গল্প। ও টাকা ও ভালবাসা। রাজা সহিদুল আসলাম। Short Story of Bangladesh.

0
262

ও টাকা ও ভালবাসা
রাজা সহিদুল আসলাম

: এ্যাই, ওঠো, শুনছো, তাড়াতাড়ি ওঠো।
স্ত্রী শরীর মোচড় দেয়, হাই তোলে, বিরক্তি নিয়ে তাকায় – কী হল, কী হয়েছে, শান্তি মত ঘুমাতে দেবে না, সাত সকালে চেঁচামেচি করছ কেন?
: আরে ওঠ ওঠ, সুখবর আছে, খুশিতে তোমার মন নেচে উঠবে।
স্ত্রী উঠে বসে, ঘুমের জড়তা নিয়ে বলে – তুমি আর খুশির খবর! তাইতো, এ তো পশ্চিমে সূর্য ওঠার মত! … এখন বল তোমার খুশির খবর।
কাগজ কলম নিয়ে স্বামী দণ্ডায়মান স্ত্রীর সামনে। বলে – ঠিকঠাক বল তোমার কত ঋণ হয়েছে? : মানে?
: মানে হল তোমার কত ঋণ আছে, তার হিসেব।
: এই সাত সকালে তুমি এইসব নিয়ে পড়লে?
: হ্যাঁ, দরকার আছে।
: তুমি জান না?
: জানি। তারপরও তোমার কাছে শোনা দরকার। আচ্ছা ঠিক আছে, আমি লিখছি, তুমি শোন। স্বামী লেখা ও বলা শুরু করে –
০১. তোমার বন্ধু জুলেখার কাছে – ১,৫০,০০০/- টাকা
০২. ব্যাংক ঋণ – ৮০,০০০/- টাকা
০৩. তোমার সমিতি – ৫০,০০০/- টাকা
০৪. মার সমিতি থেকে ঋণ – ৫০,০০০/- টাকা
০৫. শাহরিয়ার ভাইর কাছে – ৫২,০০০/- টাকা
এই তো, তিন লাখ বিরাশি হাজার। এই টাকাটা দিলে তুমি ঋণ মুক্ত হবে, তাই না?
: হ্যাঁ। আমার সমস্ত গয়না বিক্রি করলাম। তুমি বলেছিলে কিনে দেবে, সেটাও তো এক প্রকার ঋণ। : সেটাও হবে।
: বাপ রে! তুমি কি টাকার খনি পেয়েছ?
: ঠিক ধরেছ, আমি টাকার খনি পেয়েছি। আচ্ছা তোমার গয়না বিক্রি করেছ তিন লাখ টাকায়, তাই না? : হ্যাঁ।
: তাহলে মোট হচ্ছে ছয় লাখ বিরাশি হাজার।
স্বামী লুঙ্গির কোছা থেকে টাকা বের করে। সেখান থেকে ছয় লাখ বিরাশি হাজার টাকা গুনে স্ত্রীর হাতে দেয়। স্ত্রীর চোখ গরুর চোখের মত বড় বড় হয়ে যায়।
টাকার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার বিশ্বাস হতে চায় না। এক সঙ্গে এতগুলো টাকা! কথা বলতে সে ভুলে যায়। ছোঁ মেরে টাকাটা নিয়ে নেয়। টাকা নেয়ার পরেও
তার তৃষ্ণা মেটে না। সে স্বামীর হাতে অবশিষ্ট টাকার দিকে তাকিয়ে থাকে। বলে – ওগুলোও দাও, তোমার কাছে থাকলে বাজে খরচ করে শেষ করবে। আমাকে
দাও – বলে হাত বাড়ায়। স্বামী পেছনে সরে আসে। টাকা কোছায় রাখে।
: আমি বাজে খরচ করব না। এই যে তোমাকে ঋণ মুক্ত করলাম, এটা কি বাজে খরচ? : এত টাকা তুমি কোথায় পেলে?
: পেয়েছি, তোমাকে বলা যাবে না।
: আহা বলোই না।
: না, মেয়েদের পেটে কথা থাকে না।
: কী, আমার পেটে কথা থাকে না?
: শোন, এই বিষয়টা এখন থাক, আমার ইচ্ছার কথা বলি, আমার ভীষণ ইচ্ছা হয় … : কী?
: ইচ্ছা হয় তোমাকে এক ঘর টাকা দেই, ইচ্ছা হয় একটা পাহাড়, একটা নদী কিনে দেই। তুমি অনেক গয়না পরে গোটা দেশ ঘুরে বেড়াবে হেলিকপ্টারে চড়ে।
