অভিন্ন সম্প্রীতির এ আমার দেশ। সেলিম মোঃ শহিদুল আলম

0
551

অভিন্ন সম্প্রীতির এ আমার দেশ

সেলিম মোঃ শহিদুল আলম

শৈশবে ধর্ম। মুসলিম হিন্দু খ্রিস্টান বৌদ্ধ বা অন্য সম্প্রদায়ের পার্থক্য কখনও বুঝিনি। এখনও বুঝি না। খুব মনে আছে শৈশবসাথী পিযুসের কথা। সকালে বাড়ির পাশের মসজিদ ঘরের বারান্দায় আরবি শেখার জন্য যেতাম আমি। প্রতিবেশী শৈশবসাথী পিযুস প্রায়ই খেলার ছলে মসজিদ ঘরের বারান্দায় আমাদের টানে আমাদের পাশে বসে পড়া দেখত। হুজুর বারণ বা অনুৎসাহ করতেন না, অবশ্য ভাল চিনতেন ওকে, অন্যরাও। এমন আশা যাওয়ায় পিযুস কিছু আরবি পড়া, সুরার আয়াতও শিখে নিয়েছিল। আমাদের সম্প্রদায়ে অনেকটা মানিয়ে সে হঠাৎ কোন কোন শুক্রবারে জুম্মার নামাজের শেষে অনুষ্ঠিত মিলাদে সমসুরে আমার পাশে বসে দুরূদ পড়ে জিলাপি খোরমা মিষ্টি নিয়ে খেতে খেতে বাড়ি ফিরেছে।
আমিও ওদের পূজায় উৎসবে আনন্দ ভোগে গিয়েছি কত, সপ্তমী অষ্টমী নবমী দশমী দেখেছি, সুন্দর বিগ্রহ দেখে তাকিয়ে থেকেছি শুধু। পিযুসের বড় বোন ওর মত আমাকেও ভাই ফোটা, হাতে সুতো বেঁধে দিত। শৈশবে আমাদের সম্পর্কটা আমাদের ছিল।
আমরা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় পিযুসের বাবার সরকারি চাকরিতে বদলীজনিত কারণে সপরিবারে চলে গেছে। কোথায় গেছে মনে পড়ছে না। প্রায় সমবয়সি পিযুস এখন কেমন আছে কি করছে, জানা হয় নাই।
মনে পড়ে। পাড়ায় মুসলিম একবৃদ্ধ ছিলেন। সকল শিশুদের দাদু ভাই’র মত। কুঁজো হাঁটাচলা। হাতে একখানা লাঠি নিয়ে হাঁটতেন। রাগ ছিল খুব। শিশুরা অনেকে দুষ্টুমি করত, উনি ক্ষেপে লাঠিও ফিক্তেন। আমাদের ঐ বয়সে আমরা ভয় পেতাম ওনাকে। এহেন বৃদ্ধকে খোঁচাখুঁচি বেয়াদবির জন্য অভিভাবকের কমবেশী গালমন্দ শাসন সবাই পেয়েছি। কিন্তু পিযুস ভিন্ন। তাকে দাদু খুব আদর করতেন। প্রায় বিকেলে পিযুস নির্ভয়ে উনার কোলে বসে, মূখের দাঁড়ি বুলোয়, গল্প করে, এদিকে ওদিকে হাতমুঠে হেঁটে বেড়ায়, লাঠি পড়ে গেলে কুঁড়িয়ে দেয়। দাদু পিযুসের জন্য তার অল্প পরিসরের পয়সাকড়ি থেকে মুড়ির মোয়া, চকলেট, কলা কিনে খাওয়াতেন, দূরে কোথাও খেলনা কিছু পছন্দ হলে পিযুসের জন্য কিনে আনতেন দাদু। একদিন তাদের দেখা না হলে পিযুসের বাড়িতে এসে খবর নিয়ে যেত কেন দেখা হয় নাই। পিযুস দাদুর ভালবাসায় কাতর যথেষ্ট।
কিছুদিন পর। দাদু একরাতে পৃথিবী ছেড়ে যান। তার মৃত্যুতে সারারাত কেঁদেছিল পিযুস। বাবা-মা’র সান্তনায় ভুলেনি সে। পরের দিন তার বাবার সাথে কবরস্থানের পাশে দাঁড়িয়ে জানাজা দেখেছে, কবরস্থ দেখেছে দূর থেকে, একসময় ফেরত লোকজনের দলে বাবার হাত ধরে বাড়ি ফিরেছে। ক’দিন সময় লেগেছিল তার স্বাভাবিক হতে।
কৈশোরে মুসলিম বন্ধুরা ছাড়াও মিঠু নন্দী, ভিক্টোর, তপন, দেবাশিষ, মালতি, বৈশাখী আমার বন্ধু ছিল। এদের মাঝে ভিক্টোর খ্রিস্টান, উচ্চ মাধ্যমিকের পর ইংল্যান্ড গেছে আর ফিরে নাই। আমাদের সম্পর্কটা এমনই শুধু ঘুমানোর সময়টা বাদ দিলে বাকীটা সময় একসাথে একমাঠে এক স্কুলে বেশীর ভাগ এক শ্রেণিতে। এক বয়সি এতগুলো আমরা, কত ধরনের খেলায় যে মেতে থাকতাম তার হিসেব নাই। খেলাকে কেন্দ্র করে ঝগড়া কুস্তি গালমন্দ হতো, কয়েকদিন কথাও বন্ধ থেকেছে কারো কারো সাথে, আবার মিল মহব্বত গলায় গলায় সম্পর্ক পুনঃস্থাপন হয়েছে। বনভোজনে গিয়েছি একত্রে বহুবার সার্বজনীন খাদ্য উপাদান মেনে।
