গল্প। মাছের কথা। রাজা সহিদুল আসলাম

0
615

গল্প

মাছের কথা

রাজা সহিদুল আসলাম

মাছের বাজারে ঢুকলে মাথা ঘোরে। প্যাঁচার মাথা ঘুরতে দেখা যায়। মানুষের ঘোরে না অথচ মানুষ মাথা ঘোরার কথা বলে। রাজুলের ছয় বছরের ছেলে দৌড়াচ্ছিল, রাজুল বললো – হোঁচট খাবি, দৌড়াইস না। ছেলে বললো – হোঁচট কি খাওয়া যায়?
এখনকার ছেলেমেয়েদের কথাবার্তায় বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়, মনে হয় সত্যি সত্যি আয়োডিন লবণ কাজ করছে। কিন্তু সন্দেহও জাগে, গৃহিনিরা যদি লবণ খোলা রাখে! লবণ খোলা রাখলে আয়োডিন উড়ে যায়।
মানুষ মুখ দিয়ে অনেক কথা বলে, কিন্তু বাঘ বলে না, বাঘ বলে না এই জন্য যে বাঘ বাজারে যায় না। বাজার এবং বাজারের ব্যাগ মানুষকে খামচে ধরে আছে। পালাবি কোথায়? ধর! – এগুলো সিনেমার নাম হলেও বাজার ও বাজারের ব্যাগ মানুষকে এইভাবে ধাওয়া করে।
মাছের বাজারে ঢুকলে মাথা ঘোরে।
… এখন শুধু মাছ নয়, সকল দ্রব্যাদি মানুষের মাথাকে ঘোরানোর কাজে লিপ্ত। দ্রব্যের সঙ্গে ‘অ, দ্রব্য মাথাকে টানাটানি করছে আরও বেশি। চালের সঙ্গে ইউরিয়া, ফলের সঙ্গে ফরমালিন, শুটকির সঙ্গে ডিটিটি, সয়াবিন পরিশোধনে ঘাপলা, অধিকাংশ খাদ্য দ্রব্যের সাথে ‘অ’ দ্রব্য। মাথা কি তোমার স্থির থাকবে? ঘুরবে না কি?
সম্প্রতি পুরুষদের হার্ট এ্যাটাক বেশি হচ্ছে। এর কারণ খতিয়ে দেখছে না কেউ। এ বিষয়ে সরকার বা কোন এনজিও প্রকল্প হাতে নিচ্ছে না। একজন গম্ভীর মানুষ ভেতরে ভেতরে রসে টইটম্বুর বলেছেন – সংসারের আনলিমিটেড ডিমান্ড + দ্রব্য মূল্যের উল্লম্ফন + সীমিত আয় + স্ত্রীর গুতা + বয়সের সঙ্গে সঙ্গে পৌরুষ কমে যাওয়ার আশংকা = হার্ট এ্যাটাক।
রাজুলের কলিগের বন্ধুর মাসতুতো ভাই রাস্তায় সুন্দরী মেয়ে দেখলে রেগে যায়, তার ইচ্ছে হয় বাড়িতে গিয়ে বউকে পেটায়, বলতে ইচ্ছে হয় – তুই কেন ওদের মত সুন্দরী হইলি না। সুন্দরী মেয়ে তার মাথা গরম করে। এ সব ঘটনা বউ, বউয়ের বাপ, মা, ভাই, বোন – সবার মাথা ঘোরানোর বিষয় হিসেবে উপযুক্ত । শেয়ার মার্কেট অথবা পদ্মা সেতু নিয়ে নানা প্রসঙ্গও পক্ষ বিপক্ষ ও জনসাধারণের মাথা ঘুরিয়েছে। জুলিয়ান অ্যাসেনজের তথ্য অনেকের মাথার সঙ্গে পৃথিবীর লার্জ মাথাটিকে বনবন করে ঘুরিয়েছে। বড় মাথা ঘুরলে ছোট মাথাগুলো খিলখিল করে হাসে – এইবার! কাপড় খুলে গেল তো? তোরা দেখ্, দেখ্, দেখ্রে চাহিয়া …। গায়ে চুলকানি পাতা লাগলে যেমন হয়, বড় মাথার তেমন লাফালাফি, দূর থেকে দেখলে ব্রেক ডান্স মনে হবে, দর্শকরা বিনোদন পেয়ে হাত তালি দেবে। মধ্যবর্তী দর্শকরা বলবে – অর কোটি দে ধূঁয়া উড়াছে, তোহমরা কহেছেন পিঠা উষ্ণাছে (ওর পাছা দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে আর তোমরা বলছো পিঠা তৈরি করছো)।

