ প্রদেশের বাকী অংশ, বিহার এবং উড়িষ্যা নিয়ে। এর রাজধানী রয়ে যায় কোলকাতা। কিন্তু নতুন এই ব্যবস্থা সমাজ কাঠামোর উপরি অংশের স্বার্থ বিরোধী হিসেবে গণ্য হয়। দানা বাঁধতে থাকে বিরোধীতা। ধর্মীয় ও জাতিগত বিরোধ প্রকট হয়ে ওঠে। ফলে পশ্চিমবঙ্গে বিহারী ওড়িয়া সংঘ্যাধিক্য দেখা দেয়। পূর্ববঙ্গে বিস্তৃত হতে থাকে মুসলিম প্রাধান্য। এছাড়া নবগঠিত প্রদেশের উপনিবেশিক প্রশাসনে হিন্দুদের তুলনায় মুসিলীম বুদ্ধিজীবীদের প্রাধান্য দেয়া হবে মর্মে প্রলুদ্ধ করা হয়েছিল পূর্ববঙ্গের মুসলিম জমিদার আর ব্যবসারত শক্তিশালী মুসলিম বুর্জোয়াদের। ক্ষমতার লিপ্সা ফলে স্বাভাবতঃই তীব্রভাবে তাড়িত করে তাদের লক্ষ্য অর্জনের পথে। অপর দিকে শিল্প ও ব্যবসায় সম্পৃক্ত জাতীয় বুুর্জোয়ারা, যাদের অধিকাংশই ছিল হিন্দু এবং উচ্চবর্ণের অন্তর্ভূক্ত, সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে বঙ্গভঙ্গের প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এবং তাদের স্বার্থ সংরক্ষক প্রতিষ্ঠান সমূহের (যেমন ‘চেম্বার অব কমার্স’) প্রভাব হ্রাসের আশংকায়। জমিদারগণও-সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত লোপ ও ভূমি, রাজস্ব বৃদ্ধির ভয়ে। কোলকাতা কেন্দ্রিক প্রশাসনিক ও আইন আদালতের সংখ্যা হ্রাস হওয়ার এবং ফলশ্র“তিতে শিক্ষিত বেকার বৃদ্ধি পাওয়ার ব্যাপারে বুদ্ধিজীবীরা নিশ্চিত ছিল। ফলে শুরু হয় বিরোধীতা। কংগ্রেস ও অন্যান্যের প্রবল বিরোধীতার মুখে বঙ্গ-ভঙ্গ রদ হয় ১৯১১ সালে। তবে মালদহ রয়ে যায় বঙ্গ প্রদেশের মধ্যেই। এই জেলার অধীনে নাচোলকে প্রশাসনিক থানা হিসেবে গঠন করা হয় ১৯৮১ সালে। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে থানাটি ১৯৮৪ সালে উপজেলায় উন্নীত হয়। চারটি ইউনিয়নের অধীনে ১৯০টি গ্রামের সমন্বয়ে গঠিত নাচোল উপজেলার বর্তমান আয়তন ২৮৩.৬৮ বর্গ কিলোমিটার। এর উত্তর পশ্চিমে গোমস্তাপুর উপজেলা, দক্ষিণ পশ্চিমে শিবগঞ্জ ও নবাবগঞ্জ (চাঁপাই নবাবগঞ্জ) সদর উপজেলা, দক্ষিণ পূর্বে তানোর উপজেলা এবং উত্তর-পূর্বে নেয়াসতপুর উপজেলা অবস্থিত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৪৫ সালে। কিন্তু রয়ে যায় ক্ষত। প্রতিক্রিয়া হয় তীব্র। ধ্বসে পড়তে থাকে আফ্রিকাও এশিয়া উপানিবেশিক শক্তি সমূহের ক্ষমতার ভিত। ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতি নিপিড়িত হয় জটিল আবর্তে। হয়ে উঠে দ্বিধা বিভক্ত ও নাটকীয়। ভারত থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। তবে বিদায় লগ্নে সমগ্র উপমহাদেশকে তারা বিভক্ত করে রেখে যায় ভারত ও পাকিস্তান নামক পৃথক দু’টি রাষ্ট্রে। দীর্ঘ মেয়াদী সংগ্রাম সত্ত্বেও তীব্র রাজনৈতিক মতানৈক্য, টানাপোড়ন বঙ্গ বিভাগ সম্পর্কে মাউন্ট ব্যাটনের গোপন বিধান এবং সাম্প্রদায়িক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই পরিণতি ছিল অনিবার্য এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতা। ভারতে বৃটিশ বিরোধীতা তুঙ্গে ওঠে বিংশ শতাব্দির সূচনা লগ্নেই। অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় ভারতীয় হিন্দু পুঁজিপতি ও ভারতীয় মুসলিম পুঁজিপতি। শ্রেণী স্বার্থ প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল হয়ে উঠে তাদের অভীষ্ট লক্ষ্য। প্ল্যাট ফর্ম হিসেবে ব্যবহৃত হয় যথাক্রমে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ। শুরু হয় ভারতীয় এই দুই পুঁজি শক্তি এবং বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি-এই ত্রয়ীর মধ্যে দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতায় নির্ধারিত হয়ে যায় বাংলার ভবিষ্যত। উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও নয়া সামন্তবাদী প্রভুদের স্বার্থের অনুকূলে ভারত বিভক্ত হয়, সেই সাথে বিভক্ত হয় বাংলাভাষী ভূখন্ড। জন্ম নেয় ভারতীয় ইউনিয়ন ও পাকিস্তান। ১৯৪৭ সালের এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় নাচোলের অবস্থানত্ত। বৃটিশ শাসনামলের বৃহত্তর মালদহ জেলার পাঁচটি থানাÑনবাবগঞ্জ, শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর, নাচোল ও ভোলাহাট পাকিস্তানের পূর্ব প্রদেশের (পূর্ব বাংলা থেকে ১৯৫৫ সনে যার নাম করণ করা হয পূর্ব পাকিস্তান) রাজশাহী জেলার নবাবগঞ্জ মহকুমার অন্তর্ভূক্ত হয়। ঘটনাটি গুরুত্ববহ। কেননা পাকিস্তানে নাচোলের অন্তর্ভূক্তির মধ্যেই প্রথিত ছিল বীজ, অঙ্কুরিত হয়ে যা পরিণতি লাভ করে পূর্ণাঙ্গ বিদ্রোহে। ইতিহাসে এটি নাচোল বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন এবং নাচোলের কৃষক আন্দোলন ইত্যাদি নামে পরিচিতি লাভ করেছে।
৩.
