‘নতুন ধর্ম খুলতে চায় কতিপয় মানুষ’ – রাজা সহিদুল আসলাম ।শফিক আমিন । Short Story by Raja Shahidul Aslam. Criticism by Shafique Amin.

0
155

‘নতুন ধর্ম খুলতে চায় কতিপয় মানুষ’ – রাজা সহিদুল আসলাম

শফিক আমিন

মানুষের নানান রকম বাসনা থাকে, যেমন কৃষকের থাকে এক চিলতে ভিটেয় মৌসুমি ফসল চাষের নানাবিধ কৌশল। সে সাধ্যানুযায়ী বীজ কিনে ছোট্ট ছোট্ট আইল বেঁধে নেয়, তারপর পালাক্রমে বপন করে – ধনেপাতা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, গোলআলু, লাউ-কুমড়া। তেমনই আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট থাকে লেখকদের। বিভিন্ন রকম চোখ ও দেখার ভঙ্গিমা দিয়ে সাজিয়ে নেন নিজ নিজ উঠোন। সেখানে পালা করে শব্দের ওপর শব্দ বসিয়ে দেয়াল রচনা করেন, দেয়াল নামিয়ে আনেন পাঠকবুকে, পাঠ সুবিধায় কখনও কখনও সিঁড়ি লাগিয়ে দেন বহুতল ভবনে আরোহনের মতো। শব্দকে রঙ বানিয়ে রাঙাতে চেষ্টা করেন পাঠক মন। তার ভেতর থেকে নিজের অতৃপ্ত মনকে তৃপ্ততা দিতে নিজেই আগুন টেনে আনেন। জ্বলতে জ্বলতে এক সময় অন্ধকার নামে এবং আলো ছড়াতে থাকে। তেমনই একখ- আলোর নাম “নতুন ধর্ম খুলতে চায় কতিপয় মানুষ” এ আলোক খণ্ডের প্রথম গল্প ‘বুড়া মিয়া’ এখানে একজন বয়স্ক লোকের চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন নিখুঁত ভাবে।
“নতুন ধর্ম খুলতে চায় কতিপয় মানুষ” গ্রন্থের নাম স্বার্থক হয়েছে ‘বুড়া মিয়া’ নামক গল্পের মধ্যদিয়েই। বইটিতে মোট সতেরটি গল্প স্থান পেয়েছে। গল্পগুলো সতন্ত্র ও মৌলিক। গল্পকার গল্পের ছলে পাঠককে জীবন চক্রের ভেতর ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে জীবনকে উপলব্ধি করাতে সক্ষম হয়েছেন। সতেরটি গল্প সতের রকমের স্বাদ। সকল খাবার যেমন সবার কাছে মুখরোচক হয়না তেমন অরুচিপূর্ণ গল্প এখানে মিলেনি বটে, তবে কোথাও কোথাও লেখার ভেতর নিজস্বতা রাখতে গিয়ে একটু-অধটু মুন্সিয়ানার ছাপ না রাখলেও শেষ দিকে ইলেট্রিকের মতন টান মেরে পাঠমগ্নতায় ফিরিয়ে এনেছেন গল্পের ভেতর। লেখক সমস্ত গল্পগুলোতে তুলে ধরেছেন সমাজ, সংসার, জীবন ও জিবিকার ভূমিকা। যা আমাদের সমাজে পরতে পরতে অনুভব করি।
গল্পের শুরুতেই যেমন বলে গেছেন –
“সুখবর, ভোট প্রার্থীদের জন্য সুখবর!
দোয়া চাইলে
প্রতিজ্ঞা করিতে হইবে।
প্রতিজ্ঞা হইল – ‘আমি মানুষের
জন্য নিজেকে উৎসর্গ করিব।
প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করিলে
অভিশাপ দেওয়া হইবে।
-এই কথাগুলি লিখিয়া বাড়ির সামনে টাঙ্গাইয়া দিয়াছে একশ’ পাঁচ বছর বয়সী মতলুব মিয়া
এখানে স্পষ্ট জানা গেছে নির্বাচন সময়ে প্রর্থীদের ভোট প্রার্থনায় দিনে রাতে ভোটারদের দরজায় যেভাবে দৌড়-ঝাপ করেন নির্বাচন শেষে কখনই তাদের টিকিটিও দেখা যায় না বা ওয়াদা রক্ষার্থে তেমন কোনও কাজ তারা করেন না তাই প্রার্থীদের সচেতন করতে এবং ওয়াদা রক্ষায় দৃঢ়র হতে প্রতিজ্ঞার মতন একটা হাতিয়ার বেছে নিয়েছেন মতলুব মিয়া। এই মতলুব মিয়া নামটা এখন মুছে গিয়ে পরিচিত হয়ে উঠছেন ‘বুড়া মিয়া’ নামে। তবে বয়স তাকে ব্যাপক পরিচিতি দিয়েছে যেমন, তেমন সম্মানীতও করেছে। এই সম্মানের পেছনে শুধু বয়স নয় তার সাথে ‘বুড়া মিয়া’র একটা বিশেষ ঐশ্বরিক ক্ষমতাও ছিল, যে শক্তিবলে তার খ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। আর এই খ্যাতিটাকে পুঁজি করে ব্যবসার প্রস্তাব নিয়ে আসেন শহরের ধান্দাবাজ ধর্ম ব্যবসায়ীদের কয়েকজন। তাদের প্রস্তাবটা এরকম – “স্যার- একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।
: প্রস্তাব?
: জ্বী প্রস্তাব।
: বিয়ে শাদীর ব্যাপারে প্রস্তাব শব্দটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তা আমার এই বয়সে কী প্রস্তাব এনেছেন?
: স্যার, ওই বয়সের প্রস্তাব।
: বয়সের প্রস্তাব? সেটা আবার কেমন?”
