‘চালচিত্রে’র ৬ লেখকের বই

0
611

‘চালচিত্রে’র ৬ লেখকের বই

রাজা সহিদুল আসলাম

একুশে গ্রন্থ মেলা ২০১৮-তে প্রকাশ হয়েছে ‘চালচিত্রে’র ৬ জন লেখকের ৬ টি বই। লেখকরা হলেন – জিয়াউদ্দীন শিহাব, শামীমফারুক, আজমত রানা, আউয়াল আহমদ, আশরাফুল আযম খান এবং রাজা সহিদুল আসলাম।

জিয়াউদ্দীন শিহাব

ব্যতিক্রম ধারার লেখক জিয়াউদ্দীন শিহাব। একশ’ ভাগ প্রচারবিমুখ এই লেখক নিভৃতে এবং ধীর গতিতে লিখে চলেছেন গল্প। লেখা ছাপানো বা বই প্রকাশ করা – এসব ব্যপারে তার কোন মাথা ব্যথা নেই। লিখছেন নিজের মত করে। তার প্রথম গল্প – তিন স্বর্ণ শ্বাপদের রাত, হাতে লেখা, প্রথম পড়েছিলেন রূপম সম্পাদক আন্ওয়ার আহমদ। তারপর পিয়াল খন্দকার। তারপর আমরা। সবাই হতবাক। নতুন এক গল্প। বিষয়, শব্দ-বাক্য, উপস্থাপন – এক নতুন পথের দিশা। ‘তিন স্বর্ণ শ্বাপদের রাত’ গল্পটি জিয়াদ্দীন শিহাবকে অল্প সময়ের মধ্যে পরিচিত করে তোলে। বিশেষ করে যারা লেখালেখি করেন তাদের মধ্যে একটা অবস্থান তৈরি হয়ে যায়। এরপর ধীরে ধীরে লিখলেন তিনি আরও বেশ কিছু গল্প। অধিকাংশই ছাপা হয় ‘চালচিত্রে’। জিয়াউদ্দীন শিহাব-এর গল্প সম্পর্কে বলা কঠিন কাজ। কুহক আঁধার নাকি ঘন পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে জোসনার খেলা নাকি মনজগতের অলিগলিতে দাপিয়ে বেড়ানো কিশোর নাকি অন্য কিছু, অথবা ধারণার দেয়াল ঘেষে লেপ্টে থাকা আলো আঁধারী মনুষ্য কথারূপ… তবে অন্যের মুখে লবণ না চেখে পাঠকের উচিৎ সরাসরি তার গল্প পড়া। তাঁর বইয়ের নামটার কথা ভেবে দেখেন – এটা তার প্রথম বই – নাম রেখেছেন – ‘জিয়াউদ্দীন শিহাবের মৃত্যুতে’। তাহলে বুঝুন গল্পগুলো কেমন হবে। বইয়ের ভেতরের গল্পগুলো খুব ছোট ছোট, এক পৃষ্ঠা, দুই পৃষ্ঠা। পড়ার পর মনে হয়, এ তো ছোট নয়, অনেক বড়। সেই ঠাকুরগাঁওয়ের আঞ্চলিক প্রবচন মনে পড়ছে – ‘নদীক্ না কহিস ছোটো’।… তাই জিয়াউদ্দীন শিহাব-এর ছোট গল্পকে বোলো না ছোটো। যাঁরা গল্প লেখেন, যাঁরা ভাল গল্প পড়তে চান – তাঁরা এই গল্প না পড়লে কি চলে?

 

শামীমফারুক

প্রকাশ হয়েছে শামীমফারুক-এর কবিতার বই ‘কবিতার হাইওয়ে’। এটি তাঁর অনুবাদ কর্ম। তিনটি দেশের কবিতা এখানে সংকলিত হয়েছে। শ্রীলংকা, জিম্বাবুয়ে এবং নেপালের অনেকগুলো কবিতা। শামীমফারুকের বিশেষত্ব হচ্ছে তিনি এই তিনটি দেশে গিয়েছেন। নিজের চোখে অবলোকন করেছেন সেখানকার সংস্কৃতি, অর্থনীতি, জীবনাচরণ। তাই অনুবাদগুলো হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত। অনেকের অনুবাদ পড়লে যেমন মনে হয় শুকনা কাঠ। এই অনুবাদ তা নয়। আমাদের বাংলাদেশে শ্রীলংকা, জিম্বাবুয়ে এবং নেপালের কবিতা চোখে পড়েনা। বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে তাই এই বই গুরুত্বহব মনে হবে। এর অধিকাংশ কবিতা ছাপা হয়েছে ‘চালচিত্রে’। তিন দেশের কবিতা তিন স্বাদের। এটাই স্বাভাবিক। সবচেয়ে বড় কথা তিনদেশের কবিতা এক মলাটের ভেতর পাওয়া যাচ্ছে।

