উপন্যাস । অন্ধ রাজা এবং বোকা রাজপুত্রের গল্প । আজমত রানা

0
650

উপন্যাস

অন্ধ রাজা এবং বোকা রাজপুত্রের গল্প

আজমত রানা

উৎসর্গ
আমার দু’মেয়ে
আফিয়া তাহসীন লাবনী
আশীতা ইলিন
যারা প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়
ওদের জন্য বেঁচে থাকতে হবে।

পরিচিতি
১) আমি – আবিরের বাবা
২) মাহফুজা আকতার খেলনা – আবিরের মা
৩) ইলিন – আবিরের বোন
৪) বিথী – ( সঙ্গত কারণেই নামটি পরিবর্তণ করলাম) আবির যাকে ভালোবাসতো।

এভাবেই একটা গল্প লিখতে শুরু করেছিলাম

: তুমি কি আজ বিকেলে আমার সাথে বেরুবে?
: না
: না কেন?
: এমনিতেই, আমার প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছে, ঘুমাবো এখন।
ফোন কেটে দেয় আবির। বিথী মিথ্যে বলছে না এটা নিশ্চিত। কারণ বাইরে বেরুনোতে বরাবরই বিথীর ইচ্ছেটা থাকে বেশি। আর কণ্ঠ শুনেও বোঝা যায় ওর ঘুম পেয়েছে। কথাগুলো কেমন জড়িয়ে আসছিল।
ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে খালি গায়ে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দেয় আবির। গা ঘামতে শুরু করে। বিছানার ওপর বৈদ্যুতিক পাখাটা কদিন ধরেই ঢিমে তালে ঘুরছে। ক্যাপাসিটর না কি যেন ড্যামেজ হয়ে গেছে ওটার। গরমটা অসহ্য হলেও ওটা এখন ঠিক করানোতে কোন আগ্রহ নেই। ক’দিন পরই তো ঠাণ্ডা পড়বে।
ও আবার বিছানায় উঠে বসে। ফোনটা হাতে নিয়ে বিথীকে আবার কল দেয়। বেজেই চলছে, বেজেই চলছে ওপাড়ে। ফোনটা বিথী রিসিভ করে। আবার সেই ঘুম জড়ানো কণ্ঠেই বলে
: হ্যালো …
: আমার সাথে তুমি বাইরে বেরুবে?
: না ….
: আচ্ছা রাখছি।
আবির ভেবে পায় না বিথীর হলোটা কি ; ও তো কখনই এমন না। দুপুরে কখনই এমনভাবে ঘুমিয়ে পড়ে না। ক্লাশ থেকে ফেরার পথে বলেছিল শরীরটা ভালো যাচ্ছে না, হবে হয়ত।
আরো অনেক পরে আরো একবার ফোন করে বিথীকে। আবার জিজ্ঞেস করে – তুমি এখন বেরুবে?
ঘুম জড়ানো চোখে বিথী আগের মতোই বলে – আমার ভিষন ঘুম পাচ্ছে।
আবির ফোনটা কাটার আগে বলে – ঠিক আছে, এখন ঘুমোও। সন্ধ্যায় বেরুবো। আমি বন্ধুদের সাথে এখন নদীতে যাচ্ছি। ফিরে এসে তোমাকে ফোন দেব।
বিথী কিছুই বলে না, আসলে ঠিকমত শুনতেও পায়নি ওপাশ থেকে আবির কী বলেছে। ফোনটা কেটে দিয়েছে বুঝতে পেরে বালিশের পাশে রেখে বিথী চোখ বন্ধ করে। কেউ যেন দু’চোখের পাতা এক করে দিল পরম মমতায়। ঘুম… ঘু… ম…।

ধুপ ধাপ কিছু শব্দ কানে ভেসে আসে। চারিদিকে চিৎকার চেঁচামেচিও শোনা যাচ্ছে। বিথী অনেক কষ্টে টেনে চোখ খোলে। সামনেই একটা মেয়ে কাঁদছে। চিৎকার করে কিছু একটা বলছে। ঠিকমত কানে আসছে না কোন কথাই। আরো কিছু মেয়ে ওর সামনে এসে দাঁড়ালো। সবাই কি যেন বলছে। শুধু নেই শব্দটা বার বার কানে প্রতিধ্বণীত হচ্ছে। সবার কান্না দেখে সম্বিত ফিরে পায়। অসহায়ের মতো ওদের মুখের দিকে তাকায়। কেউ একজন এসে বিথীর হাত ধরে টেনে তোলে বিছানা থেকে। জড়িয়ে ধরে বলে – ‘আবির নেই।’
আবির নেই মানে কি? সবাই কেন বলছে আবির নেই? আচ্ছা এখন রাত নাকি দিন। ওর স্পষ্ট মনে আছে দুপুরে ঘুমিয়েছিল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো, সন্ধ্যা হয় হয়। আকাশভরা মেঘ তাই অসময়েই সন্ধ্যা নেমেছে। বিথীর মস্তিস্কের নিউরণগুলো কিছুটা সময়ের জন্য বোধ হয় কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। সেসব আস্তে আস্তে ধাতস্ত হচ্ছে। সবার কান্নার শব্দ আর কথাগুলো কানে ঢুকছে, বুঝতেও পারছে। সব কথা ছাপিয়ে একটা কথাই বার বার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বিথীর কানে – ‘আবির নেই’
সবার মতো করে ওর কান্না পাচ্ছে না। বুকের ভেতরটা চিন চিন করে ব্যথা করে উঠছে। নিজের মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনে দেখে অনেকগুলো মিসড কল হয়ে আছে। সবগুলোই আবিরের। একবার সবার মুখের দিকে, আবার একবার মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকায়।
‘বন্ধুদের সাথে নদীতে গোসল করতে গিয়ে পানিতে ডুবে গেছে আবির’ জেনিথের কথা কানে আসতেই ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখ ভিজে ওঠে। গড়িয়ে পড়ে পানি। নিজের ওপর নিজেরই প্রচণ্ড রাগ হয়। কেন এত ঘুম পেয়েছিল ওর ? কেন এতগুলো কল করলেও সে শব্দ ওর কানে গেল না ? নিজেকে করা একটা প্রশ্নের উত্তরও নিজের কাছ থেকে পায় না। কারো কোন কথাই কানে ঢোকে না বিথীর। শুন্য দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সামনের দিকে।

গল্পটা শুরু না হতেই শেষ হয়ে গেল

এ পর্যন্তু লিখেই লেখাটা আর এক লাইনও এগুতে চাইলো না। বেশ ক’দিন অপেক্ষা করলাম ; কিন্তু না আমার মাথা কিংবা হাত থেকে একটা শব্দও আর বেরুচ্ছে না। লেখাটাতো আমাকে শেষ করতেই হবে। ভেবেছিলাম একটা উপন্যাস লিখবো। না হলেও একটা গল্প। ধ্যাত শুরু না হতেই শেষ হয়ে গেল গল্পটা। আমার জীবনের গল্পগুলোতো এমনই, ছোট; একেবারেই ছোট। আবিরেরটা আরো ছোট। কোথায় শুরু আর কোথায় শেষ তার আগাপাছা কোনটাই নেই সেসব গল্পের। এইতো এলো, এসেই আসছি বলে সেই যে গেল আর ফিরে এলো না। এটাও কী একটা গল্প হতে পারে ? না থাক গল্পের দরকার নেই। আমার আর ওর কিছু কথাই বলি। জানি সেসব গল্প হবে না, উপন্যাস হবে না এমনকি সাহিত্যের কোন ধারার পর্যায়েও পড়ার সম্ভবনা নেই। তার পরেও বলবো, লিখবো। নইলে তো দম বন্ধ হয়ে মারা যাবো। অতএব গল্প বাদ, জীবনের কথা বলি।

মাটির কথা দিয়েই শুরু

জীবনের মধ্যে আবার মাটি এলো কোত্থেকে! সন্তান আমার কাছে ফসল। ফসল ফলাতে মাটি লাগে। মাটি বাদ দিয়ে ফসলের কথা বলাটা চরম স্বার্থপরতা। তাই মাটি দিয়েই শুরু হোক।
‘মেয়েটার নাম খেলনা’ আড্ডায় মতিন কথাটা বললো। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি রিক্সায় বসা মেয়েটা তখন অনেক দূর চলে গেছে। আমি শুধু তার পিঠে ছড়িয়ে পড়া চুলগুলোই দেখছিলাম। ধ্যাত, খেলনা কারো নাম হয় নাকি ?
: হ্যাঁ, ওই মেয়েটার নাম খেলনা ।
: হোক বাজি হোক, মেয়েটার নাম যদি খেলনা হয় আমি ওকে বিয়ে করবো। বাজির এমন শর্ত শুনে সবাই দাঁত কেলিয়ে হেসে ওঠে। আড্ডা তারপরেও চলে। অনেক কথা হয়। কথায় কথায় চাপা পড়ে খেলনার কথা।
সেদিন কথা চাপা পড়লেও আমার ভেতরে কিন্তু বার বার উঁকি মারছিল সেদিনের শর্তের কথাটা। ইয়ার্কিচ্ছলে অনেক কথাইতো আমরা এখানে সেখানে বলে থাকি। ক’টা কথাই মনে থাকে। অজানা কোন কারণে আমার সে কথাটা বার বার মনে হতে থাকে। দু’দিন পরেই মতিনের কাছে ঠিকানা নিয়ে প্রায় আট কিলোমিটার দূরের এক গ্রামে চলে গেলাম। বাসাটা খুঁজে বের করে দরজায় শব্দ করলাম। একজন মধ্যবয়সী নারী দরজা খুললেন।
: এটা কী খেলনাদের বাসা?
: জি, বলেন। আমি খেলনার মা।
: আপনি কি আপনার মেয়েকে বিয়ে দেবেন?
আমার এমন ভূমিকা ছাড়া সরাসরি প্রস্তাবে কিছুটা বিব্রত হন তিনি। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন – মেয়ে যখন আছে বিয়ে তো দিতেই হবে।
: আমি আপনার মেয়ের জন্য একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছি, যদি বিয়ে দিতে আগ্রহী হন তবে এ ঠিকানায় খোঁজ খবর নিয়ে মতামত জানাবেন।
সেদিনই বিকেলে তাঁদের মতামতটা পেয়েছিলাম। ক’দিন পরেই আমি আমার বাবাকে পাঠিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব সাথে, বিয়ের তারিখটাও দেয়ার কাজটা সেরে ফেলি।
আমার এবং ওদের দুটো পরিবারই চরম অর্থ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।
বিয়েতে তেমন কোন আনুষ্ঠানিকতা নেই, বাজনা বাজেনি, আলোর রোশনাই ছোটেনি। তবু সেটা বিয়ে…

ফসলের গল্প

১৬ জানুয়ারি ১৯৯৫ সাল।
ঠাকুরগাঁওয়ে সেদিন তীব্র ঠাণ্ডা। চারদিকে ঘন কুয়াশা, সূর্যের দেখা নেই কদিন ধরে। ফসল ঘরে তোলার ধুম লাগলো সেদিন। প্রথম বাবা হওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন। নিজেকে কেমন যেন বোকা বোকা লাগছিল। কি করবো, কি করতে হবে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। বাড়িতে মুরব্বী গোছের কেউ নেই যে পরামর্শ নেব। প্রতিবেশি দু-চারজন মহিলাই ভরসা। সবাই যখন ঘর ছেড়ে গেল তখন ঘরে ঢুকলাম আমি। ক্লান্ত অবষন্ন খেলনা বিছানায় শুয়ে আছে। আমার ডাকে সম্বিত ফিরে পায়। দু চাষির দৃষ্টি তখন ফসলের ওপর।
প্রচণ্ড ভালোবাসি খেলনাকে, খেলনাও তাই। ফসল মাঝখানে রেখে চাষির গল্প শেষ হয় না। কথা আর স্বপ্নের মালা সাজাতে সাজাতেই সিদ্ধান্ত নেই ফসলের নামকরণেও আমরা জড়িয়ে থাকতে চাই। যে কথা সেই কাজ। আজমত এর আ নিলাম আর মাহফুজা এর ম নিলাম। ফসলের নাম রাখলাম আবির মাহফুজ। ওর নামের মাঝে মালা হয়ে জড়িয়ে থাকলাম আমরা। এক বছর বয়সের সময় আবিরের এমন একটা অসুখ হলো যা এর আগে আমরা কখনও কারো দেখিনি, শুনিনি। ঝাঁকুনী মেরে জ্ঞান হারিয়ে ফেলতো। সারারাত এমন কয়েক বার হলো। গ্রামের অনেকেই জ্বিন-ভূতের আসরের কথা বলল, আমি কারো কথা না শুনে শেষ রাতে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। তাঁর পরামর্শে পরবর্তী ২ বছর ৬ মাস একটানা ওষুধ খাওয়ালাম। আবির সুস্থ্য হলো কিন্তু ডাক্তার সাহেব তখনই বলে দিয়েছিলেন ‘ও একটু অস্থির প্রকৃতির হবে, আঠারো পার হওয়ার পরে ঠিক হয়ে যাবে।’ সেকথাটা আবিরের আঠারো হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা একদিনের জন্যও ভুলিনি। আবিরের প্রথম স্কুল ঠাকুরগাঁওয়ের ‘সান কিন্ডার গার্টেন’। আঙ্গুল ধরে ধরে সেই স্কুলে নিয়ে যেতাম। ২য় শ্রেণি পর্যন্ত ওখানেই পড়ে। এরপর আমার চাকরি ক্ষেত্রে বদলি হয়ে যাওয়ায় ভর্তি করি পঞ্চগড়ের ডোকরোপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এ স্কুল থেকেই পঞ্চম শ্রেণি পাশ করে। একই সাথে ও ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায়। এরপর ভর্তি হয় পঞ্চগড় সরকারি বিপি হাইস্কুলে। আবার আমি ঠাকুরগাঁওয়ে বদলি হয়ে চলে এলাম। আবির ভর্তি হলো ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে। এখান থেকেই ২০১১ সালে জিপিএ ৫ পেয়ে এসএসসি পাশ করে। ও নিজে থেকেই তখন বলে ‘ঢাকায় যাবে, ওখানেই পড়বে।’ ভর্তি করালাম ট্রাস্ট কলেজে। এ কলেজ থেকে ২০১৩ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়ে পাশ করে।

স্বপ্নটা অধরাই রয়ে গেল

আবির ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতো সেনাবাহিনীতে যাবে। সেভাবে নিজেকে তৈরি করতে থাকে। এইচএসসি ফলাফল প্রকাশ হওয়ার আগেই ৭৩তম বিএমএ লং কোর্সের জন্য আবেদন করে। এরপর আবার ৭৫ তম বিএমএ লং-কোর্সের জন্য। ভাগ্য খারাপ অথবা কোন অযোগ্যতার কারণে দুবারই আই এস এস বি থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়। ও ভীষণ ভেঙ্গে পড়ে। লেখাপড়া ছেড়ে কোন কাজ করতে চেয়েছিল। অনেক বুঝিয়ে আবার লেখাপড়ায় ফিরিয়ে আনি। ভর্তি হয় জাতীয় বস্ত্র প্রকৌশল ও গবেষণা ইন্সটিটিউটে।

আবির যখন জাতীয় বস্ত্র প্রকৌশল ও গবেষণা ইন্সটিটিউটে…

এখানে ভর্তি হওয়াটা ছিল একান্তই আমার ইচ্ছায়। ওর মন অন্য কিছু চাইতো কিন্তু কি চাইতো সেটাও স্পষ্ট করে কিছু বলেনি। ভর্তির সময় আমিই সাথে ছিলাম। প্রথম দিন চারজন একসাথে টাকা জমা দিতে ব্যাংকে গেল। কায়েস, প্রাণ, ফুয়াদ, আবির। ওরা এক বেঞ্চে যখন বসেছিল তখন আমি সদ্য কেনা ক্যামেরাটা দিয়ে চারজনের একটা ছবি তুলি। সেখানেই চারজনকে বলি ‘একসাথেই থেকো তোমরা।’ কিছুদিন ওরা একসাথেই ছিল, এক রুমেই ছিল। পরবর্তীতে ব্যক্তিত্বের সংঘাতে প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা হয়ে গিয়েছিল। বিষয়টা নিয়ে ও আমার সাথে আলাপও করেছিল। কায়েসের সাথে বন্ধুত্বটা আরো কিছুদিন নিভু নিভু করে জ্বলেছিল। ২য় বর্ষে উঠেই ইন্সটিটিউটে এমন কিছু একটা হয়েছিল যা ওকে প্রচ- আঘাত দিয়েছিল। অনেক জানতে চাইলাম কিন্তু ও কিছুতেই মুখ খুললো না। শুধু বললো আমি এখানে আর পড়বো না। অনেক বোঝানোর পরেও ওর কথাতেই অনড় থাকলো। আমি শেষ পর্যন্ত রাজি হলাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে পরের দিনই দুপুরে ফোন করে বললো, কাল যা বলেছি ভুলে যাও। মন খারাপ কর না। আমি এখানেই থাকবো, লেখাপড়াও করবো। কেন চলে যেতে চেয়েছিল কেনই বা থাকতে চাইলো কিছুই জানলাম না। এভাবেই ভালো মন্দে মিশিয়ে কেটে যায় তৃতীয় বর্ষ ওর। ৪র্থ বর্ষে উঠেই ওর ভাবনায় অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। ভাবনাগুলো অনেক পরিণত এখন। ওর ভাবনা জুড়েই ছিল পরিবার, একটা কাজ আর বিয়ে করে সংসারী হওয়া….

আমি যখন পিতা এবং বন্ধু

আমাকে আবির যতটা না বাবা হিসেবে পেয়েছে তারচে অনেক বেশি পেয়েছে একজন বন্ধু হিসেবে। মন থেকে দেহ, বইয়ের পাতা থেকে সিনেমার সিকোয়েন্স, জগতে এমন কোন বিষয় নেই যেটা নিয়ে আলাপ হত না। ওকে বলেছিলাম যে কোন সমস্যায় আমাকে আগে ফোন দিও’। এ কথাটা আবির কখনই শোনেনি। অধিকাংশ সময়ে নিজেই নিজের সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করেছে। অনেক সমাধান করেছেও। যেখানে গিয়ে আটকে যেত সেখানেই কেবল মাত্র আমাকে জানাতো এবং সাহায্য চাইতো। আমি রেগে গিয়ে বলতাম ‘এখন কেন জানাচ্ছো?’ ও অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে থাকতো। একদিন ওর বন্ধুকে এ ব্যাপারটা নিয়ে নালিশ করেছিলাম। বন্ধুটি আমাকে জানিয়েছিল ‘আপনারা ওকে নিয়ে অনেক চিন্তা করবেন এজন্যই কিছু ঘটলেও জানাতে চায়না।’ আর যখন ওকেই জিজ্ঞেস করেছিলাম তখন জবাব দিয়েছিল ‘যেটা আমি পারি সেটাতে কেন তোমাকে ডেকে আনবো ?’ যুক্তির কাছে হার মানি আমি।
ক্যাম্পাসের প্রিয় মুহূর্তগুলো আমার সাথে শেয়ার করতো। একবার এসে আবেগাপ্লুত হয়ে জানালো, ওর সেদিন জন্মদিন। সন্ধ্যার পর মন খারাপ করে বসেছিল কোথাও। কোন এক বন্ধু ফোন করে বলে প্রশাসনিক ভবনের ছাদে আয়। দূর থেকেই অন্ধকার ছাদটা দেখে ভাবে ওখানেই বন্ধুরা হয়ত আড্ডা মারছে। পায়ে পায়ে ছাদে ওঠে। হঠাৎ করেই ওকে চমকে দিয়ে ছাদটা আলো ঝলমলে হয়ে উঠলো। সমস্বরে সবাই গেয়ে উঠলো ‘হ্যাপী বার্থডে টু ইউ।’ জানিনা গল্পটা সত্যি নাকি বন্ধুদের বড় করতে বানিয়ে বলেছিল। যেটাই হোক গল্পটা বলার সময় ওর চোখ ছল ছল করছিল। আমাদের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারটিতে কখনই ‘হ্যাপী বার্থডে টু ইউ’ বলে কারো জন্মদিন পালন করা হয়ে ওঠেনি। সেরকম ইচ্ছেও কখনই হয়নি। তবে আমরা চারজনেই সেদিনটাতে বাসায় থাকি। প্রতিদিনের চে একটু ভালো কিছু রান্না করি। উপহার দেয়া হয়নি কখনও। নিটারে ভর্তি হওয়ার পর জন্মদিন এলে আবির ফোন করে বলতো ‘বন্ধুদের খাওয়াতে হবে, টাকা দাও’। আমি এক হাজার টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি গত তিন বছর। এ বছর সে সুযোগটা আসেনি।

যখন বন্ধু প্রয়োজন হলো

সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত আমাদের আঙ্গুল ধরেই সে হেঁটেছে। তেমন কোন বন্ধুই ছিল না। ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আস্তে আস্তে পাল্টাতে শুরু করলো ও। সেটাও একটা কাহিনী। আমি জানতামই না। অনেকদিন পর ঘটনাটা জানার পর যখন ওর সামনা সামনি হলাম তখন আমার কোন যুক্তিই দাঁড় করাতে পারিনি সেখানে। ঘটনাটা হয়েছিল কি, আবির গ্রাম থেকে শহরের স্কুলে যেত। ওকে গ্রাম্য অথবা গাঁইয়া হিসেবেই চিহ্নিত করলো কেউ কেউ। ক্লাসে সামনের বেঞ্চে যত আগে গিয়েই বই রাখুক না কেন সেটা হয় পেছনে পাঠিয়ে দিত অথবা ফ্লোরে ফেলে দিত। এভাবে ওর ভেতরে এক তীব্র ক্ষোভ জমা হতে থাকে। প্রতিদিন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে কিন্তু কোন সমাধান পায় না। তখন কেউ একজন এগিয়ে আসে, পরামর্শ দেয় কারো সাহায্য চাইতে। এভাবেই নতুন এক বন্ধু সার্কেল পেয়ে যায়। সে বন্ধুরা দাঁড়িয়ে থাকে আর আবির যারা তার সাথে এমন করেছিল তাদের জবাব দেয়। এরপর আর কখনও আবিরের সাথে এমন হয়নি। ওই ছেলেগুলোও আবিরের বন্ধু হয়ে যায়। আর এ উসিলায় আরো যার যার সাথে এমন অন্যায় আচরণ হতো সেসবও বন্ধ হলো। এতটুকু শোনার পর আমি তাকে বললাম – তুমি কারো কাছে না গিয়ে আমার কাছেই তো আসতে পারতে, আমাকেই সব বলতে পারতে।
: তোমার কাছে আসলে এসব কথা বললে তুমি বলতে‘থাক কাউকে কিছু বলার দরকার নেই,সহ্য কর। যে সহে সে রহে’।
আবিরের কথা সত্য। এভাবেই শিখিয়েছি, এভাবেই বলেছি। আমার কথা শুনে এভাবে সহাসহি করতে গিয়ে এক সময় দেখেছে ছাল উঠে যাচ্ছে। প্রয়োজনই তাকে শিখিয়েছে দলবদ্ধ হয়ে থাকতে। তবে বন্ধুত্বের একাট্টা শক্তি যেন কোন অনৈতিক কাজে ব্যবহার না করা হয় সে কথা বলা কখনই থামাইনি।

এসএসসি পাশ করার পর ভর্তি করালাম প্রাইভেট কলেজ ‘ট্রাস্ট কলেজে।’ প্রাইভেট কলেজ সম্পর্কে কোন ধারণা না থাকলেও নিজস্ব হোষ্টেল সুবিধা এবং কড়া নিয়ম কানুনের কারণে আমি এখানে আগ্রহী হই। তখনই অনুভব করি আমি যেটাকে নিয়ম কানুন আর শৃঙ্খলা বলছি সেটাই আসলে ওর কাছে সবচে বড় সমস্যা। নিয়ম করে ঘুম থেকে ওঠা, ক্লাসে যাওয়া, নিয়ম করে খাওয়া, ঘুমোতে যাওয়া কোনকিছুর সাথেই ও মানিয়ে নিতে পারছিল না। ও মুক্ত আকাশ চাইতো, ঘুরে বেড়াতে চাইতো, যেটা ওখানে সম্ভব ছিল না। সেখানেও কিছু বন্ধু জুটে। ওখানেও অকেগুলো ঝামেলায় পড়ে। শিক্ষকরা আমাকে ডেকে বলেন ‘অন্যদের ঝামেলাগুলো ও নিজের কাঁধে কেন তুলে নিচ্ছে ?’ আমি যখন ওখানে গিয়ে এ ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলি তখন ও নির্দ্বিধায় বলে “বিপদে বন্ধুদের ছেড়ে চলে যাবো ? দুঃসময়ে হাত ধরে থাকাই তো বন্ধুত্ব।’ তুমি কি আমাকে বিপদে বন্ধুদের ছেড়ে যাওয়ার শিক্ষা দাও ?
আমি বার বার ওর কাছে হেরে যাই। আমি শেখাতে গিয়ে প্রতিবারই নতুন কিছু শিখে আসি ওর কাছ থেকে। যে শিক্ষকরা ভেবেছিলেন আবির পাশই করতে পারবেনা তাঁদের কপালে বিস্ময়ের চিহ্ন ফুটিয়ে কোন প্রকার প্রাইভেট না পড়ে কোচিং না করে গোল্ডেন জিপিএ ৫ নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে। এমন-ই ছিল ও।