এভাবেই পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে সাজিয়ে-গুছিয়ে প্রস্তাব পেশ করেন। তারা মতলুব মিয়ার বয়সকে পুঁজি করে ব্যবসা করার ধান্দা নিয়ে এসেছেন কথাটা সোজা না বলে লেখক গল্পের ছলে অনেক লম্বা করেই প্রস্তাব স্পষ্ট করলেন। –
“: বলুন কী প্রস্তাব।
: আমরা একটি নতুন ধর্ম খুলতে চাই। আপনি সেটার নবী হবেন।
: ধর্ম? নবী? কী আবোল তাবোল বলছেন।
: আবোল তাবোল নয় স্যার, এটা করতে পারলে ফুলে ফেঁপে ওঠা যাবে। আপনার কেরামতি আর আমাদের বুদ্ধি কৌশলের সমন্বয় ঘটলে যারপর নাই ব্যাপারটা অন্য রকম হয়ে যাবে। একদিকে ব্যবসা অন্য দিকে নতুন ধর্মের প্রবক্তা – পৃথিবীতে আমরা অমর হয়ে থাকবো।”
নতুন ধর্ম খুলতে আসা ব্যবসায়ীদের দীর্ঘ কথা মন দিয়ে শুনলেন। তার জীবনে এও একটি অভিজ্ঞতা। “ তিনি বলেন – আপনাদের সব কথা শুনলাম, ভেবে দেখবো, কথা শেষ হলে আসতে পারেন, আমি একটু বাইরে যাবো, আ-ার অয়ার কিনতে হবে”
বুড়া মিয়া এই আন্ডার অয়ার কেনার কথা শোনানোর অর্থ নিশ্চয়ই বুঝতে সক্ষম হয়েছেন নতুন ধর্ম খুলতে আসা ব্যবসায়ীরা।
বইটির দ্বিতীয় গল্প “স্থাবর অস্থাবর”
এ গল্পে লেখক তুলে এনেছেন আমাদের লোভ ও হীনমন্যতার একটি অসাধারণ গল্প। যে গল্পে ফুটে উঠেছে ভাই ভাইয়ের সম্পদ বা প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করার এক ষরযন্ত্র মূলক কৌশল। এখানে সুস্থ-সবল এক যুবককে পাগল বানাতে করণীয় কৌশলের ভয়াবহতার রূপ “পলাশের ভাবী তার ছোট মেয়ে কানিজাকে বললো – যা, তোর চাচার সার্ট প্যান্ট নিয়ে আয়। কেন মা? যা নিয়ে আয়। কানিজা ১টা শার্ট ১টা প্যান্ট নিয়ে এলে তার মা প্যান্টের একটা পা বটি দিয়ে চিড়ে দিলো, সার্টের বুক পকেটটা ম্যাচের কাঠি জ্বালিয়ে ফুটো করে দিল। তারপর কানিজাকে বললো – যা রেখে আয়”
এমন হৃদয় বিদারক ঘটনার মাঝে রস বোধকেও তুলতে ভুল করেননি সু-চতুর লেখক। পলাশের যখন চাকরীর বয়স ফুরিয়েছে তখন তার বন্ধুরা পলাশকে নিয়ে মজা করতে বললো – “তুই ‘নিয়ে এসো’ গ্রুপে আছিস।” পলাশ সরল মনে জিজ্ঞেস করে –
“: কীরকম? পলাশ বলল।
: শুনবি?
: বল।
: ১৭/১৮ বছর মেয়েদের যদি বলে তোর বিয়ে ঠিক করা হয়েছে। মেয়েটি বলবে – কেমন দেখতে? সালামন খানের মত? যদি ২৬/২৭ বছর বয়সী মেয়ের বিয়ে ঠিক করা হয় তখন মেয়েটি জিজ্ঞেস করবে – পাত্র কী করে? আর যদি ৩০/৩৫ বছর বয়সী মেয়ের বিয়ে ঠিক হয় তখন সে বলবে – নিয়ে আসো। তুই ‘নিয়ে আসো’ গ্রুপে আছিস।”
মনের ভেতর বিষাদতায় ঠাসা সত্যেও বন্ধুদের ঠাট্টায় না হেসে পারে না পলাশ, তার বুক ভরা ব্যথা, বলতে না পারার কষ্ট কাউকেই বোঝাতে পারে না। এক মাত্র বৃদ্ধা মা তাকে বিশ্বাস করে কিন্তু তাতে কোনও লাভ নেই, বৃদ্ধা মায়ের সেই শক্তি কোথায় তার ভাই-ভাবীর দেয়া কঠিন অপবাদের প্রতিবাদ জানিয়ে সবার সামনে তুলে ধরে তার বড় ছেলের ষরযন্ত্র? বার বার যখন সকল দিক দিয়ে ঘিরে ধরে ষড়যন্ত্র তখন নাভিশ্বাস ওঠে পলাশের মনে, সে বাঁচার তাগিদে বড় ভাইয়াকে চিঠি লিখে এবং সাদা-মাটা ভাবেই লিখে শেষে ইতি লিখে “তোমার ভাই” শব্দটি ক্রস চিহ্ন দিয়ে শুধু নামটা রাখে ‘পলাশ’। এরপর সে কোচে চড়ে ঢাকা আসে, বন্ধুর বাসায় ওঠে। সেখানে বন্ধুর সাথে সব কথা শেয়ার করে। পরক্ষণেই লেখক বলেন – “পলাশ মূলত তার ভাইকে চিঠি লেখেনি, বন্ধুর বাসাতেও যায়নি। সে ট্রেনে চড়ে ঢাকায় আসে ঠিকই কিন্তু পরিচিত জনের বাসায় যাওয়ার ইচ্ছে তার জাগে না।” পরের বর্ণনায় পলাশকে এক প্রকার পাগলই মনে হচ্ছে। সে শহরের পথে পথে ঘুড়ে বেরায়। পা কাটা ফকিরের পাশে বসে পড়ে, পথচারী এক ফকিরকে ভিক্ষা দেয় পাঁচ টাকা, তাকে দেয় একটা একটাকার কয়েন! পরিশেষে “মা’র কথা মনে পড়ে তার” বলেই গল্প শেষ করেন।

“পুরুষের যদি উপায় থাকতো, সে বিয়ে করতো না – এ রকম বলে কেউ কেউ, কোন কোন মেয়ে বলে – যে পুরুষরা অক্ষম তারা এই সব কথা বলে”
