ছিটমহলের গ ল্প। নেকড়ে নিধন পর্ব-১। আফরোজা পারভীন রিকা

0
704

ছিলমহলের গ ল্প

নেকড়ে নিধন পর্ব-১

আফরোজা পারভীন রিকা

ভরা আষাঢ়। করতোয়ার মৃদুমন্দরাতে ছলাৎ ছলাৎ শব্দে ডিঙ্গি পেরোয়, পেরোয় দুটো ধূর্ত চোখ। নেকড়েটা জ্বালিয়ে গেল মালতীর সারা দেহ।

বাবা বলল – কিরে মা? সিং মাছ যে, হাত দিলি? হাতে কাঁটা আটকে রয়েছে, টের পাচ্ছিস না? এতে ভীষণ জ্বর হয়।

: হ্যাঁ সত্যিতো বাবা, ব্যথা বটে, মনে মনে ভাবছে মালতী, এ ভীষণ ব্যথা! হাতে নয়, দুনিয়া জুড়ে ব্যথা বাবা।

এই জল, করতোয়ায় নীলে ভেসেছে। সবুজের সান্নিধ্যে, আদিম জলের তলে, আত্মহারা, শারদীয় উচ্ছ্বাসে-রংধনু খুঁজেছিল মেয়েটি মেঘেদের দেশে। আজ করতোয়ার তলে মনে হয়, কাঠ কয়লার ¯্রােত। প্রান্তরের সবুজ সায়রে ডুব দিয়ে যে ঘাসফুল একদিন খোঁপায় গুঁজেছিল মালতী। সেদিন সে আকাশের রাণী ছিল। সেই ফুল, পুষ্প আহা সেই ঘাস, জলজ গুল্ম, লতিকা , সবকিছু চলে গেছে মৃতদের দেশে। এখন এইখানে আকাশতলে যার হৃদয় নিয়ত ছিন্নভিন্ন হয়, সেই ব্যথার কাছে সিংয়ের কামড় কী হতে পারে? তবুও মালতী, কষ্ঠনদী আড়াল করে বলে Ñ আর কতক্ষণ মাছ ধরবে বাবা? সন্ধ্যে হয়ে এল।: ও হ্যা চল্ চল্ … সন্ধ্যবাতি দিতে হবে যে।

: সন্ধ্যাবাতি? আপন মনে হাসে মালতী, সন্ধ্যাবাতী কার জন্য?

: ভগবান তুষ্ট হলে বাড়ির মঙ্গল হয়।

: কোন মঙ্গলের আশায় এত বছর তুষ্ট করলে বাবা? যে মাটিকে আঁকড়ে ধরে  দাদাঠাকুর এই ছিটমহল ছাড়েনি, সে মাটি তোমায় মনে রাখেনি। ঐ নেকড়ের দল রাম শঙ্কর আর তার ছেলেরা, মাটি কেড়ে নিয়েছে, শান্তিতে বাস করতে দেয়নি। মা’র মুখটা আবছা মনে পড়ে, দেহটা মাটিতে শোয়ানো। যে সূদীর্ঘ গ্রীবায় রুদ্রাক্ষের মালা শোভা পেত, সেখানে সেঁটে থাকা লাল মালাটা ফাঁসির দড়ির।

সেদিনের মালতীর জিজ্ঞাসা বাতাসে ভাসতে ভাসতে  বহুদূরে অতিক্রম করেছিল।

: মা এত নিষ্ঠুর কেন বাবা ?

বাবার ভেঙ্গে পড়া শব্দগুলো সঠিক বাক্য হচ্ছিল না, আধো উচ্চারণে বলেছিল Ñ তোর মাকে বাঁচাতে পারলামনা রে।

সেদিন বোঝেনি মালতী, আজ বোঝে ছিটমহলের নিয়ম-রীতি, অপশক্তির কালো  থাবা, যাদের কাছে নতজানু হতে হয়। নতজানু হয়েছিল মালতির বাবা, মেয়েটি জানতো না কী ত্রুটি ছিল মায়ের, কী অপরাধ করেছে সে নিজে।

