গল্প। শাড়ি। রাজা সহিদুল আসলাম। Contemporary Story of Bangladesh । Raja Shahidul Aslam ।

0
409

শাড়ি
রাজা সহিদুল আসলাম
রহিম প্যাকেটটা ডাইনিং টেবিলের ওপর রাখে। রাহেলা জিজ্ঞেস করে – কী ওটা? : শাড়ি।
: শাড়ি? কার জন্য?
: মার জন্য।
: ও!
: দেখবে না? কেমন হল।
: দেখার কী আছে।
রাহেলা কাজে চলে যায়। রান্না ঘরে। রহিম দ্রুত হাত মুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে বসে। এখনই বের হতে হবে। রাহেলাকে তাড়া দেয় – কী হল, তাড়াতাড়ি দাও, কাজ আছে। কোন উত্তর আসেনা। রান্নাঘরে থালাবাসনের শব্দ অন্যদিনের চেয়ে একটু বেশি বেশি হয়।। বেশ কিছুটা সময় ব্যয় করে হেলেদুলে রাহেলা প্রথমে ভাতের গামলা আনে। এরপর পানির জগ। তারপর প্লেট। প্লেট রেখে সে বেডরুমের দিকে গেল। রহিম তাড়া দেয় – দেরী করছ কেন? আমাকে বাইরে যেতে হবে, জরুরি কাজ আছে। রাহেলার একই ভঙ্গি, হেলেদুলে রহিমের কাছে এসে দাঁড়ায়। খুব ঠাণ্ডা শান্ত ভঙ্গিতে বলে – তুমি নিজে নিয়ে খেতে পার না? আমি একটু অবসরে থাকলে কি তোমার গায়ে ফোসকা পড়ে? হঠাৎ চড় খেলে যে অবস্থা হয় সে রকম যেন। রহিম ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে রাহেলার দিকে। কয়েক সেকেন্ড মাত্র। তারপর সম্বিত ফিরে পায়। তাইতো! নিজে নিয়ে খেতেই পারে। এ কী এমন কঠির কাজ। তা-ই করে সে। খাওয়া পর্ব শেষ করে বাইরে যাওয়ার সময় রাহেলাকে কাছে ডাকে। বলে – তুমি শাড়িগুলো দেখলেনা! পছন্দ না হলে আমি চেঞ্জ করতে পারতাম। অবশ্য কালকেও করা যাবে। আমি বাইরে গেলাম। তুমি দেখে নিও। প্যাকেটে তিনটা শাড়ি আছে। দু’টা তোমার, একটা মার। এই কথা শোনার পর রাহেলার মনটা চনমন করে ওঠে।
রহিম বাইরে যাবার পর রাহেলা প্যাকেটটা খোলে। তিনটা শাড়িই সুন্দর। তার শাড়ি দু’টা বেশ উজ্জ্বল, হাতের কাজ রয়েছে। মার শাড়িটাও সুন্দর। অফ হোয়াইটের মধ্যে সোনালি বুটি আর রঙ মিলিয়ে চওড়া পাড়ে ভারি কাজ। এটা তাকেও মানাবে। কিন্তু বয়ষ্ক মানুষের জন্য এত দামী শাড়ি কী দরকার? তার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলা করে।
বেশ দেরী হয় বাড়ি ফিরতে রহিমের। শরীরে ক্লান্তি। শোবার সময় মনে পড়ে। সে রাহেলাকে জিজ্ঞেস করে – মাকে শাড়িটা দিয়েছ? রাহেলা চুপ করে থাকে। সে আবার জিজ্ঞেস করে – মাকে শাড়িটা দিয়েছ? রাহেলা ধীরে উত্তর দেয় Ñ না। : কেন?
: ওটাও আমার পছন্দ হয়েছে।
: তোমার জন্য দু’টা এনেছি।
: তাতে কী হয়েছে। আমার পছন্দ হয়েছে।
: সত্যি আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি, এটা তোমার কী ধরনের আচরণ?
: আচরণের কী দেখলে? আমার পছন্দ হয়েছে তাই নিয়েছি।
: আসলে তুমি …
: কী? আমি কী? বল?
: আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।
: মায়ের প্রতি এত দরদ?
: সত্যি, তুমি, তুমি আসলে …
: কী? বল?