সু-বিশাল শিরোনামে শুরু হয় তৃতীয় গল্প। এ গল্পে পুরুষ বিয়ের পরে তিনটি বাড়ির অস্তিত্ব খুঁজে পান। প্রথম বাড়িটি নিজের, দ্বিতীয় বাড়িটি বাবার ও তৃতীয়টি শ্বশুর বাড়ি। নিজের বাড়িটি স্বতন্ত্র রেখে পৈত্রিক বাড়ি ও শ্বশুর বাড়ির বর্ণনায় লেখক বলেন – “এই দুই বাড়ি তাকে টানাটানি করে। সেই গাধার কানের কবিতার মত।” আবার বলেন “এই দীর্ঘমেয়াদী খেলা চলাকালীন স্ত্রী সোফায় বসে চা খাবে,” এখানে এসে দেখা যায় স্বামীরা কোনও কায়দায় ঘরজামাই হলেই হলো – “এটা অবশ্য টানাটানির খেলা বলা যাবে না। এটা হলো গোজ মারার খেলা।” “স্ত্রী স্বামীর কলিজা ফুসফুস কান সব জায়গায় গোজ মারে, প্রতিনিয়ত। তাই স্বামী স্ত্রীর কথা ছাড়া অন্য কারও কথা শুনতে পায়না” “লোকে এইসব স্বামীকে ভাড়–য়া বলে, মানে স্ত্রৈন। তবে, একটা কথা হলো কী, স্বামী স্ত্রীর মাঝে যা ঘটে এসব নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক নয়। ভাড়–য়া টাড়–য়া বলা ঠিক না, বলা উচিৎ বিনয়ী আদর্শ গৃহপালিত স্বামী।”
এখানে বার বার ‘কোড’ করার মানে পাঠক নিশ্চয়ই বুঝবেন যখন বইটি আপনি হাতে নিবেন এবং পড়বেন। আলোচ্য গল্পটি ১. ২. ৩.টি পর্বে বিভক্ত। শেষ পর্বে এসে সমাজের দৈনন্দিন বিষয় জেগে ওঠে। যেমন গল্পের নায়ক নুরুজ্জামানের পারিবারিক অস্থিরতার ভেতর মায়ের ফোন আসে – “আজকাল এত ব্যাস্ত থাকিস যে ফোন ধরার সময় পাইস না।
: না, মানে, কী বলবে বলো।
: কী বলবো জানিস না? আজকে মাসের তের তারিখ। টাকা পাঠিয়েছিস? আমরা কীভাবে আছি, কী খাচ্ছি খবর রাখিস?
: একটু সমস্যা যাচ্ছে, দুই একদিনের মধ্যে কুরিয়ার করবো।”
এরপরই শোনা যায় মায়ের মুখে শ্লেষ মিশ্রিত বাক্য -“ ম্যারেজ ডে, জন্মদিন করতে পারিস আর আমাদের দুইটা মানুষের খাবার খরচ দেয়ার সময় সমস্যা?”
এমন সব পারিবারিক সমস্যা বর্ণনার মধ্য দিয়ে গল্প শেষ হলেও পাঠক মনে ফিনফিনিয়ে জ্বলতে থাকবে নিজের চলমান সমস্যা। আর তখন নায়কের মত মাথায় ঢোকাবেন বাড়তি উপার্জনের নতুন নতুন আইডিয়া।
যদিও গ্রন্থের নাম “নতুন ধর্ম খুলতে চায় কতিপয় মানুষ” – এই নতুন ধর্ম খোলা হোক আর নাই হোক আমাদের দৈনন্দিন জীবনের পরতে পরতে লেগে থাকা গোপন বেদনাগুলোর উন্মোচন হয়েছে হাস্যরস এবং বিবিধ সিরিয়াস গল্প-কথার মধ্য থেকে। জীবনের অজ্ঞাত অনেক অসুখ যেমন বেড়িয়ে এসেছে সাথে তার দাওয়াইও মিলেছে কোথাও কোথাও।
চার নাম্বার গল্পের নাম “ইনভেস্টমেন্ট”। এখানেও অভাব অনটন আর আয়-ব্যায়ের হিসাব। সাধারণ কর্পোরেট জীবনে যা ঘটে। তবুও এ গল্পে তার সহোযোদ্ধা হিসেবে স্ত্রী ও সন্তানকে কাছে পাবার একটা সমুহ শান্ত¦না সু-স্থির আছে। স্ত্রীর সৎ সঙ্গটা অকপটেই স্মীকার করলেন গল্পের নায়ক ইব্রাহিম – “অভাব অনটনের একমাত্র সঙ্গী তার স্ত্রী আর তার সন্তান। আর কাকে জানাবে সে স্বচ্ছলতার আকুতি, আর কার কাছে নালিশ করবে সে? অর্থসচিব? প্রধানমন্ত্রী? জাতিসংঘ?” “বেশ আগে আবুল হাসানের একটা কবিতা পড়েছিল সেÑ মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ নেবে না।” জীবনের শত দুঃখ যন্ত্রণার ভেতর এই সহযোদ্ধার ভূমিকা সবার জীবনে থাকেনা, তাই এই সম্বলটুকু যার জোটে নিশ্চয়ই সে সৌভাগ্যবান।
“আঁড়িয়া ও ভ্যান” রংপুরের একটি আঞ্চলিক ভাওয়াইয়া গান দিয়ে গল্পের শুরু হলো। পুরো গল্প জুড়ে গ্রামের সহজ-সরলতা ফুটে উঠেছে। একটা দিনমজুর দারিদ্র পরিবারের চিত্র গল্পপাঠের ভেতর সিনেমার মতো ভেসে উঠবে। যেহেতু পাঠক নিজ চোখে চিত্রটি দেখতে পাবেন সেহেতু সব কিছুর বিশ্লেষণ অবান্তর বলেই ক্ষ্যান্ত হলাম। তবুও শেষতক একটু গ্রামের সরলতার মন-মানষিকতা ও ব্যবসায়ী মনের কুটিলতাকেও তুলে দিচ্ছি। যেমন নায়ক পোঁহাতুকে পরামর্শ দিচ্ছে – “তুই একটা ব্যবসা করিবা পারিস।
: ব্যবসা?