ছোটদের জন্য ভালোবাসা

ছোটদের জন্য ছিল ওর ভিন্নমাত্রার ভালোবাসা। ও যখন ছুটিতে আসতো তখন খবর পেলেই বড় মাঠে (ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ)অনেক জুনিয়র দল বেঁধে এসে ওর সাথে দেখা করতো। জুনিয়ররা দেখা করতে এসেছে আর ও কিছু খাওয়ায়নি এমন ঘটনাও কম আছে। অনেক জুনিয়র যাকে আবির বলতো ‘ছোট ভাই’ তারা বাসায় আসতো। এমন একজন ছোট ভাই একবার বাসায় এলো। খাওয়া-দাওয়া করিয়ে নিজের বিছানায় বালিস দিয়ে বললো এখানে ঘুমো। ছেলেটি চলে যেতে চাইলে ও ধমকের সুরে বলে ‘এই দুপুরে তুই কোথায় যাবি, এখন ঘুমো বিকেলে উঠে চলে যাস।’ কিছুক্ষণ পর ছেলেটি বললো ভাইয়া আমার ঘুম আসছে না। আবির ছেলেটির পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো এবার ঘুমো। আমরা অবাক হয়েছিলাম। সেই ছেলেটির আমন্ত্রণে ওদের বাড়িতে গিয়েছিল আবির। আবির চলে যাওয়ার পর ছেলেটি তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছে ‘ভাইয়াটা আর আসবেনা জানলে কখনই যেতে দিতাম না।’ বদরাগি, একরোখা কোন নিয়ম না মানা ছেলেটি কখনও কখনও এমন শিশুর মতোই হয়ে যেত। দৈর্ঘ্য প্রস্থে সবাইকে ছাড়িয়ে গেলেও মনের দিক দিয়ে শিশুই ছিল। অথবা বলা যায় ওর ভেতরে একটা শিশুকেই সযত্নে লালন করতো। কোথাও কোন শিশুকে খেলতে দেখলেই সেখানে গিয়ে দাঁড়াতো আর এক সময় তাদের সাথেই খেলায় মেতে উঠতো। টিভির সামনে বসলেই কার্টুন চ্যানেল ছিল ওর প্রথম পছন্দ। এ নিয়ে আমি অনেক রাগারাগি করেছি, বলতাম তুমি কি এখনও বাচ্চা? ওর মুখে কোন ভাবান্তর নেই। মুগ্ধ হয়ে কার্টুন চরিত্রগুলোর সাথে একাত্ম হয়ে যেত। শিশুদের ভালোবাসতো এমন প্রমাণ আরো পেয়েছি যখন জানলাম ঢাকায় ‘হাসিমুখ’ নামের একটি সংগঠনের সাথে জড়িত হলো। পথ শিশুদের নিয়ে কাজ করতো হাসিমুখ। ওখানে ও যেত, ওদের সাথে সময় কাটাতো। কখনও কখনও ওদের পড়াতো। ওর ক্যাম্পাস থেকে প্রতিদিন যেতে পারতো না বলে অনেক আফসোস ছিল ওর। হাসিমুখের পক্ষ থেকে জামালপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও একবার গিয়েছে শীতবস্ত্র বিতরণ করতে। শিশুদের জন্য ওর মন কতটা কাঁদতো তার একটা ঘটনা শুনুন। তখন ও কলেজে পড়ে, সবেমাত্র সতের বছর বয়স। এক বন্ধুর সাথে ঢাকা মেডিকেলে গেছে তার অসুস্থ মা কে দেখতে। ওখানে এক দরিদ্র মহিলা তার বাচ্চার জন্য একব্যাগ রক্ত চেয়ে কান্নাকাটি করছিল। আবির আমাকে ফোন করলো, আমি ওকে নিষেধ করলাম, বললাম তোমার এখনও আঠারো বছর বয়স হয়নি। এখনই না, কদিন দেরি কর ( আমিও যখন প্রথম রক্ত দিতে যাই তখন এমন একটি কথা শুনেছিলাম, সেটাই মনে ছিল। কতটা ঠিক সে ব্যাপারে আমার কোন জ্ঞাণ নেই)। কিছুক্ষণ পর আবির আমাকে ফোন দিয়ে বললো ‘মাফ করে দাও, তোমার কথা রাখতে পারলাম না। মহিলার বাচ্চাটা অনেক অসুস্থ’ আমি রক্ত দিয়েছি। আমি আর কিছু বলিনি। অনেকের সাথে ওর একটা পার্থক্য ছিল সেটা হলো এমন সব কাজ যে কাজগুলোকে আমরা ভালো কাজ বলে জানি সেগুলো কখনই কাউকে বলে করতো না। এমনকি ওর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাও অনেকেই অনেক কিছু জানতো না। আমরা জানতাম, তবে তা অনেক পরে। ও নিজেও ছিল শিশুর মতোই। একদিনের ঘটনা, নিটার থেকে ছুটিতে বাসায় এসেছে। দুপুরে খাবারের টেবিলে ওর মাকে বলে খাইয়ে দিতে। ওর মা ব্যস্ত ছিল তাই ধমক দিয়ে বললো – তুমি কি এখনও ছোট আছো নাকি ? আমার অনেক কাজ পড়ে আছে। এখন খাওয়াতে পারবো না। কথা এতটুকুই, এতেই রেগে মেগে খাবার টেবিল থেকে উঠে বাইরে চলে গেল। ঘন্টাখানেক অপেক্ষার পর ডেকে এনে পাশে বসে খাইয়ে দিল। আমাদের ধারণা ছিল ও অনেক বড় হয়ে গেছে কিন্তু বাস্তবতা ছিল আমাদের কারণেই ও শিশুর মতোই থেকে গিয়েছিল।

রাজনীতিতে ওর ঝোঁক, আমাদের ভয়

প্রচণ্ড ঝোঁক ছিল ওর রাজনীতিতে। আর আমাদের সাফ জবাব ছিল ‘এটা কখনই না।’ শুধু একারণেই কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির চেষ্টাটুকুও করতে দেইনি। আমরা জানতাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারলেই ও ছাত্র রাজনীতিতে জড়াবে। আর জড়ালেই ও নেতা হতে পারবে বা হয়েই যাবে। আমরা নিশ্চিত ছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কখনও গোলাগুলি হলে প্রথম গুলিটা ওর গায়েই লাগবে। এমন ভাবার পেছনে যথেষ্ট কারণ ছিল। নেতা হওয়ার মতো যথেষ্ট যোগ্যতা ছিল ওর। খুব সহজেই মানুষকে আপন করে নিতে পারতো। যাদের আপন মনে করতো তাদের ভালোবাসতো। আর যাদের ভালোবাসতো তাদের জন্য জীবন উৎসর্গ করাটা হাতের চুটকি বাজানোর মতোই মনে করতো। ওর স্কুল কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধুরা ভালো বলতে পারবে যে, ও বন্ধুদের বিপদে কখনও পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে থেকে মজা দেখেনি। সামনে এগিয়ে এসে বুক চেতিয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন ঘটনায় কতবার যে বিপদে পড়েছে তার ইয়াত্তা নেই। কতবার আমি নিষেধ করেছি, রাগ করেছি কিন্তু কোন কথাই শোনেনি। বার বার একই জবাব দিয়েছে “অমন স্বার্থপর আমি হতে পারবোনা।’ বুক চেতিয়ে কথা বলতে পারতো, সাদাকে সাদা বলতে পারতো। যতবড় লাট সাহেব হোক কেউ অন্যায় বললে, অন্যায় করলে সোজা তার মুখের ওপরেই বলে দিত, প্রতিবাদ করতো। বহু দেখেছি এমনরা তো বাঁচেনা, বাঁচতে দেয়া হয় না। তাই আমাদের ভয় ছিল কখনও নেতৃত্ব পেলে ও সামনে গিয়ে দাঁড়াবেই, কথা বলবেই আর নিশ্চিত ভাবেই মরবে অথবা মেরে ফেলা হবেই। নিটারেও ছিল অসম্ভব জনপ্রিয়। নেতা ছিল না কারণ ওখানে কোন রাজনীতি ছিল না। তবে ওর এমন জনপ্রিয়তায় ঈর্ষা ছিলো কারো কারো। যারা প্রতি মুহূর্তেই ওকে বিপদে ফেলতে চাইতো।

কারো মতো ছিল না ও

চোখে চোখে রেখেছিলাম মাদক যেন না ধরে। জঙ্গির খাতায় নাম যেন না ওঠাতে পারে। শেষ পর্যন্ত সিগারেটটা বোধ হয় ধরেছিল। অনুমান নির্ভর করেই একদিন বললাম “এটার ক্ষতিকর দিকগুলোতো জানো, তারপরেও?” ও জবাব দিল ‘এটা নেশা হয়নি। বন্ধুদের সাথে থাকি। দু-এক টান মেরে সঙ্গ দেই শুধু। আমরা মেনেও নিয়েছিলাম, ওর কথায় বিশ্বাসও করেছিলাম। এই যে চোখে চোখ রাখলাম, পকেট চেক করলাম,সকাল বিকেল উপদেশের বস্তা উগলে দিলাম তাতে লাভটা হলো কী ? ধরেতো রাখতে পারলাম না। আমার কেবলই মনে হতে থাকে “ওরাই বরং ভালো যারা গাঁজা, ভাঙ্গ, ফেনসিডিল, ইয়াবা টেনে নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে। সন্ধ্যা হলে দু-চারশ টাকা দিলেই খুশি মনে চলে যায়, ফিরে আসে গভীর রাতে। খেয়েছে নাকি খায়নি কে রাখে তার খবর। ওই যে ঘুমলো একেবারে পরের দিন বিকেলে জেগে উঠে যা পায় তাই গোগ্রাসে খেয়ে আবার বাইরে চলে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এদের তেমন কোন অসুখ বিসুখও করে না। যাই কিছু করুক তবু তো বেঁচে থাকে, বাবা মায়ের চোখের সামনেই থাকে। আমরা তো আবিরকে বাঁচাতেই পারলাম না, ওই মুখ কোনদিন আর দেখতে পাবো না।
নিয়মের মধ্যে থাকা, নিয়ম মেনে চলা কিংবা কারো মত হওয়া ওর পছন্দের ছিল না। বরাবর সবার চে একটু আলাদাই থাকতো, নিজেকে আলাদা করে রাখার চেষ্টা করতো। আত্মসম্মানবোধটা ছিল প্রবল। কেউ একবার আঘাত দিয়ে কথা বললে সেটা কখনই ভুলে যেত না। কষ্ট পেলে মন খারাপ করে চুপ করে বসে থাকতো। নিজের যত কাছের মানুষই হোক না কেন সেটা। যদি কখনও বলতাম ‘ওর দিকে দেখতো, তোমারই তো বন্ধু’ এ পর্যন্ত শুনেই রেগে যেত। স্পষ্ট করে বলতো “আমি কারো মত না, আমি কারো মত হতে পারবো না। আমরা চুপ করেই থাকতাম। নিয়ম করে ঘুমোতে যাওয়া, ঘুম থেকে জেগে ওঠা, পড়তে বসা, ক্লাস করা কোনটাই নিয়মের মধ্যে ছিল না। এমনকি খাওয়ার ব্যাপারেও কোন শৃঙ্খলা ছিল না। পকেটে টাকা থাকলে যা ইচ্ছে হবে সেটা যত টাকাই লাগুক খেয়ে ফেলবে আর যখন পকেট ফাঁকা তখন একটা পাঁচ টাকার পাউরুটি আর এক গ্লাস পানিই যথেষ্ট। ছোট ভাইদের কাছে ওর উপদেশ ছিল ‘কোন কিছু খাওয়ার ইচ্ছে হলে আগে খেয়ে নাও, পরের চিন্তা পরে করো। খাওয়ার ইচ্ছে এবং ওই খাবারটাই আবার নাও পেতে পারো। কোনকিছুই আটকে থাকবেনা।’ এমন সর্বনাশা বুদ্ধি অনেক ছোটভাই ভালোবেসে গ্রহণ করে তৃপ্তি লাভ করেছে বলেই শুনেছি। একবার আবিরকে বললাম বাবা একটা টিউশনি জোগাড় করেতো নিতে পারিস, তোর পকেট খরচটা হয়ে যাবে। আমার কথা শুনে ঠিকই একবার একটা টিউশনি জোগাড় করে ফেললো। মাত্র এক মাস পড়ালো তারপর বাদ। জিজ্ঞেস করলাম বাদ দিলি কেন? লস আইটেম। ওর সোজা সাপটা জবাব। আমি ওর কথার কোন অর্থ খুঁজে না পেয়ে চেপে ধরলাম আমাকে খুলে বল কী হয়েছে ? কেন পড়াতে চাস না ? উত্তরে ও যা বললো তা হলো ছাত্র পড়ানোর সম্মানী অথবা বেতন যেটাই বলি ওটা আনতে যাওয়ার দিন এক বন্ধু জিজ্ঞেস করেছিল। ও মুখ ফসকে বলে ফেলেছিল ‘টাকাটাটা নিয়ে আসি।’ টাকা নিয়ে ফেরার পথেই সব বন্ধুরা পথ আগলে দাঁড়ায়, সবার মুখেই একটা শব্দ শোনা যায় ‘খাওয়া।’ শেষে ওদের খাওয়াতে গিয়ে পকেট থেকে আরো দু-একশ টাকা চলে যায়। ওই শেষ, আর কখনই ও পথ মাড়ায়নি।
নিটারে ভর্তির কিছুদিন পরই আবির কেমন যেন অস্থির হয়ে ওঠে। রাতে ফোন করেও পাইনা। ফোন বাজে কেউ ধরে না। আবার ধরলেও কয়েক সেকেন্ড কথা হয় ‘আব্বু একটু পর কথা বলছি।’ কয়েক মাস পর যখন বাড়িতে এলো তখন বিবর্ণ রুক্ষ এক চেহারা। জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে তোমার ? ও বরাবর যেভাবে কথা বলে সেভাবেই বললো না, কিছু হয়নি। আমাদের ধারণা হল নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছে বোধ হয়। পরের বার যখন বাড়িতে এলো তখন ও আমার জন্য একটা সিনেমা নিয়ে এলো। হিন্দি সিনেমা ‘সিনেমাটা দেখ’। এরচে বেশি কিছু বলেনি। আমি সিনেমাটা দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। ও কি বলতে চেয়েছে আমি বুঝতে পেরেছি। আমি বললাম আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি। ও আমার হাত চেপে ধরে না, তুমি কিছু বলবে না। আমি নিজেই পরিস্থিতি মোকাবেলা করবো। ঠিকই, ও নিজেই সব সামলে নিয়েছিল। র্যাগিং নামক ভয়ানক অপরাধের কবল থেকে মুক্ত করতে পেরেছিল। প্রথম দিকে ব্যাপারটা বুঝতো না বলে প্রতিবাদ করেছিল তাই ওর ওপর অত্যাচারটা নেমে এসেছিল ভয়ানকভাবে।ও নিজেই সেটা সামলে নিয়েছিল। শুনেছি পরবর্তীতে ওদের অনেকের সাথেই সম্পর্কটা অনেক ভালো হয়েছিল। এই যে সম্পর্ক তৈরি এটা কিন্তু আবির অনেক ভালো পারতো। ছোট ভাই বড় ভাই, মামা, আন্টি, আপু আরো কত কত সম্পর্ক যে তৈরি করেছিল সে হিসেবটা মনে হয় ওর নিজের কাছেও ছিল না। আর সম্পর্ক তৈরি করেই খান্ত হয়নি। সেটা টেনে নিয়ে গেছে বহুদূর। ফলে ওকে সহজেই কেউ ভুলে যেতনা। স্নেহ, সম্মান, ভালোবাসা শেষ দিন পর্যন্ত সমানভাবে পেয়ে এসেছে। একবার আমি আর আবির শাহবাগে দাঁড়িয়ে আছি বাসের অপেক্ষায়। বাস থেকে এক ভদ্রলোক নেমে সোজা আমাদের দিকেই এগিয়ে এলেন। আবির তাকে দেখেই হাত উঠিয়ে সালাম দিল। ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দিলেন। তিনি একজন চিকিৎসক। আবিরের সাথে তার পরিচয় আছে, ব্যস এতটুকুই। আবিরকে শাহবাগে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি বাস থেকেই নেমে এলেন। এই যে ভালোবাসা, সম্পর্ক এটা আবির তৈরি করে নিতে পারতো। আবির চতুর্থ বর্ষে এসে ক্যাম্পাসের বাইরে এক বাসায় একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে থাকতো। সেই বাড়ির মালিকের স্ত্রীকে আবির আন্টি ডাকতো। সেই ভদ্রমহিলা আবিরকে কখনও ভাড়াটিয়া মনে করতেন না। আবিরের সার্ট প্যান্টগুলো একবার জোর করেই নিজের হাতে ধুয়ে দিয়েছিলেন। এরপরেও একাধিকবার আবিরকে বলেছেন কাপড় ভিজিয়ে রাখিও, ধুয়ে দেব। আবির লজ্জায় এ কাজটা আর তাকে করতে দেয়নি। এই যে এখানে একজন মালিকের স্ত্রীকে প্রথমে নারীতে পরিণত করা তারপর সেখান থেকে মা বানিয়ে ফেলার মতো যোগ্যতা আবিরের সহযাত। সম্পর্কটা ও শুধু মুখের ডাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতো না, যাকে যেভাবে ডাকতো তাকে সে স্থানে বসিয়ে দিত। এরপর নিজে সম্পর্কটা বিশ্বাস করত এবং তাকেও বিশ্বাস করতে বাধ্য করত।এই যেমন কাউকে ছোটভাই ডাকলো, তার জন্য এমন অনেক কিছুই করে যা সেই ছেলেটির চোখে আবিরকে বড়ভাই করে তোলে। কাউকে বড় ভাই ডাকলো, তার কাছে আবিরের সব আবদার ছোট ভাইয়ের মতোই হয়। এমন আমরা অনেকেই পারি না। প্রয়োজনের খাতিরে কেউ কাউকে ভাই, আপু, চাচা, নানা এমনকি বাবা বলেও ডাকি কিন্তু সেটা স্রেফ মুখ ডাকা। অন্তর দিয়ে একবারও অনুভব করি না বা করারও চেষ্টা করি না। সে সব সম্পর্কের জন্য কখনও কোন টান অনুভব করি না। আবির করতো। তাদের আনন্দে সামিল হতো তাদের কষ্টে চোখের পানি ফেলতো, তাদের বিপদের দিনে আগ পাছ না ভেবেই পাশে গিয়ে দাঁড়াতো।
আবিরের যখন জন্ম তখন আমি খুব সামান্য বেতনে একটা চাকরি করি। অভাবে ছিলাম এটা বলবো না। খুব অল্পতেই আমি খুশি হতে পারি। হয়ে ছিলামও তাই। মাত্র ২ হাজার ৭শ টাকার একটা চাকরি করেও কখনই না খেয়ে থাকিনি সেকেন্ড হ্যান্ড জামা গায়ে দিয়েছি, ছেঁড়া সেন্ডেল জোড়া দিয়ে পায়ে ঢুকিয়েছি তবু কেউ কেমন আছি জিজ্ঞেস করলেই বলতাম ‘আলহামদুলিল্লাহ।’ মনের দিক থেকে খুশি ছিলাম। উপার্জন করতে হবে এটা নিয়ে কখনই হাপিত্যেশ করিনি। আমার সহকর্মীদের জিজ্ঞেস করে দেখবেন এ কথার সত্যতা আছে কিনা। নিজের স্ত্রী আর ছেলে মেয়েকেও একই শিক্ষা দিয়ে এসেছিলাম। খুব অল্পতেই কিভাবে খুশি থাকা যায়। আবিরও সে শিক্ষাটা গ্রহণও করেছিল। কোন ঈদেই ওকে বলতে শুনিনি ‘এটা কিনে দাও ওটা কিনে দাও’ কিংবা ‘এটা নেব না, ওটা নেবনা।’ যা সামর্থে কুলিয়েছে তাই দিয়েছি, তাই নিয়েছে। আস্তে আস্তে বড় হয়েছে আর ‘প্রয়োজন’ ব্যাপারটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মুখ ফুটে কিছু বলতো না। বাবার সামর্থের কথা বিবেচনা করেই হয়ত এমন করেছে। যখন বুঝতে পারতাম প্রয়োজনটা মেটানোর চেষ্টা করেছি। হয়তো কখনই ওকে ‘ষোল আনা’ দেয়া হয়নি। একবার ওকে পরীক্ষা করার জন্য ঈদের কদিন আগে মুখ ভার করে বললাম ‘ এবার ঈদে আমার হাতের অবস্থা ভালো না, তোমাদের কিছু দিতে পারবো না’। আমি ওর প্রতিক্রিয়া দেখতে চাইছিলাম। আশ্চযর্ ! ও কিছুই বলল না, স্বাভাবিক ভাবেই এটা মেনে নিল। আমি লুকিয়ে নিয়ে আসা কাপড়টা ঈদের দিন সকালে ওর হাতে দিলাম। কিছু দেব না শুনে হয়ত রাগ করেনি, হয়ত মেনেও নিয়েছিল কিন্তু হাতে পাওয়ার পর ওর মুখে যে হাসি দেখেছিলাম তা যে কোন বাবা জীবনের বিনিময়ে হলেও সন্তানের মুখে দেখতে চাইবে।
এমন ছোট-খাটো আনন্দগুলোই আমাদের জীবন ভরিয়ে রাখতো। উল্লেখ করার মতো আমাদের জীবনে বড় কোন আনন্দই নেই। পোড় খাওয়া জীবনে আবিরের জন্মই তখন আমাদের কাছে সবচে বড় আনন্দের ঘটনা। আবিরকে বলতাম আনন্দের ফসল। এক বিছানায় দু-পাশে দুজন শুয়ে আবিরকে মাঝখানে রেখেছি অনেকগুলো বছর।
ভিষণ জেদি ছিল ছোটবেলা থেকেই। রাত দুপুরে ঘুম ভেঙ্গে চিৎকার করতো আর দরজার দিকে দেখিয়ে দিত। এর মানে হল ওকে এখন বাইরে নিয়ে যেতে হবে। শীত,বর্ষা কিংবা রাত এসব কিছুই তো আর ও বোঝে না। বাইরে যেতে চেয়েছে মানে বাইরে নিয়ে যেতেই হবে। যতক্ষণ বাইরে না নিয়ে যাওয়া হবে ততক্ষণ এভাবে কান্না চলতেই থাকবে। নিরুপায় হয়ে তাই করতে হতো। বাইরে থেকে ঘুরিয়ে আনলেই চুপ করে ঘুমিয়ে যেত।
অষ্টম শ্রেণির পর থেকেই আস্তে আস্তে আমাদের আঙ্গুলটা ছাড়তে শুরু করলো ও। আমাদের জায়গাটা নিল বন্ধু। খুব দ্রুত বন্ধুর সংখ্যা বাড়তে থাকলো, এটা বুঝতে পারছিলাম। বন্ধুদের মধ্যে আবার শ্রেণি ভাগ করা ছিল। কেউ ফুটবল খেলার বন্ধু তো কেউ ক্রিকেট খেলার বন্ধু। কেউ আড্ডার বন্ধু তো কেউ বাইকে চড়ে ঘুরতে যাওয়ার বন্ধু। আরো এক শ্রেণির বন্ধু ছিল, তারা হলো গ্যাঞ্জামের বন্ধু। কোথাও কোন ভেজাল হয়েছে তো সেই বন্ধুদের ডাক পড়বে। এমনতর অসংখ্য বন্ধু তৈরি হতে থাকলো ওর। ব্যাপারটা যে মোটেও ভালো নয় সেটা ওকে বোঝালাম কিন্তু বন্ধু ছাড়তে পারেনি কখনই। এক সময় অনুভব করলাম আমাদের আঙ্গুলটা পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছে। এখন একাই সিদ্ধান্ত নিতে পারে, এখানে ওখানে যেতে পারে। আমাদের সাথে সময় না দিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারতে পারে।
ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১১ সালে জিপিএ-৫ পেয়ে এস এস সি পাশ করলো। যখন ও নিজ থেকেই বললো ঠাকুরগাঁওয়ের বাইরে কোথাও পড়বে তখন আমরাও খুশি হলাম এই ভেবে যে এবার অন্ততঃ বন্ধুর মেলা থেকে আলাদা করা যাবে।
প্রাইভেট কলেজগুলো সম্পর্কে আমার তেমন কোন ধারণা ছিল না। আমি চেয়েছিলাম কড়া শাসনে রেখে লেখাপড়া করানো হয় এবং নিজস্ব হোস্টেল আছে এমন একটা কলেজ। উত্তরার ট্রাস্ট কলেজটাই আমার পছন্দ হলো। ভর্তি করিয়ে দিলাম সেখানে। আমার মনে হয় আবিরকে নিয়ে এটাই ছিল আমার জীবনের প্রথম একটা ভুল। আমি ওর মানসিকতা বুঝতে পারিনি। কড়া শাসনের প্রতিষ্ঠানে ওকে পড়তে পাঠিয়েছি, কিন্তু ও তো কড়া শাসন মেনে নিতে পারে না। বন্দী দশা ও কখনই স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। গুমড়ে কেঁদে মরেছে। অনেক কষ্ট পেয়েছে ওখানে। তারপরেও লেখাপড়াটা চালিয়ে গেছে। ২০১৩ সালে ট্রাস্ট কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচ এস সি পাশ করে।
আমি তো দূরে থাকি। হোষ্টেলে কেমন থাকে না থাকে এসব জানার জন্য মনটা খুব ছটফট করতো। মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল। কথা বলতে চাইলে হোস্টেল সুপারের কাছে ফোন করতে হতো, তিনি ডেকে দিলে কথা বলা যেত। সে সময়টাতে আবিরকে দেখে রেখেছেন একজন শিক্ষক। প্রতি মুহুর্তে আবিরের খোঁজ নেয়া থেকে শুরু করে ওকে দাঁড় করিয়ে রাখতে অক্লান্ত শ্রম দিয়েছেন তিনি। শ্রদ্ধায় মাথা অবনত হয় তাঁর অমন ভালোবাসা দেখে। সে শিক্ষকের নাম সুশান্ত কুমার। জানিনা তিনি এখনও সেখানে আছেন কিনা। তাঁর সাথে যেদিন আমার শেষ কথা হয় তিনি সেদিন কেন জানি বললেন ‘আবির খুব বোকা ছেলে।’
আপনার কথাটা একদম সত্যি স্যার। জানি না কোথায় আছেন। আপনার কথার সত্যতা প্রমাণ হয়েছে। আপনি ভালো থাকুন স্যার, অশেষ শ্রদ্ধা আপনার জন্য।