পরস্পর ধর্মোৎসবে অংশগ্রহণ, উল্লাস আনন্দ বিনোদন নিমন্ত্রণ দুঃখ শোক পরস্পর ছিলাম। তখনও দেখেছি নিজ ধর্ম নিজ বিশ্বাস, বন্ধুত্বেও আমরা নিখুঁত বিশ্বাস।
ফুটবল খেলার মাঠে আনোয়ারের অনিচ্ছাকৃত আঘাতে দেবাশিষের পা’ ভাঙ্গে। দেবাশিষ পায়ে প্লাস্টার বাধা অবস্থায় বাড়িতে পড়েছিল কিছুদিন। আনোয়ার নিজেকে ভিষণ অপরাধী ভেবে অনুশোচনায় দেবাশিষের বাড়িতে গিয়ে দেখা করেছে কয়েকবার আমাদের নিয়ে। প্রথম দিন যেতে ভয় পেয়েছিল যদিবা দেবাশিষের বাবা মা রাগ করেন। না রাগ করেননি তারা। আমরা গুটি গুটি পায়ে ঘরে ঢ়ুকে দেখি দেবাশিষ বিছানায় শুয়ে আছে। পায়ে সাদা প্লাস্টার। নিরব শান্ত পরিবেশ। আনোয়ার দেবাশিষের পাশে বসে। আমরা দাঁড়িয়ে থাকি। কী থেকে কী হয়ে গেলো – বলে আনোয়ার দেবাশিষের হাত ধরলো। অনেক ক্ষণ তারা হাত ধরে থাকলো। এক সময় আনোয়ারের চোখ থেকে জল গড়াতে থাকলো। দেবাশিষ ঠিক থাকতে পারলো না। তার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। এই দৃশ্য দেখে আমরাও কাঁদতে লাগলাম।
আমাদের পাড়ায় বিশাল আয়তনের সরকারি দীঘি ছিল, এখন সংকীর্ণ। সে সময়ে ওয়াসার পানি এ অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত নয়। গ্রীস্মকালে টিউবওয়েল চেপে পানি উত্তোলন কষ্ট সাধ্য ছিল। আমরা বন্ধুরা মিলে হৈ হুল্লোরে দীঘির জলে গোসল সেরেছি বিশেষ করে ছুটির দিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এক ছুটির দিনে সাঁতার না জানা তপন পানিতে ডুবে গেলে ফজলু ও আলিম সাহসিক প্রচেষ্টায় বাঁচিয়ে ছিল তাকে।
মনে পড়ে। আমাদের শ্রেণির মেধাবী ছাত্র জোবায়েরের অকাল মৃত্যুতে স্কুলে আয়োজিত স্মরণ সভা ও প্রার্থনা অনুষ্ঠানে দেখেছি অনেকের অশ্রুসিক্ত চোখ, দেখেছি দেবাশিষ, বৈশাখী, মিঠু নন্দীর ক্রন্দন অনুভব বন্ধু হারানোর শোকে।
সেবার। আন্তঃজেলা স্কুল প্রতিযোগিতায় ব্যাডমিন্টন ইভেন্টের একক ম্যাচে আমাদের স্কুলের মালতি ফাইনালে উঠেছিল। বন্ধুরাসহ স্কুলের অনেকেই উপস্থিত ছিলাম। দুর্দান্ত এক ম্যাচ, একবার মালতি এগিয়ে, একবার প্রতিপক্ষ, টানটান উত্তেজনার দীর্ঘ খেলায় অবশেষে মালতি জয়ী। আমাদের জয়। পুরো প্রতিযোগিতায় ঐ একটি পদক আমাদের স্কুলের সেবার। সেদিন উল্লাস করেছি, মালতি মালতি ধ্বনিতে মাঠ মূখরিত রেখেছি। তখন ধারার মত আনন্দ অশ্রু দেখেছি রহমান স্যারের চোখে, হোসনেয়ারা ম্যাডামের চোখে মালতিকে জড়িয়ে ধরে। আনন্দ অশ্রু মালতির চোখে।
এ আমাদের সম্প্রীতি। আমাদের শৈশব কৈশোর আমাদের মত। কে খ্রিস্টান কে মুসলিম কে হিন্দু কে কি ভাবিনি কেউ। যার ধর্ম তার, বন্ধু আমরা সবার।
আমি বিশ্ব ঘুরিনি। আমি আমার চোখে আমার দেশে আমাদের সম্প্রীতি দেখেছি। আমরা আমাদের আমরা আপামর, আমরা বাংলার। ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায় অভিন্ন সম্প্রীতির এ আমার দেশ।
লেখাটি ‘চালচিত্র’ ২০১৭ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত। আরও লেখা পড়তে ভিজিট করুন – www.chalchitro.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here