ছিটমহল। গল্প – ছিটগ্রস্থ: আউয়াল আহমদ। A Short Story by Aowal Ahmad.

0
1025

আউয়াল আহমদ

ছিটগ্রস্থ

মধ্যাহ্ন-উত্তর রোদ ভরতনাট্যম বা বালিকাভঙ্গিতে তাকালে সারি সারি শালগজারির মাথায় ইতস্তত জমে থাকা ক্রমবর্ধিষ্ণু, ক্রমক্ষয়িষ্ণু কুয়াশামেঘকুঞ্জকে বদেশ্বরী গড় বরাবর প্রাক অগ্রহায়ণ উত্তরাকাশে হঠাৎ গোধুলি আলোর ঝলকানিতে জেগে ওঠা কাঞ্চনজঙ্ঘার অংশবিশেষ বলে ভ্রম হতে পারে, হয়ই তো, কখনো কখনো। আমন নাড়ার আগুনে হাত, পা ও পাছা সেঁকার পরম্পরা ও বিচিত্র মুদ্রায়, তবু, ইষদুষ্ণ রোদের অপেক্ষায় কুয়াশাভেদি দৃষ্টি চালায়, প্রতিদিন, শালবাড়ি ছিটের মানুষ, অভ্যাসবশতঃ। শালশিরি, শালবাহান, ঝলইশালশিরি, শালবাড়ি নামের মজেজা বৃক্ষ, প্রকৃতি বা ইতিহাস সন্ধানীর গবেষণার উপাদেয় খোরাক হতে হতে, ক্রমশ উজাড় হতে থাকলেও সাত দশকের পরিচয়বিহীন মানুষের নৃ অথবা যাপিত জীবনের অনুষঙ্গ হতে পারেনি, অজ্ঞাত কারণে।

কায় বারে ?
আর কায় ? মুহে?
অ…বুধারুর বাপ?
নাহায় বারে। মুই। ফাকতালের বাপ।
অহ! আকালু ? দ্যাখায় না পাও, বা !
পিতৃ/মাতৃকুলের লেজুড়সমেত/বিবর্জিত একটা নাম যে ছিল, থাকতে পারে, ভুলে যায়, ভুলে যেতে চায়, হয়তো, তারা। উত্তর প্রজন্মের পরিচয়টাই তখন প্রকট হয়ে ওঠে, নিজের অজান্তে, কাঞ্চনজঙ্ঘা দশর্নের মতো, ভ্রম অথবা সম্ভাবনা নিয়ে। বুধারু, আকালু, ফাকতাল- এসবও এদের প্রকৃত নাম কিনা, তদন্তের অবকাশই রাখেনা। কেননা মহম্মদ ইউনুছ, খগেন্দ্রনাথ বাড়ৈ বা আব্দুর রহিম প্রমাণের আপাত কোন দলিল- দস্তাবেজ, সাক্ষী-সবুদ না থাকায় রিপোর্ট ফাইনাল। সময়/ঘটনাবিজড়িত, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসম্বলিত কিংবা নিতান্তই অকারণে জুড়ে যাওয়া এই সকল সামাজিক/অসামাজিক নামেই আমরা সম্বোধন করতে থাকবো আমাদের চরিত্রগুলোকে, জন্ম নিবন্ধন সনদ/নাগরিকত্ব সার্টিফিকেট/জাতীয় পরিচয়পত্র ইস্যু হওয়ার আগ পর্যন্ত।
আর, কী দেখিবো? ক্যাংকরে দেখিব? অঘন মাসোতে যে কুহা পড়িবা ধইচে! চোখো ত কম দেখেচু আইজকাইল। আর, বয়সো তো কম হইলনি! এ্যালাতেই যে জাড় নামিবা ধইল, পোষ মাসটা বুঝি আর টিকিবা না হাও। এখখান কাড, কম্বল, ইলিপের টিন দ্যাখে যাবা পানো নাই। লেপটিন, টিপোল ত দুরের কাথা।

এইসব গল্প বা কথোপকথন বড়োবেশি নৈমিত্তিক, পৌনঃপুনিক তো বটেই, এবং কপিরাইটবিহীন। ধামের গান বা পুতুল নাচের বন্দনা সংগীতের মতো, শালবাড়ির পথে প্রান্তরে, একই গান যেন বেজে চলে, সুরে বেসুরে, ইচ্ছেমাফিক, কথার পর কথা বসিয়ে।

তুই আছিস খালি তোর লেপটিন আর কম্বল লেহেনে! খবর পাইচি, না নাই? তোর কিবা কহচে, নরেন মদি ত রাজি হোই গেইচে। ছিট বিনিময় এলা টাইমের ব্যাপার।