কেউ যখন এলো

উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পরই আমরা আবিরকে বিয়ে করিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। ব্যাপারটা সবার কাছেই হাস্যকর ঠেকলো। আমরা যত সিরিয়াস ভাবেই বলিনা কেন কেউ সেটা বিশ্বাস করছিলনা। আমরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিলাম বিয়ের পরে আবির লেখাপড়া করবে আর বউটাও লেখাপড়া করবে। প্রথম প্রথম আবিরও ব্যাপারটা মজা হিসেবেই নিল। খুব উৎসাহ দেখালো কিন্তু যখন দেখলো আমরা সত্যি মেয়ে দেখছি তখন না করে দিল। কারণটা জানতে চাইলাম,এও বললাম ‘তোমার পছন্দের কেউ আছে’?
ও না করে দিল, সাফ জানিয়ে দিল কাউকেই কখনই ভালো লাগেনি। তোমরা যাকে পছন্দ করবে তাকেই বিয়ে করবো। আবির নিটারে ভর্তি হলো, বিয়ের কথাটা আর এগুলো না। তবে আমরা ওকে বলে দিলাম তুমি লেখাপড়া কর এবং একই সাথে কাউকে পছন্দ কর। তুমি যাকে পছন্দ করবে তাকেই বউ করে আনবো। ও আবার বললো কাউকেই আমার ভালো লাগেনা। প্রতিবার বাড়িতে এলেই ওকে নিয়ে আমরা বসি।
: কাউকে পছন্দ হলো?
: না।
সাফ জবাব দিয়ে দেয়। আমরা রাগ করার ভাব দেখাই। যাকে পছন্দ করবো তাকে নিয়েই ঘর করবো, কিন্তু কাউকে পছন্দ তো হতে হবে। আবিরকে আবার সময় দিই। বছর খানেক আগে বাড়িতে এলে সবাই বসে আড্ডা মারছি। ওকে মনে করিয়ে দিই সময় চলে যাচ্ছে মেয়ে পছন্দ করা হয়েছে কি না ? ও মুখ ভার করে বলে একজনকে ভীষণ পছন্দ হয়েছিল। পছন্দের কখাটা ওকে জানালাম, মানা করে দিল।
আমরা হাসাহাসি করলাম,
: বললাম তোকে পছন্দই করলো না ?
: না, ব্যাপারটা এমন না।
: তাহলে ?
: মেয়েটা একমাস আগেই কাউকে পছন্দ করেছে, কথা দিয়েছে তাকে।
: ঠিক আছে, অন্য কাউকে দেখ, পছন্দ কর।
: না, আমি আর কাউকে দেখবোনা, তোমরাই পছন্দ কর। ওকে দেখার পর আর কাউকে আমার এ চোখে ভালো লাগবে না।
অদেখা অচেনা মেয়েটির প্রতি আমারও রাগ হয়। আমার ছেলেটাকে কেন একমাস আগে দেখলো না এ আক্ষেপ আমাকেও কুড়ে খাচ্ছিল। আবিরের কষ্ট আমাকে স্পর্শ করে।
এর কিছুদিন পর আবির যখন আবির বাড়িতে এলো তখন প্রচণ্ড খুশি। আমরা ওর এমন খুশির কারণ জিজ্ঞেস করলে বলে
: মেয়েটা আমাকে মিথ্যে কথা বলেছিল।
: কোন মেয়েটা?
: আরে ওই যে, আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল।
আমাদের কান খাড়া হয়,আশাব্যঞ্জক কিছু একটা শোনার জন্য উৎসুক হই,
: বল বল এরপর কী হলো?
: কি আর হবে; দেখি না কি হয়।
এভাবে দেখতে দেখতেই কেটে যায় অনেকগুলো মাস।
জুনের মাঝামাঝি বাড়িতে এলো। কদিন পরেই ঈদ উল ফিতর। আসার আগে ঢাকা থেকে ইলিনের জন্য একটা জামা কিনে এনেছে। ওর মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনতে গিয়েছিল। শাড়ির দাম শুনে ওখান থেকেই ফোনে বলেছিল মা, শাড়ির এত দাম ! আমার কাছে তো এত টাকা নেই। আর কদিন পরেই তো কাজে ঢুকবো। প্রথম মাসে বেতন পেয়েই তোমার জন্য একসাথে পাঁচটা শাড়ি কিনে আনবো।
ছেলের এমন কথায় মা খুব খুশি হয়। ছেলেকে ফোনেই বলেছিল দিতে হবে না বাবা, তুই বলেছিস তাতেই আমি খুশি হয়েছি। আবির বাড়ি ফিরে সে কথাটা আবার ওর মাকে বলে। মা, তুমি রাগ কর না, চাকরিটাতে জয়েন করে প্রথম বেতন পেলেই তোমাকে শাড়ি কিনে দিব। ওর মা সান্ত¡না দেয়, তুমি কি এখনও উপার্জন কর যে আমাকে শাড়ি কিনে দিতে হবে?
আবির চুপ করে যায়। এই যে ও ওর বোনের জন্য একটা জামা কিনে এনেছে কিংবা মায়ের জন্য শাড়ি কিনতে চেয়েছে সে টাকাটা ওর খরচের টাকা থেকেই বাঁচিয়ে করেছে। ও চুপ করে গেলেও আমি কিন্তু চুপ করিনি। ওকে রাগাতে শুরু করি। তুমি একটা শাড়ির দাম জানোনা, বিয়ে করবে কীভাবে ? সংসার করবে কীভাবে? কিচ্ছু হবে না তোমাকে দিয়ে। তোমার মতো বোকা ছেলের সাথে কোন মেয়ে ঘর করবে না।
আমার এমন কথা শুনে আবির রাগে না। একটু হাসে, মুখটা গম্ভীর করে বলে ওর সাথে আমার মনে হয় ঘর করা হবে না।
আমারা দুজনেই চমকে উঠি, তাহলে কী আবারও মেয়েটা না করে দিয়েছে? নাকি অন্য কিছু হয়েছে? ওর মা চেপে ধরেÑ আমাকে বলতো কি হয়েছে? মেয়েটা কিছু বলেছে?
: না, ও খুব ভালো মেয়ে, আমাকে অনেক ভালোবাসে।
: তাহলে?
: ওর কাছ থেকে আমিই সরে যাবো ভাবছি।
: তুমি কি এসব খেলা পেয়েছো? এখন ভালো লাগলো বললে ভালোবাসি আবার বিকেলে ভালো লাগলো না তখন বললে ওর সাথে নেই?
: না মা এমন নয়, এর আগে ওর মতো কাউকে কখনই খুঁজে পাইনি। এত ভালো ও কাউকে লাগেনি। আমি এতদিন মনে মনে যেমন একটা মেয়ে খুঁজেছিলাম ও ঠিক তাই। আমার বিশ্বাস তোমাদেরও অনেক পছন্দ হবে।
: আমাদের পছন্দ হোক নাহোক, তুই যাকে পছন্দ করেছিস সেটাই আমাদের পছন্দ।
: তোমাদের ভাবনার সাথে একেবারেই মিলে যাবে ও।
: মিলুক না মিলুক। ও যেমনই হোক। আমার ছেলেকে যে মেয়েটা ভালোবাসতে পারে সে আমাদের পছন্দ হতে বাধ্য, আমাকে ছবি দেখা। ওর মায়ের আবদারে শেষ পর্যন্ত আমরা মেয়েটার ছবি দেখলাম। এক দেখাতেই পছন্দ হল। আমি কপালে ভাঁজ ফেলে বলি
: তোর মতো এমন একটা ছেলেকে এই মেয়েটা ভালোবাসলো ? ঠিক বলছিস তো, নাকি বানিয়ে গল্প বলছিস ?
আমাদের ছোট পরিবারটিতে তখন উৎসব উৎসব ভাব। আবির কাউকে ভালোবাসে, কোন একটি মেয়ে আবিরকে ভালোবাসে এটাই আমাদের উৎসবের অনুষঙ্গ। রাতে শুয়ে শুয়ে আমি আর আবিরের মা কত রকম স্বপ্ন দেখি, স্বপ্নের পর স্বপ্ন দিয়ে স্বপ্নের একটা মালা গাঁথি। কোথায় অনুষ্ঠান করবো, বউকে কত ভড়ি গহনা দেব, বউকে এনে তুলবো কোথায়। এমন অনেক স্বপ্ন। সারারাত পরিকল্পনা করলেও সকালে মনে হয় অপূর্ণই থেকে গেল। এটা এমন না তো ওটা অমন না। এটা এভাবে করতে হবে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পরেও পরক্ষণেই আবার নতুন সিদ্ধান্ত। ঘরের পর্দাগুলো কোন কাপড়ের কিংবা কোন রঙের হবে সেটা নিয়েও আমাদের মত বিরোধ চরমে উঠে যায় কখনও কখনও। শেষ পর্যন্ত দুজনেই এ সিদ্ধান্তে পৌঁছি যে এটা বিথীর কাছে জিজ্ঞেস করে নেব।
ইলিন চমৎকার ছবি আঁকতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক তেমন কোন শিক্ষা না থাকলেও ওর অনেক ছবি দেখে অনেকেই প্রশংসা করেছে। ইলিনের আর একটা গুন হলো ও পোশাকের ডিজাইন করতে পারে। এসব অবশ্য নিজের জন্যই করে কিন্তু আজ পর্যন্ত একটাও নিজের ডিজাইনে পোশাক বানায়নি। শুধু এঁকে এঁকে জমিয়ে রেখেছে। ইলিন একদিন দুটি ডিজাইনের ছবি নিয়ে আমাদের সামনে এলো।
: কি এটা?
: লেহেঙ্গার ডিজাইন।
: বানাবা?
: এখন না।
: কখন?
: ভাইয়ার বিয়ের সময়। একটা ভাবীর জন্য একটা আমার জন্য। ঠিক এমন হওয়া চাই
আমি আর ওর মা মুখ চাওয়া চাওয়ি করি। আমি ইলিনকে আশ্বস্ত করে বলি
: ঠিক আছে, মিরপুর থেকে বানিয়ে এনে দেব।
শুনেছি ওখানে ডিজাইন দিলে সেরকমই বানিয়ে দেয়। ঈদের পর যখন আবিরের চলে যাওয়ার সময় হলো তখন এসব নিয়ে আবার আমরা কথা তুললাম। আবিরকে আমাদের পরিকল্পনার কথা জানালাম। ও আমাদের মত খুশি হল না। শুধু ঠোঁটের কোণে একটুকরো হাসি দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। নির্লিপ্তভাবে বললো- এত খুশি হয়ো না।
ওর কথা শুনে আমি এবং ওর মা রেগে গেলাম। ধমকের সুরেই বললাম
: আবার এসব কথা কেন?
: আমার মন বলে বিথীর সাথে আমার ঘর করা হবে না।
আমরা দুজনেই স্তব্ধ হয়ে যাই। ভেবে নিই, ও তো সবসময় খামখেয়ালীপূর্ণ কথাই বলে। এটাও তার ব্যতিক্রম নয়। এ নিয়ে আর কথা বাড়াই না।
চলে যাওয়ার দিন আমিই কোচষ্ট্যান্ডে ওর সাথে গেলাম। গাড়ি না ছাড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। ওকে কোচষ্ট্যান্ডে এগিয়ে দিতে চাইলে বরাবর নিষেধ করে। আমি কি মনে করে যেন এদিন জিজ্ঞেস করি-
: আমি তোমাকে কোচ স্ট্যান্ডে ছাড়তে আসি, এটা আমার মনের ব্যাপার। আমার ভালো লাগে। তুমি মানা কর কেন? আবির সরাসরি আমারে দিকে না তাকিয়েই বলে- আমার মনের জন্য মানা করি।
: মানে ?
: মানে কিছুনা। একা একা বাসা থেকে বের হলে মনে হয় বাইরে যাচ্ছি, আবার আসবো। তুমি এগিয়ে দিতে আসলে মনে হয় বিদায় নিচ্ছি। অনেক দূরে কোথাও চলে যাচ্ছি।
কোচ ছাড়লে আমার কান্না পায়। আমি আর কথা বলতে পারি না। আমরা দুজনেই নিরব হয়ে থাকি কিছুক্ষণ। নিরবতা ভাঙ্গে আবির।
: চা খাওয়াবা ?
: হুম।
আবির নিজেই গিয়ে দুকাপ চা নিয়ে এলো। পরিবেশটা হালকা করার জন্যই হয়তবা আবির এটা করেছে। কারণ এর আগে কখনই আবির আমার কাছে চা খেতে চায়নি। কাপ দুটো ফেরত নেয়ার সময় আবির বলে- বিল তুমি দিবা নাকি আমি দেব ? আমি পকেটে হাত ঢুকালাম টাকা বের করার জন্য।
: এবার দাও, এরপর তো তোমাকে আর বিল দিতে হবে না, আমিই দিব। বলেই কাপ নিয়ে ফেরত দেয়ার জন্য চলে গেল। ফিরে এসেই কোচে গিয়ে উঠল। কোচটা ছাড়ার পর্য়ন্ত আমি সেখানে দাঁড়িয়েই থাকলাম। ও একবার জানালা পথে মাথা বের করে আমাকে উল্টে দেখলো এবং হাত নাড়ালো। সেই শেষ যাওয়া।

আমার সাথে শেষ দেখা

জুলাই’র ২৩ তারিখে মাত্র এক দিনের জন্য জরুরি প্রয়োজনে আমাকে ঢাকা যেতে হলো। আবিরের সাথে দেখা করার মতো সময় হবে না জেনেও আমার মনটা ছটফট করছিল ওর সাথে দেখা করার জন্য। নেমেই হাতের ব্যাগটা থুয়ে আমি রওনা দিলাম সাভারের উদ্দেশ্যে। আবিরকে রুমেই পেলাম। দুপুর একটায় ওর পরীক্ষা। দুজনে একসাথে বাইরে খেলাম। ওর ইন্সটিটিউটের শেষ কিস্তির টাকা জমা দেয়ার ডেট অক্টোবরে। কেবল জুলাই চলছে। আমার মন কেবলই বলছে টাকাটা দিয়ে দেয়ার জন্য। আমি অফিসে গিয়ে বললাম শেষ কিস্তির টাকাটা আমি আগাম দিয়ে দিতে চাই। অফিস সম্মতি দিল। ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে আবার ফিরে এলাম অফিসে। অফিস পেমেন্ট কপি দেখে, সকল পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে মর্মে একটা ‘ছাড়পত্র দিল।’ সেটা নিয়ে যখন বের হলাম তখন আবির অপেক্ষা করছিল পরীক্ষার হলে ঢোকার জন্য। আমার হাতে ছাড়পত্রটা দেখে বললো তোমাকে তো আর টাকা দিতে হবেনা,এটাই শেষ।
টাকা যে আর দিতে হবে না সেটাতো আমিও জানি। ওর বলার দরকার ছিল না, তারপরেও বললো। আবির পরীক্ষা দিতে চলে গেল। আমি ওর রুমে গেলাম বিশ্রাম করতে। পরীক্ষা শেষে বের হয়েই আমাকে বললো- বাবা এখানে একটা চমৎকার নদী আছে,চল দেখবে। অনেক সুন্দর।
: না, আমার অনেক কাজ নিয়ে এসেছি। নদী দেখতে যাওয়ার মত সময় আমার নেই। ও আমাকে আবার জোর করতে থাকে নদী দেখতে যাওয়ার জন্য।
: নদীটা অনেক সুন্দর, ভুলতে পারবে না। আমারা প্রায়ই বিকেলে সময় কাটাই নদী পাড়ে বসে। আমি ধমক মেরে বলি- এখন ভড়া নদী, খবরদার তুমি নদী পাড়ে যাবে না। ও গভীর আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে- আরে না না, কিচ্ছু হবে না। আমার বন্ধুরা সাথেই থাকে। আমি আর কথা বাড়াই না। ও আমাকে কোহিনুর গেট থেকে বাসে উঠিয়ে দেয়। নবীনগর পার হওয়ার পর খেয়াল করে দেখলাম ওর ঘরের চাবিটা আমার পকেটেই থেকে গেছে। আমি বাস থেকে নেমে আবার কোহিনুর গেটে গিয়ে দেখি আবির ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে। চাবিটা ওর হাতে দিয়ে আবার বাসে উঠি। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে এবারও নবীনগর পার হওয়ার পর খেয়াল করলাম আবিরের ঘরে আমার গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস রেখে এসেছি। এবার আর নামলাম না বাস থেকে। জানতামই না আমার ভাগ্য কেন বার বার আবিরের কাছে ডাকছে। সেটাই শেষ দেখা এজন্যই কি? বুঝলাম মাত্র সাত দিন পরই। নদীটা নিশ্চয়ই অনেক সুন্দর ছিল নইলে চিরদিনের জন্য ওখানে ঘুমালো কেন ? প্রকৃতি আমাকে ইশারা দিয়েছিল , সে ইশারা বোঝার ক্ষমতা আমার ছিলনা।

মনে হাজার প্রশ্ন, উত্তর পাই না একটাও

আবির নেই।
নেই মানে কী ?
কেউ বলে না আবির মরে গেছে। এর একটা কারণ হল কেউ বিশ্বাসই করে না ব্যাপারটা। ওর স্কুল, কলেজ কিংবা নিটার জীবনের একজন বন্ধুও পাইনি যে বলেছে এটা বিশ্বাস করি। আমার কোন আত্মীয় স্বজন কিংবা ফেসবুকের কাছে দূরের বন্ধুরা কেউ কেন এটা মানতে পারছে না ? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরেছি জনে জনে। দুএকজন যা জবাব দিয়েছে তা হলো ‘আবির কিছুটা সরল সোজা কিন্তু এতটাই না যে সে বুঝবে না কোথায় তার মৃত্যু ওঁৎ পেতে থাকতে পারে।’ বহুবার ভেবেছি
১) কেন একটা ছেলে বিকেল ৫টার পর গোসলের জন্য নদীতে যাবে? যখন নদীর ঘাট থাকে সুনসান নীরব?
২) কেন সেদিন নদীর এপাড়ে কোন নৌকা ছিলনা? যেখানে প্রতিদিন ৩/৪টি নৌকা বাঁধা থাকে?
৩) ওরা সেদিন ৪জন বন্ধু ছিল, কেন ৪ জনই আলাদা আলাদা কথা বলছে ?
অর্থাৎ কারো কথার সাথেই কারো কথার মিল নেই কেন?
৪) কেন অপর ঘাটে থাকা নৌকার মাঝি এমন একটা ঘটনা দেখার পরেও উদ্ধারে এগিয়ে এলেন না?
৫) ওখানে ৪ জন বন্ধু এবং দু’জন গ্রামবাসী ছিল, এদের মধ্যে ৫ জনই সাঁতার জানতো। ৫ জনে মিলে একজনকে কেন উদ্ধার করতে পারলো না?
৬) আবির সাঁতার কেটে এক হাতও যেতে পারে না, তাহলে কালভার্ট থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে চলে গেল কীভাবে?
৭) ধরে নিলাম প্রবল স্রোত থাকায় পানিতে পড়ার সাথে সাথেই ও ভেসে গেছে অত দূরে। তাহলে প্রায় ৫০ মিনিট পর উদ্ধার কর্মীরা এলে ঠিক সেখানটাতেই দেহটা পড়ে ছিল কীভাবে? এটাতো স্রোতে বহুদূর চলে যাওয়ার বা হারিয়ে যাওয়ার কথা ছিল।
৮) পানিতে ডুবে আবির মারা গেছে অথচ আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে ওর ফুসফুসে কিংবা পাকস্থলিতে কোন পানিই ছিল না।
একজন বাবার অশান্ত মন এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফেরাটাই স্বাভাবিক। কোন উত্তর না পাওয়াই অস্বাভাবিক। হয়ত প্রশ্ন করবেন তাহলে কী ওকে হত্যা করা হয়েছে? না, আমি তা মনে করি না। আবিরকে হত্যা করতে পারে কেউ এটা বিশ্বাস করি না। আবিরের সাথে যারা মিশেছেন তারাই বলতে পারেন আমি কতটা সত্য বলেছি। আবার এটাও ঠিক যে, কোন কারণ তৈরি হতে এক মিনিটও সময় লাগে না। আমি বরং তখনই বেশি খুশি হতাম যদি এটা নিশ্চিত হতে পারতাম যে ওকে হত্যা করা হয়েছে। জানি আমার কথা শুনে চোখ কপালে উঠেছে। নিজেকেই প্রশ্ন করছেন কেন আমি খুশি হতাম। উত্তরটা আমিই দিয়ে দিচ্ছি। এমন ঘটে থাকলে আমার সন্তানকে প্রমাণ করে দিতে পারতাম আমি তাকে কতটা ভালোবাসি। কীভাবে সেটা ? এ উত্তরটা আপনিই ভেবে নিন।