নাচোল বিদ্রোহের একই সময়বৃত্তে এদেশে সংঘটিত হয় নানকর, টঙ্ক ও তেভাগা আন্দোলন। প্রেক্ষাপট অভিন্ন। রাজনৈতিক ভাঙ্গা-গড়া কিংবা শাসক শক্তির উত্থান পতন খুব বেশী প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি এ অঞ্চলের কৃষকদের জীবনে। অথচ কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতির প্রাণ কেন্দ্রেই তাদের অবস্থান, প্রাণ বায়ু তারাই। সেই প্রেক্ষিতে তারাই মূল চরিত্র এবং প্রধান কর্মী। কিন্তু বাস্তবে তারা রয়ে যায় পূর্ববৎ তিমিরে অবস্থানেই। তারা জমি চাষ করে কিন্তু জমি থেকে করতে পারে না বেঁচে থাকার সংস্থান। অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিবর্তন এক্ষেত্রে ঘটায় শুধুমাত্র প্রক্রিয়ার বদল, গুণগত নয়। ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং ভূমির উপর কর্তৃত্ব ও অধিকারের ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন আনয়নে ব্যর্থতাই এর মৌল কারণ।
মোঘল শাসনামলে ‘জমিদারী’ কথাটার খুববেশী প্রচলন ছিল না। ‘আইনী আকবরী’ নামক আবুল ফজলের আকর গ্রন্থে তাকে উল্লেখ করা হয়েছে ‘আমল গুজার’ বা ‘রাজস্ব আদায়কারী হিসেবে। অর্থাৎ মোঘল ব্যবস্থায় জমিদার ছিলনা খাজনা আদায়ের ব্যাপারে বাদশাহের প্রতিনিধি মাত্র। বণিক ইংরেজ বাণিজ্য করতে এসে ভারতের শাসন ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পর জমিদারকে প্রদান করে রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষমতা এবং একই সঙ্গে মলিকানাও। তখন থেকেই ‘জমিদার’শব্দটির প্রচলন ঘটে। পরিণত হয় ক্ষমতা ও দাপটের সমার্থক। জমিদারকে মালিক হিসেবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে উপনিবেশিক শাসকদের দু’টি উকেণশ্য নেয়ামক হিসেবে কাজ করে। প্রথমতঃ রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়তঃ শিল্প বিপ্লবের ফলে অষ্টাদশ শতাব্দির শেষার্ধে ইংল্যান্ডের অর্থনীতিতে যে অভাবিত উন্নতি ঘটে তাকে ধরে রাখা। এই সময়কালে ইংল্যান্ডে গড়ে ওঠে বিশাল বিশাল শিল্প প্রতিষ্ঠান। উৎপাদিত হতে থাকে আভ্যন্তরিন চাহিদার অতিরিক্ত শিল্পজাত পণ্য। ইংল্যান্ড পরিণত হয় শিল্প জাত পণ্যের রপ্তানী কারক দেশে। শুরু হয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে তাদের অগ্রযাত্রা। নব লদ্ধ এই সমৃদ্ধিকে টেকসই করাই ইংল্যন্ডের উঠতি ব্যবসায়ী ও শিল্পপতির আরাধ্য হয়ে উঠে। অভিষ্ট এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাদের দুটি জিনিসের প্রয়োজন ছিল। এক নম্বরে ছিল বিদেশে শিল্পজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং দ্বিতীয় বিদেশ থেকে কাঁচামাল প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধান। অধিকৃত দেশসমূহের শিল্প বিকাশকে তাই প্রথমে তারা বাধাগ্রস্থ করে। একই সঙ্গে উপনিবেশ সমূহে কাঁচামাল উৎপাদন নিশ্চিত করা হয়। বৃটিশ বেনিয়ারা এভাবেই অন্যান্য অধিকৃত দেশ সমূহের মতই ঔপনিবেশিক কায়দায় গড়ে তোলে ভারতীয় উপমহাদেশের অর্থনীতি। ফলে ভারত পরিণত হয় ইংল্যান্ডের শিল্পজাত পণ্যের আমদানী কারক এবং কৃষিজাত পণ্যের (পাট, তুলা ইত্যাদি) রপ্তানী কারক দেশে। এক্ষেত্রে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয় বৈষম্যমূলক শুল্কনীতি। অনিবার্যভাবে শিল্পবিকাশের ধারায় নেমে আসে স্থবিরতা। প্রভাবিত হয় কৃষি খাত। উৎপাদন পদ্ধতি রয়ে যায় অপরিবর্তিত। একর প্রতি উৎপাদন এবং খামারের আয়তন – উভয়বিধ দিক থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশের কৃষকগণ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। অনিবার্য পরিণাম হিসেবে নেমে আসে দারিদ্র্। কৃষকদের বৃহত্তর অংশের জীবন আটকে যায় সেই অশুভ বৃত্তে।
গ্রামীণ সামাজিকরীতি ভিত্তিক কৃষক শোষণ অবাধ ও অপ্রতিহত হয়ে উঠে। বাংলার তৎকালীন গভর্ণর জেনারেল লর্ড কর্ণওয়ালিশ কর্তৃক ১৭৯৩ খৃষ্টাব্দে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ প্রবর্তনের ফলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। জমিদারগণ তাদের আওতাধীন জমির উপর লাভ করে চিরকালীন ও বংশানুক্রমিক মালিকানার অধিকার। এছাড়াও সংগৃহীত ভূমি-রাজস্বের নয়-দশমাংশ বৃটিশ সরকারের তহবিলে জমাদানের যে বাধ্যবাধকতা ১৭৯০ খৃষ্টাব্দে জমিদারের উপর আরোপ করা হয় সেই পরিমাণ চিরকালের জন্য স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করে দেয়া হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের এই পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে রূপান্তরিত হয়ে যায় বাংলার ভূমিজীবী এবং কৃষি নির্ভর আর্থ-উৎপাদন ব্যবস্থা। প্রতিক্রিয়া হয় ভয়াবহ। জমির উপর কৃষকের অধিকার বিলুপ্ত হয়। জমি পরিণত হয় জমিদারের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে। যে এলাকায় যে খাজনা আদায় করে সেটাই হয়ে ওঠে তার জমিদারি। আবির্ভাব ঘটে এক নতুন জমিদার শ্রেণীর। এর সকলেই নগদ অর্থে সমৃদ্ধ এবং অধিকাংশই হিন্দু। অভাবেই উদ্ভব ও বিকাশ লাভ করে বাঙালী হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণী। শাসক শ্রেণীর সহায়তা ও আনুকূল্য এক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু নব জাগ্রত শ্রেণী সত্তায় স্বাধীনতার লিপ্সা ক্রমান্বয়ে দানা বাঁধতে শুরু করতেই উপনিবেশিক শক্তির বোধদয় ঘটে। স্বাধীনতার সকল দাবী ও আন্দোলনকে ব্যাহত করার অভিপ্রায়ে তারা মরণোম্মুখ
সামন্ততন্ত্রের ধবংসস্তুপের উপর গড়ে মুসলমান মধ্যবিত্তশ্রেণীর ভিত। এই শ্রেণীর মধ্যে প্রবলতর হয় সাম্প্রদায়িক বৈষম্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝোঁক।
কিন্তু বাংলার কৃষকের জীবনে এতোসব পরিবর্তনের প্রভাব পড়ে খুব সামান্যই। খাজনা বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষকের উপর সামন্ততান্ত্রিক শোষণের বরং মাত্রাবৃদ্ধি ঘটে। আবত্তয়াব, ‘হফতম ও পানডাম দাও’ নীতি, (১৭৯৯ সালে ‘হফতম’ আইনের সপ্তম রেগুলেশনের মাধ্যমে ‘রাইয়ত’ ও কৃষকদের উচ্ছেদের ক্ষমতা দেওয়া হয় জমিদারকে। আবার ১৮১২ সনের পঞ্চম রেগুলেশনের ‘পানজম আইন’ খাজনা নির্ধারণ এবং জমি থেকে প্রজা উচ্ছেদের সম্পূর্ণ অধিকার জমিদারকে ন্যস্ত করা হয়।) জমিদারগণ কর্তৃক ভাগ চাষীদের জমি ভাড়া দেয়ার রীতি ইত্যাদি কারণে কৃষকের অবস্থা একদিকে ভূমিদাসের স্তরে অবনমিত হয়। অপর দিকে নানামুখী কর ও রাজস্বের চাপে তাদের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশী হতে থাকে। স্বভাবতঃই ঋণের জন্য তারা মহাজনের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়। এই ঋণের সুদাসল পরিশোধ করতে গিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা শেষ সম্বল ভিটেমাটি পর্যন্ত হারাতে বাধ্য হয়। পরিণত হয় ভূমিহীন মজুরে।
৪.