: হ্যাঁ ব্যবসা, তোক কিছু করিবা লাগিবেনা, খালি বসে বসে টাকা গুনিবো।
: টাকা গুনিম?
: হ্যাঁ টাকা গুনিবো।
: তে ব্যাবসাটা ক্যামন ফের? ওই মতন ব্যবসা আছে নাকি ?”
মোট কথা পরামর্শদাতা পোঁহাতুকে তার গৃহপালিত আঁড়িয়া বিক্রি না করে গ্রামের ডাক আসা গাভীগুলোকে পাল দিয়ে টাকা কামানোর মত নির্লজ্জ একটা পরামর্শ দিতে চাইল যা পোঁহাতু ছিঃ বলে উড়িয়ে দিল !
(যে ভাওয়াইয়া গানটিকে কেন্দ্র করে গল্পটি ভাসান দিলো সে গানের লেখক এই গল্পের ভেতর দিয়ে স্বার্থক বলেই মেনে নিতে আপত্তি নেই। এই আলোচনার মধ্যদিয়ে গীতিকার মোঃ হাবিবার রহমানকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।)
“গরুর মাংস” – এ গল্পে লেখক গবেষণা করেন সাধারণ অসাধারণ এর পার্থক্য। এই পার্থক্য খুঁজতে গিয়ে সে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছুটে যান, সেখানে সে অতিব সাধারণ খেঁটে খাওয়া মানুষের কাছে প্রশ্ন রাখেন ‘সাধারণ ও অসাধারণ’ এর মনে বুঝে কি-না ! এই গ্রামে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেখা যায় Ñ শহরের ধনী ও শিক্ষিতদের কাছে দাঁড়াতে পাড়েনা, তাই সে শহরে খুব হলে একজন রিক্সাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করতে সাহস করে এবং প্রশ্নটা করে – “তোমার নাম ?
: মোর নাম আকালু।
: লেখাপড়া করেছো?
: ক্লাস ফাইভত উঠিছিনু। পরিক্ষা দুউ নাই।
: সাধারণ অসাধারণ বুঝ ?
: তোমহরা বড়লোক মানুষ। কত রকম ইরোঙ্গি বিরোঙ্গি কাথা কহেন!
: মানে?
: মানে হইল্, তোম্হার প্যাটত্ ভাত আছে তো, ওইতানে কত রকম কথা কহিবেন!
: সাধারণ অসাধরণ বোঝো না?
: বুঝি নাই আরহো, মুই অসাধারণ, তোমহরা সাধারণ, মুই অসাধারণ বোলেইতো এত প্রশ্ন করহেছেন।”
একজন রিক্সাওয়ালা সাধারণ অসাধারণ এর পার্থক্য ঠিকই বুঝেন। কেননা সে সারাদিন শহরের শিক্ষিত লোকদেরই বেশি বহন করে। সে শুনে ও জানে সভ্যতাকে যদিও লেখক তেমন রিক্সাওয়াল হয়ত খুঁজে পাননি।
এক সময় ভারতবর্ষে সবাই গরুর মাংস খেতো। নানান ভাবে সুস্বাদু রান্নার গোস্ত খুব মজা করে সবাই খাচ্ছে দেখে দেশের রাজা ভাবলেন এভাবে গরু খেয়ে ফেললে দ্রুতই ভারতবর্ষ গরু শূন্য হয়ে যাবে। “তিনি ভেবে চিন্তে ঘোষণা দিলেন – গো-মাংস খাওয়া যাবে না, গরু দুধ দেয়, গরু মাতৃতুল্য।”
হিন্দু সম্প্রদায়রা সেই থেকে গরু খাওয়া বন্ধ করলো। আর অন্য সম্প্রদায়রা গরু খাওয়া অব্যাহত রাখল। ভারতের গরু বাংলা দেশের তিন দিক দিয়ে প্রবেশ করতে শুরু করলো আর বাঙালি মুসলমানরা সস্তা ও সহজ প্রাপ্য বলে নানান কায়দায় গরুর গোস্ত খাওয়া শুরু করলো। টেবিলে টেবিলে সাজানো থাকে গরু, মোট কথা খাবার টেবিল এখন গরুর দখলে। ফলে নানান রোগে আক্রান্ত হতে থাকে বাঙ্গালিরা। তারা ডাক্তারের কাছে খুব ভীর করতে থাকে। এতে ডাক্তাররা ক্ষেপে গেলো। তাদের অফিস বড় করতে বাধ্য হলো। তাতেও কাজ হচ্ছেনা, এবার তারা রোগীদের নানান টেস্ট জুড়ে দিল। এক একজন রোগীকে চারটা পাঁচটা টেস্ট করাতে হিমসিম খাচ্ছে ল্যাবরেটরিগুলো ফলে নতুন নতুন ল্যাবরেটরি গজিয়ে উঠতে লাগল। “গু, মুত, রক্ত পরীক্ষা সাধারণ হয়ে গেলো, টেস্ট গিয়ে দাঁড়ালো ইসিজি, আলট্রাসনোগ্রাম, এনজিওগ্রাম, সিটি স্ক্যান ইত্যাদি ব্যায়বহুল টেস্টে। ডাক্তাররা রোগীদের পাছা দিয়ে লাল সাদা হলুদ নানা রকম সুতা বের করে দেয়। ডাক্তাররা এক যোগে বলতে লাগলো – গরু খাওয়া বন্ধ করতে হবে। সেই রাজার প্রেতাত্মা ভর করে ডাক্তারদের উপর। আর ডাক্তাররা ভর করে ল্যাবের উপর। ল্যবঅলারা বেজায় খুশি, তারা ডাক্তারের এক খোঁচায় পেয়ে যায় অনেক টেস্ট। মাস শেষে ল্যাবঅলা নিতম্ব দোলাতে দোলাতে ডাক্তারকে খাম দিয়ে আসে। ডাক্তার সেই খাম নিয়ে নিতম্ব দোলাতে দোলাতে স্ত্রীর কাছে যায়। স্ত্রী খুশি হয়ে ডাক্তারকে চক্কাস শব্দে শক্ত একটা চুম্মা দিয়ে দুলতে দুলতে শপিং মলে যায়”।
এর পরেও এই মাংসের অনেক ইতিহাস ঐতিহ্যের দিকে গড়াতে থাকে। গড়িয়ে গড়িয়ে মাংস এখন দুঃপ্রাপ্য দ্বারে এসে হামাগুঁড়ি দিচ্ছে। তবুও মাংস আরও গল্প নিয়ে ফিরবে পাঠক প্রাণে, গল্পকার মাংস কিনতে যাক, কসাই চিনে নিক গল্পকারকে!
