গল্গ। গরু। রাজা সহিদুল আসলাম

0
1029
গল্প। ২০০৭ সালে লিখেছি গরু।

গরু

রাজা সহিদুল আসলাম

কে আসল গরু – কথাটা কানে এল তার। এর আগে ‘বাঘের বাচ্চা’ শুনেছে। কেউ বিশেষ কোন কাজ করলে শাবাশি দেয়, বলে ‘বাঘের বাচ্চা’। মাঝে মাঝেই সে ভাবে মানুষ ‘বাঘের বাচ্চা’ বলে কেন? বাঘ ভীষণ হিংস্র, মানুষকে সামনে পেলে জখম করে, খেয়ে ফেলে, তারপরও বলে কেন? বরং বলা উচিৎ ‘গরুর বাচ্চা’ । গরু আমাদের দুধ দেয়, গোবর সার হিসেবে ব্যবহার হয়, চামড়া কাজে লাগে, গরুর মাংসের স্বাদও বেশি, দামও ভাল। গরুর ভুঁড়ি খেতে আরও মজা। দুই জোড়া পায়ের কথা তো বাদই রইল। রান্নার পর হয়ে যায় নেহাড়ি। রুটি বা পরোটার সঙ্গে – আহা, জিহ্বা দিয়ে জল পড়বে যেন। বাঘের ভুঁড়ি বা পা খেতে কেমন স্বাদ সেটা সে জানে না। কেউ খেয়েছে কিনা সেটাও সে শুনেনি। বাঘ পশুর রাজাও নয়, তাহলে কেন ‘বাঘের বাচ্চা’? ‘গরুর বাচ্চা’ নয় কেন?
কে আসল গরু – কথাটা তার কানে বাজলো আবার। গরু। গরু তার মাথাটা খাবে। অন্য কোন ভাবনাই তার বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। কখনও কখনও রাজ্যের সমস্ত চিন্তা তার মাথায় এসে হাজির হয়। গরু রচনা সে অনেকবার পড়েছে। কিন্তু আসল গরু, আসল গরু কোথায়? এতসব গরু সব কি নকল? তার সামনে দিয়ে দু’জন তরুণ তরুণী হেঁটে যায়। ছেলেটি তার পাড়ার, মেয়েটি শাহী পাড়ার। বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। দু’জনকে অন্য দৃশ্যে দেখেছিল। ছেলেটি সকালে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকত, মেয়েটি বইখাতা নিয়ে প্রাইভেট পড়তে যেত। তখন তারা স্কুলে। সেই সময় ছেলে মেয়েরা ব্যাগ ব্যবহার করত না, মানে খুব একটা চল ছিল না। একদিন মেয়েটা বইখাতা নিয়ে পড়তে যাচ্ছে, ছেলেটি বলল – এই মেয়ে তোর ও দুটো কি? মেয়েটি আচমকা, ভ্যাবাচ্যাকা খায়। অপমান বোধ করে। উপযুক্ত জবাব দেয়ার জন্য দাঁড়ায়, অল্পক্ষণ ভাবে, তারপর বলে – তোর মায়ের কবর। ছেলেটি ভাবতেই পারেনি এরকম জবাব সে শুনবে, কলিজায় চাক্কু মারার মতই একটা আঘাত। সে এই অপমান থেকে উদ্ধারের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে,ভাষা খোঁজে, শব্দ খোঁজে, শেষতক পেয়েও যায়, বলে – আয় না জিয়ারত করি। মেয়েটি যেন এর জবাব দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল কিন্তু হল না। বাড়ির ভেতর থেকে কে যেন ছেলেটিকে ডাকল, অমনি সে ভেতরে চলে গেল। সেই ছেলেটি মেয়েটি এখন গল্প করতে করতে হেঁটে যাচ্ছে। কে আসল গরু? ছেলেটি? মেয়েটি? নাকি ভেতর থেকে যে ডেকেছে সে? এই জীবনে সে অনেক গরু খেয়ে সাবাড় করেছে অথচ এখন গরুই তার মাথা চিবাচ্ছে।