ঔপনিবেশিক বৃটিশ শাসনের অবসান এবং উপমহাদেশে ভারত ও পাকিস্তান নামক পৃথক দুটি রাষ্ট্রের অভ্যুদয় বাংলাদেশের কৃষকের জীবনে কোন লক্ষণ যোগ্য উৎকর্ষ সাধন করতে পারেনি। তাদের ব্যক্তিক ও সামষ্টিক জীবনে জমির মালিকদের শোষণ ও নিয়ন্ত্রণ রয়ে যায় তেমনি কঠোর ও বলগাহীন। এরূপ পটভূমিতে ১৯৪৬-১৯৪৭ (বৃটিশ শাসনামল ও তৎপরবর্তী ভারত-পাকিস্তান সৃষ্টিলগ্নে) গড়ে ওঠে তেভাগা আন্দোলন। বাংলার কৃষকের জীবনে এর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। ভূমি মালিক ও ভাগচাষীদের মধ্যে উৎপাদিত শস্য সমান দুইভাগে বিভক্ত করার পদ্ধতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এই আন্দোলন পরিচালিত হয়। এর পুরোভাগে ছিলেন বর্গাচাষীরা। তবে সংগঠকের ভূমিকায় ছিলেন বাংলার প্রভিন্সিয়াল কৃষক সভার কর্মীরা। সংস্থাটি ছিল কম্যুনিষ্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার (C. P.I) এর সম্মুখ সংগঠন (Front organization)।
অর্থগত বিচারে ‘তেভাগা’ বলতে তিন অংশ বুঝায়। এক্ষেত্রে তা ফসলের তিন অংশ। শস্য ভাগাভাগির বিভিন্ন পদ্ধতি প্রচলন রয়েছে যেমন- বর্গা, আধি, ভাগি ইত্যাদি। এগুলি নির্ভর করে ভূমি নিয়ন্ত্রণের শর্তাদির উপর। ভাগ চাষের অধিকার হিসেবে ভাগ চাষী পায় উৎপাদনের একটা নির্দিষ্ট অংশ। প্রচলিত নিয়মানুযায়ী সেটি উৎপাদনের সমান অংশ বা দুইভাগের একভাগ। উৎপাদিত শস্য সমান দুই ভাগে-ভাগ করার এই পদ্ধতির বিরুদ্ধেই পরিচালিত হয় ‘তেভাগা আন্দোলন’। এর লক্ষ্য ছিল উৎপাদিত ফসলের অর্ধেকের পরিবর্তে ভূমি মালিকের এক তৃতীয়াংশ প্রদানের নিয়ম চালু করা। কারণ অবকাঠামো, শ্রম, পুঁজি বিনিয়োগ ইত্যাদি উৎপাদন প্রক্রিয়ার কোন অংশেই ভূমি মালিকদের ভূমিকা জোরালো এবং প্রত্যক্ষ নয়। শুধুমাত্র মালিকানা সূত্রে জমিতে উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক প্রপ্তির পদ্ধতি ভূমি মালিকদের স্বার্থ হাসিলের উকেণশ্যে আরোপিত, যা অন্যান্য এবং নিঃসন্দেহে জবরদন্তিমূলক। এছাড়াও উৎপাদিত ফসল উত্তোলনের পর ভূমি মালিকদের খলানে তা সংরক্ষণ এবং সেখান হতে খড় সমান ভাবে ভাগাভাগি করার প্রথার অবসানও ছিল এই আন্দোলনের অন্য লক্ষ্য। উৎপাদিত ফসল বর্গাচাষীদের বাড়িতে সংরক্ষণ এবং ভূমি-মালিককে খড়ের ভাগ প্রদান না করার দাবীকে বাস্তবায়িত করতে আন্দোলনকারীরা সংকল্পবদ্ধ ছিলেন।
ভাগ চাষী কৃষকদের দাবীগুলো ছিল যৌক্তিক এবং অব্যাহত অর্থনৈতিক শোষণ হতে উপ্ত। তথাপি বল ও বিত্তহানির আশংকায় সন্ত্র্রস্ত ভূমি মালিকরা আন্দোলনকারীদের দাবী অগ্রাহ্য করে। সমন্ততান্ত্রিক শোষণ অব্যাহত রাখর লক্ষ্যে তারা বল প্রয়োগের মাধ্যমে আন্দোলনের ধারাকে স্তব্ধ করার পথ বেছে নেয়। লেলিয়ে দেয় পুলিশ। আন্দোলনকারীদের অনেককেই গ্রেপ্তার ও অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। কিন্তু বহমান স্রোতের মতো চলমান আন্দোলনের গতি এতে স্তব্ধ করা যায়নি। কারণও ছিল। আন্দোলনটি ছিল মুখ্যতঃ শোষক ও শোষিতের দ্বন্দ্ব। শোষকের সক্রিয় বিরোধীতা শোষিতের মুক্তি আন্দোলনে প্রায়শঃই গতি সঞ্চার করে। ব্যতিক্রম ঘটেনি এ ক্ষেত্রেও। ১৯৪৬ সালের আমন ধান চাষ মৌসুুমে বাংলার উত্তর এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলের জেলা সমূহে যে আন্দোলন দানা বাঁধে, নিপীড়নের মাধ্যমে তা দমনের পদক্ষেপ এতে সঞ্চার করে দুর্বার গতিবেগ। যশোর, খুলনা, ময়মনসিংহ, রংপুর এবং দিনাজপুর জেলায় আন্দোলনটির তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। বিস্তৃতি ঘটতে থাকে অতিদ্রুত। অচিরেই ১৯টি জেলায় ছড়িয়ে পড়ে এই আন্দোলন। হয়ে উঠে অপ্রতিরোধ্য। তেভাগা এলাকা বা ভূ-স্বামী মুক্ত ভূমি হিসেবে ঘোষিত হয় কোন কোন অঞ্চল। দিনাজপুর, যশোর এবং জলপাইগুড়ি এভাবে পরিণত হয় তেভাগা এলাকায়। পরবর্তীতে যোগ হয় মেদিনীপুর ও চব্বিশ পরগণা জেলা। খাজনার হার হ্রাস এবং জমিদারী প্রথা বিলোপের শ্লোগানও ওঠে। কৃষক অসন্তোষ ও বিরাজমান ক্ষোভ প্রশমনের লক্ষ্যে গৃহীত হয় বর্গাচাষ প্রথা সংস্কারের উদ্যোগ।
এই উকেণশ্যে একটি বিল উত্থাপিত হয় ১৯৪৭ সালের বিধান সভায়। কিন্তু বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিলটিকে আইনে পরিণত করার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। দেশ বিভাগ এবং নতুন সরকারের ক্ষমতায়নের ফলে তেভাগা আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। কিন্তু এই প্রতিক্রিয়া ছিল সাময়িক। ১৯৪৯-৫০ সালে পুনর্গঠিত হয় তেভাগা আন্দোলন। সঞ্চারিত হয় নতুন গতিবেগ। নাচোল হয়ে ওঠে প্রাণকেন্দ্র।
৫.