অন্ধ বন্ধুত্ব এবং জীবনের দাম না জানা

আবির তার বন্ধুদের অন্ধভাবে বিশ্বাস করতো। কেন এটা করতো তা আমাদের জানা ছিল না। আমাদের নিষেধ সত্বেও করতো। কত বুঝিয়েছি ব্যাপারটা কিন্তু ও কখনই কানে তোলেনি। বিশেষ করে কলেজ জীবনের বন্ধুদের এবং কলেজ ছেড়ে আসার পর নিটারের বন্ধুদের। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বন্ধুত্ব হয় মুলতঃ গ্রুপ ভিত্তিক। ও এর ব্যতিক্রম ছিল না। প্রথম গ্রুপটা যেকোন কারণেই হোক ভেঙ্গে যাওয়ার পর আর একটা সার্কেল গড়ে ওঠে। মৃত্যুর এক সেকেন্ড আগেও এ গ্রুপটাই সাথে ছিল। বাবা মায়ের মন বলে কথা। অবচেতনভাবেই জুন মাসে যখন বাড়িতে এলো তখন বলেছিলাম – এমন বন্ধু বন্ধু খেলা বাদ দাও, বন্ধুদের কারণেই কোনদিন এমন বিপদে পড়বা যে সেখান থেকে উঠে আসার রাস্তা পাবা না।
ও আগের মতোই বলেছে – আমার বন্ধুরা অনেক ভালো, আমাকে কখনও ছেড়ে যায় না। আমরা আবারও হার মানি ওর কাছে। অনেক কথাই ও শুনেছে আমাদের। যা যা শিখিয়েছি অনেক কিছুই শিখেছে। শুধু একটা মাত্র কথা কোনদিন শোনেনি তা হলো বন্ধুদের ছেড়ে দেয়ার কথা। বন্ধু ভালো, বন্ধুত্বও ভালো কিন্তু বন্ধুত্ব যদি মৃত্যু ফাঁদ হয়ে ওঠে সেটা অবশ্যই ভাল না। তাহলে কী ছেলে-মেয়েরা বন্ধুত্ব করবে না? কেন করবে না, আমার কি বন্ধু ছিল না? এখনও নেই? বন্ধুত্বকে আমরা ব্যবহার করেছি সৃজনশীল উত্থানের সিঁড়ি করতে। এই যে আমি আজ যা কিছুই লিখতে পারি, কোথাও দাঁড়িয়ে দুটো কথা বলতে পারি, সুস্থ্ শুদ্ধ একটা চিন্তার সাথে থাকতে পারি তা কিন্তু আড্ডা থেকেই শিখেছি, বন্ধুরাই শিখিয়েছে। আমার কাছ থেকেও হয়ত কেউ কিছু শিখে থাকবে। এখনও এ বয়সে বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারি। আড্ডায় কথা হয় রাজনীতি, ধর্ম, সামাজিক অবস্থা কিংবা ভালো কোন বই নিয়ে। বাজার করতে গিয়ে কি ঝক্কি পোহাতে হয় সে কথাটাও সে আড্ডা থেকে বাদ যায় না। হয়ত বলবেন আমি যেমন বুড়ো আমার আলাপগুলোও তো বুড়োর মতোই হতে হবে। না জনাব, শুধু এখন না, সেই তখনও আমরা এসব নিয়েই আলাপ করতাম। এখনকার তরুণেরা তো জানেই না নিজের ভেতরে কী আছে। বাইরে বের করে আনাতো অনেক দূরের কথা। জীবনের দামটা কতটুকু তা তাদের ধারণার মধ্যেই নেই। সেই গল্পটার মতো করেই বলতে হয়, ছেলেটি একটা পুরনো দিনের পাথর লোকাল মার্কেটে দু’আঙ্গুল দেখিয়ে ভোক্তার কাছে দাম শুনেছে ২ ডলার আর সেই একই পাথর যখন মিউজিয়ামে নিয়ে গেল তখন সেই দু’আঙ্গুল দেখিয়ে দাম উঠলো ২ লাখ ডলার। এরা এদের জীবনের দামটা লোকাল মার্কেটের মতো ২ ডলার ভেবে নিয়ে এগুতে থাকে। এটাই যে কোথাও গিয়ে ২ লাখ ডলার হতে পারে তা তাদের ধারণায় নেই। আমরাও অভিভাবকেরা সে ধারণা তাদের দিতে পারি না। দিলেও তারা সেটা বিশ্বাস করে না। তারা বরাবরই বন্ধু যেটা বলে সেটাই বিশ্বাস করে। ওদের আড্ডায় একবার যদি কেউ উচ্চারণ করে বসে ‘দোস্ত লাইফটা হেল’ তো গেল সব। উপস্থিত সবাই একবাক্যে স্বীকার করে নেবে আসলেই লাইফটা হেল। ওরা জীবনকে ভেবে নেয় একটা ফুটবল। চারপাশে একটা রেখা টানা জমিনে সেটা রেখে ২২ জনে লাথি মারতে শুরু করে। একবার সে বল চলে যায় বিপক্ষ দলের গোলপোষ্টের নেটে তো একবার চলে আসে সেন্টারে। একবার গোলকিপারের হাতে ধরা পড়লে এমন লাথি মারে যে সেই বল চলে যায় সাইড লাইন অতিক্রম করে মাঠের বাইরে। সব খেলা শেষ। এই যেমন আবির, ও যদি জানতো বা কখনই জানার চেষ্টা করতো ওর জীবনটা শুধু ওর না। ওই একটা জীবনের সাথে জড়িয়ে আরো আছে আরো কয়েকটা জীবন, একটি পরিবার। তাহলে ও কখনই বন্ধুদের সাথে ভড়া নদীতে যেত না। ওর জীবন যে আমাদের কাছে কত দামি ছিল সেটা নিশ্চয়ই আমরা তাকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি। তার কাছে তার জীবন মানেই শুধু তারই জীবন। তার জীবনটা মানেই সেই গল্পের মতো তার গণ্ডিতে ২ ডলার দাম। সে জীবনতো হেলা ফেলায় নষ্ট হবেই। এটা রুখবার পথ ছিল কি ? হ্যাঁ এটা রোখা যায় যখন সে নিজেই বোঝে তাকে জড়িয়ে আছে কিছু স্নেহের পরস, কিছু স্বপ্নজাল, কিছু দায়িত্ববোধের শিকল। অদৃশ্য এ বন্ধনগুলো ছিঁড়তে শক্তি লাগে না, লাগে সামান্য অবহেলা। কখন সেসব ছিঁড়ে যায় নিজেই টের পায় না। পরিণতি ভয়াবহ।
আমরা আমাদের সন্তানকে জন্মের পরই শিখিয়েছি লেখাপড়া কর, জিপিএ ফাইভ পাও, ভালো কোথাও ভর্তি হও, লেখাপড়া শেষ কর, একটা মোটা মাইনের চাকরি কর। এর বাইরে কোন জীবন শেখাতেই পারিনি কেউ। আমি যখন কলেজে পড়ি তখনও সকালে উঠে বাড়ির গরুর জন্য এক বস্তা ঘাস কেটে তারপর গোসল সেরে কলেজে গিয়েছি। আমার বাবা আমার দশ এগারো বছর বয়সের সময়েই বাজারের ব্যাগ হাতে দিয়ে বলেছে ‘যা বজার থেকে এসব নিয়ে আয়’। বাজার থেকে ফেরার পর গুনে গুনে টাকা পয়সার হিসেব নিতেন। ডাকঘর থেকে একগাদা পোষ্টকার্ড এনে হাতে দিতেন। বলতেন অমুককে একটা চিঠি লিখ, অমুকের ঠিকানাটা লিখ। লিখেছি, আর লিখতে লিখতেই শিখেছি শেকড় কি জিনিস, কত নীচে সেটা প্রোথিত থাকে। আমরা কেউ কি এ কাজটা করি? গরুর জন্য ঘাস কাটতাম মানেই ছিল গরুর সাথে আমার একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা। আমি ওকে ঘাস কেটে দিই; ও আমাকে প্রতিদিন দুধ দেয়। গরু তার কাজটা কি সেটা জানতো আর আমি জানতাম আমার কাজটা কি। ঘাস না কাটলে গরুর দুধ কমে যেত। সমস্যাটা হতো আমার এবং পুরো পরিবারের। তাহলে তথন থেকেই পরিবারের জন্য একটা কর্তব্যবোধ তৈরি হয়েই গিয়েছিল। গরুটাও পরিবারের বাইরের কেউ না। এখন হয়ত বলবেন সন্তান মানুষ করতে হলেই কি গরু পালতে হবে আর ঘাস কাটতে হবে? না এমন কথা আমি বলি না। আমার ছোটবেলাটাই আমি বললাম। একবার আবিরকে এসব এভাবেই বলেছিলাম। ও বললো তোমার বাবা তোমাকে এভাবেই বড় করে তুলেছেন, তুমি অভ্যস্থ। আমি এসব দেখিনি, শিখিনি তাই করতেও পারবো না। অকাট্য যুক্তি। আসলেই তাই, এভাবে শিখাইনি এভাবে মানুষ করার চিন্তা করিনি।
আমি একজন শ্রমিকের ছেলে, চোখ মেলেই অভাবের সাথে পরিচিত হয়েছি। অভাবের সাথেই বসবাস। অভাবই বন্ধু হয়ে গেছে। এটাকে কখনই উটকো ঝামেলা মনে হয়নি বরং অভাবকে মানিয়েই চলতে হয়েছে। বড় হতে হয়েছে। আমি নিজেও একজন শ্রমিক। চতুর্থ শ্রেণির পদে চাকরি নিয়ে আমার পেশাগত জীবন শুরু হয়েছে। আমার বাবা স্বপ্ন দেখতেন আমিও যেন তাঁর মত একটা কাজ পেয়ে খেয়ে পড়ে বাঁচতে পারি। আমি আমার বাবার মত ঠিক না, একটু আগ বাড়িয়ে ভাবতে শুরু করলাম সন্তানদের লেখাপড়া করিয়ে বড় মানুষ করবো। কত বড় ? সেটা কি সাধ্যের বাইরে ? না এমন নয়। আমি ভেবেছিলাম বাবাকে দেখেছি ছোট একটা চাকরি করে কীভাবে একটা সংসারের সবার মুখে আহার তুলে দিতেন। কত কষ্ট তাঁকে করতে হয়েছে। কখনও কখনও বাড়তি দুটো পয়সার জন্য গভীর রাত পর্যন্ত অমানুষিক পরিশ্রম করে গেছেন। আমি নিজেও শ্রমিক হয়ে একইভাবে পরিশ্রম করে যেতে হয়েছে। ভেবেছি সন্তানদের একটু অন্যরকম কিছু করি। আবির লেখাপড়ায় ভালো ছিল, এটাই আমার মনে হয়েছে। আমার মনে হয়েছে ওকে প্রকৌশলী বানাবো। সবার আগে মনে এসেছে বস্ত্র খাতের কথা। এখানে চাকরি পাওয়ার একটা সুযোগ থাকে। আমার পরিচিত অনেকেই টেক্সটাইলে চাকরি করেন। তারাও আমাকে উৎসাহিত করেছেন আবিরকে বস্ত্র প্রকৌশল পড়াতে। আবিরকে যখন ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললাম তখন মেনে নিল। ভর্তি করালাম জাতীয় বস্ত্র প্রকৌশল ও গবেষণা ইন্সটিটিউটে। জায়গাটা অনেক নিরিবিলি তাই ওর তেমন পছন্দের ছিল না। আমার পছন্দের কারণেই মেনে নিল এবং বললো ‘মাত্র চারটা বছর, ওটা চলে যাবে।’
চলেই তো গিয়েছিল। ফাইনাল পরীক্ষার বাকি ছিল মাত্র দু’মাস। এ দুটো মাসের অপেক্ষা কারোই সইলো না। কার তাড়া ছিল এমন? আবিরের? ওর বন্ধুদের নাকি সৃষ্টিকর্তার ? ওকে আর দুটো মাস ওখানে রাখা গেল না। শ্রমিকের ছেলে শ্রমিক হবে এটাই তো হিসেবের কথা। আমি হিসেবের একটু বাইরে যেতে চেয়েছিলাম। ঘুটে কুড়ানি আর কুলি মজুরের ছেলে হবে প্রকৌশলী! হিসেবটা সবসময় এভাবে মেলে না। তাই সৃষ্টিকর্তাও চললেন হিসেবের পথ ধরেই।
ওর একটা শখ ছিল রঙ খেলার। স্কুলের শেষ দিনটিতে সব বন্ধুরা মিলে রঙ খেলেছিল অনেক ছবি তুলেছিল- সেদিন স্কুলের স্যার, ম্যাডামদের সাথে। সেসব ছবি এখনও কিছু আমার কাছে। কলেজে তেমন মুক্ত পরিবেশ পায়নি বলে সেটা হয়নি। তবে নিটারে ভর্তি হওয়ার পর ওর প্রতিক্ষা ছিল শেষ দিনটি নিয়ে। এদিন রঙ খেলা হয় বা হবে এমন এটাতো জানাই ছিল। কত রকম পরিকল্পনা আর কত উচ্ছাস পুষে রেখেছিল এ দিনটির জন্য। অবশেষে সে দিনটি এলো। ওর ব্যাচের সবাই রঙ খেললো, নিজেরা রঙিন হলো অথচ যার ছিল সবচে বেশি আগ্রহ সেই আবির হারিয়ে গেল এক কালো জগতে। যেখানে নিকষ কালো অন্ধকার ছাড়া কিছুই নজরে আসবে না আর। ওদের রঙ খেলার সেসব ছবি যখন ফেসবুকে আপলোড দিল তখন তা দেখে ভেতরটা ছিন্ন ভিন্ন হয়ে ক্ষরণ হলো। গড়িয়ে পড়লো তা দুচোখের গন্ডি বেয়ে। ওদের র্যা গ ডেটা কি আবিরকে উৎসর্গ করা হয়েছিল ? কি জানি, আমি জানি না এটা তবে ব্যানারে আবিরের নাম লেখা দেখেছি। এটুকুই যা ভালো লাগার। আনন্দের এমন দিনে সহপাঠিকে কেউ ভুলে যায়নি। আবার এমনও কেউ ছিল যে আবিরের নাম দেখে কান্না লুকাতে অনুষ্ঠান ছেড়েই চলে গেছে। আবার এমন কেউ কেউ ছিল যারা আনন্দের আতিশয্যে বিষাদময় নামটাও মুছে দেয়ার চেষ্টা করেছে। যে যা করেছে সবই ঠিক আছে। কেন কেউ ওর কথা ভেবে এমন আনন্দের দিনটা নষ্ট করবে? কেনই বা ওকে মনে রাখতে হবে? এর পরেও এখনও যারা ওকে মনে রেখেছে তারা ওর মতোই বোকা। বোকারা কারো উপহাসের পাত্র হয়েই আজীবন বেঁচে থাকে।

হায় খরগোস!

আমি আবির ইলিনের সামনে কখনও কখনও ওদের মায়ের সামনেই খরগোস এবং কচ্ছপের গল্পটা বলতাম। ওরা এতে বিরক্ত হতো। এই বিরক্ত হওয়া, এটারও একটা কারণ ছিল। একটা গল্প তাও আবার সেই ছোটবেলার ক্লাসের বইতে পড়েছে সে গল্পটা আমি যখন এভাবে বার বার বলি তখন সঙ্গত কারণেই বিরক্তি বোধ করে। ইলিন বলে – বাবা, এই গল্পে কী পেয়েছো? এতবার কেন বল? আর শুনতে ইচ্ছে করেনা। আমি হাসি হাসি মুখ নিয়ে বলি – মা রে, এ গল্পটাতে জীবনের কথা বলা আছে, একেবারে নির্যাস কথা।
কচ্ছপ আর খরগোসের দৌঁড়, কচ্ছপের জিতে যাওয়া ইত্যাদি এতবার বুঝিয়ে বলার পরেও গল্পটাতে যা বলা হয়েছে বা আরো যা কিছু ভেতরে আছে তার খুব অল্পই ওরা বুঝতে পারতো।
আবিরতো সারাক্ষণ লাফাতেই থাকতো। এটা শুধু বড় হয়ে না, ছোটবেলাতেও একই অবস্থা ছিল। হামাগুড়ি দেয়ার বয়সে কতবার যে খাট থেকে আর টেবিলে ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে রক্তারক্তি করেছে সে হিসেবটা রাখা হয়নি। মাথা ফুলে প্রায়ই সুপরির মতো হয়ে থাকতো। থুতনির নিচে কেটে ফাঁক হয়ে গিয়েছিল,সেটা জোড়া দিতে সেলাই করতে হয়েছিল। বড় হওয়ার পর খরগোস সামনে এনে কিছু তত্ত্ব কথা শোনাতাম। বলতাম দেখ খরগোস কেবলই লাফায় অথচ তার আয়ু মাত্র ১৫ বছর। আবার কচ্ছপ নড়ে চড়ে না মাঝে মধ্যে উঁকি মেরে এদিক-ওদিক দেখে, এটা বেঁচে থাকে একশ বছর। ওর সাফ জবাব ‘আমি কচ্ছপ হতে পারবো না।’

দুষ্ট বালকের দল আর ব্যাঙের গল্প

আমরা তো মোটামুটি সবাই এ গল্পটা জানি। সেই গল্পটা, বর্ষার নতুন পানিতে ব্যাঙগুলো মনের সুখে ঘ্যাঁ ঘোঁ করে ডাকছিল। দুষ্ট ছেলের দল ঢিল মেরে আনন্দ করছিল। তাই দেখে একজন বললেন ‘তোমাদের আনন্দ কারো মৃত্যু ডেকে আনছে।’ এ গল্পটা আমি অকারণেই আগে অনেক জায়গায় বাচ্চাদের সামনে বলতাম। আবির আর তার বন্ধুদের এ গল্পটা বোধহয় জানা ছিলনা। ওদের সামান্য সময়ের আনন্দ কারো সারা জীবনের কান্না হয়ে থাকলো ওরা জানতেই পারলো না। নির্দোষ আনন্দে কারো ‘না’ নেই। কিন্তু ২২/২৩ বছরের কিছু তরুণ একেবারেই বিবেকশুন্য এটা কি বলা যায়? কারো মধ্যেই কি এ জ্ঞানটুকু ছিল না? থাকলে কোন হাতছানিতে এমন জীবন সংহারি খেলায় মেতেছিল ওরা ? সেদিন ওরা কি হারিয়েছে আমরা সেটা জানি কিন্তু আমরা কি হারালাম ওরা কখনই জানবে না। সবার অনেক কিছুই থাকে, আছে। ওদেরও আছে। বিশ্বাস করুন আমাদের কিছুই ছিল না শুধু একটা আবির ছিল সেটাও কেড়ে নেয়া হলো। যাবোতো আমরা সবাই একদিন। এ যাওয়াটা কেউ ইচ্ছে করে নিজেই চলে যায়, কাউকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় আবার কাউকে ধাক্কা মেরে পাঠানো হয়। তফাত এতটুকুই। সেদিন এর একটা তো ঘটেছিল।
আবিরের মা অনেক আগেই বলে দিয়েছিল ‘ওদের আমি ক্ষমা করে দিলাম।’ মুখ দিয়ে উচ্চারণ করলেই কি সবকিছু ক্ষমা করে দেয়া যায়? আমি ইলিনকে বলেছিলাম ‘মা ওদের ক্ষমা করে দে।’ নির্বাক চাহুনিতে যেন আগুন ছিটকে বেরুচ্ছিল। আমাকেই পাল্টা প্রশ্ন করে বলে – ক্ষমা করে কি দেয়া যায় বাবা ?
আমি বিথীকেও বলেছিলাম – মা, ওদের ক্ষমা করে দে।
বিথীর চোখেও আগুন দেখেছি, উল্টো আমাকেই বলে – বাবা, আপনি ওদের ক্ষমা করবেন না।

কী ঘটেছিল সেদিন?

জানি না, জানার চেষ্টা করেছিলাম। আগা পাছা কোন কিছুই পাইনি। বিভ্রান্ত হয়েছি বার বার। এতে মনের কষ্টটাই বেড়েছে। এ জন্য জানার চেষ্টা ছেড়েই দিয়েছি। যে গেছে তাকে আর পাবো না, তা সে যেভাবেই যাক না কেন। এখন যে এমন ভাবছি তা না। আবিরের সংবাদটা পাওয়ার পরই আবিরের মা প্রথম যে কথাটা বলেছে সেটা হলো ‘এটা যেন থানা পর্যন্ত না যায়।’ সে চেষ্টা করেই আমরা আবিরকে আমাদের কাছে নিয়ে এসেছি। এখন ভেবে দেখবার বিষয় একজন মা কেন একথা প্রথমেই বললেন। এটার দুটো কারণ ছিল , নিজের মুখেই যা বলেছে। এর একটা কারণ হলো আবিরের দেহ কাটা ছেঁড়া করা হোক একজন মা হিসেবে এটা ও দেখতে চায়নি। আর একটা হলো আবিরের কোন বন্ধু যেন বিপদে না পড়ে। মা তো মা-ই, সেটা আবিরের মা কিংবা অন্য কারো মা। মায়ের দৃষ্টি দিয়ে সন্তানদের দেখেছে। আবিরের এ বন্ধু সার্কেলটার প্রায় সবাই আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। আবিরের মা নিজ হাতে রান্না করে পাশে বসে ওদের খাইয়েছে। ওর একই কথা এ ছেলেদের বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই। আমার ছেলে যাদের অন্ধ বিশ্বাস করে চারটা বছর কাটিয়ে দিল তাদের আমি অবিশ্বাস করি কি করে ? বন্ধুত্বের মতো পবিত্র সম্পর্কের ভেতরে কোন কালো অধ্যায় যেন উন্মোচিত না হয় সে চেষ্টা ছিলই। অনেকেই ফোন করে অনেক কথা বলেছেন। আবিরের বন্ধু আমার বন্ধু কিংবা পরিচিত অপরিচিত সবাই একটাই কথা বলেছেন ‘এটা বিশ্বাস করি না’। কোনটা বিশ্বাস করেন না? আবির যে নেই সেটা নাকি এভাবে নেই হয়ে যাওয়ার গল্পটা? অধিকাংশ দুটোই বিশ্বাস করেন না। আমাদের কারো বিশ্বাস কিংবা অবিশ্বাস কিছুই আসে যায় না। আবির নেই সেটাই সত্য। আবির বোকা ছিল এটা সত্য, তবে এতটা বোকা নিশ্চয়ই নয় যে ২২ বছরের একটা টগবগে তরুণ সে বুঝবে না যে ভরা নদীতে নামলে তার কি হতে পারে। কথায় আছে অন্ধকার ঘরে সব জায়গায় সাপ। যেহেতু আমরা কেউ সেখানে ছিলাম না তাই যে যেটা বলছে সেটাই শুনছি, যারা ছিল তারা যা যেভাবে বলবে সেভাবে শোনা ছাড়া কোন গত্যন্তর নাই। বিশ্বাস অবিশ্বাস যার যার নিজের ব্যাপার। কোন বিশ্বাসই আবিরকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে না এটাই শেষ সত্য।

হায় সত্য !

কোন সত্যই মায়ের মনে বিশ্বাস জন্মাতে পারে না। তাঁর মা আবিরের মুখটা শেষ বার দেখেছে কফিনে শোয়ানো অবস্থায়। আমিও তাই দেখেছি। হ্যাঁ ওটা আবিরের লাশই ছিল। ওর মাকে এটা বিশ্বাস করাতেই পারি না। ও কেবলই বলে আমি মা, স্পষ্ট ভাবে দেখেছি ওটা আবিরের লাশ না। ওটা অন্য কেউ। তুমি খোঁজ নাও সেদিন ওখানে অন্য কোন ছেলেও ডুবে গেছে কি না। আমি আমার আত্মীয় স্বজনরা বার বার বলছে ওটা আবির। একা আবিরের মা বলছে না ওটা আবির হতেই পারে না। কদিন পরেই হাসি হাসি মুখ নিয়ে বলে দেখে নিও কোরবানী ঈদের দিন ও যেখানেই থাক চলে আসবে। আমাদের ছাড়া ও অন্য কোথাও ঈদ করতেই পারেনা। আমরা কেউ কিছু বলি না। অপেক্ষা করতে থাকি কোরবানীর ঈদের জন্য। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ আদায় করেই আবিরের মা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। সকাল বেলা কোন রিকসার শব্দ পেলেই ছুটে যায় এই বুঝি আবির লাফ মেরে রিকসা থেকে নেমেই চিৎকার দিয়ে বলবে ‘মা খুচরা টাকা দাওতো, রিকসা ভাড়া দিব।’ সবার ছেলেই ঈদের আগে ঘরে ফেরে শুধু আমাদের আবিরই ফিরে না। ঈদের দিন টেবিলে খাওয়া দেয়া হয়েছে। সবাই বসেছি, আবিরের চেয়ারটা শুন্যই থাকছে। এবার আবিরের মায়ের বিশ্বাস হলো, আবির আসবে না ফিরে। সেখানে কার কান্না লুকানো যায় বলুন। এভাবেই প্রতিদিন সত্য মিথ্যার লুকোচুরিতে দিশেহারা হতে হয় আমার পুরো পরিবারটিকে। কে কাকে সান্তনা দেব ? মুখ দিয়ে কথা ফোটে না কারোই; সব কথা নোনা জল হলে গড়িয়ে পড়ে। ঈদের পরে আবির যখন চলে যেত তখন কখনও কখনও আবিরের মা আর আমি দুজনেই ওকে গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে আসতাম। আবার কখনও আমি একাই গিয়ে উঠিয়ে দিয়ে আসতাম। আবির নেই এমন প্রথম ঈদের শেষে ছোট ভাই রনি যখন কর্মস্থলে ফিরে যাচ্ছে তখন ইচ্ছে করেই আবিরের মাকে কোচষ্ট্যান্ডে নিয়ে গেলাম। এর পেছনে যুক্তি হলো ওকে বিশ্বাস করানো যে আবির আসেনি, যাবেওনা বখনও। সত্যটাই হলো আবির নেই।
কোচস্ট্যান্ডে গিয়ে নিজেকে কোন মতেই সামলে রাখতে পারলো না। আবিরের অনেক বন্ধু যারা ঢাকায় লেখাপড়া করে তারা সবাই ফিরে যাচ্ছে। অনেকের সাথেই বাবা-মা আছে। চোখ খুঁজে ফেরে শুধু আবিরকে। চোখের পানি মুছে দিয়ে বলি ‘ওর বন্ধুদের মুখে আবিরের চেহারাটা খোঁজ, নিশ্চয়ই পাবে।’ এক মায়ের তৃষ্ণার্ত চোখ খুঁজে ফেরে প্রিয় সন্তানকে। একটু পরেই বলে “কেউ আবিরের মতো না।’ কেউ আবিরের মতো না এটাই সত্য কথা। এ সত্যটাই বিশ্বাস করাতে চাই আবিরের মাকে। কেউ কারো মত না। কেউ কারো জায়গাটা নিতে পারবে না। বাইশ বছর দেখা মুখটা কীভাবে অন্য কারো মুখে খুঁজি! কীভাবে খুঁজে দেখতে বলি ? এটাতো প্রতারণা। সত্যটাই হলো, যে ছিল দৃষ্টির সীমানায় সে হারালো কোথায় কোন দূর অজানায়।

সম্পর্ক, চাইলেই হয়ে যায় ?

আবিরের মৃত্যুর পর প্রায় বিশজন তরুণ ফোনে অথবা ইনবক্সে আমার ছেলে হতে চেয়েছে। অনেকেই আমার অনুমতির অপেক্ষা না করেই বাবা ডেকেছে। এখনও ডাকছে কেউ কেউ। আমি আসলে অপেক্ষা করছিলাম ঈদের দিনটার জন্য। ঈদ অনেকের জন্য আনন্দের হলেও আমার পরিবারের জন্য ছিল বিষাদময় একটা দিন। জাহান্নামের তপ্ত কাঠ কয়লায় পুড়েছি সেদিন দিনভর। আশ্চর্যের বিষয় সেই তরুণদের কেউ সেদিন বাবাকে ফোন করে এক মিনিট কথাও বলেনি। বলবে না এটাইতো স্বাভাবিক। আমি তাদের কে? সাময়িক একটা সান্ত্বনা দেয়ার জন্য বাবা ডেকেছে। ঈদের দিন সে তার আনন্দ নষ্ট করে কেন একজন আকন্ঠ কষ্টে নিমজ্জিত এক মানুষকে ফোন করে মুড নষ্ট করবে? আবিরের স্কুল জীবনের বন্ধুরা দল বেঁধে বাসায় এসেছিল, দেখা করেছে, কথা বলেছে। নিটারের কোন বন্ধুই একটা ফোন করেনি আমাদের কাছে। আমরা ভেবেছিলাম ওদের কেউ কেউ কথা বলবে। আমার এমন ভাবার কারণ হল যাবার সময় ওরা বলেছিল ‘আমরাই আবির’। আমরাও তাই মনে করেছিলাম। ওদের মুখে আবিরের মুখ খুঁজে পাবো ভেবেছিলাম। বাস্তবে তা হয়নি। এই না হওয়ার পেছনে কিছু যৌক্তিক কারণও ছিল। সেটা হলো নিটারে বিভিন্ন জেলার ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশের ছেলে মেয়েরা পড়তে গিয়েছে। ওদের কারো কারো মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক হয়েছে বিভিন্ন প্রয়োজনকে সামনে রেখেই। চার বছরের শিক্ষাজীবন যখন শেষ হয়ে এলো তখন স্বাভাবিক নিয়মেই প্রয়োজন গুলোও কমে আসতে শুরু করলো। পরীক্ষা শেষে তো যার যার জায়গায় চলে যাবে। তাদের আবার কখনও দেখা হবে কিনা তারা নিজেরাই জানে না সেকথা। সম্পর্ক তৈরি করা যায় না এটা হয়েই যায়। কেউ কেউ এটা বোঝে না, বুঝতে চায়ও না। এদের মধ্যে একজন আবির। বন্ধুত্ব কখনও স্বার্থের কারণে গড়ে উঠতে পারে এটা ওর কল্পনাতেও ছিল না। বন্ধুত্বকে ও পবিত্র এবং অবশ্যই আত্মিক সম্পর্ক মনে করতো। তবে শেষ দিনে এসে ও মনে হয় কিছু একটা অনুমান করেছিল। মৃত্যুর কয়েক ঘন্টা আগে একজনকে ইনবক্সে জানায় ‘আমি নিজেকে অনেক চালাক মনে করেছিলাম, আসলে আমি অনেক বোকা। স্বার্থের জন্য অনেকেই আমাকে ব্যবহার করেছে। এখন সেসব ভেবে চোখে পানি আসে।’ আর একজনকে বলেছিল ‘ওরা এত স্বার্থপর কেন?’