এর পরের গল্প “ও টাকা ও ভালোবাসা” এ গল্পটা একটা স্বপ্ন’র বর্ণনা। স্বামী অনেকগুলো টাকা নিয়ে এসে স্ত্রীকে ঘুম থেকে তুলে সংসারের দেনা-পাওনার হিসেব কষে স্ত্রীর হাতে তুলে দেয় ছয় লাখ বিরাশি হাজার টাকা। স্ত্রী টাকা গ্রহণ করে, জানতে চায় টাকার উৎস কিন্তু কিছুতেই স্ত্রীকে বলেনা সে। বিকেলে মাছবাজারে গিয়ে বড় ইলিশ মাছ কিনার পরিকল্পনা করে। স্ত্রী খুশি হয়ে বলে -“তুমি নুডুলস পছন্দ কর, ইলিশ কিনতে যাবার আগে একটু বস, আমি বানিয়ে আনছি।
: দেবে ? দাও ! টাকা আর ভালোবাসা, কী যে গভীর সম্পর্ক !”
স্বামী অফিসে না গিয়ে বিকেলে ঘুমাচ্ছিল। সেই ঘুমে এসে হাজির টাকার মত গুরুত্ব পূর্ণ বিষয় যা কিনা নিজের কোচরে! পরিশেষে স্ত্রী নুডুলস রান্না করতে গিয়ে দেখে ডিম নেই, তেল নেই। সে অফিস ফাকিবাজ স্বামীকে বলে – “এ্যাই, ওঠো, শুয়োরের মতো ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে ঘুমাচ্ছো কেনো?”
অনটনের সংসারে সুন্দর স্বপ্নও দেখার উপায় থাকেনা স্বামীদের! সল্প আয়ের মানুষরা স্বপ্ন দেখানোর ব্যবস্থা করে নিজেরা দেখে না। দেখতে পারেও না। এই পারা না পারার দোলায় দুলে দুলে নির্মিত গল্পগুলো পাঠ শেষে একটা দীর্ঘশ্বাস পতিত হয় এবং ভেতরে থেকে যায় গল্পের রেস!
“পাথর” নামের গল্পেও পাওয়া না পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস বাতাসে মেলাতে মেলাতে আপনার জীবনে ফেলে আসা দিনগুলো জেগে উঠবে আপনা থেকে। দেখতে পাবেন অতীতের সুখের দোলনাটা মাঝে মাঝে নিজে থেকেই দুলছে আবার দড়ি ছিঁড়ে পড়ে যাওয়ার মত অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনায় কঁকিয়ে উঠবেন। তখন হিসেব মেলাতে গিয়ে দেখবেন জীবনের হিসেব আটকে গিয়েছিলো রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতায়!
“অন্ধকারের বিরুদ্ধে” – মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গল্প। গল্পকার অত্যন্ত সু-চতুরতায় গল্প বলা শুরু করেন, শুরুতেই আন্দাজ করতে পারবেন না যে গল্পটা কোন বিষয়ের ওপর। এমন কি পড়ার সময় যদি বে-খেয়ালে দুটো লাইন বাদ পড়ে যায় তাহলে আবার শুরু থেকে পড়তে হবে ধাচের নির্মাণ শৈলীতে দাঁড়ানো গল্প। এ গল্পে রংপুরের বেশ কয়েকটি লোক ছড়া (শিশুতোষ) আবিস্কার হলো। এর মধ্যে উল্লেখ যোগ্য একটি –
“এ্যাকত্ দ্যাকত্ ত্যাকত্ তাল্
কাইল পরশু জমিদার
কালি ধানের জমিদার
আনের আগাল নড়ে শিষ
কাউয়া ডগায় উনিশ বিশ।”
গল্পকার একাত্তরের সময় পরিবার পরিজন নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য শহর থেকে গ্রামে পালানোর জন্য বিষয়টাকে খেলার ছল হিসেবে উপাস্থাপন করেছেন। একজন শিশুকে দিয়ে বলিয়ে যাচ্ছেন গল্পটা। শিশুর কাছে এই প্রাণ ভয়ে পালিয়ে বেড়ানোটা একটা পাতানো খেলা হিসেবেই প্রতিয়মান হয়। যেহেতু বক্তা এক শিশু সেহেতু গল্পের একটু ফুসরৎ এলেই খেলার ছলে ছড়া আওড়িয়েছেন। শিশু মনে এই সব যুদ্ধ বা জীবনের নিরাপত্তায় পালিয়ে বেড়ানোকে একটা খেলাই মনে করেছে। তার কাছে সব থেকে মজার বিষয় হচ্ছে এখন আর তাকে স্কুলে যেতে হয় না, সন্ধ্যা-সকালে পড়তে বসতে হয়না। কেউ তারে বিরক্ত করে না, সারাদিন শুধু খেলা আর খেলা। লেখক বলেন – “সে তো ব্যস্তই থাকে তার রাজ্য নিয়ে। কিন্তু … ‘পালানো’। আবার সেই ‘পালানো’ খেলাটা তার বাবা মা খেলতে শুরু করে। বাবা মা খেলর প্রস্তুতি নিচ্ছে ঠিক সেই সময় আর এক দল বাড়িতে ঢুকে পড়ে তাদের খেলার জন্য। সে এক ভয়ংকর খেলা। সে ভয়ে চুপসে যায়। বড় বড় তলোয়ার, দা, লম্বা লম্বা লাঠির আগায় চাইনিজ কুড়াল আর বিশাল বড় বড় বস্তা। যেন এক উত্তাল ঝড় শুরু হয়েছে।”
এবার বোঝা যাচ্ছে গল্প কথক শিশুটিও বুঝতে পারছে ‘এটা কোনও সাধারণ খেলা নয়! এ খেলায় চরম ভয় ও অন্যায় তার চোখে ভেসে ওঠে।’ সে দেখে – “গরু ছাগলকে যেভাবে তাড়িয়ে নিয়ে যায় সে ভাবে পাড়ার সবাইকে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যায় পাশের একটি খোলা যায়গায়।” সে বয়সে সব কিছু বুঝতে না পারলেও মনে রাখার মত বয়স তার হয়েছিলো। এখন সে বুঝতে পারে গুলির হাত থেকে বাঁচানোর জন্যই ‘তার ছোট ভাইকে মায়ের পায়ের কাছে বসিয়ে ও তাকে মায়ের পিছনে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল!’