নাচোল বিদ্রোহের সূচনাও করেন কম্যুনিষ্ট পার্টির কর্মীরা। সংগঠকও তারাই। লক্ষ্য ছিল বৃহত্তর সমাজ বিপ্লব। বৈপ্লবিক সংঘটনার কৌশলগত জনগোষ্ঠি হিসেবে তারা বেছে নেন উপজাতীয় সাঁওতালদের। যৌক্তিকতাও ছিল। সাঁওতালদের সমাজ ব্যবস্থা কৃষি ভিত্তিক। তাদের জীবিকাও। এছাড়াও ছিল বিদ্রোহ ও সংগ্রামের ঐতিহ্য এবং ধনুবিদ্যায় ঈর্ষণীয় দক্ষতা। তবে স্বভাবগত ভাবেই সাঁওতালরা শান্তি প্রিয় এবং পরিশ্রমী। স্বতন্ত্রজাতিসত্তার মতই পৃথক তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি। কেন ও কিভাবে তারা পূর্ব বাংলায় বসতি স্থাপন করে তা ব্যাখ্যা করা কঠিন। তবে ১৮৮১ সনের আদমশুমারী অনুযায়ী দেখা যায় পাবনা, যশোর, খুলনা এমনকি চট্টগ্রামেও তাদের বসত রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল বিশেষতঃ রাজশাহী, নাওগাঁ, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও এবং পঞ্চগড় জেলায় সাঁওতাল জনসংখ্যার বৃহৎ উপস্থিতি।
ভারতবর্ষে বৃটিশ শাসন জেঁকে বসার আগে তাদের বাস ছিল কটক, ডালভূম, মানভূম, বড়ভূম, ছোট নাগপুর, পালামৌ, হাজারীবাগ, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া এবং বীরভূম ইত্যাদি পার্বত্য জেলা সমূহে বাঁদাড় পরিষ্কার করে চাষ-বাস করা ছিল তাদের আয়ের উৎস। ঘাটতি পূরণ হতো শিকারের মাধ্যমে। বৃটিশ শাসনের আবর্তে পড়ে বিস্রস্ত হয়ে যায় তাদের ছন্দ্বোবদ্ধ জীবন। ঔপনিবেশিক শাসকদের পেটোয়া বাহিনী ও দালালেরা সাঁওতালদের জমির উপর দাবী করে বসে তাদের অধিকার। শান্তিপূর্ণভাবে পশ্চাদাপসরণ করে সাঁওতালরা। অশ্রয় নেয় রাজমহলের পার্বত্য এলাকায়। শান্তিতে পেরিয়ে যায় কিছুটা সময়। অতঃপর পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে একই ঘটনার। সাঁওতালদের নতুন ভূমিরও মালিকানা দাবী করে ঔপনিবেশিক শাসক এবং তাদের এদেশীয় সহযোগী উচ্চ বর্ণের ভূমি মালিক ও জমিদারেরা। সঙ্গে যোগ দেয় ঋণদাতা-মহাজন। সাঁওতালদের অশিক্ষা আর সরলতার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে তারা। ব্যবসায়ী ও পণ্য বিক্রেতা হিসেবে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জন করে তারা। শুরু করে ধারে পণ্য বিক্রয়। অন্যদিকে প্রদত্ত ঋণের আসলের উপর আরোপ করতে থাকে চক্রবৃদ্ধিহারে চড়াসুদ। স্ফিত হতে থাকে ঋণের অংক। চলে যায় পরিশোধ ক্ষমতার বাইরে। বংশ পরম্পরায় সাঁওতালদের বহন করতে হয় সেই ঋণের ভার। শ্রমের বিনিময়ে ঋণ পরিশোধে বাধ্য হয়। অবনমিত হয় ভূমিদাসের পর্যায়ে। উপরন্তু চুক্তি ভিত্তিক কাজ করতে গিয়ে সাঁওতাল রমনীরা নানামুখী হেনস্থার শিকার হতে থাকে। মুখোমুখি হয় যৌন নির্যাতনের। নির্বিচারে লুণ্ঠিত হতে থাকে তাদের সম্ভ্রম। তারা পরিণত হয় জমিদার ও মহাজনের উপ-পত্নী, কখনওবা শুধুই প্রমোদ রমনীতে (comfort women)।
বহুমুখী এইসব নির্যাতনে ফুঁসে ওঠে সাঁওতাল সম্প্রদায়। প্রতারণা, নির্যাতন এবং সর্বোপরি স্বাধীনতা ও সম্ভ্রমহানীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। ১৮৫৫ সালের ৩০শে জুন দশ হাজার সাঁওতাল বিদ্রোহ ঘোষণা করে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। শুরু হয় এক অসম লড়াই। সাঁওতালদের অস্ত্র তাদের চিরচেনা তীর ও ধনুক। অপরদিকে সর্বাধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত প্রতিপক্ষ। পাহাড়ের পাদদেশে ঘাঁটি গাড়ে বৃটিশ সেনাবাহিনী। সাঁওতালরা অবস্থান নিয়েছিল সেখানেই। সংঘর্ষের শুরুতে বৃটিশ সৈন্যরা ছোঁড়ে বুলেটবিহীন গোলা। এই সময় চাতুরী ধরতে ব্যর্থ হয় সাঁওতাল বিদ্রোহীরা। বৃটিশ সমর হস্তির প্রতারণা-ফাঁদে পা দেয় তারা। শুরু হয় বৃটিশ প্রতারক শক্তির স-বুলেট গোলাবর্ষণ। আক্ষরিক অর্থেই কচুকাটা হয়ে যায় বিদ্রোহীরা। অতঃপর আক্রমণ চালানো হয় সাঁওতালদের গ্রামে গ্রামে। লুণ্ঠিত হয় তাদের গৃহ ও সম্পদ। ধর্ষিত হয় সাঁওতাল নারীরা। বিপ্লবী উকণীপনা সমূলে উৎপাটনের লক্ষ্যে সাঁওতাল তরুণদের লঠিপেটা ও নিবীর্য (Castered) করা হয়। সফল হয় বৃটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি। তাদের বর্বর নির্মমতায় অবসান ঘটে সাঁওতাল বিদ্রোহের। নিষ্ফল শত-সহস্র মানুষের সর্বোচ্চ আত্মদান (supreme sacrifice)কাঙ্খিত মুক্তি রয়ে যায় অধরা। তথাপি সাঁওতালদের আত্ম পরিচিতির ভিত্তি নির্মান এবং তাদের গর্ব ও অহঙ্কারের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয় এই বিদ্রোহকে। বৃটিশ শাসনামলের ‘সাঁওতাল পরগণা’এবং দেড় শতাব্দি পরে স্বাধীন ভারতে ‘ঝাড়খন্ড’ নামক পৃথক উপ-জাতীয় প্রদেশ গঠনের পশ্চাৎপটে নিঃসন্দেহে এই আন্দোলনই ক্রিয়াশীল ছিল।
এই বিদ্রোহ ছাড়াও সাঁওতালদের সক্রিয় ও প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহণ ছিল আরো কিছু আন্দোলনে। পান্ডুরাজা বিদ্রোহ, বিরসা মুন্ডা বিদ্রোহ, জিতু সামুর বিদ্রোহ প্রভৃতি এদের অন্যতম। এই সংগ্রামী ঐতিহ্য বিবেচনায় আসে কম্যুনিষ্ট কর্মীদের। বিপ্লব সম্পাদনের উপযুক্ত বিবেচিত হয় সাঁওতাল সম্প্রদায়। ক্ষেত্রও ছিল উর্বরা। উপনিবেশিক শাসনামলের ধারাবাহিকতায় সাঁওতাল সম্প্রদায়ের উপর অব্যাহত থাকে জমিদার ও মহাজনদের অন্ধ, নির্মম ও নীতিহীন সামন্ততান্ত্রিক শোষণ ও নির্যাতন। বংশ পরম্পরায় যে জমিতে চাষাবাদ করে সাঁওতালগণ সেই জমিতে তাদের কোন স্বত্ত্বাধিকার স্বীকৃতি পায় না। তারা রয়ে যায় পূর্ব আধিয়ার (বর্গাচাষী বা ভাগচাষী)। খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রেও অনুসৃত হয় একই রকম নীতি ও পদ্ধতি। ফসলের মাধ্যমে আদায় করা হতো খাজনা। প্রথা ছিল ফসল কাটার বিনিময় হিসেবে সাঁওতাল কৃষকরা তাদের পাওনা পাবে উপস্থিতির ভিত্তিতে। অর্থাৎ ক্ষেত্রে যতজন কর্মরত থাকবে ফসল কাটার বিনিময় পবে তারাই। এক্ষেত্রে প্রতিজন সাঁওতাল কৃষক প্রতি কুড়ি আড়ি (ধামা বা কাঠা) ধান কাটার বিনিময়ে তার ভাগে পাবে তিন আড়ি ধান। মাড়াই শেষ হলে উপজাতসহ (খড় ইত্যাদি) উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক জোতদারদের পরিশোধ করা ছিল বাধ্যতামূলক। অন্যায্য এই পদ্ধতি এবং ভাগচাষীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টিতে এগিয়ে আসেন কম্যুনিষ্ট কর্মীরা। দৃশ্যপটে অবির্ভূত হন ইলামিত্র।
৬.