এবং বিথীর কথা

আমি ভেবেই পাই না আবিরের মতো রুক্ষ, একগুঁয়ে একটা ছেলেকে বিথীর মতো একটা মেয়ে ভালোবাসে কী করে? নিঃসন্দেহে এ মেয়েটাও বোকা। বোকার সাথে বোকা মিলেছে তাই ভালো। আবির যখন বিথীর কথা জানালো তখন থেকেই আমার ছোট্ট ঘরে উৎসবের হাওয়া বইতে শুরু করলো। ওই তখন শান্ত, আমরা অশান্ত হয়ে উঠলাম। অস্থিরতা কাটাতে না পেরে বার বার বিথী সম্পর্কে জানতে চাইতাম। ছবি দেখতে চাইতাম। ও তেমন কিছু বলতো না। বেশি চাপাচাপি করলে বলতো সময় হলেই দেখাবো।
একবার এসে মোবাইল ফোনে বিথীর ছবি দেখালো। এক দেখাতেই আমরা পছন্দ করে ফেললাম। আর দেরি সয় না, আবিরকে তাড়া দেই বাবা বিয়ে কবে করবি। কেন জানি না আবির উদাস হয়ে বলতো এত খুশি হয়ো না। আবির কখনই রোমান্টিক ছিল না। কোন মেয়ের সাথেই প্যান প্যান করে ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলতো না। চিৎকার চেচামেচিই ছিল ওর অভ্যাস। ন্যাকামী মার্কা কথা ও একদম পছন্দ করতোনা। আমার সেই ছেলেটা যে কারো প্রেমে পড়বে এটা বিশ্বাস করতেই কষ্ট হচ্ছিল। সম্পর্কের কথা শোনার পর এতটাই খুশি হয়েছিলাম যে শেষের কয়েক মাস ওকে খরচের টাকার সাথে হাজার খানেক টাকা বেশি পাঠাতাম। ও একদিন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো ‘টাকা কি ভুল করে দিয়েছো ’? আমি বলি, না। ও আবার জিজ্ঞেস করে, তাহলে ? আমি উচ্ছ্বাস লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেই বলি ‘ওটা বিথীকে নিয়ে চা খাওয়ার জন্য’। ও মনে হয় স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল। একটা কথাও আর বলেনি। আরো কিছুদিন পর বিথীকে কথা বলিয়ে দিয়েছিল ইলিনের সাথে। আমরা ইলিনকে ছেকে ধরলাম – বলনা কী কথা হল।
ইলিনও যেন গুপ্তধন পেয়েছে এমন ভাব নিয়ে বলে – ভাইয়ার নিষেধ আছে, বলা যাবে না।
এ পর্যন্তই ছিল বিথীর গল্পের। আমি যখন ২৩ জুলাই নিটারে গেলাম তখন আবিরকে বললাম – বিথীর সাথে কথা বলিয়ে দাওনা।
: না, ও এভাবে দেখা করালে বিব্রত হতে পারে।
আবির নিস্প্রভ ভাবে জবাব দেয়। বিথীর সাথে দেখা করতে চাওয়াটার পেছনে আমার একটা উদ্দেশ্য ছিল। আবিরের ব্যাপারে একটা কথা বলতাম। যে কথাটা আবিরকে বলে আমরা বিশ্বাস করাতে পারিনি বা বোঝাতেও পারিনি। ভেবেছিলাম বিথী বললে শুনবে। ওর সাথে আমার কথা বলাই হলো না। আমি নিশ্চিত, যদি সেদিন সে কথাটা বিথীকে বলতে পারতাম তাহলে দৃশ্যপট আলাদা কিছু হত।
সেই বিথীর সাথে আমাদের সবার দেখা হল, কথা হল কিন্তু এভাবে দেখা আর কথা বলাটা প্রত্যাশিত ছিল না। পৃথিবীর কোন বাবা মা এমন কল্পনাও করতে পারেন না। বিথীর সাথে আমাদের সবার প্রথম কথা হয় মুঠোফোনে। কাঁদবো না কথা বলবো। মেয়েটা ওপাশ থেকে শুধুই কাঁদছে, আমরা এপাশে কাঁদছি। কান্না জড়ানো কণ্ঠেই বলে- বাবা আমি আসবো আপনাদের কাছে।
আমি কথার খেই হারিয়ে ফেলি। এমন কথার পরে কী বলা যায় বা কী বলতে হবে আমি মাথায় আনতে পারছিলাম না। ভাবলাম এটা সাময়িক একটা আবেগ। আর আবেগ তো পাগলামিই। দুদিন পরেই এ পাগলামীটা থেমে যাবে ভেবে নিলাম। বিথী দু-চারদিন পর পরই ফোনে কথা বলে আমাদের সাথে। কান্নায় ওর কণ্ঠ ভারি হয়ে ওঠে। আমি আবিরের জন্য যতটুকু কান্না করি এখন বিথীর জন্য তার চেয়ে বেশি আমাকে কাঁদতে হয়। আবির তো চলেই গেছে। বিথী আছে, ওর কান্নাটা সহ্য হয় না। বিথী আসবো আসবো করছে অথচ আসছে না কারণটা বুঝতেও পারছি না। একদিন ওকে জিজ্ঞেস করলাম – মা তুই আসবি ?
: হ্যাঁ বাবা, আমি আসবো।
: কবে আসবি ?
: বাবা, আমিতো ঠাকুরগাঁও চিনি না। যারা চেনেন তাদের অনেককে অনুরোধ করেছি শুধু একবার নিয়ে যাওয়ার জন্য। তারা আমাকে কথা দিয়েছেন নিয়ে যাবেন।
: তাহলে আসছিস না কেন ?
: বাবা, আপুরা সময় পাচ্ছেন না তাই দেরি হচ্ছে।
আরো কদিন চলে যায়। বিথীকে দেখার জন্য মন পোড়ে আমাদের। আমরাও যেতে পারছি না ওর কাছে। এমন সময় একদিন হঠাৎ করেই ফোনে বলে – বাবা আমি আসছি
: আসছিস মানে ! কবে ? কখন?
: কাল সকালেই রওনা দেব।
: সাথে কে আসছে ?
: কেউনা বাবা, আমি একাই।
আমি বিথীকে থামানোর চেষ্টা করি, অনেক বোঝাই। ও কিছুতেই কিছু বুঝবে না। আসতে চেয়েছে মানেই আসবে, একাই আসবে। আমি বললাম- ঠিক আছে আসবি আয়, সাথে কাউকে নিয়ে আয়।
: না বাবা একাই আসবো।
: কেন?
: কারো সময় নেই বাবা আপনাদের কাছে যাওয়ার মতো। আমার অনেক সময়, আমাকে যেতেই হবে।
বিথীর কণ্ঠে ক্ষোভ ঝরে পড়ে। ওকে বোঝাই, ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁও আসতে ১২ থেকে ১৪ ঘন্টা সময় লাগে। ওর এক কথা সময় লাগে লাগুক তবু আমি একাই আসবো। শেষে সায় দিলাম।
ভাগ্য সেদিন বিথীকে সহায়তা করেনি। যাত্রার ঠিক আগ মুহূর্তে ও জানতে পারে যে কোচের টিকিট কাটা হয়েছিল সেটার যাত্রা বতিল হয়েছে। আমরা বললাম আসিস না, ফিরে যা হলে। ও তবুও জেদ ধরেই থাকলো আসবেই। সেদিনই আসবে। অবশেষে অন্য একজনের সহায়তায় অন্য একটি কোচে উঠে পড়ে বিথী। কোচের হেলপার সুপারভাইজারের মোবাইল ফোন নম্বর নিলাম। কিছুক্ষণ পর পরই বিথীকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করি ও কোথায় আছে। সুপারভাইজারকে ফোন দিই ওকে দেখে রাখার জন্য। হেলপারের কাছে ফোন দিই। একসময় এসে বিথীর ফোনের ব্যাটারি চার্য শেষ হয়ে যায়। ফোন বন্ধ, আমাদেরও দম বন্ধ হওয়ার অবস্থা। সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত এলো। রাত বাড়তে থাকলো। বিথীর সাথে যোগাযোগের মাধ্যম তখন হেলপার আর সুপারভাইজার। কিছুক্ষণ পর পর ফোন করে বিরক্ত করে মেরেছি ওদের। রাত গভীর হয়ে এলো। আমরা আর ঘরে বসে থাকতে পারলাম না। আমি আবিরের মা আর ইলিন কোচ কাউন্টারে গিয়ে বিথীর জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। রাত ১২টা বাজলো। বুকের ভেতরে ঢিপ ঢিপ শব্দটা দ্রুততর হচ্ছে। আর মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই কোচটা এসে পৌঁছবে। আমরা কখনও বিথীকে দেখিনি। বিথিও আমাদের কাউকে দেখেনি। চিনতে পারবো কি না কিংবা ও আমাদের চিনতে পারবে কি না। প্রথম দেখার ক্ষণটা কেমন হবে এসব ভাবতে ভাবতেই কোচটা এসে থামলো। আমাদের তিন জোড়া চোখ একজনকেই খুঁজছে। কাউকে বলে দিতে হয়নি, কাউকে চিনিয়ে দিতেও হয়নি। এ যেন সন্তানের সাথে বাবা মায়ের অদৃশ্য আত্মিক সম্পর্কটা পুনঃস্থাপিত হল। বিথী কোচ থেকে নেমে সোজা প্রথমে আমার সামনে এসে বাবা বলে ডাক দিল তারপর ইলিন আর খেলনাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলো। সেই গভীর রাতের সকল নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে কান্নার শব্দে বাতাস ভারি হয়ে গেল। বিথী নামের এ মেয়েটিই হয়তো আমাদের বাড়িতে আসতো। কথা ছিল বউ সাজিয়ে নিয়ে আসবো। কথা ছিল ফুল ছিটিয়ে বরণ করবো। হায় খোদা এমন ভাগ্য দিলে আমাদের যে সেই মেয়েটিকেই চোখের পানি দিয়ে বরণ করতে হলো। তবে আমাদের সবার চোখের পানি বিথীর ভেতরের ক্ষতটা এক ছিটে ফোঁটাও সারাতে পারবে না সেটাও জানি।
বিথী মাত্র তিনদিন ছিল আমাদের সাথে। এখানে আবিরের স্কুল, আড্ডার জায়গা, গ্রামের বাড়ি সব ঘুরিয়ে দেখালাম। যাওয়ার দিন একা ওকে ছাড়তে সাহস পেলাম না। আমি সাথে গিয়ে ওকে হোষ্টেলে নামিয়ে দিয়ে এলাম। মেয়েটা যাওয়ার সময় আমাদের অনেক কষ্টের বোঝা নামিয়ে দিয়ে হালকা করে দিয়ে গেছে। বিথী আগেই বলেছিলÑ বাবা, বউ হয়ে না আসতে পারি মেয়ে হয়েতো আসতে পারি। আমার দৃষ্টি প্রসারিত হয় বিথীর কথা শুনে। সম্পর্কতো তৈরি করা যায় না, হয়েই যায়। বিথীর সাথে ঠিক এমনি ভাবেই আমাদের সম্পর্ক তৈরি হয়েই গেছে। বিথী আমাদের মেয়ে, ইলিনের বোন। আমরা ওর বাবা-মা। কাউকে ভালোবাসলে কতটা ভালোবাসা যায় বা বাসতে হয় তা যেন কেউ বিথীর কাছে শেখে। আমি যখন জানতে পারলাম তখন ওর প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা অবনত করলাম।
বিথী আমাদের বাসায় আসার পর ইলিন ওকে জিজ্ঞেস করেছিল- আপু তুমি যে একা একা এতটা পথ এলে, ভয় লাগেনি?
: বারে ভয় লাগবে কেন? আবির আমার সাথেই তো ছিল।
এমন একটা জবাব শুনে ইলিন কিছুটা হকচকিয়ে যায়। কি বলবে বুঝে উঠতে পারছিল না। অবস্থাটা অনুমান করে বিথী ইলিনকে ডেকে নিজের সাথে থাকা ব্যাগটার চেন টেনে খোলে সেখান থেকে আবিরের একটা টি শার্ট বের করে ইলিনকে দেখিয়ে বলে- আবিরের এটা থাকলেই আমার মনে হয় আবির আমার পাশেই আছে। এই মেয়েটাই আবিরের দুটো শার্ট পলিথিনে মুড়ে টেপ লাগিয়ে এয়ার টাইট করে রেখে দিয়েছে নিজের কাছে। ইলিন এর কারণ জানতে চেয়েছিল। নিস্পলক চোখে ও জবাব দেয় আবিরের ঘামের গন্ধটাও যেন বাতাসে মিলিয়ে না যায়…
মেয়ে তোকে স্যালুট। তোর কাছে ভালোবাসা শিখতে পারলে আর এভাবে ভালোবাসতে পারলে পৃথিবীর সব গোলাপ একদিনেই ফুটবে, সব যুদ্ধ থেমে যাবে, সহস্র কণ্ঠে কবিতাগুলো উচ্চারিত হবে। বলতেই হয় এমন ভালোবাসা পেয়েও আবির থাকতে পারলো না এটা ওর ব্যর্থতা, ওর দুর্ভাগ্য।
বিথী ঢাকায় ফিরে নিয়মিতই ইলিন আর ওর মাকে ফোন করে কথা বলে। এরাও উজ্জিবিত হয় এভাবে। একজনের প্রিয় সন্তান আর একজনের ভাইয়ের মুখটা যেন দেখতে পায় বিথী নামের মেয়েটির মুখেই। আর সব মিলিয়ে আমার পাওয়াটা তো অনেক বড়। জীবন নামের ট্রেন থেকে আমার ছেলে যে স্টেশনটাতে নেমে গেল সেখান থেকেই বিথী নামের মেয়েটি সেই একই ট্রেনে উঠে আমার কাছে এলো। মা, তুই তোর ওমেই রাখিস সারা জীবন আমাদের।

ইলিনের কথা

ভাবছেন আবিরের কথা বলতে গিয়ে কেন অন্য কারো কথা বলছি। সে কৈফিয়তও দিচ্ছি। আমি প্রথমেই বলেছি আমাদের কিছু নেই শুধু একটা আবির ছিল। এটাকেই আমরা সবাই এমনভাবে জড়িয়ে রেখেছিলাম যে, ওর থেকে কেউ আলাদা এটা এখনও ভাবতে পারি না। ইলিন আমার মেয়ে, আবিরের বোন। ও আবিরের একেবারেই উল্টো। আবির সারাক্ষণ ছটফট করতো, অস্থির থাকত, পড়তে বসতে চাইতো না, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আনন্দ-উল্লাসে মেতে থাকতে চাইতো আর ইলিনকে কখনই বলি না পড়তে বসতে বরং মাঝে মধ্যেই বিরক্ত হয়ে পড়ার টেবিল থেকে জোর করে উঠিয়ে দিই। কোন অনুষ্ঠানেই যাবে না, সবাই যখন আনন্দ উল্লাসে মত্ত থাকে ও তখন নিজেকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে এসে ঘরের কোণে বন্দি করে রাখে।
ইলিন আবিরের চেয়ে ছয় বছরের ছোট। বাড়িতে এলেই আবির যতক্ষণ বাসায় থাকবে শুধু ওর সাথেই চেচামেচি, চর থাপ্পর, ধমক দিয়ে তটস্থ করে রাখতো। আর ঢাকায় চলে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে দরজার কাছে গিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরতো।
সেই মেয়েটা আমার, আবিরকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়লো। সব সাহস এক মুহূর্তেই কর্পুরের মত হাওয়া হয়ে গেল। আবির ওকে সবসময় বলতো ‘ভয় পাবি না, আমি সব সময় তোর পাশেই আছি।’ সেই মেয়েটা যখন দেখে তার চারপাশ শুন্য, পাশে থাকার অঙ্গিকার করা ভাইটা কোথাও নেই; তখন ওর কান্না আমাদের কান্নাকেও ছাড়িয়ে যায়। কোন সান্ত¡নাই ওকে শান্ত করতে পারে না। আমার আর এক মেয়ে বিথীর কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। ইলিনের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে একজন বড় বোনের ভূমিকাটাই পালন করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। আবিরের স্বপ্ন ছিল ওর বোন লেখাপড়া করে প্রতিষ্ঠিত হবে। কোন স্বপ্নই তো পুরণ হয়নি আবিরের। এই একটা মাত্র স্বপ্ন এখনও আছে যেটাকে বাঁচিয়ে রাখতে ইলিন সোজা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

স্বপ্নে দেখা আবির

আবির চলে যাওয়ার পর আত্মীয়-অনাত্মীয় পরিচিত অনেকেই দেখা হলে জিজ্ঞেস করতেন আবিরকে স্বপ্নে দেখেছি কি না। এমন প্রশ্ন তারা কেনই করেন আর এমন প্রশ্নে আমরা কতটা বিব্রত হতে পারি তা কি তারা কখনও ভেবে দেখেছেন? একজন মৃত মানুষকে কেন স্বপ্নে দেখতে হবে, এমন ভাবনা আমাকেও ভাবিয়ে তোলে মাঝে মাঝে। হঠাৎ করেই একদিন চোখে পড়লো একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত একটি লেখা। সেখানে এক অংশে লেখা রয়েছে ‘ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সিরিন রহ. বলেন, কেউ যদি স্বপ্নে মৃত ব্যক্তিকে দেখে তাহলে তাকে যে অবস্থায় দেখবে সেটাই বাস্তব বলে ধরা হবে। তাকে যা বলতে শুনবে, সেটা সত্যি বলে ধরা হবে। কারণ, সে এমন জগতে অবস্থান করছে যেখানে সত্য ছাড়া আর কিছু নেই।’ আমরাও একে একে প্রত্যেকেই কিন্তু সত্যি সত্যি স্বপ্নে দেখলাম ওকে।

ইলিনের স্বপ্ন

ইলিন কলেজ থেকে ফিরছিল। চোখ যায় রাস্তার পাশের চায়ের দোকানটায়, ওখানে আবির মন খারাপ করে বসে আছে। ইলিন আবিরের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েই কেঁদে ফেলে। আবির দাঁড়িয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে কাঁদছিস কেন? এইতো আমি আছি।
: সবাই যে বলে তুমি মরে গেছ?
: ওরা ভুল বলেছে, দেখ আমাকে।
: ভাইয়া তুমি বাসায় চল। না রে আমার যাওয়া যাবে না।
এ কথার পর যখন ইলিন জেদ শুরু করে ওকে নিয়ে আসার জন্য তখন আবির উঠে দাঁড়ায়। বাসার সামনে পর্যন্ত আসে। তারপর ইলিনের হাতটা ছেড়ে দিয়ে বলে, তুই যা, আমি আর যেতে পারবো না।
সকালে বিছানা থেকে উঠেই রাতে দেখা স্বপ্নটা ইলিন আমাদের বলে। চিৎকার করে কাঁদে না, চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে যায়। বুকের ভেতর পাহাড় সম কষ্টের বোঝা থাকলেও ভাইয়ের সাথে কথা বলতে পারায় ভালো লাগাটুকুও চাপা রাখতে পারেনি।

ওর মায়ের দেখা স্বপ্ন

ইলিন স্বপ্নে দেখার পর ওর মা প্রায়ই আফসোস করতো। বলতো আমি মা,আমি কেন আমার ছেলেকে একবারও দেখতে পাব না? আমি শুধু শুনেই যাই। কোন প্রশ্নেরই জবাব আমার কাছে নেই।
একদিন সকালে ঘুম থেকে জেগেই আমাকে ঝাঁকুনি দিয়ে জাগায়। চোখে মুখে প্রবল উচ্ছ্বাস। আমি অবাক হয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি।
: আমি আবিরকে দেখলাম।
আমি বুঝতে পারি ও স্বপ্নে দেখেছে। অনেক বুঝিয়ে শান্ত করি ওকে। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করি – কী দেখেছো?
: আবির এসে বসলো, আমি বললাম তুমি তোমার চাচ্চুর ঘরে আস। আমরা দেখতে পারব নাড়তে পারব। আবির মন খারাপ করে বলল ; না, আমি তোমাদের ছেড়ে কোথাও যাবো না।
এ পর্যন্ত বলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। আমি আবিরের মাকে কোন সন্ত্বনা দিইনা। ওকে কাঁদতে দিই ইচ্ছে মত।

আমিও একদিন স্বপ্নে দেখি ওকে

আমি কোন এক বাড়ির উঠোনে বসে ছিলাম। আবির এলো ভেজা শরীরে। মাথার ভেজা চুল থেকে টপ টপ করে পানি ঝরছে। আমার সামনে এসে চোখ বন্ধ করেই দাঁড়িয়ে থাকলো। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম- কেমন আছো? ও চোখ বন্ধ করেই জবাব দিল- ভালো আছি।
আর কোন কথা হয়নি ওর সাথে। আর কোনদিন দেখিনি। আবিরের মা বোন কেঁদে বুক হালকা করেছে, আমার কাঁদতে মানা। আমি যে পুরুষ মানুষ, আমাকে শক্ত থাকতে হবে। আমি যে পিতা এবং স্বামী তাই আমাকে শক্ত থাকতে হবে। শক্ত থাকতে থাকতে এতটাই শক্ত হয়ে গেছি যে অনুভূতিহীন এক পাথর হয়ে গেছি। আগুন, পানি, রোদ, বৃষ্টি আমার গা বেয়েই চলে যায় এখন।

বিথীও স্বপ্নে দেখে প্রায়ই

বলা নেই কওয়া নেই সোজা এসে বিথীর বিছানায় এসে শুয়েছিল আবির। বিথী পাশে বসে চুলে হাত বুলাতে যায়,অমনি বিথীর হাতটা সরিয়ে দেয় আবির। কোন কথা বলেনা ওর সাথে। আরো দু-একবার দেখেছে, ক্যাম্পাসে এসে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।
আমরা সবাই আবিরকে স্বপ্নে দেখেছি। এই যে এভাবে দেখা এটার থাকতে পারে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা, থাকতে পারে ধর্মীয় ব্যাখ্যা। কোনটাই আমাদের জানা নেই। আবার কেউ কেউ বলেন স্বপ্নে দেখা হওয়া, কথা বলার ধারণাটাই ভ্রান্ত। মৃত্যুর পরে আত্মার ফিরে এসে দেখা দেয়ার কোন সুযোগ নেই। আমি কোন বিতর্কে যাবো না। যে যেটাই বলুক। যে বিধানই থাক, যে ব্যাখ্যাই দেয়া হোক। স্বপ্নে আমরা আবিরকে হাঁটতে, কথা বলতে দেখেছি, এটাই কম পাওয়া কিসে?

