ঠাকুরগাঁও জেলার স্মৃতিসৌধ অপরাজেয়’ ৭১ : জন্মকথাথা। ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান

0
153

ঠাকুরগাঁও জেলার স্মৃতিসৌধ অপরাজেয়’ ৭১ : জন্মকথা

ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান

পারিবারিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আজীবন স্বপ্ন দেখেছি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক, পারষ্পরিক ভেদাভেদ মুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখতে। যে কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করার পরও ফিরে আসি আমাদের এই প্রিয় ছোট্ট, শান্ত, মফ:স্বল শহরে। বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের ছোট্ট এই জেলাটি নানা কারণে ঐতিহ্য মণ্ডিত। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে, তেভাগা আন্দোলনে এই জনপদের রয়েছে গৌরবময় অধ্যায়। মহান মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গন, কুলিক আর নাগরের জল রাঙা হয়েছে দেশ প্রেমিক জনতার বুকের তাজা রক্তে। খুনিয়াদিঘী আর জাঠিভাঙ্গার গণহত্যা এখনো আমাদের বেদনা আর রোদন একই সাথে গৌরবগাঁথা। কিশোর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সালাহউদ্দিনের বাঘের খাঁচায় দু:সাহসিকভাবে আত্মদান, শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক গোলাম মোস্তফাসহ অসংখ্য জানা-অজানা শহীদ মুক্তিযোদ্ধার জীবনদান আমাদের প্রিয় এই জনপদকে এক উচ্চতর মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।
ঠাকুরগাঁও জেলায় মুক্তিযুদ্ধের কোন স্মৃতিসৌধ না থাকার অপূর্ণতা প্রায়শ:ই মনে গভীর বেদনার জন্ম দিতো। আমি এবং আমার সহধর্মীনি সেলিমা আখতার দু’জনেই এ-নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছি। আমরা দু’জনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকল্যাণ বিষয়ে সহপাঠি ছিলাম। উভয়েই প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলাম। এই জেলায় স্বাধীনতার নাম ফলক ছিল এবং আজও বিদ্যমান, মুক্তিযুদ্ধে প্রথম শহীদ মোহাম্মদ আলীর কবর, কিশোর নরেশ চৌহানের সমাধী ছিল কিন্তু আমরা স্বপ্ন দেখতাম একটি আকর্ষণীয় স্মৃতি সৌধের। জয়দেবপুর চৌরাস্তার মত যেখানে শিশু তার পিতার কাছে জানতে চাইবে স্মৃতি সৌধটি কেন এবং জানবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। এ বিষয়টি মাথায় রেখে আমরা প্রথমত আমাদের ইএসডিও ক্যাম্পাসে ২০১০ সালে নির্মাণ করি জেলার প্রথম Figure ভাস্কর্য ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, তেভাগা আর মহান মুক্তিযুদ্ধে ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর অবদানকে বিবেচনায় এনে সাঁওতাল কিষাণ-কিষাণীর মিলিত সংগ্রাম। ৭ফিট উচ্চতার ভাস্কর্যটি দাঁড়িয়ে আছে ২.৫ফিট ভূমি উচ্চতায় ৬ফিট বেদীর উপরে এবং বেদীর তিনদিকে টেরাকোটার কাজে বাংলাদেশের উক্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সামাজিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক জীবন। বেদীটি ৩৬ ফিট গোলাকার মুক্ত মঞ্চের উপর স্থাপিত। ভাস্কর হিসেবে যুক্ত থাকেন আমাদের এ অঞ্চলের গুনী তরুণ শিল্পী স্বাধীন চৌধুরী।