: সত্যি, তুমি আমাকে নিয়ে এইরকম ভাব?
: হ্যাঁ, সারাক্ষণ ভাবি।
: ইস্, আমি তোমাকে কত অবহেলা করেছি।
: আমি বুঝতে পারি, আমার অঢেল টাকা নেই, তাই তুমি ..
: থাক্ আর বলতে হবে না।
: তবে তোমার এত ঋণ করাটা ঠিক হয়নি।
: না করে উপায় আছে? সারা জীবন ভাড়া বাসায় কাটাবে? শেষ বয়সে থাকবে কোথায়? : তা ঠিক বলেছ।
: শোন, বিকেলে রেডি থেকো, বাইরে যাব।
: বাইরে, কেন?
: একটা ফ্রিজ আর একটা কালার টিভি কিনব। সাদা কাল টিভি এ যুগে কেউ দেখে? একটা গ্যাসের চুলা কিনবো। খড়ি দিয়ে রান্না করতে করতে তুমি কাল হয়ে
গেছ।
: ইস্, আমার যে কী ভাল লাগছে, এতদিনে সুখের মুখ দেখব।
: জান, নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়, দিনের পর দিন কী কষ্টটাই না করেছ তুমি। শোন, একটা কাজের লোক দেখ।
: সে দেখবো, কিন্তু একটা খাট কেনা দরকার, ঘুণ খেয়ে শেষ হয়ে গেছে, নিচে ইট দিয়ে রেখেছি, যখন তখন ভেঙে পড়তে পারে।
: তুমি একটা কাজ কর, একটা লিস্ট তৈরি কর।
: ঠিক আছে, তাই করব। … শোন, আজ একটা বড় ইলিশ মাছ কিনে আনবে, অনেক দিন হল, প্রায় তিন চার বছর তো হবেই, তুমি ইলিশ কেনোনি।
: ঠিক বলেছ, কতদিন যে মাছ মাংস কিনি না। … আগে তুমি আমাকে ফকিরের ব্যাটা বলতে, এখন নি:শ্চয়ই বলবে না?
: পুরাতন কথা তুলছ কেন? অভাব অনটন থাকলে মাথা ঠিক থাকে?
: এখন মাথা ঠাণ্ডা?
: রাখতো। তুমি নুডুলস পছন্দ কর, ইলিশ কিনতে যাওয়ার আগে একটু বস, আমি বানিয়ে দিচ্ছি। : দেবে? দাও! টাকা আর ভালবাসা, কী যে গভীর সম্পর্ক!
: খোঁচা মেরে কথা বলা তোমার অভ্যাস হয়ে গেছে।
: তোমাকে বলিনি, টাকা বাহাদুরকে বলেছি।
: হয়েছে কথা ঘুরাবে না।
: আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি নুডুলস বানাও।
স্ত্রী নুডুলস বানাতে চলে যায়। যেয়ে দেখে ডিম নেই, তেল নেই। মাথা আউলে যায়। গজরাতে গজরাতে ফিরে আসে। স্বামী দিব্যি নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। অফিস
ফাঁকি দিয়ে বিকেল বেলা ঘুম। অলস অকর্মা কোথাকার! স্ত্রী চেঁচিয়ে ওঠে – এ্যাই, এ্যাই, ওঠো, শুধু ঘুম আর ঘুম। কোন চিন্তা ভাবনা নাই। এ্যাই ওঠো,
শুয়োরের মত ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে ঘুমাচ্ছ কেন? স্বামী ধড়ফর করে উঠে বসে – কী হয়েছে, ষাঁড়ের মত চেঁচাচ্ছো কেন?
: চেঁচাবো না? শান্তিতে রেখেছ? বিয়ের পরে সুখ কাকে বলে দেখলাম না। কথা বললেই দোষ? : হ্যা, তোমার অনেক দোষ আছে তো।
: কথা বাড়াবে না। খোকাকে নুডুলস দেব, ডিম তেল কিছু নেই, এখনই নিয়ে আসো, যাও।

গল্পটি ‘নতুন ধর্ম খুলতে চায় কতিপয় মানুষ’ গ্রন্থে প্রকাশ হয়েছে।
—///—

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here