 

আউয়াল আহমদ

আউয়াল আহমদ শুরু থেকে ‘চালচিত্রে’র লেখক। যখন সে অষ্টম শেণিতে পড়ে, তখন স্কুল ম্যাগাজিনে তার একটা গল্প ছাপা হয়েছিল। এখনও মনে আছে সেই গল্পটার নাম – টু-লেট। বেশ ভাল একটা গল্প। তার শিক্ষককে বলেছিরাম, যিনি ওই ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছিলেন, মো. আখতারুজ্জামান, তাকে বলেছিলাম – গল্পটা খুব ভাল লিখেছে, লেখালেখি চালিয়ে গেলে লেখক হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আজকাল ছেলেমেয়েরা লেখক হতে চায় না, শিক্ষক হতে চায়না, ডাক্তার ইন্জিনিয়ার হতে চায়। আর যারা পড়ালেখা থেকে ছিটকে পড়ে তারা অল্প সময়ে ধনীলোক হতে চায়, অনেক টাকার মালিক হতে চায়, লেখক হতে চায়না।
টু-লেট, সেটা প্রায় ২০ বছর আগের কথা। বা তারও বেশি। সত্যি সত্যি আউয়াল আহমদ-এর কবিতার বই ‘সদ্য পুরাণ রূপকথা’ প্রকাশ হলো। এই আনন্দ আউয়ালের সাথে সাথে আমারও।
আউয়াল আহমদ-এর কবিতা গতানুগতিক নয়। আবার খুব ব্যাক্তিগতও নয়। যে সমস্যাটা অনেক কবির মধ্যে রয়েছে। প্রকৃত কথা হলো কবিতাকে কবিতা হয়ে উঠতে হবে। মহৎ বিষয় নিয়ে লিখলেই কবিতা হয়না। অথবা ছন্দ মেপে মেপে লিখলেও কবিতা হয় না। তাহলে প্রশ্ন হতে পারে যে, কবিতা কেমন হবে? এটাও বলা মুশকিল। এজরা পাউন্ড থেকে শুরু করে অনেকে কবিতা বিষয়ে কথা বলেছেন, তারপরও সবকিছু পরিষ্কার হয়নি। সে কারণে কবিতা এক কঠিন শিল্প, উচ্চমার্গীয় শিল্প। তাহলে কি এভাবে বলা যায় – যদি অন্তরকে স্পর্শ করে, তবে সেটা কবিতা। মূল কথাটা এখানেই, হৃদয়কে ছুঁতে না পারলে সেটা শিল্প হয় কী করে? আউয়াল আহমদ কবিতা লেখে, হাইকু লিখেছে অনেক। তার কবিতা এবং হাইকু হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তার গল্পও অনেক ভাল। আউয়াল আহমদ-এর বিশেষ গুণ – কবিতা এবং গল্প সমান তালে লিখে যেতে পারা। বাংলাদেশের অনেক কবি গল্প লিখতে পারেন না। সেই হিসেবে আউয়াল আহমদ-এর অবস্থানটা ভিন্ন এবং বিশেষ।

 

আজমত রানা

আজমত রানা গল্প, মঞ্চ নাটক, শ্রুতি নাটক, চলচ্চিত্র বিষয়ক গদ্য-প্রবন্ধ লিখেছেন অনেক। নাটকই লিখেছেন শ’ খানেক। একটি শর্ট ফিল্মের কাহিনী এবং চিত্রনাট্যও লিখেছেন তিনি। এই ফেব্রুয়ারিতে ২০১৮তে প্রকাশ হয়েছে উপন্যাস – ‘অন্ধ রাজা এবং বোকা রাজপুত্রের গল্প’। এটি তার তৃতীয় গ্রন্থ। এর আগে একটি গল্প গ্রন্থ এবং একটি উপন্যাস প্রকাশ হয়েছে। দু’টো বইই তার ভাল বিক্রি হয়েছে। বিক্রির কথা বলছি এইজন্য যে, ভাল না লাগলে পাঠক কিনতেন না।
আজমত রানা অনেক শাখায় লিখছেন – এটা বিরল ঘটনাই বটে। সেই হিসেবে তার বইয়ের সংখ্যা কম। তার বেলাতেও একই কথা বলতে হয় – তিনি প্রকাশোন্মুখ নন।
‘অন্ধ রাজা এবং বোকা রাজপুত্রের গল্প’ – এটি তার বিশেষ উপন্যাস। পুত্রকে নিয়ে লেখা। তার একমাত্র পুত্র সন্তান পড়ালেখা শেষ করেছে প্রায়। চাকরিও ঠিক হয়ে আছে একটা। মার সঙ্গে তার কত কথা। প্রথম বেতনের টাকা দিয়ে মাকে শাড়ি কিনে দেবে। আদরের ছোট বোন, তাকে নিয়েও তার অনেক স্বপ্ন। ঠিক সে সময় পানিতে ডুবে মৃত্যু বরণ করে সে। আজমত রানা ভাঙা বুক নিয়ে লিখেছেন এই উপন্যাস।