সর্বশেষ সংযোজিত সংলাপের ঠিক কতগুলো শব্দ বুড়োর কর্ণকুহরে প্রবেশ করে, শব্দগুলোর অর্থ সে আবিষ্কার করতে পারে কিনা, বোঝা না গেলেও বহুল উচ্চারিত ‘বিনিময়’ শব্দটি তাকে খুব বেশি সচকিত করতে পারে বলে মনে হয় না, অন্তত ছানিপড়া চোখের নিশ্চল চাহনিতে অবিশ্বাসের আস্তরণ ভেদ করতে পারেনা যে, ১০০% নিশ্চিত। কেননা কোনপ্রকার সনদ/প্রমাণপত্রবিহীন এই আত্মস্বীকৃত কিন্তু প্রচারবিমুখ মুক্তিযোদ্ধা, যোগীনের বাপ, কোন বিশ্বাসের কাছেই বিশ্বস্ত হতে পারেননি, কোনদিন। ‘ছিটমহলবাসী’ ছাড়া আর কোন পরিচয়পত্র নেই, তার।

এই সংলাপের পরের ঘটনাপ্রবাহ অবশ্য অবিশ্বাসের মতোই সত্য, সাবলীল, ৬৮ বছরের বঞ্চনা ভুলিয়ে দেয়ার মতো গতিসর্বস্ব। মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি নবায়ন অথবা রিমেইক/রিমিক্স সম্পাদন, ভারত-বাংলাদেশ যৌথ হেড কাউন্টিং, ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণে অপসন প্রদান, অপসন প্রত্যাহার, পুনরায় অপসন প্রদান, একযোগে ১১১টি ছিটমহলে লালসবুজ পতাকা উত্তোলন, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াগুলোর ব্রেকিং নিউজ, সরাসরি সম্প্রচারিত বিশেষ/অশেষ রিপোর্ট, জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকগুলোর বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ-সব, সমস্তকিছুই যেন ফেইসবুকের মতো, লাইভ ইতিহাস।

২৬ নভেম্বর ২০১৫, পুশইন/পুশব্যাক নয়, চুক্তিসম্মত মানুষ-বিনিময়ের সূচনালগ্নে, ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণে অপসন প্রদানকারীদের জড়ো করা হলে, কাজলদীঘি-কালিয়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের মাঠে, একগাদা বাক্স-পেটরার পাশে সাংবাদিক/মিডিয়াকর্মীরা আবিষ্কার করে হাঁটু গেঁড়ে প্রার্থনার ভঙ্গিতে বসে, মাটির দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা এক অশীতিপর বৃদ্ধ, যোগীনের বাপকে। মুহুর্মুহু ক্লিক, ক্যামেরা, এ্যাকশন প্রার্থনা ভঙ্গ করে, যেন। সমবেত মন্ত্রপাঠের মতো প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হতে মাটিতে দু’হাত নেমে আসে, আজীবন পরিচয় সন্ধানী বৃদ্ধের। কলের লাঙ্গলের মতো দশ আঙুলে আঁচড় দিতে থাকেন জন্মভূমির শরীরে, ক্রমাগত।

কেনে যাছেন বারে? স্থানীয় সাংবাদিক শুরু করেন।
বৃদ্ধ নিরুত্তর।
আপনার পরিবারের সবাই কি একসাথে যাচ্ছেন? কতজন আপনারা? টিভি রিপোর্টার।
বৃদ্ধ নিরুত্তর।
ছিটমহলগুলো তো এখন বাংলাদেশের ভূ-খন্ড। এখন থেকে আপনারা বাংলাদেশের নাগরিক। তাহলে বাপ-দাদার ভিটে ছেড়ে যাচ্ছেন কেন? জাতীয় দৈনিকের প্রতিনিধি।
বৃদ্ধ নিরুত্তর।
আপনার কোন আত্মীয়-স্বজন আছেন, ইন্ডিয়ায়?
বৃদ্ধ নিরুত্তর।
এই মুহূর্তে আপনার অনুভূতি কি?
বৃদ্ধ নিরুত্তর।
ছিটে আপনার জমি-জমা ছিল কিছু?
বৃদ্ধ নিরুত্তর।
ইন্ডিয়ায় আপনার, আপনাদের জীবন-জীবিকার কি ব্যবস্থা করা হয়েছে, খোঁজ-খবর নিছেন?
বৃদ্ধ নিরুত্তর।
আমি শুনেছি আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা……

পুলিশের হুইসেল বেজে ওঠে, প্রশ্ন শেষ করার আগেই, উত্তর যথারীতি নিরুত্তর থেকে যাবে, জানা, যদিও। হ্যান্ড মাইকে প্রশাসনের কর্মকর্তার তাগিদ আসে, হুড়োহুড়ো পড়ে যায়, মুহূর্তের মধ্যে।
আপনাদের মালামাল সব ট্রাকে উঠে গেছে। আপনারা আপনাদের সাময়িক পরিচয়পত্র গলায় ঝুলিয়ে বাসে উঠে পড়েন। সাংবাদিক ভাইরা, আপনারা এখন আমাদেরকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করুন।

পাঁজাকোলা করে বাসে তুলতে হয়, যোগীনের বাপকে, ডানহাতের তর্জনী তখনো ভূমি নির্দেশক।

ফ্লাশব্যাকে সাত দশকের প্রামাণ্যচিত্র, ফ্লাশব্যাকে নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নব্যাংক।
—///—

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here