গল্পকার “গরু” গল্পে অযথাই সময় ক্ষেপণ করেছেন আসল গরু খুঁজে বেড় করার জন্য। এ গল্পের স্বার্থকতা তেমন মিলেনি। গরু শব্দটা মূলত দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার, যা আমারা শিশুকাল থেকেই দেখে ও জেনে এসেছি। তবুও গরুরর মতো একটা নিরাহ প্রাণিকে নিয়ে এহেনো টানা-হেঁচড়া অবান্তর বলেই মনে হলো। বরং এখানে নুরু মিয়াকেই আসল গরু বলে খ্যান্ত দেওয়া উচিৎ ছিল। তবুও গল্পের ছলে জিলেপিটা ভালই ভাঁজেন বলে প্যাঁচে প্যাঁচে জমে থাকে রস ! আমরা খাদক সেই প্যাঁচের জিলেপি খেতে খেতে বরং সামনের দিকে আগাই, হয়ত সেখানে রসের নিচে ডুবে আছে রসগোল্লা, হয়ত তারও নিচে খুঁজে পাবো রস মালাই কিংবা রস মঞ্জুরির মত সুস্বাদু কিছু!
এই হিসেবে “টেবিল” নামক গল্পটা বেশ স্বার্থক নাম নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। এই টেবিলেরও আছে বিভাজন। চারকোণা বা আয়তক্ষেত্র টেবিলের চেয়ে গোল টেবিলের গুরুত্ব বেশি-ই দেয়া হয়। চারকোণা বা আয়তক্ষেত্র টেবিলের ওপড় থেকে আমরা জ্ঞান অর্জন করি। সে জ্ঞান নিয়েই বসি গোল টেবিলে অথচ তবুও গোল টেবিলের গুরুত্ব দেয়ায় আয়তক্ষেত্র টেবিলের রাগ বা অভিমান হলেও হতে পারে কিন্তু আমরা তাকেও গল্পের ছল বলেই উড়িয়ে দিয়ে গোল টেবিলেই গিয়ে বসি। লেখক বলেন – “টেবিলে বসে যত ভাঙাভাঙি মারামারি আর বাঁশ দেওয়াদেওয়ির পরিকল্পনা- ছক আঁকাআঁকি হয়েছে, হচ্ছে। গোল টেবিলটা একটু বেশীরকমের নিরীহ। তাই । চারকোণা বা আয়তক্ষেত্র টেবিলের চেয়ে গোল টেবিলের কদর বেশি। ধাক্কা মারলেও গোল টেবিলে গুতা খাওয়ার সম্ভাবনা নেই।”
টেবিলের গল্প যখন শুরু হলো তখন সব টেবিল বাদ দিয়ে একটা ডাইনিং বা খাবার টেবিল ঘুরে দেখাই ভাল। গৃহে অবস্থিত তিনবেলা ব্যস্ত টেবিলে যখন একটু সুযোগ আসে খাবারের ছন্দে ভাই-বোনের গল্প তখন শত অভিমান ভুলে টেবিলটাও হয়ত মুচকি হাসে! ধরুন রাতের বেলা ভাইবোন একত্রে খেতে বসেছে। তারা ছোট ছোট মাংসের টুকরো নিয়ে খেতে শুরু করেছে। সে সময় একজন গল্প শুরু কওে Ñ গাড়িতে করে – শেরপুর থেকে আসার পথে একজন বুড়ি মহিলার মাথারওপর আর একজন মহিলা বমি করে দিয়েছে। “ হঠাৎ গাড়িতে ধপাস শব্দ হল, গাড়ি থামানোর থাপ্পর, কন্ডাক্টর বলল Ñ ওস্তাদ গাড়ি থামান।
: কী হইছে? – ওস্তাদ বলল।
: বমি করছে।
: বালু দিয়া দে।
: বালু দিব কোথায়?
: যেইখানে বমি করছে সেইখানে।
: বালু দেয়া যাবে না, বুড়ির মাথায় এক মহিলা বমি করছে।
সাবান কিনে দিস।” এরপর বক্তা বলতে লাগলো – “ক্রিম কালারের বমি, আর বুড়ির মাথার ঠিক মাঝখানে একটা ছোট মাংসের টুকরা। সঙ্গে সঙ্গে মুনিরার হাতে ধরা মাংসটা ছি: বলে বন প্লেটে ফেলে দিল।”
আমাদের সামনে টেবিলে টেবিলে প্রতিনিয়ত ঘটছে নানান অঘটন। যা আমরা কখনও ভেবে দেখিনি, কারণ টেবিল তো নির্দোষ! এই টেবিলে যেমন ভালো ভালো কাজ হয় তেমন ঘুষ, দুর্নীতি, রাষ্ট্রিয়সম্পদ বিনষ্ট, ভূ-ভাগ সহ অনেক কিছুই ঘটে। “কোন কোন টেবিলে লেখা থাকে নারী পুরুষের নাম, যেমন – মানু+নুরুজ্জামান অথবা আম্বিয়া আমি তোমাকে ভালোবাসি। হোটেলের টেবিলে মোবাইল নাম্বার দিয়ে পাশে লেখা থাকে ১বার ৫০০টাকা।”
অবশেষে লেখক অক্ষেপ করে বলেন – “তোমাদের সেই টেবিল আছে কি, যেখানে অলস নিরিবিলি দুপুরে পাখি এসে পড়ে থাকা দানাগুলো খুঁটে খুঁটে খায়?”