রাজুলের ছেলে ক্লাশ টেস্টের প্রথম পরীক্ষা বাংলায় ২৫-এর মধ্যে ২৫ পেলো আর অন্যরা সবাই পেলো সাড়ে চব্বিশ তখন সব বাচ্চার মায়েদের মাথা ঘুরতে শুরু করলো। পিতারা বললো – ক্লাশ টেস্ট তো, অত সিরিয়াস হচ্ছো কেন? ফাউন্ডেশন মজবুত হলেই হবে, ক্লাশে ফার্স্ট হওয়াও জরুরি নয়। মায়েরা কর্ণপাত করলো না, বনবন করে ঘুরতে থাকা মাথা নিয়ে বসে পড়লো ছেলেমেয়েদের পড়াতে।
মাছের বাজারে ঢুকলে মাথা ঘোরে, দুর্বল পকেটওয়ালা ঘুরে ঘুরে মাছ কিনে বাড়ি ফিরলে বউ বলে – এসব কী এনেছো? সব পঁচা! যাও ফেরত দিয়ে আসো। মাছ ফেরত দিতে গেলে শুধু মারামারি হয় না, অন্য সব কিছু হয়। কোনমতে নিজের মানসম্মান বাঁচিয়ে বাজার থেকে বের হয়। সব মাছুয়া এক জোট। সে ড্রেনের পাশে দাঁড়িয়ে হাপায়। অবশেষে ড্রেন তাকে রক্ষা করে। সে মাছগুলো ড্রেনে ফেলে দিয়ে আসে। বউকে বলে – টাকা ফেরত নিয়েছি। টাকা ফেরত নিয়েছো ? বউ বলে – এখন কী রান্না করবো? ইলিশ আনতে পারলে না? শিং মাগুর? পানি দিয়ে মাথা ঠাণ্ডা করতে করতে স্বামী বলে – ও সবের দাম বেশি। দাম বেশি? বউ তেড়ে আসে – পঁচা মাছ কেনা তোমার অভ্যাস হয়ে গেছে, এরপর থেকে পঁচা মাছ আনলে তোমার মুখে ছুঁড়ে মারবো। স্বামীর মাথা এমনিতেই ঘুরছিল, স্ত্রীর কথায় মাথা গরম হয়ে উঠলো। ইচ্ছা হয় দুইটা ঘুষি বসিয়ে দেওয়ার। স্ত্রীর মাত্রা ছাড়া কথাবার্তা আর কুৎসিত আচরণ তাকে ঘুষি মারতে অনুপ্রণিত করলেও নিজেকে সামলে নেয়। তার গরম মাথা আরও গরম হয় এবং বনবন করে ঘুরতে থাকে। মাথা ঘোরা এবং মাথা গরম – দুটো রোগ একসঙ্গে হলে ডাক্তারের সিরিয়ালে জ্যাম সৃষ্টি হয়। সিরিয়ালম্যানকে ২০ টাকা ঘুষ দিয়ে সিরিয়াল টপকাতে গিয়ে বিভ্রাট ঘটে, অন্যরা তেড়ে আসে। কিন্তু ২০ টাকার কারবার ভালই চলে, শুধু তার বেলায় এই বিপত্তি। নিজেকে তখন ক ূফা মনে হয়। মাথা গরম ও মাথা ঘোরা আরও জোরদার হয়ে উঠে। ঘাড়ের রগ ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। অবশেষে তার বৈধ সিরিয়ালের ডাক পড়ে। ডাক্তারের কাছ থেকে ফর্দ নিয়ে এই ল্যাব সেই ল্যাব রিপোর্ট দেখানো ওষুধের দোকান ঘুরে কাহিল শরীর নিয়ে অবশেষে নিজ গৃহে ফেরার পালা। এই সময়ের মধ্যে তার পকেট পরিস্কার হয়ে যায়। মাছের টাকা ডাক্তার, ল্যাব আর ওষুধ কোম্পানি খায়। স্ত্রী চেয়ে চেয়ে দেখে Ñ আমার বলার কিছু ছিল না।
ওষুধ-রিপোর্ট-প্রেসক্রিপশন সঙ্গে নিয়ে পুরুষ বাড়িতে ঢোকে।
১৬ নভেম্বর ২০১২ খ্রি:
গল্পটি ‘চালচিত্রে’ প্রকাশিত।
আরও গল্প পড়তে ভিজিট করুন www.chalchitro.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here