রাতে সে সপ্ন দেখে, চারদিকে শুধু গরু আর গরু। জনসভায় গরু, রাস্তায় গরু, চেয়ারে গরু, ছাদে গরু, সবখানে। একটা গরু তার পা চাটছে, একটা তার পরনের কাপড় খাচ্ছে, পাশে টেবিলে রাখা বইকাগজপত্র সাবাড় করছে। বিস্ময়ে তার চোখ দু’টো খুলে যায়। দেখে সে বিছানায় শুয়ে আছে। সকাল হয়ে গেছে। সে ঘুম থেকে উঠে অফিসে যাবার প্রস্তুতি নেয়, দেখে তার একটা টাইও নেই। চিৎকার করে স্ত্রীকে ডাকে – লুৎফা। পরবর্তী ডাকের সময় সে থেমে যায়, তার স্ত্রীর নামতো লুৎফা নয়, তাহলে কী নাম তার? আশ্চর্য, এত বছর সংসার করার পরেও সে স্ত্রীর নাম ভুলে গেল? কী নাম তার? থানকুনি পাতা খাওয়া দরকার Ñ ভাবে সে। ভেষজ উদ্ভিদের গুণাগুণ পড়তে গিয়ে জেনেছে, থানকুনি পাতা স্মৃতিশক্তি অক্ষুণ্ন রাখে এবং বৃদ্ধি করে। হ্যাঁ পেয়েছে, আনোয়ারা, সে জোড়ে ডকে – আনোয়ারা…। দুইতিনবার ডাকার পর স্ত্রী চাকু হাতে ঘরে ঢোকে। চাকু! ভয় পায় সে। নাম ভুল করার কারণে স্ত্রী তাকে খুন করবে নাকি!
: তোমার হাতে চাকু কেন?
: কী বলবে বল, অনেক কাজ আছে।
: আমার টাই খুঁজে পাচ্ছি না।
: দেখ আছে নি:শ্চয়ই।
: পাচ্ছি না তো।
: বাড়িতে কোন ছাগল নেই।
: মানে?
: মানে বাড়িতে কোন ছাগল নেই।
: টাইয়ের সঙ্গে ছাগলের সম্পর্ক কি?
: বাড়িতে ছাগল থাকলে তো তোমার ওই দড়িগুলো দিয়ে বাঁধবো? যেহেতু ছাগল নেই সেহেতু তোমার টাই আছে। স্ত্রী চাকু ঘুরাতে ঘুরাতে চলে গেল। যাওয়ার ভঙ্গিটা বিদঘুটে টাইপের।
অফিসে এসেও তার গরু ভাবনা মাথা থেকে সরলো না। কে আসল গরু – তাকে ভাবিয়ে তোলে। একটু পর বস্ তাকে ডেকে পাঠালেন। সে যেন বহুদিন ধরে পথ হাঁটছে, এমন ক্লান্তি নিয়ে বসের রুমে ঢুকল। বস্ বললেন – মি: নুরু, আপনার রুমে নাকি গরুর ছবি টাঙিয়ে রেখেছেন? কী ব্যাপার বলুন তো?
: স্যার চারদিকে এত গরু, কিন্তু আসল গরু কে?
অসংলগ্ন কথায় বস কিছুটা রাগ হলেন, বললেন – আপনার বোধ হয় ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিৎ।

তার মনটা ভাল নেই। চারদিকে বোমা ফুটছে। এত বোমা! কারা বানাচ্ছে এসব? কারা বোমা মারছে আর কারাইবা মরছে? মানুষ বোমা মারছে নাকি গরু বোমা মারছে? মানুষ মরছে না গরু মরছে? পত্রিকায় বোমা হামলার খবর সে পড়ে না, ছবিও দেখে না। তার বিশ্বাস মানুষ বোমা বানাচ্ছে আর মানুষই মরছে। গরুর দ্বারা এসব কাজ সম্ভব নয়। গরু নিরীহ প্রাণি। সব সময় সে মানুষের উপকার করে। মানুষের কল্যাণ করতে করতে একদিন সে শেষ হয়ে যায়। শেষ হয়ে যাবার আগে সে তার প্রজন্ম রেখে যায় একমাত্র মানুষের কল্যাণের কথা ভেবে। এতকিছুর পর গরুকে বোমা হামলার সঙ্গে জড়ানো ঠিক হয়নি – ভাবে নুরু মিয়া। বসের উপর তার রাগ হয়। তার নাম নুরুজ্জামান। জামান সাহেব বলবে তা না, বলে মি: নুরু। নু….রু….। নুরুর সঙ্গে গরুর মিল পায় সে। বসের রুচি নেই, সৌন্দর্যবোধও নেই। শালা এক নম্বর …., মাতারি থেকে ফকিন্নি… ছি:, আবার চকচকে লাল টাই পরে, বলে আল্লার কসম – খোদর কসম আমি ঘুষ খাই না। গু গোবর খাওয়া মুখে আল্লাহর নাম! বসের রুমে ঢুকলে গোবর নয় সে গুয়ের গন্ধ পায়। বসকে সে কথা বললে বস্ রেগে ওঠেন। বস্ এয়ার ফ্রেশনারের ডিব্বা খুঁজতে লাগলে সে সটকে পড়ে।