অনূঢ়া জীবনে তাঁর নাম ছিল ইলা সেন। ১৮ অক্টোবর, ১৯২৫ সালে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন কোলকাতায়। তাঁর পিতা নগেন্দ্রনাথ সেন ছিলেন অবিভক্ত বাংলার ডেপুটি অ্যাকাউনটেন্ট জেনারেল। মাতার নাম ছিল মনোরমা সেন। তিন ভাই তিন বোনের মধ্যে ইলা ছিলেন জ্যেষ্ঠ। তৎকালীন যশোর জেলার ঝিনাইদহ মহকুমার অন্তর্গত বাগুতিয়া ছিল তাঁদের আদি নিবাস। কোলকাতার বেথুন স্কুল থেকে ১৯৪০ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্টিক পাশ করেন। বেথুন কলেজ থেকে ১৯৪২ সালে আই.এ এবং ১৯৪৪ সালে একই কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স সহ বি,এ পাশ করার পর ১৯৫৭ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। ত্রিশের দশকে তিনি ছিলেন বাংলার ক্রীড়া জগতের উজ্জ্বল তারকা। ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর ইলা সেন ছিলেন জুনিয়র অ্যাথলেটিক্সের বাংলা চ্যাম্পিয়ান। রক্ষণশীল সমাজের সকল বাধা টপকে এবং ইউরোপীয়ান ও অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের হারিয়ে দেন তিনি। অর্জন করেন ১০০ মিটার দৌঁড়ে সর্বভারতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ান হওয়ার গৌরব। ১৯৪০ সালে অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল জাপানে। এই অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণের জন্য গঠিত ভারতীয় দলের সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন ইলা সেন। কিন্তু ঐ সময় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালোমেঘে ঢাকা পড়ে যায় গোটা বিশ্ব। জাপানে অলিম্পিক হয়নি তারই প্রতিক্রিয়ায়।
ছাত্রাবস্থাতেই নানামুখী সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক তৎপরতায় জড়িয়ে পড়েন ইলা সেন। গার্লস স্টোরস কমিটি, ছাত্রফেডারেশন, মহিলা আত্মরক্ষা এবং কম্যুনিষ্ট পার্টির সঙ্গে তখন থেকেই তাঁর সম্পৃক্ততা। এছাড়াও ১৯৪২ সালের মম্বন্তর পরবর্তী ভুখা মিছিল ও খাদ্য আন্দোলনেও ছিল তাঁর সক্রিয় অংশ গ্রহণ। ১৯৪৪ সালে নাচোলের রামচন্দ্রপুর জমিদার পরিবারের পুত্রবধু হন ইলা সেন। তাঁর স্বামীর নাম রমেন্দ্র নাথ মিত্র। সেই সূত্রেই পাল্টে যায় ইলা সেনের পদবী ও পরিচিতি। তিনি হন ইলা মিত্র। জমিদার সন্তান হওয়া সত্ত্বেও তাঁর স্বামী রমেন্দ্র নাথ মিত্র (হাবল মিত্র নামেও পরিচিত) ভারতীয় কম্যুনিষ্ট পার্টির (ঈ চ ও) সদস্য। বিভাগ পূর্ব মালদাহ জেলার কম্যুনিষ্ট আন্দোলনের সক্রিয় সংগঠক ছিলেন তিনি। অধিষ্ঠিত ছিলেন জেলাটির কৃষক সভার সভাপতি পদে। স্বামীর সক্রিয় সহযোগিতা ও সমর্থনে ইলা মিত্র বেরিয়ে আসেন রক্ষণশীল পারিবারিক বৃত্তের বাইরে। নিজেকে সম্পৃক্ত করেন এলাকার কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে। বনেদী পরিমন্ডল ছেড়ে আসেন সাধারণ মানুষের কাছাকাছি। অবস্থানগত কারণেই আসে সুযোগটা।
১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগকালে মিত্র পরিবারের জমিদারী পূর্ব বাংলায় (পাকিস্তানের পূর্বাংশের প্রদেশ) অন্তর্ভূক্তি ছিল পরিবারটিরই ইচ্ছার ফসল। কারণ মূলতঃ হিন্দু ও উপজাতীয় সাঁওতাল অধ্যুষিত হওয়া সত্ত্বেও জমিদারী এলাকাটিকে পাকিস্তানের অঙ্গীভূত করার সিদ্ধান্ত নেন ইলা মিত্রের শাশুড়ি। তদনুযায়ী ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট রামচন্দ্র পুরের গ্রামবাসীদের এক সমাবেশে রমেন্দ্রনাথ মিত্র উত্তোলন করেন পাকিস্তানের পতাকা। এই পদক্ষেপ স্বস্তি এনে দেয় অঞ্চলটির অমুসলিম অধিবাসীদের মধ্যে। এসময় কৃষক নেতা আলতাফ হোসেন উদ্যোগ নেন কৃষ্ণ-গোবিন্দুপুর গ্রামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার। সফল হয় তাঁর উদ্যোগ। জমিদার বাড়ি থেকে হাঁটা পথে পাঁচ মিনিটের দূরত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় স্কুলটি। তাদের সন্তানদের শিক্ষার ভার ‘বধুমাতা’কে গ্রহণ করতে হবে গ্রামবাসীরা এরূপ দাবী উত্থাপন করেন। বধুমাতা ইলামিত্র মেনে নেন গ্রামবাসীদের সেই দাবী। শুরু হয় ইলমিত্রের শিক্ষকতা জীবন। গণ মানুষের কাছাকাছি আসার এই সুযোগ তাদের সমস্যা ও প্রয়োজনের বিষয়ে প্রত্যক্ষ জ্ঞান লাভের সুযোগ এনে দেয় তাঁকে। স্বামীর সঙ্গে কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলায় তিনিও ব্রতী হন। তেভাগা আন্দোলনের মুখ্য উকেণশ্য উৎপাদিত ফসলের দুই ভাগ আধিয়ার বা ভাগচাষীদের এবং এক ভাগ ভূমি মালিক বা জোতদারদের প্রদানের পদ্ধতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নতুন করে গতি লাভ করে। কিন্তু নাচোলে তেভাগা আন্দোলন বেগবান হলেও পাকিস্তানের পূর্ব প্রদেশের অন্যান্য এলাকায়, বিশেষতঃ উত্তরাঞ্চলে, আন্দোলনটি কঠোর ভাবে দমন করে ক্ষমতাসীন শাসকরা। অবদমন মূলক এই পদক্ষেপ নাচোল এলাকাতেও নির্মমতার রূপ নিতে থাকে। কম্যুনিষ্ট নেতৃত্ব আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়। ইলামিত্র ও তাঁর স্বামী রমেন্দ্রনাথ মিত্রসহ তেভাগা আন্দোলনের বিস্তৃতি ও জনপ্রিয়তা বর্ধনে ১৯৪৮-৫০ সাল পর্যন্ত পুরো দুই বৎসর নিরলসভাবে কাজ করেন যারা তাদের মধ্যে অন্যতম হলেনÑরাজশাহী সাঁওতাল কম্যুনিষ্ট নেতা সিবু কোরামুদি, সাগরাম মাঝি, টুটু হেবরম, চিতর মাঝি, শুকরা মাদাঙ্গ, মাতরা মাঝি, ছুতার মাঝি, ভাগীরথ কর্মকার, সুখবিলাস বর্মন প্রমুখ।