বাপ্পী নামের ছেলেটি

আবিরের সারা জীবনের যত বন্ধু ছিল সবচে বেশি মনের কাছাকাছি ছিল যে নামটি সেটা বোধ হয় বাপ্পী। পুরো নামটা বোধহয় সাজ্জাদ হোসেন। অত্যন্ত ভদ্র নম্র বিনয়ী একটা ছেলে। আমাদের বাড়িতেও একবার এসেছিল। আবিরের নামটা বাপ্পীর সাথে এমনভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল যে কোথাও কিছু ঘটলে সেখানে যদি আবির থাকে তাহলে থাক বা না থাক বাপ্পীর নামটা চলে আসবেই। আবার বাপ্পীর কোন ঘটনা ঘটলে সবাই ধরে নেয় ওখানে আবির ছিল। আমাকে আবির বলে দিয়েছিল ‘যদি ফোন করে কখনও আমাকে না পাও তবে বাপ্পীকে জিজ্ঞেস কর, ও বলতে পারবে।’ ১ আগস্টের আগ পর্যন্ত তাই হয়েছে। যখনই আমরা আবিরের ফোন বন্ধ পেতাম তখনই বাপ্পীর নাম্বারে ফোন করতাম। বাপ্পীর জানা থাকেলে সাথে সাথেই বলে দিত আর যদি জানা না থাকে তো একটু সময় নিত আবিরকে খুঁজে বের করতে। কতদিন যে এভাবে বাপ্পীকে বিরক্ত করে গেছি তার হিসেব রাখা হয়নি।
আবির বাড়িতে এলেও বাপ্পীকে নিয়ে আমাদের সাথে আলোচনা করতো। ওর সরলতার কথা বলতে গিয়ে রেগে যেত। ওকে নিয়ে অনেক ভাবতো। এমনকি বাপ্পীর পরিবার নিয়েও ভাবতো। বাপ্পী কখনও এমন করে ভাবতো কিনা সেটা আমার জানা নেই। তবে আবিরের প্রতি টানের কোন কমতি ছিল না কোনদিনই। যেখানে আবির সেখানেই বাপ্পী এটা ৪ বছরে নিটারের ইট-পাথর থেকে শুরু করে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জানা ছিল। মৃত্যুর দিনেও এই বাপ্পী পাশেই ছিল। শেষ পর্যন্ত এই বাপ্পীই আবীরকে বাঁচানোর চেষ্টা করে গেছে। দু-মিনিট পরে উদ্ধারকারী নৌকাটা না এলে বাপ্পীও সেদিন আবিরের সাথেই চলে যেত। আর মাত্র দু-মিনিট আগে নৌকাটা এলে হয়ত আবির বেঁচে যেত।
বাপ্পী একদিন ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বলে ও আবিরকে স্বপ্নে দেখেছে। আমি জানতে না চাইলেও ও নিজ থেকেই বললো
‘সেদিন আবিরের চলে যাওয়ার চল্লিশ দিন। বাপ্পী ওদের বাড়িতেই ছিল। আবির বাপ্পীর ঘরে আসে। পরিষ্কার সফেদ পাজামা পাঞ্জাবী পরা। বাপ্পী ওকে দেখেই হাউ মাউ করে কেঁদে ওঠে। আবির বাপ্পীর কাছে এসে সান্ত¡না দিয়ে বলে, তুই কাঁদছিস কেন? তোর কী দোষ ছিল। তুই তো অনেক চেষ্টা করেছিস। তোর আর করারও কিছু ছিল না’। এটুকু বলেই বাপ্পী ফোনের অপর প্রান্ত থেকে কাঁদতে থাকে। আমার বুকটা ভারি হয়ে আসে। বাপ্পীকে কোন কথাই বলতে পারি না। লাইনটা কেটে দিই আমি। বাপ্পী আর এক বোকা ছেলে। একেবারে আবিরের মতোই। নিজের জীবন বিপন্ন করে তুলেছিল সেদিন। অনেক ভালোবাসা বাপ্পী তোর প্রতি। যেখানেই থাকিস ভালো থাকিস।

ভাবনার সাথে স্বপ্নের আশ্চর্য মিল

দিনের ভাবনাগুলোর সাথে রাতে ঘুমিয়ে দেখা স্বপ্নগুলোর আশ্চর্য এক মিল পাওয়া যায়। আমি এবং আবিরের মা এখন প্রায়ই স্বপ্ন দেখি। এইতো সেদিন দেখি আবির এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না। একটা কথাই বার বার বলছে ‘বাবা আমি ভুল করেছি , আমাকে মাফ করে দাও’। আমি কোন কথাই বলতে পারিনি। যখন জেগে উঠলাম তখন বুকের ভেতরটায় ব্যাথা করছিল। আবিরের মা প্রায়ই এমন স্বপ্ন দেখে এখন। সব স্বপ্নের কথাতো বলেনা আমাকে তবুও কথা বলতে বলতে দু একটা জেনে ফেলি। এ লেখাটা যখন লিখছি তার একদিন আগেই আবিরের মা স্বপ্নে দেখলো আবির বাসায় এসেছে। অমনি ওকে হাত চেপে ধরে বলে ‘একবার ফাঁকি দিয়ে চলে গেছিস ,আর তোকে যেতে দেবনা। তোর সাথে সাথেই থাকবো। তুই যেখানেই যাবি সেখানেই যাবো।’ এরপর আর কি দেখেছে সেটা ওর মনে নেই অথবা ইচ্ছে করেই আমাকে বলেনি। দুজনেই শুয়ে শুয়ে ভাবি – একবার যদি এমন স্বপ্নগুলো সত্য হতো !
আমাদের মত মানুষের স্বপ্ন তা সে জেগেই দেখি অথবা ঘুমিয়ে দেখি কোনটাই কখনও পূরণ হয়না ……… হতে নেই।

শেষ পর্যন্ত আবির বন্ধুর কথাই ভেবেছিল

এই একটি মাত্র দৃশ্য যা সবাই একরকম বলেছে। আবির ভেসে যাচ্ছে, ভাসতে ভাসতেই চিৎকার করে বন্ধুদের ডাকছে ‘আমাকে তোরা বাঁচা’। ওর ডাকে বাপ্পী যখন সাড়া দিল তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।আবির প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে চলে গেছে। ওখান থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার সব চেষ্টাই যখন ব্যর্থ, তখন একটা কৌশল অবলম্বন করে দুজনেই। একজন ডুব মেরে থেকে আর একজনকে ভেসে থাকতে সাহায্য করছিল। ওরা ভেবেছিল কিছু সময় থাকতে পারলে সাহায্য চলে আসবে। ওপরে যারা দাঁড়িয়ে দেখছিল তারা সময় মত সাহায্য পাঠাতে ব্যর্থ হলো। পানিতে ওদের শক্তি ক্রমশঃ ফুরিয়ে আসতে থাকল। ওরা দুজনেই তখন নিশ্চিত যে দুজনেই মরবে। আবির বাপ্পীর হাতটা ছেড়ে দেয় বলে ‘তুই যা।’ এটাই শেষ কথা। আবির বাপ্পীর চোখের সামনেই ডুবে যায়। বাপ্পী। জ্ঞান হারানোর এক সেকেন্ড আগে সাহায্য পৌঁছে, বেঁচে যায় বাপ্পী। এটাই আবির। একা কখনও বাঁচতে চাইতো না। একা কোন আনন্দই ভোগ করতে চাইতো না। বিপদে বন্ধুকে ফেলে পালিয়ে যায়নি কখনও। বরং বন্ধুকে বাঁচাতে বহুবার বিপদে পড়েছে। স্কুল-কলেজ এবং নিটারেও একই অবস্থা। কত যে বকেছি এজন্য। কোন পরিবর্তন হয়নি।
আবির একটা জব কনফার্ম করেছিল। ইন্টার্ন শেষ করেই যোগ দেবে সেখানে এমনই কথা ছিল। একদিন আমাকে বললো- বাবা, ওখানে একা চাকরি করতে আমার ভালো লাগবে না। আমি ওদের জন্য ওখানেই চেষ্টা করবো। আমি সেদিও খুব রাগ করেছিলাম। বলেছিলাম- চাকরিটা যার যার। ওরাও নিশ্চয়ই একটা জব পেয়ে যাবে। একসাথেই থাকতে হবে এটা কেমন ভাবনা তোমার? আবির মাথা নিচু করে হাসতে হাসতে বলেÑ ওরা বন্ধু আমার।
একসাথে থাকা হল না। কোথায় আজ বন্ধুরা, কোথায় আবির। ফাইনাল পরীক্ষা শেষে সবাই নিটার ছেড়েছে। ইন্টার্ন করছে সবাই। এর মধ্যেই চাকরি হয়ে যাবে কারো কারো। সবাই চলে যাবে নিজ নিজ ভুবনে। সে ভুবনে একজনের মৃত আবিরের কোন অস্তিত্বই থাকবে না। কিছু কিছু কথা কারো কারো হয়তো মনে থাকবে। কারো কিছুই মনে হবেনা কোনদিন। আমরা শুধু ভুলতে পারবোনা একটি কথাও, একটি দিনও।

কেন এ চলে যাওয়া? কে দায়ী এর জন্য?

হাজার বার নিজেকে প্রশ্ন করেছি। অনেক আলেম, ওলেমা বিজ্ঞজনের কাছে গিয়েছি। আমার শুধু দুটো প্রশ্ন ,কেন এ চলে যাওয়া? কে দায়ী এর জন্য?

আবির নিজেই দায়ী কী?

এটাই সত্য মনে হয় কখনও কখনও। ওর ভেতরে এমন অস্থিরতা আর চঞ্চলতা ছিল যে ওকে নিয়ে সারাক্ষণ একটা আতংকেই থাকতে হতো। ঘুমানো বাদে একটা সেকেন্ড কখনও স্থির হয়ে থাকতো না। অনেক কিছুই করতে পারতো, অনেক কিছুতেই দক্ষতা ছিল অথচ কখনই কোথাও লেগে থাকেনি। শুধু একবার দেখেছে করতে পারবে কি – না। ব্যস ওখানেই শেষ ওটা। আবার আর একটা নতুন ভাবনা।
শুধু একটা ব্যাপারেই ও ছিল গভীর আত্মবিশ্বাসী। সেটা হলো বন্ধুত্ব। কাউকে বন্ধু বানাতে কয়েক সেকেন্ড লাগতো। বন্ধুদের প্রতি ছিল অন্ধ বিশ্বাস। ওর ধারণা ছিল বন্ধুরা সব পারে। ও যেমন বন্ধুদের বিপদে ঝাপিয়ে পড়ে, ওর ধারণা ছিল ওর বিপদেও বন্ধুরা তেমনিভাবে ঝাপিয়ে পড়বে। অনেকবার এমন হয়েছে যে ওকে বন্ধুরা বিপদে ফেলে নিজেরা সেভ হয়ে গেছে। বসিয়ে বুঝিয়েছি। ও সব শুনে শেষ কথা বলতো সবাই একরকম না। আমাদের আর কী বলার থাকে। হয়ত প্রশ্ন করবেন ‘কারো বন্ধু থাকাটাই কী অপরাধ?’ আমি বলিনা সেটা অপরাধ, তবে আবিরের যেমন অন্ধ বিশ্বাস ছিল সেটা অবশ্যই একটা অপরাধ। আমাদের কোন সতর্কতাই ও কখনও কানে তোলেনি। বাবা-মা যা কিছু বলেন তা বানিয়ে খুব কমই বলেন। যা কিছুই বলেন তা অভিজ্ঞতা থেকেই বলেন, এটা ওর জানা ছিল না। নির্দ্বিধায় বলা যায় আজ ওর এই চলে যাওয়ার পেছনে বন্ধুদের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস আর অসতর্কতাই দায়ী, অর্থাৎ ও নিজেই দায়ী।

না-কি আমিই দায়ী?

কখনও মনে হয়েছে আমি নিজেই আবিরের এ পরিণতির জন্য দায়ী। আমার বাবার বাবা ছিলেন শ্রমিক, আমার বাবা ছিলেন শ্রমিক, আমি নিজেও একজন শ্রমিক। আমার ছেলে শ্রমিক হলে ক্ষতিটা কোথায় ছিল? কেন তাকে লেখাপড়া করতে ঢাকায় পাঠালাম। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছিল ভালোই করেছিল, একটা কাজ জোটানো খুব কঠিন কিছু ছিল না। তা না করে আমি ওকে প্রকৌশলী বানাতে চাইলাম।
কে- না চায় সন্তানদের লেখাপড়া করিয়ে নিজের চেয়ে একটু ভালো অবস্থানে পাঠাতে, বলুন। আমিও তাই চেয়েছিলাম। সারাজীবন চাকরি নামের গোলামিতে অন্যকে স্যার স্যার করে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছি। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে নিজের ওপর ঘেন্না ধরে গেছে। আমি কখনই চাইনি আমার সন্তান এমন করুক। এ ধারণা থেকেই তাদের একটু বড় কিছু করতে চেয়েছি।এটা কখনই ভাবিনি ছেলে-মেয়ে বড় চাকরি করে অনেক টাকা কামাই করবে, আমাকে মাসে মাসে টাকা পাঠাবে আর আমি নাকে তেল দিয়ে পায়ের ওপর পা তুলে খাবো। আবিরের যে চাকরিটা কনফার্ম হয়েছিল তার বেতন ছিল কম। আমি বলেছিলাম প্রতি মাসে বাসা ভাড়ার টাকাটা আমিই পাঠিয়ে দেব। আমি শুধু চেয়েছি ও আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাক। আমার চাওয়ায় কিছু হয়নি।
প্রথম থেকেই ওর কিছুটা আপত্তি ছিল নিটারে পড়ার ব্যাপারে। তারপরেও আমি যেহেতু চেয়েছি তাই আর না করেনি। এক বছর পরেই নিজের মতো করে সব মানিয়ে নিয়েছিল। সারাক্ষণই মনে হয় আমি ওকে নিটারে না ভর্তি করালে এ ঘটনা ওখানে ঘটতো না। এ মৃত্যুর দায় আমিও এড়াতে পারি না।

ওর বন্ধুরা কী দায়ী নয়?

এ প্রশ্নটা আমাকে যেমন বার বার ভাবিয়ে তুলেছে তেমনি আবিরের অনেক বন্ধু, আমার বন্ধু শুভাকাঙ্খীরাও ভেবেছে। আবির ঢাকায় লেখাপড়া করছে, চার পাঁচ মাস পর একবার বাড়িতে এসে সপ্তাহখানেক থাকে। অর্থাৎ নিটারের চার বছরের মাত্র হাতে গোনা কটা দিন আমরা ওকে পেয়েছি। সুখে-দুখে খেয়ে না খেয়ে বন্ধুদের সাথেইতো ছিল। ওর সব বন্ধুরাই জানতো আবির সাঁতার জানে না। তাহলে দিনের পর দিন একটা এমন ছেলেকে কেন ধরে রাখার মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে নদী, সমুদ্র আর পুকুরে নিয়ে যাওয়া হলো? আমি যখন প্রথম ফেসবুকে আবিরের একটা ছবি দেখলাম কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে তখন খুব রাগ করেছিলাম। জিজ্ঞেস করেছিলাম তুমি কোন সাহসে সমুদ্রের পানিতে নেমেছো ? ওর সেই সরল স্বীকারোক্তি ‘আমার বন্ধুরা আমাকে ধরে রাখে।’ শেষদিন আবিরের সাথে যারা ছিল আবিরের সেই বন্ধুরা আমাদের বাড়িতে এসেছিল। আমরা ওদের হাতে ধরে অনুরোধ করেছিলাম ‘বাবা ওকে দেখে রাখিও’। আমি যতবার নিটারে গিয়েছি ততবারই অনুরোধ করেছি ‘আবিরকে দেখে রাখতে।’ ওরা সত্যি সত্যি আবিরকে দেখে রেখেছিল। শেষ দিন শেষ মুহূর্তেও ওরা দেখেই রেখেছিল। শুধু বাঁচিয়ে রাখতে পারেনি। ওদের আর কি দোষ, আমরাই তো দেখে রাখতে বলেছিলাম। বাঁচিয়ে রাখতে বলিনি। বাঁচিয়ে রাখা আর দেখে রাখা শব্দে, বাক্যে আলাদা কিছু। আবিরকে ওরা হাত পা বেঁধে নদীতে নিয়ে যায়নি। আবির নিজের ইচ্ছাতেই গিয়েছে। এদিক থেকে ওদের কাউকেই এ ঘটনায় দায়ী বলা যায় না। এটা ঠিক আছে কিন্তু একবার ভেবে দেখুন তো আপনি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। হঠাৎ দেখলেন একটা ছোট বাচ্চা তার বাবা মায়ের হাত ছেড়ে দিয়ে ব্যস্ত সড়কের মাঝখানে চলে গেছে। আরো অনেকেই ব্যাপারটা দেখলো। এখন আপনি কী যুক্তি দাঁড় করাবেন যে ওই শিশুটি নিজের ইচ্ছেতেই মাঝ সড়কে গিয়েছে? আমি কেন ওকে ওখান থেকে সরিয়ে আনবো বা ওর বাবা মাকে সতর্ক করে দিব। আপনি যদি মানুষ হন, আপনার যদি স্বাভাবিক জ্ঞান থাকে তাহলে সকল যুক্তি বুদ্ধি দূরে সরিয়ে আগে শিশুটিকে দুর্ঘটনা থেকে বাঁচাতে সড়ক থেকে সরিয়ে আনবেন। তারপর শিশুটির বাবা-মাকে খুঁজে বের করে দুকথা শুনিয়ে দেবেন। এমনই তো হওয়ার কথা তাই না?
আবির কোন দুধের শিশু না যে, ওই শিশুটির সাথে তুলনা করা চলে এটাই তো বলবেন। আমারও এটাই কথা কিন্তু যখন ওর বন্ধুরা দেখলে যে আবির নির্বোধের মতো সাঁতার না জেনে পানিতে নামছে। সেখানে একটা দুর্ঘটনার আশংকা আছে, তাহলে কেন ওকে পানিতে নামতে দিল বা নিজেদের সাথে নিল? বাবা হিসেবে এ প্রশ্ন আমার মাথায় আসতে পারে না?
ওই যে শিশুটির কথা উদাহরণ হিসেবে বললাম, মনে করুন শিশুটি মাঝ সড়কে গাড়ি চাপা পড়লো তখন সবাই যদি এটাকে ভাগ্যের দোষ বলে এড়িয়ে গেলে আপনার বিবেক কি আপনাকে ছাড় দেবে? এতগুলো মানুষের কোন দায় কি সে দুর্ঘটনায় নেই বলে মনে করবেন? ঠিক এটাই হয়েছে আবিরের ক্ষেত্রে। সবার সামনে একটা ছেলে ভেসে গেল আর সবাই মিলে বলল এটা ওর ভাগ্যে লেখা ছিল। হয়তো তাই ছিল, কিন্তু ওর বন্ধুরা নিজেদের বিবেককে কি দায় মুক্তি দিতে পারবে? যখন থেকে ও পানিতে নামে তখন থেকে যদি ওকে সতর্ক করা হতো, নিদেন পক্ষে আমাদের একটা ফোন করে বলতো তবে আজ আবির বেঁচে থাকতো। একটা অন্ধ বিশ্বাস কে সযতনে টুকরো টুকরো করে ভাঙ্গা হয়েছে।

আবিরের মোবাইল ফোন

আবিরকে প্রথম মোবাইল ফোন কিনে দেই ৮শ টাকা দিয়ে। পুরাতন একটা ফোন, ওই জোগাড় করেছিল। কলেজে এবং নিটারে ভর্তি হয়েও ও ৩ হাজার টাকার বেশি দামী ফোন ব্যবহার করেনি। মাত্র একবছর আগে বলে বাবা, এখন একটা ভালো ফোন লাগে। ওর প্রয়োজনটা আমি বুঝি। তাই আর না করিনি। ১৫ হাজার টাকা দিয়ে একটা ফোন কেনে। ওর চলে যাওয়ার পর ফোনটা আমার কাছে এনে রাখি। ফোনটা লক করা ছিল দুজনের আঙ্গুলের ছাপে, ও আর বিথী। ও তো নেই, বিথী যখন আমাদের কাছে এলো তখন ফোনটা খুললো কিন্ত ভেতরে সব কিছুই আলাদা করে লক করা আছে। যেটা বিথী খুলতে পারছিল না। ওর কাছে এর পাসওয়ার্ড জানা নেই। বিথী জানালো ফোনটাতে ওদের অনেক ছবি আছে। সার্ভিস সেন্টারে নিয়ে গেলে ছবিগুলো যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য বার বার অনুরোধ করতে থাকল। ইলিনও তাই, কোন মতেই ছবিগুলো নষ্ট করা চলবে না। সার্ভিস সেন্টার বহু চেষ্টা করেও ফোনটা খুলতে পারেনি। তারা আবার চেষ্টা করবে বলে আমাকে জানিয়েছে।
লক হয়ে থাকা ফোনটা আমি দু-চারদিন পর পর চার্য দেই। ওটাকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করি। ওই ফোনটায় আবিরের স্পর্শ আছে। ওটা কাছে থাকলে মনে হয় আবির আছে। প্রায়ই মধ্যরাতে আমাকে চমকে দিয়ে ফোনটা কখনও কখনও বেজে ওঠে, আমি রিসিভ করি না। কেউ একজন এসএমএস পাঠায়। যারা আবিরের নম্বরে ফোন করে অথবা এসএমএস পাঠায় তারাও নিশ্চয়ই আশায় থাকে একবার যদি ভুল করে হলেও আবির ফোনটা রিসিভ করতো অথবা এসএমএস এর জবাব লিখতো; তাহলে আর কখনই হয়তো ওকে যেতে দিত না।
আমি অনেক চেষ্টার পর অন্ততঃ দুটো নম্বর সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি এর একটি ইলিনের অপরটি বিথীর। আরো কেউ করে থাকবে, আমার সে নম্বরটা জানা নেই। প্রতিদিন ইলিন রাতের পড়া শেষ করে আবিরকে ফোন করতো। ওর সাথে কথা বলে তবে ঘুমোতে যেত। এখনও গভীর রাতে ফোন দেয় আবিরকে। ফোনটা অপরপ্রান্তে রিসিভ হয়না দেখে হয়ত ভেবে নেয় ‘ওর ভাইটা আজ অনেক ব্যস্ত আছে, তাই ফোন ধরতে পারছে না’। শুনেছি বিথীও ঘুমোতে যাওয়ার আগে একবার আবিরের সাথে কথা বলে নিত। এখনও এ আশাতেই ফোন দেয় আর ভেবে নেয় আবির পড়ালেখায় ব্যস্ত আছে তাই ফোন ধরছে না।
আমি নিজে যখন আমার ফোনটা হাতে নিয়ে কোন নম্বর খুঁজে বের করতে যাই তখন হঠাৎ করে আবিরের নামটা চলে আসে। ইচ্ছে করে একবার কল করি। কী হবে তাতে, ফোনটা তো আমার কাছেই থাকে। কেউ রিসিভ করবে না। মাঝে মধ্যে ভাবি যারা আবিরের নম্বরে ফোন করে তাদের অনেকেই হয়তো জানেন না যে আবির আর ফোন রিসিভ করার ক্ষমতা রাখে না। না জেনেই হয়তো আবিরকে ভুল বুঝে বসে আছে।

এটা কি কোন পাপের ফল?