 

আশরাফুল আযম খান

আশরাফুল আযম খান-এর প্রথম প্রন্থ – ‘স্ফটিক অন্ধকার’ একুশের গ্রন্থমেলায় প্রকাশ হয়েছে। আশরাফুল আযম খান-এর লেখালেখির শুরুটা ‘চালচিত্র’ দিয়ে। নিয়মিত লিখতো। সে সময় সে আশরাফ সেবু নামে খিতো। তাদের একটা গ্রুপ ছিলো। মোহাম্মদ ইমরান, মতিয়ার রহমানসহ সবাই লিখতো। কলেজে পড়তেই তারা কাফকা, র্যা বো, টলস্টয়, গোগল, কিউবিজম, দাদাইজম-এর সাথে পরিচিত হয়ে যায়। উচ্চ শিক্ষার্থে তারা সবাই ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকায় চলে গেল। মতিয়ার রহমান জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, মোহাম্মদ ইমরান চারুকলায়, আর আশরাফুল আযম খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওখানে ওরা সাহিত্যের আসর চালিয়েছে কয়েক বছর। একবার ওরা আমাকে আলোচক হিসেবে নিয়ে গিয়েছিলো। ঠাকুরগাঁওয়ে আলপনা সংসদের পাক্ষিক ‘সাহিত্য সভা’র পরিচালক হিসেবে কাজ করার সময় ‘কুআলোচক’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠি। ওদের বললাম – আমি তো কুআলোচক। ওরা বলল আমাদের কুআলোচক দরকার। সাহিত্যের ভালোচনা আমাদের দরকার নাই।
যা হোক, আশরাফুল আযম খান-এর সাফল্য কামনা করি। আর বলবো নিয়মিত পড়া-লেখা চালিয়ে যেতে।

 

রাজা সহিদুল আসলাম

প্রকাশ হয়েছে রাজা সহিদুল আসলাম সম্পাদিত ‘রাখাইন আমার ভাই, রোহিঙ্গা আমার অতিথি’। এটি তার দ্বিতীয় সম্পাদিত গ্রন্থ। ইত:পূর্বে প্রকাশ হয়েছে ‘বাংলাদেশ-ভারতের ছিটমহল’। এই বইটি রকমারী ডট কম-এ পাওয়া যায়।
‘রাখাইন আমার ভাই, রোহিঙ্গা আমার অতিথি’ গ্রন্থে আটজন লেখকের মোট আটটি মূল্যবান প্রবন্ধ ও গল্প সন্নিবেশিত হয়েছে। রোহিঙ্গা বিষয়ে নিকোলাস ক্রিস্টফ-এর একটি কলাম প্রকাশিত হয় – নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এ, ২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর। সেখানে কলামের শিরোনাম ছিল – Is this a genoside? প্রশ্নটি এসেছে এইজন্য যে, মিয়ানমারের চলমান বর্বরতা ও নৃশংসতাকে বন্ধ বা এর পরিসমাপ্তি টানতে কোন পদক্ষেপ গ্রহণের প্রমাণ দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে ওঠেনি তাঁর।
রোহিঙ্গা নর-নারীর জীবন, সম্পত্তি, নাগরিকত্ব – কোন কিছুই অবশিষ্ট নেই এখন। তাই অসহায় রোহিঙ্গার কণ্ঠে আর্তনাদ ওঠে – I am a Rohingya, I am not a Human being.
রোহিঙ্গা সঙ্কট অল্পদিনের ঘটনা নয়। এর রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। এই গ্রন্থে প্রকাশিত রচনাসমূহে সন্নিবেশিত হয়েছে ৬ষ্ঠ শতক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত রোহিঙ্গা-আরাকান-রাখাইনের প্রামাণ্য ইতিহাসচিত্র, নৃশংসতা, শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহের উদাসিনতা ও কারণ, চীন ও রাশিয়ার ভেটোসহ অনেক ঘটনাবলী। মানবতার চেয়ে মূল্যবান হয়ে উঠেছে ভূ-রাজনীতি, ভূ-অর্থনীতি। রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ে পরিস্কার একটি ধারণা দিতে পারবে এই বইটি।


–==///–==

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here