১৯৪৮ সালে আত্মগোপনকালীন অবস্থায় ইলামিত্র অন্তসত্ত্বা ছিলেন। সীমান্ত পেরিয়ে তাই তিনি গোপনে কোলকাতায় গমন করেন। সেখানেই তাঁর পুত্র মোহন জন্ম গ্রহণ করে। সন্তান প্রসবের ৩-৪ সপ্তাহ পরে ইলামিত্র পুনরায় যোগদান করেন চলমান কৃষক আন্দোলনে। তিনি, তাঁর স্বামী ও সহযোগীদের প্রচেষ্টায় আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। চন্ডিপুর, কালুপুর, মল্লিকপুর, মহীপুর, কৃষ্ণপুর, কেন্দুয়া, ঘাসুরা, গোলাপপাড়া, মান্দা এবং শিবনগর ইত্যাদি গ্রাম হয়ে ওঠে কেন্দ্রভূমি। উৎপাদিত ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ আধিয়ার এবং এক ভাগ জোতদারকে প্রদানের পদ্ধতি চালু করার পাশাপাশি ফসল কর্তন ও উত্তোলনের জন্য প্রতি কুড়ি আড়ায় তিন আড়ার পরিবর্তে সাত আড়া ধান প্রদানের দাবী উত্তোলিত হয়। এই লক্ষ্য অর্জনের উকেণশ্যে ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বর এবং ১৯৫০ সালের প্রথমার্ধে কৃষকরা একত্রিত হয়ে জোতদার খাজনা অর্থাৎ ফসলের আধি অংশ প্রদান বন্ধ করে দেয়। নাচোল থানার রাউতারা, জগদাই, ধারোল, ঘাসুরা এবং চন্ডিপুর গ্রামের কৃষকরা এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বিপ্লবী কৃষকদের মধ্যে প্রতিরক্ষা দলও গঠন করা হয়। তারা তীর-ধনুক, বল্লম, লাঠি এবং বিভিন্ন প্রকার দা নিয়ে সজ্জিত হয়। এই প্রতিরক্ষা দলে হিন্দু, মুসলমান ও সাঁওতাল সম্প্রদায়ের কৃষকরা অংশ নেয়। তবে সাঁওতালরাই ছিলেন প্রধান শক্তি। আক্রান্ত হলে করণীয় কি হবে সে সম্পর্কে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ‘লাঙ্গল যার জমি তার’ শ্লোগানটি প্রবল শক্তিরধারক হয়ে উঠে। তেভাগা মতবাদ (ঞবনযধমধ ফড়পঃৎরহব) বাস্তবায়নের সময় উপস্থিত বলে ধরে নেন আন্দোলনের সংগঠক ও নেতৃত্ব। ১৯৪৯ সনের শরৎকালের প্রধান ফসল-সংগ্রহ মৌসুমকে বেছে নেয়া হয়। ইলা মিত্র এবং রমেন্দ্র নাথ মিত্র দম্পতির পাঁচশ বিঘা জমির ফসলের তেভাগা কার্যকর করার মাধ্যমে শুরু হয় বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। নাচোল এলাকার সকল জোতদার ১৯৫০ সালের মধ্যে ‘তেভাগা মতবাদ ও সাতআড়ি পদ্ধতি’ মেনে নিতে বাধ্য হয়।
কার্যকর করণের পদ্ধতি ছিল অভিনবানির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট একজন জোতদারকে বেছে নেয়া হত। সেখানে উপস্থিত হতেন আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ। থাকতেন গ্রামবাসী ও চাষীরা। জোতদাররা উপস্থিত থাকতেন কিংবা অনুপস্থিত। বিষয়টিকে আমলে নেয়া হতো না। উৎপন্ন ফসল তিনভাগে ভাগ করা হত। দুই ভাগ দেয়া হত আধিয়ার বা ভাগ চাষীদের। বাকী একভাগ গরুর গাড়ীতে করে পৌঁছে দেয়া হত জোতদারদের বাড়িতে। এই বণ্টন মেনে নিতে বাধ্য হতেন জোতদাররা। তবে মহীপুরের জমিদার নিয়মটি মানতে প্রথমে অস্বীকার করেন। সমবেত কৃষক ও আন্দোলনকারী নেতাদের ছত্রভঙ্গ করতে শক্তি প্রয়োগের পন্থা অবলম্বন করেন তারা। আগ্নেয়ান্ত্র থেকে গোলাবর্ষণ করেন। কিন্তু আন্দোলনের প্রবল স্রোতধারায় ভেসে যায় জমিদারের প্রতিরোধ প্রচেষ্টা। তেভাগার সমগ্র দাবী মেনে নিতে বাধ্য হয় তারা। তবে এই আত্মসমর্পন সার্বিক ছিল না। আন্দোলনটিকে তারা সন্ত্রাস হিসেবে গণ্য করতেন। তেভাগা পদ্ধতি তাই জোতদারদের নিকট ফসল লুণ্ঠন ছাড়া অন্য কিছু ছিল না। ভূমি মালিক জোতদার এবং জমিদাররা জোটবদ্ধ হন। প্রশাসনকে তাদের ত্রাণে এগিয়ে আসতে আবেদন জানান। ইতিবাচক সাড়া আসে প্রশাসনের তরফ থেকে। কারণ দুর্বোধ্য নয়। শ্রেণীগত দিক থেকে ক্ষমতাসীনরা ছিলেন তাদেরই স্বগোত্র। ফলাফলে শুরু হয় প্রতিশোধ প্রক্রিয়া। পুলিশের সহায়তায় ভূমি মালিক, জোতদার ও জমিদারদের সম্মিলিত শক্তি আন্দোলন দমনে নির্মম পন্থা অবলম্বন করে। গ্রেপ্তার হন বহু আন্দোলনকারী কৃষক ও নিরীহ সাধারণ মানুষ। আত্মগোপনে থাকা নেতাদের জীবন অতিষ্ট ও অনিরাপদ হয়ে ওঠে। সমগ্র এলাকায় চিরুনী অভিযান (combing operation)-এর মত সূক্ষ্মতর তল্লাশী প্রক্রিয়া নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক গ্রহণ করায়। উপস্থিত হয় চরম এক সন্ধিক্ষণ।
৭.
আন্দোলনের স্নায়ুকেন্দ্র (nerve contre) ছিল চন্ডিপুর গ্রাম। নাচোল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (officer in charge) নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ১৯৫০ সালের ৫ই জানুয়ারি গ্রামটিতে আসে। গ্রেপ্তার করে দুইজন আন্দোলনকারীকে। তেভাগা আন্দোলন এবং এর সংগঠক নেতৃত্ব সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য আহরণ ছিল পুলিশের লক্ষ্য। অতত্রব গ্রেপ্তারকৃতদের উপর তারা চালায় নির্মম নির্যাতন। লম্বা বাঁশের মাথায় লাল কাপড় উড়িয়ে এবং টমটম (সাঁওতালদের ব্যবহৃত এক ধরনের মাদল) পিটিয়ে বিপদ সংকেত পাঠায় গ্রামবাসীরা। এটি ছিল তাদের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনারই অংশ। অতএব বিপদ সংকেত পাওয়া মাত্র স্থানীয় অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত জনতা ঘিরে ফেলে চন্ডিপুর গ্রাম। সমবেত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ গুলি ছোঁড়ে। কিন্তু শেষ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। তাদের ক্ষুদ্র দলটি অচিরেই ক্রুদ্ধ জনতার হাতের মুঠোয় চলে আসে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ঙ.ঈ) ও পাঁচজন সেপাই সংঘর্ষে নিহত হয়। উধর্তন কর্তৃপক্ষকে এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা মাত্রই সামরিক বাহিনী প্রেরণ করা হয়। ঘটনার দুই দিনের মাথায় ৭ জানুয়ারি, ১৯৫০ সালে আমনুরা স্টেশনে অবতরণ করে দুই হাজার সৈন্যের একটি দল। তাদের সহায়তা দান করতে নিয়োগ করা হয় সশস্ত্র পুলিশ ও আনসারদের। এই সম্মিলিত বাহিনী নাচোলের সব কটি গ্রামই ঘিরে ফেলে। উকিণষ্ট নেতাদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে ঘরে ঘরে তল্লাশী চালানো হয়। চন্ডিপুর যাওয়ার পথে অগ্নি সংযোগ করা হয় বারোটি গ্রামে। লুন্ঠন করা হয় একটার পর একটা বাড়ি। গুলি করে ফেলে দেয়া হয় অনেক গ্রামবাসীকে। বলতে গেলে প্রায় সব পরিবারের পুরুষ সদস্যদের দৈহিক নির্যাতন এবং নারীদের ধর্ষণ করা হয়। শিশুরাও রেহাই পায়নি। এই নির্মমতার সামনে তুলোর মত উড়ে যায় হিন্দু মুসলমান ও সাঁওতালদের সমম্বয়ে গঠিত আন্দোলনকারীদের প্রতিরোধ। আধুনিক মরনাস্ত্রে সজ্জিত প্রতিরক্ষা বাহিনীর কাছে দেশীয় অস্ত্র সজ্জিত আন্দোলনকারীদের প্রতিরোধ ছিল নিতান্তই অকিঞ্চিৎকর। ফলে পরাজয় বরণ করতে হয় তাদের। পশ্চাদাপসারণ করে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। নির্মম অবদমনের হাত থেকে রেহাই পেতে অনেক গ্রামবাসীও অবলম্বন করেন একই পন্থা।