বাঁশ দেয়া বাঁশ নেয়ার কাজ অনবরত চলবে, চলতেই থাকবে অনন্তকাল। যা কোনও ভাবেই বন্ধ হবার নয়। হবেনা। শত চেষ্টায় আমরা নতুন নতুন শব্দ বুনতে পারবো, হিংসা বিদ্বেষ বন্ধ করতে পারবো না। এই না পারার পেছনে যার হাত তার নাম ক্ষুধা, ক্ষুধা যদিও নিবারণ করা যায় কিন্তু লোভকে নিবারণ করা বড়ই কঠিন। সেই কঠিন কাজকে সাধন করেন মহা মনীষীরা। আমরা বরং সামনে দাঁড়ানো গল্পের পুকুরে ¯œান সেরে নেই।
‘গল্প’ – “না বলা গল্পটা কিন্তু সেরা গল্প। যাকে তুমি তোমার সেরা গল্পটা শোনাতে চাও, নানা কারণে তুমি শোনাতে পারনি। তাতে কী এসে যায়! তোমার গল্পটা কিন্তু রয়েই গেছে। এতে গল্পের কোন ক্ষতি হয়নি।” ঠিক এমনই এলোমেলো ভাবে শুরু হওয়া গল্পের নাম “অন্যের পাছায় লাথি মারার গল্প” লেখক তার চারপাশে হাজারও ঘটনার মধ্য থেকে বেছে বেছে কতিপয় ঘটনার বর্ণনাকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন। তিনি ‘উপরঅলা’ বলতে চাকরিজীবীদের অফিসিয়াল বসদের কথা বুঝিয়েছেন। এই উপরঅলারা ঘুষ দুর্নীতি ছাড়া কোন ভাবেই চেয়ারে বসতে পারেন না। বসের নিচে যারা আছেন তারা যে বেতন-ভাতা পান তাতে সংসার চালিয়ে নিতে পারেন না। ফলে নিজের অধীনে যত টুকু চেটেপুটে খাওয়ার সুযোগ আছে লেখক আবার সে সুযোগের নাম দিয়েছেন ‘রেপ’। ফলে উপরঅলা থেকে অফিসের সবাই রেপ হয়ে ও রেপ করে আসছেন অনন্তকাল ধরে। একটু পরেই গল্পকার রেপ শব্দটা ‘সেক্স’ শব্দে উন্নিত করলেন। এবার তিনি বললেন – ‘সেক্স এ্যান্ড ইকোনোমিক্স’। এখানে আঞ্চলিক শব্দকে সরাসরি তৃণমূল ভাবেই প্রকাশ করেছেন। “আঞ্চলিক লোকেরা তাদের নিজের ভাষায় বলেন – প্যাট্টা আর চ্যাট্টা। সুশীলরা বলে – সেক্স আর ইকোনোমিক্স। আঞ্চলিক লোকেরা বলে – প্যাট আর চ্যান না থাকিলে মুই আর কাম না করনু হয়। সুশীলরা বলে – সমাজ-পৃথিবীর মূলে রয়েছে সেক্স আর ইকোনোমিক্স।”
এখানে লেখক এক শালা-দুলাভাইয়ের আলাপের মধ্য দিয়ে বিষয়টা আরও খোলসা করার চেষ্টা করেছেন। – “শালাবাবু এবার বিয়ে কর। শ্যালক বলল – দুলাভাই আগে খাড়ায়া লই। দুলাভাই বলল – তুমি যখন খারাইবা তখন তোমার দড়ি খারইবো না।”
এমনি রঙ-তামাশা-ভাব রসে টইটুম্বুর গল্পের ভেতর দিয়ে সাচ্ছন্দে বলে যান সমাজ সংসারের দুঃখ দুর্দশা, জীবনের অবক্ষয়। এ গল্পেরই অংশ ‘দড়িকাঁচি’। কৃষক পরিবারে সাধারণত যা ঘটে থাকে অথচ আমরা তা অনেকেই জানিনা বা উপলব্ধি করতে পারিনা। অথচ লেখক তা উপলব্ধি করেছেন এবং গল্পের ভেতর বলেছেন ঠিক এমন করে – “রাতে স্বামী স্ত্রীর শরীর ঘেষে শোয়। অন্যান্য রাতের চেয়ে একটু বেশীই। এ কথা সে কথা দু’জনে খুল্লমখাল্লা গল্প জুড়ে দেয়, অনেকটা পুকুরে ঝাপ দেয়ার আগে পূর্ব প্রস্তুতি আরকি। যা হোক দু’জনই বেশ উত্তপ্ত, স্বামীর উত্তাপ একটু বেশি। তারপর চূরান্ত মুহূর্ত ঘনিয়ে আসে। এমন সময় স্ত্রী বলল – কাইল চাউল লাগিবে। সঙ্গে সঙ্গে স্বামীর দড়ি কাঁচি সব ছিড়ে পড়ে গেল! স্ত্রী বলল – কী হইল ? স্বামী বলল – কী আর হোবে, কাইল চাউল লাগিবে, মোরঠে টাকা নাই।” এ গল্পের আর এক অংশের নাম ‘কালার’। এখানে সবটুকুই হাসি-তামাশার, তবে এটাই বাস্তবতা। প্রান্তিক জেলা শহরের একটা হোটেলের চিত্র। হোটেলের টয়লেটে তালাবন্ধ। কারণ সেপটি ট্যাংকি ভর্তি হয়ে গেছে। তো ১৮/১৯ জন কর্মচারীরা পাশেই একটা ফাঁকা যায়গায় হুগুমুতু করে ভরিয়ে ফেলেছে। সেই হাগুমুতুর বর্ণনা করেছেন – “ পুরনো দিনে গরু জবাই করে ভাগা দিয়ে বিক্রি করা হত। কর্মচারীরা সেখানে সে রকম থোকা থোকা ভাগা দিয়ে দিলো। এক পোয়া, দেড় পোয়া, হাফ কেজী …” সেই গু এর কালার সময় সাপেক্ষে বা দিনের ব্যবধানে কেমন তাও বুঝিয়েছেন। হয়ত এই গল্পে গুরুত্বপূর্ণ কোনও ম্যাসেজ নেই তবে আমাদের গোমরা ভাব বা মন মরা হয়ে ঝিমুনি কমাতে একটু হাস্য-রসের উপকরণ দিতে সক্ষম হয়েছেন তা নি:সন্দেহ।