আমাদের স্বপ্ন ছিল ইএসডিও ক্যাম্পাসে নয় বরং জেলায় মূল স্মৃতিসৌধ নির্মিত হোক – প্রয়োজনে এর সমূদয় ব্যয়ভার বহন করবে আমাদের সংগঠন ইএসডিও। একদিন ইএসডিও ক্যাম্পাস পরিদর্শনে আসেন তৎকালীন ঠাকুরগাঁও জেলার জেলা প্রশাসক জনাব মো: শহীদুজ্জামান (বর্তমানে অতিরিক্ত সচিব, ধর্ম মন্ত্রণালয়)। তিনি ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’ দেখে মুগ্ধ হন। তিনি নিজেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অনেকগুলো উদ্যোগ নিয়ে কাজ করেছিলেন তখন বিশেষত: জেলায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণের বিষয়ে। তাঁর সাথে জেলা শহরে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সৌধ নির্মাণ নিয়ে আলোচনা হতেই তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাপক উৎসাহ প্রদান করেন। আমরা উভয়ে মিলে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, আর্টগ্যালারী পেরিয়ে নতুন ও পুরনো ব্রিজের মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটি হবে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের জন্য যথার্থ স্থান। বিষয়টি নিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যেই আমরা ঠাকুরগাঁও জেলার কৃতি সন্তান, তৎকালীন পানি সম্পদ মন্ত্রী ও এমপি রমেশ চন্দ্র সেন মহোদয়ের (বর্তমানে সাংসদ ও প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ) সাথে আলোচনায় বসি। তিনি নিজেও ইএসডিও’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও ইএসডিও নির্বাহী পরিষদের সদস্য। তিনি সাথে সাথে এ বিষয়ে সম্মতি ও ব্যাপক সমর্থন ও উৎসাহ যোগান। তিনি প্রস্তাবিত জমিটির মাটি/বালি ভরাটের ব্যবস্থা করবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়।
জেলা প্রশাসক জনাব শহীদুজ্জামান সাহেবের সাথে প্রায় এক মাস ধরে প্রায় প্রতিদিন আমরা স্মৃতিসৌধটির নকশা নিয়ে কাজ করেছি। অপরাজেয়’ ৭১-এর মূল নকশাটি করার দায়িত্ব দিয়েছিলাম আমরা ইএসডিও’র তৎকালীন জোনাল ম্যানেজার উদয় বাবুর কাকাতো ভাই দিনাজপুর জেলা স্কুলের ড্রয়িং শিক্ষক হিমাংশু রায়কে। তিনি আমাদেরকে পাঁচটি ডিজাইন এঁকে দিয়েছিলেন। যার মধ্যে থেকে বর্তমান ডিজাইনটি আমাদের পছন্দ হয়। আমরা অবশ্য সেই ডিজাইনটিতে বেশ কিছু বিষয় যুক্ত করে আবারও উপস্থাপনের পরামর্শ দিই। যার মধ্যে ছিল –
ক. স্মৃতি সৌধটি হবে ৭১ফিট। যেহেতু মহান মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে ১৯৭১ সালে।
খ. স্মৃতি সৌধটিতে পাঁচটি ৭১ ফিট পিলার থাকবে। যেহেতু ঠাকুরগাঁও জেলায় পাঁচটি উপজেলা।
গ. স্মৃতি সৌধের মূল বেদীর উচ্চতা হবে ভূমি থেকে ৯ফিট। যেহেতু ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে।
ঘ. স্মৃতিসৌধের রাইফেল-বেয়নেটটির দৈর্ঘ্য হবে ২৬ফিট। যেহেতু ২৬ মার্চে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে।
ঙ. বেয়নেটের সাথে থাকবে ৫টি শান্তির কপোত পায়রা – যা ঠাকুরগাঁও জেলার পাঁচটি উপজেলার প্রতিনিধিত্ব করবে। খুবই দু:খের বিষয় মুল ড্রয়িংটি যাঁকে দিয়ে আমরা করিয়েছিলাম সেই হিমাংশু বাবুর কথা খুব অল্প সময়েই সবাই ভুলে গিয়েছি। এমনকি বিভিন্ন প্রকাশনায় এই নামটি নেই। প্রকৃত বিষয়টি হচ্ছে তাঁর আঁকা ড্রয়িংয়ের উপর ভিত্তি করে তৎকালীন ঠাকুরগাঁও জেলার এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী মো: শরিফুল ইসলাম স্ট্রাকচারাল ডিজাইন ও কস্ট-এষ্টিমেটটি করেন এবং যেহেতু স্বাধীন চৌধুরীকে ইতিপূর্বে ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে’ নির্মাণে ভাস্কর হিসেবে আমরা দায়িত্ব দিয়েছিলাম সে জন্য ৭১ফিট পিলারের উপরে ২৬ ফিট স্টেইনলেস স্টিলের রাইফেল -বেয়নেট ও কপোতগুলো নির্মাণের দায়িত্ব স্বাধীন চৌধুরীকে দেয়া হয়।
যা হোক, স্ট্রাকচারাল ডিজাইন ও কস্ট-এষ্টিমেট হওয়ার পর দেখা যায় সব মিলিয়ে প্রায় চল্লিশ লক্ষ টাকা ব্যয় হবে (যদিও পরে ব্যয় আরেকটু বেড়ে তেতাশ্লিশ লক্ষ) টাকা হয়েছিল। ইএসডিও সমস্ত ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং আমার স্কুল জীবনের সহপাঠি নূর হোসেনকে ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দিই। কারিগরী সহায়তার জন্য এলজিইডি’র পাশাপাশি বোদা পৌরসভার প্রকৌশলী শাহরিয়ারকে দায়িত্ব প্রদান করি।