নাচোলের বিপদজনক অবস্থান ত্যাগের সময় এখানকার অনেক নেতাই ৮ জানুয়ারি, ১৯৫০ সালে গ্রেপ্তার হন। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আজাহার হোসেন, চিত্ত চক্রবর্তী ও অনিমেষ লাহিড়ী। নিরাপদ এলাকায় সরে যেতে ইলামিত্রকে পরামর্শ দেন মালতা মাঝি। অনুরোধ জানান তার দলের সঙ্গে সরে যেতে। কিন্তু সহযোদ্ধার চলাচলের ক্ষমতা খুব ভালো না হওয়ায় সেই অনুরোধ রাখতে পারেননি ইলা মিত্র। অনুরূপভাবে গরুগাড়িতে খড় বোঝাই করে তার ভেতরে তাদের ‘রাণী মা’ (ইলা মিত্র) কে সীমান্তের ও পারে পৌঁছে দেয়ার কৃষকদের প্রস্তাবও তিনি গ্রহণ করেননি। এ ক্ষেত্রেও সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তাই ছিল তাঁর প্রধান বিবেচ্য। আন্দোলন সহযোগীদের বিপদের মুখে ছেড়ে নিরাপত্তার বলয়ে আশ্রয় নেয়া তাঁর বিপ্লবী চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে স্বামী রমেন্দ্রনাথ মিত্রকে এক দলে দিয়ে অন্য এক দলে যোগ দেন ইলা মিত্র। রমেন্দ্রনাথ মিত্রের দলটি নিরাপদে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যেতে সক্ষম হয়।
ইলা মিত্রের সঙ্গে ছিলেন বৃন্দাবন সাহা। ছিলেন শতশত সাঁওতাল অনুসারী। সাঁওতাল বেশভূষায় সজ্জিত হয়ে ইলা মিত্র যাত্রা শুরু করেন। ৭ জানুয়ারি, ১৯৫০ সালে নাচোল থানার শেষ গ্রাম অতিক্রম করেন তিনি। এগুতে থাকেন পশ্চিম মুখে, ভারত সীমান্তের দিকে। বিশ্রামের জন্য তারা যাত্রা বিরতি দেন আমনুরা রেল স্টেশনে। সেখানেই ডিটেকটিভ পুলিশ সাঁওতাল নারীর বেশ ও সাঁওতালী ভাষার ব্যবহার ক্ষমতা সত্ত্বেও তাঁকে সনাক্ত এবং গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ঙঈ) সহ পুলিশ হত্যার স্বীকারোক্তি আদায়ের উকেণশ্যে বন্দিদের উপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। সুষ্পষ্ট সংখ্যা জানা না গেলেও এই নির্যাতনে ৭০-১০০ জন বন্দি মৃত্যু বরণ করেন বলে সাধারণ ভাবে ধারণা করা হয়। সহযোগীরা মৃত্যু বরণ করার পর নির্যাতনের মোড় ঘুরে যায় ইলা মিত্রের দিকে। নাচোল থানায় চারদিন তাঁর উপর চলে অকথ্য নির্যাতন। দৈহিক নির্যাতনের পাশাপাশি দলবদ্ধ বলাৎকারেরও শিকার হন তিনি। ১০ জানুয়ারি ১৯৫০ সালে অজ্ঞান অবস্থায় তাঁকে নবাবগঞ্জ এবং তৎপরবর্তীতে ২১ জানুয়ারি রাজশাহী কেন্দ্রিয় কারাগার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এ সময়েও নানামুখী চাপ ও নির্যাতন ভোগ করতে হয় তাঁকে। নাচোল বিদ্রোহের বিষয়টিকে সাম্প্রদায়িক রূপ দিতে নাচোল থানার নিহত ওসির বিধবা পত্মীকে জেল গেটে আনা ও নানারকম বক্তব্য প্রদানের সুযোগ দেয়া হয়। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে কারাব›িন্দদের মধ্যে। নিরুপায় হয়ে নিরাপত্তা হেফাজতে নেয়া বন্দিরা ১৫ দিনের সময় দিয়ে মুখ্য মন্ত্রি নূরুল আমিন বরাবরে চরম পত্র প্রদান করেন। মুখ্য মন্ত্রীর তরফে কোন জবাব আসেনা। ২ ফেব্র“য়ারি ১৯৫০ সালে নিরাপত্তা বন্দিরা অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। নবম দিনে (১০ ফেব্র“য়ারি ১৯৫০) অনশনকারীদের অবস্থা পরিদর্শনে জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট আসেন রাজশাহী কেন্দ্রিয় কারাগারে। অশ্বাস দেন উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের। নিহত নাচোল থানার ওসির স্ত্রীর জেল গেটে আসা বন্ধ হয়। সেই সঙ্গে জেলার মান্নাকে সাম্প্রদায়িক উক্তি না করার ব্যাপারে সতর্ক করা হলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
স্বাস্থ্যের কিছুটা উন্নতি হলে ইলা মিত্রকে হাসপাতাল থেকে রাজশাহী কেন্দ্রিয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। নিরাপত্তা বন্দিরা ইলা মিত্র ও নাচোল বিদ্রোহ সম্পর্কে অবগত হন। ইলা মিত্র অবগত হন তাদের সম্পর্কে। জানতে পারেন তাদের ও সাধারণ বন্দিদের সম্পর্কে। সাধারণ বন্দিরা উন্নত খাদ্য ও আভ্যন্তরিন অবস্থা উন্নয়ন সম্পর্কে দাবী উত্থাপন করে। উপেক্ষিত হতে থাকে তাদের সেই দাবী। নিরাপত্তা বন্দিরা (security prisoness) সাধারণ বন্দিদের দাবীর সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে ৫ এপ্রিল, ১৯৫০ তারিখে শুরু হয় তাদের অনশন ঘর্মঘট। ইস্পাত কঠিন সংকল্প এবং লক্ষ্য অর্জনের পথে অবিচল ছিলেন ধর্মঘটিরা। স্বভাবতঃই এই ধর্মঘট বানচালের কর্তৃপক্ষীয় সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। তারা বেছে নেয় বল প্রয়োগের পথ। ২৩ এপ্রিল, ১৯৫০ (মতান্তরে ২৪ এপ্রিল, ১৯৫০) তারিখে রাজশাহী কেন্দ্রিয় কারাগারের কুখ্যাত খাপড়া ওয়ার্ডে বন্দিদের উপর গুলি বর্ষণ করে পুলিশ বাহিনী। নিরাপত্তা বন্দিদের মধ্যে তেভাগা আন্দোলনের সময় ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষকদের মধ্য থেকে দুধর্ষ নেতা হিসেবে আবির্ভূত কল্পরাম সিংহ, সুখেন ভট্টাচার্য, সুধীন ধর, বিজন সেন এবং হানিফ শেখ, দেলোয়ার ও আনোয়ার হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। নিহত এই সাতজন ছাড়াও একত্রিশজন নিরাপত্তা বন্দির মধ্যে অনেকেই আহত হন। এদের মধ্যে আব্দুল হক, বাবর আলী, আব্দুস শহীদ, নূরুন্নবী চৌধুরী এবং অমূল্য লাহিড়ী ও মনসুর হাবিবের আঘাত ছিল গুরুতর। নৃশংস এই হত্যাকান্ড নিঃসন্দেহে নাচোল বিদ্রোহেরই সন্দ্রস্ত প্রতিক্রিয়া।