: আমি ভাবতেই পারছি না …
: একটা শাড়ির জন্য তুমি আমার সাথে এই রকম আচরণ করছ?
: একটা শাড়ি নয়, এর সাথে মন-মানসিকতা, হীনমন্যতা জড়িয়ে আছে।
: কী, আমি হীনমন্য? এতবড় কথা বললে?
: আমাকে বলতে হবে না, যে শুনবে সেই বলবে।
: কেউ বলবে না। তোমরাই বলে বেড়াও। যাও, ঢোল পিটিয়ে দাও, আমি খারাপ। : সবকিছুতে বাড়াবাড়ি কর। ভাল লাগছে না।
: আমি বাড়াবাড়ি করি? তুমি কর না?
: আমি কী করেছি?
: তোমার আর ভাই নাই? তাদের দায়িত্ব নাই? সব দায়িত্ব তোমার?
: একটা শাড়ি কিনেছি, তাতেই তোমার কাছে বাড়াবাড়ি মনে হল?
: সবকিছুতে তুমি বাড়াবাড়ি কর। মার অনেক শাড়ি আছে। এইভাবে টাকা নষ্ট করলে ভবিষ্যতে চলবে কী করে? : আমার কথা বলতে ভাল লাগছে না। কাল মাকে শাড়িটা দিয়ে দেবে।
: আমি পারব না। দিতে চাইলে তুমি দিও। আর শোন, আমি কাল বাবার বাড়ি যাব। কয়েকদিন থাকব। কোন ঝামেলা পাকাবে না।
: তাই যাও।
বেশ কয়েকদিন থাকার বাসনায় বড় ব্যাগ নিয়ে বাবার বাড়ি গিয়ে হাজির হয় রাহেলা। রহিমকে শিক্ষা দেওয়ার বাসনাও মনে ধিকিধিকি জ্বলে। জানে রাহেলা না থাকলে রহিমের অসুবিধা হবে। সে ছাড়া রহিম কত দিন চলতে পারে সেটা সে দেখবে।
মেয়েরা বাপের বাড়ি এলে বাবা মার মনে খুশির ভাব লক্ষ্য হয়। আগের দিনগুলো ফিরে পায়। আনন্দের ঘন ছোঁয়া জমজমাট পরিস্থিতি তৈরি করে। সুখের বন্যা বইতে শুরু করে। বাবা মা ভাই বোন একত্রে কত কথা, কত গল্প! ছোটবেলা, বড়বেলা, সে-ই কোথায় কে কী বলেছিল, কে কী করেছিল ইত্যাদি ইত্যাদি। সঙ্গে নিজ নিজ সংসারের এ কথা সে কথা। কখনও কখনও পরচর্চা।
রাতে রাহেলা বলল – মা, আজ আমি তোমার সাথে ঘুমাব। বাবাকে বাইরের ঘরে শুতে বল। বরাবরই তাই ঘটে। মেয়েরা বাড়িতে এলে বাবা নির্বাসিত। মা মেয়ে সারাদিন কথা বলে। রাতেও তাদের কথা চলে। কী এত কথা? মাঝেমধ্যে বাবা বলেছেনও – তোমরা কী নিয়ে এত কথা বল? রসিকতা করে এও বলেছেন – ওগুলো লিখে ফেললে মোটা মোটা বই হত।
মা মেয়ের রাতের গল্প জমাট বাঁধতে শুরু করেছে মাত্র। রিনিঝিনি সুখানুভূতি রাহেলার বুকে ঝিরিঝিরি বাতাসের মত ছোঁয়া দিতে শুরু করেছে। এমন সময় মা বলল – জানিস, রফিক আমার জন্য একটা শাড়ি এনেছে তিনদিন আগে। এই নিয়ে ওর বউ রফিকের সাথে সে কী ঝগড়া। আমাকে শুনিয়ে শুনিয়েও অনেক কথা বলেছে। জানিস খুব খারাপ লাগছে। নিজেকে নিতান্তই ছোট মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছিল আমিও দু’চার কথা শুনিয়ে দেই। তোর বাবা নিষেধ করেছে। তাই কিছু বলিনি। তোর বাবা বলেছে শাড়িটা ফেরত দিয়ে দিতে। রফিক কষ্ট পাবে না বল? আবার শাড়িটা ছুঁতেও ইচ্ছা হচ্ছে না।
রাহেলার বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে।
২১ এপ্রিল ২০১৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here