তলপেটে হাত রাখে মালতী, হৃদস্পন্দন শোনার চেষ্টা করে। ভাবে…. কয়েকটা কিল ঘুষিতে জব্দ করবে নেকড়ের বাচ্চাটাকে। শক্ত মুঠো নেতিয়ে পড়ে, হাত বুলায় তলপেটে। এই সতের বছর বয়সে প্রাগৈতিহাসিক অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী এই নারী রহস্যের সন্ধান করে। একই অঙ্গে দুই মানবের অবস্থানতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা চালায়। যন্ত্রণায় কাতর হয় মালতী, এভাবে চায়নি সে। যে অভিযাত্রিকের হাত ধরে পাড়ি দিতে চেয়েছিল স্বাপ্নিক ভূবনে, সেই সে রতন পাল, বন্দি হয়েছিল পারিবারিক কারাগারে।

সেদিন মালতির বাড়িয়ে দেয়া হাতটা খামচে ধরেছিল ওঁৎপাতা নেকড়ে হরিশঙ্কর। আলো হারানো পতিত উল্কাপি-ের মতো মালতীর চোখে অন্ধকার নেমেছিল । শত-সহস্্র ধারালো নখের আঁচড়ে ছিন্নভিন্ন মালতী, বিষাদ পীড়িত, ঝিমিয়ে পড়া রক্তজবার মতো শেষ শক্তিটুকু নিংড়িয়ে চীৎকার করেছিল। হাওয়ায় ভাসতে থাকা নরম সকরুণ চীৎকার কেউ শোনেনি, কারণ এ আক্রমণের চেচামেচী ছিটমহলবাসীর প্রতিদিনের অভ্যাসের ব্যাপার।

মালতী কী মরতে চেয়েছিল? নেকড়ের মুখে বিজয়ের হাসিতে মায়ের মরা মুখটার স্মৃতি  ভেসেছিল হৃদয়ে। পোড়াকাঠ মালতী মরতে পারেনি। বিমূঢ় বিহ্বল মেয়েটি দৌঁড়ে পালাতে চেয়েছিল সেদিন। আজও মনে হয়, পায়ে ভারি কিছু বেঁধে দেয়া হয়েছে,  আর্তচীৎকারে গুমরে উঠছে মন, তবু পা ফেলতে পারছেনা সে…

: কিরে মা সন্ধ্যেবাতি?

: সন্ধ্যেবাতি দিচ্ছি বাবা, বাতি জ্বললে অন্ধকার ঘুঁচবে কি? বিড়বিড় করে মালতী।

: শত বছরের শতকোটি দিন পেরিয়ে আগামীকাল আমরা নতুন বাঙলার বাংলাদেশী হব মা!

: নতুন বাঙলায় অন্ধকার থাকবেনা কি?

: কেন মা, হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন মা?।

: হঠাৎই মনে হল।

¯স্নান সারে মালতী, মহূর্ত ক্ষয়ে যায়, নামে অন্ধকার। ঘন আঁধারে আশা আর আতঙ্ক দোল খায়। আজ কিছু ঘটবে। ক্ষণস্থায়ী তৃপ্তিময় আসক্তি নয়, চিরন্তন মোহ নয়, নির্ঘুম মালতী আজ নির্মাণ করবে কাহিনীর সম্ভাব্য নিধন পর্ব।

উত্তেজনায় হৃদপিণ্ডে রক্ত আগুন হয় তার। সেই আগুন ঝরে পড়ে টুপ! টুপ!টুপ! …একফোঁটা,…দু’ফোঁটা…কয়েকফোঁটা…অসংখ্যফোঁটা। ফোঁটায় ফোঁটায় মিলিত হয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে করতোয়ায় মেশে।

মালতী দেখে করতোয়ার কয়লার আগুন জ্বলে উঠে। মুঠো হাতে ধারালো অস্ত্রটা নদীর আগুনে নিক্ষেপ করে।

মহীষাসুর নিধনে বুনো মেঘেরা গর্জন করে ঢাকঢোল পেটায়। নারী হরণকারী রসিক নেকড়ের মৃত্যুতে নাকি জয়িতার জয়ে আকাশ ঝরে পড়ে আহ্লাদে! করতোয়া পূণর্জন্ম নেয়।

মালতী সুরা পান করে, ক্ষণকাল পর সূর্য উঠবে। নতুন সূযর্ !

তলপেটে হাত বুলায়, নতুন বাঙলায় পৃথিবীকে নাড়িয়ে একদিন একটি কান্না বাজবে! চোখের ভেতর আশ্চর্য এক জগৎ নির্মাণ করে মালতী, একটি কান্না হয়ত আগামী সময়কে শক্তিশালী করবে… #

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here