অতঃপর শুরু হয় আইনী প্রক্রিয়া। নাচোল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (OC) ও অপর পাঁচজন পুলিশ হত্যার অভিযোগ উত্থাপিত হয় প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিষ্ট্রেট জনাব আহমদ মিয়ার আদালতে। মামলায় প্রধান অভিযুক্ত হন ইলা মিত্র। সহ-অভিযুক্তদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আজাহার শেখ, অনিমেষ লাহিড়ী, বৃন্দাবন সাহা, নগেন সরদার, দুর্গা বকর্শী, ইন্দিরা মরশু, মঙ্গলা মন্ডল, উপেন কোচ, যদু মাঝি, চতুর মাঝি, ছানু মাঝি, দুলু মাঝি, টোটন মাঝি, স্কিফেম মাঝি, সায়ফাল মাঝি, সময় সরেন, কিষান টুডু, গোপাল সিংহ, সুখ বিলাস সিংহ, সুরেন বর্মন, লালো রায়, চিনু রায়, খোকা রায়, দেবেন রায়, ভাদু মন্ডল ওরফে ভাদু বর্মন, রেঙ্গা বালি এবং মোহান্ত মল্লিক প্রমুখ। অভিযুক্তের সংখ্যা দাঁড়ায় একত্রিশ জনে। পরবর্তীতে আট জনের নামবাদ দেয়া হয়। ফলে অভিযুক্তের সংখ্যা তেইশে নেমে আসে। ১৯৫০ সালের নভেম্বর মাসে মামলা দায়ের করা হলেও বিচার কার্য শুরু হয় ১৯৫১ সালের জানুয়ারি মাসে। অভিযুক্তদের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন রাজশাহী বারের স্বনামধন্য আইনজীবি জনাব বীরেণ সরকার, কম্যুনিষ্ট পার্টি ও কৃষক সমিতির আত্মগোপনে থাকা নেতাদের অধিকাংশই ভারতে আশ্রয় নিতে সক্ষম হন। ইলা মিত্রের স্বামী রমেন্দ্রনাথ মিত্রও ছিলেন এদের মধ্যে। ৮ জানুয়ারি ১৯৫০ সালে সাঁওতালদের উকেণশ্যে বক্তব্য প্রদান কালে গ্রেপ্তার হন চিত্ত চক্রবর্তী। অনুরূপভাবে গ্রেপ্তার করা হয় আজাহার হোসেন ও অনিমেষ লাহিড়ীকে। এদের সকলকেই রাজশাহী কেন্দ্রিয় কারাগারে প্রেরণ করা হয়।
নাচোল বিদ্রোহের ব্যাপারে পাকিস্তান কংগ্রেসের নেতা গোবিন্দলাল ব্যানার্জী, মনোরঞ্জন ধর, চন্দ্র লাহিড়ী, ভবেশ নন্দি, বিকে দাস ও মনোহর ঢালি, স্পিকার বরাবরে নোটিশ প্রদান করেন আলোচনার জন্য। কিন্তু মুখ্য মন্ত্রী নূরুল আমিন কর্তৃক বিষয়টি প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় পাকিস্তানের পূর্ব বাংলা প্রদেশ আইন সভায় তা আলোচিত হতে পারেনি। ১১ জানুয়ারি ১৯৫১ সালে মামলার রায় ঘোষিত হয়। পাকিস্তান দণ্ডবিধির ৩০২ ও ১৪৯ ধারায় ইলা মিত্রসহ সকল অভিযুক্তকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দন্ডিত করা হয়। কোলকাতার প্রখ্যাত আইনজীবী জনাব আইনজীবী জনাব ইউসুফ জালাল এবং অন্যান্যের সহযোগিতা নিয়ে কুমিল্লা বারের বিখ্যাত আইনজীবী জনাব কামিনী কুমারদত্ত হাইকোর্টে প্রদত্ত রায়ের বিরুদ্ধে অপিল করেন। বিচারপতি এলিন ও বিচারপতি ইস্পাহানি ২২ এপ্রিল, ১৯৫২ তারিখে রায় ঘোষণা করেন। উক্ত রায়ে তারা নিম্ন আদালতের রায় কার্যকর না করা এবং মামলার পূণর্বিচারের জন্য সরকারকে আদেশ প্রদান করেন। এই রায় যুগান্তকারী এবং নাচোল বিদ্রোহের নৈতিক বিজয় হিসেবে পরিগণ্য।
এদিকে বন্দি অবস্থায় ইলা মিত্রের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। রাজশাহী থেকে তাঁকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৫৩ সালে ডাঃ এস কে আলম তাঁর চিকিৎসা করেন। ৩ ও ৪ এপ্রিল ১৯৫৪ সালে ইলা মিত্রের শারীরিক অবস্থা সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করে পূর্ব বাংলা আইন সভার পাঁচজন সদস্য তাঁদের উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি প্রদান করেন। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং অন্য নেতারাও অনুুরূপ বিবৃতি প্রদান করেন। ১৯৫৪ সালের জুন মাসে ইলা মিত্রকে প্যারোলে মুক্তি দেয়া হয়। চিকিৎসার জন্য তিনি কোলকাতায় গমণ করেন। সেখান থেকে তিনি আর স্বদেশে ফিরে আসেননি। ১৩ অক্টোবর ২০০২ খ্রি: কোলকাতা পিজি হাসপাতালে ৭৭ বৎসর বয়সে ইলা মিত্রের জীবনাবসান হয়। অবসান ঘটে ইতিহাসের একটা অধ্যায়ের।

নাচোলের বিদ্রোহ তেভাগা আন্দোলনেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সংগঠনে হয়তো দুর্বলতা ছিল। ফলাফলও কাঙ্খিত পর্যায়ের নয়। তথাপি বাংলাদেশের কৃষক সভার ইতিহাসে তেভাগাই যে সবচেয়ে ব্যাপক এবং সবচেয়ে শক্তিশালী আন্দোলন সেটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এই আন্দোলনের পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে আন্দোলনকারীদের অদম্য সাহস ও আত্মত্যাগের সাথে সাথে পৈশাচিক বর্বরতায় আন্দোলন দমনের কর্তৃপক্ষীয় অপচেষ্টার কাহিনী। নাচোল বিদ্রোহের কেন্দ্রিয় চরিত্র ইলা বর্বরচিত মিত্রের উপর পরিচালিত নিষ্ঠুর নির্যাতন যেমন তেমনি অমানবিক। একে শাসক শ্রেণীর মানসিক সংকটের প্রতিরূপ বলা তাই অত্যুক্তি হবে না। এটি মানবতার বিরুদ্ধেই চরম অশ্রদ্ধা প্রদর্শন। কিন্তু অহমিকা ও স্বার্থান্ধতা যখন শাসক মানস দখল করে নেয় নৈতিকতাবোধের নির্দিষ্ট সমীকরণ তখন হয়ে যায় অচল। হিংসার আশ্রয়ে নাচোলের কৃষকদের আন্দোলনের মূল উৎপাটনের প্রচেষ্টা তাই প্রতিক্রিয়াশীল শাসক চক্রের নৈতিক স্খলন ও সনাতনী দৃষ্টি ভঙ্গি এবং একই সঙ্গে ক্ষমতা ও জনভিত্তি প্রদর্শনের নোংরা রাজনৈতিক অপকৌশল হিসেবেই বিবেচ্য। তবে নাচোল বিদ্রোহ এবং আরো বিস্তৃত পরিসরে তেভাগা আন্দোলন ‘পশ্চিম বঙ্গ বর্গাদার আইন ১৯৫০’ এবং পাকিস্তানে ‘পূর্ববঙ্গ জমিদারী অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০’ প্রণয়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল সে বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। এই আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সেই আলোকেই নিণনীত হবে।
সহায়ক গ্রন্থঃ
১) বাংলার কৃষক- মূল: এম. আজিজুল হক ( Man Behind the Plough- 1939),
অনুবাদ- ওসমান গণি, বাংলা একাডেমী, ১৯৯২।
২) ভারত বর্ষের ইতিহাস- প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, তৃতীয় সংস্করণ ১৯৮৮
৩) নাচোলের কৃষক বিদ্রোহ: সমকালীন রাজনীতি ও ইলা মিত্র- মেসবাহ কামাল
ও ঈশানী চক্রবর্তী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, ২০০১।
৪) ইলা মিত্র- মালেকা বেগম, জ্ঞান প্রকাশনী, ঢাকা-১৯৮৯।
৫) ভারতবর্ষ- পাকিস্তান পর্বে ছিল না- বাংলাদেশেও কমিউনিস্ট পার্টি নাই
-এম, আর, চৌধুরী, দি ডলফিন এন্টারপ্রাইজ, ১৯৮৯
৬) বাংলা পিডিয়া- এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা
৭) আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি- মুজাফফর আহ্মেদ
৮) বাংলাদেশের উপন্যাস: বিষয় ও শিল্পরূপ- রফিকু উল্লাহ খান
বাংলা একাডেমী- ১৯৯৭
৯) Comrade Ila Mitra Dr Ajoy Roy, www. muktadhara. net,
 লেখক: আলফাজ আইয়ূব। ইত:মধ্যে তিনি অনেক গুরুত্বপর্ণ প্রবন্ধ লিখেছেন, সবগুলো প্রবন্ধ প্রকাশ হয়েছে ‘চালচিত্রে’। এই লেখাটি ‘চালচিত্র’ ফেব্রুয়ারি ২০১০ সংখ্যায় প্রকাশিত।
www.chalchitro.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here