নামকরণের ব্যপারে আমরা মোটামোটি পাঁচটি নাম ঠিক করেছিলাম। বিজয়’ ৭১, মুক্তিযুদ্ধে ঠাকুরগাঁও, চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ, সংগ্রাম’ ৭১ এবং অপরাজেয়’ ৭১। অপরাজেয়’ ৭১ নামটি জেলা প্রশাসক জনাব শহীদুজ্জামান সাহেবই প্রস্তাব করেন এবং আমরা সবাই মিলে তা সমর্থন করি। নামকরণের সেই প্রাথমিক সভায় জেলা প্রশাসক জনাব শহীদুজ্জামান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো: শাহআলম, এনডিসি মো: আসলাম মোল্লা, জেলা আওয়ামীলীগের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এ্যাডভোকেট মো: মকবুল হোসেন বাবু, জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ সাদেক কুরাইশী, ঠাকুরগাঁও প্রেস ক্লাবের তৎকালীন সভাপতি আখতার হোসেন রাজা, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, ঠাকুরগাঁও’র কমান্ডার সদ্য প্রয়াত জিতেন্দ্রনাথ রায়, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবুর রহমান খোকন ভাই, আমি ছাড়াও ইএসডিও’র শামীম হোসেন ও আবুল মনসুর সরকার উপস্থিত ছিলেন।
সিদ্ধান্ত হয় ২৬শে মার্চ, ২০১১ তে অপরাজেয়’ ৭১-এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হবে। সে অনুযায়ী অনাড়ম্বর কিন্তু হৃদয়স্পর্শী এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন জনাব রমেশ চন্দ্র সেন এমপি মহোদয়। সকল মুক্তিযোদ্ধাগণ, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের মানুষের সম্মিলনে সেদিন টাঙ্গনের পার ছিল মুখরিত। শুরু হলো আমাদের স্বপ্ন পূরণের অভিযাত্রা। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিনই সিদ্ধান্ত হয় ২৫শে মার্চ, ২০১২ তারিখে আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য প্রদানের মাধ্যমে ঠাকুরগাঁও জেলার একমাত্র স্মৃতিসৌধ অপরাজেয়’৭১-এর উদ্বোধন করা হবে।
এই সময়ে প্রায় প্রতিদিন জেলা প্রশাসক শহীদুজ্জামান সাহেব, আমি ও আমার সহধর্মীনি সেলিমা আখতার, আওয়ামীলীগের খোকন ভাই, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার স্বর্গীয় জিতেন দা সহ আমরা সবাই অপরাজেয় ’৭১ নির্মাণের কাজ তদারক করেছি। শ্রম দিয়েছে ঠিকাদার নূর হোসেন, প্রকৌশলী শাহরিয়ার এবং নির্মাণ শ্রমিকরা। আমাদের স্বপ্ন পূরণের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছিলাম আমরা।
খুবই মনে পড়ছে অপরাজেয়’ ৭১ উদ্বোধনের আগের দিনের কথা। স্বাধীন চৌধুরী নির্ধারিত সময়ে স্টেইনলেস ষ্টিলের রাইফেল-বেয়নেট আর কপোতগুলো দিতে পারেনি। এসে পৌঁছোয় উদ্বোধনের দু’দিন আগে একেবারে সন্ধ্যাবেলা, পরদিন সকাল থেকে ২৬ ফিট দৈর্ঘ্যরে অনেক ভারী এই রাইফেল-বেয়নেটটি তুলতে হবে ৭১ফিট উঁচুতে। ব্যাপক গবেষণা, ব্যাপক প্রচেষ্টা, ৭১ফিট উঁচুতে কয়েকজন মিস্ত্রী। মোটা মোটা দড়ি লাগানো হলো। এতো ভারী যে ওঠানো খুবই কষ্ট ছিল। শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই বিশেষত: আমি জীতেন দা সহ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃবৃন্দ, খোকন ভাই, আমার বড় ভাই আখতারুজ্জামান সাবু, ইএসডিও’র কর্মকর্তাবৃন্দ এমনকি স্থানীয় পথচারীরাও যুক্ত হয় এই চেষ্টার সাথে। পুরোপুরি প্রস্তুত তখন অপরাজেয়’ ৭১। অবশেষে ২৫শে মার্চ, ২০১২ তে আমাদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়। ঠাকুরগাঁও জেলার প্রথম স্মৃতিসৌধ অপরাজেয়’ ৭১ উদ্বোধন করেন তৎকালীন পানি সম্পদ মন্ত্রী ও সাংসদ (বর্তমান সাংসদ ও প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ) বাবু রমেশ চন্দ্র সেন।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here