গরু নিয়ে দিন রাত কাটে নুরু মিয়ার। গরু তার পেছন ছাড়ে না। এমনি ভাবে মাস বছর পার হয়ে যায়। একদিন সকালে নাস্তা খেয়ে পাজামা পাঞ্জাবি গায়ে চড়ায় নুরু মিয়া। দিনটা শুক্রবার ছিল। বাড়ি থেকে বের হয়ে একটা বাসে চড়ে। কিন্তু কোথায় যাবে? বাস কন্ডাক্টর অবাক হয়। নুরু মিয়া বলে – আমি নামবার সময় ভাড়া দেব। বাস কয়েক জায়গায় থামল কিন্তু নুরু মিয়া নামল না। অবশেষে দুইঘন্টা বাসে বসে থেকে একটা ছোট্ট শহরতলী মতন স্টপেজে নামল। নুরু মিয়া উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরি করে। এরই মধ্যে সূর্য মাথার উপর উঠে আসে। সে একটা মসজিদে ঢোকে জুম্মার নামাজের উদ্দেশ্যে। সেই সঙ্গে মনে মনে দোয়া করে – হে আল্লাহ, সব মানুষকে গরু বানিয়ে দাও, তাহলে গোটা পৃথিবীতে কল্যাণ বইতে শুরু করবে।
সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরা নুরু মিয়া নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হয়। দেখে মসজিদ গেটে মানুষের জটলা। একজন স্যান্ডেল চোরকে মারধর করা হচ্ছে। নুরু মিয়া দেখে কয়েক জোড়া স্যান্ডেলের মধ্যে তার নতুন স্যান্ডেল জোড়াও রয়েছে। সে চোর পাকরাওকারীকে শাবাশি দেয় – শাবাশ গরুর বাচ্চা। সবাই থেমে যায়। নুরু মিয়া আবার বলে – শাবাশ গরুর বাচ্চা। শুধু মুহূর্তের ব্যাপার। সবাই হামলে পড়ে নুরু মিয়ার ওপর। তার পাঞ্জাবি ছিঁড়ে যায়, পাজামার ফিতা ছিঁড়ে যায়, নাক দিয়ে রক্ত পড়ে। যারা দূরে ছিল, ঘটনা না জেনেই নুরু মিয়াকে কিল ঘুষি লাথি দিতে অনুপ্রাণিত হয়।
অবশেষে একজন পুলিশ নুরু মিয়াকে উদ্ধার করে। উদ্ধার দৃশ্যে দেখা যায় – নুরু মিয়ার পাঞ্জাবি অত্যাচারিত, নিপিড়িত, জর্জরিত, কোন ভাবে শরীরে লেগে আছে, পাজামা উধাও। স্থানীয় মন্ত্রী মসজিদে নামাজ পড়তে এসেছেন তাই পুলিশের আনাগোনা। নুরু মিয়া পাজামা উদ্ধারের জন্য ছটফট করে কিন্তু পুলিশ নুরু মিয়ার হাত ছাড়েনা কিছুতেই, বলে – দেখে তো ভদ্রলোক মনে হয়, এখনও পকেট মারিস? ছোটবেলার অভ্যাস? এত বয়স হইল তাও ভাল হইতে পারলি না? নুরু মিয়া কষ্টের মধ্যেও হাসে, বিড়বিড় করে – ভূতের মুখে রাম নাম! কী বলতেছিস – পুলিশ জিজ্ঞাসা করে। কিছু না, আমার হাত ছাড়েন – নুরু মিয়া হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে। পুলিশ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে – ব্যাটা পকেটমার, তার আবার তেজ কত! পুলিশ শক্ত করে একটা চড় মারে। এ্যাই ব্যাটা বিড়বিড় করে কী বললি? কিছু না। বল্ ব্যাটা, নাইলে আরও খাবি। নুরু মিয়া বলে – আসল গরু কে?
মার্চ ২০০৭

গল্পটি ‘নতুন ধর্ম খুলতে চায় কতিপয় মানুষ’ গ্রন্থে প্রকাশিত। বইটি রকমারী ডট কম-এ পাওয়া যাচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here