“ভালোবাসাবাসির দিন” গল্পে ১৪ই ফেব্রুয়ারিকে ঈঙ্গিত করেছেন। গল্প বলার মধ্য দিয়ে প্রথমত ধার্য্যকৃত দিনের প্রতিবাদ জানিয়ে গেলেও শেষতক নিজেই স্থির থাকতে পারেননি প্রতিবাদের বিষয়ের ওপর। কাত হয়ে পড়ে গেছেন আহ্লাদি বৌয়ের টিপ্পুনিতে। রিক্সায় চড়ে রিক্সাওয়ালাকে পরামর্শ দেয়া সহজ কিন্তু বাস্তবিক জীবনে তা প্রতিফলন করা বড়ই কঠিন বিষয়। এ গল্পের প্রতিপাদ্য ‘সাধারণের কাছে নিজেকে মহা জ্ঞানি হিসেবে জাহির করা গেলেও নিজ বাস্তবতার কাছে পরাজিত’।
“গাধা” গল্পে লেখক একজন নারীর জীবন ও জীবীকা নিয়ে গল্প বলেছেন। গ্রাজুয়েশন শেষে কোথাও চাকরি নিলো মেয়েটা। তার সংসারে থাকে ছোট ভাই, বোন মা। এতকাল অনেক কষ্টে সংসার টেনেটুনে লেখাপড়া করিয়েছে। চাকরি পেতেও মূল্যবান সম্পদ নষ্ট করতে হয়েছে। এবার সংসার, ভাই বোন দেখার দায় মাথায় চলে আসাটা স্বাভাবিক। নিলুফা নামের মেয়েটি তেমনই একটা সংসারের কর্ণধার। তার বিয়ের বয়স এগিয়ে যাচ্ছে বিয়ে বিরতির দিকে। দীর্ঘ দিনের প্রেমিককে বারবার ফিরিয়ে দিচ্ছে বিয়ের আহ্বান থেকে। সে কোনও ভাবেই দায় বোধ থেকে অব্যাহতি নিতে পারছে না। বিবেকের তাড়নায় নিজে নিজে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে। তবুও সংসারের দায়ভার নিয়ে সদা ব্যস্ত থাকে নিলুফা। ঐদিকে অফিস কলিগ নুরু মিয়া সামান্য আয়ের সংসারে ধার-দেনায় ডুবুডুবু, তবুও সে ঘুষ গ্রহণ বা দুর্ণীতি করেন না। অথচ সংসারের স্বচ্ছলতা আনতে এবার থেকে করবেন বলে সংকল্প করেছেন। কথাটা তার পীরের মত বসকে জানিয়ে দিলেন! এমন নুরু মিয়া আর নিলুফার গল্পে বুকের ভেতর জেগে ওঠে এক করুণ চিত্র। যে চিত্রে নিজেকে দেখা যায় এর সাথে কোথাও না কোথাও জড়িয়ে আছে। ফলে নিজের ভেতরও একটা বিদ্রোহ ভাব তৈরি হয়। আর তখনই দুর্নীতি নামের ঘুমন্ত শব্দটা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে একজন সৎ ও চরিত্রবান চাকরিজীবীর ভেতর। অথবা এই সব উপরঅলাদের অনিয়ম রুখে দিতে নিজেই কিছু করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে মনে মনে, যা মনেই পড়ে থেকে মজে যায় রাতের ভয়ংকর স্বপ্ন সকালের আলোয় ভুলে যাওয়ার মত।
বইয়ের শেষ ও সতের নাম্বার গল্পের নাম “শাড়ি”। এ গল্প নানান জন নানান ভাবে লিখেছেন এবং মৌখিকভাবেও প্রচলিত একটা গল্প। স্বাশুরীর প্রতি বউদের রুঢ় আচরণ, সামান্য বিষয়েও হিংসে। সামাজিক কারণে অনেক সময় মুখে কিছু বলেনা, রাতে স্বামীর সাথে করে খুনসুটি, যা একসময় ঝগড়ায় রূপ নেয়। অশান্তিতে বিষিয়ে তোলে। ছেলে তার মায়ের জন্য শাড়ি কেনেন স্ত্রীর জন্যও এনেছেন কিন্তু প্রথমত তা না বলে বলেন মায়ের জন্য শাড়ি এনেছি, তুমি খুলে দেখে নাও। পছন্দ না হলে পাল্টিয়ে আনবো। কথা শুনে স্ত্রীর মুড আফ! বুঝতে পেরে তখন বলে – “পেকেটে তিনটা শাড়ি আছে, দু’টা তোমার একটা মার। এই কথা শোনার পর রাহেলার মনটা চনমন করে ওঠে।”
রাতে এসে যখন জানতে পারে তিনটা শাড়িই স্ত্রীর পছন্দ এবং মাকে একটাও দিবে না তখন স্বামী নামক মানুষটির মাথা গরম না করে স্থির থাকতে পারে না। তবুও ভদ্রতার মাথা খেয়ে দু’চার কথায় শুয়ে পড়ে। অভিমানে স্ত্রী বাবার বাড়িতে চলে যায়, সেখানে মায়ের মুখে ভাইয়ের বৌ কর্তৃক লাঞ্চিত হবার বা এমনই শাড়ি বিষয়ক কথা শোনার পর নিজের বুকের ভেতর ছ্যাঁৎ করে ওঠে।
আমাদের সংসারেও স্ত্রীদের বুকে এমন ছ্যাঁৎ করে সকল অশান্তি দূরহোক। লেখকের এহেন গল্পের মধ্য থেকে জেগে উঠুক মানবতা। তবে আলোচনার চেয়ে গল্পগুলো রসে টইটুম্বর বেশি।
===///===

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here