প্রশ্নটা আমার ভেতর থেকে যেমন এসেছে তেমনি অনেকেই মিনমিনে গলায় বলেছেন। আচ্ছা পাপ করেনি কে? এর পরের প্রশ্ন কার পাপে? আবিরের? আমার? আবিরের মায়ের? ইলিনের? নাকি সেই মেয়েটি যে ওকে বিয়ে করে সংসার পাতার স্বপ্নে বিভোর ছিল? আবির ২৩ বছরের এক টগবগে যুবক। যার জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই কেটেছে বইয়ের বোঝা কাঁধে নিয়ে। সে কি কখনও খুন, ধর্ষন, ব্যভিচারের মতো পাপে লিপ্ত হয়েছিল? অথবা কোন মজলুমের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল? তাহলে কোন পাপের শাস্তি এমন ভয়ঙ্কর হতে পারে? আবিরের একজন বন্ধু পরিচিতও কি বলতে পারবে আবিরের অমার্জনীয় কোন পাপাচারের কথা?
আসছি আমার কথায়। পাপ তো করেছি, করছিই প্রতিদিন কোন না কোন পাপ। সে পাপের ভার কতটা? আমি একটা চাকরি করি, যেখানে সুযোগ ছিল ‘অনেক কিছুই করার’ তারপরেও আমার কোন সহকর্মী কিংবা সামান্যতম পরিচিত আমার অবর্তমানেও কী বলতে পারবেন আমি সে পথে কখনও হেঁটেছি? আজ টিভিতে বিজ্ঞাপন প্রচার করে যে শুদ্ধাচার প্রচার করা হয়, আমার নিরক্ষর মা বহু আগেই বাল্যশিক্ষার মত করে সেটা শিখিয়েছিলেন। সে পথ থেকে আজও সরতে পারিনি। আবিরের রক্তে আমার হারাম কোন উপার্জন প্রবেশ করেনি। হারামের টাকায় কেনা কাপড় পরিধান করাইনি, বই কিনে দেই নি। তাহলে …?
আসছি আবিরের মায়ের কথায়। হত দরিদ্র এক পরিবার থেকে মাত্র সতের বছর বয়সে বিয়ে করে নিয়ে এসেছি ওকে। বড় কিছু চাওয়ার,বড় কিছু হওয়ার, কিংবা বড় কিছু পাওয়ার কোন ক্ষমতা অথবা যোগ্যতাই ওর ছিল না। সেকারণে আমাকেই ভেবে নিয়েছিল জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া। আবির, ইলিন, আমি এবং ও এ চারজনেই ছিলাম একটা আলাদা পৃথিবী। সেখানে আমাদের চাওয়া আমরাই, এর বাইরে বেশি কিছু চাইনি। আমরা প্রার্থনা করতাম একজন আর একজনের জন্য। গত পঁচিশটা বছর ধরে দেখেছি ওকে ধর্ম-কর্ম আর স্বামী সন্তান সংসার নিয়ে কাটিয়ে দিতে। স্বামী হিসেবেও যদি শেষ বিচারের দিনে স্বাক্ষী দেয়ার কোন সুযোগ থাকে তাহলে বুক উঁচিয়েই বলবো ‘কোন কবিরা গুনাহ ও করেনি।’
বাকী থাকলো ইলিন। আবিরের চেয়ে ছয় বছরের ছোট মেয়েটা এ বছরই এসএসসি পাশ করেছে জিপিএ ৫ নিয়ে। বাবা মা ভাই আর বই ছাড়া অন্য কোন ভুবনই ছিলনা ওর। পড়তে যাওয়া ছাড়া বাড়ির বাইরে এখনও যাকে নিয়ে যেতে হলে অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হয়। যে মেয়েটা এখনও অপেক্ষায় বসে থাকে বাবা বাইরে থেকে এসে নিজের হাতে খাইয়ে দেবে। যে মেয়েটা এখনও বাইরে গেলে বাবার হাত ধরে থাকে। ও কতবড় পাপ করেছিল?
আমার পরিবারের বাইরে (এখনতো আমারই মেয়ে) একটি মেয়ে বিথী। যে মেয়েটার একটা স্বপ্ন ওকে কখনও ঘুমোতে দেয়নি। আবির নামের ছেলেটির সাথে সংসার পাতবে। নিজের কাঁধ থেকে বইয়ের বোঝা নামেনি যে মেয়েটির সে কি এমন পাপ করেছিল যে চোখ থেকে স্বপ্নটা কেড়ে নেয়া হলো?
এগুলো কথার কথা। পাপেই যদি এমন হয়ে থাকে যে চার জনের উল্লেখ করলাম তারাই এমন ভয়ঙ্কর পাপ করে ফেলেছি যে, এমন শাস্তি না দিলেই নয়? আপনার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারবো পাপের পাহাড় তৈরি করেও ধন ধান্যে পুস্পে ভরে আছে জীবন। শততম ধর্ষনের আনন্দ ধরে রাখতে পার্টি দিচ্ছে, মায়ের সামনে মেয়েকে ধর্ষন করার মতো ব্যভিচার অগণিত। আছে শিশু ধর্ষন, খুন খারাবী। আরো আছে, জেল থেকে জামিন পাওয়ার আনন্দে আট লাখ টাকার মদ গেলার খবরও শুনেছি। এমন খবরতো নিত্যদিন দেখি যে মজলুমকে নির্যাতন করছে, বাড়ি ছাড়া করছে, গ্রাম ছাড়া করছে, এলাকায় ত্রাশের রাজত্ব কায়েম করছে। নেশার বাণিজ্য করে শত শত পরিবারের স্বপ্নকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিচ্ছে। এরা কেউ কিন্তু খারাপ নেই। দীর্ঘজীবী, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, এমনকি কখনও কখনও সমাজের উঁচু স্তরে নেতৃত্বের আসনে এদেরই জায়গা হয়। মরে তো শুধু ভালোর পথে হাঁটা শুদ্ধাচার শেখা মানুষগুলোই।
অনেকেই এমন উদাহরণের কথা শুনে বলেন ওদের জন্য দুনিয়া আর ভালোর জন্য আখেরাত। হায় ! এমন এক জায়গার কথা সবাই বলেন যেখান থেকে কেউ কোনদিন ফিরে আসবে না, কেউ এসে বলবে না ‘যা শুনেছেন সব সত্যি’।
আমার জান্নাতের লোভ কোন দিনই ছিল না। যখন নিজের বিবেক বলেছে ‘একটা ভালো কাজ করেছি, অমনি প্রার্থনা করেছি এটুকুর বিনিময়ে আমার সন্তানদের ভালো রেখ আল্লাহ’। হাত তুলে এবং না তুলে একই কথা একইভাবে বলেছি। অর্থাৎ সত্যটা হচ্ছে আমি দুনিয়াবী চেয়েছি, সেটাই পাইনি। কেউ বলেছেন এটা সৃষ্টিকর্তার পরীক্ষা। হায়! এটা কেমন পরীক্ষা যে পরীক্ষায় পরীক্ষকের সাথে পরীক্ষার্থীর সম্পর্কে এমন অবনতি ঘটে? তাছাড়া আমি তো পরীক্ষাই দিতে চাইনি তাহলে কেন জোর করে এমন কঠিনতর পরীক্ষায় বসানো হল।
অনেকেই মুখের ওপর বলেছেন ‘সন্তানদের নামাজ কালাম শেখাতে হয়।’ এটা সত্য আবিরকে আমরা চেষ্টা করেও বিভিন্ন কারণে একাজটা করাতে সক্ষম হইনি। তার মানে কি নামাজ কালাম না শিখলেই একটা সন্তান অকালে চলে যাবে? যখন তাদের জিজ্ঞেস করি ‘ভাই আরো বহু মানুষের সন্তান নামাজ কালাম পড়ে না’ ওদের সাথে আমার ছেলেটা কেন বেঁচে থাকলোনা? একজনও এর সরাসরি উত্তর দেননি। কেউ কেউ বলেছেন ‘আল্লাহ ভালো জানেন।’
অবশ্যই আল্লাহ ভালো জানেন, তিনি সব জানেন। তিনি মহা আরসের মহা প্রভু। তিনি সুক্ষ্ম বিচারক। তাঁর কাছেই মাথা অবনত করে প্রার্থনা করে শুধুই চেয়েছি সন্তানের মঙ্গল। তিনি সন্তানের মৃত্যুতেই মঙ্গল দেখেছেন। আবির এমন পাপ করেছে যে মৃত্যু ছাড়া তার আর কোন বিচার হতে পারে না। আমি এতবড় পাপ করেছি যে সন্তান হারানোর ব্যাথা ছাড়া অন্য কোন শাস্তি পেতে পারি না। ইলিন এতবড় পাপ করে ফেলেছে যে, তার পাশ থেকে ভাইকে সরিয়ে নেয়ার শাস্তি ছাড়া অন্য কিছুই দেয়া যায় না। আর বিথী নামের মেয়েটা এমন পাপ করেছে যে ওকে ভালোবাসার মানুষটির সাথে ঘর করতে না দেয়ার শাস্তি ছাড়া কিছু দেয়াই যায় না। আমরা সব কটাই তাহলে পাপী। আমি আবার বলছি, আমরা অবশ্যই পাপ করেছি। পাপ না করলে তো ফেরেস্তা হয়ে যেতাম। যেহেতু মানুষ হয়েই জন্ম নিয়েছি লোভে পড়ে, শয়তানের হাতছানিতে, জেনে না জেনে অসংখ্য পাপ করে ফেলেছি। সে পাপ এতটাই কি ভয়াবহ ছিল যে প্রিয় সন্তানকে এমন অসময়ে নিয়ে যেতে হবে? কেউ কারো পকেট কাটলে সেটা আইনের চোখে দন্ডনীয় একটা অপরাধ। কেউ কাউকে খুন করলে সেটাও আইনের চোখে দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু দুটি অপরাধের শাস্তি এক নয়। আইন ধারা মোতাবেক দণ্ডটা নির্ধারণ করে রেখেছেন। আমার তো মনে হয় আমি পকেট কাটার অপরাধে হত্যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পেয়েছি।
আমার অনেক বন্ধু এবং শুভাকাঙ্ক্ষী পরামর্শ দিয়ে বলেছেন ‘এটা মহান আল্লাহ পাকের ফায়সালা, এটা নিয়ে প্রশ্ন করা যাবেনা।’ ঠিকই বলেছেন বন্ধুরা, তিনি যা কিছু ভালো মনে করেন তাই করেন। খেয়াল করে দেখুন ‘তারা কি জাহেলিয়াতের বিচার-ফায়সালা চায়? অথচ আল্লাহর প্রতি যারা ঈমান আনয়ন করেছে তাদের জন্য আল্লাহর চেয়ে উত্তম সিদ্ধান্তকারী কে হতে পারে (আল মায়েদা ঃ ৫০)?’
হায় আল্লাহ, আমি বা আমরা ঈমানহারা অথবা ঈমান ছাড়া ছিলামনা। তবুও আমাদের বুক থেকে সন্তান কেড়ে নেয়া ‘উত্তম সিদ্ধান্ত’ বলে মানতেই পারছি না।

সান্ত্বনার যত ভাষা

ধর্মেই বোধ হয় সবচে বেশি সন্তান হারানো বাবা মাকে সান্ত্বনা দেয়া হয়েছে। সান্ত্বনার ভাষাটাও হৃদয়গ্রাহী। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ(স) বলেন, ‘মু’মিন পুরুষ ও নারীর জান, সন্তান-সন্তুতি ও তার ধন-সম্পদ (বিপদ-আপদ দ্বারা) পরীক্ষিত হতে থাকে। পরিশেষে সে আল্লাহ তা’আলার সঙ্গে নিষ্পাপ হয়ে সাক্ষাৎ করবে। (রিয়াদ্বুস সালেহীনঃ অধ্যায় ১(বিবিধ অধ্যায়) হাদীস ৪৯। জামে’ আত-তিরমিযী ও মুসনাদে আহমাদ।)’
এ হাদিসটি মতে আমার সাথে যা কিছুই ঘটেছে তা আমাকে পরীক্ষা করার জন্যই ঘটেছে। আমি তো কখনই পরীক্ষা দিতে চাইনি। আর পরীক্ষা যদি এমন কঠিন হয় ক’জন আছেন যারা পরীক্ষাটা দিতে চান নিজের বুকে একবার হাত দিয়ে নিজেকেই জিজ্ঞেস করুন। আর পরীক্ষার্থী হিসেবে আমাকেই কেন আল্লাহর পছন্দ তাও আমি বুঝতে পারলাম না। এমন পরীক্ষা নিলেন প্রভু যে জীবনে আর কোন পরীক্ষা দেয়ার ক্ষমতা কিংবা সাহসই আমার থাকলো না।
আবার আর একটি হাদিস লক্ষ্য করুন আবু মুসা আল-আশ’আরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন – যখন কারও সন্তান মারা যায়, তখন আল্লাহ তা’আলা ফেরেশতাদেরকে ডেকে বলেন যে, তোমরা আমার বান্দার সন্তানের জান কবয করে ফেলেছ?’ তারা বলেন- ‘হ্যাঁ।’ আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘তোমরা তার কলিজার টুকরার জান কবয করে ফেলেছ?’ তারা বলেন- ‘হ্যাঁ।’ আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘আমার বান্দা কি বলেছে?’ তারা বলেন- ‘আপনার বান্দা এই বিপদেও ধৈর্য ধারণ করে আপনার প্রশংসা করেছে এবং ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন পড়েছে।’ তখন আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘তোমরা আমার এই বান্দার জন্য জান্নাতে একটি গৃহ নির্মাণ কর এবং তার নামকরণ কর ‘বাইতুল হামদ’ অর্থাৎ প্রশংসার গৃহ। (রিয়াদ্বুস সালেহীনঃ অধ্যায় ১৪ (মহান আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা অধ্যায়) হাদীস ১৩৯৫। জামে’ আত-তিরমিযী)
এখানেও দেখুন, কলিজার টুকরা সন্তান চলে যাওয়ার পরেও একজন পিতা মাতাকে ধৈর্য্য ধারণ করতে হবে এবং আল্লাহর প্রশংসা করতে হবে তবেই আপনি ‘বাইতুল হামদ’ পাবেন। এতটুকু ধৈর্য্য কোন বাবা মায়ের আছে বলুন। আমার নেই, আমি পারিনি। স্বপ্ন জগতটা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে।
পানিতে ডুবে মৃত্যুকে ‘শহিদী’ মৃত্যু বলে অনেকেই সান্ত¡না দিয়েছেন। তার মানে আবির সরাসরি জান্নাতে প্রবেশ করবে। সন্তান হারানো বাবা মায়ের জন্য এরচে বড় সান্ত্বনা আর কি হতে পারে? আবার কেউ কেউ এ বলে সান্ত্বনা দিয়েছেন যে কাল কেয়ামতের দিনে আবির আপনাদের জন্য বেহেস্তের দরজায় অপেক্ষা করবে। আপনাদের না নিয়ে বেহেস্তে প্রবেশ করবে না। যে ছেলেটা জীবনের একটা দিনও বাবা-মা বোনকে ছেড়ে সুখে কাটাতে চায়নি সে কি করে স্বার্থপরের মত একাই জান্নাতের সুখ ভোগ করতে চলে যাবে? আর আমরাও এমন বাবা মা না যে একদিন আবির আমাদের বেহেস্তে নিয়ে যাবে সে ভাবনায় প্রাণ খুলে এখন থেকে হাসতে শুরু করবো।
আবদুল্লাহ ইবনে মাস’উদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ “তোমরা তোমাদের মধ্যে কাকে নিঃসন্তান বলে গণ্য কর?” বর্ণনাকারী বলেন, ‘আমরা যার সন্তান হয় না তাকেই নিঃসন্তান মনে করি।’ তিনি (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, “সে ব্যক্তি নিঃসন্তান নয়। বরং সেই ব্যক্তি-ই নিঃসন্তান, যে তার কোন সন্তান আগে পাঠায়নি অর্থাৎ যার জীবদ্দশায় তার সন্তান মৃত্যুবরণ করে নি।” (সহীহ মুসলিমঃ অধ্যায় ৪৫, হাদীস ৬৩১১)। আমি আমার সন্তানকে পাঠাইনি, কেউ পাঠিয়ে দিয়েছে অথবা কেউ নিয়ে গেছেন। তবু উক্ত হাদিস মতে আমার জন্য সান্ত্বনা যে আমি নিঃসন্তান নই। এই যে এত সান্ত্বনা, সুখের এত হাতছানি কোন কিছুতেই মন ভোলে না।
কেউ কেউ আবার বলেছেন “এরচে হয়ত আরো বড় বিপদ ছিল, আল্লাহ তা’আলা আপনাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে খুব ভালো একটা মৃত্যু দিয়েছেন।’ এমন সান্ত¡নায় ধৈর্য্য এমনিতেই চলে আসে। তাঁদের কথা শুনে ভাবি; ঠিকইতো, এমনতো হতে পারতো যে ও কাউকে খুন করে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হতো কাল কাপড়ে মুখ ঢেকে। কোন জঙ্গীর খাতায় নাম দিয়ে পুলিশের গুলিতে মরতে পারতো, সমুদ্রে গিয়ে ডুবে যেতে পারতো; যেখানে কোনদিন তার লাশটাও আমরা পেতাম না। কঠিন কোন অসুখে পড়তে পারতো তা তাকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যেতে পারতো। আসলে অনেক কিছুই তো হতে পারতো কিছুই হয়নি বরং সম্মানের এক মৃত্যু হয়েছে। এমন সান্ত্বনা অনেক অনেক আছে। এমন কোন সান্ত্বনা নাই সন্তানহারা বাবা মাকে সান্ত্বনা দিতে পারে না এটাই শেষ কথা, সত্য কথা কারণ কলিজাটা তো বাবা মায়েরই কাটা যায়।

আয়ু তুমি কী, বড় জানতে ইচ্ছে করে

আয়ু, এ গ্রহে কোন প্রাণি প্রাণ নিয়ে যতটুকু সময় থাকে ততটুকুই তার আয়ু বলে ধরে নেয়া হয়। এখন কথা হলো এই আয়ুটা কিসের ভিত্তিতে নির্ধারণ হয়? কেউ পৃথিবীতে আসার পর কয়েক সেকেন্ড, মিনিট, ঘন্টা, দিন, আয়ু পেয়ে থাকেন আবার কেউ শতবর্ষ পার করে দিচ্ছেন।
এখন আসি আয়ুটা কে দেন সেটা দেখি, আবদুল্লাহ ইবনু মাস’উদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, তোমাদের প্রত্যেকেই আপন আপন মাতৃগর্ভে চল্লিশদিন পর্যন্ত শুক্র হিসেবে জমা থাকে। তারপর ঐরকম চল্লিশদিন রক্তপিণ্ড এবং তারপরের চল্লিশ দিন মাংসপিণ্ড আকারে থাকে। এরপর আল্লাহর নির্দেশে একজন ফেরেস্তা আসেন এবং তার রিযিক, মৃত্যু, দুর্ভাগ্য ও সৌভাগ্য লিখে দেন (সহীহ বুখারী (তাওহীদ), ৮২/ তাকদীর ৬৫৯৪)।
কত অসহায় আমরা। কিছুই করার নেই কারো ব্যাপারে। একটা মানব জীবন পৃথিবীতে আসার আগেই তার মৃত্যুর দিন তারিখ নির্ধারিত হয়ে থাকে। ভেবে পাই না এত কিছু তাহলে কেনই করছি। এই যে সন্তান জন্মদান, প্রতিপালন, তার দিকে দৃষ্টি রাখা, তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা। এসবের কোন দরকার আছে বলে কি আপনার মনে হয়। যখন যা হবার তাইতো হবে। বিশেষ করে মৃত্যুর দিন ক্ষণ আর তার সৌভাগ্য দুর্ভাগের ব্যাপারে। কোন অপরাধে আবিরের সেই আত্মা যা কিনা মাতৃগর্ভে ১২০ দিন অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথেই তার অদৃষ্টে এমন দুর্ভাগ্য লিখে দেয়া হলো?
প্রতিটি কাজে মহান আল্লাহকে স্মরণ করেছি। আল্লাহকে ভয় করে চেষ্টা করে গেছি সৎ থাকার। সন্তানদের আল্লাহর হাওলা করেছি। তবু থাকেনি, রাখেনি। বিস্মিত হই কেউ যখন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলে ‘এটা করেই ছাড়বো, ওটা করবোই’ তখন ঠিকই তারা সেটা কোন না কোনভাবে করেই ফেলছে। অধিকাংশের প্রায় সব সাফল্যই এভাবে এসেছে এমন প্রমাণ আছে, প্রার্থনায় এসব আসেনা। আমি এসব দেখেও শিখিনি, বুঝিনি।

কেমন আছি আমি?

আমি এখন সবচে বেশি বিব্রত হই এ প্রশ্নটাতে। আবিরের মা বাসা ছেড়ে বাইরে বেরুনোই ছেড়ে দিয়েছে এ প্রশ্নটার ভয়ে। ইলিনেরও একই অবস্থা। আমি ফেসবুকে বারংবার অনুরোধ করেছি কেউ আমাকে এ প্রশ্নটা করবেন না। যতবার প্রশ্নটা করবেন ততবার আমার মিথ্যের বোঝা বাড়বে। আপনার প্রশ্নের উত্তরে স্বাভাবিকভাবেই আমি বলবো ‘ভালো আছি।’ না, আমি ভালো নেই। আর কখনও ভালো থাকতেও চাই না। আবিরকে ছাড়া আমরা কেউ ভালো থাকবো না এটা আবিরও জানতো, আবিরের বন্ধুরাও জানতো। ওকে ছেড়ে আমরা স্বার্থপরের মতো ভালো থাকতে চাই না। আরো একটা প্রশ্ন চরম বেকায়দায় ফেলে দেয়। নতুন কারো সাথে পরিচয় হলেই জিজ্ঞেস করে ‘আপনার কয় ছেলে মেয়ে?’ এর উত্তরে আমি কি বলবো? যদি বলি দুটো তাহলে পরের প্রশ্ন কে কোথায় পড়ছে। এভাবে একসময় সামনে এসে যায় আবির নেই। যে কথাটা আমি কখনই কারো সামনে একবারও উচ্চারণ করতে চাই না। আবার যদি বলি একটি সন্তান তবে সেটাও মিথ্যে বলা হবে। অথবা আবিরের অস্তিত্ব অস্বীকার করা হবে, এটাও আমি চাই না। দিন দিন চেনা মানুষ, চেনা শহর, চেনা রাস্তাঘাট সবকিছুকেই শত্রু মনে হতে শুরু করেছে। এদের কাছ থেকে লুকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে, পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে, হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। যেখানেই পালাইনা কেন এ প্রশ্ন থেকে আমি কি মুক্তি পাবো? আবিরকে কি এভাবে এড়াতে পারবো?
সংসারের প্রথম সন্তান ঘরে আসার আনন্দটা যত বড় চলে যাওয়াটা তারচে অনেক বেশি বেদনাদায়ক। কথায় আছে বৃদ্ধের হাতের লাঠি তার জোয়ান ছেলে। আমি আমার জোয়ান ছেলেকে হারিয়েছি মানে হাতের লাঠিটাই হারিয়েছি। এটার ওপরে ভর দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে চেয়েছিলাম। সেটা আর কখনই হবে না। এখন সারাটা জীবন কুঁজো হয়ে পা টেনে টেনে চলতে হবে আমাকে। সংসারের বড় ছেলে নিয়ে আরো একটা কথা আছে সেটা হলো ‘বড় ছেলে সংসারের ছাতা।’ অনেক বড় সত্য কথা এটা। আবির আমার সংসারের জন্য এটা ছাতার কাজই করতো কিন্তু ছাতাটা মেলাই হল না। এখন আমার পরিবার বৃষ্টিতে ভিজবে এটা নিশ্চিত।
এখন মানুষের চোখগুলো ভয় লাগে। সবাই যেন কেমন করুণার চোখে তাকায়। সবাই যেন অসহায় সব হারানো নিরুপায় ব্যর্থ অভিশপ্ত একজন মানুষকে দেখছে। আমি যেন তাদের কাছে সাহায্যপ্রার্থী। আমি জানি এমন কখনই নয় তারপরেও এটা আমার মনে হওয়ার কারণ হলো আমি মানসিকভাবে অসুস্থ্য একজন মানুষ। শত চেষ্টা করেও এর থেকে বাইরে বের হয়ে আসতে পারছি না।
কোন কিছুই লিখতে পারি না। লিখতে গেলেই মনে হয় আবির এসে পাশে বসে আছে। আমি যা কিছুই লিখতে যাই না কেন ও সেটা থামিয়ে দিয়ে বলে আমার কখা লিখ। এটার একটা কারণ হতে পারে যে আবিরের চলে যাওয়ার পাঁচদিন পর থেকেই আমি ফেসবুকে আমার ওয়ালে একের পর এক ওর ছবি দিয়েছি, ওকে নিয়ে লিখেছি। এখনও লিখছি। এতে আমার দুর্বল মনে একটা ছাপ এমনভাবে পড়ে গেছে যে শত চেষ্টাতেও সেটা মুছে ফেলতে পারছি না।
আমার অফিসের দেয়ালে একটা ব্যানার লেখা আছে ওর ছবি দিয়ে। ছবিটাতে ও হাসছে। আমি যখন অফিসে পা রাখি মনে হয় আবির আমাকে দেখে হাসছে। আমার কান্না দেখে ও হাসছে। আমি ওই ছবিটা আর সহ্য করতেও পারছি না। আবার কাউকে বলতেও পারছি না ওটা দেয়াল থেকে খুলে ফেলতে। এখন ইচ্ছে করেই আর ছবিটার দিকে তাকাই না। খরশ্রোতা নদী যখন পাড় ভাঙ্গে তখন শুধু পাড়ের মাটিই ভাঙ্গে না শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদ, মন্দির, বন জঙ্গল, বৃক্ষ লতা আর মানুষকে সাথে নিয়ে তলিয়ে যায়। এমনি একটা স্রোত শুধু এক আবিরকে নিয়ে যায়নি, পাশে দাঁড়ানো আমাদের সবাইকে নিয়ে গেছে।
মানুষ আমি, বিচার আমার হবে। রোজ কেয়ামত এরপর হাসরের মাঠে বিচার তারপর নির্ধারণ হবে আমার ভাগ্যে জান্নাত নাকি জাহান্নাম। এসব কোন কিছু না হতেই আমার জন্য আল্লার যে ফায়সালা এসেছে তা কি জাহান্নামের চেয়ে কম? বরং অনেক বেশিই মনে হয়। জাহান্নামের শাস্তি ভোগের পর ক্ষমা আছে। জান্নাতের সু-সংবাদও থাকতে পারে কিন্তু আমার ভাগ্যে শুধুই শাস্তি ভোগ। আবার এ কথাও তো ঠিক কাউকে শাস্তি দিতে হলে এতটাই দেয়া উচিত যে সে যেন সেটা কোন জনমেই না ভোলে। শাস্তি যদি ভুলেই যায় তবে দিয়ে কী লাভ। এই যেমন আমি, এমন শাস্তি পেলাম যে সেটা ভোলার ক্ষমতা নেই। যতদিন জীবন ততদিনই মনে রাখতে হবে। যেকোন কারণেই হোক মহান সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ হতে আমি বঞ্চিত হয়েছি।কেউ হয়তো বলবেন এই যে আপনি এখনও বেঁচে আছেন, আলো বাতাস আর খাদ্য পাচ্ছেন এটাই তো আপনার প্রতি প্রভুর কৃপা। ঠিক তাই, এ মহাবিশ্বে মানুষ ছাড়াও মহান সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ ভোগ করে অন্য সব জীবন বেঁচে আছে। থাকলাম না হয় একদল গরুর সাথে মিশে হাম্বা হাম্বা করলাম আর একদল কুকুরের সাথে কামড়া কামড়ি করে, ঘেউ ঘেউ করে নিজের জানান দিব। কোন ক্ষতি নেই এটাকে তো বেঁচে থাকাই বলে…।

স্বপ্ন দেখি না তবে একটা পরিকল্পনা আছে

আবির যখন থেকে নেই তখন থেকেই স্বপ্ন দেখা ছেড়ে দিয়েছি। মানুষ ছাড়া অন্য সব প্রাণিরা নাকি স্বপ্ন দেখে না। নিজেকে আর মানুষই মনে হয় না। সে কারণেই স্বপ্ন দেখি না, দেখেই বা লাভ কি? আবিরকে নিয়ে আমার স্বপ্নটা ছিল আকাশের সমান। সে স্বপ্ন পুরণের পথে মাত্র কয়েক কদম এগিয়েছিলাম। আর প্রতি কদমেই আল্লাহর শুকরীয়া আদায় করে তাঁরই অনুগ্রহ প্রার্থনা করেছিলাম। সে স্বপ্নই পূরণ হল না নতুন করে আর স্বপ্ন দেখে কোন লাভ আছে বলে মনে হয় না। তবে একটা পরিকল্পনা নিশ্চয়ই আছে। কাউকে বলি না সেটা বাস্তবায়নের জন্য সাহায্য কর, অনুগ্রহ কর কিংবা প্রার্থনা কর। এখন এভাবেই বলি ‘এটা আমি করবোই।’ কাজটা তেমন কোন কঠিনও নয়। আবিরের অনেক দিনের আশা ছিল শহরে আমাদের একটা বাড়ি হবে। ওর একটা রুম থাকবে সে বাড়িতে। শেষবার যখন এলো তখন একটা জমিও দেখালাম। আশা করেছিলাম ডিসেম্বরেই কিনে ফেলবো। তারপর ধিরে-সুস্থে বাড়িটা মনের মতো করে করবো। সেটাতো আর হল না। ইলিন আর এখানে থাকতে চায় না। বলে, যে বাড়িতে ভাইয়া থাকবে না সে বাড়ি বানানোর দরকারও নেই। ভাইয়া ছাড়া ওই বাড়িতে আমি থাকব না।
ইলিন থাক বা না থাক আমি তো আবিরকে কথা দিয়েছিলাম। তাই ইচ্ছে আছে একটা বাড়ি করে একটা ঘর আবিরের জন্যই করবো। ও ঘরটা আবিরের ব্যবহৃত জিনিসপত্র দিয়ে সাজিয়ে রাখবো। ঠিক সেভাবেই সাজাবো যেভাবে ও বাড়িতে আসার আগে আমরা ভাড়া বাড়ির ওর ঘরটা সাজিয়ে রাখতাম। নিটারের পাশেই ও যে কক্ষটা ভাড়া নিয়ে থাকতো সেখান থেকে কিছু জিনিস নিয়ে এসেছি। ওর বন্ধুরা কিছু কিছু জিনিস স্মৃতি হিসেবে রেখেছে। আমাদের কাছে যা ছিল তাও রেখেছি। ওর সেভিং ক্রিম থেকে শুরু করে ছেঁড়া সেন্ডেলটা পর্যন্ত রেখেছি। ঘরের দেয়ালে মস্তবড় একটা ছবি বানিয়ে রাখবো। প্রজন্মের পর প্রজন্ম জানবে এ বাড়ির একটা হতভাগ্য ছেলে ছিল, যার নাম ছিল আবির। আর বিথী যখনই আসবে তথন চাইলে এ ঘরটায় ওই থাকবে।

কেন আমার এ লেখা

আমি আবিরকে নিয়ে বই লিখছি এটা জানার পর অনেকেই প্রচণ্ড আগ্রহ দেখিয়েছেন। অভাবনীয় সাড়া পেয়েছি। রাস্তায় আটকে জিজ্ঞেস করেছেন ‘বইটা কবে পাবো।’ অনেকেই বইটার দাম আগাম পরিশোধও করতে চেয়েছেন। কৃতজ্ঞতা সবার প্রতি। তবে একটা ব্যাপার আমার কাছে বিস্ময়কর ঠেকেছে। আমার ধারণা ছিল আবিরের যারা বন্ধু তারাই বইটা সম্পর্কে সবচে বেশি আগ্রহ দেখাবে। বাস্তবে কিন্ত তা হয়নি। বিচ্ছিন্নভাবে দু-একজন বইটা চেয়েছে মাত্র। তবে কি তারা আবিরকে অনেক বেশি বুঝে ফেলেছে? ভাবছে আবিরের সম্পর্কে আর কি বা লেখার আছে? আবার কেউ বলেছে “নিজের সম্পর্কে এত বলতে হবে কেন?” কেন যে এতকিছু বলছি আর কেনই বা এসব বলতে হবে তার উত্তর আমার এ লেখাতেই আছে।
আবির ১লা আগষ্ট চলে গেছে। আমি ৫ আগস্ট থেকে ফেসবুক আর পত্র-পত্রিকায় সমানে লিখেছি। এটা ওটা হাবি জাবি লিখেছি যা কিছু লিখেছি; দিন শেষে তা শুধু আমার জন্যই লিখেছি। কারো সাথে কথা বলতে না পারার কষ্টটা জগদ্দল পাথর হয়ে বুকের ওপর চেপে বসেছিল। সেটাকেই নামাতে লিখে লিখে কথা বলেছি। ফেসবুকের দেয়ালে যা লিখেছি তার তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। বন্ধুরা আমাকে লিখতে উৎসাহ যুগিয়েছেন। তাঁরা পড়েছেন, কেঁদেছেন। আমি এখন আর কাঁদতে পারি না, আমার বন্ধুরা এখনও কাঁদেন। অসংখ্য বাবা-মা আমাকে ফোন করে তাঁদের সন্তানের প্রতি খেয়াল রাখার নতুন অঙ্গিকার করেছেন। অনেক তরুণ আমাকে ফোন করে বলেছেন ‘বাবা-মায়ের কোন আদেশই আর কোনদিন অমান্য করবো না।’ এক তরুণ তার বাবার সাথে তিন বছর কথা বলেন না রাগ করে। আমার কয়েকটা পোষ্ট পড়েই একদিন সারারাত কেঁদেছেন। পরের দিনই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। যাওয়ার আগে তরুণ আমাকে বলে গেছেন ‘বাবারা যে সন্তানদের এত ভালোবাসেন তা আগে কখনও অনুভবই করতে পারিনি। আপনার লেখা আমাকে সে অনুভব এনে দিয়েছে। আমি আমার বাবার কাছে পা ধরে ক্ষমাা চাইবো।’ এমন একটা কথা শোনার পর আমার আর কি চাওয়ার থাকতে পারে, কি আর পাওয়ার থাকতে পারে?
এক মা আমাকে জানিয়েছেন, তিনি তাঁর দু’সন্তানকে প্রতিদিন আমার লেখাগুলো একবার পড়ান। একজন সন্তান চলে গেলে মা-বাবা কতটা কষ্ট পান তা তাদের বোঝানোটাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। আমার এক প্রতিবেশি একদিন তার স্কুল পড়–য়া ছেলেটিকে প্রচণ্ড প্রহার করলেন। সেদিনই আমার সামনে এসে যা বললেন; তার ছেলেটা সাঁতার জানে না। বন্ধুরা সবাই উপজেলা পুকুরে গোসল করতে যাচ্ছে দেখে ছেলেটিও ওদের সাথে পথ ধরেছে। খবরটা পেয়ে সেই ভদ্রলোক ছেলেটিকে পুকুরে যাওয়া থেকে নিবৃত করার চেষ্টা করলেন। ছেলেটির এক কথা পুকুরে যাবেই। উপায়ন্তর না দেখে ভদ্রলোক ছেলেটিকে প্রচণ্ড প্রহার করে ঘরে আটকে রাখলেন। ভদ্রলোক বললেন ‘ওকে মেরে আমারও খুব কষ্ট হয়েছে কিন্তু ওই একদিনই কষ্ট পেয়েছি। চিরদিন কষ্টের কারণ হোক ছেলেটা এটাতো করতে দিলাম না ’।
এ সবই হয়েছে আমার লেখার জন্য। লিখে লিখেই আমি বোঝাতে সক্ষম হয়েছি যে আমি শুধুই আবিরের বাবা ছিলাম না। বাবা মানে কি? মাত্র একটা শুক্রানুর মালিক যা দিয়ে ও তৈরি হয়েছে? আমি লিখেই প্রমাণ করতে পেরেছি আমি শুধুই একটা শুক্রানুর মালিক ছিলাম না। বরং আমি মনে করতাম আমার ক্ষুদ্রতম রুপটি শুক্রানু আকারে ২৭০দিনে একটা অবয়ব নিয়ে আমারই ঘরে আসে। আমারই সামনে আমি প্রতিপালিত হতে থাকি প্রতিক্ষণ। সেই আবির যখন মরে গেল আমি বেঁচে থাকি কী করে? আমিও তো মরেছি সাথে সাথেই। আমি যখন মরেছি তখন আমাকে জড়িয়ে লতিয়ে ওঠা একটি পরিবার আর তার অন্য সদস্যরা বাঁচে কী করে? মরেতো আমরা সেদিনই গেছি। আমার এমন মরণের কথা কাউকে জানাবো না?

মানুষের এমন ভালোবাসার জবাব কীভাবে দিই?

আবির এ শহরে একজন পরিচিত ছেলে। অনেক বন্ধু তার। ও ক্যাম্পাসেও একজন পরিচিত ছেলে। শুনেছিলাম ওকে ওখানে সবাই অনেক ভালোবাসে। আমিও আমার শহরে পরিচিত একজন মানুষ। আমাকেও এখানে অনেকেই ভালোবাসেন বলে জানি। আমাকে বা আবিরকে কতটা ভালোবাসেন মানুষ তার পরিমাপ কখনই করা হয়ে ওঠেনি। সৃষ্টিকর্তা এবার তাই এক সাথে দু’জনের প্রতি মানুষের ভালোবাসার পরিমাপ করার সুযোগ করে দিলেন।
আমি সত্যি হতবাক! নিটার এবং তার আসেপাশের এলাকাগুলোতে আবির কতটুকু প্রিয় ছিল কিংবা আবিরকে তাঁরা কতটা ভালোবাসতেন তা চোখে না দেখলে কাউকে বর্ণনা করে বিশ্বাস করানো যাবে না। ৪র্থ ব্যাচের র্যাগ ডে আবিরের নামে উৎসর্গ করে কিংবা ৪র্থ ব্যাচের বিদায়ের প্রাক্কালে বিশাল আকারের ফানুস বানিয়ে তাতে আবিরের নাম লিখে উড়িয়ে দিয়ে যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন তা আমরা ভুলে যেতে পারবো না। আমাকে সান্ত¡না দিতে দেশ বিদেশ থেকে যারা ফোন করেছেন তারা এতটাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন যে শেষ পর্যন্ত কাউকে কাউকে আমি সান্ত¡না দিয়েছি। এ সবই আমার প্রতি বন্ধুদের ভালোবাসা। ভালোবাসার জবাবে ভালোবাসা দেব এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু এমন ভালোবাসার জবাবে বা প্রতিদানে যে ভালোবাসা দিতে হবে তা দেয়ার ক্ষমতা আমার নেই। ঋণি হয়েই থাকলাম আজীবন।

মৃত্যুই মানুষের জীবনের সবচে বড় রহস্য !

এক সময় আমার মনে হতো মানুষের জন্ম এবং বেঁচে থাকাটাই একটা বিরাট রহস্য। এখন আমার সে ধারণা পাল্টে গেছে তা না। ওই ধারণাটার সাথে সাথে একটা নতুন ধারণার জন্ম হয়েছে আবিরের মৃত্যুর পর। সেটা হলো মৃত্যুই মানুষের জীবনে সবচে বড় রহস্যময়তা।
এমন ধারণা হওয়ার পেছনে অবশ্য যৌক্তিক কারণও আছে। এমন অনেক কথা আছে এমন অনেক আচরণ আছে যা আমাদের জন্য একটা ঈশারা ছিল অন্ধ আমি সেসব কিছুই বুঝিনি।
১) আমরা মৃত্যুর কথা শুনে কিছুটা হলেও ভয় পাই, বিচলিত হই। আবির কখনই কারো মৃত্যু সংবাদে বিচলিত হত না। বরং এমনভাবে কথা বলতো যেন আর দশটা খবরের মতো এটাও একটা খবর। এর কোন বিশেষত্ব নেই।
২) জুন মাসেই ওর মাকে অকারণেই বলেছিল ‘মা, আমি যেন তোমার আগে মরি। তোমার মরা মুখ আমি দেখতে পারবো না।’
৩) সেই জুনেই একদিন দুপুরে খাবার টেবিলে বসে ওর মাকে বলে ‘মা, ভালো মন্দ যা আছে খাইয়ে দাও। কোনদিন কোথায় মরে থাকি কে জানে’।
৪) আমি আবিরের বিয়ের খরচের জন্য ব্যাংকে টাকা রাখতাম এটাতো আগেই বলেছি। জুন মাসে যখন বাড়িতে এলো তখন আমাকে বললো ‘ওই টাকাটা উঠিয়ে ফেল, আমার জন্যই তো রাখছো আমিই খরচ করে ফেলি।’
৫) আমার অস্থির ছেলেটা হঠাৎ করেই একেবারে শান্ত হয়ে গেল। মৃত্যুর তিনদিন আগে থেকে কারো সাথে তেমন কথাও বলতো না। অনেকেই জিজ্ঞেস করেছে ‘ কী হয়েছে?’ ও শুধু বলেছে ‘না, কিছু হয়নি।’
৬) মৃত্যুর তিন চারদিন আগে বিথীর সাথে বসেছিল। মন খারাপ দেখে বিথী জিজ্ঞেস করেছিল কী হয়েছে? আবির চোখ মুছতে মুছতে বলেছিল ‘আব্বুর কথা খুব মনে পড়ছে। আমার জন্য আব্বু অনেক কষ্ট করছে’। আব্বুর জন্য আমারও কিছু করা দরকার।
৭) নিটারের শেষ কিস্তির টাকা জমা দেয়ার সময় ছিল অক্টোবরের ১-১৫ তারিখ পর্যন্ত। আমি কেন তিন মাস আগেই সমুদয় টাকা জমা দিয়ে ‘কোন বকেয়া নাই’ মর্মে ছাড়পত্র নিলাম?
৮) আবির কেন আমাকে বার বার চাপ দিচ্ছিল ‘পাশেই একটা সুন্দর নদী আছে, চল দেখে আসি’ বলে। আর আমিই বা কেন ওকে বলে এলাম ‘খবরদার তুই ওই নদীতে যাবি না’। (মৃত্যুর ৮ দিন আগে)
৯) কেন ওই অভিশপ্ত কালভার্টটার একটা ছবি তুলে ওর ল্যাপটপে স্ক্রীন সেভার করে রেখেছিল? (এ কালভার্টটাতেই সব অঘটন ঘটেছিল)
১০) ওর শেষ ঈদের আগে বার বার বলেছি ‘যা যা লাগে কিনে নে’ ও এক কথাই বলেছে ‘লাগবে না’। এর আগে কখনও এমন হয়নি।
১১) নিটারে চার বছরের জীবনে যার যার সাথে বিরোধ, অন্য যাদের গ্রুপিং ছিল ওর উদ্যোগেই মৃত্যুর মাত্র ১৬ দিন আগে সব মিটমাট হয়ে যায়। কেন সবার সাথে এ বিরোধ নিস্পত্তি?
১২) নিটার ক্যান্টিনে ওর প্রিয় ছিল কর্ণার টেবিলটা। একটা বিরোধের কারণে দীর্ঘদিন সেখানে আর বসেনি। সেদিনই কেন সেই প্রিয় কর্ণার টেবিলটায় সবার সাথে বসে খাবার খেয়েছিল?
এমন অসংখ্য রহস্যময়তার ভেতর দিয়ে মৃত্যুর আগে দুটো মাস ও অতিবাহিত করেছে। এতে কি ধারণা করে নেয়া যায় মানুষ তার পরিণতি নিজেই ভেতর থেকে অনুভব করতে পারে কিন্তু কাউকে বলতে পারে না? আমি এমনও এক ব্যক্তিকে দেখেছি যিনি নিজেই নিজের কাফনের কাপড় কিনে এনে রেখে প্রতিবেশীদের দাওয়াত দিয়ে এসেছেন নিজের বাড়িতে আসার জন্য। এরপর তিনি গোসল সেরে উত্তর দিকে মাথা দিয়ে উঠোনে শুয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পরে যখন প্রতিবেশীরা আসতে শুরু করলেন সবাই অবাক হয়ে দেখলেন তিনি অনেক আগেই মারা গেছেন। জীবন যতবড় না রহস্য মৃত্যু তারচে অনেক বড়। আবির চলে গেল এমন অনেক রহস্য রেখেই।

একটা জন্মদিন এবং বন্ধুত্বের অসমাপ্ত গল্প

১৬ জানুয়ারি ২০১৮।
আবিরের ২৩ তম জন্মদিন। বাসায় আমরা তিনজন মানুষ,আমি আবিরের মা এবং ইলিন। আবিরের জন্মদিনটা সবারই মনে আছে কিন্তু কেউ কাউকে কিছুই বলছিনা। বাসায় কোনদিনই কারো জন্মদিন ঘটা করে পালন করার রেওয়াজ ছিলনা। তবে আবির ইলিন বড় হয়ে ওঠার সাথে সাথে জন্মদিন এলেই রাত ১২-০১ মিনিটে কানের কাছে মুখ নিয়ে বলতাম ‘শুভ জন্মদিন’। ওরা এতেই খুশি ছিল। আবির লেখাপড়ার জন্য ঢাকায় যাওয়ার পর ফোন করে শুধু বলতাম ‘শুভ জন্মদিন’। এবার বলতে পারিনি তাই ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিল। কেউ কাউকে সেটা বুঝতে দিতে চাইনি।
ইলিন সকালেই গোসল সেরে কলেজ ড্রেস পড়ে ‘কলেজে যাচ্ছি বলে’ বাসা থেকে বের হলো। আমি আমার কাজে বেরুলাম। ওর মা বাসায় থাকলো। দুপুর বারোটার কিছু পরে ইলিন আমার ফোনে বার্তা পাঠালো ‘বাবা বাপ্পী ভাইয়া এখন ঠাকুরগাঁওয়ে’। আমি সাথে সাথেই বাপ্পীকে ফোন দেই,বাপ্পী ফোন ধরেনা। একবার ,দুবার এভাবে বার বার ফোন দেয়ার পর বাপ্পী ফোনটা ধরে।
: বাপ্পী তুমি কোথায় ?
: ঠাকুরগাঁওয়ে ।
: এখন কোথায় আছো ?
: আবিরের কাছে,ওর কবরের পাশে।
আমি বাপ্পীকে তখনি বাসায় আসতে বলি। ও ওখানেই থাকতে চায়। আমি ওখানে ওকে থাকতে দিতে চাইনা তাই বার বার বাসায় আসতে বলি। দুপুরের পর বাপ্পী বাসায় আসে।

কী ঘটেছিল সেদিন ?

আমাদের মত বাপ্পীও আবিরের জন্মদিনটা মনে রেখেছিল। ১৫ ডিসেম্বর রাতেই কাউকে কিছু না বলে ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। সকালে ঠাকুরগাঁওয়ে নেমেই সোজা চলে যায় আবিরকে যেখানে শুইয়ে রাখা হয়েছে সেই কবরস্থানে। কাউকে কিছু না বলে কবরের পাশে বসেছিল।
ইলিন কলেজে যাচ্ছি বলে বাসা থেকে বের হলেও কলেজে যায়নি। ও সোজা গিয়েছিল আবিরের কাছেই। গিয়ে দেখতে পায় কেউ একজন আগে থেকেই সেখানে বসে আছে। ইলিন ছেলেটিকে চিনতে পারেনি। ছেলেটি ইলিনকে চিনেছিল। বাপ্পী ইিলনের কাছে নিজের পরিচয় দিতেই ইলিনের চোখে মুখে ক্ষুদ্ধতা ঝরে পড়ে। কাঁদতে কাঁদতেই বাপ্পীকে জিজ্ঞেস করে – আমার ভাইয়ার হাতটা কেন ছেড়ে দিয়েছিলে ?
বাপ্পী ইলিনের প্রশ্নে কোন জবাব দেয়নি।
বাপ্পীকে আবিরের ঘরটাতেই থাকতে দিয়েছিলাম, বাপ্পী থাকেনি। দুপুরের খাওয়া সেরে আবার আবিরের কাছে গিয়ে বসেছিল। সন্ধ্যায় আমি গিয়ে নিয়ে এলাম। অনেক করে থাকতে বললাম একটা দিন, বাপ্পী থাকেনি। রাতে আমি গিয়ে উঠিয়ে দিয়ে এলাম ঢাকাগামী নৈশ কোচে।
বাপ্পী চলে গেল ,গেলনা আমাদের ভেতরের দগদগে ঘা টা। ওখানে আবারও ক্ষরণ শুরু হল। হয়ত আরো কটা জন্মদিন বাপ্পী অসহায়ভাবে শুয়ে থাকা আবিরের কাছে আসবে। আনমনে কিছু কথা বলবে। আরো কিছুদিন পরে জীবনের নিয়ম মেনে শত ব্যস্ততার মধ্যে আসার সময় হবেনা। তারও পরে কোন একদিন নামটাও আর মনে হবেনা। আবির একা…. একাই থেকে যাবে। বন্ধুত্বের অসমাপ্ত গল্পটার সাক্ষী হয়ে থাকবো আমরা…..।

কথা কখনই শেষ হয় না…

শেষ কথা বলে আসলেই কি কোন কথা আছে?
না, নেই। অন্ততঃ আমার কাছে আছে বলে মনে হয় না। যেখানে একটা কথা শেষ সেখানেই আর একটা কথার শুরু। আমিতো অনেকগুলো কথা বললাম। এর কোনটাই শেষ কথা নয়। এর পরেও কথা আছে, কথা থাকবেই। জীবন থেমে যাবে কথা থামবে না। আমি জীবনের কথা বলেছি কিছুটা। কথা বলতে বলতে এমন অনেক কথাই বলেছি যা একান্তই আমার নিজস্ব অসুস্থ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। সেসব কথার সাথে আপনি বা আপনারা একমত হবেন এমন কোন কথা নেই। আমি কাউকে একমত হওয়ার অনুরোধও করি না। এমন কিছু কথা লিখেছি যা অনুমান নির্ভর যা আপনার মনো-কষ্টের কারণ হয়ে থাকে তবে নিজ গুনেই ক্ষমা করবেন। জানি একদিন আবিরকে কোন বন্ধুই মনে রাখবে না। আর এটাও জানি আমরা কখনই ওকে ভুলে যাবো না। ভুলে যাওয়ার চেষ্টাও করবো না। যখনই সময় পাবো নিটার ক্যাম্পাসে যাবো। আবিরের নাম ধরে ডাকবো। আমি জানি ও জবাব দিতে না পারলেও আমার ডাক শুনবে। নিশ্চয়ই খুশিও হবে এই ভেবে যে ওর বাবা এখনও ক্যাম্পাসে ওকে খুঁজতে আসে। আর ক্যাম্পাসের সে সময়ের অপরিচিত শিক্ষার্থীরা একজন পাগল ভেবে হয়ত তাড়িয়ে দেবে। আমি পাগল নই, পাগল হওয়া চলবে না আমার। পাগল হলে তো আবিরকে ভুলে যাবো। যা আমি কোনদিনই পারবো না। একজন পিতা তার ছেলের সম্পর্কে লিখছে তাই স্বাভাবিকভাবেই আবিরের চরিত্রের দোষগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। আবার আর একদিক দিয়ে ভাবতে গেলে বলা যায় একজন মৃত মানুষের দোষগুলো তুলে ধরে কারোই তেমন কোন লাভ হবে না। তাকে সেই সব দোষের কারণে বিচারের মুখোমুখিও করা যাবে না। তাকে ক্ষমা করার এবং শাস্তি দেয়ার মালিক এখন একমাত্র সৃষ্টিকর্তা। এ প্রসঙ্গে একটি হাদীস উল্লেখ করছি। ইবনুন নাজ্জার এ হাদীসটি হযরত আবু হুরায়রা(রাঃ) থেকে সংগ্রহ করেছেন। রাসুলুল্লাহ(সাঃ) বলেছেন- যখন তোমরা জানাযা আদায় কর, তখন মৃত লোকটির প্রশংসা কর এবং তার ভালো কর্মের আলোচনা কর। কেননা প্রতিপালক বলেন ‘তারা সজ্ঞানে যে কাজের সাক্ষ্য দিচ্ছে তাতে আমি তাদের সাক্ষ্য গ্রহন করছি। আর যা তারা জানে না তার জন্য ক্ষমা করে দিচ্ছি (২৭৫)’।
সবাই সজ্ঞানে বলেছেন আবির অনেক ভালো একটা ছেলে ছিল, পিতা হয়ে আমিও বলছি। হে প্রভু তুমি তাকে ক্ষমা কর।

অন্ধ রাজা এবং বোকা রাজপুত্র

আমি তো আমার ভুবনে রাজাই ছিলাম। চারজনের ছোট্ট সংসার, আমারই কর্তৃত্ব সেখানে। যতটুকু জানতাম তাতে আমাকে নিয়ে তাদের কোন অসন্তুষ্টি ছিল না। আমার রাজ্যে কোন বিদ্রোহও ছিল না। বহিঃশত্রুর আক্রমনে কখনই ভয় পাইনি, কারণ আমার রাজ দরবার আর পরিষদ সুরক্ষিত ছিল। আক্রমনটা এলো এমন জায়গা থেকে যেখানে আমার দৃষ্টি যায়নি কখনও। অত্যন্ত ক্ষিণ দৃষ্টি সম্পন্ন অথবা অন্ধই ছিলাম। কারা বেঁচে থাকে, কীভাবে বাঁচে কখনও ডাইনে বাঁয়ে তাকিয়েও দেখিনি অথবা দেখতে পাইনি। আগেও অনেকেই অন্ধ বলেছে অনেকে আবার শতর্কতা সংকেতও দিয়েছেন। কোনটাই আমলে নিইনি। ভুলভাবে বেড়ে উঠেছি, ভুলভাবে বেঁচে ছিলাম, ভুলভাবে সংসার করছি আর ভুলভাবেই সন্তান প্রতিপালন করে গেছি। সন্তানদের শিক্ষাটাও দিয়েছি ভুল। সেই ভুল শিক্ষায় আবিরকে বানিয়েছি বোকা। ওর চরম বোকামির খেসারত ওকে তো বটেই পুরো পরিবারটিকে দিতে হলো। রাজাই যদি অন্ধ হয় তবে প্রজার চোখ কতটুকুই বা দেখবে। ভিত্তিহীন আদর্শের বুলি আওরিয়ে পারিপার্শ্বিকতার সত্যকে আড়ালে রেখেছি। ফলে সেটার সামনা-সামনি হয়ে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীর আচরণটাই করে নিজেকে নিঃশেষ করেছে। এখন চোখে আলো পেয়ে লাভ কী? দেখে দেখে নিজেক আর কতটুকুই বা পাল্টাতে পারবো। সে সময়টাই বা কোথায়। নিজেকে কারো মতো করে পাল্টানোটা আমার পুরো পরিবারেরই ছিল স্বভাব বিরুদ্ধ। আজ যখন নিজেকে কিছুটা হলেও পাল্টাতে চাই তখন দেখি এটাই জগতের সবচে কঠিন কাজ। এতকালের শেখা এক নিমিষেই পাল্টাতে পারছি না আবার খাপ খাওয়াতেও পারছি না। অনেক ভেবে দেখলাম তারচে বরং পালিয়ে যাওয়াটাই শ্রেয়…
এভাবেই শেষ হোক অন্ধ রাজা আর তার বোকা রাজপুত্রের গল্পটা… ।

উপন্যাসটি লেখক ও প্রকাশকের অনুমতি সাপেক্ষে প্রকাশ করা হলো।

#

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here